Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১১

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১১

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১১
রাত্রি মনি

ইতালি,ক্রেমোনা
শহরটির এক নির্জন শিল্পাঞ্চলে এই পুরোনো গোডাউনটা অবস্থিত। দিনের বেলা শহরটা যতোটা শিল্পসংস্কৃতিতে ভরা, রাত হলেই ততোটা নিঃস্তব্ধ আর রহস্যময়। গোডাউনের চারপাশে ফ্যাক্টরি, পুরোনো ট্রেনলাইন আর নদীর পাশ ঘেঁষা গুদামঘর, যেন এক মৃত্যুঘণ্টার অপেক্ষা করছে।
গোডাউনের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স। ২৪ ঘণ্টার সেই অভিশপ্ত সময়সীমা পার হয়ে গেছে মাত্র কয়েক মিনিট আগে। কার্লোর চোয়াল পাথরের মতো শক্ত, চোখ দুটো আগ্নেয়গিরির লাভার মতো জ্বলছে। সে হাতের নাইন এমএম পিস্তলটা শক্ত করে ধরে সজোরে লাথি মারল গোডাউনের মরচে ধরা বিশাল কপাটে।

‘ধড়াস!’ শব্দে দরজাটা খুলে যেতেই এক তপ্ত বাতাসের ঝাপটা তাদের নাকে এসে লাগল—বাতাস নয়, যেন নরকের নিঃশ্বাস। ছাদের একটা অংশ থেকে চুনবালি খসে পড়ল, আর তার সাথে ঝরে পড়ল অগুনতি বিশালাকার কালো মাকড়সা। বিষাক্ত ছোপওয়ালা সেই কীটপতঙ্গগুলো পায়ের তলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যেন তারা কোনো অশুভ আগন্তুককে স্বাগত জানাচ্ছে।
ধুলোবালির আড়ালে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল অলিভা। তার চোখে সেই হাড়হিম করা চাহনি, ঠোঁটে এক পৈশাচিক বিজয়োল্লাস। মুহূর্তের জন্য কার্লোর চোখের দিকে তাকিয়ে সে এক রহস্যময় হাসি দিল। ঠিক সেই সেকেন্ডে গোডাউনের সমস্ত ফ্লাডলাইট একযোগে ফেটে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারপাশ।
“বেনজি, লাইট!”

কার্লো চিৎকার করে উঠল।সেকেন্ডের মাথায় শক্তিশালী সার্চলাইটের আলো জ্বলে উঠল। কার্লো আর বেনজি হাত দিয়ে চোখ আড়াল করল। কয়েক পলক পরেই হাত সরাতেই তারা যা দেখল, তাতে তাদের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সামনে কেউ নেই। অলিভা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কিন্তু তার জায়গায় পড়ে আছে এক দলা মাংসের স্তূপ।
ওটা মুনা।শরীরটা বিকৃত, গলে যাওয়া লাশের মতো ফুলে উঠেছে। ঠোঁট আর গাল এমনভাবে সেলাই করা যে মনে হচ্ছে কোনো অদক্ষ কসাইয়ের কাজ। মাথার চুলগুলো নেই, কেবল থোকা থোকা রক্তমাখা চামড়া পড়ে আছে মেঝেতে। মাথার খুলি থেকে মস্তিষ্ক যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এমন বীভৎস দৃশ্য দেখে বেনজি আর সামলাতে পারল না, পাশ ফিরে বমি করে দিল সে। পুরো গুদামে ছড়িয়ে পড়েছে উৎকট পচা মাংস আর রক্তের কটু গন্ধ।
কার্লো পাগলের মতো আশেপাশে খুঁজল। কোনো গোপন দরজা নেই, কোনো পালানোর সুড়ঙ্গ নেই। জানালাগুলো ওপর থেকে সিল করা। তার ফোর্স পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে, মশা গলারও উপায় নেই। অথচ মেয়েটা উধাও!
কার্লো লাশের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। মুনার কপালে সেই বীভৎস খোদাই— “BLOODY QUEEN”।
পাশেই পড়ে আছে সেই লাল লিপস্টিক, ভাঙা কাঁচ আর রক্তমাখা ব্লেড। কার্লোর ভেতরে রাগের এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটল। সে দেয়ালে সজোরে এক ঘুষি মেরে গর্জে উঠল,

“She planned the whole damn murder and vanished! এটাই ছিল তার গেম! আমাদের সামনে দিয়েই সে বেরিয়ে গেল আর আমরা স্রেফ দর্শকের মতো তাকিয়ে রইলাম!”
দেয়ালের টাটকা রক্তের ছোপের নিচে কার্লোর চোখে পড়ল ছোট এক টুকরো কাগজ। কাঁপা হাতে সেটা তুলে নিল সে। তাতে লেখা:
“প্রতিযোগিতা শেষ। আমি জিতেছি।”
কার্লোর কণ্ঠস্বর ভেঙে আসা ফিসফিসে পরিণত হলো। তার চোখে এখন আগামীর ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি। সে নিজের মনেই আওড়ালো,
“এটা এখন আর কেবল সিরিয়াল কিলিং নয় বেনজি, এটা ওর শুরু করা একটা ক্রুসেড। সে আমাদের সিস্টেমকে উপহাস করে গেছে। ওর শিকার আরও আসছে… বাট হু ইজ হার নেক্সট টার্গেট?……….”

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রিম খুব সন্তর্পণে পুরো পেন্টহাউজটি ঘুরে দেখছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর পর্যবেক্ষণ—যদি পালানোর কোনো একটা সহজ পথ খুঁজে পাওয়া যায়! এখানকার বিলাসিতা দেখে সে বারবারই বিস্মিত হচ্ছে। মানুষ এতটা আভিজাত্যের মধ্যে কীভাবে বাস করে? পুরো পেন্টহাউজটি যেন কালোর এক রহস্যময় সাম্রাজ্য। আধুনিক জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা আর স্বর্ণ-হীরের নিখুঁত ছোঁয়ায় সাজানো প্রতিটি আসবাবপত্র রাজকীয়তার জানান দিচ্ছে।
ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এক পাশ থেকে ভারী লোহার ঘর্ষণের শব্দ ভেসে এল রিমের কানে। কৌতূহলী মন নিয়ে সে ধীর পায়ে শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে গেল।

ভারী দরজাটা ঠেলতেই এক হিমশীতল হাওয়া রিমের শরীর ভেদ করে চলে গেল। পুরো ঘরটা যেন এক আয়নার গোলকধাঁধা; প্রতিটি দেয়ালে নিজের ছায়ার মতো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেয়ালের একপাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা কালো আর সিলভার রঙের ডাম্বেল স্ট্যান্ড, ভারি বারবেল আর কেটল বেলস। ঘরের এক কোণে পেশী গঠনের অত্যাধুনিক ‘স্মিথ মেশিন’। তার পাশেই সাইলেন্ট মোটরে চলা ট্রেডমিল আর রোয়িং মেশিনগুলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—দেখে মনে হবে এক আস্ত জিমনেসিয়ামকে তুলে আনা হয়েছে এই ঘরের ভেতর।
মেঝেতে বিছানো কালো রাবারের কার্পেট, যা ভারী ওজনের শব্দকে শুষে নেয় নিমিষেই। ছাদ থেকে চুইয়ে পড়ছে হালকা নীল ডিমলাইটের আভা, আর মাঝে মাঝে স্পটলাইটের তীক্ষ্ণ আলো ঘরের রহস্যময়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিশাল এক কাঁচের দেয়াল জুড়ে বাইরের শহরের ভিউ; কাঁচটা কালো হলেও ভেতর থেকে রাতের শহরের ছায়াপথ স্পষ্ট দেখা যায়।

একটি কাঠের তাকে সাজানো জলের বোতল, তোয়ালে আর সুগন্ধি স্যানিটাইজার। আর ঠিক তার পাশেই ব্যক্তিগত লকার, যেখানে পড়ে আছে ঘামভেজা গ্লাভস আর একটি কালো হুডি।
হঠাৎ রিমের দৃষ্টি আটকে গেল বিশাল এক আয়নার ওপর। আয়নার প্রতিবিম্বটা তাকে যেন সম্মোহিত করে ফেলল। সেখানে দেখা যাচ্ছে এক যুবককে—উন্মুক্ত উপরিভাগ, পরনে কেবল কালো ট্রাকপ্যান্ট। সে একাগ্রচিত্তে ডাম্বেল তুলছে। প্রতিটি উত্তোলনের সাথে সাথে তার শরীরের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠছে। ঘামে ভেজা ফর্সা শরীরটা স্পটলাইটের আলোয় হীরের মতো চকচক করছে। ঘামভেজা সিল্কি কালো চুলগুলো কপালে এসে অবিন্যস্তভাবে লুটিয়ে আছে।

রিম পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বড় বড় হয়ে যাওয়া চোখের মণি এক জায়গায় থমকে গেছে। বুকের ভেতরটা যেন ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে; নিঃশ্বাস এলোমেলো, হৃদস্পন্দনের শব্দ নিজের কানেই বাজছে। সে চাইছে চোখ ফিরিয়ে নিতে, কিন্তু এক অদৃশ্য মায়াজালে সে তখন বন্দী।
ঠিক তখনই এজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হলো আয়নার ওপর। রিমের অপ্রস্তুত প্রতিফলন দেখে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসি। সে ডাম্বেলজোড়া সশব্দে মেঝেতে রেখে ঘুরে দাঁড়াল। হাতের ইশারায় তুলে নিল ম্যাট স্টিলের কালো জলের বোতলটি। তারপর, বোতলের মুখ খুলে ঢকঢক করে কিছুটা পানি খেয়ে নিল। তখন তার গলার অ্যাডাম অ্যাপেল আকর্ষণীয় ভাবে ওঠানামা করছিল। খাওয়ার পর বোতলের ঠান্ডা জল এক ঝটকায় ঢেলে দিল সোজা নিজের মাথার ওপর।
শান্তিতে চোখ দুটো বুজে এল এজের। তৃপ্তির আবেশে মাথাটা দুপাশে দোলাতেই জলবিন্দুগুলো হিরের কুচির মতো চারদিকে ছিটে পড়ল। কপাল, গাল আর ঘাড় বেয়ে সেই হিমশীতল জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে তার উন্মুক্ত বুকের খাঁজে। ঘাম আর জলের সংমিশ্রণে তার পেশিবহুল ফর্সা শরীরটা স্পটলাইটের নিচে এক বন্য সৌন্দর্যে চকচক করে উঠল।

দৃশ্যটা রিমের জন্য অসহ্য রকমের সম্মোহনী। সে যেন নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেছে। কেমন হাঁসফাঁস করতে লাগলো।তার এই বেহাল দশা দেখে এজের ঠোঁটের সেই বাঁকা হাসিটা আরও গাঢ় হলো। সে ধীর লয়ে, শিকারি চিতার মতো এগোতে শুরু করল রিমের দিকে।
বিপজ্জনক কোনো কিছু দেখে মানুষ যেমন পিছিয়ে যায়, রিমও তেমনি পেছাতে শুরু করল। কিন্তু পেছনে শীতল দেয়াল আর সামনে এই ‘মনস্টার’। পালানোর সব পথ রুদ্ধ। ভয়ে রিমের বুকটা শুকিয়ে এল, হৃদপিণ্ডটা যেন গলার কাছে এসে ধকধক করছে। এক সময় তার পিঠ গিয়ে ঠেকল শক্ত দেয়ালে।
এজে একটু ঝুঁকে এল তার ওপর। মুহূর্তেই এজের শরীরের কড়া পুরুষালি পারফিউমের ঘ্রাণ গ্রাস করে নিল রিমের চারপাশ। ঘ্রাণটা ভীষণ তীব্র, মাদকতায় ঠাসা—যাকে বলে খাঁটি ‘ব্যাডবয়’ ভাইব। সেই ঘ্রাণ আর এজের শরীরের উত্তাপে রিম যেন শ্বাসকষ্টে ভুগছে। তার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে এল, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। এক চরম অস্থিরতা আর আতঙ্কে রিম তখন দিশেহারা।
এজে রিমের একদম কাছে এসে থামল, তারপর দুই হাত দেয়ালের দুপাশে ঠেস দিয়ে রিমকে মাঝখানে আটকে ফেলল। পালানোর আর কোনো পথ খোলা নেই। রিম এখন এজের তৈরি করা এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি।
এজে একটু ঝুঁকে এল তার কানের কাছে। তার তপ্ত নিঃশ্বাস রিমের গলায় আছড়ে পড়ছে। সে শান্ত কিন্তু গভীর গলায় প্রশ্ন করল,

“তুমি কি কিছু খুঁজছিলে বার্বিডল? নাকি আমাকেই দেখতে এসেছ?”
তড়িঘড়ি করে মুখ ফিরিয়ে নিল রিম। এজের নগ্ন শরীরের উত্তাপ আর তীব্র পারফিউমের ঘ্রাণে তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“আমি… আমি আসলে ভুল করে ঢুকে পড়েছি। ভেবেছিলাম এটা হয়তো লাইব্রেরি রুম! আমি জাস্ট…”
রিমের অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে এজের ঠোঁটে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে আরও কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয়ে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি কি জানো, আমি যখন জিমে থাকি তখন এখানে ঢোকার স্পর্ধা দেখায় না কেউ? আর তুমি… তুমি আমার সব নিয়ম এক এক করে ভেঙে দিচ্ছ। অথচ ‘রুল ব্রেক’ করা একদমই পছন্দ করি না আমি।”
কথাটা বলেই এজে নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন এক গভীর নেশা। কিছুক্ষণ রিমের ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সে নিচু স্বরে বলল,
“বাট…. ইফ ইউ ওয়ান্ট, আই ক্যান ব্রেক অল মাই রুলস…. অনলি ফর ইউ।”
রিমের সারা শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। এজের এই শান্ত অথচ ভয়ানক রূপ তাকে পাথর করে দিয়েছে। দেয়াল আর এজের সুঠাম শরীরের মাঝখানে সে যেন এক চিলতে অসহায় অস্তিত্ব, যে শ্বাস নিতেও এখন ভয় পাচ্ছে।রিম এই মুহূর্তেই এখান থেকে পালাতে চায়, কিন্তু এজের পাহাড়সম অটল শরীরের সামনে সে এক লতা মাত্র। তাকে এক চুল নড়ানোর ক্ষমতাও রিমের নেই।হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল এজের বুকের বাম পাশের সেই কুচকুচে কালো তিলটার ওপর। এই প্রথম এত কাছ থেকে এই মানুষটার উন্মুক্ত শরীর দেখছে সে। রিমের বুকের ভেতর নিঃশ্বাসের গতিবেগ তখন নিয়ন্ত্রণহীন। সে এক জোড়া আতঙ্কিত আর এলোমেলো দৃষ্টি মেলল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘মনস্টার’টার দিকে।
এজে আরও কিছুটা ঝুঁকে এল। রিমের কানের লতি স্পর্শ করল তার তপ্ত নিঃশ্বাস। সে ফিসফিস করে কামনার সুরে বলল,

“এভাবে চোরা চোখে দেখার কী আছে সোনা? আমি তো সম্পূর্ণ তোমারই! চাইলে সরাসরিই দেখতে পারো। তুমি চাইলে শুধু উপরেরটা কেন, নিচেরটাও খুলে দেখাতে পারি।”
কথাটা কানে যেতেই রিম ঘৃণায় আর লজ্জায় চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল। নিজের কান দুটো দুহাতে চেপে ধরল সে। মনে হলো দম বন্ধ হয়ে এখনই সে মারা যাবে। কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে সে অস্ফুট স্বরে কেবল একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পারল,
“ছিঃ!…”
এজের ঠোঁটে খেলে গেল এক নিঃশব্দ শয়তানি হাসি। রিম এবার সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে চোখ খুলে এজের মুখের দিকে তাকাল। খুব কাছ থেকে লোকটাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল সে। ক্লিন শেভ করা ফর্সা আর তীক্ষ্ণ চোয়ালের গড়ন। সরু নাকের ঠিক ডগায় একটা লালচে তিল—যা আগে কখনো রিমের চোখে পড়েনি। আজ এই অতি নৈকট্যই হয়তো তাকে সব খুঁটিনাটি দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। এজের শুষ্ক খয়েরি ঠোঁট জোড়া এখন জলে ভিজে টসটসে হয়ে আছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে আছে এজের ওই ঘন পাপড়িওয়ালা একজোড়া চোখে। চোখের মণি দুটো অদ্ভুত আকাশী আর ধূসরের এক দুর্লভ মিশ্রণ। সেই চোখ এতটাই গভীর আর রহস্যময়ী যে, একবার তাকালে যে কেউ ওই নীল সমুদ্রের অতলে হারিয়ে যেতে বাধ্য।এত সুদর্শন এই যুবক! অথচ কার্যক্রম গুলো এতটাই হিংস্র। হিংস্রতার আড়ালে এ যেন এক ভয়ংকর সুন্দরের মলাট।
রিমের ভেতরটা এক অজানা অস্থিরতায় তোলপাড় হচ্ছে। এই চোখ দুটো তার খুব চেনা মনে হচ্ছে; যেন এর আগেও বহুবার, অতি কাছ থেকে সে এই অদ্ভুত চোখ দুটো দেখেছে সে। কিন্তু কোথায়? ঝাপসা স্মৃতিগুলো জট পাকিয়ে যাচ্ছে তার মস্তিষ্কে।
রিমের বিচলিত দশা দেখে এক চিলতে বাঁকা হাসল এজে। নিঃশব্দে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে সে বুক টানটান করে দাঁড়াল। সে শিকারি ঈগল পাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিমের থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অবলোকন করছে।

“এখনই এই অবস্থা! এখনো তো ছুঁয়ে দেখিনি সোনা। যদি ছুঁয়ে দিই, তখন তোমার অবস্থা কী হবে?”
বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো চোখ তুলে তাকাল রিম। এবার তার চোখে ভয়ের চেয়ে রাগের আগুন বেশি। সে ঘৃণায় ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আপনি একটা জঘন্য লোক!”
“জঘন্য হওয়ার মতো কোনো কাজ তো এখনও করলামই না। তবে তুমি চাইলে করতে পারি।”
এজে কিছুটা ঝুঁকে এল।
“জাস্ট টেল মি ওয়ান্স, হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট মি টু ডু?”
ক্রোধে আর বিতৃষ্ণায় রিমের শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এল। এই লোকটা যে একটা জানোয়ার, একটা ‘ব্লাডি বিস্ট’—সেটা তার জানা ছিল। কিন্তু এতটা নির্লজ্জ আর কুরুচিপূর্ণ হতে পারে, তা সে কল্পনাও করেনি। রিম এবার তেজের সাথে বলে উঠল,

“আমার কাছে আসার চেষ্টা করলে আপনি জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যাবেন!”
এজে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে নেশালো দৃষ্টিতে তাকাল। যেন আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে থাকা কোনো পতঙ্গ। সে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
“জ্বলতেই তো চাই! জ্বালিয়ে শেষ করে ফেলো না আমাকে। আই ডোন্ট মাইন্ড!”
“আপনি হয়তো ভুলে গেছেন, গোলাপেও কাঁটা থাকে।”
রিম তার তর্জনী তুলে হুঁশিয়ার করে দিল।
“ছিঁড়তে গেলে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবেন।”
এজের চোখে তখন অদম্য এক নেশা। সে ফিসফিস করে বলল,
“সেই গোলাপ যদি তুমি হও, তবে আমি সহস্রবার ক্ষতবিক্ষত হতে রাজি! তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি এমন হাজারো বিষাক্ত যন্ত্রণা মুখ বুজে সইব। বিনিময়ে শুধু তোমাকেই চাই। তখন এই যন্ত্রণাই আমার কাছে স্বর্গসুখ মনে হবে।”

রিম সশব্দে একটা ঘৃণাভরা নিঃশ্বাস ফেলল। এই জানোয়ারটার প্রতি ঘৃণা ছাড়া তার মনে আর কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট নেই। সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“সেই সুখ কোনোদিন আপনাকে হাতছানি দেবে না। কক্ষনো না!”
এজে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। অবহেলার সাথে তুলে নিল ধবধবে সাদা তোয়ালেটা। মাথা মুছতে মুছতে ভেজা চুলে একটা ঝাড়া দিতেই কয়েক ফোঁটা জল ছিটকে এল রিমের মুখের ওপর। রিম অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। এজে তখন নির্বিকার ভঙ্গিতে তোয়ালে দিয়ে ঘাড় আর গলা মুছতে ব্যস্ত।
রিম আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে পারছে না। দমবন্ধ করা এই পরিবেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সে যেই না পা বাড়াল, অমনি তার দৃষ্টি আটকে গেল এজের পিঠের উপরিভাগে—ঘাড়ের ঠিক নিচে থাকা সেই ছোট্ট কাটা দাগটার ওপর। দূর থেকে এই দাগ হয়তো কারো চোখে পড়ে না, কিন্তু এই চরম নৈকট্য আজ রিমকে এক নিষিদ্ধ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

দাগটা দেখা মাত্রই রিমের ভেতরে যেন সহস্র ভোল্টের একটা বৈদ্যুতিক শক লাগল। মস্তিষ্কের কোনো এক অন্ধকার কোণে পুরনো স্মৃতির একটা ঝাপসা পর্দা দুলে উঠল। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল
“এ-এই দাগ… এই দাগটা আমি কোথাও দেখেছি। কে… কে আপনি?”
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেল না রিম। চোখের পলকে এজে বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। এক হাতে রিমের মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল সে, আর অন্য হাতে তার লতানো সরু কোমরটা পেঁচিয়ে ধরে টেনে আনল নিজের শরীরের সাথে। একদম কাছে… এতটাই কাছে যে রিমের নাক গিয়ে ঠেকেছে এজের ভিজে ওঠা উন্মুক্ত বক্ষে। রিমের নিঃশ্বাস যেন স্থবির হয়ে গেল, সে কেবল অসাধ্য চেষ্টায় একটা শুষ্ক ঢোক গিলল। সব কিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে বোঝার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে সে।
এজে তার কানের একদম কাছে মুখ নামিয়ে আনল। তার তপ্ত ও কড়া পারফিউম মিশ্রিত নিঃশ্বাস রিমের চামড়ায় কাঁটা দিচ্ছে। ফিসফিসে কিন্তু পাথরের মতো ভারী গলায় সে প্রশ্ন করল,

“জানতে চাও আমি কে?”
রিম চাইলেও তার চোখের মণি সরাতে পারছে না। তার দুচোখ ছাপিয়ে জল টলমল করছে। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু এজে তাকে সেই সুযোগ দিল না। তার কণ্ঠস্বর এবার আরও ধারালো হয়ে উঠল,
“তোমার অতীত আমি ছিলাম, এখন তোমার ভবিষ্যৎ-ও আমিই হব। তুমি চাও বা না চাও।”
কথাটা শেষ করেই এক ঝটকায় রিমকে দেয়ালের দিকে ঠেলে দিল সে। পিঠের হাড়টা শক্ত দেয়ালে লেগে রিমের মুখ দিয়ে এক চিলতে যন্ত্রণার আর্তনাদ বেরিয়ে এল। এই জানোয়ারটার কথার বিন্দুবিসর্গও ঢুকছে না রিমের ছোট্ট মস্তিষ্কে। সে কেবল ছলছল নয়নে তাকিয়ে রইল চলে যাওয়া মানুষটার দিকে।
এজে তার কালো হুডিটা গায়ে জড়িয়ে একবারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে জিম থেকে বেরিয়ে গেল। রিমের কাছে পুরো পৃথিবীটা এখন ঘোলাটে ধোঁয়াশা। সে স্পষ্ট জানে, তিন মাস আগে ওই অভিশপ্ত দিনে সে প্রথম এই মানুষটাকে দেখেছে। তার আগে কখনো একে দেখেছে বা চেনে বলে এক ফোঁটা স্মৃতিও তার মনে নেই।
তাহলে ‘অতীত’ আর ‘ভবিষ্যৎ’—এই শব্দগুলোর মানে কী? রিম দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়ল। তার মনে হচ্ছে, সে কোনো এক গভীর চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই।

তিভোলি, রোম
রোমের কোলাহল থেকে দূরে, সবুজে মোড়ানো পাহাড় আর মায়াবী কুয়াশার চাদরে ঢাকা এক প্রাচীন জনপদ—তিভোলি। শহরটি যেন রোমান ইতিহাসের কোনো এক গোপন বাগান, যেখানে প্রতিটি পাথরে প্রাচীন আভিজাত্যের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
এরই এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে “ভিলা গ্রিগোরিয়ানা”। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জলপ্রপাত আর গুহার মায়াজাল একে করে তুলেছে কোনো এক নিপুণ শিল্পীর আঁকা জলরঙের ছবি। বিশাল ‘গ্র্যান্ডে কাসকাটা’র পতনের শব্দে মিশে আছে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতা।
পার্কের একটি ছোট্ট ফোয়ারার ধারে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে রিশাব। পরনে তার ঢিলেঢালা শুভ্র শার্ট আর ওভারসাইজ ডেনিম। চোখে রোদচশমা থাকলেও তার তীক্ষ্ণ মুখশ্রীর আভিজাত্য ঢাকা পড়ে না। ভলিউম কাট চুলে বাতাসে মৃদু দোল খাচ্ছে। পকেটে দুই হাত গুঁজে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রকৃতির দিকে। আপাতদৃষ্টিতে তাকে প্রকৃতিপ্রেমী মনে হলেও, তার গভীর দৃষ্টি জানান দিচ্ছে—সে হয়তো হারিয়ে গেছে অন্য কোনো ভাবনার গহীনে।
হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে এক পশলা ঝড়ের মতো ধেয়ে এলো এক তরুণী। রিশাব কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক প্রচণ্ড ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে ঘাসের ওপর আছড়ে পড়ল। পরক্ষণেই নিজেকে আবিষ্কার করল এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে—তার বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে এক অপরিচিত রোমান কন্যা।
বিরক্তিতে রিশাবের ঘন ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। কোমরে চোট লেগেছে বেশ। দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করল,

“শিট!”
অস্বস্তিতে মেয়েটির গাল লাল হয়ে উঠেছে। সে হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার পিছলে পড়ল রিশাবের ওপর। রিশাব এবার বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
“এখনকার বুড়ো বুড়ো মেয়েরাও কি পার্কে দৌড়াদৌড়ি শুরু করল নাকি? এটা কি পাথরের বাগান না কি রেসিং ট্র্যাক?”
মেয়েটি তার কথার ভাষা না বুঝলেও বিরক্তিটা আঁচ করতে পারল। কাঁপা স্বরে বলল,
“আই… আই অ্যাম সরি! একচুয়ালি আই ডিডেন্ট সি ইউ।”
রিশাবের বিরক্তি যেন আরও বাড়ল। সে বিড়বিড় করে বললো,
“না দেখেই তো স্পেশাল এন্ট্রি দাও। একেবারে বুকের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার মত।”
মেয়েটি বিব্রত মুখে অবিন্যস্ত চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত ত্রাস। রিশাব উঠে দাঁড়ানোর আগে একবার গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আর ইউ অলরাইট?”
মেয়েটি কোনোমতে উত্তর দিল,
“ই-ইয়েস, আই অ্যাম ফাইন।”
আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে সে ঝড়ের বেগে অজানার উদ্দেশ্যে দৌড় দিল। রিশাব অবাক হয়ে দেখল মেয়েটির পলায়ন। ঠিক তখনই ছুটে এল মাহিন।
“স্যার! আপনি ঠিক আছেন তো?”
“হুম,”
এমন সময় পার্কের প্রবেশপথ দিয়ে দু’জন কারাবিনিয়েরি (ইতালীয় সামরিক পুলিশ) মারকুটে ভঙ্গিতে উদয় হলো। তাদের পরনে লাল স্ট্রাইপ দেওয়া ইউনিফর্ম, কোমরে গ্লক পিস্তল আর কাঁধে ঝুলছে ওয়াকিটকি।একজন অফিসার রিশাবের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন।

“এই দিক দিয়ে কোনো মেয়েকে দৌড়ে যেতে দেখেছেন? গায়ের রং ফর্সা, লম্বা চুল?”
রিশাব একটু সময় নিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, একটু আগে একটা টর্নেডো বয়ে গেল এপাশ দিয়ে। আমি তো ভাবলাম প্রেমিকের সাথে ঝগড়া করে পালাচ্ছে।”
অফিসার তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন।
“আর ইউ সিওর?”
রিশাব নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“কাউকে থামিয়ে জেরা করা আমার স্বভাব নয়, অফিসার।”
অফিসার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“মেয়েটি সাধারণ কেউ নয়, সে একজন ধুরন্ধর চোর! আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে পালাচ্ছে।”
তারা আর সময় নষ্ট না করে রিশাবের দেখানো পথে দ্রুত প্রস্থান করল।রিশাব কিছুক্ষণ নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থেকে যেই না পা বাড়াল, অমনি ঘাসের ওপর চিকচিক করে ওঠা একটা জিনিসের দিকে তার নজর পড়ল। নিচু হয়ে সে তুলে নিল একটি ছোট্ট, কারুকাজ করা ব্রোচ। আঙুলের ডগায় ব্রোচটি নিয়ে সে বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলল,
“আ লেডি থিফ… ইন্টারেস্টিং!”

ক্রেমোনার সেই পরিত্যক্ত গোডাউন এখন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। নীল-লাল সাইরেনের আলোয় শিল্পাঞ্চলের অন্ধকার ফালি ফালি হয়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সে যখন মুনার সেই বীভৎস দেহটি তোলা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত পুলিশ অফিসাররাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন।
পুরো এলাকা এখন মিডিয়ার ফ্ল্যাশগানে দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল। সব নিউজ চ্যানেলে স্ক্রল যাচ্ছে— “বিউটি কুইন নো মোর: ক্রেমোনার গুদামে মিলল মুনার বিকৃত লাশ!”
কার্লো গেট দিয়ে বের হতেই ক্যামেরার লেন্স আর মাইক্রোফোনগুলো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
“অফিসার কার্লো, খুনি কি এখনো ভেতরে?”
“পুলিশের ব্যর্থতার দায় কি আপনি নেবেন?”
“খুনি কি তবে আমাদের মাঝেই ঘুরে বেড়াচ্ছে?”
প্রশ্নের বন্যায় কার্লোর মস্তিষ্ক যখন বিস্ফোরিত হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। ভিড়ের একদম শেষ প্রান্তে, একটা ল্যাম্পপোস্টের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক জোড়া চোখের ওপর তার দৃষ্টি স্থির হলো।ধূসর, গভীর এবং অমানুষিক হিংস্র একজোড়া চোখ।সেই দৃষ্টির তীব্রতা কার্লোর মেরুদণ্ড দিয়ে হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিল।
সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সেই ছায়াটি ভিড়ের গোলকধাঁধায় বিলীন হয়ে গেল। কার্লো উন্মত্তের মতো মিডিয়ার লোকজনকে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগোল,

“সরুন! রাস্তা দিন!”
কিন্তু যখন সে সেই স্পটে পৌঁছাল, সেখানে কেবল শূন্যতা আর তপ্ত পিচের গন্ধ।কার্লো হাঁপাতে হাঁপাতে পকেট থেকে সেই রহস্যময় ধাতব বস্তুটি বের করল, যা সে গোডাউনের এক কোণে মুনার লাশের খুব কাছে পেয়েছিল। একটি গোলাকার সিল। তাতে খোদাই করা প্রাচীন কোনো রাজবংশের চিহ্ন—অদ্ভুত এক ঈগল আর সাপের লড়াই। এটি আধুনিক কোনো অলংকার নয়, বরং কয়েকশ বছরের পুরনো কোনো আভিজাত্যের প্রতীক।
সিলটির ওপর আঙুল বোলাতেই কার্লোর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল হাসি ফুটে উঠল।এই সিলটি কোনো সাধারণ সিরিয়াল কিলারের হতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে কোনো অন্ধকার সাম্রাজ্যের ইতিহাস।

চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। গলিটা যেন কোনো এক অজানা গহ্বরের দিকে চলে গেছে। মাঝে মাঝে নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসছে কুকুরের আর্তনাদ—ঠিক যেন কোনো আসন্ন বিপদের সংকেত। সেই নিথর নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ দৌড়ে আসার শব্দ। একটি মেয়ে, অবিন্যস্ত চুলে প্রাণপণ ছুটছে। তার পায়ের আওয়াজ গলির দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছিল গহীন অন্ধকারে।
ঠিক তখনই টায়ারের তীব্র ঘর্ষণে একটি কালো গাড়ি এসে পথ আগলে দাঁড়াল। হেডলাইটের তীব্র আলোয় মেয়েটি চোখ ধাঁধিয়ে থমকে দাঁড়ায়।
গাড়ির দরজা খুলে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল এক যুবক। সোনালি এলোমেলো চুল, ফর্সা ত্বক আর তীক্ষ্ণ চেহারায় এক অদ্ভুত হিংস্র আভিজাত্য। ঠোঁটের নিচের পিয়ার্সিং আর দুই কানের দুল হেডলাইটের আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠছে। গলার লেদার জ্যাকেট ভেদ করে বেরিয়ে আসা জটিল সব ট্যাটু তাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
সে ক্রুর হেসে কামুক দৃষ্টিতে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে এল।

“ভেবেছিলি পালাবি?”
তার কণ্ঠস্বর সাপের মতো হিসহিসিয়ে উঠল।
“আজ পর্যন্ত এই লিওনার্দোর নজর যার ওপর পড়েছে, সে নরক থেকেও পালাতে পারেনি। So, why are you trying to run away from me? Hot-cake!”
লিওনার্দো মেয়েটির গলার কাছে নিজের নাক ঘষতে লাগল। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস টেনে বিকৃত আনন্দ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“Mmm… Silky skin. Soft like a vir*gin cloud. তুমি দৌড়াচ্ছিলে কেন, my candy girl?”
মেয়েটি থরথর করে কাঁপছে। ভয়ের শীতল স্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাচ্ছে। লিওনার্দো তার কম্পন অনুভব করে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল।
“তোমার ভয় আমাকে উত্তেজনা দেয়। I like the way you shake, tasty toy. Play with me, I won’t bite… much.”

মেয়েটি ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু সহানুভূতির বদলে লিওনার্দোর হাত আরও শক্ত হলো।
“Shhh..Don’t cry. কান্না মেয়েদের মানায় না। Little sl*ut.”
হঠাৎ করেই মেয়েটির ভেতরে এক অদ্ভুত জেদ কাজ করল। শেষ চেষ্টায় সর্বশক্তি দিয়ে সে থুতু ছিটিয়ে দিল লিওনার্দোর মুখে।মুহূর্তের জন্য থমকে গেল লিওনার্দো। চোখের দৃষ্টিতে ভেসে উঠল এক হিংস্র শকুনের ছায়া। হাত দিয়ে মুখটা মুছে সে হো হো করে হেসে উঠল—সে হাসি কোনো মানুষের নয়, যেন কোনো পিশাচের।
“You don’t know who I am,”
সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি খাই, চিবাই, তারপর ছুঁড়ে ফেলি।”
অসহায় মেয়েটির শরীর ভেঙে আসছিল। সে অস্ফুট স্বরে আর্তি জানাল,
“Please… leave…”
“Why are you in such a hurry, hot doll? আজ তুমি আমার খেলনা। আমি খেলব, যতক্ষণ না তুমি ভেঙে যাও।”
মেয়েটি মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠল,
“Please! Someone help!”
ঠাস!
এক প্রচণ্ড চড় এসে লাগল মেয়েটির গালে। ছিটকে আসা রক্ত আর গালের ওপর পাঁচ আঙুলের লাল দাগ সাক্ষ্য দিচ্ছে লিওনার্দোর দানবীয় শক্তির।
“ভিক্ষা করবি না, sweetest little pi*ggy. Cry louder! কেউ আসবে না। এটা আমার রাজত্ব।”
লিওনার্দো মেয়েটিকে হিঁচড়ে গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে চলল। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে চরম নির্দয়তায় বলল,
“Tonight your screams will echo in my basement… and I will sleep like a baby.”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১০

গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল লিওনার্দোর বন্ধুরা। তাদের চোখেমুখে পৈশাচিক হাসি। একজনের হাতে থাকা ক্যামেরার লেন্সে বন্দি হচ্ছে এই নির্মম দৃশ্য।
লিওনার্দো মেয়েটিকে ছুঁড়ে ফেললো গাড়িতে,
“ওকে ফার্মহাউসে নিয়ে চল। I want to hear her scream like a real little pi*ggy tonight!”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১২