Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৭

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৭

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৭
রাত্রি মনি

“লাশ!!!
“তাও আবার আমাদের ক্যাম্পাসে? এই প্রথম।”
“আর যেভাবে মারা হয়েছে দেখে মনে হচ্ছে বহু জন্মের ক্ষোভ মিটেছে।”
“এটা কোনো সাধারণ মানুষের কাজ হতে পারে না।”
সকালটা আজ ভার্সিটির অন্যসব দিনের মতো শুরু হয়নি।সূর্যের আলো ফুটেছে ঠিকই, কিন্তু বাতাসে অদ্ভুত এক ভার।করিডোর জুড়ে ছাত্রছাত্রীদের ফিসফিসানি কিন্তু শব্দগুলোও আজ যেন দম আটকে থাকা গলায়।
রিম আর অদ্রিজার আজ ভার্সিটির প্রথম ক্লাস।

তবুও প্রথম দিনেই যেন কারো অজানা ভয় লেপ্টে বসেছে চারপাশে।
হঠাৎ একদল চ্যালাপ্যালা হাতা গোটাতে গোটাতে দৌঁড়ে যায় ক্যাম্পাসের পেছনের দিকে।
ক্যাম্পাসের সেই দিকটা সবসময়ই ছিলো ফাঁকা,
একটা পুরনো ছায়াঘেরা রাস্তা, জংলার ঝোপঝাড়,
আর একটু দূরে ফেলে রাখা ইটের স্তূপ , যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো গল্পের নিঃশেষ পাতাগুলো।আজ সেই জায়গাটা লোকে গিজগিজ করছে।চারপাশে কাক পাখির উৎপাত। হাওয়ায় ভেসে আসছে এক গা গুলানো গন্ধ ,পঁচা রক্ত আর দগদগে মাংসের গন্ধ।
রিম আর অদ্রিজা ভিড় ঠেলে সামনে আসে।

তারা সেই ছেলেগুলোর পেছনেই এসেছিল curiosity নিয়ে। কিন্তু রিমের চোখে পড়তেই…তার পেট মোচড় দিয়ে ওঠে। পায়ের পাতায় কাঁপুনি। গলার নিঃশ্বা আটকে যায়। চোখ বড় হয়ে ওঠে।মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। প্যানিক অ্যাটাক!!
সামান্য রক্তেই যার মাথা ঘোরে, তার সামনে আজ পড়ে আছে একটি ছিন্নভিন্ন লাশ!ভেজা ঘাসের ওপর পড়ে আছে একটা বিকৃত দেহ,দেহ না, যেন মানুষের ছদ্মবেশে ছিন্ন মাংসপিণ্ড।
পেটের অংশটা একেবারে ছিঁড়ে ফেলা ভেতরের সব অঙ্গ উপড়ে বের করা হয়েছে হাতে, নারিভুরি, অন্ত্র, কলিজা সবকিছু মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। রক্তে ভিজে গেছে ঘাস, মাটি, বাতাস… সব।ছেলেটার বুক থেঁতলে দিয়ে খুলে ফেলা হয়েছে।হৃদপিণ্ড নেই! মনে হচ্ছে কেউ চিৎকার শুনতে শুনতে একে একে সব ছিঁড়ে নিয়েছে।

মাথাটা শরীরের সাথে নেই বললেই চলে গলার চামড়ায় একটুখানি মাংস ধরে আছে মাত্র।এক চোখ তুলে ফেলা হয়েছে,অন্য চোখটা আধা বেরিয়ে পড়ে আছে, দুলছে কাদায়।ঠোঁট ছিঁড়ে ঝুলছে, জিহ্বাটা দুদিকে ফেটে গেছে।ডান হাতের আঙুল তিনটে নেই। হাতটাও তিন খণ্ডে ভাগ চামড়া ছিঁড়ে নেয়া।
কেউ মুখ চেপে আছে। কেউ আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আর কেউ… ঠাণ্ডা চোখে ফোনে ভিডিও তুলছে।
চ্যালাপ্যালাদের চোখে বিস্ময়, আতঙ্ক, ক্ষোভের ছায়া।
তাদের লিডার এই ছেলেটাকেই কেউ এমন ভাবে শেষ করে দিলো? কে? কেন? এতটা নির্মমতা?
ছেলেটা ছিলো ছাত্র রাজনীতির সক্রিয় নেতা। তার নাম শুনেই অনেকে কেঁপে উঠত। প্রতিটা ফ্রেশারকে তার হিংস্র র‍্যাগিং সহ্য করতে হতো।কিন্তু আজ তাকেই কে যেন এমনভাবে শেষ করে দিয়েছে। যেন তার প্রতিটা অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে একসাথে!

রিমের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর শ্বাস-প্রসার দ্রুত গতিতে চলছে এই চোখের জল যেন বাঁধ মানছে না।
অপর পাশ থেকে একজন হুট করে বলে,
“আরে মেয়েটার কি হয়েছে? পানি দাও কেউ। মনে হয় লাশ দেখে ভয় পেয়ে গেছে।”
ছেলেটার কথা শুনে অদ্রিজা রিমের দিকে তাকায়। তার মনে পড়ে যায় রক্তে ফোবিয়া আছে রিমের। সে রিমকে সামলে ধরে। রিম অস্পষ্ট স্বরে মুখে বিড়বিড় করে বলে,
“এটা…… এই ছেলেটা….. এই ছেলেটাই সেই ছেলেটা যে কালকে আমার হাত ধরেছিল…… আমি তোকে বলেছিলাম না….ও…ও…..”

রিমের মনে পড়ে যায় দেড় বছর আগের কথা। যখন কলেজে একটি ছেলে তাকে সকলের সামনে প্রপোজ করেছিল। যদিও সে সেটা প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিল। কিন্তু পরের দিনই কলেজে খুঁজে পাওয়া যায় সেই ছেলেটার বিকৃত ছিন্নভিন্ন লাশ। আর আজ একইভাবে এই ছেলেটাও।…… তখন পুলিশ ও কিছুই খুঁজে পায়নি।
“নাহ এত মিল কিভাবে? আমি কি সত্যিই কোনো অভিশাপ নিয়ে ঘুরি? মা বলে আমি নাকি অভিশাপ, আমার জন্যই বাবার মৃত্যু হয়েছে। যারাই আমার কাছে আসার চেষ্টা করে। তাদের সকলেরই শেষ পরিণতি হয় ভয়ংকর। তাহলে কি মায়ের কথাই সত্যি?”
রিমের কলিজাটা যেন ছিড়ে যাচ্ছে। ভীষণ ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। অদ্রিজা তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকে।
“এসব তোর ভুল ধারণা ‌। তুই কোন অভিশাপ না। শুধু শুধু নিজেকে, দোষ দিবি না। এসব,, এসব কাকতালীয়। তুই শান্ত হও প্লিজ।”
তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। চারপাশের কোন আওয়াজ কানে ঢুকছে না। হঠাৎ তার মাথায় একটাই শব্দ ঘুরপাক খেতে থাকে।
“Because even your ashes…….. are mine.”

বিকেলের ম্লান আলোয় অদ্রিজা রিমকে বাড়ি নিয়ে আসতেই রিমের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আঁতকে ওঠে তার মা শেফালী বেগম। তিনি সেলাই মেশিনের ওপর ঝুঁকে কাজ করছিলেন। মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে তাঁর হাতের কাজ থেমে গেল।
“সেকি ওর এ অবস্থা হলো কি করে? কি হয়েছে ওর? শাড়ি কোথায়?আর এই জ্যাকেটটাই বা কার?”
অদ্রিজা কোনভাবে ব্যাপারটা সামলে নেয়।
“আসলে আন্টি আপনি তো জানেন ওর শাড়ি পরার অভ্যাস নেই। শাড়িটা সামলাতে পারছিল না বলেই আমি ওকে জ্যাকেটটা পরিয়ে দিয়েছি। আর সকাল থেকে কিছু খাওয়া নেই তো, তাই রোদে ঘুরে শরীরটা একটু খারাপ লাগছে।”
মেয়ের অসুস্থতার কথা শুনতেই রিমের মায়ের এবার রাগ হতে থাকে। সকালে কত করে বললো খেয়ে যেতে! মেয়েটা একটা কথা ও শোনে না। সব সময় নিজের জেদ দেখায়। না ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে। আর না ঠিকমতো শরীরের যত্ন নেয়। অসুস্থ হয়ে গেলে ডাক্তার দেখাতে কত টাকা খরচ হয় সে খবর কি আছে তার! না নেই। কত কষ্ট করে সংসার চালান তিনি।

বাড়িতে আয়ের একমাত্র উৎসই হল তিনি। টেইলারিং এর কাজ করে সংসার চালান। দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ সংসার খরচ সব একাই বহন করতে হয়। কিন্তু মেয়েরা কি আর সেটা বোঝে? মা তো একটা বান্দি সারাদিন কাজ করে খেটে মরবে। আর মেয়েরা বসে সব ধ্বংস করবে।
যদিও রিম দুইটা টিউশনি করে, কিন্তু তাতে তার নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোই মুশকিল। নিহতাই মেয়েটা পড়াশোনায় ভালো ছিল। তাই সরকারি স্কুল কলেজ আর ভার্সিটিতে সুযোগ পেয়েছে। নাহলে মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে সেই কবে বিয়ে দিয়ে দিতেন। কিন্তু কি আর করার মেয়েরও অনেক জেদ। বিয়ের কথা বললেই খ্যাক খ্যাক করে ওঠে।

শেফালী বেগম আর অদ্রিজা মিলে রিমকে ধরে বিছানায় নিয়ে গেলেন। তিনি ক্লান্ত স্বরে অদ্রিজাকে বললেন,
“আজ রাতে আমাদের এখানেই খেয়ে যেও।”
“না আন্টি, আজ যাই। আম্মু চিন্তা করবে। কাল তো ভার্সিটির প্রথম ক্লাস, আমি সকালে এসে রিমকে তুলে নেব।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
অদ্রিজাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে শেফালী বেগম ঘরে ফিরলেন। তিনি রিমকে কঠোর গলায় ফ্রেশ হতে বলে খাবারের ব্যবস্থা করতে চলে যান।

ওয়াশ রুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিম। শরীর থেকে সেই ভারি জ্যাকেটটা খুলতে নিলেই নাকের মধ্যে ভেসে এলো এক ঝাঁঝালো, পুরুষালি তীব্র পারফিউমের ঘ্রাণ। ওটা যেন পারফিউমের সুগন্ধ নয়, এক নেশাক্ত ধোঁয়া, যা সরাসরি রিমের ফুসফুসে গিয়ে বিঁধছে। রিম জ্যাকেটের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল, নিজের অজান্তেই একবার গভীর শ্বাস টেনে নিল সে। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তার। শরীরের প্রতিটি রোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়। সে চটপট খুলে ফেলে জ্যাকেটটা। কিন্তু সেই ঘ্রাণ যেন তার চামড়ায় লেপ্টে আছে। কেমন অস্থির পাগল করা সেই ঘ্রাণ। তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এল।

বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল সেই অন্ধকার কক্ষ। সেই বরফশীতল স্পর্শ, সেই হাস্কি ভয়েস। ঘাড়ে অবাধ্য ঠোঁটের স্পর্শ। রিমের শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে ঝট করে চোখ খুলে আয়নার দিকে তাকাল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার মুখটা আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।তার ফর্সা নাভির পাশে স্পষ্ট হয়ে আছে পাঁচ আঙুলের রক্তবর্ণ খামচির দাগ। আর কলার বোনের একটু উপরে সেই ছোট্ট কালো তিল টার ওপর লাল হয়ে আছে গভীর কামড়ের দাগ। দেখে মনে হচ্ছে কোনো হিংস্র প্রাণী তার চিহ্ন রেখে গেছে। তার মনে কানের কাছে বেজে উঠলো সেই গভীর কন্ঠ,
“তোমার এই বিউটি স্পটটা যেন কারো নজরে না পড়ে। নইলে এর পরের বার আরো ভয়ংকর শাস্তি পেতে হবে।”
রিমের সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। কে এই ছায়া মানব? কেনইবা তার উপর এভাবে অধিকার খাটাল? কি চায় সে? কি শত্রুতা তার সাথে রিমের? না আর ভাবতে পারছে না। মাথা যন্ত্রণা করছে প্রচুর। দুহাতে কান চেপে সে মেঝের ওপর বসে পড়ল।

শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে আসে রিম। তার পড়নে একটা ঢিলেঢালা টপ আর একটা প্লাজু। মাথার চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মোড়ানো।তোয়ালেটা অযত্নে পড়ার টেবিলের চেয়ারে ছুড়ে ফেলে সে ক্লান্তভাবে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। নরম বালিশের ছোঁয়ায় চোখ দুটো যখন বুজে আসছিল, ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল তার ছোট বোন রাহি।
“রাত্তিপু! আম্মু খেতে ডাকছে। তাড়াতাড়ি আয়।”
রিমের এখন কিছুই ভালো লাগছে না। ঘুম পাচ্ছে ভীষণ।সে বিরক্তিভরা গলায় বলল,
“খাব না… তুই যা তো রাহি, একদম জ্বালাবি না।”
“আম্মুকে বললে কিন্তু এসে প্যাদানি দেবে!”
রিম বিছানায় শুয়েই মুখে ভেঙচি কাটে ,
“এএএএএ,, প্যাদানি দেবে….. যা গিয়ে বল দেখি কি করে।”
রাহি এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজার দিকে মুখ করে চেঁচিয়ে উঠল,
“আম্মুউউউ… রাত্তিপু খাবে না বলছে!”

রিম বিদ্যুতের গতিতে বিছানা ছেড়ে উঠে রাহির মুখ চেপে ধরল। নিজেও গলার স্বর উঁচিয়ে বলল,
“না আম্মু, ও মিথ্যে বলছে! আমি কখন বললাম খাব না? এই তো আসছি।”
সুযোগ বুঝে রাহি রিমের হাতে কষে একটা কামড় বসিয়ে দিল।
“আআআ… রাক্ষুসী একটা!” রিম ব্যথায় হাত ঝাড়তে লাগল।
“হুহ্! তুই একটা ডাইনি!”
বলেই এক দৌড়ে ঘর থেকে পালাল রাহি। রিম ও এক মুহূর্তের জন্য সব কিছু ভুলে রাহির পেছনে ছুট লাগায়। নিচে নামতেই মায়ের রণমূর্তি রূপ দেখে দুজনেই চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে।
“আবারো মারামারি করছিস তোরা! তোদের জ্বালায় কি একটুও শান্তিতে থাকতে পারবো না আমি। সব ছেড়ে চলে যাই । তারপর তোরা যা খুশি কর। আর পারছিনা আমি এই সংসার সামলাতে। এবার একটু শান্তি চাই। একজন তো সেই কবেই চলে গেছে আমার ওপর সমস্ত দায়িত্ব চাপিয়ে। বলি কি দুই বোনে তারাতাড়ি খেয়ে ঘুমাতে যা আমাকে একটু উদ্ধার কর।”

মায়ের কথায় মুহূর্তেই মন খারাপ হয়ে যায় দুই বোনের। এটা তাদের মায়ের রোজকার কাজ। তারা চুপচাপ খেতে বসে পড়ে।কিন্তু টেবিল থেকে উঠতে নিতেই আবার বেঁধে যায় তান্ডব। এঁটো বাসন কে ধুবে সেটা নিয়ে। মা তো সারাদিন সেলাইয়ের কাজ করছে, তারপর আবার রান্নাবান্না। তিনি একটু আগেই গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শরীরটা ভালো লাগছে না। আর এদিকে দুইবোন টম এন্ড জেরির মত ঝগড়া করে যাচ্ছে।
রিম তারপর বলে,
“ঠিক আছে, তুই মেজে দিবি আর আমি ধুয়ে দেব। ডিল?”
“এএএএএ্য্য শখ কত! পারবো না। কালকে সব আমি একা ধুয়েছি । আজকে তুই যা।”
রিম মুখ ফুলিয়ে বলে,
“আয় না বোন আমার ভালো। তোকে দুই টাকা দেব।”
“এহ্ আসছে…. দুই টাকায় একটা চকলেটও পাওয়া না! তুই যা।”
রাহি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“তাহলে আমার আইসক্রিম ফেরত দে। কালকে তোকে যেটা খাইয়েছিলাম।”
“পারবো না। আমি তোকে বলেছিলাম দিতে? তুই নিজেই দিয়েছিস। আর আমি যখন খাই তখন তো বলিস একটু দে না, একটু দে প্লিজ ।

“ঠিক আছে মনে রাখিস পরে যখন আবার খাবো তোকে একটুও দিব না।”
“হুহ্ যাহ্ লাগবে না। আমারটা আমি নিজেই কিনে খেতে পারি । সবসময় তো এটা খাওয়াবি ওটা কিনে দিবি বলে কতো কাজ করিয়ে নিস! পরে তো কিছুই দিস না। কিপ্টা একটা। দেখে নিস তোর কপালে বর জুটবে না।
রাহি মুখ ভেঙচাতে ভেংচাতে উপরে চলে যায়। রিম পেছন থেকে ভেংচি কেটে নিচু স্বরে বলল,
“বর লাগবে না। আমার জন্য ফেইরি টেইলের প্রিন্স আসবে দেখিস।”
পরক্ষনেই তার মুখে ফুটে ওঠে এক লাজুক হাসি। তারপর সে তাকায় হাতের ব্রেসলেটটার দিকে। পুরনো একটা সিলভারের ব্রেসলেট। তারপর সে আনমনেই বলে ওঠে,
“আরাত্র কোথায় তুমি। তুমি তো আসবে বলে, আর এলে না।……..”

তার চোখে ভেসে ওঠে কিছু পুরনো ঝাপসা স্মৃতি।
ছোট্ট এক সাত বছরের বাচ্চা মেয়েকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ষোল বছরের এক কিশোর। বাচ্চা মেয়েটি চকলেট খেয়ে পুরো মুখ হাত মাখিয়ে ফেলেছে। সে আধ খাওয়া চকলেটটি এগিয়ে দেয় ছেলেটার দিকে।
“আলাতলো তুমি খাবে?”
“ইটস নট আলাতলো ইটস্ আরাত্র গট ইট। আমি চকলেট খাই না। তুমিই শেষ করো।”
বাচ্চা মেয়েটি বাঙের মতো মুখটা ওপ ফুলিয়ে ফেলে। সেটা দেখে মুচকি হেসে ফেলে কিশোর।
“ঠিক আছে তুমি খাইয়ে দাও।”
নিজের আধ খাওয়া গলে যাওয়া চকলেট ছোট ছোট আঙুলে কিশোরকে খাইয়ে দেয় বাচ্চা মেয়েটি।সেই স্পর্শে কিশোরটির শরীরে এক মুহূর্তের জন্য যেন এক অজানা বিদ্যুৎ খেলে গেল। তার হাসিখুশি মুখটা হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে এল।সে রিমকে নামিয়ে দিয়ে বলল,

“শোনো এবার তুমি যাও। একটু পর সবার পেরেন্টস আসবে নিতে।”
কিন্তু বাচ্চা মেয়েটি যেন নাছোড়বান্দা।সে তার আরাত্রর জামার হাতা খামচে ধরে বলল,
“না আমি যাবো না। আমি তোমার সাথে থাকবো। আগে আম্মু আসুক তারপর যাবো।”
কিশোর ছেলেটি এবার অস্থির হয়ে উঠলো সে বাচ্চাটিকে, বোঝানোর চেষ্টা করে আদরের সহিত বলে,
“জেদ করে না সোনা। এই মুহূর্তে আমার কাছে থাকা ঠিক হবে না তোমার। তুমি বুঝতে পারছ না।”
“না, না, না, আমি যাবো না।”
বাচ্চা মেয়েটির জেদ আর কান্না বাড়তেই থাকে। সে কিছুতেই যাবে না তার আলাতলোকে ছেড়ে। এবারে রাগে ফেটে পড়ে কিশোর,

“চুপ !!! আর একবার জেদ করলে চাপকে দাঁত ফেলে দেব।”
অভিমানে গাল ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে অবুঝ বাচ্চা মেয়েটি।
“তুমি পঁচা, খুব পঁচা, তুমি আমাকে বকেছে।”
সে এক ছুটে চলে যায় সেখান থেকে। সেই দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে কিশোর। তাকে বকে যেন তার থেকে বেশি কষ্ট সে নিজেই পাচ্ছে । বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠছে। এই মেয়ের রাগ অভিমান কিছুই সহ্য করতে পারে না সে। এখন আবার রাগ ভাঙাতে না জানি কত কাঠখোট্টা পোড়াতে হয়।

হঠাৎ রান্না ঘর থেকে থালাবাসনের ঝংং শব্দে হুশ আসে রিমের। হয়তো বেড়াল এসেছে। সে হাতে করে প্লেট গুলো ধুতে নিয়ে চলে যায়। কাজ শেষ করে ওপরে উঠে রুমে গিয়ে দেখল রাহি অঘোরে ঘুমাচ্ছে। রিমও ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। ঘুমের ঘোরে রাহি বারবার পা তুলে দিচ্ছে রিমের ওপর। এমনিতে শরীর মেজাজ কোনোটাই ভালো নেই, তার ওপর রাহির এই উৎপাত সহ্য হলো না। রিম বিরক্ত হয়ে সজোরে এক লাথি মারল রাহির কোমর বরাবর। ঘুমের মাঝেই ব্যথায় মুখ কুঁচকে মৃদু আর্তনাদ করে উঠল রাহি, তারপর পাশ ফিরে আরও দূরে সরে গিয়ে আবার অতল ঘুমে তলিয়ে গেল। জেগে থাকলে এতক্ষণে নির্ঘাত দক্ষযজ্ঞ বেঁধে যেত।

রিম বালিশের পাশ থেকে হাতে তুলে নেয় নিজের ফোনটা। আলসেমি করে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ তার আঙুল থেমে গেল একটা ভিডিওতে। স্ক্রিনে দুই তরুণ-তরুণী গভীর অনুরাগে একে অপরকে চুম্বন করছে। দৃশ্যটা দেখে রিমের ভেতরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি বয়ে গেল। সে চট করে একবার চারপাশটা দেখে নিল। কেউ দেখছে না।এক ধরনের নিষিদ্ধ কৌতূহল নিয়ে সে বারবার ভিডিওটা রিপিট করতে লাগল। নিজের অজান্তেই জিহ্বা দিয়ে শুকিয়ে আসা ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে নিল সে। মনে মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন উঁকি দিল— আচ্ছা, লিপ কিস করতে কেমন লাগে? কেমন ফিল হয়? এর টেস্ট কেমন?” এই দোলাচলের মাঝেই কখন যে ফোনটা বুকের ওপর রেখে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, টেরই পেল না।

কিছুক্ষণ পর, নিস্তব্ধ ব্যালকনির খোলা দরজা দিয়ে ছায়ার মতো ঘরে প্রবেশ করল এক আগন্তুক। পরনে কালো হুডি, মাথায় হুড তোলা—মুখটা অন্ধকারে ঢাকা। সে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে রিমের পায়ের কাছে মেঝেতে বসল। চাঁদের ম্লান আলোয় রিমের ফর্সা পায়ের পাতাগুলো গোলাপি আভা ধারণ করেছে। আগন্তুকের স্থির দৃষ্টি আটকে গেল সেখানে।তার দৃষ্টি ঘোলাটে হচ্ছে। সে এখন নিজের মাঝে নেই। যেন কেউ তাকে সম্পূর্ণ বশ করে রেখেছে, হিপনোটাইজ!! নিজের অজান্তেই সে ঘোরের মাঝে ধীর লয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় রিমের পায়ের পাতায়। পায়ে শীতল স্পর্শ অনুভব হতেই ঘুমের মাঝেই সামান্য কেঁপে ওঠে মেয়েটা।সেই মৃদু স্পন্দনেই যেন হুশ ফিরল যুবকটির। সে তাৎক্ষণিক দুরে সরে বড়বড় করে দম নিতে থাকে। বুকটা অস্থির ভাবে ওঠানামা করছে। কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে নিজের তর্জনী দিয়ে নাকের নিচেটা ঘষে নিয়ে অভ্যাসবশত কনিষ্ঠা আঙুলে সজোরে কামড় বসালো। হঠাৎ এমন কেন লাগছে ? মেয়েটাকে কাছ থেকে দেখে তার সমস্ত সিস্টেম এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ভেতরে উথাল পাতাল ঢেউ বইছে। কই আগে তো কখনো এমন হয়নি। জীবনে কত শত নারী দেখেছে সে। ছোট ছোট ড্রেস এমনকি কাজের জন্য সম্পূর্ণ উ*লঙ্গ মেয়েও দেখতে হয়েছে অনেক সময়! কই তখন তো রক্তের গতি এমন অবাধ্য হয়নি! কিন্তু এই মেয়েটার নিছক সান্নিধ্য তার দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা প্রস্তর কঠিন পুরুষত্বের ভীত নাড়িয়ে দিচ্ছে।

সে ইতালি চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু মন মানলো না। যাওয়ার আগে একনজর মেয়েটিকে দেখতে চলে এলো। হ্যাঁ রোজ লাইফ ফুটেজে দেখে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে দেখার অনুভূতিই আলাদা! সে গালে হাত দিয়ে বসে পড়ে মেয়েটির মুখের কাছে। বাইরের ফিকে চাঁদের আলোয় রিমের মুখটা কোনো ধ্রুপদী কবিতার মতো স্নিগ্ধ আর সরল দেখাচ্ছে। সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার নজর স্থির হয়ে গেল রিমের পাতলা গোলাপি অধরের ঠিক নিচে থাকা সেই কুচকুচে কালো তিলটার ওপর। শৈশবে ওটা ছিল আবছা এক বিন্দু, কিন্তু বয়সের সাথে সাথে ওটা যেন এক মায়াবী আকর্ষণে রূপ নিয়েছে। যুবকটি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল—এই সৌন্দর্য যেন তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।

ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল বিছানায় পড়ে থাকা রিমের ফোনের ওপর। স্ক্রিনে তখনও সেই দৃশ্যটা; যেখানে ডেস্পারেটলি অধরে অধরযুগল মিলিয়ে চুমু খাচ্ছে দুজন নর-নারী। সে প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তারপর কিছু একটা ভেবে শয়তানি হেসে ঠোঁট কামড়ে ধরে। গলাটা নিচু করে সে ফিসফিসিয়ে উঠল,
“Hey…… little girl টা দেখি এখন quite grown up। তোমাকে ছোট ভেবে আর দুরে সরিয়ে রাখার প্রশ্নই আসে না। রাত দিন চব্বিশ ঘন্টা নিজের সাথে মিশিয়ে রাখবো একেবারে।”
সে সন্তর্পণে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে স্ক্রিনটা অফ করে উঠে দাড়ালো।ব্যালকনির দিকে পা বাড়িয়েও সে একবার থামল। পেছনে ফিরে ঘুমন্ত রিমের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। অন্ধকারের ভেতরেও তার চোখের সেই আকাশী-ধূসর মণি দুটো ঝিলিক দিয়ে উঠল।
“চলে যাচ্ছি ঠিকই……… কিন্তু ফিরবো আবার শিগ্ৰই।”

চারপাশে সোনালি আলোর ছটা। নীল কুয়াশার চাদরে ঢাকা এক নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে রিম।তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে এক অপূর্ব সুপুরুষ। মাথায় রুপালি মুকুট, গায়ে হালকা নীল জোব্বা,চোখে হিরের মতো দ্যুতি। রাজকুমারের হাসিতে এমন এক সম্মোহন ছিল যে, রিম মুহূর্তেই তার চারপাশের জগত ভুলে গেল।
​”চলো, তোমায় নিয়ে যাব। যেখানে শুধু আমি আর তুমি…”
নরম, মখমলের মতো সেই কণ্ঠস্বর শুনে রিম মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। এক অজানা সুখে তার বুকটা ভরে উঠল। রাজকুমার ধীরলয়ে হাত বাড়িয়ে দিতেই রিম কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজের হাতটা তার হাতের ওপর রাখল। এক উষ্ণ শিহরণ বয়ে গেল তার শরীরে।

​কিন্তু স্পর্শটা মুহূর্তেই বদলে গেল বরফশীতল হিমে।
হঠাৎ আকাশের সেই সোনালি আভা কুচকুচে কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল। রিমের হাতের ওপর রাখা রাজকুমারের সেই সুন্দর হাতটা বিস্বাদ এক থাবায় রূপ নিল। রিম ভয়ে ওপরের দিকে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। সেই মায়াবী মুখটা বিভীষিকার মতো বিকৃত হয়ে গেছে! মুকুটটা খসে পড়ল মাটির বুক চিরে, রাজকুমারের নীল মণি দুটো হয়ে উঠল আগুনের মতো লাল। তার নাক আর ঠোঁটের কোণ দিয়ে ঝরছে গাঢ় রক্ত, দাঁতগুলো যেন কোনো বুনো জানোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে।রিম আঁতকে ওঠে,
“না… না… ছাড়ো আমাকে! কোথায় নিচ্ছো!”
মনস্টার-রূপী রাজকুমারটা তখন অন্ধকারের গহ্বরে রিমকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে কেবল ছায়া, গর্জন, আর এক অজানা শ্বাসরোধী ভয়!

“বাঁচাও!! কে আছে? কেউ আছো?”
ঘুমের মধ্যেই চিৎকার করে ওঠে রিম।ধপ করে উঠে বসে বিছানায়। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। গলা শুকনো। হৃদস্পন্দন যেন দৌড়চ্ছে দেহভরেই।
সে কিছুক্ষণ হাঁপাতে হাঁপাতে তাকিয়ে থাকে চারপাশে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারে সবটাই ছিল একটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু শরীরটা যেন সত্যি সত্যিই সেই অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। তার গা ঘেমে উঠছে। একটা হাত নিজের বুকে চেপে ধরে, আরেকটা দিয়ে চোখ মুছে নেয়।
“এমন স্বপ্ন… হঠাৎ কেন?”
তার বুকের ভেতরে যেন অজানা শঙ্কার ঢেউ খেলে যায়। বুক ধড়ফড় করছে এখনো। পানি খেতে ইচ্ছে করলেও উঠে যেতে মন চাইছে না। তখনি চোখ পড়ে নিচে… বিছানার পাশেই মেঝেতে কম্বলে মোড়ানো রাহি।ঘুমের মধ্যে বকছে আবোল-তাবোল,

“আহ্… আইসক্রিমটা আমার… তুই খাবি না… আঃ কামড় দিবো…”
রিম অজান্তেই হেসে ফেলে।
“এই ডাইনি, ঘুমের মাঝেও কামড় দিচ্ছিস?”
সে নরম করে একটা বালিশ ছুঁড়ে মারে রাহির গায়ে।একটা হালকা ছুট ছুট ঠোঁটের হাসি তার মুখে ঝুলে থাকে হঠাৎ—টক টক টক…
বাইরের দরজায় টোকা। রিম চমকে তাকায়। সময় সকাল সাড়ে আটটার মতো। আজকে তো ভার্সিটির প্রথম দিন। নিশ্চয়ই অদ্রিজা এসেছে।
“ঐ গাধি তাড়াতাড়ি দরজা খোল।”
রিম দ্রুত উঠে যায় দরজা খুলতে। খুলেই দেখে, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, গায়ে হালকা ফতুয়া আর হাতে এক প্যাকেট খাবার।

“জানতাম মহারানী এখনো তৈরি হয়নি। তার জন্যই খাবার নিয়ে চলে এসেছি।নে এবার তারাতাড়ি তৈরি হয়ে নে। নইলে প্রথম দিনি দেরি হয়ে যাবে।”
অদ্রিজা ভেতরে ঢুকে এলোমেলো বিছানায় বসে পড়ে। রিম এবার তাড়াহুড়ো শুরু করে দেয়। সে কিছুটা ইতস্তত বোধ করতে থাকে। অদ্রিজা তার দুই কাঁধে হাত রেখে বিছানায় বসিয়ে দেয়। চোখে চোখ রাখে। এবং নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“আমাকে খুলে বল তো কাল কি হয়েছিল?”
রিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ঠোঁট কামড়ে চোখ নামিয়ে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
“অদ্রি… আমি জানি না কি হলো… আমি তো কিছুই বুঝিনি…কাল সেই ছায়াটা………..
রিম মাথা ঝাঁকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। যেন সেই দৃশ্যগুলো আবার সামনে ভেসে উঠছে। সব শুনে অদ্রিজা হতবাক। সে চোখ বড়বড় করে হা করে তাকিয়ে থাকে। যেন সিনেমার কোনো হাইপেক ক্লাইম্যাক্স চলছে!
একটু পর হঠাৎই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে,

“ওয়াও… এ তো একদম ডার্ক ফ্যান্টাসি! কালো রুম, হাস্কি ভয়েস, রহস্যময় স্পর্শ… উফ্! Goosebumps!”
রিম চোখ বড় করে তাকায়।
“তুই পাগল নাকি! আমি তো ভয়ে কাঁপছিলাম!”
“ইস্ রিম! যদি আমার সাথে এমন হতো! তোর লাইফ একদম থ্রিলে ভরপুর… আর আমি? টেস্টে শিট দেখতে গেলেই পাশে দাঁড়ায় গজার স্যার!”
রিম না হেসে পারে না।
“তুই একটা পাগল…”
“হ্যাঁ তা তো বটেই! কিন্তু এখন সত্যি করে বল, ওর গলার আওয়াজটা কেমন ছিল?”
রিম চোখ বন্ধ করে ফিসফিসায়,
“গভীর… গা ছমছমে রুক্ষ… কেমন যেনো। আর মনে হচ্ছিল সে আমার ব্যাপারে সব জানে। সেই ফিসফিসানি কন্ঠ……. (Even your ashes are mine.)”
অদ্রিজা থমকে যায়।

“ওমাইগড… এটা আর ফ্যান্টাসি না রে… This is pure obsession.”
রিম জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে একটা লম্বা শ্বাস নিল সে। মৃদু স্বরে বলল,
“আমি এমন ফ্যান্টাসি চাই না অদ্রি… আমি চাই কেউ আসুক, হালালের শুভ্র চাদর জড়িয়ে… সবটুকু সুন্নত গায়ে… হৃদয় ভরা হেদায়েত নিয়ে…”
অদ্রিজা তাকিয়ে থাকে নীরবে। জানে, এই মেয়েটার কল্পনাও সত্যির চেয়েও বেশি জটিল।অদ্রিজা পরিবেশ স্বাভাবিক করতে রিমের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হাসে।

“আচ্ছা রে… যদি আবার সেই ছায়ামানবটা তোর সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তুই কি করবি?”
রিম ঠোঁট টিপে হালকা একটু কুটিল হাসলো তারপর এক হাত দিয়ে ঘুষি পাকিয়ে বলল,
“সোজা মেন্ট পয়েন্টে বাড়ি মারবো… একদম সারা জীবনের জন্য বাত্তি নিভিয়ে দিবো!
এই কথা বলেই দু’জনেই হেসে গড়াগড়ি খেতে থাকে। অদ্রিজা তো হেসে কুঁচকে যায়।
“আহাহাহা! তুই যে এই শান্ত মুখোশের আড়ালে এক ছোটখাটো গুন্ডা লুকিয়ে রেখেছিস, সেটা তো জানতাম না!”
রিম গম্ভীর মুখে বলে,
“জানবি না কেন? নিজেকে বাঁচাতে হিরোইনও একেক সময় ভিলেন হয়ে যায়।

কাঁশতে কাঁশতে বিষম উঠে যায় যুবকের।যুবকটির মুখমণ্ডল রক্তচাপের মতো চড়ে উঠে। সে এত জোরে নিঃশ্বাস টানে যে মাস্কের ভিতরে শব্দ হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।
৩৫ হাজার ফুট ওপরে উড়তে থাকা এক ম্যাট ব্ল্যাক প্রাইভেট জেট-এর ভেতরে। ঝকঝকে সাদা ইন্টেরিয়র, কড়া সিকিউরিটি। সামনে বসে আছে সোনালী ড্রাগনের প্রতীক খোদাই করা মাস্ক পরা এক যুবক।
তার সামনে খোলা ল্যাপটপে চলমান লাইভ ভিডিও ।রিম আর অদ্রিজার পুরো কথোপকথন কানে বাজছে।
সে ঠোঁট কামড়ে শয়তানি হেসে বলে,
“পিচ্চিটা আমাকে মেন্ট পয়েন্টে মারবে? একবার শুধু কাছে পাই মজা বুঝাবো।”
হঠাৎ কাশতে কাশতে উঠে দাঁড়ায় পাশে বসা তার এসিস্ট্যান্ট ল্যাপটপ থেকে শোনা কথায় যেন বিষম লেগে গেছে।
“স্যরি বস… আমি একটু জুস খাচ্ছিলাম…”

যুবক ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। ঠাণ্ডা গলায় বলে,
“জুসটা এবার তোর নাকে ঢুকিয়ে দিব?”
এসিস্ট্যান্ট কাঁপতে কাঁপতে আবার সোজা হয়ে বসে।যুবক এবার চোখ তুলে তাকায় ল্যাপটপের স্ক্রিনে, যেখানে রিম বিছানায় শুয়ে হেসে কুটিকুটি।তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক শয়তানি হাসি খেলে যায়।
“তুমি যদি ওখানে মারো… তবে আমি… তোমার হৃৎপিণ্ড চুরি করে ওটা তোমার বুকেই আজীবনের জন্য আটকে রাখবো।সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো চাবি থাকবে না।”
ল্যাপটপ বন্ধ করে সে মাথার হুডটা নামায়। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট এর মনে পড়ে যায় রাতে করা বসের পাগলামি গুলোর কথা।

অন্ধকার রাত। নারায়ণগঞ্জের একটা পরিত্যক্ত নির্জন রাস্তা চিরে এগিয়ে চলেছে কুচকুচে কালো একটি এসইউভি (SUV)।গাড়ির পেছনের সিটে আধো-অন্ধকারে বসে আছে সেই রহস্যময় যুবক। ড্যাশবোর্ড থেকে আসা হালকা লাল আলোর প্রতিফলন তার সোনালি ড্রাগন মাস্কের ওপর পড়ে এক বিচিত্র আভা তৈরি করেছে। চোখ দুটো ঠান্ডা বরফের মতো। গাড়ির নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ তার বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“স্টপ দ্য কার।”
স্টিয়ারিং ধরে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠে আয়নায় বসের দিকে তাকালো,

“B-but ভাই… we are just thirty minutes away from airport.”
“I said… STOP!”
একটা তীক্ষ্ণ গর্জনের মতো ঠাণ্ডা আদেশ। গাড়ি ধীরে ধীরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে এক নির্জন রাস্তায়।
বস দরজা খুলে নামেন। তার কালো কোট বাতাসে উড়ে উঠছে। পেছন থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট দৌড়ে এসে জানতে চায়,
“ভাই কী হয়েছে?”
“There’s something unfinished,
একটা ভয়ানক শান্ত কণ্ঠে সে বলে ওঠে।
“অর্ধেক কাজ করে পিছনে ফিরি না আমি।”
তার চোখে তখন রক্তের ক্ষুধা।র সে ফোন টেনে নেয়। দ্রুত একটা নাম্বার ডায়াল করে বলে,
“Is everything ready?”
অপর প্রান্ত থেকে উত্তর আসে,
“Yes boss. Like you said.

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৬

সে চোখ বুজে নিঃশ্বাস টানে, যেন নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণে আনছে। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে,
“Good. Make sure… the body can’t scream. Until I come.”
সে আবার গাড়িতে উঠে বসে। মুখে সেই চিরচেনা নিস্পৃহতা, কিন্তু চোখে লুকোনো আগুন। গাড়ি স্টার্ট করতেই গর্জে উঠে ইঞ্জিন। তারপর আবার নেমে আসে ভয়ংকর এক নীরবতা………….

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৮