প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২১
রাত্রি মনি
“শাড়ি খোলো”
রিম অবাক হয়ে বলে
“মানে!”
যুবকটি নির্দ্বিধায় বলে,
“পিচ্চি মানুষ শাড়ি পড়ে না। আর যে শাড়ি তুমি অন্যের নামে পড়েছ আমি সেটা কখনোই তোমার গায়ে থাকতে দেবে না। সো এটা খুলে ফেলো।”
রিমের অবাকের মাত্রা চরম সীমায় পৌঁছে যায়,
“মানে কি! পাগল হয়ে গেছেন নাকি? আমাকে যেতে দিন। আপনি কে? আমি কোনো আপনার কথা শুনবো? আর আপনি কোন জ্ঞানে আমাকে আপনার সামনে শাড়ি খুলতে বলছেন?”
যুবকটি ঠান্ডা এক বাঁকা হাসি নিয়ে রিমের কানে ফিসফিস করে বলে,
“আমিই তোমার সব। এরপর শুধু শাড়ি নয়, আমার সামনে আরো অনেক কিছুই খুলতে হবে তোমায়। এমনকি সম্পূর্ণ ন্যু*ড!”
রিমের রাগ যেন আকাশ ছুঁয়ে যায়। একজন ছেলে হয়ে কিভাবে একটা মেয়েকে এসব বলতে পারে, রাগে তার শরীর থরথর করে কাঁপছে,
“আমাকে যেতে দিন বলছি, নইলে কিন্তু ভালো হবে না। জানে মেরে দিব আপনাকে!”
যুবকটি ঠোঁট কামড়ে বলে,
“উফফ্ এই ব্যাপারটাইতো, তোমার এই ফায়ারটাইতো আমার এত ভালো লাগে। তাইতো তোমায় চুজ করেছি বার্বিডল, এজ মাই কুইন। তোমাকে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলতেও ইচ্ছে করে, আবার ঠোঁট ছুঁয়ে চোখ বন্ধ করতেও। তুমি আমার জন্য বানানো বিপজ্জনক আবার আরামদায়ক, একসাথে।”
রিমের কাছে মনে হয় লোকটা একটা পাগল তাই এসব উল্টা পাল্টা কথা বলছে।সে লোকটাকে ধাক্কা দিতে যায়।কিন্তু লোকটা তাকে দেয়ালের সাথে এমন ভাবে আটকে রেখেছে সে এক চুলও নাড়াতে পারে না। লোকটা তার ঠোঁটের দিকে ঘোর লাগা চোখে তাকায়।
“এই তুমি অন্যকারো জন্য লিপস্টিক পড়েছ না? মুছে ফেলো । কারণ তুমি যদি শ্বাসও নাও সেটাও আমার নামে নেবে।”
এই বলে লোকটা নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পাগলের মতো রিমের ঠোঁট থেকে লিপস্টিক মুছতে থাকে। মেরুন রঙা লিপস্টিকটা ঠোঁটের কোণায় লেপ্টে গিয়ে একধরনের অসম্পূর্ণতা সৃষ্টি করে যেন কোনো নিষিদ্ধ ফলের খোসা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা রস। সেই দৃশ্যটা যেন লোকটার চোখে রিমকে আরেকধরনের লোভনীয় খাদ্যে পরিণত করে।
সে রিমের ঘাড়ের পেছনে হাত ঢুকিয়ে চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে, এক টানে রিমের মুখটা টেনে আনে নিজের মুখের কাছে। এতটাই কাছে যে ওর তপ্ত নিঃশ্বাস ধাক্কা খেয়ে পড়ছে রিমের মুখে। রিম ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। তার হৃদস্পন্দন এতটা জোরে বাজছে, যেন সেই শব্দটা চারপাশের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
লোকটার চোখে তখন একপ্রকার ঘোর এক নেশা। সে ফাঁকা দৃষ্টিতে রিমের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে শুষ্কভাবে ঢোক গিলে। যেন এই মুহূর্তে সে বাস্তব থেকে ছিটকে কোনো কল্পনার জগতে হারিয়ে গেছে।রিমের কাঁপতে থাকা ঠোঁট, ঠোঁটের কোণায় লেপ্টে থাকা মেরুন লিপস্টিক, আর সেই নিচের ঠোঁটে থাকা কুচকুচে কালো তিল এই তিনটাতেই যেন তার সর্বনাশা আকর্ষণ।
সে ধীরে ধীরে নিজের রক্ত-লাল ঠোঁট এগিয়ে নেয় রিমের ঠোঁটের দিকে…দূরত্ব? মাত্র কয়েকটা ন্যানো সেন্টিমিটার। ঠোঁট প্রায় ছুঁই ছুঁই। তাদের দুজনের নিঃশ্বাস ক্রমশ গাঢ় হতে থাকে। উত্তপ্ত শ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ে বারবার।হঠাৎ রিম চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে নিজের দু’হাত লোকটার বুকে ঠেলে জোরে ধাক্কা দেয়। লোকটা ব্যালেন্স হারিয়ে দুই কদম পিছিয়ে যায়। খানিকক্ষণ স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলে,
“Wow… nice shot. I like it . তোমার হাতটা আমার বুক ছুঁতেই শরীরটা কেঁপে উঠল। এতদিন খালি খাঁ খাঁ করত এই বুকটা, আজ বুঝলাম সমুদ্র কেমন করে মরুভূমি দখল করে। তোমার ছোঁয়ায় শুধু বুক না, রক্ত পর্যন্ত টগবগ করে ফুটছে…”
তারপর সে আবারো ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তোমাকে বললাম না শাড়ি খুলতে। তুমি যদি কখনো শাড়ি পড়ো সেটা শুধু আমার জন্য পড়বে। খোলো, এটা একদম মানাচ্ছে না তোমার গায়ে। দাঁড়াও তোমার কোমল আঙুল দিয়ে নয়, আমি নিজেই খুলে দিচ্ছি তোমাকে কষ্ট করতে হবে না একটুও।”
কথাটা শুনে রিম আঁতকে ওঠে। তার সমস্ত স্নায়ু যেন হঠাৎ করেই শীতল শঙ্কায় জমে আসে। মস্তিষ্ক ভেতর থেকে বারবার ইশারা দিচ্ছে অভিশপ্ত কিছু ঘটতে চলেছে। সে পালাতে চায়। ছুটে যেতে চায় অচেনা কোনো মুক্তির পথে। কিন্তু চারপাশের প্রতিটা প্রস্থানপথ এখন যেন অদৃশ্য কোনো শৃঙ্খলে আটকানো
সব রাস্তাই বন্ধ।
ঠিক সেই মুহূর্তে, লোকটা এগিয়ে এসে হঠাৎই এক ঝটকায় রিমের শাড়ির আঁচল ছুঁড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। আঁচলের শব্দ যেন ভেতরে একটা ভয়ানক ধ্বনি তোলে, যা রিমের আত্মার ভেতরে ধাক্কা মারে।
লজ্জা, ঘৃণা আর অপমান একসাথে গলা টিপে ধরে তাকে। তার ইচ্ছে করে এই মুহূর্তেই মাটিতে গলে মিশে যাক সে। যুবকের চোখের সামনে দৃশ্যমান মেরুন রঙা ব্লাউজে আবৃত রিমের ফোলা ব*ক্ষ। রিম দ্রুত দু’হাতে নিজেকে ঢাকার বৃথা চেষ্টা করে, কিন্তু তার ছোট্ট সেই প্রতিবাদ লোকটার চোখে পড়েই না যেন।
তার চোখে এ দৃশ্য কেবল শিকার প্রস্তুতির এক অংশ।
সে ব্যস্ত রিমের শরীর থেকে একে একে শাড়ির স্তরগুলো খোলায়, যেন ওই কাপড় নয় কোনো সৌন্দর্যের আবরণ, বরং জঞ্জালের মত কিছু যা তাকে সরিয়ে ফেলতেই হবে। সে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে, অযত্নে, এলোমেলোভাবে টেনে টেনে খুলে নিতে থাকে রিমের শাড়ির কুচিগুলো।
রিম নিজেকে অসহায় বোধ করে। ভয় আর অক্ষমতায় তার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে একা, একটা মেয়ে,
একটা বন্ধ কক্ষে আটকে আছে এক উগ্র, বিকারগ্রস্ত পুরুষের মুখোমুখি। কীভাবে রক্ষা করবে সে নিজেকে?
কোথায় লুকাবে নিজের সম্ভ্রম?
লোকটা শাড়ির ভাঁজে ঢেকে থাকা শরীর খুলে ফেলতেই যেন গভীর শ্বাস টেনে নেয়। তার চোখ থেমে যায় রিমের কোমরের কাছে ফর্সা, মেদহীন, নিখুঁত। এক মুহূর্তে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। তাড়াহুড়ো করে শাড়ি খোলার ব্যস্ততা হঠাৎ থেমে যায়। এতক্ষণ যে শুধুই কাপড় সরানো ছিল তার উদ্দেশ্য, এবার যেন শরীরটাই তার চোখে ধরা পড়ে সম্পূর্ণরূপে।
তার শিরায় শিরায় রক্ত টগবগ করতে শুরু করে।
চোখ লাল, কান জ্বলছে। গলা দিয়ে ভারী শ্বাস বেরিয়ে আসে উষ্ণ, উত্তপ্ত। হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন যেন এমন জোরে লাফাচ্ছে যেন এই মুহূর্তে বক্ষপিঞ্জর ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়বে। সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিতে চায় নিজেকে সামলে রাখতে চায়…কিন্তু পারে না।
এই অবস্থায় রিমকে সামনে দেখে তার ভেতরের পুরুষ সত্তাটা যেন ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। মেয়েটা সত্যিই অনেক বড় হয়ে গেছে। আর সামনাসামনি, এই বাস্তবতায়, সে যেন আগুন হয়ে উঠেছে তপ্ত, ছোঁয়া গেলেই দগ্ধ করে ফেলার মতো। লোকটা চায় ঠান্ডা হতে।কিন্তু সেই আগুনের ধোঁয়া যেন ইতিমধ্যেই তার রক্তে ঢুকে পড়েছে। চোখ বুজে কয়েকবার গভীর শ্বাস নেয় সে…কিন্তু সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ সে জানে, এখন আর ফেরার পথ নেই। সে মনে মনে ভাবে ,
‘এইটুকু একটা মেয়ে…কি আছে ওর মধ্যে? কি এমন জাদু আছে যার কাছে আমার নিয়ন্ত্রণ, আমার একরোখা সত্তা হার মানছে? জীবনে কত মেয়েই তো দেখেছি…কিন্তু এই মেয়েটা? আমি নেশার মতো জড়িয়ে যাচ্ছি…নিজেকে ছাড়াতে পারছি না। উফফ্ পাগল হয়ে যাবো আমি।’
তার দৃষ্টিতে যেন হঠাৎ নেমে আসে এক ধরণের ঘোর,
এক নিঃশব্দ মাদকতা যার গভীরতা পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যকেও হার মানায়। রিমকে দেখে সে এতটাই বিভোর, এতটাই মন্ত্রমুগ্ধ, যেন বাস্তব জগতের সমস্ত শব্দ, আলো, বাধা সব মুছে গেছে। এই মুহূর্তে সে সম্পূর্ণভাবে হিপনোটাইজ। জগৎ বলতে শুধু রিম, শ্বাস বলতে শুধু তার গায়ের সুবাস।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সে রিমের কোমরের কাছে,
মাখনের মতো মসৃণ সেই ত্বকে যেন তার দৃষ্টি আটকে যায়। তপ্ত নিঃশ্বাসে শরীর কাঁপছে তার।অচেতনেই তার ঠোঁট হালকাভাবে ছুঁয়ে যায় রিমের নাভির পাশে।
ছুঁয়ে যায় বললে ভুল হবে , ছুঁয়ে ফেলে।
এক মুহূর্তেই রিমের সমস্ত স্নায়ু শিরশির করে ওঠে।
একটা ঝাঁকুনি তোলে তার শরীরে ভয়, লজ্জা, ঘৃণা আর বিক্ষোভ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয় যেন। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। চোখে আগুন নিয়ে, বিদ্যুতের মতো হাত তোলে, ঠাস! তীক্ষ্ণ এক চড় বসে যায় সোজা ছেলেটার গালে। চড়টা এতটাই জোরালো, এতটাই অপ্রত্যাশিত যে, ছেলেটা কাত হয়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে মেঝেতে।
একটুক্ষণের জন্য চারপাশে নেমে আসে নিঃশব্দ বিস্ময়।
রিম দাঁড়িয়ে থাকে নিথর, কাঁপছে কিন্তু চোখে জল নয়, শুধুই আত্মরক্ষা, আর ভিতরে জমে ওঠা ঘৃণার নিঃশব্দ চিৎকার।
“জানোয়ার! সাহস কিভাবে হলো আমাকে স্পর্শ করার?”
রিমের গর্জনে পুরো ঘরটা যেন কেঁপে উঠল। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে, কিন্তু তাতে এক বিন্দু দুর্বলতা নেই।
চোখ-মুখ রক্তিম, শ্বাস ফোঁস ফোঁস করে উঠছে। চোখ দুটো ঠিক যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ । সেই আগুনে পুরে ছাই হয়ে যেতে পারে কেউ, বিশেষত সেই মানুষটা যে তার শরীর স্পর্শ করেছে।
“সরি সরি! সরি বার্বিডল I didn’t mean it.”
সে এক ঝটকায় সামনে এগিয়ে আসে, পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে।
“আ-আমার কি হয়েছিল আমি নিজেও জানি না। বিশ্বাস করো আমি তোমাকে একটুও হার্ট করতে চাইনি। নিজের অজান্তেই তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। খুব খুব সরি সোনা। আর কক্ষনো করবো না। তুমি চাইলে আমার হাত কেটে দাও।”
রিম আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। পা দুটো অসাড় হয়ে যায়। সে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। হাতদুটো কাঁপছে, চোখ দিয়ে জল ঝরছে অবিরত। হঠাৎ নয়ন গলে পড়ে আসা সেই কান্নার মাঝখান থেকে, তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে যায় এক অসহায় ফিসফিসানায়,
“এ… এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম আমি…”
তার কণ্ঠে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি, বিষাদ। একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর আটকে পড়েছে সে, যেখানে ভালোবাসা নেই আছে মালিকানা, ভয় আর পাগলামি। সে নিজের কাঁধ জড়িয়ে ধরে কাঁপছে, যেন নিজেকেই বাঁচাতে চাইছে।সে বিড়বিড় করে,
“আমি বেরোতে চাই… বেরোতে চাই এখান থেকে, কেউ আমাকে এখান থেকে বের করো…”
সামনে থেকে লোকটার কণ্ঠ আসে আবার,
“Don’t say that বার্বিডল….. প্লিজ… তুমি চাইলে আমি আর ছুঁব না তোমাকে… শুধু চোখের সামনে থেকো… প্লিজ…”
রিম দুই কানে হাত চেপে ধরে।
“চুপ!… চুপ করো! আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না… কিচ্ছু না!”
মেঝের ওপর বসে থাকা সেই মেয়েটা । আর আগে সেই আগুনে ঝলসে ওঠা রিম না, সে এখন নিঃস্ব এক বন্দিনী।লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তার চোখে তখনো অস্থিরতা, সে নিঃশব্দে নিজের শরীর থেকে খুলে ফেলে শার্টটা নিমেষেই, তারপর খুব আলগোছে, মেঝেতে কাঁপতে থাকা রিমের গায়ে তা জড়িয়ে দেয়। রিম ছিটকে দুরে সরে যায়। তার কাছে আদিখ্যেতা মনে হচ্ছে।সে উঠে দাঁড়িয়ে কান্না ভেজা চোখে পাগলের মতো চিৎকার করে,
“আমি এখান থেকে বেরোবো! দরজা খুলুন! আমি বেরোবো এখান থেকে বলছি!”
তার গলা ফেটে যাচ্ছে, চোখ জলে ঝাপসা, ভয় আর অসহায়তার ছাপ স্পষ্ট। যুবকটি কিছুটা হতবাক হলেও তাড়াতাড়ি সামলে নিলো নিজেকে। সে দু’হাত উঁচু করে শান্ত স্বরে বললো,
“ওকে! ওকে বার্বিডল, রিল্যাক্স। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি।”
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে লক খুলে দেয়, কিন্তু চোখে মুখে তীব্র যন্ত্রণার ছাপ। বাইরে বেরিয়ে রিম থমকে দাঁড়ায়। চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছে সশস্ত্র গার্ড। কালো সানগ্লাস, মুখে নিঃস্পৃহতা। যেন কোনো ফাঁদে আটকে গেছে Rim একটা খাঁচার মধ্যে দাঁড়ানো নিরীহ হরিণ। কেউ একজন সামনের সারি থেকে এগিয়ে এলে হঠাৎই গর্জে ওঠে যুবক।
“কেউ সামনে আসবে না!”
তার কণ্ঠে আগুন মেশানো হুকুম।
“কেউ স্পর্শ করবে না ওকে। নইলে সবকটারই কবর খুঁড়ে ফেলবো আমি, একে একে!”
গভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে মুহূর্তেই। সেই ফাঁকে রিম ঝাঁপিয়ে পড়ে এক গার্ডের দিকে। চোখে উন্মত্ততা, হাতে তুলে নেয় তার বন্দুকটা। মুহূর্তেই ট্রিগারে আঙুল।
“কেউ আমার কাছে আসবে না! কেউ না!”
তার গলা কাঁপছে, কিন্তু হাত শক্ত।
“আমি কিন্তু মেরে দেব! মেরে দেব সবাইকে! আমি জানি না কিভাবে, কিন্তু গুলি চালিয়ে দেব।”
চারপাশে থমকে যায় সময়। কারও নিশ্বাস নেই। যুবকটি ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসে। ‘এই না হলে রাজার- রানী… সিংহের- সিংহী। বাঘের- বাঘিনী। সিংহীর মতো গর্জায়, বাঘিনীর মতো আঁচড়ায়…এই পিচ্চিটার শরীরে কিছু তো একটা আছে,যা আমাকে আসক্ত করে রাখে? হয়তো এটাই তার যাদু।যে আমাকে পাগল বানাতে চায়… আর আমি পাগল হয়ে যেতে দিচ্ছি নিজেকে, ইচ্ছেমতো।’
রিম এলোমেলোভাবে ছুটে বেড়াতে থাকে। কিন্তু চারপাশের সব দরজা যেন আঁটকে আছে কোনো রাস্তাই খোলা নেই। চারদিকের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার। মনে হয় পাগল হয়ে যাবে সে। এক পর্যায়ে সে সেই যুবকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখে আগুন, মুখে ধোঁয়া।
“জানোয়ার! আমাকে ছেড়ে দে… আমি এখানে থাকবো না… এক মুহূর্তও না!”
তারপর হঠাৎ যেন ভিতরের সব ক্ষোভ ফেটে পড়ে। সে দু’হাত দিয়ে যুবকের বুক লক্ষ্য করে ঘুষি মারতে থাকে এলোমেলো, অপ্রস্তুত, বেপরোয়া। মুখে আঁচড় কাটে, থাপ্পড় দেয়।
ঠিক তখনই তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসে ইয়াশ মাত্তেও আর এলেনা। এলেনা ওকে থামাতে চেষ্টা করে। কিন্তু তখনই যুবকটি গর্জে ওঠে, যেন সে কোনো ক্ষুধার্ত জানোয়ার আর তার শিকারের উপর কেউ হাত দিয়েছে।
“খবরদার কেউ… কেউ টাচ করবে না ওকে! কেউ না!”
তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে ওঠে, গলার স্বর কেঁপে উঠে পুরো কক্ষে গুমোট সৃষ্টি করে।
“ওর যা ইচ্ছে করবে আমার সাথে, ঘৃণা করবে, গাল দেবে, এমনকি মেরে ফেলবে ওর সব অধিকার আছে। আমার উপর, আমার শরীরের উপর, আমার অস্তিত্বের উপর, পুরোটা ওর। আমি বলছি, কেউ আমাদের মাঝে আসবে না। কেউ না।”
তখনই একটি গার্ড সামান্য এক পা এগোতেই
ধাঁই! একটি নিঃশব্দ গর্জন ছুটে আসে যুবকের পিস্তল থেকে। সেকেন্ডেরও কম সময়ে গার্ডের কপাল ছিন্নভিন্ন!
রিমের চোখের সামনে সবকিছু যেন থেমে যায়। চারপাশে স্তব্ধতা। কান ঝাঁঝাঁ করতে থাকে, বুক ধড়ফড় করে উঠে, কিন্তু সে এক পা-ও নাড়াতে পারে না।
তার চোখ স্থির হয়ে থাকে সেই রক্তাক্ত লাশের দিকে।
তার মুখ ফ্যাকাশে। শ্বাস আটকে আসে।
“এতটা নিষ্ঠুর?”
“একটা পা বাড়ানোই কি মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি?”
সে নিজের ভেতরেই প্রশ্ন করে। কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না।তার মনে হয় এই লোকটা মানুষ না একটা অমানুষ, একটা রক্তপিপাসু জানোয়ার। একটা নিঃসঙ্গ, হিংস্র মনস্টার! তাঁর প্রতি একরাশ ঘৃণার ঢেউ ছুটে আসে।
চোখে জল আসে না, শুধু শূন্যতা জমে থাকে। ঠিক তখনই চোখ পড়ে রক্তে ভেসে যাওয়া মেঝের দিকে…
আর তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, মাথা ঘুরতে থাকে, পা কাঁপতে থাকে।
এক মুহূর্তেই তার শরীর ভেঙে ঢলে পড়ে সোজা সেই দানবটির বুকে। ঘৃণা, ভয় আর দুর্বলতার মাঝে অজ্ঞান হয়ে যায় সে।
“AJ!!!”
ইয়াশ বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠে।
“তুই গার্ডটাকে মারলি কেন?”
এজে চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। চোখ দুটো লাল রক্তচক্ষুর মতো জ্বলছে। সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যা দেখে ইয়াশের বুক কেঁপে ওঠে। তার বাক্য থেমে যায় মাঝপথে, মুখ থেকে আর কোনো শব্দ বেরোয় না।
তার পাশে তখন নিস্তেজ হয়ে থাকা রিমের কানে বেজে ওঠে একটাই নাম ,
“এ…জে…”
এজে নিঃশব্দে তার কোমল শরীরটা নিজের কোলে তুলে নেয়। তার মুখে কোনও হিংস্রতা নেই তখন, আছে কেমন এক নিঃশব্দ শান্ত বিষণ্ণতা। সে ধীরে ধীরে রিমকে নিয়ে আসে ঘরে। খুব যত্ন করে তাকে বিছানায় শোয়ায়, যেন তার একটুও কষ্ট না হয়।
এক পলক চেয়ে থাকে মেয়েটার দিকে। এই মুখটা এত মায়াবী, এত সংবেদনশীল… অথচ তাতে যে কী পরিমাণ আগুন লুকানো! হঠাৎ মনে হয়,
“এই পিচ্চি একটা শরীরের ভেতরে এত কারেন্ট কোথা থেকে আসে? এত তেজ! কী দিয়ে বানানো ওকে?”
একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে উঠে দাঁড়ায়। রুম থেকে বেরিয়ে আসে, দরজাটা টেনে বন্ধ করে। তারপর কড়া গলায় আদেশ করে মাত্তেওকে,
“আজ থেকে হাউজের ভিতরে একটাও গার্ড থাকবে না। সব বাহিরে পাহারায় থাকবে। আর আমি যখন বলবো দরকার, তখনই কেবল ভেতরে আসবে। তাছাড়া নয়। হাউজের ভেতরে শুধু মহিলা সার্ভেন্ট থাকবে।”
মাত্তেও বিনা প্রশ্নে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। এরপর সে চোখ ফেরায় ইয়াশের দিকে।
“তুই এখানে থাকছিস না, ইয়াশ। অন্য একটা ফ্ল্যাট দেখে কাল সকালেই উঠে যাচ্ছিস। এখান থেকে দূরে।
এখনই ব্যবস্থা কর।”
ইয়াশ থমকে যায়। তার চোখে অবাক হওয়ার ছাপ
সেই অবাক ধীরে ধীরে ক্ষোভে বদলে যায়। এতদিনের একসাথে থাকা, একসাথে সব ঝুঁকি নেওয়া সেসব এখন মুহূর্তেই উপেক্ষিত? সে কিছু বলতে যাবে, কিন্তু এজে ঠান্ডা কণ্ঠে বলে ফেলে,
“আমার কথার উপরে কোনও কথা চলবে না।
আমি যা বলেছি, সেটাই হবে।”
ইয়াশ অবজ্ঞার এক চিলতে হাসি হেসে ঘাড় নিচু করে সরে যায়।সে জানে, এই অবস্থায় কিছু বলার মানে নেই। এরপর এজে ঘুরে দাঁড়িয়ে এলেনাকে ডাকে।
“তুমি মেয়েদের যা যা দরকার সব আনবে।জামাকাপড়, জুতো, গয়না, কসমেটিকস যা যা লাগে একটা মেয়ের বাঁচতে সব। আজকের মধ্যেই।”
এলেনা সায় দেয় মাথা নেড়ে। গম্ভীর মুখে রওনা হয় নিজের দায়িত্ব পালনে। তারপর এজে একজন মহিলা সার্ভেন্টকে একটা লিস্ট দিয়ে বলে,
“এখানে কিছু বাঙালি খাবারের তালিকা রয়েছে আজ থেকে তোমাদের ম্যামের জন্য সেগুলোই রান্না করা হবে এবং তাকে সময় মতো সেগুলোই দেওয়া হবে।”
মহিলা সার্ভেন্টিও শায় জানিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। আর এজে দাঁড়িয়ে থাকে দরজার পাশে ভেতরে সেই ঘরে, যেখানে ঘুমিয়ে আছে এক ঝড় নাম তার রিম।
পেন্টহাউজের ব্যক্তিগত একটি কক্ষে বসে আছে ইয়াশ আর এজে। ঘরটা একেবারে নিঃশব্দ, রাজসিক ভারি পর্দা আর কালো মার্বেলের টেবিলে ছায়া ফেলেছে আড়মোড়া বিকেলের আলো। চেয়ারে রাজাধিরাজের মতো বসে আছে এজে । এক পা আরেকটার উপর তুলে, হেলান দিয়ে, চোখে সেই চিরচেনা তাচ্ছিল্যের হালকা ঝলক।তার আঙুলে ঘুরছে একটি গোল মার্বেলের বল। নিঃশব্দে ঘুরছে, কিন্তু সেই ঘূর্ণনের শব্দটাই যেন অদ্ভুত এক উত্তেজনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এজে হঠাৎ বলল, ঠান্ডা গলায়,
“সকালে যেটাকে গুলি করলাম, ওটা একটা স্পাই ছিল। ভিতর থেকে আমাদের সব ইনফর্মেশন কালেক্ট করছিল। কুত্তাটা ভাবছিল, আমি কিছু বুঝব না?”
ইয়াশ রীতিমতো চমকে উঠে বলল,
“হোয়াট? তুই এতটা কনফার্ম হলি কীভাবে?”
এজে মার্বেলটা থামিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টেনে বলে,
“তুই কি আমাকে তোর মতো বোকা ভাবিস, ইয়াশ?
আমি মানুষের নড়াচড়া দেখে বুঝি ওরা কিসে বিশ্বাস করে, কী লুকোতে চায়। তুই ভুলে গেছিস মনোবিজ্ঞানের স্টুডেন্ট ছিলাম আমি। মানুষ দেখে দেখে শিখেছি কার গলায় শ্বাস আটকে যায়, কার চোখে অস্বস্তি, কার হাত কাঁপে মিথ্যা বলার সময়। তাছাড়া আমার চোখ এতটাই তীক্ষ্ণ, দূরের একটা দৃষ্টি থেকেও বুঝতে পারি, কার নজর আমার সিংহাসনের দিকে।”
ইয়াশ থমকে যায়। তারপর হঠাৎ কিছুটা উত্তেজিত গলায় বলে,
“তাই বলে তুই ওকে মেয়েটার সামনে গুলি করবি? এখন তো ও তোকে ঘৃণা করবে।”
এজের ঠোঁটে ঠান্ডা, নির্মম এক বাঁকা হাসি খেলে যায়,
“ঘৃণা করুক। সেটাই তো চাই।”
ইয়াশ আশ্চর্য হয়ে যায়,
“কি বলছিস তুই এসব?”
এজে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বলে, তার চোখে আগুনের মতো এক ঝলক কঠোরতা।
“ভালোবাসা আমি বিশ্বাস করি না ইয়াশ। আমার বাবা-মা ও তো একে অপরকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল। কিন্তু কই? তারা কি একসাথে থাকতে পেরেছিল? ভালোবাসা মানেই ধোঁকা, অবিশ্বাস, অস্থিরতা। ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী, কয়েকটা মুহূর্তের মোহ। কিন্তু ঘৃণা…”
সে একটু থেমে গভীর গলায় বলে,
“ঘৃণা দীর্ঘস্থায়ী। ভালোবাসা ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু ঘৃণা? ঘৃণা থেকে কেউ পালাতে পারে না।”
ইয়াশ অবাক হয়ে বলে,
“তুই পাগল…”
এজে চোখ সরিয়ে কাচের দেয়ালের দিকে তাকায়,
“আমি ওর মনে বেঁচে থাকতে চাই, চিরকাল…
সে যদি আমাকে ভালোবেসে ভুলে যায়, সেটা আমি মেনে নিতে পারবো না। কিন্তু যদি ঘৃণা করে… তাহলে আমি জানি, আমি ওর মনের প্রতিটা প্রান্তে গেঁথে থাকবো। মরে গেলেও সে ভুলতে পারবে না আমাকে।”
ইয়াশ হতবাক,
“তুই… সত্যিই পাগল হয়ে গেছিস।”
এজে মৃদু হেসে বলে,
“ভালোবাসা পাগল বানায় না ইয়াশ…ঘৃণা বানায়।”
‘ইল চেন্ট্রো’ (Il Centro)-
(ইতালির সবচেয়ে বড় শপিং মল)
বিকেলের নরম আলোয় ঝকঝকে কাঁচ ঘেরা ফ্যাশন হাউজের সামনে দাঁড়িয়ে এজে। তার পাশে একটু দূরে মাত্তেও। চারপাশের লোকজন হাঁটছে, হাসছে, ছবি তুলছে কিন্তু তাদের বস যেন জমে গেছেন। একটা অদ্ভুত দ্বিধায় দাঁড়িয়ে আছেন মলের “LADIES EXCLUSIVE” শপের সামনে।
মাত্তেও কপাল কুঁচকে ফিসফিস করে,
“ভাই, ভেতরে যাবেন না?”
এজে জবাব দেয় না। শুধু ঠোঁট কামড়ে একটা শুষ্ক ঢোঁক গিলে নেয়। অন্য কেউ হলে জানত না, কিন্তু মাত্তেও জানে এই ঠোঁট কামড়ানো মানেই ভেতরে কিছু একটা অস্থিরতা চলছে। তারপর ধীরে ধীরে এজে দরজাটা ঠেলে ঢুকে পড়ে ভেতরে।
শপের অভিজাত সাজ, সুগন্ধি, আর ঝকঝকে আলোয় যেন তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যায়। জীবনে প্রথমবার একটা মেয়ের জন্য কিছু কিনতে এসেছে সে। সেই মেয়েটা যে আজও তার চোখে ঘৃণা ছুঁড়ে মারে, তবু বুকের ভেতর এমন কিছু জাগিয়ে দেয়, যা এজে নিজেও বোঝে না।
একজন স্মার্ট মহিলা সেলার এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলে,
“May I help you, sir?”
এজে মাথা নাড়ে। ঠান্ডা গলায় বলে,
“না, আমি দেখে নিতে পারব।”
তারপর শুরু হয় খোঁজা র্যাকের পর র্যাক। সে কোনো দাম দেখে না, কোনো লেবেল নয় ,শুধু খুঁজে চলে এমন কিছু, যেটা তার সেই মেয়েটার মতোই হবে। অভিজাত, গর্জিয়াস, অথচ বিষাদের মতো কালো।
অবশেষে এক কোণে চোখে পড়ে এক টুকরো অপূর্ব শাড়ি কালো জমিনে পাথরের সূক্ষ্ম হাতের কাজ। এজে থেমে যায়। হাতে তুলে নেয় সেটি। তার মনে হয় এইটুকু কাপড় যেন তার কণ্ঠের মতো, তার চাহনির মতো বিষাক্ত সুন্দর। সে কোনো কথা না বলে সেটাই নিয়ে চলে আসে কাউন্টারে।
মাত্তেও বিস্ময়ে বলে ওঠে,
“ভাই, আপনি শাড়ি কিনলেন?”
এজে ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসে। কোন উত্তর দেয় না। তার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই।কারণ সে যা করে, তার জন্য কাউকে ব্যাখ্যা দিতে হয় না। তার মনে যা আছে সে তাই করে। ব্যস! এজে’র কাজ প্রশ্নের নয় নির্বিকার সিদ্ধান্তের। সে এক পলক চোখ বন্ধ করে ভাবে এই শাড়িটা পড়ে কেমন লাগবে মেয়েটাকে। চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে সেই মুখ… কাঁচের মতো স্পষ্ট। গোধূলির আলোয় দাঁড়িয়ে, কালো পাথরের কাজ খচিত শাড়িটায় মোড়ানো এক রহস্যময়ী নারী যার চোখে আগুন, ঠোঁটে অভিমান, আর মুখে এক নিঃশব্দ প্রতিরোধ।
মাত্তেও অবাক হয়ে তাকায় এই লোকটা… মুচকি মুচকি হাসতেও পারে? আজ পর্যন্ত তো কখনো দেখেনি!
সে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
“এ লোক নির্ঘাত প্রেমে পাগল হয়ে গেছে!”
সেলার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে,
“স্যার, আপনার কি আর কিছু লাগবে?”
এজে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপর এক ঝলক কড়া দৃষ্টিতে তাকায় মাত্তেওর দিকে।
“তুই এখন বেরিয়ে যা। ডাকলে আসবি।”
মার্তেও মুখ গোমড়া করে বলে,
“কেন ভাই? আমি থাকলে কি সমস্যা?”
এজের চোখে তখন এমন এক দৃষ্টি, যেন তাকিয়েই গিলে ফেলবে। মার্তেও আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। চুপচাপ বেরিয়ে যায়।
এজে এবার কিছুটা ইতস্তত করে। ভেতরে এক অজানা সংকোচ, তার মতো মানুষের জন্যও নতুন। সে একবার গলাটা খাঁকারি দেয়, শুষ্ক ঢোক গিলে ধীরে বলে ওঠে,
“মেয়েদের… ওই জিনিসটা লাগবে।”
সেলার ভ্রু কুঁচকে, খানিকটা বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বলে,
“হোয়াট স্যার? কোন জিনিসটার কথা বলছেন?”
এজে যেন গলা পরিষ্কার করে আবার নিশ্বাস টানে, বুকের ধুকপুক শব্দ নিজেই শুনতে পায়। তারপর চোখ নামিয়ে বলে,
“মেয়েদের ইনার… আর আন্ডারওয়্যার।”
জীবনে প্রথম যখন খুন করেছিল, তখনো হয়তো হাত কাঁপেনি তার। কিন্তু আজ, এই সামান্য কথাটা বলতে গিয়ে তার হাত কাঁপছিল, গলা অবশ হয়ে যাচ্ছিল।
মহিলা সেলারটি এবার মুচকি হেসে বলে,
“আচ্ছা বুঝতে পেরেছি! বউয়ের জন্য প্রথমবার কিনতে এসেছেন, তাই তো? তাই এতটা লজ্জা পাচ্ছেন? লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, স্যার। সাইজ বলুন, আমি বের করে দিচ্ছি।”
এজে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে তো সাইজ জানে না।
চোখ বন্ধ করে মুহূর্তে মনে পড়ে যায় সেই দৃশ্য রিমের সেই নাজুক মুহূর্ত যখন সে শাড়ি পড়েছিল। ঝটকা খেয়ে চোখ মেলে ফেলে সে। তারপর মনে মনে হিসাব করে, নিজেকে বুঝিয়ে নেয়। মুখে বিড়বিড় করে,
“মে বি… থার্টিটু হবে। খুব বেশি তো বড় না।”
সেলার একটু থেমে ভ্রু কুঁচকে দেখে, তারপর জিজ্ঞেস করে,
“থার্টিটু?”
সে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বল,
“হুম।”
সেলার পণ্য বের করতে গেলে, এজে হঠাৎ বলে ওঠে,
“সবচেয়ে ভালো ব্র্যান্ডেরটা দিন। সফট আর মসৃণ কাপড়ের, যেন ও কমফোর্ট ফিল করে।”
মহিলা এবার একটু হাসে। তারপর বলে,
“আপনি নিশ্চয়ই আপনার ওয়াইফকে অনেক ভালোবাসেন, তাই না? আপনার ওয়াইফ ভীষণ লাকি।”
এজে চুপ করে যায়। সে উত্তর না দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় শপের বাইরে। কোনো উত্তর না দেওয়াটাই যেন তার আসল উত্তর।
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রিম নিস্তব্ধ, বিমর্ষ দৃষ্টিতে থাই গ্লাসের দিকে তাকিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের এক কোণে বসে আছে। যেন তার মনের আলো নিভে গেছে, প্রাণ যেন মরে গেছে শুধু রক্তমাংসের একটা দেহপুতুল রয়ে গেছে।
হঠাৎ ,ঘরের দরজাটা খুলে গেল একটা হালকা ক্লিক শব্দে। প্রবেশ করে এজে, সঙ্গে চারজন মহিলা সার্ভেন্ট হাতে বড় বড় শপিং ব্যাগ। ব্যাগগুলোতে রয়েছে মেয়েদের সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এজে কমান্ড করে,
“সবকিছু গোছানো শুরু করো, যেন, যেন এখানে কোনোকিছুর অভাব না থাকে।”
সার্ভেন্টরা দ্রুত কাজে লেগে যায়, ব্যাগ থেকে জুতো, জামা, অলংকার একে একে বার করে রুমের এক পাশে সাজিয়ে নেয়। তারা বাইরে থেকে আরো সমস্ত শপিং ব্যাগ নিয়ে আসে।
রুমের মধ্যে এক দরজাটা সেটা খুলতেই নজরে কাড়ে চোখ ধাঁধানো এক বিলাসী ঘরের দেখা মেলে।
একপাশে নিখুঁতভাবে সাজানো হাইহিল থেকে স্নিকার্স, স্টিলেটো থেকে বুট সব ধরনের জুতো।
আরেক পাশে ঝলমলে সব পোশাক গাউন, সিল্ক শাড়ি, ট্রেনচকোট, ওয়েস্টার্ন টপ, ডিজাইনার আউটফিটস।
একটা বিশাল দেয়ালে ঝুলছে একের পর এক অলংকার হীরার, চুম্বকীয় কালারস্টোন, রোজগোল্ডের ডিজাইন যেন পুরো একটা প্রাইভেট শপিংমল।সেখানে,ড়ম্বরপূর্ণ আনুষঙ্গিক সামগ্রী মেয়েদের প্রতিটি প্রয়োজন মেটানোর জন্য সবকিছু সাজানো।
ঘরের মাঝখানে একটা টাচ স্ক্রিন বোর্ড, যেটা দিয়ে যেকোনো জিনিস অর্ডার করা যায় তৎক্ষণাৎ পৌঁছে যাবে সেই বিলাসবহুল ঘরে।
রিম এখনো একই ভাবে বসে আছে বিছানায়। এজে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে।তার চোখে এক অসম্ভব তীব্রতা, গলায় রুদ্ধ একটা আবেগ।
“তোমার সমস্ত প্রয়োজনের জিনিস এখানেই আছে, বার্বিডল। তুমি শুধু একবার হুকুম করবে, আর সব তোমার সামনে হাজির হয়ে যাবে।”
রিমের ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে যায়।যেন তার চারপাশের জৌলুস তাকে স্পর্শই করছে না।
“বাহ্… দামী খাঁচা বানিয়েছেন। কিন্তু জানেন তো, খাঁচা যতই সোনার হোক না কেন, পাখি কিন্তু মুক্তি চায়।”
তার গলা ঠাণ্ডা কিন্তু ধারালো। যেন সারা ঘর ঠান্ডা হয়ে আসে। এজে এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে যায়, সে নির্বিকারে ঠান্ডা গলায় বলে,
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৯+২০
“কি করবে বলো? তোমার ডেসটিনিতে হয়তো বন্দিত্বই লেখা ছিল।”
রিম কিছু না বলে, ম্লান মুখে তাকিয়ে থাকে সামনের দেয়ালের দিকে। ঘরে কিছু সময় থমকে থাকে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। শুধু একটা শ্বাস আটকে থাকা কান্নার মতো নিঃসঙ্গ।
