Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৩

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৩

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৩
ইনান হাওলাদার

অনেক ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে,ই’মোশনাল ব্ল্যা’কমেইল করে তারপর নাবিল পিংকিকে নিয়ে বেরিয়েছে। রাস্তা পার হওয়ার পথে হঠাৎ পিংকির হিজাব একটা চলন্ত রিক্সার হ্যান্ডেলে জড়িয়ে যাওয়ায় হোঁচট খায় সে।নাবিল ওকে ধরে সামলে নিলেও রা’গে চোখ – মুখ বিকৃত করে ফেলেছে।যেন চোখ দিয়েই খেয়ে ফেলবে রিক্সাওয়ালাকে । লোকটার বয়স চল্লিশের কোঠায় হবে হয়তো ।
এখানে রিক্সাওয়ালা বা পিংকি কারোই কোনো ত্রুটি নেই।কিভাবে যেন বেঁধে গিয়েছে।পিংকি সেটা নাবিককে বোঝানোর চেষ্টা করলেও নাবিল মানলো না। ও রিক্সাওয়ালাকে কলার্ট ধরে নামিয়েই প্রশ্ন ছুড়লো,

” বেশি খাইছস? ”
” কি ,ভাই ? ” অবুঝ ভঙ্গিতে ভোলাভালা ভাবে বলল রিক্সাওয়ালা।
” গা’ঞ্জা! ” তিরতিরে মে’জাজ নাবিলের।
” তওবা,তওবা! কি কন,মামা? বি’ড়িও খাই না।” পরপর নিজের দুই গালে দুইটা থাপ্পড় মা’রতে মা’রতে বলল লোকটি।
” শা’লা ! ” বলেই রিক্সাওয়ালার দিক ধেয়ে যেতেই পিংকি নাবিলের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
” কি শুরু করেছিস নাবিল । চল! ”
” ছাড় তো বা’ড়া । গা’ঞ্জা খাইয়া রিক্সা চালায় ? বোকা*দা ! ”
” নাবিল ! বাড়াবাড়ি করছিস তুই।ঐখানে ওনার কোনো দো’ষ নেই “খানিকটা শক্ত কন্ঠে বললো পিংকি ।
” ওর কোনো দো’ষ নেই? চোখ পু’টকির মইধ্যে লইয়া হাটে?”
নাবিল এখনো ঘাড় কাত করে লোকটির দিকে তাকিয়ে আছে।আর পিংকি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে । সে নাবিককে সেভাবেই টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
” বাবাহ্! তুই তো আরো সুন্দর সুন্দর গালি জানিস। আমি তো জানতামই না ”
” এই বা’ড়া অফ যা।বেশি কথা কস তুই ”
বলে ঝাড়ি মে’রে পিংকির হতে হাত ছাড়িয়ে নিল।তারপর একটা রিক্সা ডেকে সেটাতে উঠলো।

সন্ধ্যার সাথে সাথে এক গাদা ভাজা পোড়া এনে হাকডাক শুরু করেছেন আকবর চৌধুরী।যারা ড্রয়িং রুমে ছিল তারা তো এগিয়ে এসেছে আর বাকিরাও নিচে নেমে এসেছে। শান্ত,প্রান্ত আর তাহি এসেই খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে দিয়েছে। লতা বেগম একটা বড় দেখে গামলা এনে সবগুলো সেটাতে ঢেলে দিলেন। আহিকে না দেখতে পেয়ে আকবর চৌধুরী বললেন,
” আহি কোথায় ? ওকে ডাকো,আর তূর্যকেও ডাকো।না খাক,একটু বসে ভাই – বোনদের আনন্দ দেখুক। ”
পারভিন বেগম বললেন,
” তূর্য – আহি কেউ বাড়িতে নেই। ”
” কোথায় গিয়েছে ? ”
মারুফা বেগম বললেন,

” কি টুপিওয়ালা সোয়েটার কিনবে ,সেটা কিনতে গিয়েছে ”
আকবর চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন,
” তূর্যের সাথে ? তূর্য ওকে নিয়ে গেল? ”
” ভাইয়া শুধু আপুকে নিয়ে গেছে? আমাকে কেন নিলো না? আমারও তো ডেনিম কিনতে হবে ” বলেই কান্না জুড়ে দিল তাহি।
পারভিন বেগম মেয়েকে ঠান্ডা করতে করতে বললেন,
” তোর মেজো মা মি’থ্যে বলেছে , মা। ”
” মেজো মা না,তুমি মি’থ্যা বলছো”
পারভিন বেগম মেয়েকে বুঝিয়ে বললেন,
” আচ্ছা শোন,তূর্য কিছু কিনলে কি একা কারো জন্যে কিনে? কিনলে তো বাড়ির সবার জন্য কিনে । তোর জন্যেও আনবে , কাঁদে না, আম্মা ”

তূর্য সাধারণত এসব কেনাকাটায় অভস্থ না।আজ পর্যন্ত নিজের জামাকাপড় ছাড়া কারো জন্য কিছু হাতে করে আনেনি।কাউকে কিছু দিতে হলেও পারভিন বেগমের কাছে কার্ড দিয়ে দেয় ,উনিসহ বাড়ির বাকি গিন্নিরা গিয়ে কিনে আনেন।
আগে – পরে আহি তূর্যের কাছে অনেক কিছুর জন্যে বায়না ধরেছে।সে মেয়েও জানত তূর্য তাকে কিনে দিবে না।জেনে শুনেই দু’ষ্টুমি করত।কিন্তু তূর্য ঠিকই আড়ালে গিয়ে মায়ের কাছে কার্ড দিয়ে বলতো,
” আহি এটা চেয়েছে,আহি ওটা চেয়েছে সময় করে ওকে নিয়ে যেও ।আর তোমাদের যা লাগে কিনে নিও ”
মহিলাদের নিয়ে দোকান ঘোরাঘোরি একদম পছন্দ না তূর্যের। এটা পছন্দ হয় তো সেটা হয়না, সেটা হয় তো অন্যটা হয় না।
সুতরাং ,আহি যে মিথ্যা সোয়েটার কেনার কথা বলে গিয়েছে এটা নিয়ে কোনো স’ন্দেহ নেই ওনার।

প্রায় ঘন্টা খানেকের রাস্তা শেষে একটা রেলওয়ের পাশে বাইক পার্ক করেছে তূর্য।মাগরিবের আজান পরে গিয়েছে আরো বেশ কিছুক্ষন আগে। মোটামুটি ভালোই অন্ধকার নেমে এসেছে ধরণীতে। রেলওয়ের চারিপাশ জুড়েই অসংখ্য চায়ের দোকান। কিছুটা এগিয়ে গেলেই একটা বিস্তৃর্ণ মাঠ। এখান থেকে মেইন শহর আরো আধ ঘন্টার রাস্তা। জায়গাটা মোটামুটি কলরব পূর্ণ। রেলওয়ের পাতের উপর দিয়ে হেলেদুলে হাঁটছে আহি।কখনো পড়ে নিতে যাচ্ছে ,তো আবার নিজেকে সামলেও নিচ্ছে।
মুখে সবসময়ের মত হাসি লেপটানো। স্বতঃস্ফূর্ত হাসি!
আহির থেকে কিছুটা পিছনে তূর্য।সে আড়াআড়ি থাকা রেল স্লিপারের একটা বাদ দিয়ে আরেকটার উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে আর আহির উৎফুল্লতা দেখছে। তখন থেকে বাচ্চাদের মতো খুশিতে লাফাচ্ছে আর এটা ওটা বলছে। সে শুনছে কিনা সেদিকে ওর কোনো খেয়াল নেই।তার বলার দরকার সে বলছে।
তবে তূর্য কি শুনছে না? অবশ্যই শুনছে! আর সেটা খুবই মনোযোগ সহকারে । কত বার করে নিষেধ করেছে এভাবে পাতের উপর দিয়ে না হাঁটতে।কোনো ভাবে পড়ে গিয়ে যদি পা ম’চকে ফেলে? কিন্তু এসব কথা কি আর এই মেয়ে কানে তোলে।

পেছনে কত খানি পথ রেখে চলে এসেছে,তবুও আহির ফেরার কোনো নাম নেই।হেঁটেই চলেছে,হেঁটেই চলেছে। তূর্যও ফেরাচ্ছে না। আজ ই’ডিয়টটার কোনো আশাই অপূর্ণ রাখবে না সে।একটা দিন যখন বেরিয়েছে ,যা বলবে তাই শুনবে,যেটা করতে বলবে সেটা করবে,যেটা চাইবে সেটা দিবে।
এখন আহি এমনিতেই এতটা আনন্দে আছে, আরো সে যদি নিজের মনের মধ্যে থাকা সুপ্ত কথা গুলো উগড়ে দেয় তাহলে ও ঠিক কতটা খুশি হবে? কতটা? খুব পাগলামি করবে নিশ্চয়।
কিন্তু এই পাগলামির সুযোগ সে আহিকে দিবে না । অপেক্ষার প্রহর গোনা কতটা য’ন্ত্রণার সে জানে।তাই নিজের একান্ত প্রিয় মানুষটাকে সেই একই ভোগান্তির শিকার করতে চাই না সে।
সে চায় আহির কাছে সবটা স্বপ্নের মতো হোক।যেমন, আজকে জানতে পারুক তার তূর্য ভাই তাকে চায়, প্রচন্ড রকমে চায়,পাগলের মতো চায়,যেকোনো কিছুর বিনিময়ে চায়,আর কালকেই তার বউয়ের স্বীকৃতি পাক। ওর ছোট্ট মস্তিষ্ক সবটা বুঝে ওঠার আগেই ,তাদের সম্পর্ক বদলে যাক।

” তূর্য ভাই ? তূর্য ভাই ?”
আহির চি’ৎকার করা ডাকে ধ্যান ভাঙলো তূর্যের। সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরলো।
আহির থেকে কয়েক হাত এগিয়ে গিয়েছে সে।আহি কখন পেছনে দাঁড়িয়ে গিয়েছে এতসব ভাবনার মাঝে বুঝতে পারেনি সে। রেললাইন থেকে অনেকটা দূরে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আহি।
মেয়েটার মুখ দেখে মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরেই ডেকেছে।এগিয়ে গেল তূর্য।আহি বলল,
” সেই কখন থেকে ডাকছি,আর আপনি হেঁটেই চলেছেন, হেঁটেই চলেছেন ”
” কি হয়েছে বল ” স্বভাবসুলভ গম্ভীর কন্ঠস্বর।এতক্ষণ ধরে তার মনে কত কিছু চলছিল।অথচ এই কন্ঠ শুনে কারো বোঝার উপায় আছে ?

” কিভাবে ঘুমিয়ে আছে ও। পড়ে যাবে না ?” বলে
আহি আঙুল দিয়ে একটা ছোট খাটো গাছ ইশারা করলো।তূর্য ওর ইশারা বরাবর তাকালো।একটা বাচ্চা বিড়াল ছানা গাছের চিকন এক ডালের উপর বসে ঘুমিয়ে আছে। তূর্য দেখে বলল,
” তুই এখানে দাঁড়িয়ে থাকে ।পড়ে গেলেই ক্যাচ করবি ”
” ধুর,মজা করছেন কেন! আমি সিরিয়াস ”
” ওদের অভ্যাস আছে । পড়বে না ”
” সত্যি তো?”
” হুম ”

” তাহলে চলুন ” বলে তূর্যের হাত ধরে টেনে একটা ফুটপাতের দোকানের দিকে হাঁটা শুরু করলো আহি।তূর্য পা থামিয়ে আহির দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ডলে ডলে দেখতে দেখতে রাশভারি কন্ঠে বলল,
” হাত দুটো বরফ হয়ে আছে।বললাম শীতের কিছু পরে আসতে। আমার একটা কথা গায়ে লাগাস না তুই ”
” আমার শীত লাগছে না ,তূর্য ভাই। বাতাস তো তাই হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে ”
আহির কথার বিপরীতে তূর্য শুধু একবার চোখ তুলে ওর দিকে চাইলো।তারপর নিজের হাত দিয়ে ওর হাতের তালু ঘষতে আরম্ভ করলো। একটু বাদে হাতে উষ্ণতা আসতেই ছেড়ে দিলো।তারপর আহি বলল,

” ফুসকা খাবো তূর্য ভাই ”
” এসব আন হাইজিনিক খাবার খেতে হবে না ”
” আপনি তো আর খাচ্ছেন না,আমি খাবো ”
” তুইও খাবি না !”
” প্লিজ ”
” আই সেইড নো ”
” প্লিজ ”
আরো কিছুক্ষন ধরে খোসামোদ করে তূর্যকে রাজি করালো আহি। তূর্যও হার মানলো। বাধ্য হয়ে কিনে দিলো।আহি অবশ্য খাওয়ার সময় তূর্যকে কয়েকবার সেধেছিল।তূর্য একবার চোখ পাকিয়ে তাকানোর পর থেমে গিয়েছে।
খাওয়া শেষে আবার হাঁটা শুরু করলো তারা।আহি হাঁটতে হাঁটতে বলল,

” কত বার করে খেতে বললাম খেলেন না।এখন আমার পেটের মধ্যে কেমন যেন লাগছে।ব্য’থা ব্য’থা করছে। শেষে কিনা আমার পেট ফুলিয়ে দিলেন ”
আহির দিকে সরু দৃষ্টি ফেলল তূর্য।তারপর বলল,
” মানে তুই কি বলতে চাইছিস? তোর খাবারে নজর দিয়ে আমি পেট ফুলিয়েছি?”
” হ্যাঁ! আপনার নজর এত খারাপ তূর্য ভাই?”
” নজরের কী দেখেছিস তুই ! স্টু’পিড! ”
তূর্যের প্রথমে বলা কথাটুকু আহির কর্ণগোচর হলেও শুধু শেষ শব্দটা শুনে সে ঝগড়ুটে গলায় বলল,

” আপনার ভবিষ্যৎ বউ স্টুপিড ”
” আই নো দ্যাট! শুধু স্টুপিড না, স্টুপিডদের লিডার ”
আহি তূর্যের বিড়বিড় করে বলা কথা শুনলেও সেই কথা ধরে আর ব্যাখ্যা করলো না।তার সত্যিই পেট ব্য’থা ব্য’থা করছে।এসব ফুসকা খাওয়ার অভ্যাস তার আছে। নির্ঘাত এই লোকের ফুসকাতে গণ্ডগোল।নাহলে পেট ব্য’থা করার অন্য কোনো কারণ নেই।
তূর্য একটু বাদে লক্ষ্য করলো আহিকে। সত্যিই কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে ও।শুধু মুখ গোমড়া করে হাঁটছে।

” আহি ?”তূর্যের কোমল কন্ঠের ডাকে আহি অন্যমনস্কতায় ছোট করে সাড়া দিল,
” হুঁ ”
” তোর কি সত্যিই খারাপ লাগছে ? ”
আহি মন ম’রা হয়ে বলল,
” হ্যাঁ ”
” বাড়িতে চল। আর ঘুরতে হবে না ”
আহি প্রথমে তূর্যের কথায় সম্মতি দিতে গিয়ে তারপর আবার থেমে গেল। চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো তার।একটা আইসক্রিমের স্টল দেখিয়ে বলল,
” আইসক্রিম খাবো তূর্য ভাই ”
তূর্য চোখ ছোট ছোট করে চাইলো আহির পানে।স’ন্দিহান গলায় বলল,

” মাত্র না বললি পেট ব্য’থা করছে ? ”
” আইসক্রিম খেলে সেরে যাবে ”
বলেই এগিয়ে গিয়ে দুইটা আইসক্রিম নিলো আহি।তূর্য টাকা দিয়ে আহির পিছুপিছু হাঁটছে।সে এক সাথে দুইটা আইসক্রিমই খুলে নিয়েছে।একবার ডান হাতেরটা খাচ্ছে তো আরেকবার বাম হাতেরটা।
হাঁটার মাঝে হঠাৎ করেই থেমে গেল আহি। মাঠের মাঝ বরাবর কয়েকটা ছেলে – পেলে গিটার বাজিয়ে গান করছে।আহি ওদের দেখিয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,

” ওরা গান গাইছে ,তূর্য ভাই ”
” তো?”
” ওখানে চলুন না !”
” কেন? তুই ড্যান্স করবি ? ”
” আমি নাচতে জানি না ”
” জানলে করতি?”
” তূর্য ভাই? ওরা এদিকেই আসছে ”
আহির দৃষ্টি বরাবর ওদিকে তাঁকালো তূর্য।সত্যিই ওরা এদিকে আসছে। আসতেই পারে! সে আহির হাতের কব্জি ধরে ধীর পায়ে আবার সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো। পেছন থেকে দুইটা ছেলে ডেকে উঠলো,
” ভাইয়া ? ভাই ,শুনছেন?”
আহি ফিসফিসিয়ে বললো,

” ওরা মনে হয় আপনাকে ডাকছে ” তূর্যেরও তেমনটা মনে হওয়ায় সে দাঁড়িয়ে গেল।ছেলে দুটো তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। দৌঁড়ে আসার দরুন রীতিমতো হাঁ’পিয়ে উঠেছে তারা। একটা সালাম দিয়ে বলল,
” কেমন আছেন,ভাই ?”
তূর্য সালামের উত্তর দিলো।ও আসলে এদেরকে এখনো চিনতে পারেনি।ছেলে দুটোও ব্যাপারটা বুঝলো।তারা নিজেদের পরিচয় দিল।তূর্যের স্কুল অ্যান্ড কলেজ একসাথে ছিল। তারা নাকি তার স্কুলের জুনিয়র। আরো নানান কথা বলে তূর্যকে মনে করানোর চেষ্টা করলো।তূর্য চিনলো কি চিনলো না বোঝা গেল না।ছেলে দুটির মধ্যে একজন আহির দিকে ইশারা করে বললো ,

” আসলালামু আলাইকুম। ভাই,ভাবি নাকি ?”
আহি চোখ বড় বড় করে তূর্যের দিকে চাইলো।লোকটা কোনো উত্তর দিচ্ছে না দেখে সে উৎসুক দৃষ্টি মেলে তূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে।তূর্যও একবার আহির দিকে তাকালো। তারপর ছেলে দুটির উদ্দেশ্যে বলল,
” নাহ ”
ছেলে দুটি জ্বিভ কাটলো।খানিকটা লজ্জাও পেল। হয়তো বোন – টোন হবে। অন্যজন বলেই ফেললো,
” সরি,ভাই।তাহলে আপনার বোন নাকি ? ”
তূর্য ওই প্রসঙ্গে কথা না বাড়িয়ে বলল,
” তোমরা গান করছিলে ? ”
ছেলে দুইটা হেসে জবাব দিলো ,” হ্যাঁ ”
একজন বলল,
” আসুন ভাই,আপনারাও আমাদের সাথে অ্যাটেন্ড করুন । তাসিন ভাইও আছে ”
তাসিনের কথা শুনে জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ঠেললো তূর্য।আজকে বিকেলে তাসিন কল করে বলেছিল ভার্সিটির জুনিয়রদের সাথে আড্ডা দিবে তাকে আর নাবিলকেও আসতে। নাবিল বলেছে সে পিংকিদের বাড়ি আসতে পারবে না।আর তূর্য বলেছে তার ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে। তাসিন যদি একবার জানতে পারে তার ইম্পর্ট্যান্ট কাজ এটা,তাহলে আর কথার শেষ থাকবে না।আহি বায়না করে বলল,

” তাসিন ভাইয়াও আছে চলুন , প্লিজ ”
তূর্য আহির দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছেলে দুটিকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
” আজ না,অন্য একদিন অ্যাটেন্ড করবো। বাই দ্যা ওয়ে, তাসিনকে আমাদের কথা জানিও না ”
” তাসিন ভাই ই আপনাদেরকে দেখে ডাকতে পাঠিয়েছেন ,ভাই।ওই যে তাসিন ভাই বসে আছে ”
তূর্য ছেলেটির ইশারা অনুযায়ী তাকালো।তাসিন বসে দাঁত বের করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।এদিকে আহিও বায়না শুরু করে দিয়েছে।তূর্য ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো।অগত্যা আর কথা না বাড়িয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেখানে গেল। গিয়ে দেখলো আরেক কাহিনী।নাবিল – পিংকিও সেখানে। তাদের দেখে অনেকটা অবাক হলো তূর্য।
আশ্চর্য হয়ে বলল,

” তোরা ? ”
তাসিন দাঁত কেলিয়ে বলল,
” ক’ট!তোর মতো!তো ভাই,এই যে ইম্পর্ট্যান্ট কাজ ? ” তাসিনের কথায় বিপরীতে তূর্য চোখ গরম দিলো।
নাবিল কপট রা’গ দেখিয়ে বললো,
” বা’ড়ার সিঙ্গেল বন্ধু বান্ধব থাহাও আরেক জ্বা’লা।নিজে সিঙ্গেল ম’ইরা যা, আর আমগোও মা’র। ”
আসলে নাবিল আর পিংকি ও ঘুরতে বেরিয়েছিল।ফেরার পথে তাসিনের সাথে দেখা।অতঃপর,তারাও ….!
আহি, নাবিল আর তাসিনের সাথে কথা টুকিটাকি কথা বলল।তারপর পিংকি আহিকে তার পাশে বসালো।তারা তূর্যদের থেকে কিছুটা দূরত্বে বসেছে।দুজনে মিলে রাজ্যের গল্প করছে। তূর্য বারবার আড় চোখে সেটা দেখছে।সুযোগ পেয়েই পিংকির পাশে বসে গেছে।ই’ডিয়ট একটা ! মুখে না বললে কিছু বোঝে না। তূর্যের হাবভাব দেখে তাসিন ওকে একটা খোঁচা মে’রে বলল,
” কিরে ভাই ? বিয়ে হয়নি এখনো,ইভেন মনের কথাও বলস নাই,তাও এইটুকু দূরত্ব সহ্য হচ্ছে না? ”
” বিয়ে হলে অন্তত রাতে কাছে পেতাম !” মনে মনে কথাটা বললো তূর্য।আর উপরে উপরে গ’ম্ভীরতা দেখিয়ে বলল,
“একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবি না,তাসিন। ডিজগাজটিং”
নাবিল বলল,

” তোর ক’ষ্ট আমি বুঝতাছি।একটা গান গাইতে পারস তূর্য,তাইলে যদি আহির তোর দিকে মনোযোগ আহে ”
তূর্য একটু ভাবলো।অফারটা মন্দ নয়।ওয়েদারটাও বেশ। কয়েক সেকেন্ড সময় নিলো।তারপর হাতে গিটার উঠিয়ে আহির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। গিটারে সুর তুলতেই পিংকি – আহি দুজনেই এদিকে মনোযোগ দিলো ।তূর্য আহির পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই গাইতে শুরু করলো,

” খোলাখুলি বলতে গেলে
পড়ে গেছি তোর কবলে
তলিয়েছে মন,ভীষণ রকম
অথৈ জলে…….
খোলাখুলি বলতে গেলে
পড়ে গেছি তোর কবলে
তলিয়েছে মন,ভীষণ রকম
অথৈ জলে…….
সাঁতার কেটেছি,ঘুমিয়ে হেঁটেছি
এতটা ডুবেছি তোরই তো কারণে
তোকে ভালোবাসতে গিয়ে ”

পুরোটা সময়ে এক মুহুর্তেই জন্যেও আহির দিক থেকে দৃষ্টি নামায়নি তূর্য। ঘোরে তলিয়ে গিয়েছিল সে।
আহি বারবার চোখ নামিয়ে নিয়েছে ,আবার তাকিয়েছে। কেন জানি দীর্ঘ সময় চেয়ে থাকতে পারছিল না সে! তূর্যের এমন চাহুনি এই প্রথমবার দেখলো আহি। কী ছিল ওই নজরে ? তূর্য ভাই তো শুধু তাকিয়েই ছিলেন !
কিন্তু এভাবে তো উনি আগে কখনোই তাকে দেখেননি। ভীষন আকুলতা ছিল সেই চাহুনিতে,যেন অসংখ্য অপ্রকাশিত কথা লুকিয়ে আছে ।
এই গানের সকল কথা কি তূর্য তাকে বলেছে?তাহলে সম্পূর্ণ গানটা তাকে উদ্যেশ্য করেই ছিল?
তখন যে তূর্য ভাই বললেন, ” নজরের কী দেখেছিস তুই ? ” এটা কি সেই নজর? যদি সেই নজর হয়ে থাকে তাহলে তূর্য যেন তাকে আর কখনও তাকে এভাবে না দেখে। কখনো না !

ছেলে – মেয়ে দুটির জন্য খাবার সামনে নিয়ে অপেক্ষা করছেন পারভিন বেগম আর মারুফা বেগম। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁই ছুঁই, তূর্য আহিকে নিয়ে এখনো ফেরেনি।তবে এটা নিয়ে বাড়ির কারো কোনো মাথা ব্য’থা নেই। তূর্য সাথে আছে মানে নো টেনশন। দায়িত্ববান ছেলে।
তবে বিপদ – আপদ নিয়ে মারুফা বেগমের কোনো চিন্তা না থাকলেও চিন্তা অন্য বিষয় নিয়ে। যদিও তূর্যের উপর তার যথেষ্ট বিশ্বাস – ভরসা আছে।সে আহিকে লায় দিবে না।
কিছুক্ষণ নিরিবিলি পড়ে রইলেন তিনি ।তারপর হঠাৎ ভাবলেন তার আধ পাগলা মেয়েকে সামলানোর জন্য যদি তূর্যের মতো দায়িত্ববান একটা পুরুষ সারা জীবন পাশে থাকে তাহলে ব্যাপারটা সুন্দর নাহ? কিন্তু এই বাড়ির লোকেরা কি সেটা মেনে নিবে ? বিশেষ করে বড় ভাইজান ?ভেবেই নিজের উপর একটু হেসে নিলেন তিনি।বড় ভাইজানের কথা ভাবছে সে ,আর এদিকে তূর্য ? সে তো সবার আগে বাঁধ সাধবে ।
খাবার নিয়ে বসে থেকে কিছুক্ষণ এসব আজব সব ভাবনা ভেবে তিনি নিজেদের রুমে চলে গেলেন তিনি।পারভিন বেগমও কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে গেলেন।খাবার টেবিলে সাঁজানো থাকবে ওরা নিজে নিয়েই খেয়ে নেবে। তিনি আবার কাবাবের হাড্ডি হতে চান না। রুমে গিয়ে দেখলেন আকবর চৌধুরী এখনো ঘুমনি।তিনি প্রশ্ন করলেন,

” এসেছে ওরা? গাড়ির শব্দ তো পেলাম না ”
” আসেনি এখনো।তুমি না ঘুমিয়ে জেগে আছো কেন ? ”
” ঘুম আসছিল না ”
” আলো বন্ধ করে দিচ্ছি ,এবার ঘুমাও ”
” কল করলাম তূর্যের ফোন বন্ধ বলছে ,আর আহি রিসিভ করছে না ”
” সে মেয়ে মোবাইল ফোন বাড়িতে ফেলে গেছে ”
” তোমার ছেলেরই বা কি কান্ডজ্ঞান ফোন বন্ধ করে রেখে দিয়েছে।চিন্তা হয় না আমাদের ? আর সোয়েটার কিনতে কতক্ষণ লাগে? কি করছে কে জানে ! বি’পদ – আপদের কথা বলা যায়? ”
” তুমিই বা সেধে সেধে চিন্তা করছো কেন?আল্লাহর রহমতে কিছু হবে না।তুমি ঘুমাও ”
বলে কিছু মনে করার ভঙ্গি করে পারভিন বেগম ফের বললেন,
” ভালো কথা! ভাবির সাথে কথা হয়েছিল, ওনার ভাজতি !ঐযে শবনম ।চিনেছ তো? সেও আহির সাথে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।মেয়েটা হলে থাকত।কি যেন সমস্যা হয়েছে মাস দুয়েক আমাদের বাড়িতে রাখতে চাচ্ছিলো। যদিও ওর চাচারাও এখানে থাকে কিন্তু…. ”
” হ্যাঁ,সমস্যা কি ! আসতে বলো।ভালোই হবে আহি আর ও একসাথে যেতে পারবে । কখন আসছে?” পারভীন বেগমকে থামিয়ে বললেন আকবর চৌধুরী।
” আরো মাস খানেক পরে আসবে ”

অবশেষে ঘোরাঘুরি – আড্ডা সেরে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে উঠেছে সবাই। বিদায় নিয়ে যে যার মতো করে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছে। এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরেই তূর্যের বাইক পার্ক করা। গন্তব্যের দিকে হাঁটছে তারা দুইজন।শুরুর দিকে আহির যত উৎফুল্লতা ছিল সব ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে সেটা বেশ কিছুক্ষন ধরে লক্ষ্য করছে তূর্য।
সারা বিকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি আহি তূর্যের আগে আগে হাঁটছিল আর তূর্য তার পিছুপিছু।এমন যেন সে এখানের কিছু চিনে না , আহি তাকে চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এখন পুরো বিপরীত।
আহি মন ম’রা হয়ে তূর্যের পিছু পিছু হাঁটছে ।
তূর্য বেশ কয়েকবার করে বলেছে ওর আগে আগে হাঁটতে।ধ’মক খেয়ে কিছুক্ষন তূর্যের সাথে সাথে হেঁটে,তারপর আবার যা তাই। বি’রক্ত তূর্য পা থামিয়ে গ’ম্ভীর কণ্ঠে ফের বলল,

” কথা কানে যাচ্ছে না তোর? সামনে হাঁট। ”
” আপনি হাঁটুন না,তূর্য ভাই । আমি কি হা’রিয়ে যাচ্ছি নাকি ?”
” মা’র না খেতে চাইলে যা বলছি কর ”
” আপনার পায়ে পড়ি, জোর করবেন না প্লিজ …! ” অ’সহায় কন্ঠে বলল আহি। আহিকে স্বাভাবিক লাগছে না তূর্যের । তূর্য এবার নরম কন্ঠে বললো,
” কোনো সমস্যা হচ্ছে তোর ? ”
আহি এদিক – ওদিক না বোধক মাথা নেড়ে মুখে বলল,
” না ! আপনি তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলুন ”
” কি সমস্যা হচ্ছে ক্লিয়ারলি বল। রা’গাস না আহি “শক্ত কন্ঠে বললো তূর্য
” বলছি তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না , বাড়িতে চলুন তাড়াতাড়ি ”
” হুডি কিনে দেইনি বলে এমন করছিস? আম্মুদের সাথে গিয়ে কিনিস!”
” হুডি তো যাকে বলবো সে কিনে দেবে। আপনি না দিলে কি আসে যায় ! ”
” তাহলে কি প্রবলেম ? ব…” কথার মাঝপথে থেমে গেল তূর্য।হঠাৎ খেয়াল করলো আহি দুই হাতে পেট চেপে দাঁড়িয়ে আছে।সন্ধ্যায় বলছিল পেট ব্য’থা করছে।এখন আবার এভাবে পেট চেপে দাঁড়িয়ে আছে । তার সামনে দিয়ে হাঁটতেও চাইছে না । তূর্য দুইয়ে দুইয়ে চার করে খানিকটা ইতঃস্তত স্বরে বলল,

” পি’রিয়ড হয়েছে ? ”
ল’জ্জায় ম’রে যেতে ইচ্ছা করছে আহির ।সেই তূর্য ভাই সবটা বুঝে ফেললেন।মান ,সম্মান,ই’জ্জত আর কিছু বাকি রইলো না। আর পি’রিয়ডটাকেও বলি হারি! ওকে আজকেই আসতে হলো।কোনো টাইমসেন্স নেই।
কোনো উত্তর না করে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো আহি। তূর্য আর কথা বাড়ালো না।ধীর পায়ে হেঁটে আহির পিছনে গেল। ব্যাক সাইডটাই একবার চোখ বুলিয়ে নিল। ব্লাক ড্রেস হওয়ায় অতটা বোঝা যাচ্ছে না। সে আহির সাথে প্রায় মিশে দাঁড়িয়ে বলল,

” এইবার হাঁট ”
আহি তূর্যের কথা মতো গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো।আর তূর্য ওর পিছুপিছু প্রায় ইঞ্চি খানিকের ব্যবধান রেখে হাঁটছে।বেশ অনেকটা সময় পর বাইকের কাছে পৌঁছালো তারা। তূর্য বাইকে উঠে আহিকে উঠতে বলল।আহি মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলল,
” এভাবেই উঠবো ? ”
” উঠবি না তো কি করবি? আমার কাছে তো আর দঁড়ি নেই যে তোকে বাইকের সাথে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যাবো ”
এত বড় বাঁকা কথার লোক পৃথিবীতে দুটি আছে কিনা স’ন্দেহ আহির। নেহাত কথা বললে পেটের ব্য’থা বাড়ছে তাই আর কথা বাড়ালো না সে।মুখ ফুলিয়ে উঠে বসলো। তূর্য তার কন্ঠ কোমল করলো।বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩২

” বেশি পে’ইন হচ্ছে ? ”
” হুম ” ছোট্ট করে উত্তর দিলো আহি ।
” প্রত্যেকবার হয় ?”
” হুম ”
” ডক্টর দেখিয়েছিস ?”
” না ”
” কেন ? ”
” এমনি!”
” মেজো মা জানে ? ”
” কী?”
” ব্য’থার কথা ই’ডিয়ট ”
” জানে ”
” কালই ডক্টরের কাছে যাবি ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৪