হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩৫
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
দীর্ঘ তিন বছর অন্তর মির্জা বাড়ির বড় ছেলে অর্থাৎ নাজমিন বেগমের একমাত্র সুপুত্র আজ বাড়ি ফিরতে চলেছে। সাথে বাড়ির একমাত্র মেয়ে ইকরাও আজই জামাই নিয়ে বাড়িতে আসছে। সবকিছু মিলিয়ে মির্জা নিবাসে আজ ছোটখাটো আয়োজনের তোড়জোড় চলছে। কর্তিদের হাত থেকে যেন কাজ পড়ছেই না। আনন্দে আনন্দে ভরে উঠেছে বাড়ির প্রতিটি কোণ।
এতো এতো খুশির বিপরীতে বিরক্তির সাথে বারান্দায় মিঠুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কৃশান। নিজের চরম শত্রুর আগমনে মা- চাচিদের এমন আদিখ্যেতায় মোটেও খুশি হতে পারছে না সে। বন্ধুরা ট্যুরে থাকায় বাইরেও বের হতে পারছে না। আর নাতো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। কারণ ঐদিন রাতে সবগুলোকে ঘুমের মধ্যে রেখেই বাসায় ফিরে এসেছে সে। এখন এদের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়া মানেই নিজের মুসিবত ডেকে আনা।
এর মাঝেই ব্যস্ত পায়ে মিঠুর খাবার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল হুমায়রা। মিঠুকে কৃশানের কাছে দেখে সেদিকেই এগিয়ে গেল। খাবারটা সামনে দিয়ে পুনরায় কক্ষ ত্যাগ করার উদ্দেশ্যে পা চালাতেই পিছু ডাকল কৃশান,
“ এই হুজুরনী, আবার কোথায় যাচ্ছিস? ”
“ আর কোথায়! রান্নাঘরেই যাচ্ছি। ”
“ দরকার নেই! ”
ভ্রু বেঁকে গেল রমণীর। খানেক আশ্চর্যের কণ্ঠে বলল,
“ মানে! ”
“ মানে তুই আজকে রান্না করবি না। ”
“ কেন? ”
“ কারণ আমি নিষেধ করেছি। তুই ঐ লাফাঙ্গার জন্য আজকে রান্না করবি না! ”
কৃশান কাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলেছে বুঝতে বেগ পোহাতে হলো না হুমায়রার। শান্ত কণ্ঠে বলল,
“ আমি কি শুধু তাঁর জন্য রান্না করছি? ইকরাও তো আসছে সাথে ঘরের সবায়ই তো খাবে। ”
“ এতো কথা বলতে বলেছি তোকে! বলেছি রান্না করবি না মানে করবি না! ”
ঠোঁট উল্টাল মেয়েটা। খানেক এগিয়ে এসে দাঁড়াল মানুষটার মুখোমুখি। বলল,
“ আপনি এমন কেন? ”
“ কেমন? ”
“ এইযে এরকম করছেন আপনাকে পুরো হিংসুটে মনে হচ্ছে। ”
হুমায়রার কথায় তেমন একটা রিয়েক্ট করল না কৃশান। চুপচাপ নুয়ে মিঠুকে ফ্লোরে বসিয়ে দিলো। পরপর সোজা হয়ে একেবারে মেয়েটাকে ঘেঁষে দাঁড়াল। কিছুটা ঝুঁকে ভারী স্বরে বলল,
“ মনে হওয়ার কিছু নেই, আমার সবটাই হিংসুটে স্বভাবে ভরপুর তবে সেটা শুধু তোকে ঘিরে। তোর ক্ষুদ্রাতিক ক্ষুদ্র ব্যাপারেও কারো উপস্থিত আমাকে হিংসার আগুনে পোড়ায়। সুতরাং ঐ লাফাঙ্গার বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে তুই আজকে রান্না করবি আর তোর রান্ন খেয়ে ঐ লাফাঙ্গা প্রসংশা করবে- এটা আমার সহ্য হবে না! ”
হুমায়রার চকিত দৃষ্টি খুব কাছ থেকে পরখ করতে লাগল মানুষটাকে। মানে লোকটা এতোটা জেলাস তাকে নিয়ে? অথচ নিজে তো কখনো তার রান্না মুখেই নেয় না। আর মানুষ খেয়ে প্রশংসা করলেও দোষ! মেয়েটা হুট করেই বলে বসল,
“ আমি মানুষের জন্য রাঁধতে পারব না তো কার জন্য রাঁধব? আপনি তো ঘরে খাবারই খান না! ”
উত্তর কিয়ৎক্ষণ নীরব রইল কৃশান। পরপর হুমায়রার কৌতূহলী দৃষ্টির পানে চেয়ে উত্তর করল,
“ আচ্ছা, এখন থেকে নাহয় ঘরেই খাবো। তবে হ্যাঁ, খাবার কিন্তু তুই খাইয়ে দিবি। ”
কৃশানের প্রথম কথাটা শুনেই খুশিতে গদগদ হুমায়রা। শেষের কথাটা এক প্রকার কানেই নিলো না। ওমনিই স্বীকারুক্তি দিয়ে দিলো,
“ ঠিক আছে। ”
মেয়েটার উচ্ছাসিত চেহারা দেখে কিঞ্চিৎ হাসল কৃশান। পরক্ষণেই নির্দিষ্ট দূরত্বে এসে আদেশ ছুঁড়ল,
“ যা এবার লক্ষ্মী বউয়ের মতো স্বামীর জন্য রান্না শুরু কর গিয়ে। ”
“ কি কি খাবেন আপনি? ”
“ তোর যা ভালো লাগে তাই কর। ”
কথা বাড়াল না হুমায়রা। স্বামীর কথা মতোই রান্না ঘরের দিক হাঁটা ধরল।
প্রতিদিন রান্না বান্নার কাজ হুমায়রার হাতে তুলে দিলেও আজকে তা নিজ হাতে তুলে নিলেন নাজমিন বেগম। ছেলের যত পছন্দই পছন্দের খাবার আছে সবকিছু নিজ হাতেই তৈরির করতে লাগলেন। পাশে সবকিছু এগিয়ে দিচ্ছেন ইয়াসমিন বেগম। রান্নাঘরে পৌঁছে সে দৃশ্য দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল হুমায়রা। এগোতে নিবে তখনি সহসা পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরল কেউ। পরপরই কর্ণপাত হলো ইকরার উচ্ছাসিত স্বর,
“ সখি……”
পরিচিত কণ্ঠ শুনে নিজেকে ধাতস্থ করল হুমায়রা। ঠোঁটে ফুটল মিষ্টি হাসি। উত্তর করল,
“ হুম সখি, কেমন আছিস তুই? ”
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুই? ”
“ আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ”
মেয়ের কণ্ঠে শুনে তড়িৎ ঘুরে তাকালেন দুই জা। তৎক্ষনাৎ তাদেরকেও গিয়ে জড়িয়ে ধরল ইকরা। পরপর মা – বড়ো মার উদ্দেশ্যে বলল,
“ কেমন আছো তোমরা? ”
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আম্মু, তুমি কেমন আছো? ”
“ আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ”
“ জামাই বাবা কোথায়? ”
“ ড্রয়িং রুমে। ”
সাথে সাথেই মেয়েকে ছেড়ে সেদিকে এগিয়ে গেলেন তারা। ওদিকে মহিলাদের উপস্থিতিতে ড্রয়িং রুমে অন্যদিক ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিল উমর। যদিও এখান থেকে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না তবুও নিজের নজর সংযত রাখল সে। ইয়াসমিন বেগম এসেই তাকে উদ্দেশ্যে করে বললেন,
“ আরে এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন বাবা! ”
শাশুড়ির গলায় সামনে ফিরল উমর। বিনয়ী স্বরে শাশুড়িকে সালাম চুকল। জিজ্ঞেস করল,
“ কেমন আছেন আম্মাজান? ”
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো বাবা। ”
সালামের উত্তর নিয়ে বললেন ইয়াসমিন বেগম।
“ এইতো আলহামদুলিল্লাহ। ”
হাসিমুখে জবাব দিলো উমর। পরপর একই ভাবে নাজমিন বেগমকেও ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করল। ততক্ষণে সেখানে উপস্থিত হলো ইকরা। তাকে দেখতেই ইয়াসমিন বেগম তাগদা দিয়ে বললেন,
“ জামাইকে নিয়ে রুমে যা, বোরকা খুলে রেস্ট কর গিয়ে। ”
“ হুম যাচ্ছি। ”
বলেই উমরের সাথে রুমে চলে গেল ইকরা।
সূর্য্য তখন প্রায় মধ্য গণনে চলে আসছে। বেলা গড়িয়েছে বেশ। ঘড়িতে তখন আনুমানিক এগারোটার কাছাকাছি বাজে। রাস্তা দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে হেঁটে চলছে দুজন রমণী। বয়স বিশের কৌটায় পৌঁছেছে। তন্মধ্যে আরিয়া নামক মেয়েটি বলল,
“ তো এখন কি সিদ্ধান্ত নিলি তুই? ”
উত্তরে শুনা গেল অপর রমণীর নির্লিপ্ত স্বর,
“ কি করব মানে কি? ঐ লোককে আমার ছোট থেকেই পছন্দ না। আর সবচেয়ে বড় কথা, ঘরের পাশে ঘর! এতো কাছাকাছি বিয়ে করতে যাব নাকি আমি আজব! ছোটবেলা ঐ লোকের সাথে খেলার সময় কতো মারপিটও করেছি আমি। কারো সাথে না পারলে তিনি তখনো নিজের মাকে এনে লাগিয়ে দিতেন! মানে জাস্ট অসহ্য! আমি ছোট থেকেই উনার মেরুদণ্ড হীন আচরণের জন্য উনাকে দেখতে পারিনা। হ্যাঁ, আম্মু- আব্বুর কাছে উনার এই দিকটা ভালো মনে হলেও আমার কাছে বিরক্ত লাগে। আবার সে নাকি অনুষ্ঠান করে বিয়ে করবে না। মানে সবকিছু আমার চয়েজের বাহিরে! আমি জিনিয়া রহমান কখনোই ঐ মদন আলভি মির্জাকে বিয়ে করবো না। ”
রহমান বাড়ির একমাত্র আদরের মেয়ে জিনিয়া রহমান। অতিরিক্ত আদরে বড় হয়েছে বিদায়ই রাগ, জেদ বড্ড বেশি তার। ভার্সিটির প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করে সে। দেখতে অসম্ভব সুন্দরী। একপ্রকার ছেলেদের লাইন লেগে থাকে তার পিছনে। গতকাল রাতে হঠাৎ করেই তাকে জানানো হয় যে,পাশের বাড়ির সে অসহ্য আলভি মির্জার সাথেই নাকি মা
– বাবা তার বিয়ে ঠিক করে রেখেছে। আজকেই বিদেশ থেকে ফিরছে সে। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই তার বিয়ে। মাকে সাথে সাথেই না করে দিয়েছে জিনিয়া। তবে ভদ্রমহিলা মানতে নারাজ। বান্ধবীর থেকে সব ঘটনা শুনে বলার মতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না আরিয়া। সে অসহায় কণ্ঠে বলল,
“ কি বলবো বুঝতেছি না, তোর যা ভালো মনে হয় তাই কর আমি পাশে আছি। ”
“ হুম, দেখছি কি করা যায়। আম্মু না মানলে ভাবছি ঐ মদন লোকের সাথেই কথা বলে বিয়েটা ভাঙব। ”
“ হ্যাঁ, এটা করলে পারিস। ”
যোহরের সালাত শেষে কৃশানের জন্য খাবার হাতে কক্ষে প্রবেশ করল হুমায়রা। তখন নাজমিন বেগমের রান্না শেষে কৃশানের জন্যে তার পছন্দের শুকনো মরিচের ভর্তা ও চিংড়ি মাছ রান্না করেছে সে। ইকরার থেকে জেনেছে মাছ, মাংস কৃশানের খুব একটা পছন্দ না। এই দুটো জিনিসই বেশি পছন্দ করে সে। রান্নার পুরোটা সময় ইকরা হুমায়রার পাশেই ছিল। আর বিভিন্ন গল্প করেছিল দুই বান্ধবী। মাত্রই একসাথে সালাত আদায় করে নিজের রুমে গিয়েছে ইকরা।
দরজায় হুমায়রার অবয়ব নজরে আসতেই সটান দেহে শুয়া থেকে উঠে বসল কৃশান। হাতে থাকা ফোনটা সাইডে রেখে বলল,
“ কাম হ্যায়ার বাইকো…..”
বাইকো শব্দটা শুনে পূর্বের মতোই ভ্রু কুঁচকালো হুমায়রা। কৃশানের নিকট এগোতে এগোতেই প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ বাইকো মানে কি? ”
“ বাইকো মানে তুই আর তুই মানেই বাইকো! ”
“ আরে বাইকো শব্দের অর্থ টা কি সেটা বলুন না! ”
“ কিছুনা। ”
খাবারগুলো একটা সাইডে রাখল হুমায়রা। কৃশানের মুখ থেকে কথাটা বের করতে পারবে না এটুকু বুঝে গেছে মেয়েটা। তাই আর বৃথা চেষ্টা না করে বলল,
“ নিন খেয়ে নিন। ”
নিজের প্রিয় খাবারগুলো সামনে দেখে ঠোঁটে হাসি ফুটল কৃশানের। বলল,
“ খাবার তো ভালোই রেঁধেছিস মনে হচ্ছে, এবার খাওয়ানো শুরু কর। ”
কৃশানের কথা বোধ হয় পুরোপুরি বিশ্বাস হয়নি হুমায়রার। সে দ্বিধান্বিত চোখে চেয়ে রইল মানুষটার দিক। ওমনিই ধমকে উঠল কৃশান,
“ কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কি বললাম- খাইয়ে দে! ”
তৎক্ষনাৎ বসে পড়ল মেয়েটা। ব্যস্ত হাতে খাবার মাখিয়ে নিলো। পরপর লোকমা ধরল স্বামীর সামনে। কোনারূপ ভণিতা হীন মুখে খাবার পুরল কৃশান। হুমায়রার দৃষ্টি এলোমেলো, লোকমা নেওয়ার সময় যতবার মানুষটার ঠোঁট তার আঙুল স্পর্শ করছে ততবারই শরীর ময় শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। বারবার ঢোক গিলে নিজের অস্বস্তি ভাবটা স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাল মেয়েটা। এর মাঝেই কৃশান প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ তুই খেয়েছিস? ”
“ না, আপনাকে খাইয়ে গিয়ে খাব। ”
“ দরকার নেই, এখান থেকেই খা। ”
চকিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মানুষটার দিক তাকাল হুমায়রা। এবার চোখ ইশারা করে তাকে খেতে বলল কৃশান। খানেক সময় নিয়েই মুখে খাবারটা পুরল রমণী। ভিতরে কাজ করল এক অদ্ভূত ভালোলাগা। আজকে আরও একটা স্বপ্ন পূরণ হলো তার- স্বামীর সঙ্গে একই প্লেটে সুন্নতি খাবার খাওয়ার আশা। যা এতো তাড়াতাড়ি পূরণ হয়ে যাবে ভাবতেও পারেনি সে। কিছুদিন আগেও তো তার মুখে খাবারের কথা শুনলেই ধমকাতো কৃশান। আর আজ! তার সাথে, এমনকি তার হাতেই খাবার খাচ্ছে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে আসলো ধরণীতে। তখনি মির্জা নিবাসের লোহার গেইট পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল একটা চকচকে সাদা প্রাইভেট কার। বাড়ির মূল ফটকের সামনে এসে গাড়িটা থামাতেই পেছনের দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো স্যুট বুট পড়া এক সুদর্শন যুবক। সামনে নিজের অতি পরিচিত বাড়িখানা দৃশ্যমান হতেই ঠোঁটে হাসি ফুটল যুবকের। হাস্যোজ্বল মুখে এক পা এগোতেই কর্ণপাত হলো জন্মদাত্রীর সেই মায়াময় স্বর,
“ আমার আলভি, বাবা আমার! ”
সবেগে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন নাজমিন বেগম। পরপর ইয়াসমিন বেগমও ছুটে এলেন। দুহাতে মা – চাচিকে জড়িয়ে ধরল আলভি। মুচকি হেসে বলল,
“ কেমন আছো তোমরা? ”
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো বাবা, তুই কেমন আছিস? আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো? ”
উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন ইয়াসমিন বেগম। নাজমিন বেগমের চোখে ততক্ষণে অশ্রুরা ভিড় করেছে। নিজের আদরের ছেলেকে এতবছর পর কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছেন তিনি। কথাই বলতে পারছেন না একপ্রকার। ছেলের কপালে চুমু খেলেন তিনি। আঁচলে চোখ মুছে বললেন,
“ কত বড়ো হয়ে গেছে আমার বাবা টা! ”
মায়ের আহ্লাদী কথায় বরাবরের মতোই হাসল আলভি। পৃষ্ঠে বলল,
“ ঘরের বাইরে রেখেই কি সব ভালোবাসা দিবে? ঘরে ঢুকতে দিবে না? ”
ছেলের কথায় কান্নার মাঝেই হেসে ফেললেন নাজমিন বেগম। পরপর ছেলেকে নিয়ে হাঁটা ধরলেন। ইয়াসমিন বেগম আলভির থেকে লাগেজগুলো নিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। আলভি একাই ফিরেছে। তাকে আনতে যায়নি কেউ। কৃশানকে যাওয়ার কথা বলেছিল তবে সে ঘাড়ত্যাড়া জনাব যায়নি।
ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে আলভি। মাত্রই ফ্রেস হয়ে মায়ের ডাকাডাকি তে আবারও নিচে আসতে হয়েছে তাকে। ভেবেছিল একটু রেস্ট নিয়ে তারপর নিচে আসবে। তবে নাজমিন বেগমের এক কথা- খাওয়ার পর রেস্ট নেওয়া যাবে। অগত্যা আর রুমে থাকা হলো না তার। আলভির পাশেই উমর বসে আছে। কৃশান ও হুমায়রা ব্যতীত বাদ বাকি সবার সাথেই সাক্ষাৎ হয়ে গেছে আলভির। সবার সাথে কথা বলেই রুমে গিয়েছিল সে। তবে কৃশান এখনো রুম থেকে বের হয়নি। তাই আলভিও আলাদা ভাবে কৃশানের খুঁজ করেনি। উমরকে ডেকে এনে তার সাথেই কথাবার্তা বলছে।
এর মাঝেই বাইরে বেরোনোর উদ্দেশ্যে সেখান দিয়ে যাচ্ছিল কৃশান। আশেপাশের কোনোকিছু তেই তোয়াক্কা নেই তার। হাতে থাকা ব্রেসলেট টা ঠিক করছে আর সামনে এগোচ্ছে সে। তখনি তাকে পেছন থেকে ডেকে উঠল আলভি,
“ কিরে কৃশান, কি অবস্থা তোর? কেমন আছিস? ”
পরিচিত মুখে অপরিচিত শব্দ গুলো শুনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফিরে চাইল কৃশান। ডান ভ্রু খানা উঁচু করে পর্যবেক্ষণ করল নিজের সবচেয়ে পছন্দের ব্যক্তিকে। তার চাহনির ধরণ দেখে বোধ হয় মজা পেল আলভি। আরেকটু জ্বালানোর আশায় বলে উঠল,
“ ও’পস স্যরি, বখাটে কৃশান! কেমন আছিস তুই? ”
তার বরাবর সোজা হয়ে দাঁড়াল কৃশান। খাটি অশুদ্ধ ভাষায় জবাব দিলো,
“ তোরে কেন কইতে যামু? কইলে কতো টাকা দিবি? বখাটে দের সম্পর্কে কিছু জানতে হলে টাকা দিতে হয়! ”
উমরের সামনে কৃশানের এমন ত্যাড়া উত্তরে কিছুটা থতমত খেয়ে গেল আলভি। তবে তা প্রকাশ না করে উল্টো দীর্ঘশ্বাসের অভিনয় করে বলে উঠল,
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩৪ (৩)
“ মানুষ হলি না তুই! ”
“ মানুষ হলে টাকা দিবি? তোর সাথে আমার মানুষ হওয়া লাগবো না।”
পৃষ্ঠে বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না আলভি। বরাবরের মতোই কৃশানের সাথে কথায় আজও হেরে গেল সে। এইদিকে দুভাইয়ের কথা বার্তায় নীরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে রইল উমর। কৃশানের উত্তর শুনে হতবিহ্বল হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ওসব তোয়াক্কা করল না ছেলেটা। ধুপধাপ পায়ে নিজ গন্তব্যে হাঁটা শুরু করল। সেদিকে বিরক্তি চোখে চেয়ে রইল আলভি।
