প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৩
রাত্রি মনি
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
চারদিক থমথমে। কারও মুখে শব্দ নেই, নিঃশ্বাস যেন আটকে আছে। লাস্যময় সাজের আড়ালে মুখগুলোয় ছড়িয়ে আছে আতঙ্ক। কেউ ঘাম মুছছে নীরবে, কেউ আবার দরজার পথ মেপে নিচ্ছে চোখে চোখে। এই মুহূর্তে সমস্ত রাজকীয়তা, সাজসজ্জা, বিলাসিতা সবকিছু ঢাকা পড়ে গেছে এক ভয়াবহ অচেনা নিস্তব্ধতায়। এই মুহূর্তে কেউ সাহস করে নিঃশ্বাসও নিচ্ছে না।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দুই পুরুষ। দুজনেই হিংস্র দানব। দুজনেই আলফা। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই যেন আগুনে আগুন মিশে গেছে।
একদিকে “আলেসান্দ্রো” যে বর্তমানে গোটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইন্টিস্ট। মানুষের জীবন যার কাছে শুধুই কেমিক্যাল আর ফর্মুলা। অন্যদিকে আরাত্রিক জেইন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কুখ্যাত মাফিয়া। যে শুধু মানুষ নয়, মানুষ নামের এক দানবীয় নর পিশাচ।
আজকের গেট টুগেদার আয়োজনের পেছনে জেইনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল আলেসান্দ্রো। তাই আজ চিফ গেস্ট হিসেবে তাকে বিশেষ ভাবে ইনভাইট করেছে জেইন।দুজনের ঠোঁটেই ধীরে ধীরে উঠে আসছে এক বিষাক্ত, ঠান্ডা হাসি।
আলেসান্দ্রো ঠান্ডা গলায় এক চিলতে বিষাক্ত হাসি ঝুলিয়ে বলে,
“এত বছর পর আবার দেখা হবে ভাবিনি, ১২ বছর তো কম সময় নয়।”
জেইনের কন্ঠস্বর ইস্পাতের মতো ধারালো, বাতাসের প্রতিটি অণুকে চিরে দিচ্ছে তার শব্দগুলো।
“পুরোনো সম্পর্ক! আত্মার সাথে আত্মার, এত সহজে ভোলা যায়?”
আলেসান্দ্রো এক পা এগিয়ে এল। জেইনের দেহরক্ষীদের হাতের অস্ত্রগুলো আরও শক্ত হলো। সে নিচু স্বরে টিপ্পনী কাটল,
“গল্পের শেষটা এবার আমি লিখব। কারণ, তুই যে মিথ্যে মরীচিকার পেছনে এতগুলো বছর পাগলের মতো ছুটেছিস, তার চাবিকাঠি এখন আমার মুঠোয়…”
তার কুটিল দৃষ্টি এবার নিচে নামল। জেইনের প্রশস্ত বুকে তখন লেপ্টে আছে এক নিস্তেজ দেহ—রিম। রক্তের বীভৎসতা দেখে রিম জ্ঞান হারিয়েছে অনেক আগেই। জেইন ওকে এমনভাবে আগলে রেখেছে, যেন পৃথিবীর সমস্ত আঘাত থেকে সে নিজের শরীর দিয়ে ওকে ঢাল হয়ে আড়াল করবে। নিজের দামি ব্ল্যাক ব্লেজারটা দিয়ে পরম যত্নে ঢেকে রেখেছে ওর নাজুক শরীর।যেন সদ্য জন্ম নেয়া ছোট্ট একটা বাচ্চা।
আলেসান্দ্রো ঠান্ডা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে, চোখে খেলা করে অদ্ভুত রহস্য।
“মেয়েটা বড্ড মায়াবী, যেন কাঁচের তৈরি পুতুল।… ঠিক মতো আগলে রাখিস। কে জানে, কখন আবার কার শিকারে পরিণত হয়ে যায়! তোর খাঁচা ভেঙে ওকে কেউ উড়িয়ে নিয়ে যাবে না; এর কি নিশ্চয়তা আছে?”
মুহূর্তে জেইনের চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করে। চোখের মণি যেন আগুনে জ্বলছে। তার গলায় উঠে আসে গর্জন, চাপা দেওয়া জ্বালামুখের মতো শীতল আগুন।
“এই মুহূর্তে তোকে এখানেই ছিঁড়ে জ্যান্ত কবর দিতে পারতাম… কিন্তু তোর কপাল ভালো যে আমার এখনও তোকে প্রয়োজন।বাট বাট বাট চিন্তা করিস না। আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তুইও ফুরিয়ে যাবি। তোকে এমন এক মৃত্যু দেব, যেখানে যমরাজও আর্তনাদ করে বলবে—’এই শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা আমারও নেই!’ তোর জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড এখন থেকে আমার দয়ায় চলবে, আর প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস হবে একটা করে কাঁটার আঘাত।”
সে নিজের ব্লেজারটা আরেকটু টেনে রিমকে পুরোপুরি আড়াল করে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলে। রিমের গালে তার হাতের আঙুল ছুঁয়ে থাকে আলতোভাবে।
“ভুলেও ওর দিকে তাকাবি না…তাহলে তুই থাকবি কিন্তু তোর চোখ থাকবে না। অন্ধ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরবি সারাজীবন।”
আলেসান্দ্রো এবার একটু বাঁকা হাসে,
“আমি নজর দিই না, ছিনিয়ে নিই। ঠিক যেমনটা ১২ বছর আগে করেছিলাম।”
জেইনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।ভেতরের আদিম বাঘটা যেন এখন জ্যান্ত হয়ে বের হতে চাইছে।পুরো মুখ জ্বলন্ত অগ্নিগিরির মতো রূপ নেয়। সে ঠান্ডা আগুনে ফুঁসতে থাকা এক বাঘের শ্বাস ফেলে বলে,
“শুধু আমার ফায়ার ফ্লাইয়ের ঘুম নষ্ট হবে বলে,
তুই এখনো দাঁড়িয়ে কথা বলছিস। নইলে আজ তোকে এমনভাবে পঙ্গু করতাম যে…হুইলচেয়ারই হতো তোর একমাত্র সম্বল।”
আলেসান্দ্রো ঠান্ডা গলায় হেসে বলে,
“Well, let’s see…”
চারপাশের বাতাস থমকে আছে। উত্তাপআলেসান্দ্রো একটা রহস্যময় হাসি দিল। চোখ নামিয়ে দেখে তার এক হাতে ধরা ব্ল্যাক সিগারেটটা অর্ধেক জ্বলছে, অন্য হাতে পকেট থেকে একটা রিমোট বের করে এক ঝটকায় প্রেস করল সে।
বুম!
বিশাল এক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল পুরো এলাকা। দূরে জঙ্গলের আকাশ মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে উঠল।
“আই টোল্ড ইউ… আই অ্যাম নট দ্য ওয়ান ইউ কন্ট্রোল। আই অ্যাম দ্য ওয়ান ইউ আনলিশ!”
আলেসান্দ্রোর ঠোঁটে বিকৃত হাসি।
জেইনের চোখে আগুন, মুখে হিংস্রতা, আর শরীর থেকে যেন অন্ধকার ঝরে পড়ছে। তার কালো শার্টে রক্তের ছিটে, হাতে এখনো রক্ত লেগে আছে। কলিজা ছেঁড়া সেই ছেলেটার রক্ত।
“তুই ভুলে গেছিস অ্যালেস… আমি খেলোয়াড় নই, আমি শিকারি। আর শিকারি কখনো খেলা শেষে খালি হাতে ফেরে না।”
তার ঠাণ্ডা অথচ হিংস্র কণ্ঠ চারদিক কাঁপিয়ে তোলে।এলেনা পাশ থেকে সামনে এসে দাঁড়ায়। মুখ থমথমে কিন্তু গলায় এক ধরনের কোমলতা।
“Give her to me. আমি ওকে রুমে পৌছে দিই।”
জেইনের চোখ রিমের জ্ঞানহীন মুখের উপর স্থির, তারপর এলেনার দিকে তাকিয়ে তীব্র স্বরে বলে,
“No need. আমার ফায়ার ফ্লাইকে অন্য কারো ছায়াতেও রাখতে পারি না আমি। She’s mine… to hold, to break, to burn… and to heal.”
এক মুহূর্ত নীরবতা। শুধু রিমের ভারসাম্যহীন নিঃশ্বাস। সে রিমকে তার বাহুর মধ্যে আরো আঁকড়ে ধরে।ফিসফিসে কিন্তু কঠিনভাবে বলে,
“She came into my storm. Now she’ll stay…
Until the silence learns to scream.”
পেন্টহাউসের করিডর দিয়ে জেইনের ভারী পদধ্বনি ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে, তার বুকের মধ্যে পিষে আছে রিম।আলেসান্দ্রো তখনও সেখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। ঠোঁটে অদ্ভুত এক রহস্যময়ী হাসি।
কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে তখন আগ্নেয়গিরি লাভার মতো ফুটছে অলিভা। আজ সে তার বাবার সাথে এই পার্টিতে এসেছিল কেবল জেইনকে নিজের করে পাওয়ার এক বুক আশা নিয়ে। কিন্তু মাঝখান থেকে এই মেয়েটি এসে জেইনের সমস্ত মনোযোগ আর আশ্রয়টুকু কেড়ে নিল, যা অলিভার কাছে মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক।
সে স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল জেইনের প্রস্থান পথের দিকে। তার দুচোখে তখন হিংসে আর উন্মাদনার তপ্ত শিখা। হঠাৎ এক তীব্র শব্দ—”ক্র্যাচ!”
হাতের স্ফটিকের গ্লাসটা সে এমন জান্তব আক্রোশে চেপে ধরল যে, তা মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গুঁড়ো হয়ে গেল। ভাঙা কাঁচের ধারালো টুকরোগুলো গভীর হয়ে বিঁধে গেল তার নরম হাতের তালুতে। টকটকে লাল রক্ত চুইয়ে গড়িয়ে পড়ছে মেঝের দামী মার্বেলে, কিন্তু অলিভার মুখে ব্যথার কোনো চিহ্ন নেই। তার চোখে তখন এক পৈশাচিক প্রতিজ্ঞার আগুন জ্বলছে। সে হিসহিস করে ফিসফিসিয়ে উঠল,
“জেইন শুধু আমার…! আর কারোর না… কক্ষনো না! যে আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে আমি নিজ হাতে শেষ করে দেব…!”
অন্যদিকে, এই কোলাহল আর জৌলুশের ভিড় থেকে অনেকটা দূরে, বার কাউন্টারের এক কোণে নিঃশব্দে বসে আছে যুবক। তার চোখে তখন এক বিচিত্র মোহ—না, একে মোহ বলা ভুল, এ যেন এক চিরন্তন বিস্মরণের নেশা। আঙুলের ফাঁকে ধরা কাঁচের গ্লাসটা সে ধীরলয়ে ঠোঁটে তুলল। রক্তের মতো টকটকে লাল ওয়াইনটুকু এক চুমুকে গিলে নিল সে।
তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে শরীরটাকে নিস্তেজভাবে ছেড়ে দিল। চোখের পাতাগুলো বুজে আসছে, নিঃশ্বাস হয়ে আসছে ভারী। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষণ্ণ আর অস্ফুট হাসি। ঠিক সেই মুহূর্তে একঝলক হিমশীতল বাতাস তার পাশ দিয়ে বয়ে গেল, যেন অশুভ কোনো সংকেত নিয়ে এল। বারের লাল মায়াবী আলোটাও এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠে নিভে এল।
রাত ঠিক দুটো ছাপ্পান্ন
আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠেই নিজেকে নরম মখমলে বিছানায় আবিষ্কার করে রিম। শরীরের প্রতিটি পেশি যেন জমে আছে। চোখ মেলতেই সামনের কাউচে স্থির হয়ে বসে থাকা অবয়বটা দেখে ওর রক্ত হিম হয়ে এল।
সেখানে বসে আছে সেই ‘মনস্টার’। সুন্দর আয়েশ করে পা ছড়িয়ে বসে আছে কাউচে। চোখ দুটো টকটকে লাল—যেন সারারাত কোনো রক্তগঙ্গা পেরিয়ে এসেছে। ভেজা চুলগুলো অবাধ্যভাবে কপালে লেপ্টে আছে, হয়তো একটু আগেই শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। তার ফর্সা শরীরটা ডিম লাইটের স্নিগ্ধ আলোয় অদ্ভুতভাবে ঝকঝক করছে। লাল-খয়েরি ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে জমাট বেঁধে আছে। এমন পুরুষালি সৌন্দর্য দেখলে যে কোনো নারী মুহূর্তেই হৃৎস্পন্দন হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু সামনে থাকা মেয়েটি? রিমের চোখে সে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত দৃশ্য।
একটু আগেই একটা জ্যান্ত মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে এখন কি সুন্দর নিষ্পাপ বাচ্চার মতো বসে আছে! যেন দুধে ধোয়া তুলসী পাতা। রিমের শরীরের প্রতিটি কোষে ঘৃণার আগুন জ্বলে উঠল। সে রাগে থরথর করে কাঁপছে।
“আপনি এখানে কি করছেন? লজ্জা করে না এতো রাতে একটা মেয়ের রুমে এভাবে বসে থাকতে? বেরিয়ে যান বলছি ।এক্ষুনি বেরিয়ে যান আমার রুম থেকে। জানোয়ার!”
জেইন কোনো উত্তর দিল না।যেন রিমের কোনো কথাই তার কানে ঢুকছে না। তার স্থির শীতল দৃষ্টি রিমের প্রতিটি কম্পন মেপে নিচ্ছে।সে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে আসে সামনে। রিমের পুরো শরীরটা যেন আতঙ্কে জমে যায়। আজ মনস্টারটা’টাকে অন্যদিনের চেয়ে একটু আলাদা লাগছে; ভয়ংকর। রিম শুষ্ক ঢোক গিলে বিছানার শেষ প্রান্তে পিছিয়ে যেতে চাইল। তার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলেছে।
“একদম আমার কাছে আসার চেষ্টা করেন না। দূরে, দূরে যান বলছি।”
জেইন বিছানায় বা হাতে ভর দিয়ে রিমের ওপর ঝুঁকে আসে খানিকটা। রিমের সাহসী রূপটা হঠাৎ যেন বেলুনের মতো ফুসস হয়ে যায়। তার বুকটা ঢিপঢিপ করছে।সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে, কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু শব্দগুলো গলার কাছে আটকে গেল। ঠিক তখনই জেইনের শক্ত হাতটা সাপের মতো এগিয়ে এসে রিমের গলায় চেপে বসল। যেন এই মুহূর্তে তার ভেতরের হিংস্র জানোয়ারটা বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
“খুব সাহস বেড়ে গেছে না? কলিজাটা বোধহয় শরীরের চেয়েও বড় হয়ে গেছে!”
জেইনের কণ্ঠস্বর এখন চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে।
“ভেবেছিলে আমি কিছু বলছি না বলে যা ইচ্ছে তাই করবে আর আমি তোমাকে মাথায় তুলে নাচবো? আমাকে কি খুব ভালো মানুষ মনে হয় তোমার?”
হঠাৎ জেইন সিংহের মতো গর্জন করে উঠল,
“আমার বারণ করা সত্ত্বেও রুম থেকে বের হলে কোন সাহসে? অ্যানসার মি, ড্যাম ইট!!!!!”
চিৎকারের তীব্রতায় পুরো রুমটা যেন ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল। জেইনের হাতের চাপ আরও বাড়ছে। রিমের চোখ দুটো উল্টে যাচ্ছে, শ্বাস নিতে না পেরে ওর ফর্সা মুখটা নীলচে হয়ে আসছে। দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে জেইনের হাতের ওপর। কিন্তু সামনে থাকা জানোয়ারটা’র মধ্যে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন নেই। সেখানে কেবল জ্বলছে এক উন্মাদ নেশা।
“কথা বলছো না কেন? উত্তর দাও!!!”
জেইন ওর মুখের ওপর তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে আবার হুংকার দিল। রিমের মনে হলো, আজ হয়তো এই অন্ধকারের ভেতরেই ওর শেষ নিঃশ্বাসটা হারিয়ে যাবে। হঠাৎ রিমের ভেতরকার জমানো ক্ষোভ এক লহমায় যেন বিস্ফোরণ ঘটালো। প্রাণ বাঁচাতে নিজের শরীরের সবটুকু শক্তি জড়ো করে সে জেইনের পাথরের মতো শক্ত বুকে সজোরে এক ধাক্কা মারল। অপ্রস্তুত জেইন টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
মেঝের ঠান্ডা স্পর্শে আসতেই জেইনের চোখের সেই রক্তবর্ণ নেশা যেন জাদুর মতো উবে গেল। মুহূর্তেই তার হিংস্র মুখভঙ্গি পাল্টে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক চরম অপরাধবোধ আর ছটফটানি। সে পাগলের মতো মেঝে থেকে উঠে রিমের কাছে এগিয়ে এল।
“সরি সরি। সরি বার্বি ডল। দেখি খুব বেশি লেগেছে না? আই’ম ভেরি ভেরি সরি সোনা। ইশ একদম লাল হয়ে গেছে গলাটা।”
সে এমনভাবে ছটফট করতে থাকে যেন কষ্টটা তার নিজেরই হচ্ছে।
“আ-আমার যে মাঝে মাঝে কি হয়ে যায়; আমি নিজেও জানি না। বিশ্বাস করো তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।”
সে পাগলের মত দুহাতে নিজের চুল গুলো টেনে ধরে। সে সম্পূর্ণ দিশেহারা কি করবে নিজেই বুঝতে পারছে না। সে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আয়নার ছুঁড়ে। মুহূর্তে কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। রক্ত গড়িয়ে পড়ে তার আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে।
অন্যদিকে রিম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কেন জানি তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। যে লোকটা কখনো তার গায়ে একটা সামান্য আঁচড় পর্যন্ত লাগতে দেয়নি। তার থেকে এমন আচরণ পেয়ে বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। নিজের অজান্তেই তার মনে অভিমান জমে ওঠে। জেইন রক্তাক্ত হাত নিয়েই টলতে টলতে রিমের পাশে এসে বসল। নিজের দুহাতের আজলায় পুরে নেয় রিমের ছোট্ট গোলগাল মুখশ্রী। কাতর স্বরে বলে,
“সরি সোনা। কেঁদো না প্লিজ। তোমার চোখের জল দেখলে যে আমার কলিজাটা ফেটে যায়। আমার সোনা পাখি তোমার কি খুব বেশি ব্যাথা হচ্ছে? দেখি একটু…..?”
সে দুহাতে লাল হয়ে যাওয়া গলাটা উঁচু করে দেখতে নিলেই আচমকা রিম এক হিংস্র বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। কোনো বাছবিচার না করেই নিজের সবটুকু আক্রোশ উজাড় করে সে কামড়ে ধরল জেইনের শক্ত কাঁধটা।জেইনের সারা শরীরে একটা যন্ত্রণার বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে নিজের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত করে নিল, হাতের আঙুলগুলো অবশ হয়ে খামচে ধরল বিছানার চাদর। যন্ত্রণায় ওর চোখ-মুখ কুঁচকে গেলেও সে রিমকে কোনো প্রকার বাঁধা দিল না।মিনিট দশেক পেরিয়ে গেল, রিমের দাঁতগুলো জেইনের মাংসের গভীরে বসে গেছে, তবুও রিম একই ভাবে দাঁত বসিয়ে রেখেছে। একসময় রক্ত বেরিয়ে আসে সেই জায়গা থেকে। রিমের ঠোঁট মিশে যায় ধীরে ধীরে। শক্তি হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পরে সে।এক অদ্ভুত অবসাদে ওর শরীর ছেড়ে দিলেও ভেতরের রাগ কমছে না কিছুতেই।
জেইন আদুরে স্বরে বলে,
“এবার কি একটু শান্তি লাগছে সোনা? আরেকটা কামড় দিবে? তুমি চাইলে….”
রিম যেন এক জংলি বিল্লি। কথা শেষ হওয়ার আগেই সে অন্য কাঁধেও নিজের দাঁত বসিয়ে দিল।জেইন এবারও নড়ল না; শুধু নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল যন্ত্রণার চরম শিখরে পৌঁছানোর জন্য। সে ঠোঁট জোড়া সামান্য ফাঁক করে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল। এই গভীর যন্ত্রণার মাঝেও তার মুখে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি খেলে গেল। রিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে সে নেশালো কণ্ঠে বলল,
“হেই…. এভাবে আর কতোক্ষণ আমার সাথে লেপ্টে থাকবে বলোতো? আই ফিল সামথিং নেগেটিভ। আর বেশিক্ষণ এভাবে থাকলে আমি কিন্তু মারাত্মক ভুলভাল কিছু ঘটিয়ে ফেলব!”
কথাটা কানে যেতেই রিমের সম্বিত ফিরল। এক ঝটকায় সে জেইনের শরীরের বাঁধন থেকে ছিটকে দূরে সরে গেল। এক লহমায় তার সমস্ত রাগ ছাপিয়ে এক তীব্র লজ্জা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাকে। রিমের ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই টমেটোর মতো টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে বসে রইল, নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দ যেন সে নিজেই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।
জেইন ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিমের ওই রক্তিম আভা মাখা মুখের দিকে। ওর লাল হয়ে থাকা ফোলা ফোলা গালগুলো দেখে জেইন নিজের অবচেতন মনেই নিজের কনিষ্ঠা আঙুলটা কামড়ে ধরল। আঙুলে ব্যথা লাগতেই সম্বিত ফিরল তার। মুখে ক্রুর হাসি টেনে বললো,
“মাই Wild Cat…. এই তুমি কি লজ্জা পাচ্ছো? এভাবে লজ্জা পেয়ো না প্লিজ। কেন জানি একদম বাসর রাতের মতো ফিল আসছে আমার!”
রিম তরাক করে চোখ তুলে তাকায়। ক্রোধে, লজ্জায় ফুঁসে ওঠে তার নাকের পাটা। সে এলোমেলোভাবে ঘুসি ছুড়ে দেয় মনস্টারটা’র প্রশস্ত বুকে। জেইনের মুখ থেকে মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে আসে,
“উপফ্!”
রিম বাচ্চাদের মতো ফোপাতে থাকে। অভিমানী গলায় বলে,
“আমাকে মারলি কেন? শয়তান! আমার কষ্ট হয় না। তুই পঁচা খুব পঁচা। থাকবো না তোর সাথে বাজে লোক। আমাকে খালি কষ্ট দেয়। মেরেই ফেলবো তোকে আজ। কাঁচা চিবিয়ে খাবো একদম।”
রিম দাঁত কিরমির করে বলে ওঠে। জেইন ঠোঁট কামড়ে হাসে,
“তাহলে আমাকে খেয়ে নাও সোনা। That’s what I want. Touch me, eat me, at Last kill me.”
রিমের হাত দুটো হঠাৎ থমকে যায়। সে কারেন্টের মত দূরে সরে চুপচাপ বসে থাকে। নিজের এমন আচরণে নিজেই হতবাক।জেইন এবার একটু এগিয়ে এসে রিমের একদম গা ঘেঁষে বসল। তার কণ্ঠস্বর এখন ভেলভেটের মতো নরম।
“এখনো রাগ করে আছো? বললাম তো আর হবে না। সবসময় আমার কথার এমন অবাধ্য হও কেন বলতো? এত বারন করা সত্ত্বেও বেরিয়ে এলে….. তাই তো নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারিনি। তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।”
রিম ফুঁস করে ওঠে মাথা তুললো,
“বেশ করেছি। আরো বেশি করে করবো । শুনবো না আপনার কোনো কথা। আপনি কে হ্যাঁ? আপনি যেটা করতে না বলবেন সেটাই আরো বেশি করে করবো আমি।”
জেইন নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে তার দিক ঝুঁকে আসে। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
“রিয়েলি আমি যেটা করতে না বলবো , সেটা আরো বেশি করে করবে তুমি?”
রিম চট করে ঠোঁট ফুলিয়ে বলে ফেলে,
“হ্যাঁ আপনি যেটা করতে না করবেন, সেটাই বেশি বেশি করে করবো আমি।”
জেইনের কন্ঠস্বর একটু নিচু হয়ে গেল। চোখে একধরনের রহস্যময় ঘোর।
“ভেবে বলছ তো? ”
রিম ভ্রু কুঁচকে তাকায়। জেইন বলে,
“আমি যদি রুম থেকে বের হতে না বলি?”
“বেশি করে বের হবো।”
“যদি ঘুমাতে না বলি?”
“বেশি করে ঘুমাবো।”
“যদি খেতে না বলি?”
“একশবার! বেশি করে খাব।”
জেইন এবার শরীরের সমস্ত ভার দিয়ে রিমের ওপর আরও খানিকটা ঝুঁকে এল। তার শরীরের তপ্ত উত্তাপ রিম অনুভব করতে পারছে।সে গাঢ় হুইস্কির কন্ঠে বলে,
“আর যদি আমার কাছে আসতে বারণ করি?”
“বেশি করে আসবো।”
“যদি বলি, আমাকে জড়িয়ে ধরতে না?”
“বেশি করে ধরবো।”
জেইন ক্রুর হাসে। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে রিমের একদম ওষ্ঠের কিনারে মুখ নিয়ে এল। বাতাসের দূরত্বটুকুও যেন বিলীন হয়ে গেছে। সে ফিসফিস গভীর নেশাতুর গলায় বলে,
“আর যদি বলি…. আমার লিপসে কিস করতে না?”
“বেশি করে করব।”
“রিয়েলি!”
জেইন এক লহমায় রিমের তুলোর মতো সফট কানের লতিতে নিজের দাঁত দিয়ে হালকা এক কামড় বসিয়ে দিল। এক বিচিত্র শিহরণ আর বিদ্যুতের ঝটকায় রিম ছিটকে দূরে সরে এল।সে চোখ বড়বড় করে তাকায়। এতক্ষণ এসব কি বলছিল সে? নিজেই জানে না! বুক ধুকপুক করছে, লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় তার ফর্সা মুখটা নীল হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ইচ্ছে করছে মাটিতে মিশে যেতে। ইশ্….. লোকটা এত নির্লজ্জ কেন? সে উঠে দাঁড়ায় বিছানায়। তারপর জেইনকে ঠেলে সরিয়ে দেয়।
“নির্লজ্জ লোক! জানোয়ার! এখনই বেরোন আমার রুম থেকে। বেরোন বলছি!”
জেইন রিমের লজ্জা পাওয়ার বিষয়টা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে। তাই সে আর কোনো কথা না বলে বেরিয়ে যায় চুপচাপ। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ থমকে যায় তার পা। তারপর পেছনে না তাকিয়েই বলে,
“বাই দ্য ওয়ে… তোমার ঐ ছোট্ট লাল ড্রেসটা খুব সুন্দর লাগছে। একদম পারফেক্ট মানিয়েছে তোমার সাথে।”
জেইন বেরিয়ে যেতেই রিমের ভ্রু কুঁচকে গেল। লাল ড্রেস? পাগল নাকি লোকটা? সে তো সাদা রঙের কামিজ পরে আছে। লাল এল কোত্থেকে? কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখেই রিমের সমস্ত শরীর যেন পাথরের মতো জমে গেল। কামিজের নেকলাইনটা একটু সরে গেছে, আর সেখান দিয়ে তার ইনারের লাল স্ট্র্যাপটা স্পষ্ট হয়ে বেরিয়ে আছে। কাঁধের ওপর সেটা একদম দৃশ্যমান। লজ্জায় রিমের ইচ্ছে করছে মার্বেলের মেঝেটা যদি এখন দুভাগ হতো আর সে তার ভেতরে ঢুকে যেতে পারত!
এতক্ষণ ওড়না ছাড়াই সে এই লোকটার সামনে বসে ছিল! সে এক লাফে বিছানায় গিয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। বালিশে মুখ গুঁজে বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো।বুকের ভেতরটা তখনো কোনো এক অজানা ঝড়ে লন্ডভন্ড হচ্ছে। ঘৃণা না কি লজ্জা? নাকি এই দুইয়ের মাঝে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো অনুভূতি—হঠাৎ এমন কেন লাগছে তার?
কক্ষজুড়ে ঘন অন্ধকার। মাঝখানে একটা হালকা নীল আলো। নিঃশব্দে একটার পর একটা কাচের শোপিস চুরমার হয়ে যাচ্ছে। ভাঙা টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ছে মেঝে জুড়ে। কাচ ভাঙার শব্দ ছাড়িয়ে হঠাৎ এক গর্জন শোনা যায়। অলিভা… তার চোখে রক্তজবা আগুন। শরীর কাঁপছে রাগে আর অবসেসনে। ড্রাগের ধোঁয়া আর জ্বলন্ত ঈর্ষা মিশে এক বিকৃত পাগলামিতে রূপ নিয়েছে।
অলিভা চিৎকার করে ওঠে,
“He doesn’t even look at anyone else, dad! কেবল ওই মেয়েটার জন্য! সেই সাধারণ চেহারার, নিরীহ মেয়ে!”
হঠাৎ চোখ ভিজে উঠেছে কান্নায়। কিন্তু কান্নাটাও যেন বিষাক্ত।
“আমাকে… আমাকে বছরের পর বছর ইগনোর করেছে জেইন! আমি কী কম ছিলাম? আমার চেহারা, আমার বংশ, আমার শরীর… তবু ঐ মেয়েটা!”
সে আবার ঘুরে একটা বড় কাচের ল্যাম্প ছুঁড়ে ফেলে দেয় দেয়ালের দিকে। ভেঙে পড়ে। চারদিক ছুটোছুটি করছে কাচের স্ফুলিঙ্গ। ততক্ষণে তার বাবা আন্তোনিও তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তিনি চিৎকার করে ওঠেন ,
“What the hell is this, Oliva? তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”
অলিভা হুংকার ছাড়ে
“Yes, dad! I’m mad! And it’s her fault! She’s going to pay for it… I’ll finish her!”
হঠাৎই এক পাশ থেকে মাতাল কণ্ঠে কেউ বলে ওঠে ,
“She’s not just a girl… she’s an Angel.”
আন্তোনিও পেছন ফিরে তাকান। তার ছেলে লিওনার্দো বিভানে শরীর এলিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। অর্ধেক বোতল ফুরিয়ে গেছে তার হাতে। চোখ রক্তজবা, ঠোঁটের কোণে অসুস্থ হাসি। আন্তোনিও ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন তার দিকে। তাঁর কণ্ঠে বিস্ময় আর ক্ষোভের ছায়া
“Leo… তুমি জানো তুমি কী বলছো? ঐ ছেলেটা… জেইন… তোমার চোখের সামনে তোমারই বন্ধু ম্যাক্সকে কুপিয়ে খুন করল। আর তুমি চুপচাপ বসে রইলে? Are you a coward?”
লিও গলা নামিয়ে ফিসফিস করে
“Coward? No, dad… If Zaine hadn’t done it, I would have.” (জেইন যদি এই কাজটা না করত তাহলে আমি নিজেই করতাম।)
আন্তোনিও হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন।
“What! তুমি পাগল হয়ে গেছো?”
লিও হেসে ফেলে।
“Yes, I’m mad, dad. ঐ মেয়েটার জন্য আমি সব করতে পারি। খুন, যুদ্ধ, ধ্বংস… সব। ওর জন্য শুধু একটা না এরম হাজারটা খুন করতে পারি আমি।”
সে চোখ বন্ধ করে দেয়। ঠোঁটে অদ্ভুত প্রশান্তি।
“Her eyes, those lips… the way she breathes. So calm… so fu*cking pure. আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি অনেক মেয়েকে ছুঁয়েছি, তাদের ভেতরে ডুবে থেকেছি। But never… never felt this.”
সে কাঁপা গলায় বলে ওঠে
“I want her, dad. Not for a night. For eternity. I want her in my arms… forever.”
চার্লস মাথায় হাত দিয়ে চুপ করে বসে পড়েন। এই দুই সন্তান… একজন জেইনের আত্মার জন্য পাগল, আরেকজন তার জন্য। আর মাঝখানে তিনি ভাঙা সাম্রাজ্যের রাজা, যে ধ্বংস নিশ্চিত জেনেও কিছুই করতে পারছেন না। লিও তখন ছাদের দিকে তাকিয়ে আড়াল থেকে ফিসফিস করে ওঠে ,
“আমার সেই এঞ্জেল চাই ড্যাড… No matter what it takes. By hook… or by blood.”
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
“ভাই… ভাবিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।………..”
পেন্টহাউসের জানালা দিয়ে সকালের নরম সোনালি আলো ঢুকে পড়েছে ঘরে। হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে ধীরে ধীরে। বিছানায় শার্টলেস উপুড় হয়ে শুয়ে আছে জেইন। সূর্যের আলো তার পেশিবহুল পিঠ ছুঁয়ে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিঃশ্বাস ধীর, চোখ বন্ধ। কিন্তু কপালের ওপর জমে থাকা ভাঁজ জানান দিচ্ছে, ঘুমটা ঠিক স্বস্তির নয়। রাতে রিমের ঘর থেকে ফিরেই বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়েছে সে।
ঠিক তখনই দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ে মাত্তেও।
চোখ কোটরে ঢুকে গেছে, কণ্ঠ কাঁপছে ভয় আর আতঙ্কে।
“ভাই… ভাবিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!
ঘরে নেই, লিভিং লনে নেই… পুরো পেন্টহাউস ঘুরে দেখেছি কোথাও নেই!”
এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর জেইনের চোখদুটো হঠাৎ করে খুলে যায় শীতল, সাদা ধোঁয়ায় মোড়ানো ক্রোধে জ্বলছে। সে গর্জে ওঠে, যেন শিকারি বাঘ হঠাৎ ঘুম ভেঙে বুঝে গেছে, তার শিকার খাঁচা ভেঙে পালিয়েছে।
ধরফর করে উঠে বসে পড়ে। পাশের টেবিল থেকে কালো শার্টটা তুলে গায়ে চাপিয়ে নিতে নিতে, গলা নিচু করে অথচ হাড় কাঁপানো কণ্ঠে বলে,
“এবার পালিয়ে খুব ভুল করেছ তুমি সোনা…
এইবার শাস্তিটা এমন হবে তোমার রক্ত চিৎকার করলেও আমার মন গলে যাবে না।”
সে হাত বাড়িয়ে কমিউনিকেশন বোতামটা চেপে ধরেই গর্জে ওঠে,
“সব গার্ড অন হাই অ্যালার্ট! সিটি চেকপয়েন্টগুলো বন্ধ করো! হেলিকপ্টার, স্পিডবোট, ট্রাক সব বের করো! এয়ারপোর্ট, রেলস্টেশন, বন্দর একটাও যেন না খোলে! এই শহরের প্রতিটা কোণা সীল করে দাও!”
চোখে আগুন, হাতে শীতল ইস্পাতের দৃঢ়তা। কালো শার্টটা গায়ে পড়ে বেরিয়ে পড়ে রুম থেকে। বিস্তর ঘাসের ওপর হেলিকপ্টারের পাখা ঘুরে তুফানের মতো গর্জন করছে। সে বড়বড় পা ফেলে উঠে পড়ে হেলিকপ্টারে। এক পিশাচ বেরিয়ে পড়েছে তার একমাত্র শিকারের খোঁজে।
ড্রোন উড়ছে আকাশে। হেলিকপ্টার থেকে নজরদারি চলছে পুরো শহরে। প্রতিটি রোড চেকপয়েন্টে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। রেলস্টেশন, বন্দর, এয়ারপোর্টে একটিও যাত্রী প্রবেশ করতে পারছে না।
নদীপথে স্পিডবোট ছুটছে। আকাশে হেলিকপ্টার, মাটিতে সাঁজোয়া গাড়ি, জলে নৌযান সব কিছু নামানো হয়েছে। মুখচেনা ও অচেনা সব নারীর ছবি স্ক্যান করে মিলানো হচ্ছে।আর প্রতিটি সেন্সর, প্রতিটি ক্যামেরা স্ক্যান করছে
“Where is she?”
জেইন নিজের হেলিকপ্টারে দাঁড়িয়ে নিচের শহরটার দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে এক বিকৃত হালকা হাসি যেন এ এক পছন্দের খেলা।
সে গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে
“She thinks she can run… But I don’t chase I hunt.”
সে আবার ফিসফিস করে ওঠে,
“ফায়ারফ্লাই… তুমি পালিয়ে বাঁচতে পারবে না।”
বেঘোরে ছুটছে রিম। কাঁটা, পাথর, শুকনো পাতার শব্দে মাটির ওপর পা রাখা দায় তবুও থেমে নেই। জঙ্গল পেরিয়ে শহরের প্রান্তে চলে এসেছে প্রায়। অচেনা রাস্তাগুলো যেন কুয়াশার মতো ধোঁয়াটে, প্রতিটা মুখ যেন সন্দেহজনক, প্রতিটা গাড়ির শব্দে বুক কেঁপে ওঠে।
রিম চারপাশে তাকায় চোখের সামনে হাজারো মানুষ, গাড়ি, ভিড় তবুও সে ভীষণ একা। এই শহর তার নয়। এই মানুষগুলো তাকে বাঁচাবে না। এই ভিড়ের মাঝেও সে একা হারিয়ে গেছে নিজেই নিজের ভেতর।
হাঁপাতে হাঁপাতে হঠাৎ দেয়ালে ভর দেয় সে। শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, হাঁটু দুটো যেন ভেঙে পড়তে চায়।
তবুও মনের মধ্যে একটা কথাই বারবার ঘুরছে। যে করেই হোক সেই মনস্টারটা’র কাছ থেকে পালাতে হবে অনেক দূরে। যেখান থেকে তাকে আর খুঁজে পাবে না সেই মনস্টারটা।
রাতে জেইন রুম থেকে বেরিয়ে গেলে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ শুয়ে থাকে রিম। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। গা ছমছমে সেই রহস্যময় কক্ষটা যেন আবার তাকে টানতে শুরু করে। পা দুটি যেন নিজের ইচ্ছেতেই সেখানে পৌঁছে যায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে অজান্তেই ফিসফিস করে ওঠে।
“এই ঘরের ভেতরে কি আছে?”
সে পাসওয়ার্ড লক খোলার চেষ্টা করে AJ, আরও নানা কিছু চেষ্টা করেপ্রতিবারই ঠান্ডা লাল আলো জ্বলে ওঠে। শেষবারে একটানা বিপ-বিপ-বিপ শব্দে বোঝায়
Access Denied. Too many attempts.
লক টাইম হয়ে যায়। আলো নিভে যায়।
একটা দীর্ঘ, পরাজিত নিঃশ্বাস ফেলে সে। ঘুরে দাঁড়িয়ে হেঁটে চলতে শুরু করে পেন্টহাউজের অভ্যন্তরে। হঠাৎই কাঁচের দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখে বাইরের চারদিক ঘেরা প্রহরাদৃঢ় পেন্টহাউজের প্রধান লোহার দরজাটা খোলা। আশপাশে কোনো গার্ডও নেই।
এক মুহূর্ত থেমে থাকে রিম। তারপর তার চোখে জ্বলে ওঠে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এটাই… সুযোগ!
সে দৌড়ে চলে যায় সেই দিকেই। জানে না সামনে কী আছে, কোথায় পৌঁছাবে, জানে শুধু, এটাই একমাত্র রাস্তা পালানোর।
আসলে সেই রাতের পার্টির জন্য মূল ফটক খোলা ছিল। উৎসবের হুল্লোড়ে সেটি আর বন্ধ করা হয়নি। আর গার্ডরা? সবাই নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে আছে। কেউ দেখছে না, কেউ শুনছে না। রিম তখন দৌড়চ্ছে শুধু মুক্তির আশায়, অজানা ভবিষ্যতের দিকে।
হোটেল অরেলিয়াস প্রাইভ, রোম
ইয়াশ ক্যাথিকে হোটেলে নিয়ে এসে নিরাপত্তার জন্য আলাদা একটি রুমের ব্যবস্থা করে। তারপর নিজের বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে তার জন্য একটি সম্মানজনক চাকরি, থাকার জন্য ফ্ল্যাট এবং যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়। সবকিছু যেন এক নতুন জীবনের শুরু হয় ক্যাথির জন্য।
দুজনেই যখন পরস্পরের জীবনের কঠিন সময় নিয়ে শান্তভাবে কথা বলছিল, ঠিক তখনই হন্তদন্ত ছুটে আসে মাহিন। চোখে মুখে উত্তেজনা, গলাটা কাঁপছে।
“স্যার! ম্যামকে খুঁজে পাওয়া গেছে!”
শব্দগুলো মুহূর্তেই ঘরের বাতাস বদলে দেয়। ইয়াশের চোখে যেন ঝড় নামে। সময় থমকে দাঁড়ায়। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মাথার ভেতরে বাজতে থাকে সেই হারিয়ে যাওয়া রিমের মুখ, হাসি, চোখের অভিমান। তার কাছে মনে হচ্ছিল, নিজের পুরনো হারানো কিছুটা হঠাৎ করে আবার পেয়ে গেছে। কিন্তু এটা কি আনন্দ? নাকি আরেকটা যুদ্ধের শুরু? সে শীতল গলায় প্রশ্ন করে,
“where is she?…..”
মাহিন তখন নিঃশ্বাস সামলে বলে,
“এলবো লোকেশন ট্র্যাক করতে পেরেছে। ম্যামকে শেষবার দেখা গেছে ক্যালাব্রিয়া জঙ্গলের আশেপাশে।”
ইয়াশের চোখে জ্বলজ্বলে সেই আলোর ঝলক, সে শুধুই ফিসফিস করে বলে,
“Finally… I found her…”
ক্যালাব্রিয়া নামটা শুনে কাঁথির চোখ বড় হয়ে যায়। তার কণ্ঠে ভয় আর আতঙ্ক মিশে ওঠে
“রিম এখানে কি করছে? এ তো সাধারণ কোনো জায়গা নয়। এখানে বসবাস করে কুখ্যাত মাফিয়া গোষ্ঠী।”
কথাগুলো কানে পড়তেই রিশাবের বুক ধক করে ওঠে।
হঠাৎ করে এক অজানা দুশ্চিন্তা তার মনজুড়ে ঘুরে বেড়ায় , রিমের জন্য, তার নিরাপত্তার জন্য।
সেকেন্ডেরও কম সময়ে সিদ্ধান্ত নেয় সে। আর দেরি না করে দ্রুত নিচে নামতে থাকে। তার জন্য এলবো গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। লোকেশন ট্র্যাকিং চালিয়ে তারা দ্রুত রওনা দেয় ক্যালাব্রিয়ার শহরের প্রান্তে।
শহরের প্রান্তে পৌঁছাতেই হঠাৎ গাড়ি থামাতে বলে রিশাব। এলবো ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
“Any problem?”
রিশাব জানালার বাইরে তাকিয়ে গলা নিচু করে বলে,
“আমার মনে হচ্ছে… রিম এখানেই কোথাও আছে। খুব কাছে… একদম পাশে।”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২২
এমন সময়েই চোখে পড়ে একটা গলি। অন্ধকারে ডুবে থাকা সেই গলির এক কোণায় দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে একটা মেয়ে। হাঁটু দুটো গুটিয়ে নিয়েছে বুকে, মাথা ঠেকানো হাঁটুর ওপর। চুল এলোমেলো, মুখ আড়ালে কিন্তু তবুও সেই আতঙ্কিত, হতাশ শরীরী ভাষা যেন চিৎকার করে বলে দিচ্ছে কিছু ভেঙে পড়েছে ভেতরে ভেতরে।
রিশাব আর এক মুহূর্তও দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। ধীর পায়ে, যেন কারও টানে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে তাকে, সে সামনে এগিয়ে যায়। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মেয়েটির সামনে। তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে আবেগে
“রিম……”
