Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৯+২০

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৯+২০

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৯+২০
রাত্রি মনি

টুটা যো কাভি তারা
‌‌ সাজনা ভে………🎶
তুঝে রাবসে মাঙ্গা…রাবসে যো মাঙ্গা
মিলেয়া ভে………🎶

ঢাকা, Bailey Road
“Harmony Studio”
তপ্ত দুপুরের কড়া রোদ পিচঢালা রাস্তার ওপর যেন আগুনের হল্কা ছড়াচ্ছে। রিমের কপালে জমেছে ঘামের বিন্দু, রোদে পুড়ে কাঁধে গিটারটা যেন আরও ভারি লাগছে। কিন্তু সেদিকে ওর খেয়াল নেই। ওর সমস্ত মনোযোগ ইউনিভার্সাল মিউজিক হাউজের বন্ধ গেটটার দিকে।
পাশে দাঁড়ানো অদ্রিজা অস্থির হয়ে গার্ডের সাথে তর্ক করছে,
“ভাইয়া, প্লিজ! আমরা অনেক দূর থেকে আসছি। জ্যামের কারণে দেরি হয়ে গেছে। মাত্র পঁচিশটা মিনিট
তো!”
সিকিউরিটি গার্ডের মুখ যেন পাথরে খোদাই করা। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,
“রুল ইজ রুল। অডিশন ক্লোজড। এখন ভেতরে গিয়ে লাভ নেই, স্যাররা প্যাক-আপ করছেন।”
রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ভাইয়া, আমরা ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ করে কোনোমতে ছুটে এসেছি। একটা সুযোগ কি দেওয়া যায় না?”
গার্ড এবার বিরক্ত হয়ে গলা চড়ালো,
“আপনারা বুঝতে পারছেন না, এটা কি রাস্তার অনুষ্ঠান নাকি? এটা রিশাব জাওয়াদ এর অডিশন শো। টাইম মানে টাইম।”
ঠিক সেই মুহূর্তে কাঁচের ভারী দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল এক যুবক। সাদা টি-শার্টের ওপর নীল-সাদা চেক শার্টের বোতামগুলো খোলা, চোখে ডার্ক সানগ্লাস। এক হাতে ফোন, অন্য হাতে গাড়ির চাবি। তাকে দেখা মাত্রই গার্ডের শক্ত ভঙ্গি মুহূর্তেই নুয়ে পড়ল।
যুবকটি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“হোয়াটস গোয়িং অন? এত শোরগোল কিসের?”
কণ্ঠস্বরটা চেনা। রিম মাথা তুলে তাকাতেই বুকটা ধক করে উঠল। রিশাব জাওয়াদ! কথাটা বলা মাত্রই রিশাবের চোখ পড়ল সোজা রিমের চোখে। একটা থেমে যাওয়া সময়। চারপাশের শব্দ যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বুকের ভেতর এক অজানা ঝড় শুরু হয়, ঠিক যেমনটা তার স্বপ্নে বহুবার হয়েছে।
অদ্রিজা উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল,

“ও মাই গড! রিশাব জাওয়াদ! স্যার, আমরা আপনার বিশাল ফ্যান! ও অডিশন দিতে এসেছিল, কিন্তু গার্ড ভাইয়া ঢুকতে দিচ্ছে না।”
রিশাব সম্বিত ফিরে পেল। ঠোঁটের কোণে হালকা সৌজন্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,
“Nice to meet you. প্রবলেমটা কী?”
গার্ড মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
“স্যার, এরা অডিশনে অনেক লেট করে এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী…”
রিশাব গার্ডের কথা কেড়ে নিয়ে শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে বলল,

“তুমি এখানে গার্ড, জজ নও। Let them in.”
রিম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রিশাবের মতো বড় মাপের একজন শিল্পী তাকে এভাবে সুযোগ করে দেবে, সে কল্পনাও করেনি। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“কিন্তু আমি তো অডিশন মিস করেছি… আসলে আমি ঠিক জানি না আমি পারব কি না…”
রিশাব রিমের কাঁধের গিটারটার দিকে একবার তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসল।
“গিটার যখন পিঠে আছে, তখন ভয় কিসের? এসো।”
স্টুডিওর অডিটোরিয়ামে পিনপতন নীরবতা। বিচারক আসনে বসে থাকা গুণী মানুষগুলোর সামনে স্টেজে উঠতে গিয়ে রিমের পা কাঁপছে।হাতের মাইক্রোফোনটা যেন শতপাউন্ড ওজনের।নিচ থেকে অনেকের কৌতূহলী এবং বিরক্ত দৃষ্টি ওর ওপর বিঁধছে।
রিশাব নিচ থেকে রিমের এই জড়তা লক্ষ্য করল। সে উঠে গিয়ে স্টেজের এক কোণে দাঁড়াল। নিচু স্বরে বলল,

“মনে করো, এখানে কেউ নেই। লাইট, ক্যামেরা বা বিচারক—কাউকে দেখার দরকার নেই। ভাবো যে, এটা তোমার সেই বারান্দা যেখানে তুমি একা প্র্যাকটিস করো। জাস্ট ব্রিদ এন্ড সিং ফর ইওরসেলফ।”
রিশাবের সেই অভয়বাণী জাদুর মতো কাজ করল। রিম চোখ বন্ধ করল। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াল। প্রথম কর্ডটা বাজার সাথে সাথেই ঘরের পরিবেশ বদলে গেল।রিমের কণ্ঠ অডিটোরিয়ামে ছড়িয়ে পড়তেই মনে হলো প্রতিটি শব্দে যেন এক একটা গল্প লুকিয়ে আছে। কন্ঠে এক ধরনের মায়াবী শুদ্ধতা।গান শেষ হওয়ার পর কয়েক সেকেন্ডের এক নিস্তব্ধতা… তারপর বিচারকদের মৃদু গুঞ্জন।
রিশাব একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল রিমের দিকে। তার চোখে একরাশ মুগ্ধতা। সে এগিয়ে এসে বলল,

“তোমার গলায় জাদু আছে, কিন্তু সেটা এখনো কাঁচা হীরা। অনেক পালিশ করতে হবে। টেকনিক্যাল কিছু দুর্বলতা আছে, যা ট্রেনিং ছাড়া কাটবে না।”
অদ্রিজা পাশ থেকে বলে উঠল,
“কিন্তু ও তো কোনোদিন বড় কোনো ওস্তাদের কাছে শেখার সুযোগ পায়নি। এখন ওকে কে দেখাবে?”
রিশাব রিমের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ধীর গলায় বলল,
“সমস্যা নেই। আজ থেকে ও আমার স্টুডেন্ট। আমি নিজে ওকে ট্রেইন করব।”
রিম চোখ তুলে চমকে তাকায়।দেশের হার্টথ্রব মিউজিশিয়ান, যার গান শুনে ও বড় হয়েছে, সে নিজে তাকে শেখাবে? রিমের দুশ্চিন্তা মেশানো মেঘলা মুখে এক চিলতে রোদ খেলে গেল। হয়তো এটাই তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।

বিকেলের দিকে রিম ক্লান্ত পায়ে বাসায় ঢুকতেই ভেতরে শাড়ি-পরা ভদ্রমহিলাদের ফিসফাস, চায়ের কাপের ঠুংঠাং শব্দ, ছেলেদের গলা শুনতে পায়। বুঝতে তার বাকি থাকে না আজ আবার পাত্রপক্ষ এসেছে।রিমের মা দ্রুত তার কাছে এসে চোখ পাকিয়ে নিচু গলায় বলে,
“তোর মাথায় ঘোমটা দে। আর দাঁড়িয়ে থাকিস না, গিয়ে সালাম দে। লোকজন বসে আছে।
রিম দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দে।ভেতরে ভেতরে বাড়তে থাকে তীব্র রাগ।তবু মুখে হাসি মেখে, কোনো ঘোমটা না দিয়েই সে সামনে যায়, সোজা গিয়ে পাত্রপক্ষের ঠিক মাঝখানে বসে পড়ে এক চুলও মাথা নিচু না করে। সালামও দেয় না। সে মুখে একটা ভেংচি কেটে প্লেটে রাখা সিঙাড়া তুলে নিয়ে কামড় দেয়। একটা, দুইটা… চুপচাপ খাচ্ছে ভাবভঙ্গিমা এমন যেন তার সামনে কেউ নেই।
পাত্রের মা একটু কেশে বলে,

“তোমার নাম কি মা?”
রিম পাল্টা করে বলে,
“সেসব পরে আগে বলুন ছেলের বাড়ি গাড়ি সব আছে তো?”
পাত্রের মা একটু হেসে বলে,
“হ্যাঁ মা, ছেলে তো ভালো… চাকরি, গাড়ি সবই আছে।”
রিম তখন গম্ভীর মুখে বলে,
“গাড়ি আছে? তাহলে তো আমি কিছুদিন পর গ্যারেজের দেয়ালে ঝুলে থাকবো! বউ না হয়ে গাড়ির স্টিকার!”
এক লাফে ওর মা বলে,
“রিম!”
পাত্র কিছু বলতে যাবে, রিম আগেই বলে ফেলে,
“আপনি কি কবিতা বলেন?”
পাত্র একটু অবাক হয়ে মাথা নাড়ায়,
“না, আসলে আমি ব্যাংকে কাজ করি।”
রিম বলে,

“তাহলে তো মন্দ না। প্রেমিক কাব্য করুক, স্বামী হিসাব রাখুক!”
সবার মুখে একটু থতমত। পাত্র হালকা লজ্জা মিশ্রিত হাসে। মায়ের কানে ফিসফিস করে বলে মেয়ে তার ভীষণ পছন্দ। পাত্রের মা সোজা রিমের মাকে বলেন,
“মেয়ে দেখতে খুবই সুন্দর… আমাদের তো খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু ওর… আচরণটা… একটু আলাদা মনে হলো।”
রিমের মা ব্যস্ত হয়ে বলে,
“আসলে ছোট মানুষ তো… এইসব বুঝে না। বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে।”
তারা বিদায় নিয়ে চলে যায়। ঘরে নেমে আসে নিস্তব্ধ রাগ। রিম ঘরের মধ্যে ঢুকতে না ঢুকতেই তার মা চিৎকার করে বলে,
“তুই এইরকম করলি কেন? ওরা কী ভাবলো বল তো? এত সুন্দর ছেলে, বিদেশ থেকে এসেছে, ভালো চাকরি করে।”

রিম শান্ত গলায়, কিন্তু চোখে আগুন নিয়ে বলে,
“ওরা কী ভাবলো, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না মা। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম ,আমি এখন বিয়ে করবো না। আমার পড়াশোনা শেষ করতে হবে। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। বারবার এই বিয়ে বিয়ে… আমার আর ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে তো মনে হয়… মরেই যাই।”
তার মা চিৎকার করে উঠে,
“মরে গেলে যা! কিন্তু মরে যাওয়ার আগে তোর পেছনে যত টাকা খরচ করছি সব ফেরত দিয়ে যাবি!”
রিম একপা সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল, কিন্তু মায়ের সেই বাক্যটা কানে লেগে বুকটাকে ছিঁড়ে দেয়।সে থেমে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখের কোনা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।যতই হোক নিজের মায়ের থেকে এমন বাক্য কখনোই প্রত্যাশা করেনি সে। সে ভাঙা ব্যাথিত গলায় বলে,

“চিন্তা করো না মা তোমার সব টাকা ফেরত দিয়ে তবেই মরবো।”
তারপর সে ধীরে ধীরে উপরে উঠে যায়। রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়।আর বিছানায় শুয়ে পড়ে চুপচাপ। বালিশে মুখ গুঁজে দেয়, যেন সেখানে মায়ের বুকের মমতাময়ী ভালোবাসা খুঁজছে‌ যেটা আজ আর মেলে না। তার চোখের অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছে বালিশ। বাবার মৃত্যুর পর এখন পর্যন্ত মা তাকে একবারও বুকে জড়িয়ে আদর করেনি। তার কি ইচ্ছে করে না মাকে বুকে জড়িয়ে থাকতে? মা মা গন্ধ পেতে? কেউ কি নেই এই পৃথিবীতে যে তাকে একটু ভালোবাসবে? একটু বুঝবে… কেন জানি আজ ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার।

ইতালি,রোম
রোম শহরের এক পুরোনো কবরস্থান। চারপাশে শুনশান নীরবতা। দুরে অলপাইন গাছের সারি। বাতাসে হালকা মৃত গন্ধ। সাদা গ্রানাইট পাথরের নিচে সদ্য খোঁড়া কবর। কবরের ফলকে খোদাই করা – “Jarik Zharkov” (1968-2025)
কবরের ঠিক সামনেই নিষ্পৃহ দৃষ্টিতে দাড়িয়ে আছে যুবক। তার পরনে কালো শার্ট। মাথা সিল্কি ঝাঁকড়া চুলগুলো এলোমেলো। তার মুখের অভিব্যক্তি বোঝার উপায় নেই। ঠোঁট লাল কিন্তু চুপ। চারপাশে তার সমস্ত গার্ড নিশ্চুপে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, পাথরের মতো স্থির। তারপরে ঠোঁট কাঁপে হালকা ভাবে, নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে,
“Why, Papa… এতগুলো বছর মিথ্যে বলে কেন ঠকালে আমাকে? Why? এবার এই পাপ… আমি কীভাবে মুছব?”
হাওয়ার গুঞ্জনে তার কণ্ঠ হারিয়ে যায়। তার পেছনে ছায়া পড়ে, গোধূলির আলোয় কবরের মার্বেল চকচক করে ওঠে । তেমনই নিস্পৃহ, যেমন তার মুখ। কারণ আজ তার ভেতরে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই না অভিমান, না ভালোবাসা। শুধু এক নির্লজ্জ উত্তরাধিকার । এক রক্তাক্ত শীতলতা।

রাতের অন্ধকার যখন আরও গাঢ় হয়ে উঠলো, তখন আন্ডারওয়ার্ল্ড জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো একটাই খবর,
“THE GODFATHER IS DEAD.” “ডন জেরিক মারা গেছে।”
না, এটা কোনো গুজব নয়। না, এটা কোনো সাজানো নাটক নয়। এটা সত্যি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় গডফাদার, সেই রক্তপিপাসু কিংবদন্তি ডন জেরিক, খুন হয়েছে। আর খুনি? তাঁরই রক্ত তাঁর একমাত্র ছেলে “Aratrik Zain Chaudhary”।

আন্ডারওয়ার্ল্ড জুড়ে খবরটা ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুতের গতিতে যেন আগুনের ঢেউ ছুটে যাচ্ছে বিশ্বের সব প্রান্তে।
রোম, ইতালি –
এক বিলাসবহুল কাঁচঘেরা অফিসে ডন মারকো রিসিভার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কাঁপছে ঠোঁট।
“Impossibile! Zharkov never dies! Who did this?”
মস্কো –
ভ্লাদিমির বস তার হুইস্কির গ্লাস হাতে জমে যায়।
“If the son can kill the father… no one is safe anymore.”
টোকিও –
ইয়াকুজা প্রধান নিজের মুখোশ খুলে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে
“A new demon is born…”
ঢাকা –
স্থানীয় গ্যাং লিডারদের এক বৈঠকে সিগারেট ঠোঁটে এক ডন থেমে যায়।
“জেরিক মারা গেছে? তাহলে… এখন কে গডফাদার?”
“The throne is not empty.
Because the heir…
has returned.”
সে নেই এখন। ডন জেরিক যে এককথায় এক মৃত্যু পরোয়ানা ছিল আজ কবরের নিচে। কিন্তু তার জায়গা কেউ দখল করে নেয়নি। তার সিংহাসনে বসেছে তারই ছেলে “আরাত্রিক জেইন চৌধুরী”।যে তার বাবার থেকেও হাজার গুণ বেশি ভয়ংকর। সে যুক্তি দিয়ে শাসন করে না সে শাসন করে ভয় দিয়ে। তাকে দেখে কারও গুলি চলে না, কারণ গুলি চালানোর আগেই হাত কেঁপে যায়।

নারায়ণগঞ্জ, মাসদাইর
সকালটা ছিল অস্বাভাবিক নীরব। আকাশটা ধূসর, মেঘলা, ঠিক যেন কোনো অশুভ কিছু ঘটতে যাচ্ছে এমন একটা অজানা অনুভব ছড়িয়ে ছিল বাতাসে। হঠাৎ বেজে ওঠে ফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দ।রিমের মা কানে ফোনটা তুলেই থমকে গেলেন। কণ্ঠটা কাঁপছে, চেহারাটা ফ্যাকাসে।
“কি বললেন আপনি?”
ফোন কেটে যায়।
“হয়… হয়তো ভুল শুনেছি…”
রিম পাশ থেকে জিজ্ঞেস করে,
“কি হয়েছে মা?”
রিমের মা ধীরে তার দিকে ফিরে তাকায়। মুখে একটা গভীর আতঙ্ক আর হতাশা।
“কাল যারা তোকে দেখতে এসেছিল ওরা… ওরা আর নেই…..”
“মানে?”
“তারা গাড়ি করে ফিরছিল… এক্সিডেন্ট হয়েছে। পুরো গাড়িটায় আগুন লেগে গেছে। কারো শরীরটাও চেনার উপায় নেই…”

রিম হকচকিয়ে যায়। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। তার মা আবার ক্রোধে ফেটে পড়ে,
“তোর মত অভিশাপ মেয়ে বোধহয় পৃথিবীতে একটাই! এখন খুশি তো? বিয়ে করতে হবে না আর! যেই তোকে দেখতে যায়, সেই মারা যায়! এবার তো গোটা পাত্রপক্ষ শেষ করে দিলি! ধন্য তুই! এবার বল, খুশি তো?”
রিম কিছু বলে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মায়ের চোখে। যেন নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না, ওর আশেপাশে এমন এক অদৃশ্য অশুভ ছায়া ঘোরাঘুরি করছে।

ইতালি,রোম
চব্বিশ ঘণ্টার মাথায় ডনদের গোপন সভা বসে। একজন ডন কাঁপা কণ্ঠে বলে
“He killed the Godfather… his own father. Now we are finished.
বৈঠকে সবাই এক মুহূর্ত চুপ। একজন ফিসফিস করে বলে,
🔻 “Heir of Hell.”
🔻 “Son of Sin.”
🔻 “King of Blood.”

ভার্সিটির ক্লাস শেষে রিম রোজ রিশাবের কাছে যায় গান শিখতে। এখন ওর প্রাত্যহিক রুটিন। তারা দুজনে একান্তে বসে রেওয়াজ করে। তান তুলতে গিয়ে রিম যখন কোনো জটিল সারে ভুল করে ফেলে, রিশাব হারমোনিয়াম থামিয়ে ওর দিকে তাকায়। রাগ করার বদলে ওর ঠোঁটে খেলা করে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি। রিশাব নরম গলায় বলে,
“তুমি মন দিয়ে গানটা গাও। আমি আজ বাজি ধরে বলতে পারি, এই শহর একদিন তোমার সুরের নেশায় মাতাল হবে। তারা তোমার নামে চিৎকার করবে।”
তান তুলতে গিয়ে রিম কখনো ভুল করলে রিশাব হেসে বলে,
রিম তখন শুধু হালকা হাসে।ও আসলে খ্যাতির কাঙাল নয়। ও কেবল সুরের শুদ্ধতায় বাঁচতে চায়।
সময় পেরোয়। সুরের সাথে সাথে বাড়তে থাকে এক গভীর বন্ধুত্ব। রিম প্রথমবার কাউকে নিজের সুরের জগতে আসতে দিয়েছে। সেই মানুষটা রিশাব।

একদিন, হঠাৎ করেই রেওয়াজ শেষ করতে দেরি হয়। স্টুডিওর বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি।ফলে রিশাব রিমকে নিজের গাড়ি করেই বাড়ি পৌঁছে দেয়। যদিও রিম অনেকবার বারন করেছে কিন্তু রিশাব তার কোনো কথাই কানে নেয়নি। ঠিক তেমনি রিমও রিশাবকে জোর করে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে।ভিতরে ঢুকেই রিমের ছোট ছিমছাম ড্রয়িংরুমে রিশাবকে দেখেই থমকে যায় রিমের মা।দু’চোখ বিস্ময়ে আটকে থাকে রিশাবের দিকে। এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে মুহূর্তে।এত বড় একজন স্টার তাদের বাড়িতে! এটা যেন তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না।
“এই তোমার স্যার রিশাব জাওয়াদ!”
রিম গলার স্বাভাবিক স্বরে বলে।
“আমাকে গান শেখান।”

রিমের মা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কেবল মাথা নাড়েন। তিনি কিভাবে কি আপ্যায়ন করবে বুঝতে পারছেন না।
এরপর থেকে রিশাব তাদের বাড়িতে মাঝেমাঝেই আসে। রিমের মা তাকে ভালোবাসার চোখে দেখতে শুরু করেন। নিজের সন্তান না হয়েও ছেলের মতো যত্ন করেন।রিশাবও সেই ভালোবাসায় ধীরে ধীরে বাঁধা পড়ে যায়।
এভাবে একদিন রিমের মা’কে একান্তে ডেকে নিয়ে যায় রিশাব।সে কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলতে পছন্দ করে না, চোখে সোজাসুজি এক সত্য,
“আন্টি আমি রিমকে বিয়ে করতে চাই। আমি ওকে ভালোবাসি। সারাজীবন ওকে সুখে রাখবো।”
রিমের মা চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর ম্লান হেসে বলেন,

“ও তো এসবের কিছুই জানে না, তাই তো?
রিশাব মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়,
“ওর স্বপ্ন অনেক বড়। আমি শুধু সেই স্বপ্নের নীরব শ্রোতা হয়ে থাকতে চাই।”
রিমের মা মৃদু হাসেন। সেই হাসির মাঝে একটা পুরনো দহন লুকিয়ে থাকে।
“আমার মেয়েটাকে কোনোদিন কষ্ট দেবে না তো বাবা?
“কখনো না।” রিশাবের সরল উত্তর।
এদিকে রিম এসকল বিষয় থেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। সে শুধু নিজের স্বপ্ন আর নিজের গানের জগৎ নিয়েই আছে। আর হাতের সেই পুরোনো ব্রেসলেট যেটা দেখলে তার মনের গহীন থেকে শুধু একটাই নাম উঠে আসে, “আরাত্র”………….

ইতালি
এই শহরের বাতাসে এখন নতুন এক নাম ভাসে…
জেইন। একটা নাম নয়, একটাই ভয়।
Underworld has a new Godfather now.
And his rules… will be written in blood.
সে ধীরে ধীরে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপিয়ে তোলে। কালো দুনিয়ার সমস্ত বিজনেস হাতিয়ে নেয়। একে একে সবকিছু নিয়ে নেয় নিজের দখলে।
ডন জেরিকের মৃত্যুর পর প্রথম দিন,
ডন জেরিকের মৃত্যুর খবর যেমনটা এসেছিল বিস্ফোরণের মতো, জেইনের আগমন হয়েছিল নিঃশব্দ এক ভূমিকম্পের মতো। বাবার মৃত্যুর পর সে শোক প্রকাশ করেনি শুধু গ্ৰহণ করেছিল একটাই শপথ।
“My father built an empire. I will make it kneel before me.”
দ্বিতীয় দিন।

যারা জেরিকের মৃত্যুর পরেও চুপ ছিল, যারা ভাবছিল ছায়ায় থেকে যাবে, তারা একে একে গায়েব হতে শুরু করল। কেউ গাড়ির ভেতরে, কেউ নিজের বাথটাবে, কেউ বিমানবন্দরের সামনে… লাশ হয়ে ফিরল।
মারকো, ভ্লাদিমির, কাইতো, রিয়াদ—তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল। কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলেনি, কিন্তু চুপ থেকেও বিরোধিতা করেছিল। জেইনের মতে, “চুপ থাকা মানে ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়া।”
সে একে একে অঞ্চল দখল করল, অস্ত্রভাণ্ডার ছিনিয়ে নিল, বাহিনীগুলো নিজের অনুগত করল। কেউ পালানোর চেষ্টা করেছিল তাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল সমুদ্রের কিনারে, পেটে গেঁথে দেওয়া ছিল তার বাবার নামে লেখা রক্তমাখা চিঠি।

“Those who speak against me will lose their tongues.
Those who hide from me… will be found.”
তৃতীয় দিন।
এক গোপন আন্ডারওয়ার্ল্ড বৈঠক। সব বড় বড় মুখ উপস্থিত। সেই চেয়ার, যেখানে একসময় ডন জেরিক বসতেন, এবার সেখানে বসে আছে তার ছেলে। বয়সে কম, চেহারায় ঠাণ্ডা, কিন্তু চোখে এমন কিছু, যেটা দেখলে অভিজ্ঞ খুনিও একবার দম নিয়ে নেয়।
“এই সাম্রাজ্যে এখন তিনটে নিয়ম,” সে বলে।
১. Betray me once, die twice.
২. Loyalty earns life.
৩. I don’t forgive. I rebuild.
এজজন ডন এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বলল,
“Forgive me…..”
জেইন তাকাল না। মাথা ঘোরাল না। শুধু একটা কথাই ,
“Forgiveness is for the dead. জীবিতদের আমি শিক্ষা দিই।”

বলা মাত্রই সে এক টানে গুলি চালাল। মাথার পেছন থেকে রক্ত ছিটকে গিয়ে ভিজে গেল সিংহাসনের কার্পেট। সবার মুখে নীরবতা। ভয় এবার সত্যিকারের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হল।
সপ্তাহখানেকের মধ্যেই জেইনের নাম হয়ে গেল বিশ্বজনীন আতঙ্ক।
ইতালি, জার্মানি, স্পেন, ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি বাংলাদেশ পর্যন্ত । সব শাখা, সব বড় বড় রুট, অস্ত্র ব্যবসা, মাদক সরবরাহ, মানব পাচার থেকে শুরু করে ব্যাংকিং সিন্ডিকেট সব তার হাতের মুঠোয়।

“He is not ruling the underworld.
He is the underworld.”
তার নতুন উপাধি দেওয়া হল
“The Red Monarch”
“The Butcher King”
“Jain of Flames”
সে শুধু গডফাদার না, সে এক রাজা। যার হাতে রাজদণ্ড নেই, আছে রক্তমাখা ছুরি। যার আদালত নেই, আছে অন্ধকারে গুলির শব্দ।

বাংলাদেশ ঢাকা
সময় তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে। দেখতে দেখতে কয়েকটা মাস কেটে গেল।এক সন্ধ্যায়, রিশাব রিমকে নিয়ে গেল তার বাড়িতে প্রচণ্ড উৎসাহ আর আশা নিয়ে। সে চেয়েছিল মায়ের সামনে রিমকে উপস্থাপন করতে, যেন মা বুঝতে পারে এই মেয়েটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কিন্তু সব আশায় জল ঢেলে দিল রিশাবের মা।
রিমের সাধারণ পোশাক আর সহজ-সরল ব্যবহার দেখে তার মা অবজ্ঞার হাসি হেসে তিনি বললেন,,
“এই মেয়েটা? এই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবেশ থেকে আসা মেয়েটা? এধরনের মানুষের সাথে তুমি মেলামেশা করেছো আজকাল! তাই তো বলি তোমার এত অধঃপতন হল কোথা থেকে? আমি অবাক হচ্ছি তোমার রুচি দেখে!”
রিম থমকে দাঁড়ায়।অপমানের প্রতিটি শব্দ রিমের কানে তপ্ত সীসার মতো লাগল। তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড চোট লাগল, কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদ করল না। কেবল বড় বড় চোখ করে একবার রিশাবের দিকে তাকাল। সেই ছিল একরাশ শূন্যতা। রিম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। কারো ডাক না শুনেই ও দ্রুতপায়ে সেই বিলাসবহুল প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এল।
পেছন থেকে রিশাব চিৎকার করে উঠল,

“রিম! শোনো!”
মা ওর হাত চেপে ধরলেন। মা-ছেলের মাঝে শুরু হলো তুমুল বাকবিতণ্ডা। রিশাব ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলল, “তুমি ওকে অপমান করে শুধু ওকে নয়, আমার ভালোবাসা আর আমার পছন্দকেও তুচ্ছ করলে মা! আমি ওকে ভালোবাসি। আর তুমি চাও বা না চাও, রিমই আমার জীবনসঙ্গিনী হবে।”
রাগে-ক্ষোভে সেদিন রাতেই রিশাব নিজের বাড়ি ত্যাগ করল। হাতে কোনো ব্যাগ নেই, আছে কেবল রিমের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সে সোজাসুজি রিমদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। রিমের মায়ের সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে রিশাব রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“আন্টি, আমি রিমকে বিয়ে করতে চাই। ও আমার জীবন। আপনি যদি রাজি থাকেন, তবে আমি এই মুহূর্তে তাকে আমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চাই।”
রিমের মা রিশাবকে কাঁধে হাত রেখে উঠিয়ে বলে,

“আমি জানি তুমি ওকে ভালোবাসো। ওকে সুখী রাখবে। তোমার চোখে আমি ভালোবাসা দেখেছি। আমি তোর পাশে আছি।”
রিশাব একটু চিন্তিত গলায় বলে,
“কিন্তু আন্টি… রিম কি রাজি হবে? আমি চাই না ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু হোক।”
রিমের মা একটু হাসিমুখে, আত্মবিশ্বাসী গলায় বলে,
“তুমি চিন্তা কোরো না । আমি ওকে সামলে নেব। রিম খুব আবেগী মেয়ে। ওর ভালোমন্দ আমি ভালো করেই বুঝি। তাছাড়া, তুমি ওকে ভালবাসো, এটা আমার চোখে স্পষ্ট। ও নিশ্চয়ই রাজি হবে।”
এরপর থেকেই রিমের মা শুরু করে দেয় বিয়ের তোড়জোড়। রিম কিছুই জানে না। প্রতিদিনের মতোই সে সকালে উঠে রেওয়াজ করে, বিকেলে রিশাবের কাছে যায় গান শিখতে। তার পৃথিবীটা এখন শুধুই সুরের, তাল-লয়ের মাঝে গাঁথা এক স্বপ্ন বড় একজন গায়িকা হওয়া। কিন্তু সে জানে না, তার জীবনের সবকিছু পাল্টে দিতে যাচ্ছে তার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোই তাকে না জানিয়ে, না জিজ্ঞেস করেই।

বিকেলের ম্লান আলোয় জানালার পাশে বসে ছিল রিম। হঠাৎ অবচেতন মনেই সে তার বাঁ হাতের কবজিতে হাত বোলাল। মুহূর্তেই তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। কবজিটা শূন্য। তার সেই প্রিয় ব্রেসলেটটা নেই!
এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড… রিমের পৃথিবীটা যেন থমকে দাঁড়াল। ওর দুচোখ বড় বড় হয়ে গেল, কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠান্ডা ঘাম নেমে এল। সে নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এটা বাস্তব। পরক্ষণেই সেই স্তব্ধতা রূপ নিল এক প্রলয়ংকরী উন্মাদনায়। বিড়বিড় করে বলতে থাকে,
“না! এটা কোথাও পড়ে যেতে পারে না! এটা হারাতে পারে না! না না না!”

বলে চিৎকার করে ওঠে রিম।
সে যেন মুহূর্তেই অন্য এক মানুষে রূপ নেয়। বিছানা, আলমারি, তাক, টেবিল সব উল্টেপাল্টে ফেলে। তাক থেকে বই পড়ে যায়, কাপড় ছিঁড়ে যায়, ঘরের মেঝে যেন তছনছ হয়ে যায় তার তাণ্ডবে। তার চোখের পানি নাক-মুখ দিয়ে ঝরতে থাকে, দম বন্ধ হয়ে আসা কান্নার মধ্যে গলা ফাটিয়ে বলতে থাকে,
“আমার ব্রেসলেটটা আমাকে দাও! ওটা আমার চাই! ওটা ছাড়া আমি… আমি থাকতে পারি না… আমি… আমি মরে যাবো ওটা ছাড়া!”
তার মা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে তাকে থামানোর চেষ্টা করে,তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু রিম তখন ছটফট করছে, যেন কেউ তার শ্বাসরোধ করছে। তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে কান্নায়, ঠোঁট কাঁপছে। সাথে শরীরটাও কাঁপছে ভয়ে না রাগে বোঝা যাচ্ছে না।

“রিম…পাগলামি করে না। এইতো আমি খুঁজে দেব। আমি তোকে ঠিক এই রকমই একটা এনে দেব।”
“না!!!”
গর্জে ওঠে সে। তার চোখে তখন অদ্ভুত রকমের উন্মাদ এক আগুন।
“এটা কোনো সাধারণ ব্রেসলেট না! আমি কিছুই শুনতে চাই না, আমি ওটাই চাই… যেভাবেই হোক, আমাকে এনে দাও!”
তার মা তাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে, কিন্তু রিম এমনভাবে নিজের চুল ছিঁড়ে, নিজেকে আঘাত করতে শুরু করে যে যেন নিজের যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছু অনুভব করছে না সে। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলে,
“না, না, না, আমি জানি না । আমি কিচ্ছু জানি না। আমার ওটাই চাই। ওটা ছাড়া আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। আমার কষ্ট হচ্ছে। একটাই তো চিন্থ ছিল আমার কাছে। সেটাও হারিয়ে ফেললাম আমি। কেন? কেন? কেন বারবার আমার সাথেই এমন হয়? ……. আমার প্রিয় জিনিস গুলো কেন আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়?……. কেনও?………..”
সে তীব্রভাবে কাঁদতে থাকে, নিজেকে বিছানায় আছড়ে ফেলে। অবশেষে তার মা মিথ্যা আশ্বাস দেয়,

“ঠিক আছে মা, আমি খুঁজে দেব। ওটাই খুঁজে দেব। প্লিজ, একটু শান্ত হো!”
তার ছোট বোন রাহি এসে বল,
“রাত্তিপু তুমি কেঁদো না প্লিজ। আমি আমার সব আইসক্রিম তোমাকে দিয়ে দিব। তোমার সাথে আর ঝগড়াও করবো না। টিভির রিমোটও তোমাকে দিয়ে দিব। কক্ষনো লুকিয়ে রাখবো না।”
রিম তখন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়, কিন্তু চোখে ঠিকরে পড়ে অদ্ভুদ এক পাগলামির ছায়া। সেই মুহূর্তে মনে হয়, যেন একটা ছোট্ট ব্রেসলেট নয়, তার সমস্ত অস্তিত্বটাই হারিয়ে গেছে।
অবশেষে অনেক বোঝানোর পর শান্ত হয় রিম। বিকেলে হঠাৎ তার মা একটি মেরুন রঙের শাড়ি নিয়ে আসে হাতে রিমকে শাড়িটা পড়তে বললে রিম অবাক হয়ে বলে,
“শাড়ি কেন পরবো?”
তার মা হেসে বলে,
“একটা অনুষ্ঠান আছে। তোকে একটু বাইরে নিয়ে যাই। মন ভালো লাগবে।”
রিমের মন ভালো লাগছে না। সে প্রথমে কিছুতেই রাজি হয় না। কিন্তু মায়ের কথা শুনে অবশেষে একটু দ্বিধা নিয়ে সম্মতি জানায়।

ইতালি
বিশাল অন্ধকার রুমের ভেতর গুমোট এক নিস্তব্ধতা। রুমের চারপাশ জুড়ে বড় বড় মনিটর আর স্ক্রিন থেকে বিচ্ছুরিত হালকা নীল আলোয় ভেসে উঠছে ডিজিটাল ডাটা। মাঝখানে বিশাল এক লেদার চেয়ারে বসে আছে এক যুবক। তার চোখে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি, কিন্তু চোয়ালের হাড়গুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে, তারপর রিমের ঘরের সিসিটিভি ফুটেজ চালু করে। এতদিন কাজের এত এত চাপ ছিল যে মেয়েটিকে একপলক দেখার সুযোগ পায়নি সে। কিন্তু নিজে খোঁজ নিতে না পারলেও গুপ্ত স্পাই দিয়ে ঠিকই খোঁজ নিয়েছে।
মনিটরের নীলচে আলোয় ফুটেজটা সচল হতেই যুবক স্থির হয়ে গেল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য।
ন*গ্ন শরীরে দাঁড়িয়ে আছে রিম। তার শুভ্র ফর্সা শরীরে কেবল একটি কালো ইনার আর কোমরে জড়ানো গাঢ় মেরুন রঙের পেটিকোট। দৃশ্যটি যেন যুবকের চোখ ধাঁধিয়ে যায়।পাথর মূর্তির মতো স্থির হয়ে যায় সে।যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। রিম ধীরে ধীরে শাড়িটা হাতে তুলে নেয়। কিন্তু শাড়িটা গায়ে চাপাতে গিয়ে হঠাৎ গা শিউরে ওঠে তার।এক মুহূর্তেই মনে পড়ে যায় সেই অন্ধকার ঘরটা। যেখানে একটা কালো ছায়া শাসিয়েছিল তাকে,

“দ্বিতীয়বার শাড়ি পরার স্পর্ধা দেখিয়ো না…”
তার বুকের ভেতর হঠাৎ হিম শীতল কিছু নেমে আসে। হাত কাঁপে। কিন্তু পরক্ষণেই সে মাথা উঁচু করে নিজেকে বলে
“না! আমি কেন ভয় পাবো? কে সে? আমি কেন তার কথা শুনবো?”
দৃঢ়ভাবে শাড়িটা পড়ে ফেলে রিম। কিন্তু সে জানে না এই শাড়িই আজ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
ওদিকে স্ক্রিনের ওপারে থাকা যুবকের অবস্থা শোচনীয়। রিমের এই মোহনীয় রূপ আর অবাধ্য ভঙ্গি দেখে তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। বুকের খাঁচা যেন ফেটে যাবে এমন অনুভব।ধমনীতে রক্তের গতিবেগ এতই বেড়ে গেছে যে তার হার্টবিট এখন প্রতি মিনিটে ২০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যেন এক্ষুনি হার্ট অ্যাটাক করে মারা যাবে। আর তীক্ষ্ণ চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, আঙুলের পেশি টনটনে, চোখ দুটো লাল হয়ে ওঠে।সে দ্রুত স্ক্রিন থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু কেন জানি তার বেহায়া চোখ দুটো আবার স্ক্রিনের দিকে আটকে যায়। ভেতরের এই দানবীয় উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সে এক ঝটকায় নিজের হাতের উল্টো পিঠটা মুখের কাছে এনে কষিয়ে এক কামড় বসিয়ে দিল। দাঁতগুলো চামড়া ভেদ করে মাংসের গভীরে বসে গেল। মুখে নোনতা গরম রক্তের স্বাদ অনুভব করতেই সে সজোরে হাতটা ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিল। কামড়টা এতটাই হিংস্র ছিল যে ক্ষতের মুখ থেকে চুইয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল মেঝেতে।

সে চেয়ারের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে টেনে টেনে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল। বাতাসের জন্য তার ফুসফুস হাহাকার করছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন আগুনের হল্কা বের হচ্ছে। শরীরটা কাঁপছে। নিজেকে শান্ত করার এক আপ্রাণ চেষ্টায় সে চোখ বুজে রইল কিছুক্ষণ, কিন্তু তার মগজে তখন কেবল সেই মেরুন শাড়ির লাবণ্য আর এক নিষিদ্ধ নেশা দাউদাউ করে জ্বলছে। সে আবার সোজা হয়ে উঠে বসে তার ভ্রু কুঁচকে যায়। কাপা গলায় ফিসফিস করে বলে,
“এতো বড় হলো কবে? উফফ্ সোনা তুমি ছোট বেলায় ছিলে একটা কিউটি পাই….। কিন্তু এখন বড় হয়ে অনেক হ*ট এন্ড সে*ক্সি হয়ে গেছ। একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।”
তার ঠোঁটের কোণে হঠাৎ এক ক্রুর আর রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে সে শীতল কণ্ঠে বলল,

“আমার বারণ অমান্য করে আবারো শাড়ি পরে খুব বড় ভুল করলে তুমি। এর মাশুল তোমাকে দিতেই হবে।”
ফুটেজটা ঝট করে বন্ধ করে দিল সে।কক্ষ থেকে বেরিয়ে পা বাড়াতেই বাইরে অপেক্ষা করা তার ব্যক্তিগত অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রায় টলতে টলতে দৌড়ে এল। ছেলেটি ঘেমে-নেয়ে একাকার, চোখেমুখে চরম আতঙ্ক।
ভয়ার্ত গলায় সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“ভাই… ভাবী… ভাবী আজকে বিয়ে করছেন!”
যুবকটি এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মূর্তির মতো থমকে দাঁড়াল। পরক্ষণেই সাপের মতো ফোঁস করে ঘুরে তাকাল সে। তার চোখের মণি এখন টকটকে লাল, যেন সেখান থেকে আগুনের হল্কা বের হচ্ছে। এক পা এগিয়ে এসে সে অত্যন্ত ঠান্ডা কিন্তু ভয়ংকর গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“তোদের কী বলেছিলাম আমি?”
অ্যাসিস্ট্যান্ট কোনো উত্তর দিতে পারল না। যুবকটি এবার আরও এক পা এগিয়ে এসে নিচু অথচ কম্পিত গলায় বলল,

“তোদের বলেছিলাম না—ওর প্রতিটা নিঃশ্বাসের খবর যেন আমার কানে পৌঁছায়? ওর ছায়ার ওপর দিয়েও যদি কেউ হেঁটে যায়, সেটা যেন আমি জানতে পারি? তাহলে এই বিয়ের খবর এখন কেন আসছে? কীভাবে হলো এটা, বল!”
করিডোরের তাপমাত্রা যেন হুট করে কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল। যুবকটি হঠাৎ ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে গিয়ে ছেলেটার কলার চেপে ধরল। তার হাতের পেশিগুলো টানটান হয়ে ফুলে উঠেছে।দাঁতে দাঁত চেপে সে গর্জনের মতো ফিসফিস করে বলল,
“She is mine. Only mine. ওর দিকে যদি কেউ চোখ তুলে তাকানোর সাহসও করে, তবে তার চোখ আমি উপড়ে ফেলব। ওর গায়ে যদি কেউ হাত ছোঁয়ায়, তবে এই গোটা দুনিয়াটাকেই আমি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করব। ওকে স্পর্শ করার ক্ষমতা আমি ছাড়া আর কারো নেই!”
এক ঝটকায় ছেলেটাকে মার্বেল ফ্লোরে আছড়ে ফেলে দিল সে। অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যথায় ককিয়ে উঠলেও টু শব্দ করার সাহস পেল না।
“এক্ষুনি সব ব্যবস্থা কর। আমাকে এখনই বাংলাদেশে যেতে হবে। চার্টার্ড প্লেন রেডি রাখ।”
তার শান্ত অথচ হিংস্র চোখদুটো যেন অন্ধকারের সাথে মিশে গেছে। সে বিড়বিড় করে বলল,
“তোমাকে অনেক সময় দিয়েছি সোনা। অনেক খেললে চোর-পুলিশ। এবার ফেরার পালা। তৈরি থেকো…”
তার সেই রক্তজবা ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ঠান্ডা, নিষ্ঠুর আর রহস্যময় হাসি।

মাসদাইর, নারায়ণগঞ্জ
শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে নিঃশব্দে বসে ছিল রিম‌। তখনি তার মা পেছন থেকে এসে একটি নীল পেন্ডেটের লকেট পরিয়ে দেয় তার গলায়।
“একটা অনুষ্ঠান বাড়িতে যাচ্ছিস এভাবে খালি গেলে ভালো লাগে?”
তিনি রিমের মুখের দিকে তাকাতেই বলেন,
“এমা মুখের একি অবস্থা!”
তিনি হাতে তুলে নিলেন একটি মেরুন রঙের লিপস্টিক। রিমের ঠোঁটে লাগিয়ে বলেন।
“এত সাদামাটা থাকলে চলে! একটু সাজতে হয় ।এই রংটা তোর সাথে খুব মানায়।”
রিম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। যদিও এই মুহূর্তে এসব সাজগোজ তার ভালো লাগছে না। কিন্তু কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না। তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছে কিভাবে সে তার ব্রেসলেট খুঁজে পাবে? তার মনে পড়ে সেই কথা, ‘যতদিন এই ব্রেসলেটটা কাছে তোমার থাকবে মনে করবে আমি তোমার কাছে আছি… খুব কাছে।’ সে এক মুহূর্ত চোখটা বন্ধ করে আয়নার দিকে তাকায়। মুখে খুব একটা সাজ না থাকলেও ফর্সা মুখশ্রীতে মেরুন রঙের লিপস্টিক দারুন মানিয়েছে বেশ নজর কাড়ছে।
“এবার চল দেরি হয়ে যাচ্ছে বেরোতে হবে।”

রেজিস্ট্রি অফিসের একটি ঘরে দারিয়ে আছে রিশাব। একদম ফর্মাল গেটাপে এসেছে। তার মনে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। যতক্ষণ না বিয়েটা সম্পন্ন হচ্ছে সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেনা। পাশে তার ল’ইয়ার, টেবিলে খুলে রাখা রেজিস্ট্রির পেপারস। বাইরে মিডিয়া, ফ্যান, সিকিউরিটি সব মিলিয়ে বিশাল প্রস্তুতি।

রিম , রাহি আর তাদের মা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। রিশাব যে গাড়িটা পাঠিয়েছে, সেটাই আজ তাদের গন্তব্যে নিয়ে যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে এক পুরোনো প্রতিবেশী এসে পড়ল সামনে।
রিমের মা হাসিমুখে বললেন,
“দোয়া করবেন, মেয়ের বিয়ে।”
শব্দটা ঠিক যেন কানের ভেতরে বাজ পড়ার মতো ধ্বনিত হলো রিমের মনে। বিয়ে? এখন? না… না কিছুতেই না। সে বিয়ে করতে পারবে না, করবে না।
গাড়ি রওনা দেয়। বাইরে শহরের কোলাহল, ভিতরে রিমের মনে অস্থিরতা। অদৃশ্য শেকলের মতো কিছু একটা ওকে টেনে ধরছে। ছটফট করতে থাকে সে। চোখে খোঁজে একটা ফাঁক… একটা সুযোগ।
এবং অবশেষে, জ্যামে আটকে যায় গাড়ি। রাস্তার ধোঁয়া, হর্ন আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে হঠাৎই রিম গাড়ি থেকে নেমে পালিয়ে যায়।

চারপাশে নেমে এসেছে গা ছমছমে নীরবতা। নিস্তব্ধ রাস্তায় একা ছুটে চলেছে রিম। সে জানে না কোথায় যাবে… শুধু জানে, এখান থেকে পালাতে হবে। বিয়ে কিছুতেই করতে পারবে না। সে ১১ বছর ধরে অপেক্ষা একটি মানুষের জন্য। অন্য কাউকে কিভাবে বিয়ে করবে?
তখনই আচমকা এক গর্জনে কেঁপে উঠে রাস্তা। একটা হেলিকপ্টার নয়, একেবারে Inferno X মডেলের প্রাইভেট জেট নিচে নেমে আসে এক পরিত্যক্ত রাস্তায়, সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে ছুটে আসে সশস্ত্র কালো পোশাকের বডিগার্ডরা। রাস্তার আলো নিভে যায় এ যেন অন্ধকারের নিজস্ব এক শাসন। রিম থমকে দাঁড়ায়। তার চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় এক কালো Savage SUV। ধীরগতিতে খুলে যায় দরজা।
ধোঁয়ার মতো কুয়াশার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেস যুবক। কালো ট্রেঞ্চ কোট, মুখে কালো রাবার মাস্ক।
চোখদুটো শুধু দেখা যায় আকাশি-সাদা মিশ্রিত হিমশীতল চোখ যেন চোখ দিয়ে গুলি চালানো যায়।
রিম শরীরে এক হীমশীতল স্রোত বয়ে যায়, ভয়ে শুকিয়ে আসে কলিজা, পেছনে হাঁটে, পালাতে চায়। কাঁপা কন্ঠে বলে,

“কে….. কে তুমি আমার পথ আটকেছো কেন?”
যুবকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক দানবাকৃতি বডিগার্ড এক পা বাড়ায়, কিন্তু যুবকটি হাত তুলে থামিয়ে দেয়। ধীর পায়ে এগিয়ে আসে সে। রিম থরথর করে কাঁপছে।
“তুমি কে? আমাকে যেতে দাও প্লিজ!”
যুবকটি ঠাণ্ডা গলায় বলে ,
“You’ve already been chosen. এবার পালানো নয়, শেষ শুরুটা শুরু হোক।”
রিম ছুটে পালাতে চায়, কিন্তু তখনই যুবকটির হাতে ধরা পড়ে। সে ছটফট করে, তাকে ধাক্কা দিতে থাকে।
“Let me go! I don’t want to go with you Stay away!”
হঠাৎ রিমের কোমর চেপে তার সাথে মিশিয়ে নেয়। রিমের নাকে ধরা পড়ে ঠিক সেদিনের সেই একি পারফিউমের ঘ্রাণ। তার আতঙ্ক যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। আত্মা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে যায়। যুবকটি তার কোটের পেছনের পকেট থেকে বের করে একটি ছোট্ট কাপড়ের টুকরো ভেজা, ক্লোরোফর্মে। রিম চিৎকার করার আগেই তা চেপে ধরে রিমের মুখে।

“Shh… তুমি তো অনেক জেদি,। এখন একটু ঘুমাও… এরপর তোমার গল্প আমি লিখব।”
রিমের হাত থেমে যায়, চোখ বুজে আসে, সে ঢলে পড়ে
যুবকটির কোলে। যুবকটি কাঁধে তুলে নেয় রিমকে। তার মুখে অন্ধকারের মতো একটি বাঁকা, ঠাণ্ডা হাসি। চারপাশে বডিগার্ডরা সিকিউর করে জেট। আকাশে তখন নেমে আসে বজ্র।

অন্যদিকে রিশাবের কাছে পৌঁছে যায় খবর বিয়ের পাত্রী পালিয়েছে। বাংলাদেশের মিডিয়া তোলপাড়
“Bangladesh’s rock icon Rishav Jawad—his fiancée ran away on the wedding day!”
টিভি স্ক্রিনে ঘুরে ফিরে একটাই ব্রেকিং নিউজ।
পাপারাজ্জিদের ক্যামেরা ফ্ল্যাশে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, কিন্তু রিশাব নির্বিকার। নীরব। সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য।
চারপাশের মিডিয়ার শোরগোল, রিপোর্টারদের চিৎকার, ম্যানেজারদের উত্তপ্ত ফোনকল, সব কিছু কেমন যেন ঝাপসা লাগছে তার কাছে। শুধু কানে বাজে একটাই লাইন “রিম তার ব্লুফেইরি চলে গেছে।”সে স্তব্ধ হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকে সামনের শূন্যতার দিকে।

রিমের বাড়ি ঘর জুড়ে নিস্তব্ধতা।কিন্তু এই নিস্তব্ধতা শান্তির নয়,বরং অপমান, অভিমান আর অভিশাপের। প্রতিবেশীরা, আত্মীয়-স্বজন সবাই একটার পর একটা কথার খঞ্জর ছুঁড়ে দেয়।
“মেয়েকে সামলাতে জানে না। এত বড় ঘরের পাত্র, তাও ধরে রাখতে পারলো না! কি অসম্মান!”
মাঝখানে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রিমের মা। গলার কাছে কাঁটা জমে ওঠে। তবু চোখে জল নেই। কেবল মনের গভীরে জমে থাকা এক গ্লানির আগুন জ্বলতে থাকে।
তিনি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করেন,
“আজ থেকে আমার একটাই মেয়ে; রাহি। রিম নামে কেউ ছিল না, নেই, আর কখনো থাকবে না।”

সকাল। সূর্যের নরম আলো ফোঁটা ফোঁটা করে পড়ছে জানালার ফাঁক গলে। রিমের চোখ ধীরে ধীরে খুলছে মাথা ঝিমঝিম করছে। চারপাশটা ঝাপসা অচেনা, বিলাসবহুল, বিশাল এক ঘর। চোখ পড়ে সিলিং-এর ক্রিস্টাল ঝাড়বাতিতে, চকচকে মার্বেল ফ্লোরে, ভারি পর্দা আর বিছানার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা দামি সাজসজ্জায়।
সে হঠাৎ উঠে বসে।রিম আতঙ্কিত, হাতে এলোমেলোভাবে চুল ছুঁয়ে বলে,
“আ-আমি… আমি কোথায়…?”

হঠাৎ চোখ পড়ে সামনের সিংহাসনসদৃশ সোফার দিকে।সেখানে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে আছে এক যুবক।গা শিউরে ওঠে রিমের। যুবকের চোখে গাঢ় ছায়া, নিখুঁত হেয়ার কাট, মোহময়ী চোখ,আর ঠোঁটে খেলা করা এক রহস্যময় বাঁকা হাসি।সেই হাসি যা, কারও চোখে জাদু ছড়াতে পারে, আবার কারও শরীরে কাঁপুনি ধরাতে পারে। কিন্তু রিমের চোখে নেই কোনো মোহ। সে পেছিয়ে যায বুকের ভিতর কাঁপুনি, গলা শুকিয়ে আসে।রিম কাঁপা কণ্ঠে
“কে… কে আপনি? আমাকে এখানে কেন এনেছেন? আমাকে যেতে দিন প্লিজ!”
যুবক চুপচাপ। শুধু গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তার সেই নিঃশব্দতা যেন আরও আতঙ্ক ছড়ায়।
রিম উঠে ছুটে যায় দরজার দিকে। আছাড়ে-পিছাড়ে ধাক্কা দেয়। কিন্তু দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে লক করা।
রিম ছটফট করে, চিৎকার

“কেউ আছেন? দয়া করে, আমাকে ছেড়ে দিন! আমি বাড়ি যেতে চাই!”
তখনই পেছন থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে সেই যুবক। রিম ঘুরে তাকায়। তার চোখে এবার ভয়ের ছায়া গাঢ়। রিম দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে,
“না… দয়া করে… আমার কোনো ক্ষতি কোরো না। প্লিজ… আমি…”
যুবক থামে ঠিক তার সামনে। মুখটা রিমের একেবারে কাছে। তার ঠোঁটে এখনো সেই রহস্যময় বাঁকা হাসি।যুবক নরম অথচ হিমশীতল গলায় বলে,
“তুমি এখন আর কোথাও যেতে পারবে না।”
রিম চোখ বড় বড় করে
“ক-কী বলছেন আপনি?”
“এখন থেকে তুমি এখানেই থাকবে। সারাজীবনের জন্য আমার কাছে বন্দী হয়ে।”
এক মুহূর্তের জন্য রিমের মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে যায়।সে জিজ্ঞাসা করে শেষ প্রশ্নটা, বুকে দুঃস্বপ্নের ভার নিয়ে।রিম কাঁপা গলায় বলে,

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৮

“এ-এটা… কোথায়?”
যুবকের ঠান্ডা গলা প্রতিধ্বনির মতো ভেসে আসে,
“ইতালি।”
এক মুহূর্তে সব স্তব্ধ। ঘরের মধ্যে যেন সময় থেমে যায়।
শুধু বাতাসে জড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত আতঙ্ক অজানা ভবিষ্যতের ছায়া।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২১