প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২২
রাত্রি মনি
রিশাব প্রায় পাগল হয়ে গেছে। শহরের প্রতিটা কোণা, অচেনা গলি, পরিচিত মুখ সবখানে খুঁজে ফিরেছে সে, কিন্তু রিম নেই। মেয়েটা কোথায় গেল? এতটা একা হয়ে কোথায় বা যেতে পারে? স্পাই ইনফর্মারদেরও কেউই কোনো খবর দিতে পারছে না।
রিশাবের মন মানতে চায় না যে রিম পালিয়েছে। তার মন বলছে সে কোনো বিপদে আছে। এই এক বছরে রিমকে কখনো এমন মেয়ে বলে মনে হয়নি। মেয়েটা ছিল নিষ্পাপ, কিন্তু আত্মসম্মানে অটল। তাই সে ঠিক করেছে জীবনের যতটুকু সময় লাগে লাগুক, সে খুঁজে বের করবে রিমকে। হাল ছাড়বে না কোনোভাবেই। যদি প্রয়োজন পড়ে, তবে নিজের গোটা জীবনটাই সে উৎসর্গ করে দেবে সেই মায়াবিনীর খোঁজে।
রোম,জেমেল্লি হসপিটাল
সবটা শুনে বিস্মিত ক্যাথি। চোখ বড় বড় করে বলে ওঠে,
“মানে… মেয়েটা বিয়ে না পালিয়েছে? আর আপনি গত তিন মাস ধরে তাকে খুঁজছেন। খুঁজতে খুঁজতে ইতালি চলে এসেছেন?”
রিশাব চোয়াল শক্ত করে তাকায় তার দিকে। গলার স্বর আগুনের মতো কঠিন ,
“বলেছি তো, ও পালায়নি। আমার রিম এমন নয়। She is in trouble… and I’ll find her, no matter where she is.”
ক্যাথি এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
কী অসম্ভব এক দৃঢ়তা! কী অপার বিশ্বাস! একটা ছেলে কতটা ভালোবাসলে, এতটা নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করতে পারে!
“I’m… I’m sorry, I didn’t mean to….”
রিশাব হালকা মাথা নাড়ে।
“It’s okay.”
ভোরের প্রথম আলো আস্তে আস্তে ছুঁয়ে যায় হাসপাতালের কাঁচ জানালাগুলো। রাতের আঁধার গলে রুপালি আলোর কুয়াশা নামছে আকাশে। দূরে গির্জার ঘণ্টা বাজে মৃদু শব্দে, পাখির ডানায় ভেসে আসে আশার নতুন সকাল।
হঠাৎ একজন ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে ক্যাথিকে জানায়,
“Your brother is stable now. ওকে এখন আপনারা ডিসচার্জ করে নিয়ে যেতে পারেন।”
ক্যাথি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চোখের কোণ মুছে বলে,
“Thanks, doctor.”
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রিমের মনে শুধু একটাই কথা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে কি এমন আছে সেই রহস্যময় ঘরটায়, যেখানে একটা মাছিও প্রবেশ করতে পারে না? সেই ঘর নিয়ে জানোয়ারটা কেন এতটা পজেসিভ? সে ঘুমোতে পারেনি একটুও, সারারাত জেগে ছটফট করেছে এই একটা প্রশ্ন নিয়ে। যেভাবেই হোক, সেই রহস্য তার জানতেই হবে এটাই যেন তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।
কিন্তু ঘরটা লক করা। আর সেই পাসওয়ার্ড রিমের জানা নেই। নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে, ফিসফিস করে বলে, “যেভাবেই হোক… আমাকে জানতে হবে। একবার শুধু কোডটা পেলে… আমি ঢুকেই দেখবো।” চোখে ঝিলিক দেয় একরোখা জেদ। যেটাই থাকুক ওখানে সত্য, স্মৃতি, কিংবা মৃত্যু রিম এখন পিছিয়ে যাওয়ার মেয়েটা নয়।
এজের চোখে ঘুম নেই।কাল রাতেও জেগে ছিল, আজ সকালেও।পেন্টহাউসের বিশাল কাঁচের জানালার সামনে সে একা দাঁড়িয়ে, দৃষ্টি বাইরের ধোঁয়াটে শহরের দিকে। তবে শহর নয়, সে যেন নিজের ভেতরেই এক জ্বলন্ত নরক দেখছে।
পেছন থেকে দরজার লক খোলার মৃদু শব্দ হলো। ঘরে প্রবেশ করল এক দীর্ঘাঙ্গী নারী। পরনে ব্ল্যাক বডিকন স্যুট, পায়ে উঁচু হিল, আর হালকা বাদামি সিল্কি চুলগুলো মাথার ওপর শক্ত করে ঝুঁটি করা। চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হলেও পেশাদারিত্বের আড়ালে তা ঢাকা পড়ে গেছে। তার হাতে একটি ছোট ডিজিটাল নোটপ্যাড।
এজে ধীরগতিতে ঘাড় ফেরাল। কণ্ঠস্বর বরফশীতল,
“Got anything, Elena?”
এলেনা থেমে দাঁড়ায়। মাথা নিচু। নিস্তব্ধতা। সে উত্তর দেয় না। শুধু নিঃশ্বাসে বোঝা যায়, বহু চেষ্টা করেও এবারেও ব্যর্থতা।
এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড…হঠাৎ ঝনঝন শব্দে চুরমার হয়ে গেল পাশের দামী কাঁচের টেবিলটা। হাতের কফির মগটা সজোরে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলেছে এজে। সে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
“মার্কো! লুকা! What the hell are they doing, huh?”
সে টেবিলের ওপর সজোরে থাবা মেরে ঘড়ির দিকে তাকাল। রগ ফুলে উঠেছে গলার।
“ড্যাম ইট! একটা সামান্য এনক্রিপশন ব্রেক করতে পারছে না ওরা? কিসের স্পাই হ্যাকার ওরা? সব কটা অপদার্থের দল!”
Elena মুখ তোলে, চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ। সে নরম কিন্তু আত্মবিশ্বাসী স্বরে বলে,
“কাম ডাউন। ইউ নো ওদের ওপর সারভেইল্যান্স আছে। ওরা ওদের বেস্ট ট্রাই করছে। ডোন্ট ওয়ারি, সবকিছু আমাদের প্ল্যানমাফিকই এগোচ্ছে। গেট-টুগেদারের সব আয়োজনও একদম পারফেক্টলি সেট করা হয়েছে।”
বলেই এলেনা সহজ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। ফ্রান্সিসকো মিশনটা ছিল গোপন, এমনকি তাদের দলেরও কেউ জানে না কেন পাঠানো হয়েছিল তাকে। তবে এলেনা নিজেও ভাবছে কি এমন আছে ঐ পুরনো হার্ডড্রাইভে? যার জন্য এত উন্মাদ হয়ে আছে এজে?
এজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করল। তবে সেই শান্ত হওয়াটা যেন ঝড়ের আগের স্তব্ধতা। সে গম্ভীর গলায় বলল
“মেক সিওর… পার্টির চিফ গেস্ট যেন অবশ্যই প্রেজেন্ট থাকে।
এলেনার ঠোঁটে এক চিলতে শীতল হাসি ফুটে উঠল। সে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“Don’t worry, এতক্ষণে তার হাতে ইনভিটেশন কার্ড পৌঁছে গেছে… with a personal touch.”
ইতালি,রোম
শহরের এক গোপন কুঠুরি। ল্যাবের বাতাসটা ঘন হয়ে এসেছে। চারপাশে অন্ধকার, মাঝে কেবল সাবজেক্ট বক্সটার উপর ঝুঁকে কাজ করছে আলেসান্দ্রো। তার চোখে তীব্র দৃঢ়তা, চোয়াল শক্ত, নিঃশ্বাস গভীর। চারদিকে আধুনিক মনিটর, তারের জঙ্গল, আর নিঃশব্দে ঘড়ঘড় শব্দ তুলে ঘুরছে লিকুইড নাইট্রোজেনের পাইপলাইন।
কাঁচের কফিনের মতো সেই বক্সে শুয়ে থাকা সাবজেক্টের শরীর নিথর তবুও মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
হঠাৎ কম্পিউটারের স্ক্রিনে ঝলসে ওঠে এক লাল নীল গ্রাফ, আর ঠিক সেই মুহূর্তে সাবজেক্টের বুকে টুক করে ওঠে এক ধাক্কা।
টিক… টিক… টিক…হার্টবিট। পেছন থেকে ছুটে আসে এক বিজ্ঞানী, মুখে ঘাম, চোখে অবিশ্বাস।
“স্যার! উই… উই ডিড ইট! হি ইজ আলাইভ… উই আর সাকসিডিং!”
ল্যাবের অন্য বিজ্ঞানীরাও ধীরে ধীরে মাথা তোলে, বিস্ময়, আনন্দ আর শঙ্কা মিলেমিশে এক বিভ্রম তৈরি করে। আলেসান্দ্রো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে গভীর ছায়া। ঠোঁটের কোণে রহস্যময়ী হাসি।
“ফাইনালি……”
কিন্তু ঠিক তখনই স্ক্রিনটা কেঁপে ওঠে। লাল আলোর সতর্ক সাইরেন ঘন্টা বাজাতে শুরু করে।
‘BEEP… BEEP… SYSTEM FAILURE…’
সবাই চমকে ওঠে। হার্টবিট থেমে যায়। স্ক্রিন কালো।
আলেসান্দ্রো স্থির। তারপর হঠাৎই ঘুরে দাঁড়ায়। পাগলের মতো ছুটে যায় সামনে থাকা বিজ্ঞানীর দিকে। কিছু না বলে তুলে নেয় একটা তীক্ষ্ণ টাইটেনিয়াম ক্ল্যাম্প, তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সেটা গেঁথে দেয় সেই বিজ্ঞানীর গলায়। ছড় করে রক্ত ছিটকে পড়ে মেঝেতে।বিজ্ঞানী লুটিয়ে পড়ে নিথর। চারপাশ স্তব্ধ।
এই নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয় এক সার্ভেন্টের চপল পদচারণা। তারপর আবার পা দুটো থেমে যায় হঠাৎ করেই। চোখে মুখে তীব্র ভয়ের ছাপ। এই মুহূর্তে নিজের স্যারের সামনে দাঁড়ানোর সাহস নেই তার। কিন্তু খবরটা না দিলে পরে আরো ভয়ংকর কিছু ঘটতে পারে। তাই সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। ঘাম ভেজা কপাল আর কাঁপা কন্ঠে বলে,
“স্যার… একটা ইনভিটেশন কার্ড এসেছে… ক-কে যেন পাঠিয়েছে… খুব আর্জেন্ট মনে হচ্ছে…”
ভয়ে ভয়ে সে বাড়িয়ে দেয় খামের মতো কালো একটা কার্ড, যার উপরে সোনালী অক্ষরে লেখা ,
La Notte Del Patto Oscuro-
“The Night of the Dark Pact”
আলেসান্দ্রো ধীরে ধীরে খুলে দেখে কার্ডের ভিতরের লেখা, তারপর ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে সেই পুরনো, পরিচিত, ছায়াময়ী অট্টহাসি।
“Finally… আবার দেখা হবে… সেই ‘ডেভিল’-এর সঙ্গে। এইবার… খেলা আমিই শুরু করব।”
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রিম ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। অন্ধকার, নীরবতার সেই চিরচেনা পেন্টহাউজ আজ যেন অন্য এক রূপ নিয়েছে। সার্ভেন্টদের ছোটাছুটি, পায়ের শব্দ, কিছুর প্রস্তুতি একটা উৎসবের আমেজ। মনে হচ্ছে আজ এখানে কিছু একটা বিশেষ ঘটতে চলেছে।
চোখ ঘুরিয়ে সে দেখে, একপাশে দাঁড়িয়ে এলেনা ফোনে কথা বলছে। রিম নিঃশব্দে তার কাছে এগিয়ে এসে কৌতূহলভরা গলায় বলল,
“আজ এখানে এত মানুষ? কী আয়োজন হচ্ছে?”
এলেনা ফোনটা ধীরে কান থেকে নামিয়ে রাখে। তার মুখে একটুখানি স্নেহের ছাপ, তবে তাতে চাপা থাকে এক রকমের সতর্কতা। কোমল স্বরে বলে,
“তেমন কিছু না… আজ একটা পার্টি আছে। তবে শোনো, আজ তুমি রুম থেকে বের হবে না। এজে তোমাকে স্পষ্ট নিষেধ করে রেখেছে। আজ এখানে এমন কিছু মানুষ আসবে… যারা মোটেই ‘ভদ্রলোক’ নয়। তাদের সামনে তোমার যাওয়া নিরাপদ নয়।”
রিম ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট বাঁকায়। ঘৃণা মেশানো তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,
“তোমার স্যারের থেকে খারাপ আর কেউ হতে পারে না। আমি যদি কারো কাছে আনসেফ হই, সেটা একমাত্র ওই তোমাদের স্যারের কাছেই।”
এলেনা হালকা মলিন হেসে কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। হয়তো কিছু বলার ছিল, কিন্তু সময় বা সাহস কোনোটাই সঙ্গ দেয় না। রিমও আর একটাও কথা না বাড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মাথা উঁচু করে ধীরে ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে যায়।
রিম চুপচাপ জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরের আকাশটা মেঘলা, ঠিক তার মনের মতো। হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় একটা চেনা ঘ্রাণ এসে তার নাকে ধাক্কা দিল—চিংড়ির মালাইকারি! রিমের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। ঠিক পরক্ষণেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল এজে। হাতে তার ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর সযত্নে সাজানো চিংড়ির থালা। রিমের প্রিয় খাবার, সেটা এজে ভালো করেই জানে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রিমের সামনে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসল।তার চোখে এক আদিম শিকারির মতো ধূর্ত অথচ মোহাচ্ছন্ন হাসি।
রিমের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“সকাল থেকে না খেয়ে জাসুসি চলছে বুঝি?”
তার ঠোঁটে এক তাচ্ছিল্যভরা হাসি খেলে যায়।
“যতই চেষ্টা করো, এই মায়াজাল ছিঁড়ে বের হতে পারবে না। আজীবন মুক্তি নেই তোমার, মাই লিটল স্পাই।”
রিম রাগে ফুঁসে উঠে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়। ইচ্ছে করে দু’চারটা থাপ্পড় মেরে দেয়। কিন্তু নিজের মনের ইচ্ছেটা শক্ত করে চেপে রাখে। মুখে কিছু না বললেও চোখে ক্ষোভ স্পষ্ট।
এজে ঠোঁট কামড়ে একটানা তাকিয়ে থাকে তার দিকে, তারপর বাঁকা হেসে বলে,
“চাইলে থাপ্পড় দিতে পারো। আই রিয়ালি ডোন্ট মাইন্ড। বরং এতে আমার একটু বেশিই ভালো লাগবে।”
রিম চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। যেন তার মনের কথা কেউ চুরি করে শুনে ফেলেছে! লোকটা কি অন্তর্যামি? রিমের অবাক হওয়া দেখে এজের হাসির ধার যেন আরও বেড়ে গেল। সে রিমের খুব কাছাকাছি মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
“অবাক হয়ো না সোনা। তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনেই আমি বুঝে যাই তুমি কী ভাবছ। তুমি কখন, কী ভাবছো, কী করতে যাচ্ছো… সব। এমনকি এমন কিছু জানি, যেটা শুনলে তুমি লজ্জায় কুঁকড়ে যাবে। আর আমি… হয়তো নিজের শেষ কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলব।”
বলেই সে এক চোখ টিপে দেয় মুচকি হেসে। রিমের রাগ তখন তীব্র আগুনে পরিণত। সে মুখ খুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এজে হঠাৎ করে তার মুখে ভাত ঢুকিয়ে দেয়। রিম রেগে যায় ঠিকই, কিন্তু কিছু না বলে চুপচাপ খেতে থাকে। কারণ সে জানে খিদের সময় খাবার নিয়ে নাটক করলে তার পরিণাম ভালো হবে না। আর তাছাড়া চিংড়ি… সেটা তো তার দুর্বলতা।
খাওয়া শেষ হতেই এজে ধীরস্থিরভাবে উঠে হাত ধুয়ে নিল। তারপর আলতো করে রিমের ঠোঁটের কোণটা মুছে দিতে হাত বাড়াল। এজের আঙুল যখন রিমের নরম ওষ্ঠ স্পর্শ করল, ঠিক সেই মুহূর্তে দুজনের মাঝখানে যেন এক সহস্র ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক অদ্ভুত শিহরণে এজে নিজেই কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল। টিস্যু দিয়ে নিজের হাত মুছে তার কণ্ঠস্বর এক নিমেষেই পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেল।
“আজ তুমি রুম থেকে এক পা-ও বের হবে না। কিছু দরকার হলে সার্ভেন্টকে ডাকবে। ব্যস!”
রিম দাঁতে দাঁত বলে উঠল,
“আমি কেন আপনার হুকুম মানব? আপনি কী ভাবছেন, আমি আপনার কেনা গোলাম? আপনার ওই পোষা চাকরদের মতো আমি আপনাকে ভয় পাই না!”
এজে এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। রিমের চোখের মণির দিকে তাকিয়ে সে নিচু স্বরে বলল,
“তুমি চাকর হতে যাবে কেন সোনা? তুমি তো এই সাম্রাজ্যের রানি। আর রানি যদি রাজার কথা না শোনে… তবে সেই রাজত্বে প্রলয় অনিবার্য। তাই না এতটুকু জানো না?”
গাড়ির গতি থেমে যায় এক পুরনো আবাসিক এলাকার সামনে। রিশাব তাকিয়ে দেখে, বাড়ির সামনে কিছু মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। ক্যাথি বিস্ময়ে তাকিয়ে বলে,
“এসব কি… আমাদের জিনিসপত্র?”
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িওয়ালা কঠোর গলায় বলে ওঠে,
“আপনাদের সময় শেষ। গত দু’মাসের ভাড়া বাকি। আমি আর রাখতে পারছি না। দয়া করে জিনিসপত্র নিয়ে চলে যান।”
ক্যাথি যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে এমনভাবে চুপ করে যায়। তার ভাই কৃশ কিছুই বোঝে না, শুধু হাত ধরে রাখে বোনের। চোখের কোনায় জমে ওঠা কান্না লুকাতে লুকাতে ক্যাথি অসহায়ভাবে বলে,
“এখন কোথায় যাবো আমরা?”
রিশাব এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে ক্যাথির চোখে। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“এই মুহূর্তে তোমার যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই, ক্যাথি। তুমি চাইলে আমার সঙ্গে চলো। ওখানে আপাতত থেকে যাও। আমি পরে তোমার জন্য অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দেব।”
ক্যাথি কিছু বলতে পারে না। কণ্ঠ আটকে আসে। হঠাৎ যেন রিশাবের কাঁধটাই পৃথিবীর একমাত্র ভরসা মনে হয় তার কাছে।
চাঁদের আলোটা আজ একটু ধুসর। ঠিক যেন আকাশও বুঝে গেছে এখানে আলো নয়, অন্ধকারের উৎসব চলবে।জঙ্গলের বিলাসবহুল সেই বহুতল ভবনের ছাদে আলো ঝলমলে এক অন্ধকার। ছাদজুড়ে এক গোপন গেট টুগেদার। চারদিক কাঁচের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। নিচে শহরের বাতিগুলো তুচ্ছ লাগে এই ছাদই যেন আসল রাজত্ব। ঝিমঝিম স্লো জ্যাজ বাজছে পেছনে। এক কোণে পুরনো গ্রামোফোনের মতো দেখতে স্পিকারে ভেসে আসছে সুর,,
“And the night whispers secrets no one dares to keep…”
রেড লাইট জ্বলছে ছাদের চারপাশে।না, কোনো উজ্জ্বলতা নেই তাতে বরং লাল আভা ছড়িয়ে ছায়া আরো কালো করে তুলছে। চাঁদের আলো এসে পড়ছে কারো গাল ছুঁয়ে, কারো গলায় আটকে।
চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সোফা, চেয়ার আর হাই টেবিলের পাশে বসে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর কিছু মুখ। ইতালি, রাশিয়া, কলম্বিয়া, তুর্কি, চায়না প্রতিটা গ্যাং এর বসেরা এসেছে আজ। কেউ সিগার ছুঁড়ছে, কেউ নিঃশব্দে ওয়াইনের গ্লাস তুলে চুমুক দিচ্ছে।
এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন চাইনিজ বডিগার্ড, সবার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। তাদের কালো স্যুটের নিচে লুকানো আছে অ্যান্টিক স্নাইপার। এই পার্টিতে হাসি নেই, শুধুই হিসেব। বন্ধুত্ব নেই, কেবল ক্ষমতার মেপে মেপে ছুঁয়ে দেখা। না, এটা কোনো আনন্দের পার্টি নয় এটা ‘Blood Sign Agreement’ এর চূড়ান্ত রাত।
গুমোট এই পরিবেশে সবার মুখে একটাই প্রশ্ন, একটাই কাঁপুনি মেশানো ফিসফিসানি
“Where is he…?”
“Where’s the King?”
“এই গেট টুগেদার… যে আয়োজন করেছে, সেই তো আসেইনি!”
একজন ডনের গলার রগ টনটন করে উঠছে
“হয়তো… সে এখানেই আছে। ছায়ার মতো। আমাদের দেখতে। শুনতে।”
ঠিক তখনই শঙ্খনাদ ছুঁয়ে দূর থেকে ছুটে আসে এক তীক্ষ্ণ ছুরি। ছ্যাঁক করে কারো হাত কেটে মেঝেতে পড়ে যায়। একজন লোক তাকিয়ে দেখে তার হাত নেই।
রক্ত গড়িয়ে মেঝে লাল করে দেয়। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু তার আগেই কেঁপে কেঁপে পড়ে যায় মাটিতে।
সব যেন জমে যায় এক মুহূর্তের। সবার মুখে আতঙ্ক, স্তব্ধতা। পেন্টহাউজের সমস্ত আলো নিভে যায়। এক মুহূর্ত, নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার মতো সময়। তারপর… লাল রঙের স্পটলাইট পড়ে ছাদের কাঁচঘেরা পাশের দরজায়। সেই দরজা খুলে যায় ধীরে ধীরে… স্লো মোশনে একটা কালো বুট সামনে এগোয়… কালো শার্ট, ওপরে ব্ল্যাক ওয়াইন-কালার ব্লেজার। ছায়া মূর্তিটি এগিয়ে আসে সামনে। চোখ জ্বলছে আগুনে।
“No one dares to touch what is mine.”
তার ঠান্ডা শীতল কন্ঠ যেন এক তীক্ষ্ণ ছোড়া ছুরির ফল।
রিম রুম থেকে বেরিয়ে এসেছিল জেদ করে, নিষেধ অমান্য করে। ভেবেছিল একটু হেঁটে আসবে। কিন্তু চারপাশের জমকালো ভিড়ে সে নিজেকে বেমানান মনে করছিল। সে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেকে গুটিয়ে। তখন হালকা মাতাল এক তরুণ, হাতে ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। এখন তার মনে হচ্ছে মনস্টারটার সাথে জেদ করে এখানে আসা তার মোটেই উচিত হয়নি। ছেলেটার ঠোঁটের কোণে এক শয়তানি হাসি,
“Hey sexy, come enjoy with me tonight… Just a drink, huh?”
ঘৃণার স্রোত বয়ে যায় রিমের শরীরে।সে সরে আসতে নিলে ছেলেটা আবারো এসে দাঁড়ায় তার সামনে।
“Hey baby what happened. Let’s enjoy…….”
রিম তাকে ধাক্কা দিয়ে থাপ্পড় দিতে যায় কিন্তু ছেলেটা তার হাত চেপে ধরে। রিম মোচড়াতে থাকে, চেষ্টা করে ছাড়াতে…
ঠিক সেই মুহূর্তে সাঁই করে ছুরি আসে, ছেলেটার হাত কেটে ছিটকে পড়ে মেঝেতে। সবার চোখ কপালে।
তখনই ধোঁয়া ভেদ করে সেই আগুনখেকো আগমন। কোন শব্দ নেই, শুধু ঠাণ্ডা বিষাক্ত দৃষ্টি আর থমথমে নীরবতা। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হুমকি
“Don’t. Touch. What’s mine….”
চোখের সামনে ছেলেটার আর্তচিৎকার থেমে যায়। সেই দানবের মতো ছায়া মানবটি আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেউ বুঝে ওঠার আগেই ছেলেটার বুক চিরে সরাসরি হাত ঢুকিয়ে টেনে বের করে আনে তার লালচে জ্বলজ্বলে কলিজা।
চারপাশে নিঃশব্দ। শুধু রক্তের গরম ছিটে পড়ছে জমিনে। তারপর চকচকে সিলভার কুড়ালটা তুলে নিঃশ্বাস ফেলল সে, যেন ওটা তার প্রিয় অস্ত্র তার আত্মার এক টুকরো। এক কোপ…দুই কোপ…তিন… এভাবে একের পর এক কোপে ঝাঁ ঝাঁ করে দেয় ছেলেটার শরীর। মাংস, হাড়, হুড়মুড় করে ভেঙে যেতে থাকে।
চারপাশে হাঁটু কাঁপতে শুরু করে সবার। কেউ কেউ পেছাতে চায়, কিন্তু পায় না। কারণ সামনে থাকা সেই দানবটি সে যেন কোনো মানব নয়। তার চোখে আগুনের লেলিহান ঝিলিক। চুলগুলো এলোমেলো, তবুও গৌরবময়। তার শরীর জুড়ে রক্ত, মুখের কোণে হিংস্র এক হাসি। সবার মনে তখন একটাই ভাবনা
“কে সেই মেয়েটা? যার জন্য এত উন্মাদনা!”
আর ঠিক তখনই আকাশ গর্জে ওঠে, যেন স্বয়ং মৃত্যু এসে দাঁড়িয়েছে এই চুক্তির অন্ধকার রাত্রিতে। মঞ্চে তখন হঠাৎ আলো নেমে আসে। একটি গম্ভীর কণ্ঠ ঘোষণা করে ,
“Tonight, we bow to the darkness that unites us. Presenting the one who orchestrates this night of pacts and power… The Devil in a Suit…
Aratrik Zain Chowdhury… also known as—AJ.”
মুহূর্তেই বিস্ফোরণ! গোটা ছাদটা যেন কেঁপে উঠে
সেই নামটা, এতদিন যেটা ছিল ধোঁয়াশার মতো, আজ যেন প্রাণ ফিরে পেল। এটা শুধু একটা নাম না ,এটা একটা বিস্ফোরণ, একটা ব্র্যান্ড। এমন এক ব্র্যান্ড, যার উপরে আর কোন দামি ব্র্যান্ড চলে না।
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২১
Aratrik Zain Chowdhury. Zain. AJ.
এক ব্যক্তি এক আত্মা…………
The Phantom of Power.
The Physio of Death.
The Lover of Obsession.
