প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৪
রাত্রি মনি
“স্যার… ম্যামকে খুঁজে পাওয়া গেছে!”
মাহিন এক দৌড়ে এসে কথাটা ছুঁড়ে দিলো রিশাবের কানে। তার কণ্ঠে ছিল একধরনের উত্তেজনা……..
রোম, হোটেল অরেলিয়াস প্রাইভ
নীল আলোর এক মায়াবী আস্তরণে ঢাকা নিথর ঘর। চারপাশ একদম পরিপাটি, নিস্তব্ধ। সেই ঘরের পুরু বিছানায় শুয়ে আছে এক রোমান কন্যা। ধীরে ধীরে তার চেতনার দুয়ার খুলে যায়। মাথার ভেতরটা যেন সহস্র হাতুড়ির ঘায়ে কাঁপছে। কপালে সযত্নে লাগানো শুভ্র ব্যান্ডেজ। এলোমেলো চুল আর শুষ্ক ওষ্ঠাধর নিয়ে সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
“Where… where am I?”
হকচকিয়ে উঠে বসল সে। চারপাশের দামি চাদর, ব্যান্ডেজের সুবাস আর অচেনা আভিজাত্য—সবই তার কাছে অপরিচিত। নিজের গায়ের জ্যাকেট আর জিন্স দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলেও বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। স্মৃতি হাতড়ে সে মনে করার চেষ্টা করল শেষ মুহূর্তটা—একটা তীব্র আলোর ঝলকানি, প্রচণ্ড এক ধাক্কা, অসহ্য যন্ত্রণা… আর তারপর সব নিকষ অন্ধকার।
ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে বারান্দা থেকে ভেসে এল গিটারের করুণ ঝঙ্কার। কোনো এক বিরহী হৃদয়ের হাহাকার যেন চুইয়ে পড়ছে সেই সুর থেকে। এক শান্ত, বিষণ্ণ কণ্ঠে কেউ গাইছে
“তেরি ইয়াদেঁ, মুলাকাতেঁ…
মে ক্যায়সে ভুলু চাহাত কি ও বরসাতেঁ…
তুহি মেরা দিল হ্যায়, তুহি মেরি জাহাঁ…”
সুরটা যেন বাতাসের ডানায় ভর করে পুরো ঘরে এক সম্মোহন ছড়িয়ে দিচ্ছে। মেয়েটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শব্দের উৎসের দিকে পা বাড়াল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রিশাব। রাতের আকাশকে সাক্ষী রেখে সে গিটারে সুর তুলছে, তার কণ্ঠে এক অব্যাক্ত ব্যথায় ভরা সুর।
“কাভি তো পাস মেরে আও,
কাভি তো নজরে মুজসে মিলাও,
কাভি তো দিল সে দিলকো মিলাও,
“মেরি জান পলকেঁ ইউ না ঝুকানা,
মেরি জান মুঝসে দূর না জানা,
মেরি জান মুঝকো ভুল না জানা… ও জানা…”
হঠাৎ পেছনের মৃদু পায়ের শব্দে রিশাবের আঙুলগুলো গিটারে থমকে গেল। সে ধীরলয়ে পেছনে ঘুরে তাকাল। তার চোখে এক হিমশীতল সন্দেহ। মেয়েটি রিশাবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে কিছুটা কুঁকড়ে গেল। কাঁপা জিজ্ঞেস করল,
“আমি এখানে কীভাবে এলাম? কে নিয়ে এসেছে আমাকে এই জায়গায়?”
রিশাব গিটারটা একপাশে রেখে নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল,
“আমি নিয়ে এসেছি। তুমি হঠাৎ আমার গাড়ির সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে। মাথায় বেশ চোট পেয়েছিলে, তাই ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল।”
তার কথাগুলো পাথরের মতো শক্ত আর আবেগহীন। রিশাব কয়েক পা এগিয়ে এল। তারপর একটু থেমে, তাচ্ছিল্য করে বলল,
“সবই তো বুঝলাম। কিন্তু তার আগে এটা বলো, তুমি অমন ঝড়ের বেগে পালাচ্ছিলে কেন? আর পুলিশই বা তোমাকে পাগলের মতো খুঁজছে কেন? লেট মি গেস… তুমি নিশ্চয়ই কিছু চুরি করেছো? রাইট?”
রিশাবের ‘চোর’ অপবাদ সহ্য করতে না পেরে মুহূর্তেই বারুদের মতো ফেটে পড়ল মেয়েটি।
“আমি চোর নই! আমি চোর নই!”
আর্তনাদ করে উঠল সে।
“আমার নাম ক্যাথরিনা… ক্যাথি। আমার ভাইকে কিছু লোক অপহরণ করেছে। আমি এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া আর কেউ নেই। বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই আমার। ভাইয়ের মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে না পেরে আমি নিরুপায় হয়ে ওই চুরি করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমি শুধু আমার ভাইকে ফিরে পেতে চাই…”
তার দু’চোখ বেয়ে অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ছে, কণ্ঠে এক বুক হাহাকার। এক হার মানা অসহায়ত্ব ঝরে পড়ছে। ঘরে এক মুহূর্তের জন্য নিথর স্তব্ধতা নেমে এল। সে মুখ ফিরিয়ে নিজের চোখের জল আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। রিশাব এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কিন্তু তার পাথুরে মুখে মায়ার কোনো চিহ্ন নেই, নেই কোনো বাড়তি কৌতূহল। কেবল এক নিস্পৃহ স্পষ্টতা নিয়ে সে বলল,
“তুমি কী করো আর কেন করো, সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে এই মুহূর্তে তুমি নিরাপদ। তোমার ভাই কোথায় আছে, সেটা বলো।”
রিশাবের শীতল কণ্ঠে কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে চোখের জল মুছে ক্যাথি কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল,
“ওদের একজন বলেছিল আজ রাতে গুদামে নিয়ে যাবে… ট্রিনিটা রোডের মাথায় সেই পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরিটা…”
রিশাব ধীরস্থিরভাবে গিটারটা একপাশে রেখে পকেট থেকে ফোন বের করে মাহিনকে কল করল।
“মাহিন, একটা লোকেশন দিচ্ছি। পুলিশ ইনভল্ভ করো দ্রুত। তবে সাবধান, আমার নাম যেন কোথাও না আসে। একটা ছেলেকে উদ্ধার করতে হবে। আর…”
বলতে বলতে রিশাবের কণ্ঠস্বর একদম ভারী হয়ে এল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ চিনচিনে ব্যথায় মুচড়ে উঠল তার। ফোনের ওপাশে থাকা মানুষটির উদ্দেশ্যে নিচু স্বরে প্রশ্ন করল
“রিমের কোনো আপডেট পেয়েছো?”
ওপাশ থেকে কাঙ্ক্ষিত কোনো উত্তর না শুনতে পেয়ে মুহূর্তেই বিষণ্ণতায় ডুবে গেল রিশাবের মন। সে দীর্ঘশ্বাস চেপে ফোনটা রেখে ক্যাথির দিকে তাকাল।
“কিডন্যাপারদের ফোন করো এখনই। বলো যে তুমি টাকা নিয়ে আসছো। ওদের রাজি করাও যেন ওরা তোমার ভাইকে সেখানে নিয়ে আসে।”
ক্যালাব্রিয়া , পেন্টহাউজ
সকাল আটটা। বাইরের আলো হালকা ছড়িয়ে পড়েছে পেন্টহাউজের কাচের জানালায়। অথচ ভিতরে এখনো অন্ধকারের ঘনঘটা, নেশার দমবন্ধ করা গন্ধে ছেয়ে আছে পুরো বারের মেঝে।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে ইয়াশ।
তার হাতে ফাইল আর ফোন। প্রথমে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঢুকলেও হঠাৎ থেমে যায়। চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
কালো মার্বেলের বারটায় এখনো পড়ে আছে খালি গ্লাস, ছড়ানো ড্রাগ সিরিঞ্জ, ভাঙা বোতল, আর AJ নিজে।দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা এক বিপর্যস্ত দেহ। চোখ আধা বন্ধ, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, বুকের বাম পাশে শার্ট রক্তে শুকিয়ে আছে।
“ডুড!! What the hell!!”
সে দৌড়ে এসে ঝাঁকুনি দেয়।
“Wake up! ব্রো, open your eyes!”
AJ চোখ খুলে তাকায় একবার। ঠোঁটে এক বিষাক্ত, ক্লান্ত, হালকা হাসি খেলে যায়।”
“Morning, soldier……”
ইয়াশ একবার ফ্লোরে পড়ে থাকা সিরিঞ্জ গুলোর দিকে তাকায।তৎক্ষণাৎ বোঝে–এগুলো সাধারণ কিছু না। অতি উচ্চমাত্রার সিডেটিভ ড্রাগ।যার সামান্য এক ফোঁটা একজন মানুষকে দুদিন অচেতন করে রাখার জন্য যথেষ্ট। আর এখানে পড়ে আছে সাত-সাতটি সিরিঞ্জ!
“সাতটা! সাতটা ইনজেকশন? Seriously… এটা নেশা না সুইসাইড! তুই কি মরতে চাস?”
“মরতে চাই না। মরার থেকেও… খারাপ কিছু খুঁজছি…”
ইয়াশ হতভম্ব হয়ে যায়। AJ-এর গা থেকে শার্টটা সরাতে গিয়েই আটকে যায় তার দৃষ্টি। বুকের বাঁ পাশে শুকানো রক্ত। স্পষ্ট ক্ষত।এই ইস্পাতকঠিন মানুষটার এত কাছে পৌঁছানোর দুঃসাহস কার হলো? সে আঙুল দিয়ে ক্ষতটা ছুঁয়ে দেখে।
“এইটা… কে করল? এতটা কাছাকাছি কে আসতে পারল?”
এজে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস তখনো অস্বাভাবিক, যেন ফুসফুস ছিঁড়ে বাতাস বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোখ বন্ধ করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ও করেছিল… ওর নরম হাত… একটা ভাঙা কাঁচ বুকের ঠিক মাঝখানে চেপে ধরেছিল। ও আমাকে ছুঁয়েছিল ইয়াশ… খুব কাছাকাছি এসেছিল সে…. একদম আমার নিশ্বাসের কাছাকাছি।…..”
এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে AJ। মুহূর্তেই মানসপটে ভেসে উঠল সেই দৃশ্য—রিম কাঁদতে কাঁদতে ওর বুকের ওপর মুখ গুঁজে দিয়েছে, দুই হাতে শক্ত করে খামচে ধরেছে ওকে। সেই স্পর্শের তীব্রতা যেন এখনো এজের প্রতিটি স্নায়ুকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে।এজে নিজের ক্ষতবিক্ষত বুকের ওপর হাত চেপে ধরে চোখ বুজে কাতরে উঠল,
“ওর ছোঁয়াটা… উফ! এটা কোনো জখম না ইয়াশ… ইট’স নেক্টার! অমৃত!”
ইয়াশ এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।ক্ষুব্ধ স্বরে বলল,
“তুই নিজেকে ধ্বংস করে দিচ্ছিস। লিটিল সিস্টার তোর আসক্তি হয়েছে ঠিক আছে। কিন্তু এরকম করে নিজেকে শেষ করে?”
এজে এবার স্থির, শীতল চোখে ইয়াশের দিকে তাকাল।
“যাকে একবার ছুঁয়েছি, তার ছায়াও আমার হওয়া উচিত। ও… আমার poison। আর আমি সেই বিষের প্রতিটা ফোঁটা শুষে নিতে চাই।”
ঠোঁটে এক বিকৃত শান্তির হাসি ফুটিয়ে এজে আবার চোখ বুজল।
“উফ্ I hate this fuc***king emotion, আমি চাই ও আমাকে জ্বালিয়ে যাক।”
ধীরে ধীরে এজের চোখের পাতা জোড়া আবার বুজে এল। ইয়াশ একা হাতে এজের মতো সুঠাম আর বিশালদেহী মানুষটাকে তোলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার কপাল ঘেমে একাকার। গলার শিরাগুলো টানটান হয়ে ফুলে উঠেছে অতিরিক্ত পরিশ্রমে।
“ধুর! এই হিমালয়সম শরীরটা আমি একা টানব কীভাবে?”
সে একরাশ বিরক্তি নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“Matteo!! Matteo!! Get your a*ss here now!”
দূরে একটা দরজা খুলে হঠাৎ অস্থিরভাবে দৌড়ে এলো মাত্তেও। সবে চোখে ঘুম, চুলগুলো এলোমেলো, পরনে ট্যাংক টপ। গলায় অস্থিরতা।
“কী হয়েছে ভাই?”
“দেখো নিজেই দেখো! পাগলটা কি করে রেখেছে নিজের অবস্থা!”
ইয়াশ গর্জে উঠল,
“গর্দভ, কি করছিলি তুই? তুই থাকতে সাতটা সিরিঞ্জ ঢুকে গেল ওর শরীরে, আর তুই দেখলি না কিছুই?!!!”
মাত্তেও হা করে তাকিয়ে থাকে AJ-এর দেহের দিকে। তারপর ফ্যাচ করে মুখ ফুলিয়ে রেগে যায় বাচ্চাদের মতো।
“রাতে মিশন থেকে ফিরে উনি তো নিজের ঘরেই গিয়েছিলেন। আমি কি করে জানব উনি বারে এসে সিরিঞ্জে নিজের শরীর ফুটো করে ফেলবেন? আমি তো আর ভবিষ্যত দেখতে পাই না। আমি তো কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়েছি মাত্র!”
“তোর ঘুম! শয়তান ঘরে আছে আর তুই ঘুমাস! তুই তো ওর assistant, সারাক্ষণ সাথেই থাকিস , তুই জানিস না ও একটা পাগল? এভাবে একা ছাড়া যায় কাউকে?”
“আরে আমিও তো মানুষ, ইয়াশ ভাই! আমি কি সারারাত পাহারা দিই! মাথা ঠিক থাকলে কে সাতটা সিরিঞ্জ নেয়? ওনার মতো পাগল বস সারা দুনিয়ায় আর একটা নাই!”
“পাগলই তো একটা মেয়ের জন্য নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। আর এটা…. ওর বুকের ক্ষত তুই জানতি না?”
মাত্তেও মুখ নিচু করে ফেলে। গলার স্বর ক্ষীণ।
“হ্যাঁ… আমি জানতাম।”
“কি! তুই জানতিস? আর তাও কিছু করিসনি! তুই ডক্টর ড্রেভেনকে দেখাসনি কেন, ইডিয়েট? তুই কোন জাতের অ্যাসিস্ট্যান্ট বলতো?”
মাত্তেও অপরাধীর ন্যায় ফিসফিস করে বলে,
“আমি উনাকে ডাক্তারের কথা বলেছিলাম। কিন্তু উনি চান না এটা কেউ ছুয়ে দেখুক। উনার কাছে এটা শুধু ক্ষত নয় , এক ধরনের আবেশ। যেটা উনি নিজের মাঝে বয়ে নিয়ে বেড়াতে চান।”
ইয়াশ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
“আবেশ? তোরও কি মাথা খারাপ?সাতটা কড়া সিডেটিভ ঢুকিয়েছে শরীরে! যদি হার্ট অ্যাটাক করত? তোর ওই আবেশে?”
“আমি ভয় পেয়েছিলাম কিছু বললে উনি আরও ক্ষিপ্ত হতেন!”
“স্রেফ ভয় পেয়ে চুপ করেছিলি? যদি ইনফেকড করত? এইটুকু জায়গায় ইনফেকশন হলে… ব্রেইন পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে! তুই জানিস না ওর ব্রেইনে প্রবলেম আছে?”
মাত্তেয়োর চোখের পাতা নেমে আসে ধীরে। তার চোখের কোণে কিছুটা জল টলমল করে ওঠে, কিন্তু সে শক্ত করে গিলে ফেলে সব।
“ঠিক আছে। চল, তুলে দিই ওকে। ওর ঘুম দরকার… না হয় মরেই যাবে একদিন।”
ইয়াশের আদেশে তারা দুজনে মিলে কোন মতে টেনে টুনে এজের ভারী দেহটা রুমে নিয়ে বিছানায় তুলে ফেলে। দুজনেই হাপিয়ে উঠেছে। যেন একটা যুদ্ধ জয় করে ফিরল দুজনেই। কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে ইয়াশ। কপালের ঘাম টুকু মুছে বলে ওঠে,
“ড্রেভেনকে কল কর, এক্ষুনি আসতে বল।”
রোম, ভেনাস রোড
সন্ধ্যার আলোয় ঝিমিয়ে পড়া রোম শহর। ভেনাস রোডের পাশে একটা স্নিগ্ধ কফিশপ—
“Caffè Lumière”।
কাঁচের দরজা, কাঠের আসবাব আর ক্যালিগ্রাফিতে লেখা মেনু বোর্ড। ভেতরে আবছা আলোয় একটা শান্ত আভিজাত্য থাকলেও, বাতাসের প্রতিটি অণুতে মিশে আছে এক হাড়কাঁপানো টেনশন।
ক্যাফেটার ভেতরে মাত্র চারটে টেবিল। একদম কোনার টেবিলে বসে আছে ক্যাথি। তার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া দুই হাতের আঙুলের ফাঁকে ধরা একটি লাল টাকার ব্যাগ। প্রতিবার ক্যাফের বেল বাজার শব্দে সে শিউরে উঠছে। সামান্য একটি ভুল মানেই তার আদরের ছোট ভাইটার চিরবিদায়।একজন ওয়েট্রেস এসে নিচু স্বরে শুধাল,
“আ ক্যাপুচিনো, মিস?”
ক্যাথি শুধু যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়ল। তার চোখ তখন জানালার ওপারে। রাস্তার ওপাশে পার্ক করা একটি কালো সেডান। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে রিশাব। চোখে তার ডার্ক সানগ্লাস। পাশে মাহিন, আর আশেপাশে সাধারণ পোশাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ইতালীয় পুলিশের তুখোড় কিছু অফিসার।
রিশাবের কানে ব্লুটুথ ডিভাইসে তার শান্ত কিন্তু ধারালো কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“জাস্ট অবজার্ভ। ওরা ছেলেটাকে সামনে আনলেই ব্যাগটা ফেলবে ক্যাথি। তার আগে কেউ পজিশন ছাড়বে না। রিমেম্বার… ডোন্ট ফায়ার ফার্স্ট।”
হঠাৎ ক্যাফের দরজার বেলটা সজোরে বেজে উঠল। তিনজন বলিষ্ঠ পুরুষ ভেতরে ঢুকল, সবার মুখে কালো মাস্ক। ক্যাফের স্নিগ্ধতা মুহূর্তেই এক বীভৎস আতঙ্কে রূপ নিল।
তাদের মধ্যে একজন ক্যাথির সামনে এসে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
“একা এসেছিস তো? পুলিশ টুলিশ পিছু নেয়নি তো?”
ক্যাথির কণ্ঠ কাঁপলেও সে নিজেকে সামলে নিল।
“টাকা তৈরি। আগে আমার ভাইকে দেখাও।”
তাদের পেছন থেকে চতুর্থ একজন বেরিয়ে এল। ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে দিল এক কিশোরকে। ছেলেটার চোখ-মুখ বাঁধা, গলার চামড়ায় কালচে দাগ। আর্তনাদ করে উঠল ছেলেটা,
“আ..আপু!”
কিডন্যাপাররা টাকার ব্যাগের দিকে এগোতেই ক্যাথি ঠাস করে লাল ব্যাগটা টেবিল থেকে নিচে ফেলে দিল।
গাড়ির ভেতর থেকে রিশাবের বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল,
“অ্যাটাক! নাও!”
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ থেকে পুলিশ ক্যাফেতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দৃশ্যপট বদলে গেল। একজন কিডন্যাপার বিদ্যুৎগতিতে ছেলেটাকে জাপটে ধরে তার গলায় একটা ছোট কিন্তু ধারালো ছুরি চেপে ধরল। ক্যাফের ভেতরের কোলাহল এক সেকেন্ডে মরণ-নিস্তব্ধতায় থমকে গেল।
“কেউ এক ইঞ্চি এগোলে এই কচি গলাটা দু’ভাগ হয়ে যাবে!”
কিডন্যাপারের উন্মত্ত হুঙ্কার। ক্যাথি আর্তনাদ করে উঠলো,
“না! প্লিজ, ওকে ছেড়ে দিন!”
পুলিশ অফিসাররা তাদের অস্ত্রের সেফটি লক খুলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এক মিলিমিটার ভুল মানেই একটা তাজা প্রাণের অবসান।রিশাব ধীর পায়ে ক্যাফেতে ঢুকল। চোখের সানগ্লাসটা খুলে রাখলো পকেটের ভেতর। সে একদম সামনে গিয়ে কিডন্যাপারের চোখের ওপর চোখ রাখল।
“ছুরি চালালে শুধু ওই ছেলেটা মরবে না, তুইও মরবি।”
রিশাবের কণ্ঠস্বর একদম নিস্পৃহ।
“ধুর! তুই কে? ভাগ এখান থেকে!”
কিডন্যাপারের হাত কাঁপছে।রিশাব একটুও বিচলিত হলো না। কাউন্টার থেকে কফির একটা কাপ তুলে নিয়ে খুব আয়েশ করে এক চুমুক দিল।
“ভুল করছিস। এখন যদি ওকে খুন করিস, এখান থেকে তোর লাশ বেরোবে। ওই ছেলেটা এখন তোর রক্ষাকবচ হতে পারে, কিন্তু ওর রক্ত ঝরলে ওটাই হবে তোর ফাঁসির দড়ি।”
“আমি বলেছি দূরে থাক!”
কিডন্যাপার চিৎকার করে উঠল।ঠিক সেই মুহূর্তেই রিশাব পকেট থেকে তার দামী মোবাইলটা ছুঁড়ে মারল পাশের জানালার কাঁচে। ‘ঝনঝন’ শব্দে কাঁচ ভাঙার আওয়াজে কিডন্যাপারের মনোযোগ এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য সরে গেল।আর ঠিক সেই সুযোগটাই কাজে লাগাল মাহিন। পেছন থেকে ডাইভ দিয়ে সে কিডন্যাপারকে মাটিতে আছড়ে ফেলল। হাতের ছুরিটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। সাথে সাথে পুলিশ বাকিদেরও কাবু করে ফেলল।
বাঁধনমুক্ত কিশোর ছেলেটি কাঁপতে কাঁপতে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল বোনকে। ক্যাথি চোখে তখন অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে কিন্তু সেই কান্না নিজের ভাইকে ফিরে পাওয়ার।
ক্যাফের বাইরের রাস্তায় চারপাশে পুলিশ, হ্যান্ডকাফ পরা কিডনাপাররা গাড়িতে তোলা হচ্ছে। একপাশে ক্যাথি তার ছোট ভাইটিকে বুকের মাঝে আগলে ধরে আছে, যেন একটু আলগা করলেই আবার কেউ তাকে কেড়ে নেবে। ছেলেটি এখনো আতঙ্কে কাঁপছে, বড় বড় চোখ দুটো জলে ভেজা।
একটু দূরে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে রিশাব। পরনে কালো হুডি, চোখে সানগ্লাস। সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই ক্যাথি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল।
“থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি না থাকলে… আজ হয়তো আমার ভাইকে আমি চিরতরে হারিয়ে ফেলতাম।”
কথাটা শেষ করেই ক্যাথি রিশাবের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। অপলক চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার চোখের মণি বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত শিহরণ নিয়ে সে বলে উঠল,
“আপনি তো… আপনি আরজে (RJ) রিশাব না?!”
ক্যাথির কণ্ঠে এখন এক আকাশ বিস্ময়। ভাইয়ের চিন্তায় আর পরিস্থিতির চাপে এতক্ষণ সে মানুষটাকে ঠিকঠাক খেয়াল করতে পারেনি। এমনকি হোটেলের সেই বিষণ্ণ গানটিও তাকে চিনিয়ে দিতে পারেনি। কিন্তু এখন এই আলোর নিচে রিশাবের তীক্ষ্ণ মুখশ্রী দেখে চিনতে আর বাকি রইল না।
রিশাব কিছুটা অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে নিল। দৃষ্টি এড়িয়ে সে নীরব রইল। ক্যাথি উচ্ছ্বসিত হয়ে আবার বলল,
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না! আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান। আপনার ‘সোচ কে ভুলে’ গানটা আমি লুপে শুনতাম। আপনি তো শুধু একজন রকস্টার নন… আপনি বাস্তব জীবনের একজন হিরো!”
রিশাবের ঠোঁটের কোণে একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে সে বলল,
“আমি হিরো সাজতে আসিনি। এই গান, এই খ্যাতি—সবই অর্থহীন। বাস্তব জীবনটা রূপকথার মতো নয়, অনেক কঠিন।”
তার কণ্ঠের সেই পাথুরে গাম্ভীর্য ক্যাথিকে থামিয়ে দিল। সে এক মুহূর্তের জন্য রিশাবের চোখের গভীরে তাকিয়ে অনুভব করল, এই মানুষটার ভেতরে এক বিশাল আগ্নেয়গিরি চাপা পড়ে আছে।
রিশাব গাড়ির দরজা খুলে নির্লিপ্তভাবে বলল,
“চলো, তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসি। ওর শরীরে চোট নেই, কিন্তু হাসপাতালে একবার চেকআপ করা দরকার।”
গাড়িতে রিশাবের পাশে বসে হাঁসফাঁস করছে ক্যাথি। এতক্ষণে তার মনে রিশাবের জন্য একটা সফট কর্নার তৈরি হয়েছে। এই রুক্ষ মানুষটার ভেতরের কোমলতা তাকে মুগ্ধ করছে। রিশাব শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ক্যাথির দিকে না তাকিয়েই সে বলল,
“এখন থেকে আর এসব করতে হবে না। আমার বাবার এক পরিচিত বন্ধুর কোম্পানিতে তোমার কাজের ব্যবস্থা করে দেব। আর যে ডায়মন্ড ব্রোচটা তুমি নিয়েছিলে, ওটা আমি পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছি। মামলা হবে না।”
মেয়েটির একটু ক্ষোভ মেশানো অভিমানী কন্ঠে বলল ঝরে,
“আমি চোর নই… আমি শুধু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছিল।”
“জানি,”
“কিন্তু আপনি আমার জন্য এত কিছু কেন করছেন?” ক্যাথি সরাসরি তার দিকে ফিরে তাকাল।
“একটা অচেনা মেয়ের জন্য কেউ এত ঝুঁকি নেয়?”
রিশাব সিটে একটু হেলান দিয়ে বসল। তার দৃষ্টি এখন অনেক দূরে, হয়তো এই সময়েরও ওপারে।
“করছি, কারণ তোমার চোখে নিজের ভাইকে হারানোর যন্ত্রণা দেখতে পেয়েছিলাম। আর আমি খুব ভালো করেই জানি কাছের মানুষ হারানোর যন্ত্রণা ঠিক কতটা কষ্টদায়ক। আমিও আমার জীবনের সবচেয়ে দামী মানুষটাকে হারিয়েছি। তাকে খুঁজতেই এতো দূর আসা। খুব ভালোবাসি ওকে।”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৩
‘ভালোবাসি’—রিশাবের মুখের এই একটি শব্দে ক্যাথির বুকের ভেতরটা হঠাৎ চিনচিন করে উঠল। এক অজানা বিষাদ যেন তাকে গ্রাস করল। সে নিজের মনের ভাব আড়াল করে, গলার দলা পাকানো কষ্টটুকু গিলে ফেলে এক মেকি হাসিতে জিজ্ঞেস করল,
“কে সেই ভাগ্যবতী মেয়ে?”
রিশাব সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। বিড়বিড় করে বলল,
“শি ইজ মাই ব্লু ফেয়ারি… মাই হার্ট, রিম।”
