প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৯
বন্যা সিকদার
পুরো ক্লাসরুম জুড়ে চিৎকার‚ চিল্লাচিল্লি আর হট্টগোলে কান পাতা দায়। আজ তাদের ফিজিক্স ক্লাসের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একজন প্রফেসর আসার কথা রয়েছে। কিন্তু কে সেই প্রফেসর‚ কেমন দেখতে হবেন তিনি এই নিয়ে ক্লাসের সবার মনেই কৌতুহলের শেষ নেই। হঠাৎ মৌ নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড কাম বোন মেহেরে’র কাঁধে ক্লান্ত মাথাটা রেখে মিনমিন স্বরে আওড়াল„ ”মেহু এখন আবার আমাদের হাড়মাস জ্বালাতে কোন নতুন ইবলিশ শয়তান আসবে বল তো ভাই? এই কলেজের প্রিন্সিপাল বুড়োটাও যে কী পায়‚ রোজ রোজ টিচার চেঞ্জ করে।
মেহের নিচু স্বরে জবাব দিলো। “ঠিক বুঝতে পারছি না রে মৌ। তবে ক্যাম্পাসের সিনিয়র আপুদের মুখে শুনলাম‚ আজ যিনি আমাদের ফিজিক্স ক্লাস নিতে আসছেন তিনি নাকি ভীষণ কড়া আর বদরাগী টাইপের মানুষ। কিন্তু মানুষটা নাকি দেখতে অসম্ভব হ্যান্ডসাম আর ড্যাশিং।
মেহেরের মুখে অন্য পুরুষের হ্যান্ডসাম হওয়ার প্রশংসা শুনে মৌ চট করে তার কাঁধ থেকে মাথা তুলে বসল। সে নিজের চোখ দুটো ছোট ছোট বলল‚ “সে যত বড়ই হ্যান্ডসাম হোক না কেন? আমার প্রফেসর সাহেবের মতো হিরো কিন্তু এই দুনিয়ায় কেউ হবে না বুঝেছিস? কিন্তু একটা জিনিস ভাব তো মেহু‚ আমার ওই খিটখিটে প্রফেসর সাহেব ঠিক কোন কলেজের প্রফেসর বল তো? আজ তো ওনারও ভার্সিটির প্রথম দিন।
মেহের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল‚ “আই ডোন্ট নো। কিন্তু তুই তো ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করতে পারতি কোন কলেজের প্রফেসর।
মৌ এবার ভেংচি কেটে মুখটা কালো করে নিলো। “খাটাশ লোক আমায় কিছু বললে তো।
তাদের এই ফিসফিসানির মাঝেই হঠাৎ গম্ভীর মুখে স্বয়ং কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার ক্লাসে প্রবেশ করলেন। প্রিন্সিপাল স্যারকে দেখা মাত্রই পুরো ক্লাসরুমের ওই হইচই এক নিমেষে পিনপতন নীরবতায় রূপ নিল। সব স্টুডেন্ট একসাথে তড়িৎ গতিতে দাঁড়িয়ে পরম শ্রদ্ধায় সমস্বরে বলে উঠল।
“গুড মর্নিং স্যার। হাউ আর ইউ?
প্রিন্সিপাল স্যার নিজের গম্ভীর মুখে খানিকটা কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে দুই হাত তুলে সবাইকে বসার ইশারা করে আওড়ালেন‚ “গুড মর্নিং‚ সিট ডাউন এভরিবডি। তবে সত্যি কথা বলতে আমি তোমাদের ওপর আজ বিন্দুমাত্র খুশি নই। এই বিগত মাত্র কয়েক মাসের ভেতরে তোমাদের এই সেকশনের জন্য আমাকে পুরো ছয়-ছয়জন ফিজিক্স টিচার চেঞ্জ করতে হয়েছে। তোমরা এই ক্লাসের স্টুডেন্টরা সবাই এত বড় মাপের ফাজিল আর বেয়াদব যে তোমাদের যন্ত্রণায় কোনো টিচার এই ক্লাসে টিকতেই চায় না‚ সবাই ইস্তফা দিয়ে চলে যায়।
প্রিন্সিপাল স্যার একটু থামলেন। তারপর ক্লাসের সবার দিকে এক কড়া দৃষ্টিপাত করে আবার বলতে লাগলেন‚ “অবশেষে একজনকে অনেক অনেক রিকোয়েস্ট করার পর তিনি তোমাদের এই ক্লাসের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন। অবশ্য বলে রাখা ভালো তিনি ইন্টারমিডিয়েটের কোনো ক্লাস নেওয়ার জন্য এই কলেজে জয়েন করেননি‚ তিনি মূলত অনার্সের গোল্ড মেডেলিস্ট প্রফেসর। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অনুরোধে তিনি তোমাদের ফিজিক্সের বেসিক ঠিক করতে রাজি হয়েছেন। তবে এখন তোমাদের নিয়ে আমার বড্ড টেনশন হচ্ছে। কারণ আজ যিনি তোমাদের সামনে আসছেন তিনি বড্ড কড়া ধাতের মানুষ‚ ওনার মুখের কথার চেয়ে হাতের অ্যাকশন বেশি চলে! সো এভরিবডি…প্লিজ ওয়েলকাম মিস্টার উজান চৌধুরী!
’উজান চৌধুরী’ নামটা প্রিন্সিপাল স্যারের মুখে শোনা মাত্রই মৌ আর মেহেরে’র চমকে উঠলো। তারা তীব্র এক ধাক্কা খেয়ে চোখ বড় বড় করে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। মেহেরে’র হাতের কলমটা হাত থেকে ফসকে নিচে পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই গাম্ভীর্য নিয়ে ক্লাসরুমে প্রবেশ করল উজান। আজ সাদা শার্ট আর ফরমাল প্যান্টে তাকে দেখতে এতটাই ড্যাশিং আর অসম্ভব সুন্দর লাগছিল যে ক্লাসের প্রতিটা মেয়ে স্টুডেন্ট এক পলকে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। পুরো ক্লাসের মেয়েদের চোখ যেন আজ উজানে’র ওপর গিয়ে একদম আঠার মতো আটকে গেল। প্রিন্সিপাল স্যার উজানে’র কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে সিলেবাস নিয়ে কিছু সময় কথা বললেন এবং উজান’কে ক্লাসের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন।
উজান ক্লাসের পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত নিজের চোখের সানগ্লাসটা খুলল। তারপর ক্লাসের স্টুডেন্টদের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা দিল সাথে সাথে সে নিজেও তীব্র এক শক খেয়ে একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। ক্লাসে ঠিক মাঝখানের ব্রেঞ্চে বসে আছে তার ঘরের বউ মৌ মহাশয়া‚ যে নিজের বড় বড় হরিণী চোখ দুটো মেলে তার দিকেই তপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে। উজান নিজের অজান্তেই একটা ঢোক গিলল। মৌ যে এই কলেজেই পড়াশোনা করে‚ তা উজান আগে জানত না। জানলে নেচে নেচে প্রিন্সিপাল স্যারের রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে আসত না! এতক্ষণ বাড়ির বাইরে এসে একটু শান্তির নিশ্বাস ফেলবে বলে মনের ভেতর যে আনন্দটুকু ছিল।।এখন এই ক্লাসরুমে বউ নামক ‘মোস্ট ডেঞ্জারাস’ মেয়েটাকে নিজের স্টুডেন্ট হিসেবে দেখে উজানে’র গলার জল নিমেষেই শু’কিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
আর এদিকে মৌ নিজের গাল দুটো রাগে রসগোল্লার মতো ফুলিয়ে‚ হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে বেঁধে বরের দিকে চোখ রাঙিয়ে বসে রইল। মনে মনে ভাবল‚ এই খাটাস লোকটা তাকে মনে মনে একটুও ভালোবাসে না। তা তো সে ভালো করেই জানে। কিন্তু তাই বলে কি নিজের বিবাহিতা বউকে এত বড় একটা কথা লুকিয়ে যাবে? তারই কলেজের ফিজিক্স প্রফেসর হিসেবে জয়েন করতে আসছে অথচ তাকে একবারের জন্যও মুখ ফুটে তাকে বলল না। এত বড় ধোঁকাবাজ লোক তো দুনিয়ায় দুটো নেই। পুরো ক্লাসের এই স্তব্ধতার মাঝে মেহেরও নিজের ঘোর কাটিয়ে উঠল। সে চরম বিস্ময় নিয়ে পাশে বসা মৌ’য়ের পাঁজরে নিজের কনুই দিয়ে একটা জোরালো খোঁচা মারল। তারপর উজানে’র দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা মৌ’য়ের কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত ফিসফিসানি স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“মৌ ভাইয়া এখানে কী করছে?
মৌ’য়ের মুখের ভাষা যেন এক নিমেষে হারিয়ে গিয়েছে। সে এখনো নিজের বড় বড় চোখ জোড়া মেলে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সামনের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে থাকা উজানে’র দিকে তাকিয়ে আছে। এরই মাঝেই উজান নিজেকে দ্রুত স্বাভাবিক করে নিল। ক্লাসের বাকি মেয়েদের হা করে তাকিয়ে থাকা আর মৌ’য়ের ওই বোকা বনে যাওয়া মুখ দেখে সে নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চতুর ও মুচকি হাসি ঝুলাল। তারপর ডাস্টার আর চকটা টেবিলের ওপর রেখে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ ও ভরাট গলায় বলতে লাগল।
“হাই এভরিবডি। আমি তোমাদের নিউ ফিজিক্স টিচার উজান চৌধুরী। আজ যেহেতু তোমাদের সাথে আমার ফার্স্ট ক্লাস‚ তাই আমি সরাসরি পড়ালেখায় যাব না। আমি চাই আজ সবাই সংক্ষেপে নিজেদের একটা ফরমাল পরিচয় দাও।
কথাটা শেষ করেই উজান প্রথম বেঞ্চের কর্নারে বসা মেয়েটির দিকে নিজের ধারালো ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে সে এক ভ্রু উঁচিয়ে অত্যন্ত পেশাদার কণ্ঠে বলে উঠল‚ “হেই গার্ল স্ট্যান্ড আপ। হোয়াট ইজ ইয়োর নেম?
উজান মূলত মৌ’কে খেপানোর জন্য এবং ক্লাসের সবার সামনে নিজের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতেই প্রশ্নটা করেছিল। কিন্তু উজান যেদিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করেছিল সে ছিল এই কলেজের সবচেয়ে অহংকারী আর ডানপিটে মেয়ে ললিতা আফরিন। পুরো কলেজে মাসে মাসে মোটা অঙ্কের ডোনেশন দেওয়া মিস্টার আরকাম সাহেবের মেয়ে সে। কলেজের তথাকথিত সুন্দরী ও স্টাইলিশ নারীদের মধ্যে অন্যতম একজন। যার ক্ষমতার দাপটে কলেজের সাধারণ স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে অনেক টিচারও মাথা নিচু করে কথা বলেন নয়তো সামান্য অজুহাতে তাকে সোজা কলেজ থেকে বহিষ্কার করার হুমকি দেওয়া হয়।
বাবা আরকাম আফরিন দেশের নামকরা ও বড় মাপের বিজনেসম্যান হওয়ায় ললিতার অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। মেয়েটা বড্ড একরোখা আর জেদি‚ জীবনে সে যা চেয়েছে তা যেকোনো মূল্যে পেয়েই ছেড়েছে। ললিতা ভাবল এই হ্যান্ডসাম ও ড্যাশিং প্রফেসর বুঝি তার দিকে তাকিয়েই মুগ্ধ হয়ে নামটি জানতে চেয়েছে। সে নিজের ঠোঁটে এক চিলতে চপল হাসি ঝুলিয়ে খানিকটা উজানে’র দিকে ঝুঁকে এলো। এবং আদুরে গলায় বলল‚
”আই অ্যাম ললিতা আফরিন। মিস্টার আরকাম আফরিন সাহেব ওরফে এই কলেজের যিনি মূল প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা‚ আমি ওনার একমাত্র মেয়ে।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৮
ললিতা’র ধারণা ছিল তার বাবার নাম আর বিপুল প্রতিপত্তির কথা শুনলে এই নতুন প্রফেসরও বাকিদের মতো থতমত খেয়ে তাকে সমীহ করা শুরু করবেন। কিন্তু মেয়েটির এই দেমাকী ও বাড়তি উত্তরে উজান বিন্দুমাত্র খুশি হলো না। বরং তার গম্ভীর মুখাবয়ব আরও শক্ত ও শীতল হয়ে উঠল। সে ললিতা’র দিকে এক পলক তাকিয়ে অত্যন্ত কড়া ও গম্ভীর স্বরে ক্লাসরুম কাঁপিয়ে আওড়াল„
“জাস্ট শাট আপ….
