Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৭
ইনান হাওলাদার

ডাইনিং টেবিলে এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত বাহারি রকমের রান্না সাজানো। ভর্তা থেকে শুরু করে মাংস কোনো কিছুই বাদ যায়নি। মাংসের আবার বিভিন্ন প্রকার এবং বিভিন্ন কায়দায় রান্না।
সবাই যখন খাবার টেবিলে পারভীন বেগম আর আহি তখনো অনুপস্থিত । বিয়ের প্রথমদিন নিয়ম দেখিয়ে আহি মায়েদের সাথে খাবারের তদারকি করার পর থেকে তূর্য প্রতি ওয়াক্তে বউকে না নিয়ে টেবিলে বসেনি। সে আজকে সোজা এসেই চেয়ার টেনে বসেছে। একবার জিজ্ঞেসও করেনি আহি কোথায়? খেয়েছে কিনা! ও প্লেটে ভাত তুলে নেওয়ার পরপর পারভিন বেগম এবং আহি নিচে নেমে এলো। মারুফা বেগম তূর্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেখে-শুনে খাওয়ানোর জন্যে। পারভিন বেগম এসেই বললেন,

” মেজো তুই সর। তূর্যকে আহি প্লেটে তরি-তরকারি তুলে দিবে ”
জা’য়ের কথায় সম্মতি দিয়ে সরে দাঁড়ালেন মারুফা বেগম। সাথে সাথে ওনার স্থানে গিয়ে আহি দাঁড়ালো। তূর্যের প্লেটে সাদা ভাত দেখে বলল,
” পোলাও নিবেন না তূর্য ভাই ? ”
” নাহ ” কিছুটা সময় নিয়ে গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এলো। আকবর চৌধুরী প্লেটে হাত নাড়াতে নাড়াতে বললেন,
” শোনো মা , তূর্যের সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে।এখন সে তোমার স্বামী। এভাবে ভাই ডাক ভালো শোনায় না। আস্তে আস্তে অভ্যাস ত্যাগ করো মামনি ”
” জ্বি বড় আব্বু ” বলে মাথা কাত করে সম্মতি দিলো সে। তারপর তূর্যকে প্রশ্ন করলো ,
” আপনাকে কি দিবো? ”
তূর্য কোনো কথা বার্তা ছাড়া নিজ উদ্যোগে ডিমের কোরমা প্লেটে তুলে নিলো। আহি মুখ গোমড়া করে পারভিন বেগমের দিকে তাঁকালো একবার। তিনি ওকে ইশারায় শান্ত থাকতে বললেন। মন খারাপ করতে না করলেন। আসিফ চৌধুরী তূর্যের উদ্দেশ্যে বললেন,

” তোমাদের বিয়েতে আমি কিছুই দিলাম না। হানিমুনে কোথায় যেতে চাও? ”
” যেতে চাই না ”
” কেন?কোথাও গিয়ে ঘুরে আয় ” পারভিন বেগম বললেন।
” এই মুহূর্তে পসিবল না।অনেক প্রেশার ”
তূর্যের মুখে প্রেশারের কথা শুনে অবাক হলো আহি। তার সাথে যাবে না বলে মিথ্যে বলছে লোকটা।গতকালও জিজ্ঞেস করেছে সে হানিমুনে কোথায় যেতে চায়। আর আজকে হুট করেই কাজের প্রেশার হয়ে গেল? আসিফ চৌধুরী খাবার চিবোতে চিবোতে বললেন,
” চাপ কমলে ঘুরে এসো তাহলে। ধরে নেও এটা আমার পক্ষ থেকে তোমাদের বিয়ের উপহার ”
” হুম ” খেতে খেতে ছোট্ট করে উত্তর দিলো তূর্য।

ইলিশ তূর্যের পছন্দের। আহি এবারে আর জিজ্ঞেস না করে সরষে ইলিশের সব চেয়ে বড় পিসটা তুলে দিলো স্বামীর প্লেটে। খেতে খেতে এক মুহূর্তের জন্যে থমকাল তূর্যের হাত।কিছুক্ষণ মাছের টুকরোটার দিকে তাঁকিয়ে থেকে পুনরায় খেতে শুরু করলো। ডিম খাওয়া শেষে মাছের কোনাটাও ছুঁয়ে দেখলো না সে। প্লেটের এক কোণে পড়ে রইলো। সকল খাবার রেখে হাসের মাংসের দিকে হাত বাড়ালো।নাগালের বাইরে হওয়ায় লতা বেগমকে বলল,
” ছোট মা হাঁসের মাংসটা একটু এগিয়ে দিবেন ?”
লতা বেগম এগিয়ে দিতেই যাচ্ছিলেন তার আগে আহি মাংসের পাত্রটা এনে তূর্যের সামনে রাখলো। প্লেটে তুলে দেওয়ার জন্যে চামচে হাত দিতেই তূর্য ওকে আটকালো। রাশভারী গলায় বলল,
” কি হয়েছে ? আমি নিয়ে খেতে পারবো না? মা’তবরি করছিস কেন? ”
” আমি তুলে দিচ্ছি ” বলে একে একে তূর্যের পছন্দের সকল মাংস তুলে দিলো প্লেটে। কোনো কথাবার্তা ছাড়া বসে রইলো তূর্য।চুপচাপ বসে মেয়েটার কান্ড দেখলো। আহি চামচ থেকে হাত নামতেই ভারী গলায় বলল,

” হয়েছে তোর? ”
আহি ছলছল নয়নে তাঁকিয়ে রইলো। কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তূর্য। প্লেট ঠেলে‌ চলে যাওয়ার জন্যে উদ্যত হতেই আকবর চৌধুরী হুং’কার দিয়ে উঠলেন,
” এতক্ষণ ধরে শুধু তোমার কান্ড দেখছি আমি। কি সমস্যা তোমার? বলো কি সমস্যা? খাবার ছেড়ে উঠছ কেন? ”
ঘাড় ঘুরিয়ে বাবার রেগে আগুন হওয়া রূপ দেখলো তূর্য। অতঃপর স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিলো ,
” ক্ষিধে নেই ”
” তাহলে খেতে বসেছ কেন?আর এইমাত্র মাংস চেয়ে এখন তোমার ক্ষিধে কোথায় গিয়েছে ? ”
আকবর চৌধুরীর বিপরীতে আর কোনো কথা বললো না তূর্য। কিয়ৎক্ষণ শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। কথার মধ্যে চলে যাওয়া বে’য়াদবি হবে এইজন্যে হয়তো। ভদ্রলোক এখনো রাগে ফুঁসছেন। তূর্য সাবলীল কন্ঠে বললো,
” আর কিছু বলবেন? ”

রাগের মাত্রা আরো খানিক বাড়লো আকবর চৌধুরীর। অতিরিক্ত রেগে গেলে কথা বলতে পারেন না তিনি।ফলস্বরূপ চুপ করে রইলেন।নীরবতা পেয়ে যাওয়ার জন্যে উদ্যত হলো তূর্য। পিছনের চেয়ার ঠেলে পাশে ঘুরতেই আহির মুখোমুখি হলো।ভেজা চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা।তূর্য সেটা দেখেও দেখলো না।গম্ভীর গলায় ধ’মকে বলল,
” সর সামনে থেকে ”
টুপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো রমণীর গাল বেয়ে।দ্রুত হস্তে সেগুলো মুছে সরে দাঁড়ালো সে।তূর্য দুই কদম এগোতেই পুনরায় হুং’কার ছাড়লেন আকবর চৌধুরী,
” কি পেয়েছ কি তুমি? এটা কথা বলার কেমন ধরণ ? বিয়ের তিন দিনের মাথায় বিরক্ত হয়ে গেছো?
দ্বিতীয়বার যদি দেখেছি এমন ব্যবহার ভালো হবে না বলে দিলাম ।”
আসলাম চৌধুরী থামালেন বড় ভাইকে।ছেলে-মেয়ের উদ্দেশ্যে শান্ত কন্ঠে বললেন,

” কি সমস্যা হচ্ছে তোদের? ”
” কোনো সমস্যা হচ্ছে না।আপনারা সবাই মিলে তিলকে তাল বানাচ্ছেন ”
চোখ মুছে স্বাভাবিক গলায় বলল আহি। ওর কথায় তাচ্ছিল্য হাসলো তূর্য। বাঁকা চোখে তাঁকিয়ে বলল,
” ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সবাইকে বলতে পেরেছিস বাবাকে বললে কি প্রবলেইম। নাকি আমি উপস্থিত দেখে প্রবলেইম হচ্ছে। যাহ, চলে যাচ্ছি। ঠিকঠাক করে বলে আয়।ওকেই? ”
বলে আর এক সেকেন্ড দেরি করলো না সে। গটগট পায়ে হেঁটে চলে গেল। ও যেতেই মারুফা বেগম আহির কাছে আসলেন। নরম কন্ঠে বললেন,
” তূর্য তো এমনি এমনি এত রাগ করার ছেলে না। কিছু করেছিস,মা ? কি হয়েছে তোদের?”
মায়ের কথার বিপরীতে চেঁচিয়ে উঠল আহি,
” তোমাদের সমস্যা কি আম্মু? আমাদের ব্যাপার আমাদের বুঝে নিতে দেও।তোমরা কেন এসবের ভিতরে ঢুকছ? তোমাদের জন্যে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে। ”
বলে সেও চলে গেল। পারভিন বেগম একটা দীর্ঘ শ্বাস টেনে বললেন,
” আহি বোধহয় ঠিকই বলল। ওদের স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে আমাদের ঢোকা উচিত হয়নি।বাড়াবাড়ি হয়ে গেল ”
বিপরীতে আকবর চৌধুরী বললেন,
” তোমার ছেলে কি বাড়াবাড়ি করেনি? আমাদের সামনে কেন মেয়েটার সাথে এভাবে কথা বলল? নাকি ছেলের ভুল চোখে পড়ে না? ”
আসলাম চৌধুরী বড় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
” বাদ দেও ভাইজান। তূর্য সব সামলে নিবে । আমার ভরসা আছে । তুমি খাও ” আর মারুফা বেগমের দিকে তাঁকিয়ে বললেন,
” তূর্যকে তো আর আনা যাবে না।মেয়েকে ডেকে খেতে দেও।”

ঘড়ির কাঁটায় এখন রাত বারোটা বেজে ঊনিশ মিনিট। পুরো বাড়ি ভূতুড়ে হয়ে আছে। কোনো ঘরে কোনো আলো নেই।রাতের খাবার শেষে যে যার রুমে চলে গিয়েছে অনেকক্ষণ-ই হয়েছে।
এই মুহূর্তে তূর্য নিজ কক্ষের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। অমাবস্যায় ঢাকা ঘুটঘুটে অন্ধকার আকাশের দিয়ে চেয়ে রয়েছে। মুখের অভিব্যক্তি একদম স্বাভাবিক।আর ভিতরের খবর কে রাখে? রাতের অমাবস্যা সবাই দেখছে । হৃদয়ের অমাবস্যা কে দেখে? যে দেখবে সে কি আদেও দেখার চেষ্টা করে? নাকি বোঝার চেষ্টা করে?
নারীর রাগ-অভিমান ভাঙানোর গুরু দায়িত্ব নিয়ে পৃথিবী এসেছে পুরুষ। তাদেরটা দেখার কে আছে?তাদের বোঝার কে আছে?
তূর্যের অতশত ভাবনার মাঝে দরজায় কট করে শব্দ হলো। কে এসেছে বুঝতে বাকি রইলো না ওর। হয়তো এতক্ষণ ধরে তার অপেক্ষাতেই ছিল। সে নিরিবিলি হেঁটে বিছানার কাছে গেল। আহির হাতে খাবারের প্লেট।তাতে সুন্দর করে ভাত, তরি-তরকারি দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে এসেছে। স্বামীর কাছে এসে মৃদু কন্ঠে বলল,
” খেয়ে নিন তূর্য ভাই ”
তূর্য খাটে ওঠার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল ওর কথা শুনে এক মুহূর্ত থমকালো । তারপর কোনো বাক্য ব্যয় না করে শুয়ে পড়ল।মেয়েটা তবুও হার মানলো না।ভেজা গলায় পুনরায় বলল,
” দয়া করে খেয়ে নিন ”
” তোর কাছে খেতে চেয়েছি আমি? ” রাশভারী কন্ঠে বললো তূর্য।
” ইলিশ মাছ আমি রান্না করেছিলাম বলে আনিনি।আর খাবার বড়মা তুলে দিয়েছে।আমি শুধু প্লেটটা-ই ধরে নিয়ে এসেছি।”

” এনেছিস কেন? আনতে বলেছি? ”
আহি এবার খাবারের প্লেটটা বেড সাইড টেবিলের উপর রেখে এগিয়ে গেল তূর্যের কাছে। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
” আমি স্যরি,তূর্য ভাই ! আমি …আমি বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা এত সিরিয়াস হয়ে যাবে। আর কখনো এমন করবো না, ক’সম করে বলছি। ”
মেয়েটা যথাসাধ্য চেষ্টা করলো নিজের দিকটা বোঝানোর। নিজের ভুলও স্বীকার করলো। কিন্তু কিছুতেই যেন তূর্যের মন গললো না। অনুভূতিহীনভাবে শুয়ে রইলো সে। কিছু কিছু সময়ে নিজের প্রিয় মানুষের সাথে ইচ্ছা করেই দূরত্ব বাড়ানো উচিত।তাকে উপলব্ধি করতে দেওয়া উচিত তোমার গুরুত্ব তার জীবনে ঠিক কতটুকু।
চোখ মুছতে মুছতে বিছানা হতে নেমে পড়ল আহি। দরজা লক করার উদ্দেশ্যে কিছুটা এগোতেই আ’র্তনাদ করে উঠলো। তূর্য এবারে তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে উঠে বসলো।ড্রিম লাইটটাও বন্ধ।ফলস্বরূপ রুমের কিছুই স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান নয়। উতলা হয়ে বলল,

” আহি? কি হয়েছে? কোথায় তুই? ”
বলতে বলতে রুমের লাইট অন করলো সে। সাথে সাথে চোখ পড়ল প্রেয়সীর দিকে । এক হাতে বাম পায়ের আঙুল চেপে মেঝেতে বসে আছে সে।আরেক হাতে মুখ চেপে কাঁন্না আটকাচ্ছে । দ্রুত ছুটে গেল ও। হাঁটু গেঁড়ে ‌আহির সামনের মেঝেতে বসে পড়ল।চোখ-মুখে আ’তঙ্কের ছাপ। বৃদ্ধা আঙুলটাকে ছাড়ালো মেয়েটার হাত থেকে। সাথে সাথে রক্ত গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। ড্রেসিং টেবিলের কোণায় লেগে খানিকটা কাঁচা নখ উঠে গিয়েছে।
তূর্য ব্য’থিত কন্ঠে বলল,
” একটু সাবধানে চলাচল করতে পারিস না? ”
অতঃপর পাজকোলা করে খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসলো প্রেয়সীকে। ফার্স্ট এইড বক্স এনে খুব সাবধানে ড্রেসিং করতে লাগলো। মুখটা এখনো গম্ভীর করে রেখেছে। অথচ ফুঁ দিয়ে দিয়ে পরম যত্নের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।এমন যেন ব্যথা আহির নয় ওর লাগছে। নিজের কাজ শেষে উঠে দাঁড়ালো সে। সাথে সাথে আহিও উঠে দাঁড়ালো। আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরলো মানুষটিকে। বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁন্না জুড়ে দিল। তূর্য না ওকে নিজের হতে ছাড়ালো, আর না আগলে ধরলো। মেয়েটা ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে বলতে লাগলো,

” আপনি ইগনোর করলে আমার কষ্ট হয় তূর্য ভাই। কিচ্ছু ভালো লাগে না। সারাক্ষণ ব’কুন সেটাও ভালো।কিন্তু এমন ব্যবহার করবেন না। তাহলে আমি ম’রে যাব। সত্যিই ম’রে যাব। এই একটা বেলায়-ই আমি হাঁপিয়ে উঠেছি।এইযে নখ উঠে গিয়েছে না? বিশ্বাস করুন আমার একটুও ব্যথা লাগছে না।কিন্তু আপনার এই ব্যবহারে আমার কলিজা ছিঁ’ড়ে যাচ্ছে। আপনি যেটা বলবেন সেটা হবে । আমি কখনো বাঁধা দিবো না । আমি…..”
ওকে থামলো তূর্য। জোর হাতে নিজের থেকে ছাড়িয়ে বলল,
” আর কতভাবে ইনসাল্ট করবি আহি? ওসব নিয়ে কে রাগ করেছে ? হ্যাঁ, খারাপ লেগেছিল,দুই মিনিট পর ঠিকও হয়ে যেত। কিন্তু তুই সেসব বাড়ি ভরে বলে বেড়াবি? কোনো প্রাইভেসি নেই আমাদের ? ”
” আমি কাউকে কিচ্ছু বলিনি ” নাক টেনে টেনে বলল মেয়েটা।
” তাহলে তারা জানলো কীভাবে?আম্মু কেন আমাকে ডেকে প্রশ্ন করলো? আমাদের মধ্যে কিছু হয়েছে কিনা জানতে চাইলো? ”
” আমি জানি না তূর্য ভাই ”
” এখন তুই কি বলতে চাইছিস? তারা অন্তর্যামী? ” বলে এক মুহূর্ত থামলো তূর্য।বুঝতে পারলো বেশি রুড হয়ে যাচ্ছে। জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ঠেলে নিজেকে শান্ত করলো।অতঃপর বলল,
” আচ্ছা, থাক ওসব। রাত বাড়ছে শুয়ে পড় ”
পরপর আলো নিভিয়ে নিজে শুয়ে পড়লো। কিয়ৎক্ষণ বাদে আহিও শুয়ে পড়লো। তবে কান্না এখনো থামেনি। ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কান্না করেই যাচ্ছে। এদিকে তূর্য না পারছে মেয়েটার কাঁন্না সহ্য করতে আর না পারছে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে।সে গম্ভীর গলায় বলল,
” কাঁন্না বন্ধ করবি তুই ? ”

এতে মেয়েটার কাঁন্নার‌ বেগ আরো বাড়ল। সমানে হেঁচকি তুলে চলেছে। এতক্ষণ তূর্য সিলিংয়ের দিয়ে মুখ করে শুয়ে থাকলেও এবারে উল্টো পাশ ঘুরে শুলো।কাঁন্না করতে করতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে গেল মেয়েটা। রুম পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে গেলে চোখ খুলল তূর্য। খুব সাবধানে নড়ে-চড়ে প্রেয়সীর দিকে ঘুরলো। নোনাজল চোখের কার্নিশে সরু ও লম্বা দাগ করেছে। কাঁন্নার তোপে পুরো মুখ এখনো ফুলে আছে। চোখের উপরে খেলা করা বেবি হেয়ারগুলো আলগোছে কানে গুঁজে দিল তূর্য। এক বুক কষ্ট নিয়ে আফসোস করলো,
” তুই আমাকে কোনোদিন বুঝলি না আহি।জানি না কোনোদিন বুঝবিও কিনা। কখনো কখনো দূরত্ব সম্পর্কের গভীরতা বোঝায়।আমরা নাহয় সেটা-ই করি। ”
” আপনি আমাকে মোটেও ভালোবাসেন না তূর্য ভাই। ”
ঘুমের মধ্যে প্রলাপ বললো আহি। তা শুনে তাচ্ছিল্য হাসলো তূর্য।বলল,
” আমাকে নিয়ে খুব অভিযোগ তোর?ভালোবাসি না তোকে।বিকজ ভালোবাসি বলি না ।  তবুও আমি দুই-একবার হলেও বলেছি।তুই কয়বার বলেছিস আমাকে? আমার কি ইচ্ছে করে না তোর মুখে ভালোবাসি শুনতে? নাকি আমার এসব অনুভূতি নেই?”
অতঃপর একটু থামলো সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

” তোর যদি মনে হয় তোকে আমি ভালোবাসি না।তাহলে বাসি না। তোর সাথে জীবন জড়ানোর কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না আহি,ট্রাস্ট মি। অনেক ট্রাই করেছি নিজেকে বোঝানোর। বারবার ব্রেইনকে বুঝিয়েছি চাচাতো বোন আর আপন বোনের মধ্যে কোনো ডিফরেন্ট নেই। বাট হা’র্ট কিছুতেই মানতে চায়নি। ভেবেছিলাম সময়ের সাথে সাথে হয়তো অনুভূতি মিঁইয়ে যাবে।কিন্তু না! ডে বাই ডে বাড়তে শুরু করলো। দ্যান আর নিজেকে আটকানোর ট্রাই করিনি। শুধু ওয়েট করে গেছি কবে তুই একটু ম্যাচিউর হবি। বাট,আপনি তো আলালের ঘরের দুলালি। তাই বাধ্য হয়ে উপন্যাসের বই গিফট দিলাম। জাস্ট ভালোবাসা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্যে।ভালোবাসা বলে কিছু পৃথিবীতে এক্সিস্ট করে সেটা বোঝানোর জন্যে। কিন্তু আপনি কি করলেন? কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিলেন। খুব রাগ হতো তখন। তবে উপকার-ই হয়েছে। এ্যাট লিস্ট ফিকশন্যাল ম্যানের সাথে আমাকে কম্পেয়ার তো করেছিলি। ” এবারে একটু হাসলো তূর্য। বলল,

” একটা ফানি স্টোরি শুনবি? তুই যখন বারবার এসে আমাকে বলতিস আমার বিহেভ তোর ওই ফিকশন্যাল ম্যানের মতো।তখন ওই সেইম বই আমি কিনে এনে পড়া শুরু করি। জাস্ট ট্রাই করছিলাম নায়িকাকে মনে ধরানো যায় কিনা। কিন্তু তার আগেই যে এই মন একটা আধ পাগলা রমণী দখল করে বসে আছে । উপন্যাসের মেয়েটা খুব ম্যাচিউর ছিল।এদিকে আমার তো এই ইমম্যাচিউর তোকে ভালো লাগে। তোর পাগলামি ভালো লাগে। হুটহাট মুখ ফুলিয়ে রাখা তোতা পাখিটাকে ভালো লাগে। ”
আবারো থামলো সে। ফিসফিস করে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৬

” আরেকটা সিক্রেট শোন, কি ভাবতিস? তুই আমার রুমে আসলে আমি বিরক্ত হতাম? ভুল জানতিস জা’ন। বরং তুই রুমে না আসলে আমি বিরক্ত হতাম। ”
পরপর আবার গম্ভীর হলো সে,
এরপরেও যদি তোকে ভালোবাসা না হয় তাহলে আমি বাসি না। আর না কখনো বাসতে পারবো। সারাদিন মুখে ‘ ভালোবাসি ‘ ‘ভালোবাসি ‘ বলে ভালো আমি কোনোদিন বাসতে পারবো না। ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৮