Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১২

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১২

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১২
রাত্রি মনি

বিশাল ফার্মহাউসের লোহার গেটটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। হেডলাইটের আলো গিয়ে পড়ল নির্জন চত্বরে। গাড়ি থামতেই লিওনার্দো মেয়েটিকে চুলের মুঠি ধরে হিঁচড়ে বের করে আনল। মেয়েটি তার সর্বশক্তি দিয়ে নখ বসিয়ে দিচ্ছিল লিওনার্দোর হাতে, ছটফট করছিল মুক্তি পাওয়ার জন্য। কিন্তু লিওনার্দোর ইস্পাতকঠিন হাতের সামনে তার সেই চেষ্টা ছিল বালির বাঁধের মতো নড়বড়ে।
ফার্মহাউসের ভেতরে এক বিলাসবহুল কক্ষ। চারদিকে দামি আসবাব, মাঝখানে ধবধবে সাদা বিছানা। লিওনার্দো তাকে বিছানার মাঝখানে ছুড়ে মারল। নরম বিছানায় ধাক্কা খেয়ে মেয়েটির মুখ থেকে মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
লিওনার্দো ধীর পায়ে এগোতে লাগল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মৃত্যুর পদধ্বনি। ভয়ে মেয়েটির বুক ধড়ফড় করছিল, সে শরীর টেনে টেনে পেছাতে লাগল। এক সময় পিঠ ঠেকে গেল বিছানার শেষ প্রান্তে। আর পালানোর কোনো পথ নেই।
লিওনার্দো লাফিয়ে উঠে বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসল, তার দীর্ঘ ছায়া গিয়ে পড়ল মেয়েটির ওপর। মেয়েটির দ্রুত স্পন্দন করা বক্ষ আর ভারী নিঃশ্বাস লিওনার্দোর চোখে এক পৈশাচিক লালসা জাগিয়ে তুলল।

“Please… leave me…”
মেয়েটির কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছিল।লিওনার্দো উত্তর না দিয়ে আবারও তার চুলের মুঠি ধরে নিজের মুখের কাছে টেনে আনল। হঠাতই সে নিজের জিভ দিয়ে মেয়েটির গলায় স্পর্শ করল। এক অসহ্য ঘৃণায় শিউরে উঠল মেয়েটির শরীর। লিওনার্দো এবার আরও হিংস্র হয়ে উঠল, পশুর মতো কামড়ে ধরল মেয়েটির গাল।
“আহহ্!”
ব্যথায় চিৎকার করে উঠল মেয়েটি।লিওনার্দোর চোখেমুখে এক পৈশাচিক তৃপ্তি। সে হিসহিসিয়ে বলল, “Cry louder, Candy girl! আমার উত্তেজনা বাড়ছে।”
এক ঝটকায় তাকে বিছানায় ফেলে দিয়ে লিওনার্দো সোজা হয়ে বসলো। শীতল গলায় আদেশ দিল,

“Take off your clothes. আমি ধরলে সেটা তোমার জন্য আরও ভয়াবহ হবে। তুমি শুধু খুলবে আর আমি দেখব, লিটল পিগি। ইওর টাইম স্টার্ট নাও… ওয়ান… টু… থ্রি…”
মেয়েটি নিথর হয়ে পড়ে রইল। কিন্তু ভেতরে জমে ছিল শেষ মরণকামড় দেওয়ার জেদ। সুযোগ বুঝে পাশের টেবিল থেকে একটি ভারি ফ্লাওয়ার ভাস তুলে নিয়ে সে লিওনার্দোর মাথায় আঘাত করতে গেল। কিন্তু লিওনার্দো যেন আগে থেকেই তৈরি ছিল। চোখের পলকে সে চেপে ধরল মেয়েটির হাত। ক্রুর হেসে বলল,
“I like the way you are. তুমি যেহেতু খুললে না, কাজটা তবে আমিই করছি।”
পর মুহূর্তেই এক হিংস্র থাবায় মেয়েটির পাতলা ফ্রকটি ছিঁড়ে ফেলল সে। উন্মুক্ত বক্ষের ওপর লোভাতুর দৃষ্টি ফেলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার শিকারে। বন্ধ ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসতে লাগল মেয়েটির গগণবিদারী চিৎকার। কিন্তু সেই চিৎকার লিওনার্দোকে থামানোর বদলে তাকে আরও উন্মাদ করে তুলল।
কক্ষে কোনো আলো ছিল না। জানালা দিয়ে চুইয়ে আসা ম্লান জোৎস্নায় দেখা যাচ্ছিল মেয়েটির নিঃশব্দ কেঁপে ওঠা শরীর আর বিছানার সাদা চাদরে ছোপ ছোপ টাটকা রক্তের দাগ।
রাত যখন শেষ পর্যায়ে, তখন আর কোনো শব্দ নেই। সেই নীরবতাই যেন চিৎকার করে বলছিল—এই সমাজেই কীভাবে নরকের জন্ম হয়। মেয়েটির শরীরে অজস্র ক্ষতের চিহ্ন, নখগুলো ভেঙে গেছে, চোখের মণি স্থির। তার ঠোঁটে জমে আছে একরাশ নিঃশব্দ আর্তনাদ। মৃত্যু তাকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি, সে যেন এক জীবন্ত লাশ হয়ে পড়ে রইল—এক অনন্ত বিচারের অপেক্ষায়।

ভোরের ম্লান আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের কোণে এসে পড়েছে। রাতের সেই পৈশাচিক উল্লাসের রেশ কাটিয়ে লিওনার্দো এখন ক্লান্ত, কিন্তু তার চোখেমুখে এক বিষাক্ত তৃপ্তি। ঠিক সেই মুহূর্তে কর্কশ শব্দে ডোরবেল বেজে উঠল।
বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলল লিও। সামনে দাঁড়িয়ে তার বন্ধু ম্যাক্স। ম্যাক্সের চোখেমুখে কৌতূহল আর এক চিলতে ধূর্ত হাসি।
“মেয়েটা কি এখনো বেঁচে আছে?”
লিও ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরের ভেতরের কাউচটায় আয়েশ করে গা এলিয়ে দিল সে। তার পরনে কেবল একটি ঢিলেঢালা প্যান্ট, যা নাভির বেশ খানিকটা নিচে নামানো। খালি গায়ে তার পেশিবহুল শরীর জুড়ে থাকা গাঢ় রঙের রহস্যময় ট্যাটুগুলো ভোরের আলোয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
“তোর কী মনে হয়? আমার সাথে রাত কাটানোর পর আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে কি বেঁচে ফিরেছে? অবভিয়াসলি নট। তাহলে আজ কেন ব্যতিক্রম হবে ভাবলি?”
ম্যাক্স ক্রুর হাসল। ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা স্মার্টফোনটি প্রবল শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ম্যাক্স বলল,

“আঙ্কেল ফোন করেছে।”
লিও বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলল,
“তুই কথা বল। বুড়োর প্যাঁচপ্যাঁচানি শোনার মুড নেই আমার।”
ম্যাক্স কল রিসিভ করে কানে ধরল।
“হ্যালো আঙ্কেল!”
ওপাশ থেকে এক গম্ভীর ও ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হোয়ার ইজ লিও?”
“ও তো এখানে নেই আঙ্কেল। কাল রাতে ক্লাবে সবাই একসাথে ছিলাম, তারপর যে যার বাড়িতে চলে গেছে।”
“চুপ করো! ফোনটা ওকে দাও। আই নো ব্লাডিটা তোমাদের সাথেই আছে!”
ওপাশের গর্জন ফোনের বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছিল।ম্যাক্স নিরুপায় হয়ে লিওর দিকে ফোনটা বাড়িয়ে ধরল। লিও একটা দীর্ঘ ও বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা হাতে নিল।

“ইয়াহ ড্যাড।”
“হোয়ার আর ইউ?”
“ফার্ম হাউস।”
“ওদিকে তুমি ফুর্তি করছো আর এখানে তোমার বোন এক বিশাল ব্লান্ডার করে বসে আছে! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি আসো। তোমার স্টুপিড সিস্টার আমাদের ফ্যামিলি সিলমোহরটা হারিয়ে ফেলেছে!”
মুহূর্তের মধ্যে লিওর চেহারার উদাসীনতা উধাও হয়ে গেল। কন্ঠে বিস্ফোরণ,
“হোয়াট? ড্যাম… ইজ শি অ্যান ইডিয়ট? ড্যাড, ওটা যদি একবার পুলিশের হাতে পড়ে, উই আর ফিনিশড!”

স্কুলের সামনের রাস্তাটা ব্যস্ত।রিকশার টুংটাং ঘণ্টা, সাইকেলের হর্ন আর স্কুলবেলের সম্মিলিত কোলাহলে যেন প্রাণ ফিরে পায় চারপাশ। ফুটপাথের এক কোণে ফুচকাওয়ালা তার পসরা সাজিয়ে বসেছে, পাশে ঝালমুড়ি আর ঠান্ডা পানির পসরা। রাস্তার একপাশে স্কুল বাস, সিএনজি আর রিকশার দীর্ঘ সারি; অন্যপাশে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের ভিড়। কারো হাতে রঙিন ছাতা, কারো হাতে সন্তানের টিফিন বক্স।
সেই ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল আট বছরের একরত্তি এক মেয়ে। নেভি ব্লু স্কার্ট, ধবধবে সাদা শার্ট আর গলায় নীল টাই। মাথায় সযত্নে বাঁধা দুটো ঝুঁটি। কাঁধে তার ছোট্ট গোলাপি স্কুল ব্যাগ। এক হাতে বাবার শক্ত আঙুল ধরে দাঁড়িয়ে আছে অন্য হাতে ধরা কটন ক্যান্ডি। তপ্ত রোদে মেয়েটির গোলগাল মুখশ্রীতে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে, ঘর্মাক্ত কপালটা রোদে চিকচিক করছে। তার দুচোখে জমেছে রাজ্যের বিরক্তি। এই অসহ্য গরমে সে আইসক্রিম চেয়েছিল, কিন্তু বাবা হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন এই আঠালো কটন ক্যান্ডি।

৩২ বছর বয়সী সুঠাম দেহের অধিকারী যুবকটি মেয়ের এই অভিমানী মুখ দেখে মনে মনে হাসলেন। ফর্সা, দীর্ঘকায় মানুষটিকে দেখে মনে হয় এখনো যেন টগবগে যুবক। মেয়ের আবদার তিনি বোঝেন, কিন্তু ঠান্ডায় বসা গলার কথা ভেবে আইসক্রিম দিতে রাজি হননি। স্নেহমাখা চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি দুহাত বাড়িয়ে তাকে কোলে নিতে চাইলেন। কিন্তু মুখ কুঁচকে অভিমানী রাজকন্যার উত্তর,
“আমি বড় হয়ে গেছি, কোলে নিতে হবে না!”
বাবা আবারও হাসলেন। নরম স্বরে বললেন,
“আমার মা-টা তো আসলেই বড় হয়ে গেছে!”

বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হতে শুরু করল মেয়েটি। হঠাৎ….. এক বিকট হর্ন। একটা ট্রাক যেন মৃত্যুর গর্জনে ছুটে এল। মুহূর্তে ছিড়ে যায় আঙুলের বাঁধন। ছোট্ট মেয়েটা ছিটকে পড়ল রাস্তার এক কোণে। তার হাতের কটন ক্যান্ডিটা ধুলোয় মিশে গেল, আর তার চেয়েও দ্রুত বেগে রাস্তাটা লাল হতে শুরু করল তার বাবার রক্তে।
চারপাশে মানুষের গগনবিদারী চিৎকার, ছোটাছুটি, ছিটকে পড়া ভাঙা কাঁচের টুকরো আর এক জোড়া বিচ্ছিন্ন জুতো। মেয়েটির হাঁটু থেকে রক্ত ঝরছে, মাথার এক পাশটা ভোঁ ভোঁ করছে। ঝাপসা চোখে সে তাকাতে চাইল নিজের বাবার দিকে।দূরে, ট্রাকের চাকার নিচে পড়ে থাকা নিথর দেহটির সাদা শার্টটা এখন গাঢ় লাল রঙে ভিজে একাকার।
এক ভদ্রমহিলা ছুটে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন আতঙ্কিত শিশুটিকে।আড়াল করতে চাইলেন তার চোখ দুটো। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঝাপসা দৃষ্টি যখন স্পষ্ট হলো, তখন নিজের সবটুকু শক্তি উজাড় করে দিয়ে শিশুসুলভ আর্তনাদে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল সে

“না ! ! !”
ধরফরিয়ে উঠে বসে রিম। তার নিঃশ্বাস টেনে আসছে যেন বুক ফেটে যাবে। ঘর্মাক্ত কপাল, চোখে জল। চারদিক দেখে বুঝে যায়, এটা শুধু একটা স্বপ্ন… কিংবা সত্যের মাঝে আটকে থাকা দুঃস্বপ্ন। শরীরের প্রতিটি স্নায়ু তখনো কাঁপছে।রুদ্ধ কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসে,
“আব্বু….আ…আ… আব্বু…”
তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়; ঠিক যেন হাঁপানি রোগীর মতো খাবি খাচ্ছে সে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্নায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে অদৃশ্য কোনো হাত তার টুঁটি চেপে ধরেছে। বিছানার এক কোণে জবুথবু হয়ে বসে রিম দুই হাতে নিজের মাথাটা আঁকড়ে ধরে। তার কান্নার তীব্রতায় কবুতরের মতো ছোট দেহটি বারবার কেঁপে উঠছে।
কক্ষের অন্ধকারকে ভেদ করে রিমের আর্তনাদ যেন দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। চোখ ভরা আতঙ্ক আর গলায় অবর্ণনীয় কম্পন নিয়ে সে হাহাকার করে ওঠে,

“আব্বু… তুমি কোথায়? প্লিজ… একবার ফিরে এসো!”
ঠিক তখনই দরজায় শোনা যায় কারো হন্তদন্ত পায়ের শব্দ। হুড়মুড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করে এজে। এক মুহূর্তের জন্য সে দরজায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ডানা ভাঙা পাখির মতো খাটের ওপর ছটফট করছে রিম; তার পাগলামি আর আর্তনাদ যেন দেয়ালগুলোকেও কাঁপিয়ে দিচ্ছে। রিমের এই অবস্থা দেখে এজের বুকটা মুচড়ে ওঠে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সে ঝড়ের বেগে ছুটে যায় রিমের কাছে।
বিছানার সামনে হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ে এজে। রিমের ছোট্ট, গোলগাল মুখশ্রী নিজের দুই হাতের তালুতে আগলে ধরে ব্যাকুল স্বরে বলে,
“হেয়… হেয়… বার্বিডল… একবার তাকাও আমার দিকে। কিচ্ছু হয়নি তো। সোনাপাখি আমার, এই তো আমি!”
কিন্তু রিম যেন এক অদৃশ্য গোলকধাঁধায় আটকে আছে। তার দৃষ্টি শূন্য, যেন কোনো অশরীরী বিভীষিকার সঙ্গে সে যুদ্ধ করছে। রিমের এই অসহায়ত্ব এজের ভেতরটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই মোলায়েম হয়ে আসে,

“বার্বিডল, এভাবে কেঁদোনা প্লিজ। তুমি শুধু একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছিলে। কলিজা আমার, শান্ত হও… আমি আছি তো এখানে।”
এজে একপ্রকার জোর করেই রিমের মাথাটা টেনে আনে নিজের বুকের গভীরে। রিমের কান্নার বেগ কমে না, বরং অস্থিরতা আরও বাড়ে। হেঁচকি তুলতে তুলতে সে বলতে থাকে
“আমা… আমার আব্বু… আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আপনি জানেন? আমাকে কেউ ভালোবাসে না। সবাই শুধু ছেড়ে চলে যায়। আমি যাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছি, তাকেই হারিয়ে ফেলেছি। আমার পছন্দের সব জিনিস আমার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। আমার জীবনটা এমন অভিশপ্ত কেন? আমি তো কারো ক্ষতি করিনি! তবে আমার সাথেই কেন এমন হয়? মা-ও আমাকে ভালোবাসে না… কেউ না! আমি কি আল্লাহর এতই অপ্রিয় বান্দা? আমি আর পারছি না… খুব কষ্ট হচ্ছে …”

শিশুর মতো আহাজারি করতে থাকে রিম। এজে রিমের মাথায় হাত রাখে। আলতো বুলিয়ে সে ফিসফিস করে বলে,
“কে বলেছে কেউ নেই? আমি আছি তো। যে তোমাকে কোনোদিন কষ্ট পেতে দেবে না। সারাজীবন এভাবেই নিজের বুকের পাঁজরে আগলে রাখবো তোমায়।”
এজের কথাগুলো যেন রিমের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না, সে এজের পিঠের শার্টটা শক্ত করে দুই হাতে খামচে ধরে বিড়বিড় করে,

“আমার আব্বু… আমার… আমাকে… চলে গেছে… আমাকে ছেড়ে….. আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না প্লিজ… আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে রাখুন।”
এজে তার আলিঙ্গন আরও দৃঢ় করে। ইচ্ছে করছে রিমকে নিজের হৃদপিণ্ডের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে, যেন বাইরের কোনো আঘাত তাকে আর ছুঁতে না পারে। সে
“রিল্যাক্স… শান্ত হও। আমি কোথাও যাবো না তোমাকে ছেড়ে।”
ধীরে ধীরে রিমের অস্থির দেহটি শান্ত হয়ে আসে। এজের শক্ত আলিঙ্গন আর বুকের উষ্ণ ছোঁয়ায় তার অশান্ত নিঃশ্বাসগুলো স্বাভাবিক হতে শুরু করে। সময় যেন সেই মুহূর্তেই থমকে যায়। ঘরে শুধু শোনা যায় দেয়াল ঘড়ির ‘টিক টিক’ শব্দ আর দুই জোড়া তপ্ত নিঃশ্বাসের আদান-প্রদান। শূন্য কক্ষে তাদের হৃদস্পন্দন ছুটছে এক অদম্য গতিতে। কারো মুখে কোনো কথা নেই, তবুও এই নিস্তব্ধতার মাঝেই যেন লুকিয়ে আছে হাজারো না বলা কথা, ব্যথা আর আবেগ।

আস্তে আস্তে চেতনা ফিরে পায় রিম।আর তখনই নাকে আসে সেই পরিচিত পারফিউমের কড়া ঘ্রাণ। মুহূর্তেই যেন টনক নড়ে ওর। এতক্ষণ কার বুকে মাথা রেখে কাঁদছিল সেটা বুঝতে পেরে রিমের সারা শরীর ঘেন্নায় রি রি করে উঠল। ঠিক যেমন আইসিইউ থেকে ফেরা রোগী হঠাৎ চোখ মেলে বাস্তবতা দেখে চমকে ওঠে, রিমও সেভাবে নিজেকে আবিষ্কার করলো বাস্তবে।সে মুহূর্তেই ফিরে এলো নিজের চিরচেনা সেই রণমূর্তি রূপে। গায়ের সবটুকু জোর দিয়ে প্রচন্ড এক ধাক্কা মারল মনস্টারটার বুকে।

অপ্রস্তুত এজে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় মেঝেতে।রিমের জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে জায়গা হতো কবরের নিচে । কিন্তু এখন তার মুখে ক্রোধের লেশমাত্র নেই। বরংচ মুখে রয়েছে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি। এটাই তো চেয়েছিল সে । যেন তার ফায়ারফ্লাই নিজের অগ্নিরূপে ফিরে আসে। এই মেয়েকে দুর্বল দেখতে পারে না সে। এই মেয়ে কষ্ট পেলে, যেন তার নিজের কলিজাটাই ছিদ্র হয়ে যায়। এ মেয়েকে দুর্বল রূপে মানায় না। তার রাগী রূপটাই ভালো লাগে তার কাছে। জংলি বিল্লি একটা ! ইচ্ছে করে….
ঠোট কামড়ে বাঁকা হাসছে জানোয়ারটা। ক্রোধে জ্বলে উঠলো রিমের সর্বাঙ্গ।
“আপনি! আপনি কে আমাকে এভাবে ছুঁতে?খবরদার, আর কক্ষনো কাছে আসবেন না! ঘৃণা করি আপনাকে আমি। আপনি একটা জানোয়ার। কেন বারবার আমার জীবনে বিষিয়ে দিতে আসেন? নিজের ওই নোংরা ছোঁয়া আমার গায়ে লাগাবেন না। আপনার কোনো অধিকার নেই আমার ওপর!”

এতক্ষণ শান্তভাবে সবকিছু উপভোগ করলেও, অধিকার শব্দটা যেন মুহূর্তেই হিংস্র বানিয়ে তুলতে সক্ষম সামনে থাকা যুবককে। সে গর্জে উঠে হাতের ফোনটা সজোরে ছুড়ে মারল ড্রেসিংটেবিলের আয়নায়। ‘ঝনঝন’ শব্দে চুরমার হয়ে গেল আয়নাটা। এক লাফে উঠে রিমের চুলের মুঠি চেপে ধরে ওকে নিজের একদম কাছে টেনে আনল এজে। রিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিস করে বলল,
“অধিকার… অধিকার… অধিকার! শুনতে শুনতে কান পচে গেছে আমার। জানতে চাও কিসের অধিকার? তবে শুনে রাখো— কাগজে-কলমে নয়, রক্তে সই করে তোমাকে নিজের করে নিয়েছি আমি। তুমি শুধু আমার, বুঝতে পেরেছো? আমি ছাড়া তুমি কারোর নও, কিচ্ছু নও; এমনকি তুমি তোমার নিজেরও নও!”
যন্ত্রণায় রিমের চোখে জল চলে এলেও গলা উঁচিয়ে বলল,

“আমি মুক্তি চাই!! আপনি অসুস্থ, পাগল। আপনার সাথে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ থাকতে পারে না।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি অসুস্থ। আমি পাগল। শুধুতোমার জন্য।”
উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল এজে। তারপর হিসহিসিয়ে বললো,
“এখন এই পাগলের সাথেই থাকতে হবে তোমায়।তোমার মুক্তি নেই, আজীবন। আমার নেশা হয়ে গেছো তুমি। আমি ছাড়া কেউ যদি তোমার পাশে শ্বাসও নিতে চায় তাকে শেষ করে ফেলব। তুমি আমার ছিলে,আছো আর থাকবে।”
রিম দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আপনি শুধু আমার শরীরটাকেই খাঁচায় বন্দি করতে পারবেন। আমার আত্মা এখনো আমার। সেটা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আপনার মতো দজ্জালের নেই।”
এজে এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে রিমের চোখের ওপর চোখ রাখল। নিচু স্বরে বলল,
“তোমার আত্মা? ওটা তো অনেক আগেই আমার এই লোহার শিকলে বাঁধা পড়ে গেছে ফায়ারফ্লাই। শুধু তুমি এখনো বুঝে উঠতে পারোনি…”

রিমের ভেতরটা তখন ক্রোধে ফুঁসছে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক ধাক্কায় মেঝেতে থাকা কাঁচের ছোট্ট টি-টেবিলটা উল্টে ফেলে দিল সে। ‘ঝনঝন’ শব্দে চুরমার হয়ে গেল টেবিলটা। এজে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিম নিচ থেকে এক টুকরো ধারালো কাঁচ তুলে নিল।
এজের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। এই মেয়ের কোনো বিশ্বাস নেই, আবার নিজের কোনো ক্ষতি করে বসবে না তো! সে বাধা দিতে এগোতেই রিম এমন কিছু করে বসল যা এজের ভাবনারও বাইরে ছিল।
সেকেন্ডের মাথায় এজের কলার চেপে ধরে ওকে দেয়ালের সাথে পিষে ফেলল রিম। হাতের ভাঙা কাঁচের টুকরোটা বিঁধিয়ে দিল এজের বুকের ঠিক মাঝখানে। মুহূর্তেই কালো শার্ট চুইয়ে গড়িয়ে পড়ল তাজা লাল রক্ত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এজের মুখে কোনো ব্যথার ছাপ নেই। বরং ঠোঁটে লেগে আছে ক্রুর হাসি। এই হাসিটাই রিমের শরীরের প্রতিটি কোষে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
রিম দাঁতে দাঁত বললো,

“আমাকে সস্তা ভাবে নিবেন না একদম! এবার বেশি বাড়াবাড়ি করলে জানে মেরে ফেলব আপনাকে!”
এজে নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল। চোখে ঘোর লাগা উন্মাদনা। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“সে তো অনেক আগেই মেরে ফেলেছ সোনা। তোমার এই বিধ্বংসী বাঘিনী রূপের তেজ দিয়ে আমার ভেতরটা কবেই পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছ। এখনো মারতে পারো… তোমার হাতে আমি হাজারবার মরতে রাজি।”
কথাগুলো এজে এত সহজভাবে বলল যে মনে হলো সে কোনো সাধারণ বিষয় নিয়ে গল্প করছে। জীবনের মায়া যেন ওর কাছে একদমই তুচ্ছ। রিম এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। হাতের বাঁধন কিছুটা শিথিল হয়ে এল। এজে তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার বলল,

“কী হলো? হাত কাঁপছে কেন? মেরে ফেলো! তোমার হাতে মরেও আমি শান্তি পাব। শুধু একটা কথা রেখো— আমার শেষ নিঃশ্বাসটা যখন বের হবে, মাথাটা যেন তোমার কোলেই থাকে। আমার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট।”
রিমের চোখে তখন আগুনের স্ফুলিঙ্গ।তার ক্রোধ, একটু আগের কান্না, সব মিলিয়ে মুখে ফুটে উঠেছে রক্তিম আভা।তার দ্রুত আর তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো বারবার এজের বুকের খাঁজে আছড়ে পড়ছে। এজে তখন সম্পূর্ণ মোহাচ্ছন্ন; রিমের এই সান্নিধ্য তাকে এক অদ্ভুত ঘোরের রাজ্যে নিয়ে গেছে। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন নেশা ধরা এক উন্মাদনা।নিস্পৃহ কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে মেরে ফেলো সোনা… কারণ আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে তোমার কোনো মুক্তি নেই। তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে, তোমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে আমি বিষ হয়ে মিশে থাকব। দুনিয়ার সব মানুষের চোখের আড়ালে, তুমি শুধু আমার খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকবে। আর ভেবো না যে আমি মরে গেলে তুমি পার পাবে। মরে গিয়েও তোমার পিছু ছাড়ব না আমি।”

রিম রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কাঁচের টুকরোটা আরও জোরে এজের বুকের গভীরে চেপে ধরল। কিন্তু মুহূর্তেই সেই টকটকে লাল রক্ত দেখে তার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। হাতের কাঁপন আর থামছে না। রক্তের প্রতি পুরনো ফোবিয়া মুহূর্তেই কাবু করে ফেলল তাকে।রিমের শ্বাস ভারী হয়ে এল, কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল,
“রক্ত… রর… রক্ত…”
রিমের হাত থেকে কাঁচের টুকরোটা মেঝেতে পড়ে গেল।চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছোটবেলার সেই বীভৎস স্মৃতি। রক্তে ভেজা বাবার নিথর দেহ। যা তার মনে গভীরভাবে দাগ ফেলেছিল সেদিন। সেদিনের পর থেকেই রক্তের ফোবিয়া রয়েছে তার। তার শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়তে নিলেই একজোড়া শক্তিশালী হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরল। এজে পরম আবেশে রিমকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। রিমের দৃষ্টি তখন ঝাপসা, শরীরের সব শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। সে মনে মনে চাইছিল এজেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে, চিৎকার করে বলতে—

“ছুঁবেন না আমায়!”, কিন্তু জবান ততক্ষণে আড়ষ্ট হয়ে গেছে।
এজের ঠোঁটে তখন এক রহস্যময় হাসি। রিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে একদম নিচু স্বরে সে বলল,
“তুমি আমাকে মারতে পারলে না বার্বিডল। এবার আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে তোমাকে? তোমাকে তিলে তিলে শেষ করব আমি। কারণ ‘আমি’ নামক বিষ ছড়িয়ে পড়েছে তোমার অস্তিত্বে। চাইলেও এই বিষ তুমি শরীর থেকে আলাদা করতে পারবে না। আমি ঠিক মৃত্যুর মতো, একবার পিছু নিলে আর ছাড়ি না। ওয়েলকাম… ওয়েলকাম টু মাই ডার্ক সাইড, বার্বিডল!”

নেপলস, ইতালি
ইতালির কাম্পানিয়া অঞ্চল। ভূমধ্যসাগরের নোনা বাতাস আর পিনপতন নীরবতায় ঢাকা নেপলস শহর।সাগরের বাতাস আর দূরে ভেসে আসা জাহাজের হর্ন ছাড়া শহরটা আজ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। শহরের এক প্রান্তে পরিত্যক্ত শিল্প এলাকার এক অন্ধকার চিপা গলি। সেখানে একটি জং ধরা ম্যানহোলের ঢাকনা। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে এক দশকেরও বেশি সময় কেউ এটি স্পর্শ করেনি। কিন্তু ঢাকনা সরাতেই বেরিয়ে আসে এক গভীর সুড়ঙ্গ আর লোহার খাড়া সিঁড়ি।

নিচে নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। স্যাঁতসেঁতে সুড়ঙ্গ পথ পেরিয়ে এক বিশাল গুদামঘর—যা মূলত নেপলসের নতুন আতঙ্ক “Black Hangman” গ্যাং-এর গোপন আস্তানা। চারদিকে কড়া হলুদ আলোর ঝলকানি আর ভারী অস্ত্রের পাহারা। বাইরে পৃথিবী জানে না, এই ম্যানহোলের নিচেই তৈরি হয়েছে এক নতুন অপরাধ সাম্রাজ্য।
গুদামঘরের মাঝখানে একটি আভিজাত্যপূর্ণ চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন ভিক্টর কাস্তেলো। চওড়া কাঁধ, চোখে পিশাচসুলভ দৃঢ়তা।
শিপ থেকে মাল নামানো হয়েছে। সদ্যই বন্দর থেকে এক বিশাল কন্টেইনার লুট করে এনেছে তার ছেলেরা। ভিক্টর সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে অট্টহাসি হাসল।
“আজ থেকে আমরাই রাজা! এই বন্দরের নতুন নাম হবে—Black Hangman Port!”
গুদামঘরের মেঝেতে রাখা স্তূপীকৃত অস্ত্র আর নিষিদ্ধ ড্রাগসের বস্তা। কিন্তু সবার নজর সেই বিশেষ কন্টেইনারের ভেতর থাকা একটি ছোট, ভারী ধাতব বক্সের দিকে।

“বস, এই বক্সটা অনেক হেভি। ভেতরে কী আছে? হিরোইন নাকি সোনা?”
একজন সদস্য কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল।ভিক্টর মুচকি হাসল। তিন স্তরের পাসওয়ার্ড দিয়ে বক্সটি খুলতেই এক অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দে চারিদিক কেঁপে উঠল।মুহূর্তেই গুদামঘরের তপ্ত বাতাস বরফ হয়ে গেল। ভেতরে কোনো হিরে বা জহরত নেই। মখমলের কাপড়ের ওপর রাখা কেবল একটি সোনালী ধাতব প্লেট। তার ওপর খোদাই করা এক প্রলয়ঙ্করী ড্রাগন—ডানা মেলে আগুনের শিখা উগরে দিচ্ছে। আর প্লেটের উল্টো পিঠে খোদাই করা ইংরেজি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর—”A”।
ভিক্টরের ঠোঁটের জ্বলন্ত সিগারটা মেঝেতে পড়ে গেল। তার চোখের সেই পিশাচসুলভ আত্মবিশ্বাস এক লহমায় আতঙ্কে রূপান্তরিত হলো। পেছনের গার্ডদের হাত থেকে অস্ত্র পড়ে যাওয়ার উপক্রম। কারো কপাল বেয়ে ঘাম নামছে, কারো হাঁটু কাঁপছে দৃশ্যমানভাবে।

“বন্ধ করো বক্সটা! এক্ষুনি!” ভিক্টরের কণ্ঠস্বর কাঁপছে আতঙ্কে,
“ফেরত পাঠাও এটা! সাফ করো সবকিছু! আমাদের গায়ে এর ধুলো পর্যন্ত যেন না থাকে!”
ভিক্টরের এই রূপ দেখে অবাক হলো প্যাট্রিক। সে কেবল এই গ্যাং-এ যোগ দিয়েছে। অবজ্ঞার সুরে সে বলে উঠল,
“বস, আপনি ভয় পাচ্ছেন? এটা তো সামান্য একটা লোগো! Who the hell is this guy? যার জন্য আপনি এভাবে কাঁপছেন? আমি নিজের হাতে তাকে শেষ করব!”
ভিক্টর বাঘের মতো গর্জে উঠে প্যাট্রিকের কলার চেপে ধরল। তার চোখ এখন টকটকে লাল।
“শাট আপ, বা*স্টার্ড! যার নাম উচ্চারণ করলে মৃত্যু দরজায় কড়া নাড়ে, তাকে নিয়ে কথা বলার সাহস করিস না। এই লোগো কোনো সাধারণ চিহ্ন নয়; এটা এক অদৃশ্য অভিশাপ। যার সম্পদ ভুল করে স্পর্শ করা হয়েছে, সে মানুষ নয়—সে এক যমদূত।”

ভিক্টর কাঁপা হাতে বক্সটি বন্ধ করতে করতে বিড়বিড় করে বলল,
“ওকে দেখা যায় না প্যাট্রিক, শুধু অনুভব করা যায়। আর যখন তুই তাকে অনুভব করবি, জানবি তোর আয়ু শেষ।”
হঠাৎ একদিকে বাতি টিমটিম করতে শুরু করে। তারপরেই একে একে নিভে যায় সমস্ত লাইট। মুহূর্তেই সেই আলিশান আস্তানা রূপ নিল এক অন্ধকার গুহায়। অজানা আতঙ্কে সবার বুক কাঁপছে। কেউ একজন কাঁপাকাঁপা হাতে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালালো। হঠাৎ প্যাট্রিকের মনে হলো তার ঘাড়ের পাশ দিয়ে এক হিমশীতল হাওয়া বয়ে গেল। দ্রুত পেছনে ফিরল সে, কিন্তু সেখানে কেবল নিরেট অন্ধকার। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চাইল সে—’কেউ কি এসেছিল?’
ঠিক তখনই অন্ধকারে একটা ছায়া নড়ে উঠল। ‘সঁসঁ…’—খুবই ক্ষীণ একটা শব্দ। বাতাসের ঘর্ষণের মতো।
পরক্ষণেই প্যাট্রিকের কণ্ঠনালীর এক পাশ চিরে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এল। তার চোখ দুটো উল্টে গেল, কথা বলার শক্তিটুকুও পেল না সে। দু-পা প্যাঁচিয়ে নিঃশব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ল তার দেহ। প্রাণহীন চোখ দুটো তখনো বিস্ময়ে খোলা।

“ওই ছায়াটা কী? ওখানে কে দাঁড়িয়ে?”
অন্য একজন আর্তনাদ করে উঠল।কোনো উত্তর নেই। উত্তরের বদলে সুনামির বেগে এক কৃষ্ণবর্ণ অবয়ব আছড়ে পড়ল লোকটার সামনে। কুয়াশার মতো ধোঁয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই মূর্তি। কুচকুচে কালো দীর্ঘ কোট, মাথায় তোলা হুড। আর মুখাবয়বে জ্বলজ্বল করছে একটি সোনালী ড্রাগন মাস্ক। মাস্কের চোখের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসছে একজোড়া শীতল, প্রাণহীন দৃষ্টি।
লোকটি চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু শব্দ বের হওয়ার আগেই এক তীক্ষ্ণ নাইফ তার গলা ভেদ করে চলে গেল। উষ্ণ রক্তে ভিজে লাল হয়ে উঠল ছায়া মানবটির সেই সোনালী মাস্ক।
ভিক্টর কাস্তেলো পেছাতে পেছাতে দেয়ালে ঠেকে গেছে। তার সামনে এখন সাক্ষাৎ যমদূত। কাঁপা কাঁপা গলায় সে বললো,

“আ-আমরা… আমরা ভুল করেছি। জানলে কোনোদিন তোমার এলাকায় হাত দিতাম না। বক্সটা নিয়ে যাও, আমাদের ছেড়ে দাও!”
ছায়াটি নিশ্চুপ। পাথরের মূর্তির মতো স্থির। কোনো দয়া নেই, কোনো আবেগ নেই। সে শুধু তার হাতের ছোট্ট ব্লেডটি আঙুলের ডগায় ঘোরালো। এক… দুই… তিন…।
‘ঘ্যাচ! ঘ্যাচ! ঘ্যাচ!’
পেছন থেকে যারা আক্রমণ করতে এসেছিল, মুহূর্তের ব্যবধানে তাদের দেহগুলো নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ল। গরু কুরবানির পর যেমন ফিকিনি দিয়ে রক্ত ছোটে, ঠিক তেমনিভাবে গুদামঘরের মেঝে ভেসে গেল লালে।
বাকিরা প্রাণভয়ে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু সেখানেও যমদূতদের পাহারা। সবার মুখে একই ড্রাগন মাস্ক, তবে সেগুলো কালো। কেবল গুদামঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়া মানব টির মুখোশটিই সোনালী। সে-ই ড্রাগনের রাজা—”দ্য গোল্ড সাঙ্গুয়ে হান্টার”।

নীরবতা ভেঙে শুরু হলো এক পৈশাচিক উৎসব। ছায়া মানব একজনের ঘাড় চেপে ধরে পুরো শক্তিতে আছড়ে ফেলল ইস্পাতের পাইপের ওপর। মট করে এক বিকট শব্দে মাথার খুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
“এত ভয়ংকর… এত নিঃশব্দে কেউ মারতে পারে?”
ফিসফিসিয়ে বলল একজন। অন্যজন আতঙ্কে তোতলাতে শুরু করল,
“Who… who are you? What are…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ছায়া মানবের এক ঝটকায় সে নিক্ষিপ্ত হলো তেল ভর্তি ড্রামে। মুহূর্তেই তেলের রঙ বদলে লাল হয়ে গেল। তিনজন মিলে পালানোর শেষ চেষ্টা করতেই ছায়া মানব তার পকেট থেকে বের করল এক ঝকঝকে সোনালী লাইটার। আঙুলের ছোঁয়ায় জ্বলে উঠল আগুনের শিখা।

‘বুম!’—এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে গুদামঘরের এক পাশ নরককুণ্ডে পরিণত হলো। আগুনের লেলিহান শিখায় দুজন ছিটকে পড়ল ছিন্নভিন্ন হয়ে। শেষ জীবিত লোকটি যখন দরজার দিকে দৌড়াচ্ছিল, তখনই তার সামনে এসে দাঁড়াল সেই মৃত্যুপ্রতীক।
এতক্ষণে নীরবতা ভাঙল ছায়া মানব। কণ্ঠস্বর বরফশীতল, কিন্তু তাতে যেন ভূমিকম্পের গর্জন মিশে আছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“Useless felon. সামান্য কীট হয়ে আমার জিনিসে হাত দেওয়ার দুঃসাহসিকতা? You have no right to live.”
নিজের লম্বা কোটের পকেট থেকে সে বের করল একটি ছোট্ট শিশি—হাইড্রোফ্লোরিক এসিড। এক নিমেষে তা ছুড়ে মারল লোকটার শরীরে। শুরু হলো হাড় আর মাংস গলে যাওয়ার বীভৎস শব্দ। আর্তনাদ করার সুযোগটুকুও পেল না সে।আগুনের লাল আভা আর পচা মাংসের উৎকট গন্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে রইল গোল্ড সাঙ্গুয়ে হান্টার।

জঙ্গলের বুক চিরে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে ভিক্টর। পেছনে মাত্র একজন গার্ড। তার হাঁটুতে গভীর ক্ষত, মুখ রক্তে মাখামাখি। গোডাউনের পেছনের ভাঙা গেট দিয়ে পালিয়ে এসেছে এই দুই দস্যু। তাদের চোখে এখন কেবল মৃত্যু ভয় আর আতঙ্ক। ওপরের আকাশটা আজ শোকাতুর; ঘন কালো মেঘে ঢাকা। ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক ছাপিয়ে হঠাৎ আকাশ ভেঙে শুরু হলো বজ্রপাত।

অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছুটতে গিয়ে এক বিশাল পাথরে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল ভিক্টর। কপাল ফেটে কাদা আর রক্ত মিশে একাকার হয়ে গেল। নোনা কাদা আর পিঠের রক্ত মাখানো অবস্থায় সে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে বসল। পেছনে তাকাল—না, কেউ নেই। বুক চিরে একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতেই আকাশজুড়ে বিদ্যুতের এক তীব্র ঝলকানি খেলে গেল। আর সেই আলোয় সামনে দৃশ্যটা দেখে ভিক্টরের হৃদপিণ্ড যেন থমকে গেল।
কিছুটা দূরে জঙ্গলের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে একটি কুচকুচে কালো রাজকীয় SUV। ঠাস!! করে আকাশে বাজ পড়ার শব্দ। তারপরেই ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি না, যেন পাগল হয়ে ঝরে পড়া মৃত্যুর অশ্রু। গাড়ির সামনে হাঁটু মুড়ে বসে আছে এক কালো অবয়ব। মাথায় কোটের হুড, মুখে সেই সোনালী ড্রাগন মুখোশ। লোকটা নির্বিকারভাবে ঠোঁটে চেপে রেখেছে দামী ব্র্যান্ডের সিগারেট। পকেট থেকে লাইটার বের করে আগুন জ্বালাল, ঠিক তখনই জ্বেলে উঠল গাড়ির শক্তিশালী স্পটলাইট।
সেই তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল ভিক্টরের। সে কোমর হিঁচড়ে পেছাতে চাইল, কিন্তু শরীর আজ তার কথা শুনছে না। তার সাথে থাকা লোকটিকে ততক্ষণে দবচে ধরেছে ছায়ামানবের গার্ডরা। বাঁচার আকুতিতে লোকটা মিনতি করে উঠল,

“কে তুমি? ছেড়ে দাও প্লিজ! আমরা না বুঝে তোমার জিনিসে হাত দিয়েছি!”
ভিক্টর তখন কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে, অনেকটা ঘোরের মধ্যেই বলে উঠল,
“তার নাম বললে মৃত্যু আসে। এটা শুধু নাম নয়, এ এক অভিশাপ। এ এক মৃত্যুর পূর্বাভাস।এই নামে কেউ বড় হয় না। এই নাম কেউ পায় না। এই নাম জন্মায় মৃত্যু থেকে। সে যেই রাস্তা দিয়ে হেটে যায়, সে রাস্তাও আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। সে যেখানে থাকে, সেখানকার বাতাস মৃত্যুর মতো ভারী হয়ে ওঠে। একমাত্র মৃত্যুর ঘ্রাণ যে পায়, সে ছাড়া কেউ তাকে দেখে না। He is not just a man. He is a nightmare walking in silence. He is…. ‘আরাত্রিক জেইন চৌধুরী’…………”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১১

নামটা উচ্চারণ করার সাথে সাথেই যেন চারপাশের বাতাস থমকে গেল। বজ্রপাতের শব্দও যেন স্তব্ধ হয়ে গেল সেই নামের ভারে।আকাশে আবার বিদ্যুতের ঝলকানি। সেই ক্ষণিক আলোয় দেখা গেল সোনালী মাস্কের আড়ালের মুখাবয়ব। মাস্কের চোখের কোটর দিয়ে বেরিয়ে আসছে এক শীতল নীলাভ আভা। সেই চোখের দৃষ্টি পাথরের মতো ঠান্ডা—যার গভীরে তাকালে মনে হয়, অনন্তকালের মৃত্যু সেখানে হেঁটে বেড়াচ্ছে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৩