প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৪
ইনান হাওলাদার
গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছে আহি – তূর্য। তূর্য মাঝে মাঝেই দেরি করে ফেরে এইজন্য তার কাছে একটা ডুপ্লিকেট চাবি থাকে।সেটা দিয়েই বাড়িতে প্রবেশ করেছে। বাইক গ্যারেজে রেখে দুজনেই ফ্রেশ হতে গিয়েছে। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরোলো আহি।খুব ক্ষুধা লেগেছে।সে তড়িঘড়ি করে ড্রয়িং রুমে আসলো।ঘুটঘুটে অন্ধকার।খালি চোখে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না ।বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে আছে বেশি আলো জ্বালালে ঘুমে ডিস্টার্ব হতে পারে তাই সে একটা লাইট অন করল।
ডাইনিংয়ে সকল খাবার ডেকে রাখাই আছে। সবগুলো একে একে দেখে নিলো।গরুর মাংস হলে আহির আর কিচ্ছু চাই না। সে মাংসের বাটিটা নিয়ে কিচেনে গেল।সেটাকে গরম করে টেবিলে বসতেই মেইন ফটক দিয়ে তূর্য আসলো । হাতে একটা ক্লিনিং স্প্রে। আহি তাকে দেখেও না দেখার ভাব করে প্লেটে মাংস নিতে আরম্ভ করলো। আজ এমনিতেই অনেকটা লজ্জায় পড়েছে।এখন তূর্যের চোখে চোখ পড়লেও লজ্জায়
পাতাল পুরিতে ঢুকে যেতে ইচ্ছা করছে। তূর্য এগিয়ে আসলো আহির কাছে।ওর পাশের চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বলল,
” ভালোই তো ! আমার গোটা একটা বিকাল, সন্ধ্যা,রাত বরবাদ করে দিয়ে একা একাই খেতে বসে গেলি । দুইটা মিনিট ওয়েট করার ধৈর্যও হলো না ”
আহি কোনো কথা না বলে একটা প্লেট তূর্যের সামনে রেখে ভাত তোলার জন্য চামচে হাত দিতেই তূর্য ওর হাত আটকে দিলো।তারপর বলল,
” আগে বল কী কী রান্না হয়েছে ”
আহি সবগুলো খাবারের নাম বলল।তূর্য একটু সময় নিয়ে বললো,
” মাংস তো গরম করেছিস! চিংড়ি আর এইটা কি শাক? আই থিঙ্ক পালং । হ্যাঁ,পালং শাক! যাহ, এই দুইটা গরম করে নিয়ে আয় ”
” রাতে এত কিছু খাবেন? শুধু মাংস খেলেই তো হয় ” আহ্লাদী গলায় বলল আহি।
” তোর মতো এক গাল ভাতে পেট ভরে না আমার যে এক আইটেমেই হয়ে যাবে। যেটা বলেছি সেটা কর ”
আহি মনে মনে তূর্যকে ব’কতে ব’কতে খাবার গুলো গরম করতে গেল। তূর্য আহির কান্ডের মুচকি হাসলো।
কিছুক্ষণ বাদে আহিকে আসতে দেখে ফের মুখে গাম্ভীর্য টানলো। আহি খাবার গরম করে তূর্যের সামনে রেখে পুনরায় নিজের প্লেটে হাত চালালো।ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছে তার অথচ এতক্ষণ ধরে একটা ভাতও মুখে দিতে পারলো না। কেবল কয়টা ভাত মাখিয়েছে, তূর্য পুনরায় বলল,
” হাতে জার্ম আছে,এই মুহূর্তে উঠতে মন চাইছে না ”
” এখানে হ্যান্ড ওয়াশ এনে দিব ?”
” খাইয়ে দে ”
তূর্যের এমন আবদার শুনে তড়িৎ বেগে আহির ভিতরে বাড়ি খেলো। একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
” কি বলছেন ,তূর্য ভাই? ”
” আ’ম ভেইরি হাঙ্গরি। তোর ঢং দেখার টাইম নেই। শুরু কর ,ফাস্ট ”
” আমারও খুদা লেগেছে।”
” তো তুইও খা।নিষেধ করেছি আমি ?”
” আমি মাংস দিয়ে খাবো ”
” ফার্স্ট শাক খাবি,সেকেন্ড চিংড়ি, দ্যান মাংস ”
” তূর্য ভাই !”
” বেশি টাইম নিচ্ছিস আহি ”
হঠাৎ দরজার ঠকঠক আওয়াজে ধ্যান ভাঙলো আহির। মানুষ দিবা স্বপ্ন দেখে , তাই বলে এতটা ? তূর্য ভাই তাকে খাইয়ে দিতে বলবে ? আর সে না খাইয়ে দেওয়ায় জন্য এতগুলো কথা বলবে? এটাও সম্ভব?তূর্য মুখ ফুটে একবার বললে সে তো নাচতে নাচতে খাইয়ে দিবে। তবে তার জেগে জেগে দেখা স্বপ্নের পুরোটা মিথ্যা নয়। সে নিচে গিয়েছিল । হট ওয়াটার বাগ আনতে গিয়েছিল।তখন তূর্যকে ক্লিনিং স্প্রে হাতে বাইরে যেতে দেখেছিল।আর ওগুলো তো বড় মাকে দুপুরে রান্না করতে দেখেছিল । এপর্যন্তই !
সেখান থেকে মাংস গরম থেকে শুরু করে তূর্য ভাইকে খাইয়ে দেওয়া পর্যন্ত দেখে ফেললো? যদিও এখনো মুখে ভাত তুলে দিতে পারেনি।দরজায় আরেকটু পর ঠকঠকানি পড়লে সেই কাজটা করে ফেলত।
” কী ধ্যানে মগ্ন হয়েছিস ? ”
তূর্যের রাশভারী কন্ঠে পুনরায় ভাবনার ছেদ ঘটলো তার। পেটের উপর থেকে হট ওয়াটার ব্যাগটা সরিয়ে শোয়া থেকে আধ শোয়া হলো সে।
‘ কি ধ্যানে মগ্ন হয়েছি শুনলে আর আস্ত রাখবেন না ‘ মনে মনে কথাটা বললো আহি। তূর্য একটা প্লেট হাতে এসেছে। সেই প্লেটটা আহির পাশে রাখতে রাখতে বলল,
” খেয়ে নে ”
” আপনি খেয়েছেন ? ”
” নাহ! তোর জন্যে না খেয়ে বসে আছি ”
আহির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো।অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললো,
” সত্যি ?”
” ইডিয়ট! খেয়েছি আমি । তুই খেয়ে ঘুমা ” বলে চলে যায় তূর্য।
যদিও বিকাল থেকে অনেক হাবিজাবি খাবার খেয়েছে তবুও খুব বেশি ক্ষুধা লেগেছে আহির। এই মুহূর্তে খাওয়াটা খুব জরুরি। তবে তূর্য খাবার নিয়ে না আসলে খেত কিনা সন্দেহ।পেট ব্যথা নিয়ে উঠতও না আর খেতেও না। কিন্তু হাত ধোয়ার জন্য হলেও তো উঠতে হবে। তবে শাক – ফাক নিয়ে এলে খাবে না। পেটে ক্ষুধা নিয়েই ঘুমোবে।সে আগে খাবারটা আলগা করলো।যাক বাবা শাক না ! মাংসই এনেছে।তবে একটা জিনিস দেখে অবাক হলো আহি।
তল পেটে প্রজাপতি উড়তে আরম্ভ করলো। ভাতগুলো মাখানো!সাথে একটা চামচ রাখা। তূর্য ভাই তার জন্য ভাত মাখিয়ে এনেছেন ? এটা কি সত্যি? নাকি আবার জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে? নিজেকে একটা চিমটি কাটলো সে। ব্যথাও পেল।তারমানে এটা সত্যি , স্বপ্ন নয়!
তূর্য সাধারণত সবসময়ই ফোন সাইলেন্ট করে রাখে। ফোন কলের রিংটোন কী সেটাও হয়তো মনে নেই। কিন্তু ভোর হতে একনাগাড়ে কল বেজে যাচ্ছে।ঘুমের ঘোরে বালিশের নিচ থেকে হাতিয়ে মোবাইলটা বের করলো সে। হাতের আন্দাজে বুঝলো তার মোবাইল বাজছে না।তাহলে কার ফোন? পিটপিট করে চোখ খুললো। সারা রাত অন্ধকারে ডুবে থাকা চোখে ভোরের আলো পড়তেই ভ্রু কুঁচকে ফেললো ।আড়মোড়া ভেঙে শব্দের উৎস খুঁজলো।ড্রেসিং টেবিলের উপর রিং হচ্ছে।
শীত শীত আমেজ পরে গিয়েছে। ভোরের আবহাওয়াটা বেশ ভালোই ঠান্ডা। তূর্য উঠে উদাম শরীরে একটা ফুল স্লিভ টিশার্ট জড়ালো। তারপর ড্রেসিং টেবিলের কাছে গেল।আহির মোবাইল! তার জানা মতে কাল অত রাতে বাড়ি ফিরে আহি আর তার রুমে আসেনি। আর এত ভোরেও ঘুম থেকে ওঠার কথা নয়।
মোবাইল হাতে নিল সে। কল নয় এলার্ম! সেটাকে অফ করে একবার টাইম দেখতেও ভুললো না। সাতটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তাহলে আর ভোর নেই । সে করিডোরে গিয়ে আহিকে একবার ডেকে নিলো। তারপর ফ্রেশ হতে ঢুকলো। কিছুক্ষণ বাদে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখলো আহি গোমড়া মুখে খাটে বসে আছে। তূর্য গিয়ে ডিভানে বসলো।তারপর বলল,
” অল গুড ? ”
সে যে সকাল থেকে মোবাইলটা খুঁজে পাচ্ছে না , সেটা বললে তো তূর্য ভাই বকবেন ।এমিতেই কিনে দেওয়ার সময়ই অনেক কথা শুনিয়েছিল। সে বলল,
” মোবাইল হারিয়ে গেছে ”
” ওহ ! ”
আহি আশ্চর্জিত হয়ে বলল,
” ব’কলেন না যে !”
” আ’রেকটা কিনে দিবো ,এইজন্যে। ”
” সত্যি কিনে দিবেন ?”
” হুম!তার আগে এক কাপ কফি করে নিয়ে আয় । যাহ ”
খুশিতে যখন আত্মহারা আহি। ঠিক সেই মুহূর্তে ওর ড্রেসিং টেবিলের উপর নজর গেল।মুখে হাসি ফুটলো
ঐতো তার মোবাইল।সে উঠে মোবাইলটা হাতে নিয়ে বলল,
” এই যে মোবাইল,আর আমি সারা দুনিয়া খুঁজছি। এখন তাহলে আসছি ”
তারপর হেলেদুলে যেতে নিলো সে ।তূর্য মনে করিয়ে দিয়ে বলল,
” কফি ! ”
” তূর্য ভাই শরীরটা কেমন কেমন লাগছে। নড়তেও কষ্ট হচ্ছে” মিথ্যা অসুস্থতার নাটক করতে করতে বলল আহি।তারপর দৌঁড়ে পালালো। তূর্য শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলো।
ঠোঁ’ট প্রসারিত হলো তার আর বিড়বিড় করে বলল,
” এত আলসে বউ তো আমার চলবে না । ”
আহি মোবাইলটা পেয়ে আগে ড্রয়িংরুমে দৌড় লাগালো। সবাইকে তো আগে জানাতে হবে সে মোবাইলটা পেয়েছে। আজকে মারুফা বেগমের পাশাপাশি পারভিন বেগমও তাকে কড়া কথা শুনিয়েছেন।রাতারাতি মোবাইল কী করে ফেললো? জানে হারায়নি , কোথাও রেখেছে কিন্তু এখন কেন মনে করতে পারছে না?
এদিকে সে যে ভোর রাতে একবার তূর্যের রুমে গিয়েছিল সেটা তো ভুলেই বসেছে।
আগে তো তূর্য রুম থেকে বারান্দায় আসলেও পারলে ডোর লক করে রাখতো।কিন্তু এখন রাখে না, কেন? সেসব না হয় বাদ,রাতেও ডোর লক করে না ? এই নিয়ে তিন দিন সে চুপিচুপি তূর্যের রুমে গিয়েছে। তবে তার মধ্যে একদিন দোরগোড়া থেকে ফেরত আসতে হয়েছিল। ভেতর থেকে আটকানো ছিল।বাকি দুই দিন কার্য হাসিল করে চলে এসেছে।
তবে এখন আর সে চোরাচুরি করে না। ভদ্র হয়ে গেছে। গোপনে গোপন কাজ হাসিল করে।গোপন কাজের কথা মাথায় আসতেই দুই গাল রাঙা হয়ে উঠেছে তার।যদি কোনো ভাবে একদিন ধরা পড়ে যায় তাহলে কি হবে? তূর্য ভাই তাকে আস্ত রাখবেন? মান – সম্মানের ফালুদা হয়ে যাবে না ?
জাবির ক্যাম্পাসের পূর্ব প্রান্তে বসে আছে আহি আর তারিন। নানান গল্পে মশগুল তারা। তারিনের এখন অফ পিরিয়ড হলেও আহির ক্লাস আছে।তবে সে ক্লাস করবে না।আলাদা ডিপার্টমেন্ট হওয়ায় দুজনের ঠিকমতো দেখাও হয় না,একমাত্র ব্যাচে ছাড়া। মোবাইলে আর কত কথা বলা যায়? এদিকে তার ফেইসবুক ,ম্যাসেঞ্জার তূর্যের মোবাইলেও লগ ইন করা সে বুঝে ফেলেছে।সকল কথা খুলেও বলতে পারে না। জীবনটা ত্যানা ত্যানা করে ফেলছেন তূর্য ভাই।না নিজে কিছু বলছেন,না তাকে কিছু বলতে দিচ্ছেন।মাঝে মধ্যে একটু আধটু আস্কারা দেন শুধু।এতে কি পোষায়? রিলেশন গ্রো আপ করে? তার তো সবকিছু ফিল্মি স্টাইলে হওয়া চাই। তূর্য তাকে প্রতিদিন ঘুরতে নিয়ে যাবে,বাড়ি ফেরার সময় তার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসবে,জিনিসটা খুব সামান্য হোক ,তবুও নিয়ে আসবে।থেকে থেকে একটু রো’মান্টিক কথা বার্তা বলবে,একটু আধটু রো’মান্সও করবে। কিন্তু তূর্য ভাই তো সেটা করেন না। একটু ঘুরতে নিয়ে গেল ,সেটাও বোবা মানুষের মতো।সে নিজে থেকে কত কত কথা বলার পর শেষে গিয়ে শুধু ‘ হুঁ ‘ ,
‘ হ্যাঁ ‘ , ‘ না ‘ আর ‘ হুম ‘ । ভাবনা করতে করতে আহি হুট করেই বলে ফেললো,
” তারিন , শোন। কারো মনের ভিতর থেকে লুকিয়ে রাখা কথা কিভাবে বের করা যায়? ” সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে বললো আহি।
” অনেক ভাবেই বের করা যায় । তবে সেটা যদি হয় তূর্য ভাইয়া,তাহলে কোনো ভাবেই বের করা পসিবল নয় ”
একটু সময় নিয়ে আহির কথার বিপরীতে কথাটা বলেই খিলখিল করে হাসতে আরম্ভ করলো তারিন।আহি একটু চিন্তা করে বলল,
” আচ্ছা লাল পানি খাওয়ালে কাজ হবে না ? ”
” তুই পাবি কোথায় ? “সন্দিহান কন্ঠ তারিনের।
” সেটাই তো ! পাবো কোথায় ! ” একটু চিন্তিত হলো আহি। তারপর আবার চট করে বলল,
“আরাফকে বললে এনে দিবে না? ”
” পাগল হয়ে গেছিস তুই? ”
” তাতে কি হয়েছে ? আমি আরাফকে কল করছি ,আজ বিকেলে ওকে ওসব নিয়ে আসতে বলবো। তুইও আসবি। ”
হার মানলো তারিন।বলল,
” খাওয়াবি কিভাবে ? ”
আহি গভীর ভাবনায় মগ্ন হলো। তাই তো খাওয়াবে কিভাবে?সে মাঝেমধ্যে তূর্যকে সিগারেট খেতে দেখলেও কখনো ড্রিংক করতে দেখেনি।হয়তো তূর্য ভাই ওসব ছাইপাঁশ গিলেন না। কিন্তু খাওয়াতে তো তাকে হবেই। হঠাৎ কিছু একটা মাথায় আসলো।উত্তেজিত হয়ে তারিনকে বলল,
” আইডিয়া! এমন কিছু আনতে বলবো যেগুলো খাবারে মিশিয়ে খাওয়ানো যায়।বুঝলি ? ”
তারিন ভীতু মুখ করে বলল,
” ধরা পড়ে গেলে কি করবি? ”
” আরে পরবো না,ইনশাআল্লাহ ”
” জা’উরামি করতে ইনশাআল্লাহ বলিস না , প্লিজ। বাই দ্যা ওয়ে,ধরা পড়লে কিন্তু আমি কিছু জানি না ”
” আচ্ছা,আচ্ছা ! কিছু জানিস না ! ”
এরপর আরো কিছুক্ষণ ধরে নিখুঁত প্ল্যান করলো তারা। তারিন বারবার করে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করেও লাভ হলো না।সে আমতা আমতা করতে করতে সাঁই দিলো।আহি করবে বলে ঠিক করেছে মানে করবে।আর সেটা আজই।অধৈর্য আহির আর দেরি সইলো না। সে সাথে সাথে আরাফকে কলে সবটা বুঝিয়ে দিলো। তারপর বাড়িতে ফিরল।
তারিন,আরাফ আর তাদের ভার্সিটির তিনটা ফ্রেন্ড এসেছে চৌধুরী বাড়িতে।প্ল্যান মাফিক সন্ধ্যা বাঁধিয়ে এসেছে তারা। সারা বিকেল জুড়ে আহি হইহই করতে করতে সবটা গুছিয়েছে।এটা অবশ্য আহির নিজের ধারণা।সেভাবে দেখতে গেলে সে শুধু একবার দোতলা আরেকবার নিচতলা ছোটাছুটি করেছে।কি কাজ করেছে জানতে চাইলে আহি নিজেই বলতে পারবে না। তবে হ্যাঁ,কাজের মধ্যে একটা করেছে ,গাছের গোলাপ গুলো কেটে ফেলেছে।
তারিনের রোজে এলার্জি আছে। যার কারণে খুব কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কাটতে হয়েছে। কি আর করার!
আর এসব করতে গিয়ে তূর্যের সাথে এক চোট স্নায়ু যুদ্ধ হয়েছে।
তূর্য নিয়ম করে প্রতিদিন বিকেল বেলা ছাদে হাটাহাটি করে আজও করছিল। ঐ টাইমেই আহি ছাদ পরিষ্কার সহ আরো নানান ধূলাবালির কাজ করছিল।তূর্য বলে উঠলো,
” সাফায়কর্মী হয়েছিস? ”
অথচ আহি পাত্তা দিলো না।সে তার কাজ… না, অকাজে ব্যস্ত। উত্তর না পেয়ে আরো বি’রক্ত হলো তূর্য। তির্যক চোখে আহির কাজকর্ম পরখ করতে লাগলো।ইতিমধ্যে নাক সুরসুর করতে আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।সে ‘ বা ‘ হাতের তালুতে নাক ডলতে ডলতে ছাদ থেমে নামতে গিয়েও থেমে যায়।আহির নিজের এত যত্ন করে গড়ে তোলা গোলাপ ফুলগুলো কাটতে দেখে একই ভাবে নাকের ডগা ডলতে ডলতে বলে,
” রোজ গুলো এভাবে কাঁটছিস কেন ? ”
” তারিনের রোজে এলার্জি আছে ”
হুট করেই মুখের আদলের পরিবর্তন ঘটলো তূর্যের। কোথাকার কোন বান্ধবি তার রোজে এলার্জি দেখে শখের গোলাপ ফুল কাটছে।এদিকে সে নাক ডলতে ডলতে ম’রছে তার কোনো খেয়াল নাই। ও কি জানে না তার ডাস্ট এলার্জি আছে ?
যদিও সেসব কথা জানলেও এখন সত্যিই আহির মাথায় নেই। তার চিন্তা তো অন্য কিছু নিয়ে ।কখন তূর্য ভাইকে ঐটা খাওয়াবে,আর কখন তিনি মনের কথা বলবেন। আহ্! ভেবেই মনটা শুধু নেচে নেচে উঠছে।
আহির সকল বন্ধু বান্ধবদের বাড়ি তাদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে না। একজনের বাসা একটু দূরে ,তবে সে ছেলে হওয়ায় একটু রাত হলেও প্রবলেম হবে না।আর আসলাম চৌধুরী বলেছেন মেয়ে দুইজনকে বাড়ির গাড়িতে করে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন,সঙ্গে উনি বা বাড়ির অন্য কোনো সদস্যদের থেকে কাউকে পাঠাবেন।যদিও আজকের রাতটা থাকার জন্য অনেক জোর জবরদস্তি করেছেন তারা।কিন্তু ছেলে মেয়ে গুলো থাকতে নারাজ।থাকবে কিভাবে ?যে কেলেংকারী কান্ড করবে বলে ঠিক করেছে,সেটাই যদি ধরা পড়ে তাহলে তো খতম।
এখন রাত প্রায় নয়টা বাজে । বাড়ির ছাদে বার্বিকিউ পার্টির অ্যারেঞ্জমেন্ট করছে তারা,আহিসহ তার ফ্রেন্ডস এবং শান্ত – প্রান্ত – তাহি। যেহেতু সবাই ফিরে যাবেই , তাই বেশি রাত না করাই ভালো।সেজন্যেই সকাল সকাল সবটার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মাঝারি সাইজের একটা টেবিল আর জন প্রতি চেয়ার এনে ছাদের একপাশে সেট করেছে।চারিদিকে একটা করে ইট দিয়ে দিয়ে বক্সের মতো বানিয়েছে।সেটার ভিতর আগে থেকে এনে রাখা কয়লা গুলো ডিজেলের সাহায্যে জ্বালিয়েছে। আর সিকের উপর ম্যারিনেট করা মাংস গুলো রাখা।
সবাই এক যোগে একেক কাজ করেছে।সাহেদ আর প্রান্ত হাত পাখার সাহায্যে বাতাস করে করে কয়লা গুলোকে বেশি উতপ্ত করছে । তারিন, আহি আর সানা মাংসের টুকরো গুলোকে উল্টিয়ে দিচ্ছে।আর আরাফ এবং নাহিদ উল্টে রাখা মাংস গুলোর উপর ম্যারিনেট করার পর থেকে যাওয়া মশলা গুলো দিচ্ছে। তাহির ছোট বিধায় তাকে কোনো কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না।শুধু কিছুর প্রয়োজন হলে,এটা ওটা আনতে ওকে নিচে পাঠানো হচ্ছে।তাহলে একমাত্র শান্ত ব্যতীত বাকি সবাই কিছু না কিছু করছে।সে চেয়ারে বসে ফোন ঘাটছে ।আর মুচকি মুচকি হাসছে।গোপন সূত্রে জানা গিয়েছে তিনি সদ্য প্রেমে পড়েছেন।আর তথ্যটা দিয়েছে তাহি। হয়তো তার সাথেই খুচড়া আলাপ করছে। চ্যাটিং করতে করতে খানিকটা পানি ফেলে দিলো সে।হুস ফিরতেই তাহিকে ডেকে বললো,
” তাহি ওই টিস্যুর বক্সটা থেকে পাঁচ – ছয়টা টিস্যু নিয়ে আয় আপায় ”
তাহি দৌঁড়ে গিয়ে কয়েকটা টিস্যু এনে দিলো।শান্ত সেগুলো বিছিয়ে বিছিয়ে পানির উপর রাখছে সেটা দেখে তারিন ডাক নিলো,
” এই শান্ত….! তুমি টিস্যু দিয়ে পানি মুছছো? বড়লোক্স ! তাও বক্সের টিস্যু! ”
” তো কী হয়েছে আপু? আমি তো ওয়াশরুমে মিনালের ওয়াটার ইউজ করি ”
” হ্যাঁ ভাই, আমিও কোল্ড ড্রিংকস দিয়ে হাত মুখ ধুই ” গলা উঁচিয়ে বলল সাহেদ।
নাহিদ বলল,
” হ্যাঁ, হ্যাঁ সব বুঝেছি।আম্বানির বংশধর সব।এই শান্ত এসো ,তুমি এবার বাতাস করো ”
“বাতাস করলে কয় টাকা পাবো ?”শান্ত উঠতে উঠতে বলল।
এতক্ষণ বাদে খিটখিট করে উঠলো আহি,
” খালি টাকার গান।আমরা যে এতক্ষণ ধরে কাজ করছি সেই টাকা আগে ফ্যালা ”
” তোর এত টাকার লোভ আহিপু? ছিঃ! ”
” আর তুই যে টাকা চাচ্ছিস তার বেলা ? তোর লোভ নেই?”
” আমি তো ভেবেছিলাম শুধু আমিই লোভী ” বলে উচ্চশব্দে একটা শয়তানি হাসি দিলো শান্ত।
সাথে সাথে সবাই হাসতে আরম্ভ করলো।
তারিনদের বিদায় দিয়ে দুটো ফালুদার গ্লাস হাতে তূর্যের রুমে আসলো আহি। এতক্ষণ ধরে অনেক কনফিডেন্স নিয়ে প্ল্যান করলেও এখন বুকের ভিতরটা দুরুদুরু করছে।যদিও এখন পর্যন্ত সবকিছু প্ল্যান মাফিকই এগোচ্ছে।
সে রুমে ঢোকার আগে মোবাইল ফোনে রেকর্ডিং চালু করতেও ভুলেনি।
আহি নানান নাটক, সিনেমায় দেখেছে কিছু কিছু ভি’লেন আছে যারা হিডেন ক্যামেরা লাগিয়ে দুটো গ্লাসে শরবত নিয়ে আসে ,যার একটা পিউর আর অন্যটা ইম্পিউর অর্থাৎ কিছু মিশিয়ে আনে। প্রথমে পিউরটা অপর প্রান্তের লোকটা দেয় ।তারপর কিছুক্ষণের নিরবতা।ধুমতানা.. না ..না.. বাজে এবং পরে বলে, ” কি বিশ্বাস পাচ্ছো না ?” তারপর সেই গ্লাসটাই আবার নিজে খেয়ে নেয়।আর ইম্পিউরটা অন্য প্রান্তের লোকটাকে দেয়।
সেও সেটা করবে ।
সেক্ষেত্রে লোক দুই জনের মাঝে আগে থেকেই দ্ব’ন্দ্ব – বিবাদ থাকে,ভিতরে ভিতরে স্নায়ু যুদ্ধ চলে। কিন্তু তাদের মধ্যে তো আর বিশ্বাস – অবিশ্বাসের কোনো ব্যাপার নেই।তাহলে তূর্য এসব ভাববে কেন? এসব কথা মাথায় আসলো না আহির।
তূর্য যদি খায় , আহি যেটা দিবে সেটাই খেয়ে নিবে,আর না খেতে চাইলে খাবে না। অতি ভক্তি যে চো’রের লক্ষণ নির্বোধ আহির মাথায়ই আসলো না।
তূর্য বিছানায় পা মেলে আধ শোয়া হয়ে আছে। ঊরুর উপর ল্যাপটপ। খুব মনোযোগী হয়ে কোনো কাজ করছে। তার রুমে যে কেউ প্রবেশ করেছে সেটা সে খেয়াল করেছে কি করেনি মুখ দেখে বোঝার কায়দা নেই।
আহি এগিয়ে আসলো, মিষ্টি হেসে তূর্যের দিকে একটা গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,
” তূর্য ভাই এটা আপনার ”
” খাবো না। কাজ করছি “তূর্য এক পলক আহির হাতের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল।অতঃপর আবার ল্যাপটপে ধ্যান দিলো।আহি বলল,
” অল্প একটু খেলেই কাজ হয়ে যাবে। একটু খান ”
কিবোর্ডে আঙুল চালানো থামালো তূর্য। ভ্রু কুঁচকে বলল ,
” কি কাজ হবে ? ”
মানুষ বলে না ? ‘ চোরের মন পুলিশ পুলিশ ‘ আহিরও তেমনটা হলো।সে কপট মে’জাজ দেখিয়ে বলল,
” আপনি কি আমাকে স’ন্দেহ করছেন তূর্য ভাই ? এমন করছেন যেন আমি এতে নে’শার কিছু মিশিয়ে এনেছি। তাই আপনি খাচ্ছেন না ”
বলে তূর্যের দিকে এগিয়ে ধরা গ্লাস হতে স্ট্র সরিয়ে ঢকঢক করে খানিকটা শেষ করলো । তূর্য বি’রক্ত ভঙ্গিতে অন্য গ্লাসটা নিয়ে সামান্য পরিমাণ মুখে দিয়ে আবার ফেরত দিতে গেল।মিষ্টি জিনিস তার একদম পছন্দ না । আর মিষ্টি দিয়েছেও আল্লাহর নাম নিয়ে।
আহি জোর করে বলল,
” আরেকটু খান। এইটুকু খেলে কাজ নাও হতে পারে ”
” তখন থেকে কাজ হবে না,হবে না করছিস। পাগল হয়েছিস তুই ? ডিস্টার্ব না করে যাহ ”
” আরেকটু খান না, প্লিজ ” অনুরোধ করে বলল আহি।
তূর্য বুঝলো বেশি করে না খেলে এই মেয়ে বিদায় হবে না।। সে নাক মুখ কুঁচকে প্রায় অর্ধেক শেষ করে গ্লাস আহির হাতে দিয়ে বলল,
“যাহ এখন ”
আহি গ্লাস দুটো টি – টেবিলের উপর রেখে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝতে পারলো মাথাটা ভারী ভারী লাগছে। মাথার মধ্যে কেমন যেন ঝাঁকি মেরে উঠলো। সে টের পেল অদ্ভুত এক উষ্ণতা শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। পা সোজা করে দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি পড়ে যাবে।
এগুলো তার সাথে কেন হচ্ছে? এসব তো তূর্য ভাইয়ের সাথে হওয়ার কথা। দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে টলতে টলতে তূর্যের পাশে বসে পড়লো সে। তূর্য বিরক্তি নিয়ে ধমকে উঠলো,
” আহি ? গায়ের উপর পড়ছিস কেন ? ”
আহি দুই বার ওঠার চেষ্টা করতে গিয়েও পারলো না। ঢলে ঢলে পড়ে যাচ্ছে। তূর্য ওকে এক টানে নিজের দিকে ফেরালো।সে যত দূরে দূরে থাকতে চায়,স্টুপিডটা ততো বেশি ঘেঁষাঘেঁষি করবে। কিছু কড়া কথা শোনাবে ,কিন্তু আহির চোখমুখ লক্ষ্য করে বললো,
” এ্যাই ? কি হয়েছে তোর ? ”
আহি দুর্বল গলায় বললো,
” কিছু না ”
আহিকে স্বাভাবিক ঠেকলো না তূর্যের।সে ল্যাপটপটা রেখে কিছুটা দূরে সরে বসলো।আহি চোখ বন্ধ করে টলছে।
তূর্য টে মুখোমুখি হয়ে পুনরায় বলল,
” কি হয়েছে তোর ? ”
আহি খিলখিল করে হেসে উঠলো। আর বলল,
” আমার কি হবে? আপনি কেন মনের কথা বলছেন না ? ”
তূর্যের আর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না। নির্ঘাত এতে কিছু মিশিয়ে এনেছিল। তাকে খাওয়াতে গিয়ে ভুলক্রমে নিজে খেয়ে ফেলেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে চাপা কণ্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
” এটাতে কি মিশিয়েছিস ,ই’ডিয়ট ”
” একটা সিরাপ মিশিয়েছি কিন্তু সেটা তো বলবো না আপনাকে।এবার ফটাফট মনের কথাগুলো উগড়ে দিন ”
” স্টু’পিডের ঘরের স্টু’পিড। দিবো কানের উপর একটা ? ”
” বলে দিন ভালোবাসি !আর লুকোচুরি করিয়েন না ” মাতলামি করতে করতে বলে তূর্যের উপর ঢলে পড়লো আহি। বুকে মুখ গুজে ফের অস্পষ্ট আওয়াজে আউড়ালো,
” ভালোবাসি তূর্য ভাই,অনেক ভালোবাসি । আমি জানি আপনিও ভালোবাসেন । তাহলে লুকিয়ে যাচ্ছেন কেন? ”
চোখ বন্ধ করে ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়ল তূর্য। আহি আরো আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরলো তাকে। তূর্য দুই হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে চোখ বন্ধ করলো।ভিতরে জেগে ওঠা অযাচিত দমকা হাওয়ার সামাল দেওয়ার সম্পূর্ণ চেষ্টা করছে। আহি জড়ানো গলায় ফের বলল,
” তূর্য ভাই ! ”
তূর্য খুব দ্রুত চোখ খুললো। আহিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে তড়িৎ বেগে বিছানায় ফেললো,তারপর নিজে ওর উপর আধশোয়া হলো। কামুক দৃষ্টিতে প্রেয়সীর গোলাপি অধর জোড়ায় চোখ বুলালো।অধৈর্য গলায় বলল,
” এখন যদি একটা প্রোলংড ( দীর্ঘস্থায়ী ) চু’মু খাই ,সকালে তোর মনে থাকবে ?”
আহি চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে ।সেভাবেই ফের উচ্চ কন্ঠে হেসে উঠলো ।হাসতে হাসতে বলল,
“আমার সব মনে থাকবে ,কিন্তু আপনি তো নেশা করে আছেন।আপনি ভুলে যেতে পারেন ,বুঝলেন ? ”
ওর কথা কানে লাগালো না তূর্য।
আহির কথায় তার কোনো মনোযোগ নেই। মনোযোগ শুধু থেকে থেকে নড়ে ওঠা প্রেয়সীর র’ক্তাভাব ওষ্ঠে। আহির দুই হাত বিছায়ায় চেপে ধরলো তূর্য। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল নিষিদ্ধ জিনিসটার দিকে।দুই প্রান্তের দুই জোড়া অধর যখন প্রায় ছুঁই ছুঁই ঠিক সেই মুহূর্তে বকবক করে উঠলো আহি,
” তূর্য ভাই, আপনি একটা চু’মু খেতে অনুমতি নিচ্ছেন? আমি তো দুইদিন লুকিয়ে লুকিয়ে আপনাকে চারটা চুমু খেয়েছি কিন্তু অনুমতি নেইনি ।এতে কি আমার পা’প হবে ? ”
আবার নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ালো তূর্য। আহির উপর থেকে সরে পাশে শুয়ে পড়ল।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্লিংয়ে নজর নিবদ্ধ করলো। আহি পুনরায় তূর্যের কাছ ঘেঁষলো, বাহু ধরে ঠেলতে ঠেলতে বলল,
” বলুন না ! ”
হাত ছাড়িয়ে দিলো তূর্য।কিছুটা সরে শুলো। মনের গহীনে নানান চিন্তা,হিসাব – নিকাশ ! তূর্য যেই কায়দায় আহির উপর ঝুঁকেছিল আহিও সেই কায়দায় তূর্যের উপর ঝুকলো।তবে সামান্য একটু পার্থক্য।তূর্য আহির হাতের ভাঁজে হাত রেখে বিছানায় চেপে রেখেছিল আর তাদের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব ছিল।কিন্তু আহি তূর্যের সাথে পুরোপুরি মিশে দুই হাতে তার বুকের উপর খোটা খুঁটি করছে আর মুচকি হাসছে।খোটা খুঁটি করতে করতে হুট করে একদম হুট করেই সে তূর্যের অ্যাডাম’স অ্যাপলের উপর পরপর অতি ক্ষুদ্র দুইটি চু’মু খেয়ে সরে পড়লো। সবকিছুই ছিল খুব অল্প সময়ের মধ্যে তূর্য বুঝে উঠতে উঠতে আহির কার্য হাসিল। আহি এমন করতে পারে সেটা তার ধারণার বাইরে। স্তম্ভিত তূর্য এখনো স্লিংয়ের দিকে তাকিয়ে। সামান্য দুইটি চু’মুতে এত নাজেহাল হলো সে?
সে হাতের তালুতে মাথার ভর রেখে কাত হয়ে শুলো।নিগূঢ় দৃষ্টিতে আহিকে পর্যবেক্ষণ করছে।চোখে একরাশ মুগ্ধতা। আহির লাজুক মুখশ্রী হঠাৎ করে ভাবুক হয়ে পড়ল। তূর্যের বাহু জড়িয়ে বলল,
” তূর্য ভাই? আমি যখন আপনাকে ছুঁলাম আপনার কি কোনো কিছু ফিল হলো ? আমার তো কিছুই ফিল হলো না।শুধু একটু লজ্জা আর ভয় লাগলো । ”
” আমি ছুঁলে অনেক কিছু ফিল করবি। মা’তলামির সুযোগ নিতে বাধ্য করিস না জা’ন ”
আহির বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে নিরেট গলায় বলল তূর্য।
আহি ভেবে দেখল কথাটা মিথ্যা নয়।তূর্য ভাই একটু ছুঁলেই তার মনে রংধনুর আসর বসে ,পেটের ভিতরে হাজারো প্রজাপতি খেলা করে,থেকে থেকে বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে;চিনচিন ,চিনচিন করে!
আর ধৈর্যের পরীক্ষা তূর্য দিয়ে পারছে না। এবার সত্যিই কোনো একটা স্টেপ নেওয়া দরকার। নাহলে কিছু একটা ঘটে যাবে ।
আহি তূর্যকে ছেড়ে আরো অনেকক্ষণ ধরে কিসব বিড়বিড় করলো। যার কিছু তূর্য শুনেছে তো কিছু শোনেনি।শোনেনি বলতে জড়ানো কথা বোঝেনি। বকবক করতে করতে এক পর্যায়ে থেমে গেল আহি।হয়তো ঘুমিয়ে গিয়েছে বা জ্ঞান হারিয়েছে।
তূর্য বিছানা থেকে উঠলো।তারপর আহিকে পাজকোলা করে তার রুমে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। পায়ের সাহায্যে দরজাটা খুলতেই দেখতে পেল দরজার মাথায় মারুফা বেগম দাঁড়িয়ে। গম্ভীর,থমথমে মুখশ্রী। তিনি একবার আহি আরেকবার তূর্যের মুখের দিকে তাকালেন। তূর্যের চোখে চোখ পড়ল। না তিনি দৃষ্টি সরালেন,আর না তূর্য। তূর্যের ভাবগতির কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। সে এক মুহূর্তের জন্য পা থামালো শুধু ,অতঃপর আহির রুমে চলে গেল । তাকে বিছানায় শুইয়ে গায়ে একটা ব্ল্যাংকেট টেনে দিল। রুমের বাইরে যাওয়ার জন্য পিছু ঘুরতেই দেখলো মারুফা বেগম দাঁড়িয়ে।অবাক হলো না তূর্য। দাঁড়িয়ে থাকবারই কথা।
” সকালে ঘুম ভাঙলে এক গ্লাস লেবু শরবত করে দিয়েন ” বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল তূর্য মারুফা বেগম বলে উঠলেন,
” এসব কিছুই ঠিক হচ্ছে না ”
পা থামিয়ে মেজো মায়ের মুখোমুখি হলো তূর্য।বলল,
” কিসব ?”
” আমি জানি ,আমার মেয়ের ভুল।কিন্তু তুমি তো বুঝদার ,ওকে না বুঝিয়ে লায় দেওয়া কি ঠিক ? ”
” লায়? সেটাতো তো কোনো কালেই দেইনি ”
” তোমরা আজ কালকের পোলাপানেরা যেটাকে ভালোবাসা বলে ভাবো সেটাকে ভালোবাসা বলে না। এসব ভালোবাসা সময়ের সাথে সাথে ফুরিয়ে যায়।হারিয়ে যায় অতলে।কিছুদিন যেতেই সকল আবেগ উধাও হয়ে যায় । তখন এসব কথা মনে করলে নিজেদেরই আ’ফসোস হয়,নিজের প্রতি হাসি পায় । বলতে পারো অনেকটা ল’জ্জা।
ভেবনা আমি আমার মেয়েকে শা’সন করবো না,শুধু কাল সকালটা হতে দে ”
” এসব বিষয়ে আহির কানে কিচ্ছু দিবেন না,মেজো মা।কিচ্ছু না ! আর না ওকে ব’কাবকি করবেন। আপনার মেয়েকে ভালোবাসি কিনা জানি না,বাট বিয়ে করবো । সো,মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড হোন ”
বলে চলে যায় তূর্য। মারুফা বেগম এখনও পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।অতীতের সব ঘটনা মিলাচ্ছেন।তূর্য নিজে সারাক্ষণ আহিকে ব’কাবকি শাসনের উপর রাখলেও ওর প্রতিটা বিষয়ে সে খেয়াল রেখেছে ,পড়ালেখা,ব্যাচ টিচার,কোথায় যাচ্ছে,কি করছে, কার সাথে মিশছে,কখন বাড়ি ফিরছে ,সবকিছু!
তূর্য রুমে এসেছে ঠিকই কিন্তু ঘুমোতে পারছে না ,তখন থেকে তার কানে মারুফা বেগমের সেই একটাই কথাই বাজছে ।
‘ এসব ভালোবাসা সময়ের সাথে সাথে ফুরিয়ে যায়।হারিয়ে যায় অতলে।কিছুদিন যেতেই সকল আবেগ উধাও হয়ে যায় । তখন এসব কথা মনে করলে নিজেদেরই আ’ফসোস হয়,নিজের প্রতি হাসি পায় । বলতে পারো অনেকটা লজ্জা।”
তূর্য মুখ বাঁকিয়ে একটা হাসি দিল।তার মতে মারুফা বেগমের কথা মোটেও ঠিক নয়।এটা তিনার পুরোপুরি ভুল ধারণা। সামান্য ভালোবাসার মতো ভালোবাসলেই সেটা না ফুরায়,আর না হারায়। সেখানে সে তো আহিকে শুধু ভালোবাসে না। তিনি মনে হয় জানেন না,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৩
” ভালোবাসা ফুরায় না
প্রেম কভু হারায় না
অনুভবে থাকে
যার যার … ”
