প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৮
রাত্রি মনি
ঝোপঝাড়ের ভেতর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক নিস্তব্ধতাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। রাতের বাতাস যেন কোনো এক অশুভ ভারে থমকে আছে। বাতাসে ভাসছে কাঁচা রক্তের একটা হালকা, বিচ্ছিরি ঘ্রাণ।
ভার্সিটির পেছনের পরিত্যক্ত ভাঙা বয়লার ঘর। ভেতরে ধুলোবালি আর জং ধরা লোহার ভিড়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে একটি ছেলে। তার চোখের বাঁধনটা ভীষণ আঁটোসাঁটো। আতঙ্কে ছেলেটার শরীর থরথর করে কাঁপছে। পাশে যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে মুখোশধারী দুই গার্ড। তাদের একজনের হাতে একটা মোটা প্লাস্টিকের পাইপ, যা নিষ্ঠুরভাবে ছেলেটার মুখের ভেতর ঠেসে ধরা হয়েছে।
হঠাৎ একজনের বরফশীতল কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো দেয়ালে,
“ওর জ্ঞান ফেরা জলদি। বস অপেক্ষা করছে।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই পাইপ দিয়ে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বরফ-জল প্রবল বেগে ঢুকে পড়ল ছেলেটার গলার ভেতর। মুহূর্তেই এক তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে জেগে উঠল সে। মনে হলো কণ্ঠনালীটা কেউ জ্বলন্ত কয়লা দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসা কাশির তোড়ে বুকের খাঁচাটা যেন ভেঙে আসবে। সে প্রাণপণে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু ফুসফুসে বাতাসের বদলে কেবল হিমশীতল যন্ত্রণার হাহাকার।
চোখের কাপড়টা হেঁচকা টানে খুলে ফেলা হলো। ঝাপসা দৃষ্টিতে সে প্রথমে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই তার চোখ স্থির হলো সামনে থাকা এক জোড়া পায়ের ওপর। কুচকুচে কালো প্যান্ট আর পালিশ করা লেদার বুট। অন্ধকারের বুক চিরে কেউ একজন আয়েশ করে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে।
ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি ইলেকট্রিক সিগারেটের নীলচে আলো জ্বলে উঠল। আগন্তুক পরম আবেশে ধোঁয়া ছাড়ল বাতাসে। সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে বয়লার ঘরের স্যাঁতসেঁতে ছাদের দিকে। ধোঁয়ার আড়ালে লুকানো মানুষটার চোখে এক অতল নীরবতা—যে নীরবতা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর।
ছেলেটি কাঁপতে কাঁপতে গলায় একরাশ কৃত্রিম সাহস টেনে চেঁচিয়ে উঠল,
“ক-কে… কে তুই? আমাকে তুলে এনেছিস কেন?”
সামনের মানুষটির মধ্যে কোনো বিকার নেই। তার সামনে সাজানো একটি স্টিলের ট্রে, যার ওপর রাখা এক সারি চকচকে অস্ত্র—ছুরি, প্লায়ার্স, তীক্ষ্ণ কাঁচি আর সিরিঞ্জ। প্রতিটি যন্ত্র যেন এক একটা শরীরী যন্ত্রণার নীল নকশা। যুবকটি ধীরেসুস্থে হাতে কালো ল্যাটেক্স গ্লাভস পরে নিল। চামড়ার ওপর রবারের ঘর্ষণের শব্দটা এই নিস্তব্ধতায় প্রচণ্ড কর্কশ শোনাল। সে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল, ঠিক যেমন কোনো শিকারি তার শিকারকে ব্যবচ্ছেদ করার আগে বসে।
ছেলেটা তখন রাগে আর আতঙ্কে দিগভ্রান্ত। দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠল,
“তুই… তুই জানিস না, তুই কাকে তুলে এনেছিস?”
বিশাল বড় ভুল করে ফেলেছিস তুই। আমার গায়ে একটা টোকাও দিলে… একবার যদি আমার রক্তে হাত লাগে… আমার বাবা বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতাদের একজন! তোর বাপের বংশ ইতিহাস থেকে মুছে দেবে ওরা! তোকে কেউ খুঁজেও পাবে না, এমন গর্তে ফেলা হবে! এটা ভার্সিটি না, এটা আমার মাঠ… আর তুই?… তুই একটা কুকুর!”
কালো কোট পড়া যুবকের ঠোঁটের কোণে এক বিবৃত হাসি খেলে যায়। পরক্ষনেই বিদ্যুতের গতিতে তার হাতটা বাতাসে ঘুরে এল।সে চোয়াল শক্ত করে ঠাঁটিয়ে এক চড় বসিয়ে দেয় ছেলেটার ডান গালে। চড়ের শব্দটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।ছিটকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে ছেলেটার নাক আর দাঁতের ফাঁক দিয়ে।মাথাটা ঘুরে উঠল তার, চোখের সামনে পৃথিবীটা যেন এক লহমায় ঝাপসা হয়ে এল।
“Fu*cking brown b*itch. বাবা Huh… বাপের নাম নিয়ে চেচ্চাচ্ছিস?… রাজনীতি ৫ বছরের খেলা। আর আমি…. আমি Underworld এর Lord. আমার রাজত্বে একবার কারো চোখ পড়লে , সে চোখ আর চোখ থাকে না। আর তুই?… তুই তো আমার অস্তিত্বে হাত দিয়েছিস You son of a b**itch. তোর বাপকে গিয়ে আমার নাম বলে দেখিস পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠবে।”
ছেলেটি যন্ত্রণার ভেতরেও শেষবারের মতো ভ্রু কুঁচকে ভয় ঢাকার চেষ্টা করল। অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ক-কে তুই? তোর এত সাহস কোত্থেকে আসে?”
ঠিক সেই মুহূর্তে—পুরো ঘরের শূন্যতা যেন এক অশরীরী চিৎকারে কেঁপে উঠল। কোনো মানুষের কণ্ঠ নয়, বরং যেন দেয়ালগুলোই গুঞ্জন করে উঠল এক অভিশপ্ত নাম—
“আরাত্রিক জেইন চৌধুরী…”
নামটা কানে পৌঁছানো মাত্রই সময় যেন স্থবির হয়ে গেল। ছেলেটার শিরদাঁড়া বেয়ে এক হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। তার মুখ থেকে রক্তের লাল আভা মুছে গিয়ে ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে এল। চোখে নেমে এল অন্ধকার ছায়া।
সে অসংলগ্নভাবে বিড়বিড় করতে শুরু করল,
“না, না… না! এটা হতে পারে না… সে তো একটা… একটা দানব! এক নরপিশাচ!”
তার মনে পড়ে গেল সেই কিংবদন্তি, যা এই অন্ধকার জগতের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। এক ছায়া-মানুয, যার ছবি কেউ দেখেনি, যার হদিস কেউ জানে না। যার নাম কেবল যমদূত আসার ঠিক আগে শোনা যায়।
ছেলেটা এবার ফিসফিসিয়ে আর্তনাদ করে উঠল,
“না, না… তুই মিথ্যে বলছিস! তাকে তো কেউ খুঁজে পায় না… He is a shadow… একবার যে তাকে দেখে… সে আর কোনোদিন কথা বলার সুযোগ পায় না!”
জেইন ঠান্ডা গলায় হেসে ফেলে। তারপর ডান হাতের তিন আঙুলের সাহায্যে ছেলেটার চোয়াল শক্ত করে ধরে মুখটা নিজের দিকে ঘোড়ায়।
“তাই তো….. তুই তো এখনো কথা বলছিস।…… দুঃখের ব্যাপার এটাও তোর শেষ কথা ছিল।”
হঠাৎ জেইন একটু অপ্রকৃষ্ঠের মতো আচরণ করে। নাক ঘষে বড় বড় করে শ্বাস নেয়।
“এই! তুই ওর হাত ছুঁয়েছিলি না? বল! তোর কেমন লেগেছিল? খুব নরম ছিল ওর হাতটা, তাই না?”
সে অপ্রকৃতদের মতো নিজের আঙুলগুলো দাঁতে কামড়াতে থাকে। চলনে একধরনের অস্থির উন্মাদনা।
“এই কথা বলছিস না কেন হ্যাঁ? বল বল কেমন লেগেছিল? বল না? 11 years……. ha, 11 years ওর থেকে দূরে ছিলাম। ওর ছায়াও স্পর্শ করতে পারিনি। কতটা যন্ত্রণায় ভুগতে হয়েছে বুঝতে পারছিস? আর তুই…. তুই প্রথম দিন এসেই ওকে ছুয়ে ফেললি……. No no no কাজটা একদম ঠিক করিস নি। শাস্তি পেতে হবে তোকে।”
হঠাৎ একটা পশুর মতো হুঙ্কার দিয়ে সে চেঁচিয়ে উঠল
“শাস্তি পেতে হবে you f**ucking di**ck….”
বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো জেইনের হাতে উঠে এল একটা ধারালো শার্প নাইফ। বাতাস চিরে সেটা নেমে এল নিচে। সরাসরি ছেলেটার হাতের আঙুলের ওপর এক মরণঘাতী কোপ!
ছেলেটার কলিজা ফাটানো চিৎকারে বয়লার ঘরের দেওয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল। তরতাজা, উষ্ণ রক্ত ছিটকে এসে লাগল জেইনের গালে। মেঝেতে ছিটকে পড়ল তিনটে বিচ্ছিন্ন আঙুল। জেইন চোখ বন্ধ করে ফেলল। সেই উষ্ণ রক্তের ছোঁয়া যেন তাকে এক অলৌকিক শান্তি দিচ্ছে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক দানবীয় তৃপ্তির হাসি।
“আহ্ finally I got some relief….. এই!! চিৎকার কর আরো জোরে চিৎকার কর। তোর এই চিৎকারটা আমার কানে মিউজিকের মতো বাজছে।”
ছেলেটা যন্ত্রণায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম। সে বুঝতে পারছে না সে কার কথা বলছে, কাকে ছোঁয়ার অপরাধে এই বিভীষিকা! সে মুখ খুলতে চাইল, কিন্তু জেইন তাকে সেই অবকাশ দিল না। চোখের পলকে জেইনের হাতের ছুরিটা গেঁথে গেল ছেলেটার বাঁ চোখের কোটরে।
“আআআআআআহ…”
অমানুষিক সেই যন্ত্রণার হাহাকারে জেইন যেন ছোট বাচ্চাদের মতো আনন্দ পেল। সে পাগলের মতো বলতে লাগল,
“এই চোখ দুটো দিয়েই ওর দিকে তাকিয়েছিলি না? কোথায় কোথায় তাকিয়েছিলি? বল! ওকে দেখে তোর ভেতরে কী অনুভূতি হচ্ছিল? খুব ছুঁতে ইচ্ছে করছিল? বল না… তোর অনুভূতিগুলো আজ আমি দেখবো।তোর শরীর চিরে বের করব!”
উন্মাদনায় মত্ত জেইন এবার তার ছুরিটা ছেলেটার বুক বরাবর বসিয়ে দিয়ে সটাক করে চিরে ফেলল পেট পর্যন্ত। যেন এক কসাইয়ের বীভৎস তাণ্ডব। ছেলেটার আর চিৎকার করার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। তার নিভু নিভু চোখ দুটো কেবল নিজের শরীরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা নাড়িভুঁড়ি আর রক্তের বন্যায় নিজের শেষ প্রহর গুনছে।
তারপর শুরু হয় একের পর এক বিভীষিকা। এমন এক হিংস্রতা… যার সামনে পৃথিবীর সব হিংস্রতম প্রাণীও হাঁটু গেঁড়ে কাঁপে। এমন তাণ্ডব… যেখানে দয়াও রক্তে ডুবে মারা যায়।
নিজের কাজ সমাপ্ত করে উঠে দাঁড়ায় জেইন। তার সমস্ত মুখমণ্ডল রক্তে স্নান করেছে। আর নিচে পড়ে রয়েছে এক জীবন্ত বিভীষিকা। জেইন গ্লাভসটা খুলে ট্রে-তে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল,
“এই নর্দমাটাকে ভার্সিটির পেছনে ফেলে দিয়ে আসো।”
সে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায় কালো SUV গাড়িটার সামনে। ড্রাইভিং সিটে বসে স্টার্ট করে গাড়ি। খুঁখার দানবের মতো গর্জে ওঠে ইঞ্জিন। পেছন থেকে তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
“ভাই, আপনি কেন ড্রাইভিং সিটে বসেছেন? দিন, আমি তো আছি… আমি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।”
জেইন ধীরে মাথা তোলে। তার চোখে রক্তচক্ষুর মতো শীতল চাহনি। ভেতরটা গিলে ফেলার মতো ভয়াবহ ঠান্ডা গলা।জেইন ধীরে, গভীর স্বরে বলে ওঠে,
“উঠে বস। আজ তোর ছুটি। আজ আমি চালাবো।”
এক সেকেন্ডে থেমে যায় অ্যাসিস্ট্যান্ট। তার মুখ শুকিয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস আটকে আসে। জেইনের গাড়ির দরজা বন্ধ করার শব্দটা যেন চারপাশ নিস্তব্ধ করে দেয়।
“চৌধুরী মেনশন”
শান্ত, নীরব এক এলিট প্রাসাদ, যেন শহরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক ইতিহাসের প্রতীক।
বাড়ির প্রধান গেটটি বিশাল, রাজকীয় এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। পুরোটা কাস্ট আয়রনের তৈরি, কালো রঙের গায়ে মাঝে মাঝে সোনালী রঙের নিখুঁত নকশা।
গেটের উপরের দিকে খোদাই করে লেখা,,
“Chowdhury Mansion”
এই লেখার ভেতরেই আছে এক অভিজাত ঐতিহ্যের ছাপ । যা বোঝায়, এই বাড়িতে একসময় গর্ব করে বাঁচা হতো।
গেট পেরোনোর সাথে সাথে প্রশস্ত এক পাথরের পথ চলে গেছে বাড়ির মূল ফটকের দিকে। দুপাশে সারি সারি গোলাপ গাছ, বটল ব্রাশ, আর বিদেশি অর্কিডের ঝোপ। যেগুলো এখনো নিখুঁতভাবে কাটা-ছাঁটা রাখা হয়।
বাড়ির ডান পাশে আছে একটি বিশাল সবুজ লন, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে একদম সেন্টার পয়েন্টে একটি ফোয়ারা। শুভ্র পানির তিরতির শব্দে মনে পড়ে যায় একসময় বিকেলগুলো কেমন প্রাণবন্ত ছিল।
বাম পাশে বিস্তীর্ণ সুইমিং পুল, যার নীল জল আজও চকচকে ,যেন প্রতিদিন কেউ পরিষ্কার করে রাখে, যদিও অনেকদিন ধরে কেউ সাঁতার কাটেনি।
সুইমিং পুলের পাশে রাখা রয়েছে ছাউনি ঢাকা সানবেড আর ছোট ছাতা, যেখানে একসময় কেউ নিশ্চিন্তে বসে বই পড়তো, অথবা বাচ্চারা হেসে খেলতো।
আর ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে চৌধুরী বাড়ি, দুটি তলা বিশিষ্ট, সাদা মার্বেল পাথরের দেয়াল, বারান্দা ঘেরা, প্রতিটি জানালার উপরে কালো লোহার ডিজাইন করা গ্রিল।
দূর থেকে দেখলেই বোঝা যায় ,এটা একটা সময় খুব ভালোবাসায় গড়া হয়েছিল এই বাড়ি।
বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কালো, রক্তচোষা শকুনের মতো নিশব্দ এক SUV। গাড়ির সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে জেইন। তার কালো শার্টটা এখনও রক্তে ভেজা। কিছুটা শুকিয়ে গাঢ় লালচে, কিছুটা এখনো টলমল করছে। ছোপ ছোপ রক্ত, যেন কারও কান্নার রঙ।সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই বাড়িটার দিকে।যেখানে একসময় জীবন ছিল, আর এখন শুধু নীরবতা।তার চোখে কোনো রাগ নেই, দুঃখ নেই, এমনকি ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও নেই। শুধু একটা শূন্যতা… যেন দুনিয়ার সব আবেগ তার মগজ থেকে কেটে ফেলা হয়েছে।
ঠিক তখনই… তার কানে ধীরে ধীরে ভেসে আসে এক ঝাঁঝালো খিলখিল হাসি । একটা ছোট্ট ছেলেবাচ্চার…
“মা ধরতে পারবে না!”
জেইনের চোখের পলক পড়ে না, কিন্তু ভিতরের জমাট বরফে যেন একটা চিড় ধরতে থাকে।
বাড়ির চারদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই হাসির শব্দ।
একপাশে দৌড়ে ছুটছে ছোট্ট ছেলেটা, সে কখনো লনের ঘাসে গড়িয়ে পড়ছে, কখনো ফুলের টব উল্টে দিচ্ছে।
পেছনে তার মা , হাতে খাবার আর গলার স্বরে অস্থির মমতা,
“আরু ….! বাবা দাঁড়া! পড়ে যাবি তো! আগে খেয়ে নে, তারপর খেলবি!”
ছেলেটা জোরে হেসে উঠে বলছে
“না মা! আগে খেলবো, তারপর খাওয়া!”
ঘরের বারান্দা, সিঁড়ি, সুইমিং পুলের কিনারা সবখানে ছড়িয়ে পড়ছে সেই ছেলেটার পায়ের শব্দ।
একটা সময় তার মা হাল ছেড়ে বসে পড়ে হাসছে, ছেলের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত ভালোবাসায় চোখ টলমল করে।
আর তখনই, পেছনের বাস্তবের একটা হিংস্র বাতাস জেইনের রক্তমাখা জামা নাড়িয়ে দেয়।
তার কানে সেই হাসি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়…
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, নিঃশব্দে। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে একটা বিনা অনুভূতির ঘামবিন্দু। এই বাড়ি… একসময় শুধু একটা ‘ঠিকানা’ ছিল না, ছিল একটা ‘জগত’। এখন সেটা একটা প্রাসাদ , যেখানে মৃত্যুর মতো নীরবতা কড়া নাড়ে।
হঠাৎ…আকাশ কালো করে আসে। পশ্চিম দিক থেকে গর্জে ওঠে মেঘ। ঝুম বৃষ্টি নামে।আর ঠিক তখন, পেছন থেকে দৌড়ে আসে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট, হাতে একটা ছাতা।
“ভাই, আপনি ভিজবেন না প্লিজ, এই নিন।”
জেইন ফিরে তাকাল না। শুধু একটা বরফশীতল হাতের ইশারা। অ্যাসিস্ট্যান্ট থমকে গেল, এক কদম নড়ার সাহসও তার অবশিষ্ট নেই।
জেইন আচমকা লাফিয়ে উঠলো কালো এসইউভির ছাদে।একটুও শব্দ না করে শুয়ে পড়ে ঠিক আকাশটার নিচে।দুটো হাত শূন্যের দিকে মেলে ধরে। বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা ছুঁয়ে যায় তার আঙুল… তার মুখ… তার বুক… গায়ের রক্ত ধুয়ে যায়। কিন্তু চোখের দৃষ্টি? আকাশের দিকে স্থির। যেন চোখের পাতায় আটকে থাকা একটা পুরোনো দৃশ্য আবারও বেঁচে উঠেছে। সে চোখটা বন্ধ করে ফেলে। ফিসফিস করে বলে ওঠে,
“Ahh… This emotion? I fu*cking despise it. Hate it with every damn fiber.”
হঠাৎ কর্কশ কণ্ঠে বেজে ওঠে assistant এর পকেটে থাকা ফোন। সে ধীরে নিঃশব্দে এগিয়ে আসে। ভয়ে ভয়ে বলে,
“ভাই… আপনার বাবা কল করেছেন।”
জেইন ফোনটা হাতে নেয়, কানে তোলে। ওপাশ থেকে শোনা যায় বাবার কন্ঠ,
“ব্যেটা…. তুমি হঠাৎ এভাবে চলে গেলে কেন? কাউকে কিছু না বলে… আজকে তো বড় একটা ডিল ছিল। সেটা মিস হলে ক্ষতিটা কত বড় হবে, বুঝছ তো?
জেইন ঠান্ডা স্বরে বলে ওঠে,
“Don’t worry, পাপা। ওরা আবার আসবে… কারণ আমরা ছাড়া ওদের উপায় নেই। কালই ফিরছি, সাইন হয়ে যাবে।”
তার বাবা একটু হালকা স্বরে বলে,
“ঠিক আছে বেটা, রাখছি তাহলে।”
জেইন একটু চুপ করে থাকে, তারপর হঠাৎ নিচু গলায় ডাকে,
“…….পাপা?”
বাবার নরম সুর ভেসে আসে,
“হ্যাঁ বেটা, বলো।”
জেইনের ঠোঁটে একটুখানি গা-ছাড়া হাসি ফুটে ওঠে, যেন একটা কথা বলবে, কিন্তু থেমে যায়,
“নাথিং।”
অন্ধকার আকাশের বুক চিরে ছুটে চলেছে এক কালো প্রাইভেট জেট — INFERNO X।
মেঘের গর্জন, বজ্রপাতের ঝলক আর দমকা বাতাসকে চিরে তীব্র হুংকারে জঙ্গল ঘেঁষে নামে সেই প্রাইভেট জেটটা।জেটের চাকাগুলো মাটি ছুঁতেই ধুলো আর পাতা উড়ে ছিটকে পড়ে চারদিকে। পেছনের গাছেরা কাঁপে, পাখিরা ছুটে পালায়, হরিণ পর্যন্ত দৌড়ে পালিয়ে যায়। জেটের গায়ে আঁকা একটাই নাম — ARATRICK ZAIN CHOWDHURY।
একটা সময় দরজাটা খুলে যায়। সবার আগে নামেনা কেউ। সুদৃঢ় পা ফেলে ধীরে ধীরে, ভারী জুতোয় মাটি থেঁতলে, নিচে নামে সেই পুরুষ , কালো শার্ট, হাত গুটানো, ওপরে সূর্য না থাকলেও চোখে সানগ্লাস। সে হাঁটছে না হিমশীতল শূন্যতা এগিয়ে আসছে যেন।তার পেছনে ছুটে আসে তিনজন।
“Boss, She already cleared the way.”
জেইন থেমে যায়। ধীরে চোখ তুলে সানগ্লাস খুলে ফেলে। সেই চোখ… যেন তুষারাবৃত পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরি। সে ভিজিয়ে বলে.,
“Well then… Let’ play.”
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ
‘Narayanganj Metropolitan University (NMU)’
সকাল ৯টা ৪২ মিনিট
সূর্য তখনও রোদের তীব্রতা বাড়ায়নি। হালকা রোদ, বাতাসে গাছের পাতারা ঝিম মেরে দুলছে।
রিম আর অদ্রিজা ভার্সিটির মূল ভবনের পেছনের করিডোর ধরে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। রিমের পায়ে বল যেন নেই, তার মুখ সাদা, ঠোঁট রক্তশূন্য।অদ্রিজা এক হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে হাঁটছে, অন্য হাতে তার ব্যাগ।
পেছনের ক্যাম্পাসে তখনও পুলিশ টেপ টানাচ্ছে, অনেকে ফোনে ভিডিও করছে, ফিসফাস থামেনি।
ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে রিম আর অদ্রিজা। অদ্রিজা একটি রিক্সা ডাকে,
“এই মামা মাসদাইর যাবেন?”
রিক্সাওয়ালা মাথা নাড়ে।
“একটু আস্তে চালাবেন। ওর শরীরটা খারাপ।”
রিম ধীরে ধীরে উঠে বসে অদ্রিজার পাশে। তার মাথাটা যেন অদ্রিজার কাঁধে হেলে পড়ে। রিকশা রওনা দেয়।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা সাদা কালো মিশ্রিত রেঞ্জ রোভার গাড়ি প্রবেশ করে ভার্সিটি গেটে। চাকা ঘষে ধুলো উড়ে যায়। নিরাপত্তারক্ষী তাড়াতাড়ি গেট খুলে দেয়।গাড়ির ভিতর বসে এক চমৎকার মুখশ্রী, সানগ্লাসে ঢাকা চোখ, গালে হাল্কা চাপ দাড়ি। চুলগুলো ভলিউমভাবে আন্ডার কাট দেয়া। গাড়িটা ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসের ভিতর ঢুকে পড়ে, আর অন্যদিকে রিম আর অদ্রিজার রিকসা হারিয়ে যায় ভিড়ে।
রেঞ্জ রোভার মূল ভবনের সামনে থামতেই, স্নিকার্স পড়া একজোড়া পা মাটিতে ফেলে , নেমে আসে এক যুবক। তার পরনে এক ডেনিম জ্যাকেট। আর গলায় ঝুলানো R আকৃতির একটি স্টারলিং সিলভারের লকেট।প্রিন্সিপাল যুবকটিকে দেখে চমকে ওঠে।
“Mr. Jawad! You? This early morning? Any issue?”
রিশাব হালকা থতমত খেয়ে যায়। কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার ঠোঁট হালকা কেঁপে ওঠে,
“Actually… আমি… আমি একজনকে খুঁজছি।”
প্রিন্সিপাল জিজ্ঞেস করে,
“Name?”
রিশাব মনে মনে ভাবে,
“নামটাইতো জানি না…….”
“Mr. Jawad আপনার পরিচিত কেউ কি আমাদের এখানে পড়ে? আপনি বললে আমি খুঁজে দিতে পারি।”
“ইয়ে মানে…..”
রিশাব একটু ইতস্তত করে। এতটা অস্বস্তি জনক পরিস্থিতিতে তাকে আগে কখনো পড়তে হয়নি। সে কিভাবে বলবে একটি মেয়েকে খুঁজতে এসেছে? যাকে প্রথমবার দেখেই তার মনে ঝড় বয়ে গেছিল।
“actually এতক্ষণে সমস্ত স্টুডেন্ট ক্যাম্পাস থেকে চলে গেছে।”
রিশাব একটু চমকে ওঠে,
“কেন? কি হয়েছে?”
প্রিন্সিপাল একটু গম্ভীর মুখে বলেন,
“ক্যাম্পাসে আজ সকালে একটা ছাত্রের লাশ পাওয়া গেছে পিছনের বাগানে। ছেলেটা ছাত্রদলের নেতা। পুলিশ এসে সব সীল করে গেছে। ছাত্রছাত্রীরা খুব ভয় পেয়ে গেছে। বেশিরভাগই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছে।”
রিশাবের মুখটা শুকিয়ে যায়। কন্ঠ রোধ হয়ে আসে। সে প্রিন্সিপাল কে বিদায় জানিয়ে, উঠে পড়ে রেঞ্জ রোভারে।
বিছানার ওপর চাদরটা মুড়ি দিয়ে নিথর হয়ে শুয়ে আছে রিম। শরীরটা এখনও মাঝে মাঝে শিউরে উঠছে। অদ্রিজা তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই চলে গেছে। শেফালী বেগম যখন শুনলেন মেয়ের আবার ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হয়েছে, তখন আর কোনো ঝুঁকি নেননি; আজ আর টিউশনে যাওয়ার অনুমতি দেননি তিনি।
ঘরের ভেতর বিকেলের ধূসর আলোটা থমকে আছে। রিম ধীর পায়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল, ওয়াশ রুমে যাবে বলে।শরীরে প্রচণ্ড ক্লান্তি, কিন্তু দুশ্চিন্তার ভারে ঘুম আসছে না।সে গলায় পেঁচানো স্কাফটা খুলে ছুড়ে মারে বেডে।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। আয়নার প্রতিফলনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই কামড়ের দাগটা—গাঢ় লালচে, যেন এক হিংস্র পশুর নখের আঁচড়। সারাদিন প্রচণ্ড গরমেও সে গলার এই দাগটা ঢেকে রেখেছিল স্কাফ দিয়ে, যাতে মা বা ভার্সিটির কেউ দেখতে না পায়। ক্ষতটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অভিমানে তার মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে এল,
“রাক্ষস একটা!”
ইতালি
হঠাৎ কাশতে কাশতে বিষম উঠে যায় যুবকের। জেইন লাউঞ্জে বিশাল জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, কফির কাপ হাতে। হঠাৎ এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনির মতো কাশিতে কেঁপে ওঠে সে।কফির কাপ হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট ঝাঁপিয়ে পড়ে,
“ভাই! ভাই কি হলো আপনার? ঠিক আছেন তো? কেউ আবার আপনার নামে গালি দিলেন না তো?”
জেইন রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায়,
“স্যাট আপ ইডিয়েট!!”
অ্যাসিস্টেন্ট মুখ কাঁচামাচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ে। বুক ধ্রিম ধ্রিম করছে। কেন যে মুখ ফসকে বকবক করতে গেল! সে ফিসফিস করে নিজের মনেই নিচু গলায় বলে ,
“মাফিয়া কিনা জানি না, তবে আবেগের এই রেট দেখলে ‘ক্রিমিনাল অফ লাভ’ ঘোষণা দিতে হয়! ঠিক রোমিওর মাফিয়া ভার্সন।”
জেইন ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
“Did you say anything?”
এসিস্ট্যান্ট চোখ বড় বড় করে তাকায়, মনে মনে ভাবে এটা কি মানুষের কান না কি বাদুড়ের! সে একটা শুষ্ক ঢোক গিলে হাতজোড় করে বলে,
“না না ভাই আমি তো কিছু বলিনি! ওই যে বাতাসে, মানে…. বায়ুতে শব্দ হয়েছে, বায়ুতে!”
জেইন বিরক্ত গলায় বলে,
“ইডিয়েট।”
হঠাৎ সেই মুহূর্তে সেখানে প্রবেশ করে এক আগন্তক।লোকটার উচ্চতা ছয় ফুট দুই। বয়স ছাপ্পান্ন পেরুলেও, তার সৌন্দর্য যেন সময়কে থামিয়ে রেখেছে। কঠোর চোয়াল, গাঢ় নীল চোখ, ধবধবে চুলে হালকা রূপালি ছোঁয়া ঠিক যেন বরফের দেশ থেকে নেমে আসা এক অতিপ্রাকৃত সৌন্দর্য।
সামনে দিয়ে হেঁটে যায় যখন, মনে হয় সময়ই থমকে গেছে। কালো শার্ট, কালো স্লিমফিট স্যুট, সিল্কের টাই
আর হাঁটার ভঙ্গিতে এমন একটা নিঃশব্দ হুমকি থাকে, যেন দম নেওয়াটাও অনুমতির ব্যাপার।সে ধীরে পা বাড়ায়, কিছুটা নাটকীয় ভঙ্গিতে থেমে বলে,
“My son… come into my arms. Without you… this empire feels so hollow. (আমার বেটা আমার বুকে আসো। তুমি ছাড়া এই সাম্রাজ্য খুব ফাঁপা লাগে।)
লোকটা হাত মেলে ধরে, কিন্তু গম্ভীর চোখে তাকিয়ে থাকে,
“An empire without its heir is just a
fortress of ghosts. (উত্তরাধিকারী ছাড়া একটি সাম্রাজ্য কেবল ভূতের দুর্গ।)”
জেইন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার বাবা তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। গলা ফাটিয়ে নয়, বরং ঠান্ডা অথচ গভীর গলায় বলে,
“love you, my son. Now that you are here… everything will fall back into place.( এখন তুমি ফিরে এসেছো, সব আবার আগের মত হয়ে যাবে।)”
তার চোখে হালকা জ্বলজ্বল করা এক ভয়ংকর প্রশান্তি।
“Let the world get ready. My heir has returned. (বিশ্ব প্রস্তুত হোক। আমার উত্তরাধিকারী ফিরে এসেছে।)”
হঠাৎ জেইন তার কানে কাছে বরফঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,
“১১ বছর আগে কী হয়েছিল, Papa? Why did you lie to me?”
তার বাবার হাসি মুহূর্তে জমে যায়। কপালের শিরা ফুলে ওঠে। ঘামের চিকচিকে রেখা নেমে আসে নাকে‑কপালে।তার বাবার গলায় জোড়াতালি,
“Wh‑what lie, b‑beta? I… I don’t understand.”
জেইন চোখ নামিয়ে মৃদু শ্বাস নিল, যেন আগে থেকেই ঠিক করা ছিল কাজটা। পিতার বুকঘেঁষা অবস্থাতেই ডান হাতে সরু ফোল্ডিং‑ড্যাগার খুলে নেয় , এক টানে সোজা চুক্ করে ঠেসে দিল কণ্ঠনালিতে।
বাবার চোখ বিস্ফারিত। রক্তের গলগল শব্দ। দেহ কাঁপতে‑কাঁপতে জেইনের কোলে গড়িয়ে পড়ল।
জেইন অস্থির হয়ে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে গেল,
“Where is she? Tell me! WHERE IS SHE!”
তার বাবা ফেঁপে‑ফেঁপে রক্ত‑তোলা নিঃশ্বাসে কর্কশ গলে ফিসফিস করল,
“To‑… তোমার মা মরেনি, বেটা… She is alive…”
জেইন চোখ কপালে, ছুরির ফলা এখনো গ্রথিত, গলা শুকিয়ে এল।
“কোথায়?”
বাবার ঠোঁটে রক্তঝরা কৌতুক‑মিশ্রিত কাঁপা হাসি।
“Fra… Fr… ফ্রান্সিসকো… Francisco Hospital…”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৭
জেইনের দৃষ্টি জ্বলজ্বল করছে গলায় অস্থিরতা ।
“কোন হসপিটাল? কোন শহরে?”
বাবা হাতে‑মুঠো করে জেইনের জামা আকড়ে ধরে ফিসফিস করল,
“That… hard drive… everything… there…”
জেইন চোখ রক্তবর্ণ, ছুরিটা বের করে ঠোঁট কামড়ে বলল
“What hard drive, Papa? Papa… Papa!”
কথার মাঝপথে বাবার হাত গলে পড়ল মেঝেতে। চোখদুটো কাঁচের মতো ফাঁকা, ঠোঁট নিস্তেজ। শেষ নিঃশ্বাস… এক টুকরো রক্তের বুদ্বুদ ফেটে মুছে গেল।
