Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১০

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১০

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১০
বন্যা সিকদার

“জাস্ট শাট আপ‚ মিস আফরিন। ক্লাসে অতিরিক্ত কথা একদম অপছন্দ আমার। আমি তোমাকে শুধু তোমার নিজের নামটুকু জিজ্ঞেস করেছি‚ তোমার বাবার নাম কিংবা ওনার সম্পত্তির খতিয়ান জানতে চাইনি। সো‚ বিহেভ ইয়োরসেলফ।
​উজানে’র মতো একজন অত্যন্ত হ্যান্ডসাম কিন্তু কঠোর শিক্ষকের কাছ থেকে পুরো ক্লাসের সামনে এমন অপমানজনক ও কড়া ধমক খাবে‚ তা ললিতা নিজের স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসের সামনে ললিতার অহংকারী ফর্সা মুখের রঙ পাল্টে গিয়ে লাল-কালো হয়ে গেল। অপমানে আর রাগে তার শরীর কাঁপতে লাগল।

উজান ও দ্রুত ললিতা’র সামনে থেকে সরে গেলো। সে এবার এক এক করে ক্লাসের বাকি সকল স্টুডেন্টের কাছে গিয়ে তাদের পরিচয় জেনে নিতে লাগল। এভাবে একে একে সবার পরিচয় নেওয়া শেষ করে উজান এবার ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ঠিক মৌ’য়ের বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়াল। ক্লাসের বাকি সব স্টুডেন্ট উজান’কে সামনে আসতে দেখে সম্মানে দাঁড়িয়ে গেলেও‚ মৌ কিন্তু নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়ল না। সে আগের মতোই গাল দুটো রসগোল্লার মতো ফুলিয়ে অভিমানী মুখ করে বেঞ্চে বসে রইল। পাশে বসা মেহের তাকে কনুই দিয়ে কয়েকবার খোঁচা মেরে দাঁড়িয়ে পড়ার কথা বলল‚ তবুও মৌ উজানে’র ওপর অভিমানে একটুও শুনল না।
​উজান নিজের মুখে চরম গাম্ভীর্য বজায় রেখে ভরাট গলায় মৌ’কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করল।
“মিস তাসফিয়া মৌ প্লিজ স্ট্যান্ড আপ।

​মৌ এবার উজানে’র কড়া ধমক শুনে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে গেল বটে কিন্তু সে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। উজানে’র চোখের দিকে একবারের জন্যও তাকাল না। মৌ’য়ের এমন বাচ্চাদের মতো অভিমানী ও রাগী মুখখানা দেখে উজান নিজের মনের ভেতর এক চিলতে নিঃশব্দে হাসল। তবে ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টরা এবার একদম ড্যাবড্যাব করে উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কারণ‚ মৌ তো এখনো নিজের মুখ ফুটে নামই বলেনি তাহলে এই নতুন প্রফেসর প্রথম দিনেই তার নাম ‘তাসফিয়া মৌ’ কীভাবে নিখুঁতভাবে জানতে পারলেন। সেটাই সবার মাথায় ঢুকছিল না। ​উজান সবার মনের কৌতুহল টের পেয়ে কিছুটা নিচু হয়ে মেঝে থেকে মৌ’য়ের পড়ে থাকা ফিজিক্স বইটা কুড়িয়ে নিল। বইয়ের প্রচ্ছদে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘তাসফিয়া মৌ’। উজান বইটা আলতো করে মৌ’য়ের বেঞ্চের ওপর রেখে ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টদের উদ্দেশ্য করে আওড়াল„
​“লিসেন এভরিবডি। মিস তাসফিয়া মৌ’য়ের নামটা আমি এত নিখুঁতভাবে কীভাবে জানতে পারলাম তা এবার নিশ্চয়ই তোমরা বুঝতে পেরেছো? সো‚ আমার মুখের দিকে ওভাবে হাঁ করে না তাকিয়ে‚ সবাই নিজেদের সামনের বইয়ের দিকে মনোযোগ দাও!

​উজানে’র চতুর বুদ্ধি দেখে ক্লাসের সকল স্টুডেন্ট লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। আর ঠিক সেই সুযোগেই উজান মৌ’য়ের দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে এসে একদম নিচু ও ফিসফিসানি স্বরে কড়া গলায় বলে উঠল।
​“মিসেস চৌধুরী ক্লাস টাইম শেষ হওয়া মাত্রই সরাসরি আমার পার্সোনাল কেবিনে এসে দেখা করবেন‚ নয়তো কলেজের প্রথম দিনেই কিন্তু বড় রকমের পানিশমেন্ট পেতে হবে। মনে থাকে যেন!
​কথাটা বলেই উজান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে এগিয়ে গিয়ে ফিজিক্সের কিছু বেসিক ম্যাথ আর সূত্র বোর্ডে করাতে লাগল। দেখতে দেখতে ক্লাসের নির্ধারিত সময় প্রায় শেষের দিকে চলে এলো। উজান সবার উদ্দেশ্যে কড়া গলায় জানাল।
​“এভরিওয়ান‚ আজ যেহেতু তোমাদের সাথে আমার ফার্স্ট ক্লাস সেই জন্য আজকে আর বেশি কিছু করাচ্ছি না। নেক্সট ক্লাসে আসার আগে বোর্ডে দেওয়া এই ম্যাথগুলো সবাই হোমওয়ার্ক হিসেবে করে নিয়ে আসবে নয়তো ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

​উজানে’র এই কড়া নির্দেশ শোনা মাত্রই ক্লাসের মাঝখানের বেঞ্চ থেকে একটা ছেলে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে অত্যন্ত দেমাকী সুরে বলল‚ “পানিশমেন্ট মানে? কিসের পানিশমেন্টের কথা বলছেন স্যার? এই কলেজের হিস্ট্রিতে আজ পর্যন্ত কোনো বড় বড় টিচারও আমাদের এই সেকশনকে পানিশমেন্ট দেওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেনি। আর আপনি কলেজে পা রাখার কয়েক ঘণ্টাও হয়নি‚ এর মধ্যেই আমাদের পানিশমেন্ট দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন? শোনেন স্যার, আমি হলাম এই এলাকার ওসির ছেলে। আমাকে এসব ফালতু ভয় দেখাবেন না নয়তো আপনার চাকরি…

​ছেলেটির হুমকি মাখা কথা শেষ হওয়ার আগেই উজান বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির কলার চেপে ধরে তার গালে পরপর কয়েকটা সজোরে ঠাসস ঠাসস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ​আচমকা ক্লাসরুমে এমন একটা কাণ্ড ঘটে যাবে তা কেউ ভাবেনি। থাপ্পড় খেয়ে ওসির বখে যাওয়া ছেলে জিহাদ নিজের গাল চেপে ধরে চরম ভয়ে আর আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। পুরো ক্লাসরুম জুড়ে এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা নেমে এলো। যেখানে এই কলেজে জিহাদে’র চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস কোনো সাধারণ স্টুডেন্ট বা কোনো টিচারের হতো না‚ সেখানে এই নতুন প্রফেসর প্রথম দিনেই তাকে সবার সামনে চড় মারল। এটা ভেবেই জিহাদে’র রাগে গা জ্বলছিল কিন্তু উজানে’র রুদ্ররূপ দেখে সে টু শব্দ করার সাহস পেল না। ​উজান এবার বাঘের মতো গর্জন তুলে পুরো ক্লাস কাঁপিয়ে তুললো।

“লিসেন টু মি কেয়ারফুলি। উজান চৌধুরী কারো বাপের কেনা গোলাম নয়। এই ক্লাসের সময়টুকু যেহেতু আমার‚ সো এই ৪টি দেয়ালের ভেতর সবকিছু শুধুমাত্র আমার রুলস অনুযায়ী চলবে। কার বাবা মিনিস্টার‚ আর কার বাবা ওসি এসব ফালতু জিনিস দেখার টাইম বা ইন্টারেস্ট আমার বিন্দুমাত্র নেই। আজ ফার্স্ট ডে বলে তোমাকে শুধু ছেড়ে দিলাম। নেক্সট টাইম যদি আমার ক্লাসে এমন ত্যাড়াবেঁড়ি করো তবে কান ধরে পুরো ক্যাম্পাস এক পায়ে ঘোরটাবো মাইন্ড ইট! আর হ্যাঁ‚ লিসেন গার্লস তোমরা মেয়ে বলে পার পেয়ে যাবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। অন্যায় করলে কাউকে ছেড়ে দেওয়া উজান চৌধুরীর ধাতে নেই‚ মনে রেখো সবাই!
​যে ক্লাসে সবসময় টিচারের চেয়ে স্টুডেন্টদের চিলানোর শব্দে কান পাতা যেত না। আজ সেই ক্লাসের প্রতিটা স্টুডেন্ট একদম মুখে কুলুপ এঁটে বিড়ালের মতো চুপ হয়ে রইল। কারো মুখে একটা কথাও সরল না। এরই মাঝে উজান নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত ক্লাসরুম ত্যাগ করে করিডোর দিয়ে হেঁটে নিজের পার্সোনাল কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।

​ক্লাস শেষ করে উজান নিজের ক্লান্তি দূর করতে যেই না নিজের পার্সোনাল কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেছে‚ ঠিক তখনই হঠাৎ কেউ একজন এসে তীব্র আবেগে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরল। ​উজান মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ ও নিথর হয়ে গেল। তাকে এভাবে হুটহাট হুট করে জড়িয়ে ধরার অধিকার আর পাগলামি শুধুমাত্র তার পুঁচকে বউ মৌ’য়েরই আছে। কিন্তু মৌ তো এখন মাত্রই ক্লাস শেষ করে বান্ধবীদের সাথে ক্লাসরুমে থাকার কথা‚ তাহলে এই বন্ধ কেবিনের ভেতর এত সাহস নিয়ে তাকে কে জড়িয়ে ধরল? ​উজান নিজের সমস্ত পুরুষালী শক্তি দিয়ে নিজেকে সেই বাঁধন থেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। ঠিক তখনই তার কানের কাছে এক চেনা বিষাক্ত মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

​”উজান কেমন আছ তুমি? এতগুলো বছর পর আজ সামনাসামনি দেখেও এভাবে চট করে ভুলে গেলে আমায়?
​কণ্ঠটা শোনা মাত্রই উজানে’র চেনা পৃথিবীর সব আলো যেন এক পলকে নিভে গেল। সে তীব্র এক ঝটকায় মেয়েটিকে নিজের শরীর থেকে দূরে সরিয়ে দিল। মেয়েটির মুখের দিকে তাকানো মাত্রই উজানে’র চারপাশের চেনা জগৎটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। এই তো সেই শিরিন যাকে উজান নিজের তরুণ বয়সে‚ নিজের উদ উদীয়মান যৌবনে প্রথম দেখার পর পাগলের মতো ভালোবেসেছিল। মেয়েটির মুখের অবয়ব এখনো ঠিক আগের মতোই আছে‚ চেহারায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে এক সময় এই মেয়েটিকে উজান যতটা না ভালোবাসত আজ তার চেয়ে কোটি গুণ বেশি ঘৃণা করে। ​যাকে নিয়ে একসময় স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের জীবনের ঘরণী বানানোর হাজারো রঙিন স্বপ্ন বুনত উজান। ঠিক সেই মেয়েটিই একদিন উজান’কে একাকী এক মাঝ দরিয়ায় ফেলে‚ তারই সবচেয়ে কাছের বন্ধুর হাত ধরে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেছিল। আজ দীর্ঘ চোদ্দোটা বছর পর তাদের আবার এভাবে সামনাসামনি দেখা হলো।

​উজানে’র বয়স যখন মাত্র ষোলো। তখন তাদের স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছিল শিরিন। মেয়েটি ছিল উজানে’র চেয়ে তিন বছরের জুনিয়র। প্রথমে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব তারপর ধীরে ধীরে তা এক গভীর ও অন্ধ ভালোবাসায় রূপান্তর হয়। একসাথে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যখন তারা কলেজ লাইফের শেষ প্রান্তে‚ ঠিক তখনই এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র কয়েক মাস আগে শিরিন উজানে’রই পরম বন্ধুর সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নেয়। অথচ উজান তাকে নিজের জীবনের সবটুকু উজাড় করে ভালোবাসত। উজানে’র সাথে শিরিনে’র চার বছরের দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল কিন্তু পরে উজান জানতে পারে তার আড়ালে তার বন্ধুর সাথেই নাকি শিরিনের পাঁচ বছরের গভীর সম্পর্ক ছিল।
​শুধুমাত্র এই একটি মেয়ের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য উজানে’র সাজানো সুন্দর জীবনটা এক নিমেষে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। সে এতটাই মানসিক আঘাত পেয়েছিল যে জীবনের প্রথম পরীক্ষা এইচএসসিতে সেফ ফেইল করে বসেছিল। তারপর বছরের পর বছর একা কেঁদে,‚ নিজেকে পুড়িয়ে সে ধীরে ধীরে মুভ অন করে আজকের এই স্বনামধন্য গোল্ড মেডেলিস্ট প্রফেসর উজান চৌধুরী হয়েছে। এখন সে এই মেয়েটিকে তীব্র ঘৃণা করলেও‚ মনের কোনো এক অন্ধকার কোণ থেকে তার নামটা পুরোপুরি ভুলতে পারেনি।

তবে এই বিগত কয়েকটা দিন ধরে মৌ তার লাইফে আসার পর থেকে এই বিষাক্ত মেয়েটির কথা উজান যেন ভুলেই গিয়েছিল। তার মনেই থাকত না শিরিনে’র কথা। ​উজান’কে ওভাবে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিরিন আবারও এক পা এগিয়ে এসে চোখের জল ফেলে তীব্র আবেগে উজান’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আর ঠিক সেই চরম মোক্ষম মুহূর্তেই প্রফেসরের কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরের রুমে প্রবেশ করল মৌ। ​ভেতরে ঢুকেই উজান আর শিরিন’কে অমন এক অতি ঘনিষ্ঠ ও অপ্রস্তুত অবস্থায় জড়িয়ে ধরে থাকতে দেখে মৌ’য়ের মাথার ওপর যেন আস্ত আকাশটা ভেঙে পড়ল। তার বুকের ভেতরটা এক নিমেষে হাজারটা টুকরো হয়ে গেল। যাকে সে ভালোবাসে‚ সে এখন অন্য একটা অচেনা মেয়ের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ।

মৌ’য়ের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে নোনা জলে ভরে উঠল এবং আপনা-আপনিই দু-ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। ​উজান দরজার দিকে তাকিয়ে মৌ’য়ের ভাঙা চাউনি দেখে পুরোপুরি থমকে গেল। সে তড়িঘড়ি করে শিরিন’কে নিজের শরীর থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইল কিন্তু শিরিন এবার বড্ড শক্ত করে উজান’কে আঁকড়ে ধরে রাখায় উজান তাকে সরাতে ব্যর্থ হলো। আর উজানে’র বুকে অন্য নারীর এই অধিকার দেখা মাত্রই মৌ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের আত্মসম্মান বিলিয়ে দিল না। সে কাঁদতে কাঁদতে তড়িৎ গতিতে কেবিন ছেড়ে করিডোর দিয়ে বাইরের দিকে ছুটে চলে গেল।
​উজান এবার নিজের সর্বশক্তি খাঁটিয়ে শিরিন’কে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিয়ে তার গাল বরাবর দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। ​উজান মুহূর্তের মধ্যেই বাঘের মতো গর্জন করে উঠল। “খা*** তুই কোন সাহসে আমাকে জরিয়ে ধরলি?

​শিরিন হকচকিয়ে গিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল‚ “উজান, তুমি আমাকে থাপ্পড় দিলে? আবার এত নোংরা ভাষায় গালি দিচ্ছো? নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে কেউ কি এভাবে রুড বিহেভিয়ার করে?
​উজান সঙ্গে সঙ্গে শিরিনে’র গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে‚ “তোর মতো বা*** উজান চৌধুরী অন্তত ভালোবাসে না। কালনাগিনী আমি তোকে চোদ্দো বছর আগেই আমার লাইফ থেকে আউট করে দিয়েছি আর আজ এত বছর পর তুই এসে আমাকে ভালোবাসা দেখাচ্ছিস? সর মা***
​উজান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে মৌ’য়ের পিছু পিছু দৌড় দিল কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। করিডোরের শেষ প্রান্তে মেহের’কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উজান উদগ্রীব কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল‚ “মেহের পিচ্চি কোথায়? ওকে দেখেছো?
​ “মৌ তো কাঁদতে কাঁদতে কলেজ গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু ভাইয়া সরি স্যার আপনি মৌ’কে এমন কী বলেছেন যে ও ওভাবে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল? আপনি কি আবার ওকেও থাপ্পড় দিয়েছেন?
“এই মেয়ে তোমার কি সেন্স নেই? আমি কোনো বরদে ওইটুকু একটা মেয়েকে মারতে যাব? তাছাড়া ও তো আমার বউ!
​উজান আর কোনো কথা না বলে বড় বড় পা ফেলে দ্রুত গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। তার দ্রুত চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মেহের মুগ্ধ হয়ে হাসল। অনিচ্ছায় হলেও আজ প্রথমবারের মতো উজান মৌ’কে নিজের ‘বউ’ বলে স্বীকৃতি করলো।

​এদিকে মৌ বাসায় ফিরে নিজের রুমে ঢুকেই একটার পর একটা জিনিস মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে ভাঙতে শুরু করল। পুরো রুম লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। তার চোখ থেকে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বাড়িতে আজ শুধু আরিফুল চৌধুরী‚ তুবা আর মৌসুমি চৌধুরী রয়েছেন; বাকিরা সবাই কাজে বাইরে। তুবা অনেক চেষ্টা করছে মৌ’কে শান্ত করার কিন্তু মৌ তাকে নিজের ধারেকাছেও আসতে দিচ্ছে না। আরিফুল চৌধুরী আর তুবা রুমের দরজার বাইরে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটার হঠাৎ এমন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার কারণ কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।

​মৌ হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে ডুকরে কেঁদে উঠল। তারপর পাশ থেকে একটা ফুলদানি নিয়ে সজোরে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে ছুঁড়ে মারল। ঝনঝন শব্দে সেটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলে উঠল‚ “থাকব না আমি এই বাড়িতে। আমি একটুও থাকব না! আমায় কেউ ভালোবাসে না, আমি চলে যাব এখান থেকে।
​ঠিক সেই মুহূর্তে উজান তড়িঘড়ি হয়ে রুমে প্রবেশ করল। মৌ’য়ের কাছাকাছি আসতেই সে আবারও চিৎকার করে উঠল‚ “একদম আমার কাছে আসবেন না। আমি এই রুমের সব ভেঙে ফেলব‚ কিছু রাখব না। আর চলেই যাবো আমি আপনার জীবন থেকে‚ থাকব না এক মুহূর্তও।
​উজান মৌ’য়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে না‚ কারণ মৌ তার ওপর একে একে জিনিস ছুঁড়ে মারছে। কাঁদতে কাঁদতে মৌ’য়ের মুখটা অনেকটা ফুলে উঠেছে। উজান নরম স্বরে বলল‚ “পিচ্চি,প্লিজ স্টপ। কেন এমন করছ?
​”বললাম না আসবেন না আমার কাছে।
​এই বলেই মৌ উজানে’র শখের টফিগুলো মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলল। রুমভর্তি এখন ভাঙা কাঁচ আর ধ্বংসস্তূপ কিন্তু উজান তবুও শান্ত। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তুবা আর আরিফুল চৌধুরী হা করে তাকিয়ে আছেন। যে জিনিসগুলো উজান ইফাত’কে পর্যন্ত স্পর্শ করতে দিত না ভেঙে যাওয়ার ভয়ে। আজ মৌ সেগুলো ভেঙে ফেলার পরেও উজান একদম চুপ। তার মুখে সামান্যতম রাগের আঁচড়ও নেই। ​তুবা আরিফুল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলো।

“বাবা এসব কী দেখছি? ভাই মৌ’কে এত বড় কাণ্ডের পরেও একটা বকাও দিচ্ছে না।
​ “সেটাই তো ভাবছি আম্মাজান। ছেলেটার আজ কী হলো?
​উজান কয়েক ধাপ এগিয়ে মৌ’য়ের দিকে হাত বাড়াল। মৌ সাথে সাথে ভাঙা কাচের টুকরো হাতে নিয়ে সাথে সাথে আবারও চিৎকার করে উঠল‚ “আসবেন না আমার কাছে। যদি আসেন তাহলে আমি নিজেই নিজেকে আঘাত করব।
​ঠিক সেই মুহূর্তেই উজান বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে মৌ’য়ের হাত থেকে কাচের টুকরো ফেলে দিয়ে নিজের দুই বাহুর মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর মৌ’য়ের কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত আদুরে ও শান্ত স্বরে আওড়াল‚

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৯

“মিসেস উজান চৌধুরী‚ প্লিজ রাগটা একটু কন্ট্রোলে আনেন। আপনার এই অগ্নিকন্যা রূপ উজান চৌধুরী নিতে পারছে না।
​মুহূর্তের মধ্যে……

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here