Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪
ইনান হাওলাদার

সময় চলমান।দিনের গণ্ডি পেরিয়ে সপ্তাহ , সপ্তাহের গণ্ডি পেরিয়ে মাস।এবং দেখতে দেখতে কিভাবে দুইটা মাস পার হয়ে গেছে।আজ আহির উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিন।মনের ভিতর নানান ভয় আর দুশ্চিন্তা নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে এসে নিজস্ব আসনে বসে আছে সে।তবে পরীক্ষার চিন্তায় মগ্ন না থেকে সে মগ্ন তূর্যের চিন্তায়। একটা মানুষ কতটা খা’রা’প হলে পরীক্ষার দিনেও ব’কা’ব’কি করে?
এইযে,আহি যে রুমে বসে আছে সেই রুমেই কত মেয়ের বড় ভাইয়েরা তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কতো কিছু বলে গেছে।আর তার বড় ভাই ? সিটটা খুঁজে দিয়েই চলে গেল।একটা কিচ্ছু বলল না। তার উপর দিয়ে আসার সময় দেমাক দেখিয়ে বলল,

” তোর বাপ – চাচারা কি আমাকে কা’মলা পেয়েছে ? “আরো কতো কী! সেসব কথা মনে করে আহি মন খারাপ করতে চায় না।
সে কি বলেছে নাকি তাকে নিয়ে আসতে ? বড়ো আব্বু বলেছেন! তাই ব’কাটা তাকে দিতে পারতেন।কিন্তু সে সাহস তো তার নেয়।সে শুধু পারে আহির সাথে।
এমন ভাব করে যেন সে বাড়ির প্রেসিডেন্ট আর বাকিরা সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণ।
আহির এসব আজগুবি চিন্তা – ভাবনা মধ্যে ৬ জন শিক্ষক – শিক্ষিকা খাতা আর প্রশ্নপত্র নিয়ে হাজির হলেন।সে দ্রুত নিজের ভাবনার জগৎ হতে বেরিয়ে এলো।
শিক্ষক – শিক্ষিকারা সবাইকে খাতা আর ওএমআর শিট দিয়ে সবটা বুঝিয়ে দিলেন।গুণে গুণে তার ৩০ মিনিট পর ঘণ্টার আওয়াজ শুনে প্রশ্নপত্র দিয়ে দিলেন।শুরু হলো দীর্ঘ ২ বছরের অর্জিত জ্ঞান খাতা – কলমে প্রকাশের পালা।

দীর্ঘ ২৮ মিনিট ধরে একটানা বক্তৃতা শেষে বাড়ি ফিরেছেন সাবেক মেয়র লায়েক শিকদার।সূর্যের কড়া তাপ তারউপর ধীরে ধীরে জনগণের কাছে জমানো ইমেজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার রা’গ দুটো মিলে যেন মুখশ্রী র’ক্তিম থেকে র’ক্তি’ম’তর হয়ে উঠেছে। বছরের বছর ধরে আয়ত্ত করা নিজের ইমেজ মুহূর্তের মধ্যে কেমন ন’ষ্ট হয়ে যাচ্ছে।সে যখন ক্ষ’মতায় ছিল তখন কি জনগণের সেবা করেনি? তাদের সুযোগ – সুবিধা দেখেনি ?তাহলে কেন তার এই পরিণতি? কী জাদু করেছে ওই আসিফ চৌধুরী?
যে জাদু করেছে করুক !এর শেষ না দেখে এবার ছাড়বে না লায়েক শিকদার।কিছুতেই না!আসিফ চৌধুরী এক এক করে তার থেকে সব কেঁ’ড়ে নিয়েছে ।সব!
জনগণের ভালোবাসা,সম্মান,ক্ষমতা সর্বোপরি তার…..
” ভাইজান,তুমি বললে ওই জা’নো’য়া’রের মু’ন্ডু কেঁ’টে সামনে হাজির করব ” ছোট ভাই লাতিন শিকদারের কথায় নিজের ভাবনার ইতি টানলেন তিনি আর বললেন,
“সময় হোক ,একেকটা করে প্রত্যেকটার হিসাব ক’ড়ায় – গ’ন্ডায় আদায় করব।চুল পরিমান ছাড় পাবে না ও।আমার থেকে যতগুলো জিনিস কেঁ’ড়ে নিয়েছে ওর ক’লিজা কেঁ’টে ততগুলো ভাগ করে শূ’ক’র দিয়ে খাওয়াবো”
” সেটা নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত আমার ক’লি’জায় শান্তি ফিরবে না ,ভাইজান ”

চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িং রুম জুড়ে যেন হাসির ফোয়ারা উঠছে। বাড়ির ৪ পুরুষ বাদে সবাই সেখানে উপস্থিত।পারভিন বেগমের মুখের কথা শুনে কেউ আর হাসি আটকাতে পারলো নাহ।আহি হাসছে আর নিজের কোলের উপর রাখা সোফার বালিশটাকে দুই হাতে চাপড়াচ্ছে।
তূর্য গায়ের শার্টটার হাতা ফোল্ড করতে করতে নিচে নামছে।দেখে মনে হচ্ছে খুবই ব্যস্ততার সহিত কোথাও বের হচ্ছে।এভাবে একসাথে সবার উচ্চস্বরে হাসির ধ্বনিতে সে ড্রয়িং রুমের ডান পাশটায় চোখ বুলালে।সাথে সাথে নিজের গন্তব্য পাল্টে ডান দিকে পা চালালো। অনেকটা শক্ত এবং গম্ভীর গলায় বলল,

” তোর এক্সাম চলেছে না ?এখানে কী ?যা পড়তে বোস ”
সবাই হাসি থামিয়ে দিলেও আহি হাসিটা পুরোপুরি থামাতে পারলো না।মুখে হাসি রেখেই বলল,
” যে লোক সারাজীবন বলে এসেছে ‘ পড়ালেখা করে কী করব? আমি কি চিঠি লিখব নাকি?আমি তো ফোনে কথা বলবো ‘ সে আবার আসছে পড়ার কথা বলতে ” কথাটা শেষ করে পুনরায় উচ্চস্বরে হাসা আরম্ভ করলো সে।
তূর্য চোয়াল শক্ত করে একবার মায়ের পানে তাঁকালো।অনেক ছোট বেলায় কথাটা বলেছিল।তাই বলে কি সেটা জনে জনে বলে বেড়াতে হবে?
কেউ পারভিন বেগমের কাছে তূর্যের ছোট বেলার কথা জিজ্ঞেস করলে উনি আগেই এই কথাটা বলেন।যার কারণে তূর্য অনেক আগের মাকে বলে রেখেছিলো কথাটা যেন বাড়ির ছোটদের কানে না যায়।
তার,মাকে আর কিছু বলার নেয় তাই সে একবার হাতের ঘড়িতে লক্ষ্য করে পুনরায় আহির দিকে তাঁকিয়ে বলল,

” তোকে ফিরে এসে দেখছি । ওয়েট কর ! ” বলেই যেভাবে এসেছিল সেভাবেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলে গেল ।
মাত্রই বড় মার মুখ থেকে যে কথা শুনে এত হাসছিল।এখন সেই কথা জন্যই থ্রেট খেতে হলো।এজন্যই দাদু বলতেন
” এত হাসিস না।বেশি হাসলে কাঁদতে হয় ”
” আম্মু ,রাতের খাবারটা আমার রুমে দিয়ে এসো “বুকের গভীর থেকে বড় একটা শ্বাস ছেড়ে কথাটা বলে চলে গেলো আহি । দুইদিনের মধ্যে আর তূর্যের সামনে পরা যাবে না।
বাড়ি ফিরে সামনে পেলে আজই ওর চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দিবে।

বন্ধু ! জীবনে পরিবারের পরেই যাদের স্থান।তবে এমন কিছু বন্ধুত্ব আছে যেগুলো পরিবারের মতোই।চাইলে পরিবারের চেয়েও বেশি বলা যায়।কিন্তু সেটা বললে মিথ্যা বলা হবে ! তবে তারা পরিবার থেকে কোনো অংশে কম নয়।
সকল সমস্যার সমাধান একমাত্র বন্ধুরাই দিতে পারে।সমাধান দিতে না পারে তাহলে নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে মান’সিক সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করে।
এমন অনেক কথা থাকে যেগুলো পরিবারকে জানানো যায় না। কিন্তু বন্ধু – বান্ধবকে সেগুলো অনায়াসে বলা করা যায়।আজ তেমনি কিছু বন্ধুদের মিলন মেলা।

তূর্যেরও এমন কিছু বন্ধু আছে ।যারা তার কাছে ফ্যামিলির মতো।তবে তার বন্ধুদের মধ্যে তাসিন একেবারে জন্য দেশে ফিরলেও সাবিত,অনিক,আবিদ,সিফাত আর আরাফাত বিদেশে সেটেল। তারা সবাই যোগাযোগ করে এই সপ্তাহে দেশে ফিরেছে।তাদের দুইজন মেয়ে বন্ধু আছে পিংকি আর আলিয়া।তবে তারা আজ অনুপস্থিত।
সময়,ব্যস্ততা বা দূরত্ব কিছুই বন্ধুত্বের উষ্ণতা কেঁড়ে নিতে পারে না ।এটাই তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।
তারা সবাই আজ আবিদদের বাসায় এসেছে।বাড়ির ছাদে আড্ডা দিচ্ছে ।তাদের হাসি – ঠাট্টায় রাতের আকাশটা যেন বেশি ঝলমল করছে। চাঁদ বোধহয় আজকে বেশিই দীপ্তি ছড়াচ্ছে।তূর্য পার্কিং লটে গাড়িটা রেখে বড়বড় পা ফেলে দ্রুত ছাদে উঠলো।এসেই প্রথম প্রশ্ন করলো,

” নাবিল কোথায় ?”
” ওই শা’লা এখনো আসেনি !” তূর্যের সাথে কোলাকুলি করতে করতে বলল অনিক।
” আমাকে লাস্ট ফাইভ মিনিটস এ না হলেও ৪ টা কল দিয়েছে ”
” আরে বা’ড়া,চইলা আইছি ” দুই হাঁটুতে দুই হাতের ভর দিয়ে হাপসাতে হাপসাতে বলল নাবিল।দেখেই বোঝা যাচ্ছে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে।
” এই হলো তুই আমার জন্য ওয়েট করে বসে আছিস ?”
” ধুর বা’ড়া আমি জীবনে টাইমলি আইছি? তুই বিশ্বাস করতে গেছস ক্যা?”
” আরে বোস তোরা! এই নে ধর ওয়েলকাম কফি ” সিফাত তাদের দুজনের হাতে দুইটা কফি দিতে দিতে বলল।
তারা সবাই মাদুর বিছিয়ে এক জায়গা গোল হয়ে বসেছে।আবিদের মা বিভিন্ন প্রকার নাস্তা দিয়ে গেছেন।সেগুলো খাচ্ছে আর গল্প করছে।
প্রায় আধা ঘন্টা ধরে একেকজন একেক রকম কথা বলে মজলিস জমিয়ে রাখছে।কিন্তু তূর্য সেরকম কোনো কথাই বলছে না।যদিও সে কম কথা বলে সেটা সবাই জানে।যে দুই – একটা কথা বলে সেটা সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শোন। সাবিত বলল,

” তূর্য চুপ কেন ? কিছু তো বল ”
” তোরা বলছিস তো।আমি শুনছি ! প্রয়োজন মনে করলে বলব ”
” ভাই ,তার মানে তুই এতক্ষণ প্রয়োজন মনে করিসনি ?” খুবই ভোলাভালা ভাবে বলল আরাফাত ।
” ওর মুখ থেকে কথা বের করতে হলে টিকিট কাঁটতে হয় জানিস না ? কেঁটেছিস কেউ? তাহলে কথা বলবে কেন?” সামনে রাখা পাপড় তুলে মুখে দিতে দিতে বলল তাসিন।
” কাজের কথা বললে অবশ্যই বলব ”
” আরে তূর্য ,ভাই তুই চুপ করেই থাক ! বেশি কথা বললে আয়ু কমে যায় “কথাটা বলে হেসে উঠলো অনিক।
” হ বা’ড়া । তোগো বা’ড়া তোরা বন্ধ কইরাই রাখ ।কথা কওন লাগতো না ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩

” তোর বা’ড়া মার্কা কথা অফ কর,মেহরাব ।কথার শেষে বা’ড়া লাগানো কি খুব প্রয়োজন?রিডিকিউলাস!”
” একটু আগেই কিন্তু তুই কইছোস কাজের কথা কইলে কথা কইবি।তারমানে আমার বা ‘ড়া টা খুবই দর…. ” তূর্যের কঠোর দৃষ্টির পানে চোখ পড়ে বাক্যটা শেষ না করেই নাবিল আবার বলল,
” থাক বা ‘ড়া ।কইলাম না বা ‘ড়া ।তাতে কি ম ‘রে যাবো নাকি বা ‘ড়া! ”
তার কথা শুনে সবাই একযোগে চিৎকার করে হেসে উঠলেও তূর্যের ঠোঁ’টে মুচকি হাসির দেখা মিলল।
এভাবে আরো কিছুক্ষন হাসি – ঠাট্টা করে সবাই বাড়ি ফিরলো।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫