প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১০
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিলে চলে এলো ধোঁয়া ওঠা গরম গরম পছন্দের খাবার। খাবারের সুবাস ছড়াতেই রিহান যেন সব ভুলে খাওয়া শুরু করে দিল। রিদিতা চামচ দিয়ে রিত্তিকার মুখে একটা ফিস ফ্রাই তুলে দিয়ে বলল, “নে রিত্তি, হা কর!
রিদিতা কথা মতো রিত্তিকা হা করে মুখে তার দেওয়া খাবারটা নিল।
আর রিহান একমনে খেয়েই যাচ্ছে, অন্যদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
রিদিতা: কি রে রিহান একাই খেয়ে যাচ্ছিস দেখি,আমাদের জন্যও রাখ ভাই।
রিহান ভ্রু নাচিয়ে বললো, আপনে কে আফা।
রিদিতা:ঠাস করে মারবো তোকে রিহান সম্মান দে আমি তোর ৫ মিনিটের বড়।
রিহান:আসছে আমার বড়। ফোট তো।
রিদিতা :তোকে তো..
তখনি রিত্তিকা বললো,থাম তোরা এটা বাড়ি না যে এখানেও শুরু হয়ে গেলি।চুপচাপ খা আর বাড়ি চল।
তারা দুইজনেই চুপ হয়ে গেল রিত্তিকার কথা শুনে। তারপর তারা চুপচাপ খেয়ে বিল দিতে গেল।
বাসায় ফেরার জন্য একটা অটো ডাকা হলো। আর অটোয় কে কোথায় বসবে, তা নিয়ে শুরু হলো যুদ্ধ।
রিহান: “আমি ডান পাশে বসব, বাতাস খাবো।”
রিদিতা: “মোটেও না! আমি মাঝখানে বসব না, দুই পাশে তোদের চিপায় আমার হাড়গোড় ভেঙে যাবে।”
রিত্তিকা: “একদম চুপ! আমি আর রিদিতা বসব, রিহান তুই ওই মাঝে সিটে বসবি।”
শেষমেশ রিত্তিকার ধমকে রিহান চুপ হয়ে গেল।তার কথা মতোই মাঝে বসলো।
বাসায় ঢুকতেই ড্রয়িংরুমে রিদিতার মা সোফায় বসে সিরিয়াল দেখছিলেন। তিন মক্কেলকে একসাথে ঢুকতে দেখে মা চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন, “কী রে, এতক্ষণ কোথায় ছিলি তোরা?”
রিদিতা সুযোগ পেয়েই মায়ের কাছে গিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল, “মা! দেখ তোমার গুণধর ছেলে রেস্টুরেন্টে গিয়ে কীভাবে রাক্ষসের মতো খেয়েছে!
আরে চুপ কর তোরা বাবা তোদের নিয়ে আমি আর পারি না। যে যার ঘরে যা।
পরদিন সকালে রিত্তিকা ঘুম থেকে উঠে চোখ ডলতে ডলতে নিচে নামলো। ডাইনিং টেবিলে অলরেডি ব্রেকফাস্টের সুবাস ছড়াচ্ছে। পরিবারের সবাই উপস্থিত, শুধু রিত্তিকার বাবা ছাড়া। তিনি ব্যবসার জরুরি কাজে থাইল্যান্ড গিয়েছেন।
সবাই একসাথে হাসিমুখে ব্রেকফাস্ট শেষ করলো। রিহান তখনো প্লেট চাটছিল। তা দেখে ইফাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রিত্তিকাকে বললো, “রিত্তি, অফিসে যাওয়ার সময় তোকে আমি ভার্সিটিতে ড্রপ করে দিয়ে আসবো নে। তাড়াতাড়ি রেডি হ।”
”ওকে ভাইয়া, আমি জাস্ট পাঁচ মিনিটে তৈরি হয়ে আসছি!” বলেই রিত্তিকা দোতলার দিকে ছুটলো।
আজ রিত্তিকা একটা গাঢ় নীল কালারের ফ্রক পড়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু ঘুরতেই ফ্রকটার ঘের চমৎকারভাবে ছড়িয়ে পড়লো। মুখে কোনো বাড়তি সাজসজ্জা নেই, কাজল কালো চোখে আর ঠোঁটে হালকা লিপবাম—তাতেই যেন তাকে এক টুকরো নীল পরীর মতো লাগছে। চুলগুলো আলতো করে খোঁপা করে ওড়নাটা কাঁধে ফেলে ও নিচে নেমে আসলো।
নিচে ইফাত তখন সোফায় বসে একমনে ফোন স্ক্রল করছে।
রিত্তিকা সামনে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, “উহুম… ভাইয়া আমি রেডি, চল।”
ইফাত ফোন থেকে চোখ সরিয়ে রিত্তিকাকে দেখলো। একটু মুচকি হেসে ও বললো, “বাহ্, আজ তো দেখি নীল পরী সেজেছিস! তা ভার্সিটিতে কি পড়াশোনা করতে যাচ্ছিস, নাকি কোনো রাজপুত্রের মন কাড়তে?”
রিত্তিকা গাল ফুলিয়ে বললো, ” উফ ভাইয়া! একদম পচাবি না বলে দিচ্ছি। চল এবার, লেট হয়ে যাচ্ছে।”
ইফাতকে যেমন ভয় পাই রিত্তিকা তেমনই মজাও করে।
ইফাত হেসে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো, “আচ্ছা বাবা চল।”
রিত্তিকা ড্রয়িংরুম পার হওয়ার সময় জোরে ডাক দিল, “মা, আসছি আমি!”
রান্নাঘর থেকে মা মুখ বাড়িয়ে হেসে বললেন, “সাবধানে যাস তোরা। ইফাত, গাড়ি আস্তে চালাবি!”
বাড়ির গ্যারেজ থেকে ইফাত তার চকচকে কালো গাড়িটা বের করে আনলো। রিত্তিকা সামনের দরজা খুলে আয়েশ করে বসে পড়লো।
ইফাত রিত্তিকাকে ভার্সিটির মেইন গেটের সামনে নামিয়ে দিলো। রিত্তিকা হাত নেড়ে বাই বলে ভেতরে চলে গেল। ইফাতও গাড়ি ঘুরিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিল।
ভার্সিটির করিডোর পেরিয়ে ক্লাসরুমে ঢুকতেই রিত্তিকার চোখ গেল মাঝের সারির বেঞে।আনিকা, আনুশা আর নিহারিকা—তিন জনই একসাথে বসে আছে। রিত্তিকা গিয়ে গিয়ে জিয়ার পাশে ব্যাগটা রেখে বসলো।
পেছনে ঘুরে আনিকাদের দিকে ভুরু কুঁচকে রিত্তিকা জিজ্ঞেস করলো, “কী রে ডাইনিরা! তোরা কাল আসিসনি কেন বল তো? ?”
তিনজন যেন আগে থেকেই রিহার্সাল করে এসেছিল, একসাথে মুখ বাঁকিয়ে বললো, “কী আর বলবো রে রিত্তি, কাল শরীরটা একদম ভালো ছিল না!”
রিত্তিকা হেসেই খুন। ও জিয়ার দিকে তাকিয়ে তালি দিয়ে বললো, “বাহ্! কী চমৎকার ফ্রেন্ডশিপ রে ভাই! তিনজনেরই একসাথে, একই দিনে শরীর খারাপ? দারুণ তো! তোদের এই রোগ-শোকের টেলিপ্যাথি দেখে আমার চোখে পানি চলে আসছে।”
জিয়া ফিসফিস করে যোগ করলো, “রোগ না রে রিত্তি, কাল তো শপিং মলে ডিসকাউন্টের শেষ দিন ছিল, তাই এই তিন রত্ন একসাথে অসুস্থ হইছিল!” জানিসই তো তিনটে শপিং ছাড়া কিছু বোঝে না।
ধরা খেয়ে তিনজনেই জিভ কাটলো। এরপর প্রফেসর ক্লাসে ঢোকার আগ পর্যন্ত চললো তাদের কানাকানি আর হাসাহাসির তুমুল আড্ডা।
এসি-র ঠান্ডা বাতাসেও ইফাতের কপালে হালকা ঘাম। ও বড় ডিলিং টেবিলের মাথায় বসে আছে। ডিলারদের একজন প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে ফাইলের খুঁটিনাটি আর বিজনেস ডিল নিয়ে অনর্গল বুঝিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইফাতের কান পর্যন্ত কথাগুলো পৌঁছালেও মাথায় ঢুকছে না।
ওর চোখের সামনে প্রজেক্টরের স্লাইডের বদলে বারবার ভেসে উঠছে একটা মায়াবী চেহারা। সেই ডাগর ডাগর চোখ।
ইফাত মনে মনে নিজেকেই ধমক দিল, ‘উফ! কী হচ্ছেটা কি আমার? হঠাৎ মিটিংয়ের মাঝখানে ওই মেয়েটার ছবি কেন ভাসছে? কেন আমি মনোযোগ দিতে পারছি না? সামান্য একদিনের দেখা… অথচ আমার চোখের সামনে মেয়েটা এভাবে ঘুরঘুর করছে কেন? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?’
ঠিক তখনই পাশের সিট থেকে ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট বললো,
“স্যার? এনি প্রবলেম?
ইফাত এক ঝটকায় বাস্তবে ফিরে এলো। গলার টাইটা একটু আলগা করে গম্ভীর গলায় বললো,
“নো… ইটস ওকে। কন্টিনিউ।”
মিটিংটা কোনোমতে শেষ করেই ইফাত প্রায় পালিয়ে নিজের কেবিনে চলে আসলো। ধপাস করে সোফাটায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করলো ও। কিন্তু লাভ হলো না। চোখ বন্ধ করতেই অন্ধকার ফুঁড়ে আবার সেই চেনা মিষ্টি অবয়ব!
ইফাত বিড়বিড় করলো, “উফ! কেন তুমি বারবার আমার সামনে আসছো? কেন তোমাকে আমি ভুলতে পারছি না? সামান্য একদিনের দেখায় এমন কী জাদু করলে আমার ওপর, যে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণই হারিয়ে ফেলছি…”!
ভার্সিটি শেষ করে রিত্তিকা যখন কলিং বেল বাজালো, ওর পেটের ভেতর রীতিমতো ছুঁচো ডলফিন মারছে! চাচি দরজা খোলার সাথে মাথেই ও ঘরের ভেতর ব্যাগ ছুড়ে দিয়ে চেঁচাতে লাগলো, “মা! ও মা! তাড়াতাড়ি আসো, ক্ষুধার চোটে তোমার মেয়ে এখনই জ্ঞান হারাবে! জলদি খেতে দাও!”
মা রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে বের হয়ে কপালে হাত দিলেন, “আরে বাবারে বাবা, তোর এই চিৎকার শুনলে তো পাড়ার মানুষ ভাববে আমি তোকে তিনদিন ধরে উপোস করায় রাখছি! যা, আগে ব্যাগটা ঠিক জায়গায় রাখ। হাত-মুখ ধুয়ে আয়, আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি।”
“আই লাভ ইউ মা! এই গেলাম আর এই আসলাম!” বলেই রিত্তিকা ফ্রকের ঘের ধরে এক ছুটে ফ্রেশ হতে চলে গেল।
নিচে এসেই দেখে টেবিলে ধোঁয়া ওঠা তরকারি আর গরম ভাতের সুবাস ছড়াচ্ছে, যা তার ক্ষুধা আরও চার গুণ বাড়িয়ে দিল!
টেবিলে বসামাত্রই রিত্তিকা প্লেটে ভাত আর তরকারি মাখিয়ে এক বড় লোকমা মুখে পুরলো। স্বাদে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসলো ওর। পরম তৃপ্তিতে চিবোতে চিবোতে ও আহ্লাদ করে বললো, “উফ মা! কী দারুণ রান্না করেছো! জাস্ট ওয়াও! তোমার হাতের রান্নার কোনো তুলনা হয় না, মনে হচ্ছে অমৃত খাচ্ছি!”
মা মেয়ের অতিরিক্ত প্রশংসা শুনে হেসে ফেললেন, তবে মুখে একটু কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে বললেন, “হয়েছে, হয়েছে, । এবার চুপ করে খাবার খা। খাওয়ার সময় এত বেশি কথা বলতে নেই, গলায় আটকে যাবে।”
”আচ্ছা, বাবা, এই চুপ করলাম!” বলেই রিত্তিকা আবার একমনে খাওয়ায় মন দিল।
কিন্তু ওর চঞ্চল মন কি আর বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারে? খাওয়া প্রায় শেষ করে রিত্তিকা চারপাশটা একটু ভালো করে খেয়াল করলো। পুরো ড্রয়িংরুম নিঝুম, কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি নেই, সোফার কুশনগুলোও জায়গায় ঠিকঠাক গোছানো। ও গ্লাস থেকে পানি খেয়ে মুখ মুছে কৌতূহলী চোখে মাকে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা মা, বাড়িটা আজ এত চুপচাপ কেন বলো তো? আমাদের ‘ছাগলদের দল’ কোথায় গেল? কোনো উপদ্রব তো দেখছি না!”
মা রান্নাঘরের স্ল্যাবটা মুছতে মুছতে মুচকি হেসে বললেন, “ওরা আজ একটু সকাল সকাল কলেজে গিয়েছে, বিশেষ কী যেন ক্লাস আছে ওদের। তাই বাড়িটা একটু বেশিই শান্ত লাগছে।” একটু থেমে মা আবার রিত্তিকাকে চোখ রাঙিয়ে বললেন, “কিন্তু ওদের তুই ‘ছাগল’ বলবি না রিত্তি! দেখিস না, ওরা দুটো বাড়ি না থাকলে পুরো ঘর কেমন খাঁ খাঁ করে, একদম ফাঁকা লাগে আমার।”
রিত্তিকা টেবিল থেকে উঠতে উঠতে একটা ভেঙচি কেটে বললো, “তোমার তো ফাঁকা লাগবেই মা! ওরা তো আর তোমাকে জ্বালায় না, যত অত্যাচার সব তো আমার ওপর দিয়ে যায়! ওদের জ্বালাটা আমিই বুঝি, এক একটা আস্ত ছাগল!”
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৯
বলেই রিত্তিকা নিজের মনে হাসতে হাসতে হাত ধোয়ার জন্য বেসিনের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ও মনে মনে খুব ভালো করেই জানে, মুখে যাই বলুক না কেন—ভাই-বোনদের এই বাঁদরামিগুলো ছাড়া ওর নিজের দিনটাও আসলে একদম পানসে!
