Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৬

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৬

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৬
ইনান হাওলাদার

দিন তিনেক আগে চৌধুরী বাড়িতে পুত্রবধূ আসলেও আজ মেয়ে জামাই এসেছে। বাড়ি জুড়ে উৎসব মুখর পরিবেশ। জামাইয়ের পছন্দের সকল খাবার তৈরি হচ্ছে চৌধুরী বাড়িতে। আসলাম চৌধুরী বলে দিয়েছেন তার মেয়ে জামাইয়ের আপ্পায়নে যেন কোনো কমতি না থাকে। শুধু তিনারাই যে জামাই নিয়ে মাতামাতি করছেন এমন না। জামাইও এসেছে জামাইয়ের মতো। রাজধানীর কোনো মিষ্টান্ন আনতে বাকি রাখেনি সে ।রসগোল্লা ,কালোজাম,চমচম,সন্দেশ,রসমালাই, ক্ষীরকদম থেকে শুরু করে রাজভোগ।ফল-ফলালিরও বিভিন্ন প্রকার। বাড়ির সবার ধারণা ছিল আহির বাবার বাড়ি আসার শখ ঐ সকালের আলাপ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তূর্য জীবনেও ওর এসব পাগলামিতে সাঁয় দিবে না। কিন্তু দুপুর গড়াতেই তূর্যের এত কেনা-কাটি নিয়ে ঘরে ফেরার পর বারিশুদ্ধু সবাই অবাক হন। পারভিন বেগম প্রশ্ন করে বসেন এত খাবার-দাবারের আয়োজন কেন? সকালের ঘটনা তিনি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। তখন তূর্য স্বভাব সুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে বলে,

” জামাই শ্বশুরবাড়ি খালি হাতে আসবে? ”
ব্যস! এই কথাটুকু বলে উপরে চলে যায় সে। তিন গিন্নি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে পড়ে থাকেন। তারপর ব্যস্ত হয়ে কাজে লেগে পড়েন।বাড়ির কর্তাদের মোবাইল করে এটা-ওটা আনার লিস্ট দেন।তাদেরও তো জামাই আদর করতে হবে। প্রথম বার বাড়িতে জামাই এসেছে বলে কথা।
তূর্য কেনা-কাটা করে বাড়ি নিয়ে আসা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হলেও আহি ড্রয়িং রুমে বসে ছোট ভাই-বোনদের বারবার অনুরোধ করছে শ্যালক-শ্যালিকা হিসাবে তূর্যকে বিরক্ত করতে। কিন্তু কিছুতেই মন গলাতে পারছে না। প্রায় ঘন্টা খানিক ধরে অনুরোধ করার পর হার মেনে নিলো সে। বুঝলো যা করার তাকেই করতে হবে। অগত্যা নিজেই গেল স্বামীর কাছে। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ধীরে ধীরে পা বাড়ালো রুমে। ঘর জুড়ে আধ আলো – আধ অন্ধকার। নির্ঘাত ঘুমোচ্ছে লোকটা। ও আস্তে করে কাঁচের জানালা হতে পর্দাটা সরিয়ে এক পাশে দলা করে রাখলো। হঠাৎ আলোয় চোখ মুখ-কুঁচকে ফেললো তূর্য। পাতলা ঘুমে ছিল সে। আহির উপস্থিতিও টের পেয়েছে।কিন্তু এসেই এরকম বিরক্ত করবে ভাবনার বাইরে ছিল তার। আধ খোলা চোখে বিরক্ত ভঙ্গিতে তাঁকালো আহির দিকে। ঘুম জড়ানো মোটা গলায় বলল,

” আমার ঘুমে কি প্রবলেইম তোর জা’ন? সকালে নড়েচড়ে ডিস্টার্ব করবি।আর এখন পুরো আলোর গোডাউন এনে চোখের উপর রাখলি ”
” সারা রাত চৌকিদারী করে দিনে এত ঘুম কোথা থেকে আসে?” বিড়বিড় করলো আহি। তূর্য ওর কথায় কান না দিয়ে পুনরায় ঘুমানোর চেষ্টা চালালো। মাথার নিচের বালিশটাকে ঠিকঠাক করে উপুড় হয়ে শুলো সে। শুতে শুতে আরেকবার বলল,
” তোর কাজ শেষ হলে পর্দাটা টেনে দিস ”
এখন তূর্যকে কে বলবে ওর কাজ লোকটার ঘুম উড়িয়ে দেওয়া।সেটা না উড়ানো পর্যন্ত শান্তি মিলবে না। আহি এগিয়ে গেল বিছানার কাছে। স্বামীর উন্মুক্ত কাঁধ ঠেলে ডাক দিবে সেই মুহূর্তে পিঠে নজর পড়ল।এতগুলো নখের আঁচড় দেখে মুখ কালো হয়ে গেল মেয়েটার। পরপর নিজের দুইহাত নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখলো। হাতে অবশ্য নখ নেই তবুও যেটুকু আছে সেগুলো কাঁটা আবশ্যক। কিছুক্ষণ ধরে শোক পালন করলো সে।রুমে আসার কারণই ভুলে বসেছিল প্রায়। সেগুলো পুনরায় মাথায় আসতেই তড়িঘড়ি করে ডাকলো ,

” তূর্য ভাই? শুনছেন ? ”
ডাক তূর্যের কান অবধি পৌঁছালেও সাঁড়া দিলো না। ঘুমের তোড়ে ইচ্ছা করছে না মুখ খুলতে। কিন্তু আহি তো নাছোড় বান্দা। সে বিরতিহীন ডাকতে রইলো। বিরক্ত হয়ে এক পর্যায়ে চোখ খুললো তূর্য। বলল,
” উফফ,আহি ! তুই ঘুমালে আমি ডিস্টার্ব করি?করি না! তাহলে তুই কেন করছিস?”
” এহহহ,আসছে! করেন না ” ব্যঙ্গ করে কথাটা বলে মুখ ভেঙচালো আহি। তূর্য এখন অসহায় গলায় বলল,
” কি চাইছিস তুই? জাস্ট থার্টি মিনিটস ঘুমোতে দে।তারপর সব কথা শুনবো ”
এবারের লোকটার প্রতি মায়া হলো তার। একটু ঘুমানোর জন্যে কীভাবে অনুরোধ করছে। আহারে ! ও উঠে গিয়ে জানালার পর্দাটা আবার পূর্বের মতো করে রেখে স্বামীর শিঁয়রে বসলো।প্রথমবারের মতো স্বেচ্ছায় তার চুলের মধ্যে হাত রাখলো। আরাম পেয়ে আহির দিকে ঘুরে শুলো তূর্য। দুই হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে ওর কোলে মাথা রাখলো। জড়ানো গলায় বলল,

” লক্ষ্মীবউ আমার ”
মুহূর্তেই রক্তিম আভায় ভরে উঠলো রমণীর চেহারা। চুলের ভিতরের হাত জোড়া কিছুক্ষণ থমকে থেকে পুনরায় চলতে শুরু করলো।
বেশ খানিকক্ষণ এভাবে পার হলো। তূর্য ঘুমিয়েছে বোধগম্য হতেই খুব সাবধানে কোল মাথা তুলে বালিশে শুইয়ে দিলো। আহি উঠে চলে যেতে গিয়েও আবার থমকালো। কিছুক্ষণ ঘুমন্ত স্বামীর দিকে চেয়ে থেকে টুপ করে তার কোলের মধ্যে ঢুকে পড়লো।দুই হাতে জড়িয়ে নিল তাকে। ঘুমের মধ্যে তূর্যও ওকে বাহু বন্ধি করে নিলো। স্বামীর বুকে থুতনি ঠেকিয়ে মাথা তুলে তাঁকালো রমণী। ফ্যানের মৃদু বাতাসে কপালের কাছের চুলগুলো খেলা করছে। ও ফুঁ দিয়ে সেগুলোকে উপরে তোলার চেষ্টা করলো। এক ঝটকায় সেগুলো উপরে উঠেও গেল , মুহূর্তেই আবার নেমে আসলো। মেয়েটা মনে মনে কিছু একটা ভেবে লাজুক হাসলো। নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো তূর্যের হতে।তারপর ঝুঁকে কপালে শব্দ করে একটা চুমু খেল। সাথে সাথে লজ্জায় দুই হাতে মুখ ঢেকে নিলো। প্রথমবার চুমু খাওয়ার অভিজ্ঞতা হলো তার। বুকের ভেতর ঘনঘন বাড়ি খাচ্ছে। আজকে স্বামীর রোগটা বোধ হয় বউকে ধরেছে। কপালে চুমু খাওয়া শেষে নাকের ডগায় চুমু খেল ,তারপর থুতনিতে আর দুই গালে। দুই দিন আগে সেইভ হওয়ার দরুন খোঁচা খোঁচা দাড়ি উঠেছে তূর্যের গালে ঠোঁটের সাথে সংঘর্ষ হতেই শিরশির করে উঠলো মেয়েলি শরীর। আহি হঠাৎ লক্ষ্য করলো দুই ওষ্ঠের মাঝে ফাঁক হয়ে আছে তূর্যের। শুরুতেই ছিল? নাকি হঠাৎ ফাঁকা হয়েছে? জেগে গেল নাকি লোকটা?

ঘনঘন ঢোক গিললো মেয়েটা। কিছুক্ষণ রোবট হয়ে পড়ে রইলো। না ! তূর্যের কোনো হেলদোল নেই । নিশ্চিন্ত হলো সে।ভীত নয়ন স্বাভাবিক হলো। মেয়েটার পাগলামি এবার সীমানা ছাড়ালো। আলতো করে তূর্যের গাল চেপে ধরলো সে। যার দরুণ ফাঁকা হয়ে থাকা ওষ্ঠপুট আরো খানিকটা ফাঁকা হলো।আনমনে এর পরের পদক্ষেপ ভেবেই ঠকঠক করে কাঁপতে আরম্ভ করলো ও। চোখ খিঁচে বন্ধ করে কাঁপতে কাঁপতে মাথাটা নুইয়ে নিলো পুরুষালি কালচে বাদামি ওষ্ঠদ্বয়ের দিকে। দূরত্ব যত ঘোচাচ্ছে কাঁপুনি তত বাড়ছে মেয়েটার।তবুও হার মানলো না সে। নিজের নরম,কোমল ওষ্ঠ জোড়া দাবিয়ে দিলো রুক্ষ ,শুষ্ক ওষ্ঠে। বিদ্যুতের গতিতে চোখ খুলে গেল তূর্যের। এতক্ষণ ধরে সবটা সহ্য করে নিলেও এবারে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল ও। এদিকে আহি আনাড়ি ভাবে চুম্বনে ব্যস্ত । তূর্য না পারছে ওর সাথে তাল মেলাতে আর না পারছে নিজেকে সামলাতে। অসহায় হয়ে দুই হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরলো।কয়েক সেকেন্ড পেরোতেই সজোরে কামড় পড়লো ঠোঁট জোড়ায়। তূর্য মুখে অস্পষ্ট আর্তনাদ করে আহিকে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হতে। ডান হাতের পিঠে ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল,

” ইডিয়ট ! হচ্ছিলো তো ,এত জোরে কাঁমড় দিলি কেন? ”
এদিকে মেয়েটার শরীর হতে আত্মা ছুটে যাওয়ার উপক্রম। মাথা ভনভন করে ঘুরছে এই লোক জেগে গেল কখন। ও কাপতে কাপতে বলল,
” আ..আমি কিচ্ছু ক..ক..করিনি । আপনি ভু..ল ভাব..ভাবছেন ”
এক ঝটকায় ওকে নিচে ফেললো তূর্য। দুই ভ্রুর মাঝে ভাঁজ ফেলে বলল,
” ওহ রিয়েলি? কিচ্ছু করিসনি তুই? ”
” আমি…আমি ওসব করিনি তূর্য ভাই।বিশ্বাস করুন ”
” হ্যাঁ,করলাম বিশ্বাস। কেউ আমার কপাল,থুতনি,গালে চু’মু খায়নি। ঠোঁট কেঁটে রক্তও বের করেনি। সব মেনে নিলাম।হ্যাপি?”
” আপনি জেগে ছিলেন? তো বলেননি কেন?”মিনমিন করে বলল মেয়েটা।
” বললে বউয়ের চু’মু খেতে পারতাম ? আচ্ছা বাদ দে! তোর কি শরীর খারাপ? ”
হঠাৎ এমন কথা বলায় চিন্তিত হলো আহি।তার তো শরীর খারাপ কখনোই ছিল না। ও সন্দিহান গলায় বলল,
” না তো! কি হয়েছে ? ”
” কিছু না, জা’ন ” বলেই এক থাবায় গলায় ঝুলতে থাকা ওড়নাটা ধরে ছুঁড়ে ফেললো তূর্য। কি হয়ে চলেছে আন্দাজ করতে পেরে ছটফট করে উঠলো মেয়েটা। ততক্ষণে গলা জুড়ে তূর্যের ঠোঁটের বিচরণ শুরু হয়ে গিয়েছে। হাত জোড়াও ব্যস্ত হয়েছে। আহি চিৎ’কার করে উঠলো,

” প্লিজ না ,তূর্য ভাই ”
সাথে সাথে থমকে গেল তূর্য। এভাবে কখনো বাঁধা দেয়নি আহি।
মাথা তুলে তাঁকালো মেয়েটার চোখের দিকে। বলল,
” পি’রিয়ড ? ”
” নাহ। ছাড়ুন প্লিজ ”
আহির এমন হাবভাবে তূর্যের মনে হলো ও বিরক্ত। তার ছোঁয়া কি খারাপ লাগে আহির কাছে? জোর করে নিজের অধিকার ফলায় ? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো সে।অতঃপর আহিকে বললো,
” খারাপ লাগছে তোর? ”
মেয়েটা তূর্যের প্রশ্ন শুনলো কি শুনলো না বোঝা গেল না।কিন্তু ঝটপট বলতে শোনা গেল,
” হুঁউ… ”
সেকেন্ডের ব্যবধানে দূরত্ব বাড়ালো তূর্য।কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয় থেকে
অস্পষ্ট গলায় বলল,
” স্যরি । আ’ম স্যরি ”
তারপর বিছানা ছেড়ে সোজা বেলকনিতে চলে গেল। কি থেকে কি হয়ে গেল দুজনের কেউ-ই বুঝতে পারলো না। এতক্ষণের সুন্দর পরিবেশটা মুহূর্তেই গুমোট হয়ে গেল। আহিও বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।ওড়না গায়ে জড়িয়ে বেলকনিতে গেল।
মাথা নত করে অপরাধীর ন্যায় বলল,

” আপনি কি রাগ করলেন তূর্য ভাই?”
” উহু ” তূর্যের দৃষ্টি দূরের গাছটার দিকে।যার শুকনো ডালটার উপর দুইটি শালিক বসে কিচিরমিচির করছে।মনে হচ্ছে যেন ঝ’গড়া করছে ওরা। একটা শালিক বারবার উড়ে উড়ে একই গাছের এ-ডাল ও-ডালে বসছে।আর অন্যটা প্রথমটির পিছুপিছু উড়ছে আর কিচিরমিচির করছে।তূর্যের দৃষ্টি লক্ষ্য করে আহিও দেখলো পাখি দুটিকে।পুনরায় অপরাধীর ন্যায় বলল,
” আমি আসলে ওভাবে বলতে চাইনি তূর্য ভাই ”
” হ্যাঁ,বুঝেছি ” গম্ভীর কন্ঠস্বর তূর্যের। মুখটাও অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর হয়ে আছে। এখনো পর্যন্ত একটাবারের জন্যে অপরাধে ভুগতে থাকা মানবীর দিকে দৃষ্টিপাত করেনি সে।রমণী পুনরায় বলতে শুরু করলো,
” আমি সত্যিই…..”
কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তূর্য ঝট করে মাথা ঘুরালো ওর দিকে। খানিকটা উঁচ্চ কন্ঠে বলল,
” ইট’স ওকে।আর কিছু বলার থাকলে বল নাহলে যাহ ”
হঠাৎ উচ্চ কন্ঠে মৃদু কেঁপে উঠলো মেয়েটার শরীর।নতজানু করে রাখা মাথাটা তুলে ছলছল নয়নে স্বামীর চোখে চোখ রাখলো। র’ক্তভাব চোখ দেখে বুকের ভিতর ধ্বক করে উঠলো মেয়েটার। চোখ নামিয়ে দ্রুত প্রস্থান করলো সে। আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেললো তূর্য।কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলো। বারবার একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সে আহিকে জো’র করে।গত দুইদিন  নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সবটা স’হ্য করেছে মেয়েটা ।ভাবতে ভাবতে দুই হাতে মাথা চেপে ধরলো তূর্য।

চৌধুরী বাড়ির পরিবেশ এখনো আনন্দমুখর। শুধু দুটি মানুষ গম্ভীর হয়ে ঘুরছে। যার একজন বরাবরই গম্ভীর থাকে যার দরুণ তার ভিতরের খবর বোঝা কঠিন।আর দ্বিতীয় জন নিজেকে যথাসম্ভব হাসিখুশি দেখানোর চেষ্টা করছে। যদিও মনের পরিস্থিতি যতই ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন চেরায় সেটা ফুটে উঠবে-ই। খুশির হোক বা দুঃখের ! শত ব্যস্ততার মাঝেও মেয়ের গোমড়া মুখ পরখ করেছিলেন মারুফা বেগম। আর এটাও খেয়াল করেছেন রুম থেকে বেরোনোর পরেই মেয়েটা এমন মন ম’রা হয়ে আছে। হাসার চেষ্টা করছে তবুও সেটা কৃতিম। এটাও জানেন তিনি মেয়ের কাছে যতই মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করেন মেয়ে কিছুতেই বলবে না। তাই বড় জা’কে বললেন।পারভিন বেগম রান্না-বান্নার ঝামেলা শেষে তূর্যকে রুমে ডাকলেন। মাফুফা বেগমের ধারণা মতে মেয়েটার মন খারাপের কারণ হয়তো তূর্য। তার সাথেই কিছু হয়েছে।তিনি নিজেও বিকাল থেকে ছেলের অস্বাভাবিক ব্যবহার লক্ষ্য করছেন। যে ছেলে বাড়ি ফিরে এক মুহূর্তের জন্যে মেয়েটাকে চোখের আড়াল করতে চায় না। এটা ওটা অজুহাত দেখিয়ে রুমে ডাকে। সেই ছেলে একটাবারও আহিকে ডাকলো না? বিকাল হতে মেয়েটা ড্রয়িং রুমে বসে কাটিয়েছে।
মা ডাকার প্রায় মিনিট পাঁচেক পর তূর্য এলো। বাইরে থেকে দরজায় টোকা দিয়ে ডাকলো,

” আম্মু?”
পারভিন বেগম হাতের তাসবিহটায় চুমু খেয়ে বিছানার পাশে রাখতে রাখতে বললেন,
” ভিতরে আয় বাবা ”
তূর্য গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ালো। বলল,
” হ্যাঁ,বলো ”
পারভিন বেগম ওকে পাশে বসতে ইশারা করলেন।তূর্য বসলো। তিনি বললেন,
” আহির সাথে তোর কি হয়েছে আব্বা? ”
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে চমকালো তূর্য । জানতে চাইলো,
” কেন? ও কিছু বলেছে তোমাকে? ”
পারভিন বেগম ওর পিঠে হাত রাখলেন।বললেন,
” সে বলা না বলা পরে ! রে’গে যাচ্ছিস কেন? আগে বল তো আমায় কি হয়েছে। ব’কেছিস মেয়েটাকে? ”
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তূর্যের। এই সামান্য ব্যাপার নিয়েও বাড়ির সবাইকে বলা হয়ে গেছে ওর ? নূন্যতম কমনসেন্স পর্যন্ত নেই।

” তোমাদের মেয়ে যা যা বলেছে সেগুলো হয়েছে। ”
” আহি আমাকে কিছু বলেনি আব্বা। শোন আমার কথা।তূর্য? ”
নিজের কথাটা বলেই উঠে চলে গেল তূর্য।এদিকে পিছন থেকে পারভিন বেগম যে কথাগুলো বলে গেলেন সে শুনেও শুনলো না। মাঝ পথে দেখা হলো আহির সাথে। আহি পা থামিয়ে চাতক পাখির ন্যায় লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকলেও একবারের জন্য ওর দিকে তাকালো না তূর্য। বড়বড় পা ফেলে চলে গেল।আহি তখনো থমকে দাঁড়িয়ে মানুষটার যাওয়া দেখছে। নোনাজলে চোখের কোটর ভরে উঠেছে। হঠাৎ এতটা পরিবর্তন কেন? আগেও তো রাগ করেছেন তূর্য ভাই।এমন তো কখনোই করেননি। বকেছেন,ধমকেছেন, বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন ।তারপর ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়েছেন। তবুও এরকম মুখ ফিরিয়ে থাকেননি।কানে হঠাৎ পারভিন বেগমের ডাক ভেসে এলো। মুখে হাত চেপে কান্না আটকালো মেয়েটা। ওড়নার কোনা দিয়ে দ্রুত চোখ মুখ মুছে নিলো।যথাসম্ভব হাসিখুশি মুখ নিয়ে বড়মা’র কাছে গেল।পারভিন বেগম ওকে নিজের পাশে বসার জন্যে ইশারা করলেন।
আহি গিয়ে বসলো। হাসি হাসি মুখ করে বললো,

” কি হয়েছে বড়মা ।কিছু বলবেন ?”
মেয়ের কান্না মাখা লাল মুখ দৃষ্টি এড়ালো না ওনার। মৃদু হেসে বললেন,
” আমার তো কিছুই হয়নি।কিন্তু তোর কি হয়েছে মা ? ”
” কই? কিছু না তো ” জোরপূর্বক হেসে বলল সে।
পারভিন বেগম আর ঘাটালেন না ওকে। মেয়ে লুকোচুরি করছে বুঝেও খুশি হলেন তিনি।নিজেদের দাম্পত্য কলহ ঘরের বাইরে আসা ঠিক নয় এটা অন্তত বুঝতে পেরেছে। তিনি জানেন না ওদের মনোমালিন্য কি নিয়ে তবুও নিজে থেকে বলে গেলেন,
” আমাদের শ্বাশুড়ি মা—তোর দাদু ,মা’রা গেছেন কত বছর হয়েছে আহি? বড়জোর সাড়ে তিন বা চার বছর। তুই তো তখন বুঝদার, সব বুঝিস। এটাও বুঝতি তূর্যের সাথে মায়ের সম্পর্ক কতটা ভালো ছিল। আর তূর্য ছোট থেকেই চাপা স্বভাবের,গম্ভীর এটাও জানিস তুই।জানিস না?”
বড়মা হঠাৎ এসব কথা কেন বলছেন জানে না আহি।
তবুও ছোট করে উত্তর দিলো সে,

” হুম ”
পারভিন বেগম পুনরায় বলতে আরম্ভ করলেন,
” আমি মা , তবুও তূর্য আমাকে সেসব কথা বলতো না যেগুলো ওর দাদিকে বলতো। দাদুকে খুব বেশি ভালোবাসতো ছেলেটা। আর ছেলেটা সবার বড় হওয়ায় মাও ওকে অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই আদর করতেন। এটা নিয়ে তুই হিংসেও করতিস। করতিস না ?”
” হুম ।কিন্তু এসব এখন বলছেন কেন বড় মা? ”
” কারণ আছে দেখেই বলছি। আমার মনে হয় তোর কথা মাও জানতেন ”
” আমার কথা মানে? ” প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালো আহি।
” এইযে আমার ছেলে তোকে বউ বানানোর স্বপ্ন সেই শুরু থেকে দেখে আসছে ”
এবারে চুড়ির ব্যাপারটাও মাথায় আসলো আহির। হয়তো সত্যিই জানতেন।আহি এবারে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

” আপনি কিছু জানতেন বড়মা? আপনার ছেলে কবে থেকে আমাকে…”
বলতে বলতে থেমে গেল সে। মেয়েটার উত্তেজিত অবস্থায় দেখে হাসলেন পারভিন বেগম। বললেন,
” সেটা কখনো পরিষ্কার করে বলেনি কখনো। তুই জেনে নিস আমার ছেলের কাছ থেকে। আহি তুই লক্ষ্য করেছিলি? তোর দাদু মা’রা গেলে বাড়ির শুদ্ধু সবাই কান্না করলো। তোর বড় আব্বু এত শক্ত মানুষ সেও কান্না করলো।কিন্তু তূর্যকে কান্না করতে দেখেছিলি? ”
আহি দুইপাশে ‘ না ‘ বোধক মাথা নাড়লো। বলল,
” আমি একবার ভেবেছিলামও আমি দেখেই ছাড়বো ওনার কান্না।”
” দেখেছিস? ”
” না .. তূর্য ভাই তো কাঁদেন না। কারো মৃত্যুতে ওনার কিছু যায় আসে না। আমি মরে গেলেও উনি কখনো কাঁন্না করবেন না ” প্রচন্ড অভিমান থেকে কথাগুলো বলে ফেললো আহি।
পারভিন বেগম মলিন হেসে বললেন,

” তুই ম’রে গেলে কাঁন্না করবে না।কিন্তু তোকে হারানোর ভয়ে হাউমাউ করে কাঁন্না করেছে আমার ছেলে। বাচ্চাদের মতো কাঁন্না করেছে। যে ছেলে কখনো আমার সামনে সামান্য অনুভূতি প্রকাশ করেনি, সে তোর জন্যে আমাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কাঁন্না করেছে।তোর বাবার পায়ে ধরতে বাকি রেখেছে শুধু। আমার ছেলে….”
বাকিটা আর বলতে পারেন না পারভিন বেগম।তার আগেই ওনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁন্না জুড়ে দিয়েছে আহি। তূর্য ভাই তার জন্যে এতটা উন্মাদ,আর সে…! কাঁন্নার বেগ ক্রমশ বাড়ছে ওর। পারভিন বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।আহি কাঁন্না জড়ানো গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৫

” আমি কখনোই তূর্য ভাইয়ের মতো ওনাকে ভালোবাসতে পারলাম না বড়মা। আমি ওনাকে এখনো বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু ওনার এভাবে কথা বলে না থাকা যন্ত্রণা দিচ্ছে আমায়। আপনি বিশ্বাস করুন আমি ইচ্ছা করে কিছু করিনি। কিভাবে কি হয়ে গেল বুঝতে পারিনি।” বলে একটা ঢোক গিললো সে। ঢোকের সাথে কান্না গিলে নিলো। মাথা তুলে দুইহাতের পিঠে চোখ মুছে নিলো।বলল,
” কিন্তু… কিন্তু … আমিও ওনাকে অনেক ভালোবাসি বড়মা। খুব ভালোবাসি বড়মা। উনি আমাকে এরকম ইগনোর করলে আমি ম’রে যাব ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৭