Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৩

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৩

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৩
রাত্রি মনি

“আরাত্রিক জেইন চৌধুরী”
এই নাম কোন মানুষকে বোঝায় না। এটা একটা অভিশাপ। একটা আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি। যা একবার উচ্চারণ করলেই চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আসে। এটা একটা ব্র্যান্ড-যেখানে তার ছায়াও মৃত্যু ডেকে আনে। যার অস্তিত্ব মানেই মৃত্যু, ধ্বংস আর আগুন। সে যে রাস্তায় পা রাখে সেখানে পাথরও কেঁপে ওঠে। সে যেখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে নীরবতার ঘনত্বে মৃত্যু ডাকে। এই নামের ছায়া পড়লে জমি অনুর্বর হয়ে যায়। আর হৃদপিণ্ড থেমে যায়।
রক্তে ভেজা রাস্তাগুলোর নিঃশব্দ সাক্ষী সে। নিশুতি রাতে যার পায়ের শব্দ কানে এলে, ঘুমন্ত শহর কেঁপে ওঠে। তার জন্ম হয়েছিল অন্ধকারে। শিরায় শিরায় বয়ে চলা রক্ত যেন আগুনে পুড়ে গড়া। নিষ্ঠুর, শীতল এবং ভয়াবহ রকমের নিঃস্পৃহ। আর চোখ? চোখ দুটো যেন বরফের চেয়েও ঠান্ডা। ধূসর আর আকাশি মেশানো সেই চোখে কেউ একবার তাকালেই কেমন যেন হৃদকম্পন শুরু হয়।

তাকে কেউ প্রতিপক্ষ ভাবে না। কারণ সে প্রতিপক্ষ রেখে দেয় না। যে জ্যান্ত থাকে, সে শুধু তার ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম। আর যে মরে যায়, শেষ হয়ে ওঠে গল্প, গুজব বা হয়তো একটা ছিন্ন ভিন্ন দেহ। নামহীন কবরের নিচে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে থাকা ভয়।
বনের মধ্যে গলি ঘুপচিতে কিংবা জনসম্মুখে তার হত্যাকাণ্ড এক একটা নিখুত শিল্পকর্ম। তার হাতে দয়া নেই, অনুতাপ নেই। তাকে কেউ দেখতে পায় না। যে ব্যক্তি একবার তার সেই অদ্ভুত চোখওয়ালা মুখটা দেখার সৌভাগ্য পায়, তার আর দুনিয়ার আলো দেখা হয়ে ওঠে না। সে একটা দুঃস্বপ্ন। আর সেই দুঃস্বপ্নের নাম – “আরাত্রিক জেইন চৌধুরী”।……….

নেপলসের অন্ধকার জঙ্গল। এটা জঙ্গল নয়, যেন মৃত্যু অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন শিকারভূমি।চারদিকে গাঢ় সবুজ, কিন্তু বাতাসে রক্তের গন্ধ। পাতার নড়াচড়া নেই, অথচ হাড়ে কাঁপুনি ধরানো ঠান্ডা। দূরে কোথাও একটা কাক ডাকছে। নাকি কারও শেষ চিৎকার? বোঝা যায় না।
ভিক্টর কাস্তেলো পড়ে আছে কাদা আর রক্তে মেশানো গর্তের সামনে। শরীর কাদায় লেপটে গেছে। পিঠে লেগে আছে নিজেরই রক্ত। ভয়ে অস্থিরভাবে কাঁপছে তার শরীরটা। কিন্তু তবুও সে পালানোর চেষ্টা করে না। কারন সে জানে স্বয়ং মৃত্যু দূত তার সামনে দাঁড়িয়ে! সে শুধু নিজের মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে আছে জঙ্গলটা। চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কালো মুখোশ পরা, কালো পোশাকধারী কতগুলো গার্ড। আর তারা ধরে রেখেছে ভিক্টরের সেই সঙ্গীটিকে। যে এখন হাঁটু ভেঙ্গে মাথা ঝুকিয়ে বসে আছে। আর তার দুই হাত ধরে রেখেছে দুজন গার্ড। দেখে মনে হবে যেন শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
গাড়ির সামনে আগের মতই মাথায় হুড পরে, সোনালী ড্রাগন মাক্স মুখে,হাঁটু মুড়ে বসে আছে জেইন। কোন নরন চরণ নেই। কোন শব্দ নেই। সে এক নীরব ছায়ার মত। তবুও তার উপস্থিতি যেন এক বিস্ফোরিত আতঙ্ক।
সে হঠাৎ হাতের সিগারেটটা ফেলে, উঠে দাঁড়ায়। চোখ বুজে,মুখ হাঁ করে নিঃশব্দে ধোয়া উড়িয়ে দেয় আকাশের দিকে। বৃষ্টির পানিতে মিলিয়ে যায় তা। সে ধীরে ধীরে কোন শব্দ ছাড়াই এগিয়ে আসে সামনে। তার বুটের শব্দ যত সামনে আগাতে থাকে,, ভিক্টরের হৃদস্পন্দন ততই বাড়তে থাকে।সে চোখের পলকে ভিক্টরের সামনে ঝুঁকে বসে পড়ে হাঁটু মুড়ে।ভিক্টর জানে বাঁচা সম্ভব নয়। কিন্তু তবুও…. সে তো মানুষ মনটা মানতে চায় না। সে বাঁচার জন্য আকুতি করে,

“I , I didn’t know…… it’s you! জানলে কখনো এমন স্পর্ধা দেখাতাম না।”
কথাগুলো সামনে থাকা মানুষটার মনে কোনো ছাপ ফেলতে পারেনা। সে নির্দয়, তার মনে দয়া নেই। যেন একটা পাথর। তার হাতে থাকা ফিশ হুক ব্লেডটি রূপালী মাছের আঁশের মতো চিকচিক করে উঠল। একটু সামনে ঝুঁকে এল। মাস্কের চোখের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসা সেই শীতল নীলাভ আলো যেন ভিক্টরের আত্মার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।বিষাক্ত, ধারালো আর পাথরচাপা স্তব্ধতার মতো শীতল কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলে,
“You didn’t just walk in, Victor. You signed your own death warrant the moment you stepped on my soil.”

বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে জেইনের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক হাসি। মুহূর্তের নীরবতা ভেঙে নেমে এল বিভীষিকা।
‘ছ্যাক!’—এক ঝটকায় ব্লেডটা বসে গেল ভিক্টরের গলায়। আকাশ কাঁপিয়ে এক আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার কণ্ঠ চিরে। ফিনকি দিয়ে উষ্ণ রক্ত ছিটকে এসে ভিজিয়ে দিল জেইনের সোনালী মাস্ক। কিন্তু জেইন থামল না। সে হিংস্র পশুর মতো ভিক্টরকে মাটিতে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরল।
ধারালো ব্লেডটা এবার নেমে এল ভিক্টরের বুকের মাঝ বরাবর। পচে যাওয়া কাপড়ের মতো চিরে গেল বুক। জেইন তার আঙুলগুলো ঢুকিয়ে দিল পাঁজরের হাড়ের খাঁজে। দুই হাত দিয়ে দুই পাশে প্রচণ্ড জোরে টান দিল সে। ‘চররর…’—কাঁচা মাংস আর চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার সেই বীভৎস শব্দে জঙ্গলের বাতাস ভারি হয়ে উঠল। ভিক্টরের বুকটা এখন যেন ব্যাগের খোলা চেইনের মতো হাঁ হয়ে আছে। ভেতরে ধকধক করছে লাল মাংস আর রক্তে ভেজা হৃদপিণ্ডটা।

জেইন এক ঝটকায় তার রক্তমাখা হাত ঢুকিয়ে দিল সেই গর্তে। ‘ঘ্যাচ!’—কলিজা আর টিস্যু ছিঁড়ে বের করে আনল টকটকে লাল হৃদপিণ্ডটা। হাতের তালুর ওপর ওটা তখনও লাফাচ্ছে, শেষবারের মতো লড়াই করছে বাঁচার জন্য। জেইন সেটার দিকে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলল,
“এইটুকু কলিজা আর এত বড় দুঃসাহস!”
মুহূর্তেই হৃদপিণ্ডটা মাটিতে আছড়ে ফেলে চটকে দিল সে। কিন্তু জেইনের তৃষ্ণা মেটেনি। সে নিচু হয়ে ভিক্টরের তলপেট বরাবর ব্লেড চালিয়ে দিল। এক টানে বের করে আনল রক্তে ভেজা নাড়িভুঁড়ি, পাকস্থলী আর যকৃৎ। কোনো ক্ষুধার্ত হায়েনা যেভাবে শিকারকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলে, জেইন ঠিক সেভাবেই একে একে শরীরের ভেতরের অংশগুলো টেনে বের করে চারপাশে ছিটিয়ে দিল।

ভিক্টর তখনও মরেনি। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নিজের শরীরের বাইরের ভেতরের অংশগুলোর দিকে। চোখে জল নেই। মুখে আওয়াজ নেই। আছে শুধু রক্তমাখা নিঃশ্বাস।
চারপাশে সমস্ত গার্ড দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। তাদের মুখে কোন শব্দ নেই। তারা যেন কোন যন্ত্র মানব। তাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তারা জানে তাদের বস এই মুহূর্তে এক নরপি*শাচ।
এক ঝটকায় নিজের মুখোশটা খুলে ফেলে জেইন।জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতো সেই মুখটা দেখতে পেল ভিক্টর। সেই মুখ কোনো সাধারণ মানুষের অবয়ব নয়; এক দানবের মানচিত্র। তীক্ষ্ণ চোয়াল, আর সেই বরফ-শীতল ধূসর-নীলাভ চোখ দুটোর ভেতরে যেন জ্বলছে নরকের নীল শিখা। শেষবারের মতো এই ভয়ংকর মুখটা ভিক্টরের চোখের মণি স্পর্শ করতেই তার শরীরের শেষ কাঁপুনিটা থেমে গেল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল চিরতরে। কিন্তু তার চোখ দুটো তখনও অস্বাভাবিকভাবে খোলা, যেন মৃত্যুর ওপার থেকেও সে ফিরে এসে এই বীভৎস দৃশ্যটা দেখতে চাইছে।
জেইন সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার রক্তাক্ত হাত থেকে একটা পিচ্ছিল অন্ত্র টুপ করে খসে পড়ল মাটিতে। বৃষ্টির পানিতে ভিক্টরের শরীরের ধ্বংসাবশেষগুলো ধুয়ে যাচ্ছে, আর কাদা মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে মানুষের নাড়িভুঁড়ি। সেখানে এখন কোনো মানুষ পড়ে নেই, পড়ে আছে কেবল এক তাল ছিন্নভিন্ন কাঁচা মাংস।

জেইন আকাশের দিকে মুখ তুলে বৃষ্টির ঝাপটা নিলো। তার মুখাবয়বে কোনো ক্লান্তি নেই, আছে এক আদিম তৃপ্তি।আকাশে হুংকারের মতো বজ্রপাত। ভারী বৃষ্টির ফোঁটা তার শরীরে রক্ত ধুয়ে মুছে নিয়ে যাচ্ছে। সে ভিজে ঝুপছুপে হয়ে গেছে। জায়গাটা যেন রক্তে আর কাদায় মিশে একাকার। চারিপাশে কাদামাটি আর রক্তের পচা উটকো গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে।
জেইন নিচু হয়ে কাদা থেকে তার সোনালী মুখোশটা কুড়িয়ে আবার পরে নিল। মুখোশের ড্রাগনটা বৃষ্টির আলোয় আবার হিংস্রভাবে ঝিলিক দিয়ে উঠল। তার পেছনে ছায়ার মতো পড়ে আছে – ধ্বংস-মৃত্যু আর রক্তে ভেজা এক জীবন্ত বিভীষিকা।

জেইন ঘাড় ঘুরিয়ে তার গার্ডদের দিকে তাকাল। তারা তখনও ভিক্টরের সেই সঙ্গীকে ধরে রেখেছে। কিন্তু লোকটা এখন এক জড় পদার্থ। নিজের চোখের সামনে বসকে ওভাবে ছিঁড়ে যেতে দেখে সে সেই কখন জ্ঞান হারিয়েছে। তার নিস্তেজ শরীরটা ঝুলে আছে গার্ডদের হাতের ওপর।জেইনের ঠোঁট আবার সেই শয়তানি হাসিতে বেঁকে উঠল। সে ধীরপায়ে এগোতেই একজন গার্ড নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“বস, একে কী করব?”
জেইন লোকটার নিথর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে মুখ ফেরাল। বরফ শীতল কণ্ঠে আদেশ দিল,
“জবাই করে ফেলো। এসব কীট-পতঙ্গ বেঁচে থাকলে শুধু পলিউশন বাড়বে। যে আমার শত্রুর পাশে থাকে, সে শত্রুর চেয়েও নিকৃষ্ট।”

অন্ধকার চিরে কালো কুচকুচে SUV-টি গর্জে উঠল। জেইন গাড়ির পেছনের সিটে গা এলিয়ে দিয়ে তার ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে কোট আর সোনালী ড্রাগন মাস্কটা পাশের সিটে ছুড়ে ফেলল। সামনের মিররে দেখা যাচ্ছে ড্রাইভিং সিটে থাকা তার অ্যাসিস্ট্যান্টের তটস্থ মুখ। পেছনের গাড়িবহর জেইনের গাড়িকে অনুসরণ করছে ঠিক যেন অন্ধকারে চলা এক দল শিকারি নেকড়ে।
হঠাৎ ফ্রন্ট মিররে অ্যাসিস্ট্যান্টের চোখ আটকে গেল জেইনের বুকের বাম পাশে। সেখানে শার্টের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে এক গভীর ক্ষত।মাত্রই এক রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব শেষ করার পর শরীরের উত্তেজনায় সেই পুরনো ক্ষত থেকে ফের তাজা রক্ত চুইয়ে পড়ছে। অ্যাসিস্ট্যান্টের হাত স্টিয়ারিংয়ে থমকে গেল। যে মানুষটার ছায়া স্পর্শ করার সাহস এই দুনিয়ায় কারো নেই, তার শরীরে এমন ক্ষত!
সে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল,

“এই ক্ষত…! কেউ আপনার গায়ে হাত তোলার স্পর্ধা দেখিয়েছে? এটা কি সত্যিই আপনার রক্ত, ভাই?”
জেইন হাতের গ্লাভস জোড়া খুলে অবজ্ঞার সাথে সেই ক্ষতের দিকে তাকাল। গাঢ় লাল রক্ত শুকিয়ে বুকের চামড়ায় লেপ্টে আছে।
অ্যাসিস্ট্যান্ট আবার বলে উঠল,
“এটা কি ওই লোকগুলোর কেউ করেছে? কিন্তু আপনাকে তো কেউ ছুঁতে পারার কথা নয়…”
জেইনের চোখের সেই রক্তাভ হিংস্র চাউনি মিররে ধরা পড়তেই অ্যাসিস্ট্যান্টের কথা মাঝপথে থমকে গেল। সে শুকনো ঢোক গিলে নুইয়ে পড়ল। জেইন অলস ভঙ্গিতে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দিয়ে দুই পা ছড়িয়ে বসল। তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস। সে গাড়ির ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল
“এটা কোনো শত্রুর দেওয়া নয়! এটা এমন এক মানুষের দেওয়া, যে আমার একান্ত ব্যক্তিগত। যে মিশে আছে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে।”
অ্যাসিস্ট্যান্টের বুঝতে বাকি রইল না বস কার কথা বলছেন। তবুও বুক চিতিয়ে সাহস সঞ্চয় করে সে আবার প্রশ্ন করল,

“কিন্তু ভাই, আপনি ওষুধ লাগাননি কেন? অন্তত একটা ব্যান্ডেজ? এটাকে এভাবে ফেলে রেখেছেন কেন?”
জেইন একটা বড় ঢোক গিলল। তার কন্ঠমনি কাঁপল একবার। সে নিজের আঙুল দিয়ে সেই কাঁচা ক্ষতের ওপর প্রচণ্ড চাপ দিল। ব্যথায় তার চোখ-মুখ কুঁচকে গেল ঠিকই, কিন্তু ঠোঁটে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত স্বর্গীয় হাসি। যন্ত্রণার ভেতরেও এক দুর্লভ শান্তি খুঁজে পাওয়া মানুষের মতো সে ঠোঁট ফাঁক করে ঘন ঘন শ্বাস নিতে লাগল।জেইনের এই উন্মাদনা দেখে অ্যাসিস্ট্যান্ট স্তম্ভিত। জেইন বলতে লাগল,
“এই ক্ষত যত তাজা থাকবে, আমি জানব সে আমায় স্পর্শ করেছিল। জানব সে আমার খুব কাছে এসেছিল… খুব বেশি কাছে…. ঠিক যতটা কাছে আসা সম্ভব।”
“কিন্তু ক্ষতটা অনেক গভীর! ব্যান্ডেজ না করলে শুকাবে না। ইনফেকশনও হতে পারে।”
অ্যাসিস্ট্যান্টের কন্ঠে নিজের বসের জন্য এক গভীর মায়া ও চিন্তার ছাপ। জেইন নিজের জলে ভেজা লাল-খয়েরি ঠোঁটটা শক্ত করে কামড়ে ধরলো দাঁত দিয়ে। এই দগদগে ক্ষতটা এখন তার কাছে এক অতৃপ্ত সুখের আধার। সে ঘোরের মধ্যে বলল,

“আমি চাই এই ক্ষতটা শুকিয়ে না যাক। আমি চাই এটা রোজ জ্বালাক। কারণ কিছু যন্ত্রণারই স্বাদ থাকে। যেখানে ব্যথার ভেতরেই একটা সুখ ঘুমিয়ে থাকে। এটা শুধু যন্ত্রণা নয়, এ এক মিষ্টি যন্ত্রণা!”
অ্যাসিস্ট্যান্টের শরীর শিউরে উঠল। সে জানে তার বস এক ঠাণ্ডা মাথার কসাই, কিন্তু এই মুহূর্তে জেইন এক ভয়ংকর পাগল প্রেমিক। যে ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না। কিন্তু সেই বিষে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করতেও দ্বিধা করে না।
কালো SUV-টি বৃষ্টির পর্দা চিরে ঘন কুয়াশায় মিলিয়ে গেল। শুধু কাঁচে পরা বৃষ্টির টিপটাপ শব্দ‌। আর জেইনের বুকের সেই ক্ষত, যা তার কাছে এক অতৃপ্ত সুখ……..।

ইতালি, রোম
রোম শহরের একটি ছোট্ট আবাসিক এলাকা।
দু’পাশে দোতলা বাসা, ছাদ থেকে কাপড় শুকোচ্ছে।
একটা সরু গলি, পাথরের পাকা রাস্তা। দিনের বেলায় যেখানে বাচ্চারা দৌড়ায়, সন্ধ্যায় বয়স্করা হাঁটেন,সেই গলিটাই এখন একদম ফাঁকা।
রাত প্রায় আড়াইটা।বাতাসে হালকা ঠান্ডা। রাস্তার ল্যাম্পগুলো জ্বলে আছে,হালকা হলুদ আলো। নিঃশব্দ চারপাশ, কেবল মাঝে মাঝে গাছের পাতা মাটিতে পড়ার আওয়াজ।
ঠিক এমন সময়, গলির মাথা থেকে হঠাৎ ছুটে এল এক তরুণী।চোখেমুখে আতঙ্ক। পরনে অফ-হোয়াইট লেডিস জ্যাকেট আর একটা কালো জিন্স।যেটা বৃষ্টিতে ভিজে জবজবে হয়ে আছে। এক হাতে ছোট একটা ব্যাগ জড়িয়ে রেখেছে বুকের সঙ্গে।
সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছিল। আর ঠিক তখনই – ধাঁইইই!
মুহূর্তে কান ফাটানো শব্দে টায়ার ঘষে একটি গাড়ি বাঁক নিয়ে গলিতে প্রবেশ করল। মেয়েটি নিজেকে সামলাতে পারল না; সজোরে ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়ল গাড়ির একপাশে। পাথুরে রাস্তায় মাথা ঠুকে গিয়ে কপাল ফেটে নামল রক্তের ধারা।

গাড়িটি ব্রেক কষে থামল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক যুবক। টি-শার্ট আর জিন্স পরা হাতে গাড়ির চাবিটা শক্ত করে ধরা। এমনিতেই মেজাজটা তুঙ্গে ছিল রিশাবের, এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় বিরক্তি আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।বিরক্ত গলায় সে বলে উঠল,
“সিরিয়াসলি? রাতের বেলাতেও কি রাস্তায় দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে?”
কিন্তু কাছে যেতেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।রাস্তায় পড়ে থাকা মেয়েটির কপাল থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। নিঃসাড় পড়ে আছে সে। চোখ বন্ধ। রিশাব হাঁটু গেড়ে বসলো মেয়েটির সামনে।হলুদ আলোয় রক্তে ভেজা মেয়েটির মুখটা স্পষ্ট হতেই
“You?….”
এক মুহূর্তে সব স্মৃতি ফিরে এল। সকালে এই মেয়েটাকেই তো সে দেখেছিল… যাকে পুলিশ ধাওয়া করছিল! এখন আবার সেই মেয়েটিই পড়ে আছে তার গাড়ির নিচে, নিঃসাড়, রক্তাক্ত।রিশাব একবার চারপাশটা দেখে নিল। গলিটা নির্জন। পুলিশের উপস্থিতি নেই, কিন্তু মেয়েটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। কোন এক অজানা কারণে সে মেয়েটিকে কোলে তুলে গাড়িতে রাখল। আর কিছু না ভেবেই রওনা দিল তার হোটেলের দিকে।

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রাত এখন নিঝুম। থাই জানালার কাঁচ ভেদ করে রুপালি চাঁদের আলো ঘরে ঢুকে এক মায়াবী আবছায়া তৈরি করেছে। বাতাসে মৃদু ঠান্ডা।রিমের রুমের দরজার পাল্লাটা অতি সন্তর্পণে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল এজে।পা ফেলার শব্দও যেন নিশ্বাস চেপে ধরে।সারাদিন মেয়েটার দেখা পায়নি সে। মিশনে বেরিয়েছিল।কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। ফ্রেস হয়েই চলে এসেছে তার ফায়ারফ্লাইকে দেখার জন্য। তার কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো থেকে এখনো টপটপ করে পানি পড়ছে।
বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে রিম। ঠিক সব সময়ের মতো এলোমেলো অবস্থা তার। পরনে পাতলা টি-শার্ট যা কোমরের কাছে কিছুটা কুঁচকে গেছে। প্লাজুটাও হাটু অবধি উঠে আছে। সে গভীরভাবে শ্বাস টানছে।শান্ত, নিস্পন্দ। গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে যেন অন্য এক জগতে। চাঁদের ওই রুপালি আলো যখন তার কোমল মুখে পড়ছে, মনে হচ্ছে সে যেন কোনো এক মায়াবী জগতের রাজকুমারী।
দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল এজে। তার চোখদুটো এই মুহূর্তে এক অদ্ভুত তৃষ্ণায় জ্বলছে। চাঁদের কোমল আলোতেও সেই দৃষ্টি যেন আগুনের হলকা ছড়াচ্ছে। এক আদিম ক্ষুধার্ত নেশা তার প্রতিটি রক্তবিন্দুতে আলোড়ন তুলছে।

সে ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে এল। তার দেহের দীর্ঘ ছায়া গিয়ে পড়ল রিমের ঘুমন্ত মুখে। মেয়েটার নিঃশ্বাস ধীরে ওঠানামা করছে। যেন এক ধরনের নিষ্পাপ নিস্তব্ধতা ঘিরে আছে তাকে। এজের তীব্র দৃষ্টি নিবদ্ধ রিমের বন্ধ চোখের পাতায়, ঈষৎ ফাঁক হয়ে থাকা ওষ্ঠাধরে। ঘুমের ঘোরে রিমের ঠোঁটের কোণ থেকে অবুঝ শিশুদের মতো লালা গড়িয়ে পড়ছে, যা এজের কাছে কোনো মহার্ঘ্য লোভাতুর বস্তুর চেয়ে কম নয়। আর সেই ঠোঁটের নিচের তিলটি! ওটি যেন তার সর্বনাশের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

সে এক শুষ্ক ফাঁকা ঢোক দিলে।তার ভেতরে চলতে থাকে এক অদৃশ্য যুদ্ধ। মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে বুকের ভেতর। উফ্….. মেয়েটাকে না দেখে থাকতে পারে না। আবার দেখলেই নেশা ধরে যায়।
এই মেয়েটিকে না ছুঁয়ে থাকা তার জন্য যতটা কঠিন, তাকে ছুঁয়ে নেয়া তার চেয়েও ভয়ঙ্কর। কি করবে সে? কিভাবে মুক্তি পাবে এই যন্ত্রণা থেকে? তার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে, মেয়েটা কি সুন্দর নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে দেখো! সে জানে–এই মেয়েটটিই তার ধ্বংস, তার নেশা, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সর্বনাশ।
তার চোখে এক প্রকার অগ্রাসি দাবি জমে, ‘এই ঘুমন্ত শুধু দেহটা আমার….. একান্তই!’
তার নজর আটকে যায়, মেয়েটার মেদহীন ফর্সা উদরের মধ্য বিন্দুতে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে তার। দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ নেশা হচ্ছে। মারাত্মক নেশা! যে নেশা থেকে মুক্তি পাবার উপায় নেই। নিঃশ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে। তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে যায়, কামড়ে ধরে দাঁত দিয়ে। নিজেকে কেমন অস্থির পাগল পাগল লাগছে। সে হাতের তর্জনী দিয়ে ঘষে নেয় নাকের নীচ। চোখ দুটো অসম্ভব রকমের লাল হয়ে আছে। সে ফিসফিস করে নেশাক্ত কন্ঠে বলে,

“আমার রাতের ঘুম চুরি করে শান্তিতে ঘুমাচ্ছো.…এখনই সময় যত পারো ঘুমিয়ে নেও। কারণ এরপর আর সেই সুযোগ পাবে না। সময় আসবে, যখন তোমার প্রতিটা রাত চুরি করবো আমি,,তোমার ঠোঁট, তোমার কাঁপুনি, তোমার ঘাম, বিছানার নীরবতা… সব আমার হয়ে যাবে। তখন ঘুম নয়, আমি তোমার দেহে আগুন জ্বালিয়ে রাখবো সারারাত। তুমি ঘুমাতে পারবে না, চাইতেও পারবে না…শুধু কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে ডাকবে আমার নাম।”
তার অবাধ্য হাত আপনা আপনি উঠে যায় মেয়েটার উদরের দিকে। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবেই থমকে হাত। তার মুঠো এমন শক্ত করে পাকাল যে হাতের প্রতিটি শিরা-উপশিরা স্পষ্ট হয়ে উঠল। দাঁত নিশপিশ করছে। এসির ঠান্ডা হওয়ার মধ্যেও তার কপাল বে ঘাম ঝরছে। না এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। যদি হুশ খুইয়ে মেয়েটাকে চেপে ধরে তখন! সে ঝড়ের বেগে অস্থির ভাবে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।……….

পেন্ট হাউজের বিলাসবহুল বারের মধ্যে বসে আছে এজে।বার কাউন্টারটি কালো মার্বেলের তৈরি।পাথরের গায়ে সোনালি আঁচড়, যেটা নরম আলোয় জ্বলে ওঠে। তার পেছনে রাখা শতাধিক বিদেশি ওয়াইনের বোতল, স্কচ, রেড ওয়াইন, হুইস্কি, ব্লাডি মেরি, এমনকি কিছু হ্যান্ডমেইড অদ্ভুত তরল, যেগুলোর নামও উচ্চারণ করা কঠিন।
সে কাচের গ্লাসে তরল ঢেলে, একের পর এক গ্লাস খালি করে যাচ্ছে। নাহ্… হচ্ছে না! সে পুরো বোতল নিয়ে ঢক ঢক করে গিলতে শুরু করে। তাও হচ্ছে না।
“আআআআআহহহহহ্…….”

হিংস্র এক চিৎকারে ফেটে পড়ল এজে। আর গলার রগ খিচে রয়েছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়ার হাতরে হাতে তুলে নেয় একটা সিরিঞ্জ। পুশ করে দেয় সোজা হাতের শিরায়। অস্থিরভাবে নিঃশ্বাস টেনে মাথা উঁচু করে ঘাড় হেলিয়ে দেয়। ঝাকুনি দিয়ে ওঠে তার দীর্ঘ শরীরটা। হাত থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে যায় সিরিঞ্জটা।দেয়ালের ওপর নিজের শরীরের সমস্ত ভর ছেড়ে দিয়ে ধপাস করে বসে পড়ল ফ্লোরে। দুই পা সোজাসুজি ছড়ানো, বুকটা কামারের হাপরের মতো দ্রুত ওঠানামা করছে।চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসছে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১২

কিন্তু মুক্তি কই? হচ্ছে না, কিছুতেই নেশা হচ্ছে না। রিমের নেশা থেকে বের হতে পারছে না সে।কোনো ড্রাগ, কোনো অ্যালকোহলই তাকে কাবু করতে পারছে না। কারণ ইতিমধ্যেই তার রক্তের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়েছে রিম নামক নেশা।সে দুই হাতে খামচে ধরে মাথার সিল্কি চুল।
“আমাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছো তুমি… ভেতরটা অদ্ভুত এক আগুনে পুড়ছে। কী করবো বলো? এই যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না। মিটবেও না, যতক্ষণ না তোমাকে খুব কাছে পাই… একেবারে আমার মাঝে।…….”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৪