Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৫

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৫

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৫
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

তারপর রিত্তিকা ভার্সিটির দিকে হাঁটা ধরল…
​ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু হতে এখনো ১৫ মিনিট বাকি আছে। তার মধ্যেই রিত্তিকা চলে এসেছে। ক্যাম্পাসে ঢুকতেই সে দেখল—মাঠে আনুশা, নিহারিকা আর জিয়া বসে আছে।
রিত্তিকা পেছন থেকে আলতো করে জিয়ার চোখ দুটো চেপে ধরল। জিয়া বোঝার চেষ্টা করল কে তার চোখ ধরেছে। তারপরেই সে হেসে বলে উঠল, “রিত্তিকা, তুই! আমি বুঝে গেছি।”
​রিত্তিকা হাত সরিয়ে অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “কী করে বুঝলি যে আমি?”

​”ওমা, তুই এসেছিস আর আমি বুঝব না!”
​”নাহ্‌, বুঝবি না। যাই হোক, হ্যাপি বার্থডে জিয়া! আর এই ফুলগুলো তোর জন্য।”
জিয়া ফুলগুলো হাতে নিয়ে উৎফুল্ল গলায় বলল, “থ্যাংক ইউ সো মাচ! ফুলগুলো সত্যিই অনেক সুন্দর। কিন্তু তুই জানলি কীভাবে আজ আমার বার্থডে?”
​রিত্তিকা একটু হেসে বলল, “আরে, আমাদের যখন প্রথম দেখা হয়েছিল, তখন তোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মনে নেই তোর? তখন থেকেই আমার মনে আছে যে আজ তোর জন্মদিন।”
​জিয়া একটু আবেগপ্রবণ হয়ে বলল, “সেই কবে কার কথা এখনো মনে রেখেছিস তুই!”
​রিত্তিকা মুখ ফুলিয়ে বলল, “সর তো, বেশি ঢং করিস না। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বার্থডে আমি মনে রেখেছি, তাতে তোর কী? আর এত জিজ্ঞাসাই বা করছিস কেন, হুহ!”
জিয়া দুই কান ধরে হেসে বলল, “আচ্ছা বাবা সরি , আমার ঘাট হয়েছে! আর জিজ্ঞেস করছি না, এবার খুশি তো?”

​রিত্তিকা গাল ফুলিয়ে বলল, “হুম, এবার খুশি!”
​এতক্ষণ পর নিহারিকা আর আনুশাও একসাথে বলে উঠল, “হ্যাপি বার্থডে জিয়া! 🦋 কিন্তু আমরা তো তোর জন্য কোনো গিফট আনতে পারিনি, সরি রে।”
​জিয়া আলতো হেসে বলল, “আরে, আমি কি তোদের গিফট আনতে বলেছি? তোরা যে আমাকে উইশ করলি, এটাই আমার জন্য অনেক।”
​রিত্তিকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাড়া দিল, “হয়েছে, এবার থাম তোরা। চল, ক্লাসে যাই।”
​আজকে তারা পরপর তিনটা ক্লাস শেষ করে যে যার যার বাড়িতে চলে এলো।

বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসতেই ‘কায়সার ম্যানশন’ এক মায়াবী রূপ ধারণ করল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন রূপকথার কোনো প্রাসাদ। পুরো বাড়ির সীমানা জুড়ে লতা-পাতার মতো জড়িয়ে আছে অসংখ্য ফেইরি লাইট। ভেতরের করিডোরগুলোতে রঙিন বেলুন আর সাদা-গোলাপী ফুলের রাজত্ব। আজ এই বাড়ির আরেক রাজকন্যা জিয়া কায়সারের জন্মদিন। ও বাড়ি ফেরার আগেই পুরো বাড়িটাকে খুব সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।
জিয়া মাত্রই মেইন গেট দিয়ে ভেতরে পা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন ভুতুড়ে খ্যাপাটেপনা নিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়াল বড় ভাই জিহাদ আর ছোট বোন জেসমিন।
​জেসমিন হাত দিয়ে ইশারা করে বলল, “স্টপ! ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক। এখন বাড়িতে ঢোকা নিষেধ। তুই বরং বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ টো টো করে ঘুরে আয়।”
​জিয়া আকাশ থেকে পড়ল, “মানে কী? আমি আমার নিজের বাড়িতে ঢুকব না কেন? আর বাড়িটা বাইরে থেকে এভাবে লাইটিং করা কেন রে?”
জেসমিন একগাল হেসে বলল, “আরে, আজ আমার বাপের আবার নতুন করে বিয়ের অনুষ্ঠান! তাই এত আয়োজন।”

​”কীহ!” জিয়ার চোখ তো ছানাবড়া।
​জিহাদ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, সে জেসমিনের মাথায় একটা হালকা চাঁটি মেরে বলল, “ফালতু কথা বন্ধ করবি তুই?” তারপর জিয়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “জিয়া, তুই জাস্ট চোখ দুটো বন্ধ কর আর আমাদের সাথে চল।”
​”কিন্তু ভাইয়া, কারণটা তো বলবি?” জিয়া বেশ অবাক।
জিহাদ এবার বুক ফুলিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “আমি যাহা বলিব, তুমি তাহাই করিবা। কেননা, আমি তোমার বড় ভাই! আমার আদেশের ওপর কোনো কথা হবে না। এখন চুপচাপ চোখ বন্ধ করে ঘরের দিকে পা বাড়াও, আমি না বলা পর্যন্ত চোখ খুলবে না।”
​জিয়া বুঝল, এদের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। ও বাধ্য হয়ে চোখ বন্ধ করল। জিহাদ আর জেসমিন ওকে দুই পাশ থেকে আগলে ধরে সাবধানে ভেতরের দিকে নিয়ে গেল।

_______সুফিয়ান কায়সার—যিনি জিয়ার দাদা—ফোনে তাঁর এক পরম বন্ধুর সাথে কথা বলছিলেন। তিনি বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন, “ভাই আজ আমার নাতনির জন্মদিন। তোকে কিন্তু আসতেই হবে।”
​ওপাশ থেকে তাঁর বন্ধু কিছুটা মলিন গলায় বললেন, “ভাই, ইচ্ছা তো ছিল খুব। কিন্তু শরীরটা হঠাৎ একটু বিগড়ে গেছে রে। তবে আমি না যেতে পারলেও, আমার পরিবারের বাকি সবাই কিন্তু তোর ওখানে যাচ্ছে।”
​সুফিয়ান সাহেব হেসে বললেন, “আচ্ছা, তুই শরীরটার যত্ন নে। ওদের পাঠিয়ে দিস।”
______ঠিক একই সময়ে, অন্য এক বাড়িতে সাদমান
ইসলাম রিত্তিকার দাদা তাঁর পরিবারের সবাইকে বসার ঘরে ডেকে বললেন, “আজ তোমাদের একটা বিশেষ জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যেতে হবে। আমার এক পুরোনো বন্ধুর নাতনির জন্মদিন। আমার শরীরটা আজ ভালো ঠেকছে না, তাই আমি যেতে পারছি না। তোমরা সবাই ঘুরে এসো।”

​রিত্তিকার মা চিন্তিত মুখে বললেন, “বাবা, আপনার শরীর ভালো না, এই অবস্থায় আপনাকে রেখে আমি কীভাবে যাই? তার চেয়ে রিত্তিকা আর ইফাত যাক, আমি আপনার কাছে থাকি।”
দাদা মৃদু হেসে বললেন, “তাও ভালো হয় বউমা। ওদের দুজনাকেই পাঠিয়ে দাও।”
​রিত্তিকার মা দ্রুত রিত্তিকার রুমে গিয়ে বললেন, “রিত্তি, আজ তোর দাদার এক বন্ধুর বাড়িতে জন্মদিনের পার্টি আছে। তুই আর ইফাত জলদি তৈরি হয়ে নে। তোর দাদা অসুস্থ, তাই উনি যেতে পারছেন না। আমি বাসায় থাকছি তোর বাবাও তো নেই তাই তোরা যা”।
​রিত্তিকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, সে ঘুরে বলল, “আচ্ছা মা, ঠিক আছে।”
​মা ঘর থেকে বের হওয়ার আগে একটু চোখ রাঙিয়ে বললেন, “দেখিস, ওখানে গিয়ে যেন আবার কোনো দুষ্টুমি করিস না। শান্ত হয়ে থাকবি।”
“আরে মা, আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি! তুমি এখন যাও তো, আমি রেডি হই। আর ভাইয়াকে বলো জলদি তৈরি হতে, ও তো আবার লেট লতিফ!”
​”হ্যাঁ, ও রেডি হচ্ছে। তোরই তো সাজতে ঘণ্টা লাগবে, তুই তাড়াতাড়ি কর!” মা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

_____পরনের হালকা গোলাপী রঙের ফ্লোরাল গাউনটা রিত্তিকার শরীরের সাথে যেন মিশে গেছে। ও কোনো চড়া মেকআপের ধার ধারেনি। ঠোঁটে আলতো করে ছুঁইয়ে নিয়েছে হালকা নুড শেডের লিপস্টিক, আর ডাগর দুটো চোখে গভীর করে টেনেছে কালো কাজল। চুল গুলো পিঠের ওপর আলগা করে ছেড়ে দেওয়া, যা বাতাসের দোলায় বারবার ওর গালে এসে পড়ছে। ডান হাতে শুধু একটা চিকন রুপোলি ব্রেসলেট। সামান্য সাজেই অপূর্ব লাগছে তাকে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিফলন দেখে ও নিজেই একটু হাসল। এই অতি সাধারণ, স্নিগ্ধ সাজেই তাকে বেশ লাগে।
____ মা আমি রেডি ভাইয়া কই ও তোর জন্য ঘরে অপেক্ষা করতে করতে বাইরে চলে গিয়েছে। দেখ বাইরে দাড়িয়ে আছে। বেশি তো সাজিস নি তাও এতো দেরি হলো।
আহ মা, বলো কেমন লাগছে।
মাশআল্লাহ দারুণ লাগছে। এবার যা।
আচ্ছা মা টা টা।
__কিরে তোর কত সময় লাগে সাজতে রিত্তি।
চলেই তো এসেছি ভাইয়া চলো তো এবার।
__চল..!

এদিকে কায়সার ম্যানশনে, জিয়াকে সাজাতে ব্যস্ত জেসমিন। জিয়ার পরনে আজ ধবধবে সাদা রঙের একটা গাউন। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক, আর মুখে একদম হালকা, স্নিগ্ধ মেকআপ। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে জিয়া নিজেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। সত্যিই, আজ তাকে কোনো রাজকন্যার চেয়ে কম লাগছে না।
​ঠিক তখনই দরজার কাছ থেকে এক গম্ভীর অথচ স্নেহমাখা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “মাশআল্লাহ! আজ আমার বোনটাকে একদম পরীর মতো সুন্দর লাগছে।”
​জিয়া চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখল ওর বড় ভাই জিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। ও হেসে বলল, “ভাইয়া, তুই! দরজায় দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে আয়।” জিয়ান ঘরে ঢুকতেই জিয়া ওর হাতটা ধরে আবদারের সুরে বলল, “ভাইয়া, নিচে কিন্তু আজকে তোকে থাকতে হবে।
জিয়ান একটু অস্বস্তি প্রকাশ করে বলল, ” জিয়া, তুই তো জানিসই—আমার এসব বেশি জাঁকজমক আর হইচই একদম পছন্দ না। আমি রুমে থাকি?”
​জিয়া এবার মুখটা ছোট করে অভিমানী গলায় বলল, “না, আমি কোনো কথা শুনব না! আজ আমার জন্মদিন, তোকে নিচে থাকতেই হবে।”

​বোনের এমন আদুরে আবদার জিয়ান আর ফেলতে পারল না। ও হেসে মাথায় হাত রেখে বলল, “আচ্ছা বাবা আচ্ছা, থাকব। এবার খুশি?”
​জিয়া খুশিতে জিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “লাভ ইউ ভাইয়া!”
​জিয়ান ওর মাথায় একটু টোকা দিয়ে বলল, “আচ্ছা, এবার সাজগোজ তো শেষ, চল নিচে চল। সবাই অপেক্ষা করছে।”
​”হ্যাঁ চলো, আমি একদম রেডি।”
দুই ভাইবোন একসাথে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। ততক্ষণে লিভিং রুমে বাড়ির প্রায় সবাই উপস্থিত হয়েছে। আজ জিয়ার দুই ফুফুও সপরিবারে এসেছেন। বড় ফুফু নিশিতা বেগমের এক ছেলে ও এক মেয়ে—কবির আর কলি। আর ছোট ফুফু নুরাইয়ার একমাত্র ছেলের নাম সাইফান। কাজিনরা সবাই মিলে সোফায় বসে দারুণ আড্ডায় মেতে উঠেছে, পুরো বাড়ি হাসিখশিতে মুখরিত।
​জিয়ান নিচে নামতেই ওর দাদা সুফিয়ান কায়সার ওকে ইশারায় ডেকে বললেন, “দাদুভাই, একটু মেইন দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াও তো। আমার এক বিশেষ অতিথি এখনই এসে পৌঁছাবে। ওদের একটু রিসিভ করো।”
​দাদার কথা ফেলতে না পেরে জিয়ান ধীর পায়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

____ঠিক একই মুহূর্তে, কায়সার ম্যানশনের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল রিত্তিকা । রিত্তিকা হাঁটতে হাঁটতে নিজের পরনের গোলাপী গাউনটার দিকে তাকিয়ে কুঁচকে যাওয়া অংশটা ঠিক করছিল। ও এতটাই মগ্ন ছিল যে সামনে কে আছে খেয়ালই করেনি।
​আর ঠিক তখনই—ধড়াম!
​দরজার কাছে দাঁড়ানো কারোর শক্ত পক্ত বুকের সাথে বেশ জোরেই ধাক্কা খেল রিত্তিকা। আচমকা ধাক্কায় ও ছিটকে পড়তে গিয়েও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল, কিন্তু কপালে বেশ ভালোই চোট লাগল।
​রিত্তিকা রাগে অন্ধ হয়ে কপাল ডলতে ডলতে মুখঝামটা দিয়ে বলে উঠল,
“শালা! চোখে দেখিস না নাকি রে? দিলি তো আমার কপালটা ফাটিয়ে! বদদোয়া দিলাম—তোর জীবনেও কোনোদিন বিয়ে হবে না, আর বিয়ে হলেও কোনোদিন বাচ্চা কাচ্চা হবে না, বলে দিলাম!”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে রিত্তিকা যেইনা রাগি চোখে ওপরের দিকে তাকাল, অমনি জিয়ানের চোখের সাথে ওর চোখাচোখি হলো। জিয়ানও তখন চোখ বড় বড় করে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
​মুহূর্তের মধ্যে দুজনের মুখ দিয়েই একসাথে চিৎকার
বেরিয়ে এলো—”তুমি?!” / “আপনি?!”

​রিত্তিকা দুই সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে থেকে, কোমরে হাত দিয়ে জিয়ানকে চার্জ করল, “আপনি এখানে কী করছেন শুনি? নিশ্চয়ই আমার পিছু পিছু এখানে এসেছেন, তাই না?”
​জিয়ান রিত্তিকার অবান্তর কথা শুনে তাচ্ছিল্যের এক ফালি হাসি হাসল। তারপর হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে একটু ঝুঁকে বলল,

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৪

“বাহ্! বেশ চমৎকার তো! আমার নিজের বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকেই জিজ্ঞেস করছ আমি এখানে কী করছি? আর এই যে মিস পুকি, একটু আগে কী যেন বলছিলে? বিয়ে হবে না, বাচ্চা হবে না… তাই না?”
জিয়ানের গম্ভীর গলার ধমক মেশানো কথা শুনে রিত্তিকার এতক্ষণের সব তেজ এক নিমেষে উবে গেল। ও ঢোক গিলে কপাল থেকে হাত সরিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “না… মানে… আমি… আমি তো ওসব কিছু বলিনি! আপনি ভুল শুনেছেন।”
আমি ভুল শুনেছি…

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here