প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৯
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
আমরা সবাই নিচে আর তুই উপরে কেনো থাকবি..?
রিত্তিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হুম, তো আমি কী করব? তোরা নিচে আছিস থাক, আমি না হয় গেলাম না। আমার একদম ভালো লাগছে না।”
রিদিতা এবার নিজের দুই কোমরে হাত রেখে যেন এক হাত নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “কেন ভালো লাগছে না শুনি? হ্যাঁ? কী হয়েছে তোর?”
”সব সময় কি তোদেরকে সবকিছু বলতে হবে যে আমার কেন ভালো লাগছে না?
রিহান ফোড়ন কেটে পাশ থেকে বলল, “তা বলবেন না কেনো আফা!
”চুপ কর বেয়াদব!” রিত্তিকা রিহানকে ধমকে উঠল।
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে রিতু ইসলামের (রিদিতা ও রিহানের মা) চড়া গলা ভেসে এলো, “তোদের ঝগড়াঝাঁটি যদি শেষ হয়ে থাকে, তবে এবার দয়া করে খেতে আয়! রাত তো অনেক হলো!”
”আসছি চাচী!” রিত্তিকা ওপর থেকেই চেঁচিয়ে জবাব দিল। তারপর রিহান আর রিদিতার দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “চল ছাগলের দল, এবার খেতে যাই। তোদের এই পটর পটর শোনার চেয়ে নিচে শান্তিতে খেতে যাওয়া অনেক ভালো।”
রিহান হেসেই খুন, “চল চল!”
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রিদিতা আর রিহান আবার রিত্তিকার ঘরে এসে হাজির হলো। রিহান দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে বলল, “আফা, মনে আছে তো? কাল সকালে কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত ফুটবল খেলা!”
রিত্তিকার চোখ দুটো মুহূর্তেই চকচক করে উঠল, “হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন? আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক বলে কথা! আমার মনে থাকবে তো তোর মনে থাকবে?”
রিহান মুচকি হেসে হাত উল্টে বলল, “দেখা হবে কাল, আফা! আমি আবার আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সাথে বেশি কথা বলি না। তাই আমি চললাম এখান থেকে!”
”যাহ! তোকে কে থাকতে বলেছে শুনি? ফোট তো এখান থেকে!” রিত্তিকা বালিশ ছুড়ে মারার ভান করল।
রিহান হাসতে হাসতে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তাড়িয়ে দিচ্ছিস? ঠিক আছে, আমি নিজের ইচ্ছায় চলে যাচ্ছি, তোর কথা শুনে যাচ্ছি না কিন্তু!”
রিদিতা মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে বলল, “আরে থাম ভাই তোরা! কথায় কথায় শুধু তোদের যুদ্ধ শুরু হয়।”
দরজার কাছে গিয়ে রিহান শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “গেলাম আমি!”
রিত্তিকা হেসে উঠে বলল, “যাহ তো যাহ..!” তারপর হঠাৎ মনে পড়ায় রিদিতাকে ডেকে বলল, “এই রিদিতা, সকালে খেলা দেখবি তো?”
”হ্যাঁ, তো দেখব না কেন? অবশ্যই দেখব।”
”ওকে, তাহলে আমাকেও কিন্তু সকালে ঘুম থেকে ডেকে দিস।”
”আচ্ছা ঠিক আছে, যাহ তুই এবার ঘুমা, আমিও ঘুমাতে গেলাম।” রিদিতা চলে যাওয়ার পরপরই ঘরটা আবার শান্ত হয়ে গেল।
রিদিতা ঘর থেকে বের হতেই রিত্তিকার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে জিয়ার নাম।ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জিয়ার মিষ্টি গলা ভেসে এলো, “কেমন আছিস, রিত্তি?”
”আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুই কেমন আছিস?” রিত্তিকা বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
”আমিও আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো আছি। কী করিস এখন?”
”এইতো শুয়ে আছি। তুই?”
”আমিও শুয়ে আছি রে। আচ্ছা রিত্তি… তুই কি আজ ভার্সিটিতে ভাইয়ার কথায় খুব কষ্ট পেয়েছিস?” জিয়ার গলায় একরাশ সহানুভূতি আর সংকোচ।
রিত্তিকা নিজের ভেতরের কষ্টটাকে এক ঝটকায় আড়াল করে একগাল হেসে বলল, “ধুর! না রে, আমি মোটেও কষ্ট পাইনি। বরং উনার কড়া কথাগুলো আমার বেশ ভালোই লেগেছে।” তবে মনে মনে রিত্তিকা প্রতিজ্ঞার সুরে বলল, ‘উনি আজ ক্লাসে যা করেছেন, তার বদলা আমি তুলবই তুলব, দেখে নিয়েন স্যার!’
”রাগ করিস না প্লিজ রিত্তি, ভাইয়ার পক্ষ থেকে আমি তোকে সরি বলছি।” জিয়া অনুতপ্ত গলায় বলল।
”আরে! তুই কেন সরি বলবি? বাদ দে তো এসব কথা।” রিত্তিকা প্রসঙ্গ ঘোরাল।
”হ্যাঁ, শোন রিত্তি, কাল তো ফুটবল খেলা আছে, তুই দেখবি তো?” জিয়ার গলায় এবার উত্তেজনা।
”হ্যাঁ, দেখব না কেন? আমার প্রিয় টিমের খেলা, আমি চোখ বন্ধ করে থাকব নাকি?”
”তুই আর্জেন্টিনার সমর্থক না?”
”হ্যাঁ! তুই?”
”আমিও তো সেম! ওহ গড, ভালোই হলো! আমাদের বাসায় কাল খেলা দেখার বিশাল আয়োজন হচ্ছে। ছোট-বড় সবাই মিলে একসাথে লিভিং রুমে বসে খেলা দেখব। তুই চলে আয় না আমাদের বাসায়, আমরা একসাথে বসে দেখব নে।”
রিত্তিকা একটু ইতস্তত করে বলল, “না রে তোরা দেখ, আমি বরং বাসাতেই বসে দেখি।”
”নাহ! তোকে আসতেই হবে। তুই যদি না আসিস, তবে আমি ভাবব তুই এখনো ভাইয়ার ওপর রেগে আছিস। আর জানিস? আমাদের ভাইয়া কিন্তু ব্রাজিলের সমর্থক!”
রিত্তিকার কান খাড়া হয়ে গেল, “কীহ! জিয়ান স্যার ব্রাজিল সমর্থক?!”
”হ্যাঁ! আমরা বাসার সবাই আর্জেন্টিনা, শুধু ভাইয়া একাই এক পিস ব্রাজিল। আর ভাইয়া কিন্তু তার এই প্রিয় টিম নিয়ে মারাত্মক সিরিয়াস!” জিয়া হাসল।
কথাটা শুনে রিত্তিকার ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টুমিভরা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, ‘বাহ! তাহলে তো মেঘ না চাইতেই জল! কালকে জিয়ান স্যারকে খেপানোর একটা জবরদস্ত সুযোগ পাওয়া গেল। উনার অপমানের ঔষধ তবে কাল আমি দেবই!’
সে জিয়াকে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে বাবা, কাল সকালে আমি তোদের বাসায় আসব।”
পরদিন সকালে রিত্তিকা খুব সুন্দর করে জার্সি পড়ে তৈরি হয়ে নিলো। চোখে-মুখে তার এক অদ্ভুত জয়ের আনন্দ। রেডি হয়ে নিচে গিয়ে তার মাকে বলল, “মা, আমি জিয়াদের বাসায় যাচ্ছি খেলা দেখার জন্য। ও কালকে আমাকে অনেক করে বলেছে যাতে আজকে ওদের বাসায় গিয়ে খেলা দেখি।”
শানজাদা ইসলাম রান্নাঘর থেকে মুখ বের করে বললেন, “কেন, তুই নিজের বাসায় বসে খেলা দেখতে পারিস না?”
”আমি তো ওকে বলেছিলাম মা, কিন্তু ও তো নাছোড়বান্দা, আমার কোনো কথাই শুনল না।” রিত্তিকা একটু আদুরে গলায় বলল।
”আচ্ছা বাবা, মেয়েটা যখন এত করে বলছে, তাহলে তুই যা। আর খেলা শেষ হলেই কিন্তু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসবি।”
”আচ্ছা মা, আই লাভ ইউ মা!” বলেই রিত্তিকা উড়াল দিল কায়সার ম্যানশনের উদ্দেশ্যে।
___কায়সার ম্যানশনে তখন উৎসবের আমেজ। লিভিং রুমে প্রকাণ্ড টিভির সামনে বাড়ির ছোট-বড় সবাই হাজির হয়েছে, কেবল জিয়ান বাদে। সবাই খেলায় মগ্ন। জিহাদ সোফায় বসে ঘুমের ঘোরে ঢুলছে, আর জেসমিন অনবরত তার গায়ে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে চলেছে ঘুম ভাঙানোর জন্য। ঠিক তখনই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল রিত্তিকা।
রিহানা কায়সার রিত্তিকাকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এলেন, “আরে রিত্তিকা মা! কেমন আছো তুমি?”
”এইতো আন্টি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?” রিত্তিকা মিষ্টি করে হেসে কুশল বিনিময় করল।
”আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি মা, এসো বসো।”
জিয়া সোফা থেকে হাত নেড়ে চেঁচিয়ে উঠল, “রিত্তি! তুই চলে এসেছিস? আয় আয়, জলদি বসে পড়, একসাথে খেলা দেখব!”
”হ্যাঁ, চল।” রিত্তিকা সবার সাথে টুকটাক কথা বলে একদম সামনের সারিতে খেলা দেখতে বসে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই যখন আর্জেন্টিনা প্রথম গোলটি দিল, তখন পুরো লিভিং রুম যেন কেঁপে উঠল! সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল—”গোলললল!” জেসমিন তো সোফা থেকে নেমে রীতিমতো নাচতে শুরু করে দিল, আর তার সাথে তাল মেলালো রিত্তিকাও।
তাদের এই আকাশ কাঁপানো চিৎকারে জিহাদ ঘুম থেকে একদম লাফ মেরে উঠল! চোখ কচলে যখন সে দেখল গোল হয়ে গেছে, তখন সে-ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, ওমনি নাচতে শুরু করে দিল।
কিছুক্ষণ পর খেলায় যখন দ্বিতীয় গোল হলো, তখন লিভিং রুমের আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। এবার আর বড়রা চুপ করে থাকতে পারলেন না। বাড়ির কর্তা সুফিয়ান কায়সারও সোফা ছেড়ে উঠে ছোটদের সাথে কোমরে হাত দিয়ে নাচতে শুরু করলেন। সে এক দেখার মতো চমৎকার দৃশ্য! প্রবীণ-নবীন সবাই এক হয়ে তাল মেলাচ্ছে।
এরপর এলো সেই তো মুহূর্ত —যখন লিওনেল মে
সি তার পায়ের ছোঁয়ায় হ্যাটট্রিক গোলটি সম্পন্ন করলেন! রিত্তিকা তখন আর নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না। সে সোফার ওপর দাঁড়িয়ে দুহাত উঁচিয়ে গলার সবটুকু জোর দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “গোওওওললল! এইইইইই হুউউউউ!”
তার সেই কান ফাটানো চিৎকারে লিভিং রুমের সবাই থমকে গিয়ে এক পলক রিত্তিকার দিকে তাকাল। রিত্তিকা সবার তাকানো দেখে কিছুটা লজ্জিত হয়ে জিভ কেটে মুচকি হাসল। পরক্ষণেই আবার সবাই একজোটে চিৎকার করে উঠল—”গোল!” রিত্তিকাও তাদের সাথে গলা মেলালো।
খেলা শেষ হতেই রেফারি বাঁশি বাজালেন। আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলের এক বিশাল ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে নিয়েছে। পুরো কায়সার ম্যানশনে তখন যেন আনন্দের বন্যা বইছে। সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নাচানাচি করছে।
ঠিক তখনই রিত্তিকার মাথায় সেই বহু প্রতীক্ষিত দুষ্টু বুদ্ধিটা খেলে গেল। সে ভিড়ের মধ্য থেকে আলতো করে বেরিয়ে সোজা দোতলায় জিয়ানের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
অন্যদিকে, জিয়ান তখন নিজের ঘরের মেঝেতে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল আর কপাল টিপে ধরছিল। নিচের তলার ওই বিকট চিৎকার আর নাচানাচির শব্দে তার কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল। সে বিরক্তিভরা গলায় একা একাই বলছিল, “শুরু হয়ে গেছে এদের সেই আদিখ্যেতা আর পাগলামির কাহিনী! উফ, একটা মানুষ শান্তিতে ঘরে থাকবে, তারও উপায় নেই!”
জিয়ান যখন ঘরের ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করছিল, ঠিক তখনই বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল রিত্তিকা। জিয়ানের ঠিক পেছনে গিয়ে,
রিত্তিকা বলে উঠল:
”স্যার! আপনি… 7 Up? 😁”
আয়নায় রিত্তিকার মুখটা দেখেই জিয়ানের মাথার সব কটা রগ যেন একসাথে চটে গেল। সে এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল,
“চুপ কর বেয়াদব মেয়ে!থাপ্পড়ায়ে গালের নাকশা বদলায় দেবো, বেরো আমার রুম থেকে! 😡”
রিত্তিকা একটুও ভয় পেল না, বরং তার ঠোঁটের কোণের চওড়া হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে ঝটপট নিজের ফোনটা পকেট থেকে বের করল। তারপর গ্যালারি থেকে একটা ছবি বের করে জিয়ানের চোখের সামনে ধরে নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“এই দেখুন স্যার, আমরা জেতার পর আপনাদের অবস্থা। 🤣
ছবিটা ছিল চরম হাস্যকর, কোনো এক ব্রাজিল সমর্থকের হার্ট অ্যাটাক করার মতো এক করুণ ও মজার অভিব্যক্তি।
ছবিটা দেখেই জিয়ান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে, এক অভিনব ছড়া কেটে বলে উঠল,
“আর্জেন্টিনা ছেঁড়া ত্যানা, চোরের নাম ম্যারাডোনা! ডিব্বারে কই ডাব্বা, জার্মানি তোগো আব্বা!” ছড়াটা শেষ করেই জিয়ান রিত্তিকাকে রাগানোর জন্য খিলখিল করে উপহাসের হাসি হাসতে লাগল।
জিয়ানের মুখে নিজের প দলের নামে এমন ছড়া শুনে রিত্তিকার মাথা একদম গরম হয়ে গেল! সে রাগ সামলাতে না পেরে দুই হাত এমনভাবে ওপরে তুলল যেন এখনই জিয়ানের গলাটা টিপে ধরবে। সে রাগে মুখ লাল করে চেঁচিয়ে বলল,
“মন চাচ্ছে শা*লা তোর গলা টিপে দিই একদম! 😡 আর্জেন্টিনা তোগো আব্বা,আমি জানি আপনার জ্বলে.! 🤣
জিয়ান মুহূর্তের মধ্যে রিত্তিকার মুখের কথা লুফে নিলো। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল,
“কীহ! বেয়াদব মেয়ে! তুই আমাকে ‘তুই’ করে বলছিস?! তোর এত বড় সাহস!”
রিত্তিকা তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল রাগের মাথায় সে চরম ভুল করে ফেলেছে। সে চট করে জিভ কামড়ে দুই হাত জোড় করে একগাল চিলতে হাসি দিয়ে বলল,
“😁😁 সরি, সরি স্যার! আপনাকে বলি নাই তো! 😅 ওটা এমনি মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে। আমরা ৩ টা গোল আর আপনারা ড্র😁
জিয়ান দুই হাত বুকের ওপর বেঁধে মুখটা শক্ত করে বলল,
“চুপ কর বেয়াদব মেয়ে! তোদের মতো আমরা চুরি করে জিতি না, আমরা চোর না! সামনে যখন মুখোমুখি দেখা হবে, তখন বুঝিয়ে দেব কার কত ক্ষমতা, যাহ!”
”যাব না! আপনি এক কাজ করুন, ফ্রিজ থেকে এক ক্যান ‘7 Up’ বের করে ঢকঢক করে খেয়ে নিন তো স্যার, মাথাটা একদম ঠান্ডা হয়ে যাবে!” রিত্তিকা চোখের পলক নাচিয়ে খোঁচা দিল।
জিয়ান এবার রিত্তিকার পোশাকের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “আমাদের 7 Up খেতে বলিস? তোরা তো খেলা দেখতে আসিস না, তোরা তো আসিস থ্রি-পিস পরতে!
জিয়ানের মুখে এমন পাড়ার ছেলেদের মতো ফুটবল নিয়ে ঝগড়া করতে দেখে রিত্তিকা মনে মনে পুরো থমকে গেল। সে অবাক হয়ে ভাবল, ‘শা*লা, এটা কি সত্যিই আমাদের সেই গম্ভীর, খড়খড়ে জিয়ান স্যার?! উনি সামান্য ফুটবলের দল নিয়ে একটা মেয়ের সাথে এভাবে ঝগড়া করছেন?! জিয়া তো কাল রাতে একদম ঠিক কথাই বলেছিল—উনি নিজের দল নিয়ে বড্ড বেশি সিরিয়াস। অবশ্য সবারই একটা নিজস্ব পছন্দ থাকে। আমি তো শুধু কালকের ক্লাসরুমের সেই অপমানের প্রতিশোধটা নিতে চেয়েছিলাম উনাকে এভাবে খেপিয়ে।’*
ভাবনা কাটিয়ে রিত্তিকা বুক টান করে জিয়ানকে বলল, “হ্যাঁ, পরি তো! তাতে আপনার কী শুনি? আপনারা তো 7 Up খান!
”যাহ তো এখান থেকে বেয়াদব মেয়ে!” জিয়ান তর্জনী উঁচিয়ে দরজার দিকে নির্দেশ করল, “কালকে ক্লাসে তোকে এতগুলো কড়া কথা শোনালাম, এত অপমান করলাম, তাও তোর বিন্দুমাত্র শিক্ষা হয়নি? আবার আমার সামনে এসে মুখ চালাচ্ছিস?!”
রিত্তিকা দরজার দিকে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে মিষ্টি করে এক গাল হেসে বলল, “ওই স্যার, শোধ নিতে এলাম এভাবে… আপনাকে একদম লাল-নীল করে খেপিয়ে! হুহু, আমার শোধ নেওয়া শেষ, আমি চলেই যাচ্ছি। টা টা, খরগোশ মার্কা স্যার! 😜”
”কী বললি?! আবার বল! দাঁড়া তোকে তো আজ…” জিয়ান এক পা বাড়িয়ে রিত্তিকাকে ধরতে গেল, কিন্তু তার আগেই রিত্তিকা এক দৌড়ে জিয়ানের ঘরের বাইরে চলে গেল। জিয়ানের গলার চিৎকার যেন ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। জিয়ান ধপ করে সোফায় বসে পড়ে কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল, “মেয়েটা কী পরিমাণে বেয়াদব ভাবা যায়!”
সবাইকে বিদায় জানিয়ে কায়সার ম্যানশন থেকে বের হয়ে রিত্তিকা যখন ধীর পায়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটছিল, তখন তার ঠোঁটের কোণে আর সেই দুষ্টুমিভরা হাসিটা ছিল না। তার মনের আকাশে তখন এক অশান্ত মেঘ জমেছে। জিয়ানের সেই রেগে যাওয়া মুখটার কথা মনে পড়তেই সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল:
’সরি স্যার! আপনাকে মনে কষ্ট দেওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। আমি জানি ফুটবলের মাঠে সবারই আলাদা আলাদা পছন্দ, আলাদা ভালোবাসা থাকে। আমি আপনার বা অন্য কোনো দলকেই কোনোভাবে অসম্মান করি না, সব দলকেই আমি মনে-প্রাণে সম্মান করি। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল কালকের সেই অপমানের শোধ নেওয়া আর আপনাকে একটু জ্বালানো… এছাড়া আর কিচ্ছু না স্যার, সত্যি বলছি আর কিচ্ছু না।’
বাসায় ফিরেই রিত্তিকা দেখল রিদিতা আর রিহান ড্রয়িংরুমে বসে নিজেদের মধ্যে টুকটাক গল্প করছে। রিত্তিকাকে দেখেই রিদিতা সোফা থেকে উঠে একগাল হেসে বলল, “কী রে রিত্তি, সারাদিন তো ঘরেই কাটালি। চল না, আজকে বিকেলটা আমরা কোথাও থেকে একটু ঘুরে আসি? মনটাও একদম হালকা হয়ে যাবে।”
রিদিতার এই চনমনে প্রস্তাবে রিত্তিকার মনটাও কেমন যেন ভালো হয়ে গেল। সে মৃদু হেসে সায় দিয়ে বলল, “চল, ভালোই হবে। আজ তো ভার্সিটি ছুটি, । তোদের এই পাগলা দলের সাথেই না হয় আজকে ঘুরতে যাই।”
যেমন কথা, তেমন কাজ। বিকেলের নরম আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই তারা তিনজন নিজেদের মতো করে তৈরি হয়ে নিলো। ঘর থেকে বেরিয়ে তারা কোনো কোলাহলপূর্ণ জায়গায় গেল না, বরং প্রকৃতির এক শান্ত ও নিবিড় কোণ খুঁজে নিল। রিদিতা আর রিহানের বাড়ি থেকে কিছুটা পথ পেরিয়ে তারা এসে পৌঁছাল এক অপরূপ লেকের পাড়ে।
লেকের শান্ত জল তখন গোধূলির শেষ সোনাঝরা আলোয় ঝিলমিল করছে। হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া এসে রিত্তিকার মুখের ওপর পড়া এলোমেলো চুলগুলোকে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছিল। লেকের পাড়ের এই শান্ত স্নিগ্ধতা যেন রিত্তিকার ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি আর মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সুক্ষ্ম কষ্টগুলোকে এক নিমেষেই ভুলিয়ে দিচ্ছিল।
রিহান আর রিদিতা যখন লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলায় আর নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি ও মেতে ছিল, রিত্তিকা তখন জলের মৃদু তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে একমনে নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিল। এই লেকের ধারের নীরবতা যেন তার চঞ্চল মনটাকে এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরিয়ে দিচ্ছিল।
লেকের পাড়ে গোধূলির আলো যখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার চারপাশটাকে ছুঁয়ে দিল, তখন রিহানের পেটের ভেতর খিদেই চোঁ-চোঁ করতে শুরু করল। সে পেট চেপে ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “আফা রে, লেকের হাওয়া খেতে খেতে আমার পেটের ভেতরের সব হাওয়া খালি হয়ে গেছে! এবার চল, কিছু না খেলে আমি এই লেকের পাড়েই শহীদ হয়ে যাব।”
রিহানের এই কথা শুনে রিত্তিকা আর রিদিতা একসাথে হেসে উঠল। রিদিতা রিত্তিকার হাত ধরে বলল, “সত্যিই রে রিত্তি, চল আজকে সবাই মিলে কোনো একটা ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভরপেট খাওয়া-দাওয়া করি। বিলটা না হয় রিহানই দেবে!”
”কীহ! আমি বিল দেব?!” রিহানের চোখ তো বের হয়েই আসবে এমন।
তো কে দেবে..? তুই দিবি চল।রিত্তি বললো।
তাদের এই খুনসুটি দেখতে দেখতেই তারা তিনজন লেকের পাড় ছেড়ে শহরের আলো-ঝলমলে এক সুন্দর রেস্টুরেন্টে গিয়ে হাজির হলো। রেস্টুরেন্টের ভেতরের পরিবেশটা ছিল বেশ দারুণ—হালকা স্নিগ্ধ আলো আর ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব মৃদু সুরে একটা পিয়ানোর টিউন বাজছিল, যা এক নিমেষেই মন ভালো করে দেওয়ার মতো।
তারা একদম কোণার দিকের একটা টেবিল বেছে নিয়ে আরাম করে বসল। মেন্যু কার্ডটা হাতে আসতেই রিহান আর রিদিতা খাবার অর্ডার করার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ল। রিত্তিকা চুপচাপ বসে গ্লাসের ঠান্ডা জলে চুমুক দিচ্ছিল আর রেস্টুরেন্টের নান্দনিক সাজসজ্জা দেখছিল।
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৮
কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিলে চলে এলো ধোঁয়া ওঠা গরম গরম পছন্দের খাবার। খাবারের সুবাস ছড়াতেই রিহান যেন সব ভুলে খাওয়া শুরু করে দিল। রিদিতা চামচ দিয়ে রিত্তিকার মুখে একটা ফিস ফ্রাই তুলে দিয়ে বলল,
“নে রিত্তি, হা কর!
