প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
জিয়ান মাথা নেড়ে বিনীতভাবে বলল, “আচ্ছা বাবা, আমি সময়মতো অফিসে পৌঁছে যাব, তুমি চিন্তা করো না।”
”ছেলেটা আমার কতদিক সামলাবে হ্যাঁ! সারাদিন ভার্সিটিতে থাকে, তারপর আবার ওত বড় বিজনেসটা দেখে। ওর শরীরের ওপর দিয়ে তো কম ধকল যায় না। এমন দিনরাত এক করে খাটলে তো যেকোনো দিন অসুস্থ হয়ে পড়বে,” কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বললেন জিয়ানের মা রিহানা কায়সার।
নওশাদ কায়সার খাবার খেতে খেতেই শান্ত গলায় বললেন, “তোমার আদরের ছেলেই সব একসাথে করতে চেয়েছে রিহানা। এতে আমাকে কেন দোষ দিচ্ছো? যা বলার তাকেই বলো গিয়ে।”
”উফ, তোমরা খাওয়া বাদ দিয়ে কি শুরু করছো প্লিজ থামো তো, অনেক হয়েছে! আমি সবদিকটাই সুন্দর ম্যানেজ করতে পারবো, আমার কোনো সমস্যা হবে না,” জিয়ান কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল। তারপর টেবিলের বাকিদের দিকে তাকিয়ে প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইল, “এসব বাদ দিয়ে খাবার খাও তো চুপ করে। আচ্ছা চাচ্চু, জিহাদ কবে আসবে? ওর কি দেশ-বিদেশ ঘোরা শেষই হচ্ছে না?”
আজমল কায়সার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোর ওই ছন্নছাড়া ভাই কখন কী করে না করে, সে নিজেই জানে। আমাকে তো কিছুই বলে না, বড্ড বেপরোয়া হয়ে উঠছে দিন দিন। এবার একটা বিয়ে দিয়ে ঘরে বেঁধে রাখতে হবে।”
এমন সময় সদর দরজার দিক থেকে কেউ একজন চড়া গলায় হেসে বলে উঠল,
“কাকে বিয়ে দিয়ে ঘরে বন্দি করে রাখবে, পাপা?”
সবাই চমকে পিছন ফিরে দেখল—হাতে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে জিহাদ। মুখে তার চিরচেনা সেই দুষ্টুমি ভরা হাসি।
”তাহলে এতদিনে মহামান্যর আসার সময় হলো!” একরাশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন আজমল কায়সার।
”আরে থামো তো তুমি! ছেলেটা আমার কতদিন পর এতদূর থেকে জার্নি করে বাড়ি ফিরল, আর উনি এসেই কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। কোথায় একটু আদর করে খোঁজ নেবে যে কেমন আছে না আছে…” ছেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন জিহাদের মা রেনিয়া।
জিহাদ মাকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদ করে বলল, “ও মা, তোমাকে যে কী মিস করেছি গো! তুমি ছাড়া আমাকে কেউ বোঝেনি, তোমার মতো তো কেউ ভালোই বাসে না।”
সোফায় বসে থাকা জেসমিন মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আইচ্ছা! তাহলে আমি তোর কেউ না, ভাইয়া?” জেসমিন জিহাদের ছোট বোন।
জিহাদ বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে তুই তো আছিসই আমার কিউট বনু!”
”খাওয়ার টেবিলে এত কথা কেন হচ্ছে বুঝলাম না। জিহাদ, ড্রামাটিক সিন বন্ধ করে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে আয়,” জিয়ান গম্ভীর গলায় ধমকের সুরে বলল।
”ওকে ব্রো, আমি এক্ষুনি আসছি,” জিহাদ বলল।
জিহাদ হাত-মুখ ধুয়ে আসার পর সবাই খাওয়া শেষ করল এবং যার যার ঘরে চলে গেল।
জিয়ান রুমে এসেই দরজাটা লক করে দিল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে তার বেস্ট ফ্রেন্ড আরিফকে কল দিল সে। ওদিক থেকে কল ধরতেই জিয়ান কোনো ভূমিকা ছাড়া বলল,
“তোকে আমি একটা নাম্বার টেক্সট করছি, এই নাম্বারটা কার, নাম-ঠিকানা সব আমাকে জলদি ট্র্যাক করে জানা।”
আরিফ ওপাশ থেকে হাই তুলতে তুলতে বলল, “কেন রে ভাই? এত রাতে কার পেছনে লাগলি? কে তোর কোন পাকা ধানে মই দিল যে তুই তার কুন্ডলী বের করতে বলছিস?”
”তোর এত অতিরিক্ত জানা লাগবে না। যা বললাম তাড়াতাড়ি কর। ফাস্ট!” জিয়ানের গলার আওয়াজ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
”ভাই রে ভাই! তোকে দেখে যত ভয় পাই, কসম—জীবনে এমন ভয় আর কোনো জল্লাদ দেখেও পাইনি। করছি বাবা, করছি।”
”তোর এত ফালতু কথা শোনার মুড নেই আমার। রাখছি, ৫ মিনিটের মধ্যে সব ডিটেইলস চাই। মাইন্ড ইট!” বলেই জিয়ান খট করে কলটা কেটে দিল।
ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে জিয়ান ঘরের মাঝে পায়চারি করতে লাগল। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, নিজে নিজেই বলতে লাগল, “একবার শুধু তোমার আসল খোঁজটা পাই, থাপ্পড় দিয়ে ওই ‘ভালোবাসি’ বলার শখ এক মিনিটে মিটিয়ে দেবো। বেয়াদব মেয়ে !”
ঠিক সাড়ে চার মিনিটের মাথায় আরিফ ব্যাক করল। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে সে বলল,
“শোন, সিমটি এক রিত্তিকা ইসলাম নামে রেজিস্ট্রেশন করা। খোঁজ নিয়ে জানলাম, মেয়েটা তোর ভার্সিটিতেই পড়ে, ফার্স্ট ইয়ার। আর বাসা নীলক্ষেতের দিকে। আর কিছু জানতে চাস তো বল? নিজের ঘুম হারাম করে তোর জন্য এই গোয়েন্দাগিরি করছি। সত্যি করে বল তো, কোনো মেয়ের চক্করে পড়লি নাকি?”
”শাট আপ, আরিফ!” জিয়ান দাঁত কিড়মিড় করে বলল।
”ওকে বস, আমি একদম চুপ। আমি তো জাস্ট ভাবলাম…”
বাকিটুকু বলার আগেই জিয়ান মুখের ওপর কল কেটে দিল।
ওপাশে আরিফ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হা হয়ে রইল। তারপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল,
“যাহ সালা! দুনিয়াতে মানুষের উপকার করাই উচিত না। এত রাতে একটা ভালো মানুষের মতো হেল্প করলাম, আর বেটা একটুও দাম দিল না! মুখের ওপর কল কেটে দিল? দাঁড়া জিয়ান, তোর মুখের ওপরও যদি কোনোদিন আমি কল না কাটছি, তবে আমার নামও আরিফ না!”
এদিকে নিজের ঘরে জিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে আপনমনে বলতে লাগল,
“তাহলে তুমিই সেই সাহসী কন্যা, যে আমাকে ‘ভালোবাসি’ বলেছ? স্টুডেন্ট হয়ে আমার সাথে এই টিজিং করার এত বড় সাহস দেখাও! আচ্ছা, কাল শুধু ভার্সিটির ক্যাম্পাসে পা দাও জানেমান, তারপর আমি দেখছি তোকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায়!”
অন্যদিকে রিত্তিকাদের ডাইনিং টেবিলে তখন হাসির রোল উঠেছে। খাবার খাওয়া শেষ করে রিত্তিকা তার মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “আচ্ছা মা, মামুনিরা কবে আসবে গো? বড্ড মিস করছি।”
বড় ভাই ইফাত পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলল,
“কেন রে? তোর একা একা বান্দরমি করা কি কম হয়ে যাচ্ছে? রিদিতা আর ইফাত এ বাড়িতে পা রাখলে তো তোদের ওই তিন ভন্ডের মহাকাব্য শুরু হয়ে যাবে। তখন বাড়ি মাথায় তুলবি!”
রিত্তিকা বলল,
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২
“আরে ভাইয়া, তুমি কী যে বলো না! আমি কত শান্ত, লক্ষ্মী একটা মেয়ে। আমার মতো ইনোসেন্ট কেউ হয় নাকি এই যুগে? সারা দুনিয়া হন্যে হয়ে খুঁজে দেখো, যদি আমার মতো এমন একটা হিরের টুকরো পাও!”
ইফাত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত দিয়ে বলল,
“তাই তো! তুই একদম ঠিক বলেছিস। তোর মতো আস্ত একটা ডাইনামাইট আসলেই দুনিয়াতে আর দ্বিতীয়টি নেই!”
রিত্তিকা ভাইয়ের কথা শুনে মুখ ভেংচালো।
