Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৪

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৪

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৪
রাত্রি মনি

___”তিয়াত্তুর ঘণ্টা!!
মানে কত জানিস? চার হাজার…. তিনশো…. আশি মিনিট! মিনস দুই লক্ষ…. বাষট্টি হাজার…. আটশো সেকেন্ড! এই প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা সেকেন্ড মরেছি আমি। শ্বাস নেওয়াটাও torture ছিল। ফুসফুস ছিঁড়ে নিচ্ছিল আমার নিঃশ্বাস। আই’ম whole time fu**cking bleeding inside.”

হাতে দু’কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ায় রিশাব। রিম নিষ্পলক তাকিয়ে আছে দূর শহরের আলো ঝলমলে বিল্ডিংগুলোর দিকে। হঠাৎ তার মনে হচ্ছে কি যেন নেই।সব কিছু ঠিক আছে অথচ তার ভিতরটা শূন্য। যেন কিছু একটা হারিয়ে গেছে তার থেকে। কিন্তু কি সেটা নিজেই জানে না।
সে মনস্টারটা’র বন্দীত্ব থেকে মুক্ত কিন্তু তার মনে মুক্তির আনন্দ নেই। কেন জানি আজ হঠাৎ করেই তার পুরনো সেই হারানো ব্রেসলেটা’র কথা খুব মনে পড়ছে। যেটার অস্তিত্ব এতদিন বেমালুম ভুলেই বসেছিল সে। নরম স্বরে, কিন্তু তীক্ষ্ণ বিষণ্ণতায় ছেয়ে, তার ঠোঁট থেকে অজান্তেই শব্দগুলো বেরিয়ে আসে,
“আরাত্র… তুমি কোথায়? আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। আমার তোমাকে চাই। তুমি কি আমাকে সত্যিই ভুলে গেছো? আমার যে তোমাকে খুব মনে পড়ছে।”

গাড়ি থেকে নেমে রিশাব হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মেয়েটির সামনে। তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে আবেগে,
“রিম…”
এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত… তারপর ধীরে ধীরে মুখ তোলে মেয়েটি। সেই চোখ!… সেই মুখ!… যেন ভেঙে পড়েছে সহস্র ছায়ার নিচে।
রিশাবের বুকটা ধক করে কেঁপে ওঠে। চোখের সামনে সেই মায়াবী মুখটা। কিন্তু আজ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে গায়ের রঙ, চোখের নিচে ঘুমহীন রাতের ছাপ ডার্ক সার্কেল। গোলুগালু মুখটা শুকিয়ে গেছে, আর থুতনিতে ছোট্ট একটা পিম্পেল অসুখের মতো ঝুলে আছে।
রিম স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে রিশাবের দিকে।মুহূর্তখানেক যেন সময়ও থেমে যায়।‌ দু’জনেই বিশ্বাস করতে পারছে না এই সাক্ষাৎ সত্যি। হঠাৎ কাপা কণ্ঠে রিম ফিসফিস করে,

“আপনি!…”
রিশাব ধীরে কাছে এগিয়ে আসে। চোখে অপার যন্ত্রণা।
“তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এসেছি।
এই কি অবস্থা তোমার? আমি জানতাম, জানতাম তুমি ভালো নেই। কোথায় ছিলে, কেমন ছিলে জানি না…
কিন্তু এখন আমি তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই। চলো আমার সাথে।”
রিম একটু পিছিয়ে যায়। চোখে আতঙ্কের ছায়া। সে ফিসফিস করে ওঠে অজানা কাঁপুনিতে।
“না, না! আ..আপনি এখান থেকে চলে যান। ও যদি দেখে ফেলে… তাহলে শুধু আমাকেই নয়, আপনাকেও শেষ করে দেবে। প্লিজ, চলে যান… আমি বলছি।
রিশাবের চেহারা কঠিন হয়ে ওঠে। কণ্ঠে জেদ ও দৃঢ়তা।

“কার কথা বলছো তুমি? কেউ কিছু করতে পারবে না। আমি এসেছি… এবার কিছুই হবে না। আমি তোমায় নিয়ে যাব। এবার কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না।”
রিম ঘাড় নাড়ে। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।‌ সে যেতে চায় না, সে জানে এই মুক্তির চেষ্টার শাস্তি কী ভয়ঙ্কর হতে পারে। তবুও রিশাব ধৈর্য ধরে, নরম গলায় বোঝাতে থাকে। অবশেষে, বহু অনুরোধে ভয়ে, কান্নায়, কাঁপতে কাঁপতে রিম মাথা হেঁট করে রিশাবের সঙ্গে বেরিয়ে আসে।

হোটেল অরেলিয়াস প্রাইভ, রোম
রিশাব রিমকে নিয়ে হোটেলের ভেতরে ঢোকে। স্যুটের দরজা খুলতেই তার চোখে পড়ে ক্যাথি নেই।‌ এক মুহূর্ত থেমে যায় রিশাব।
“ক্যাথি কোথায় গেল?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজেই উত্তর খুঁজে নেয়,
“হয়তো না বলেই চলে গেছে।”
ভ্রু কুঁচকে তাকালেও, আর কিছু না ভেবে সে রিমের দিকে ফিরে বলে,
“চলো, তোমাকে রুমে নিয়ে যাই।”
রিম নির্বিকারভাবে হাঁটে, যেন অনুভূতিগুলো কোথাও আটকে গেছে। রুমে ঢুকেই রিশাব বলে,
“তুমি আগে ফ্রেশ হয়ে নাও।”

কোনো কথা না বলে রিম ধীর পায়ে সোফায় গিয়ে বসে। চোখে-মুখে ক্লান্তি আর বিষণ্ণতা। রিশাব এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎই বলে ওঠে,
“ও শিট… তোমার তো এখন জামা-কাপড় কিছুই নেই। ফ্রেশ হবে কিভাবে?”
একটু ভেবে নিয়ে আবার বলে,
“এক কাজ করো, তুমি আমার একটা শার্ট আর ট্রাউজার পরে নাও। পরে আমি অনলাইনে অর্ডার করে দিচ্ছি তোমার জন্য, ঠিক আছে?”
রিম মাথা নাড়ে না, কিছু বলে না, শুধু নিঃশব্দে শার্ট আর ট্রাউজারটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর নিঃশব্দ পায়ে চলে যায় ওয়াশ রুমে।

রাত ১২ টা ২৫ মিনিট
Velvet Sin, রোম শহরের সবচেয়ে লাক্সারিয়াস বার
ইতালির নিঃশব্দ উপকণ্ঠে, এক পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা রহস্যময় বার — “Velvet sin”।
বাইরে থেকে দেখা যায় অন্ধকারে ঢাকা এক জায়গা, রক্ত-রঙা আলোয় আলতোভাবে ঝলমল করছে একমাত্র নামফলক। ভিতরে ঢুকলেই মনে হয় যেন নরকের এক কামুক সংস্করণে প্রবেশ করেছো।
ছাদ ঝুলে আছে চাঁদের মত বাঁকা সোনালি ঝাড়বাতি। তার নিচে লম্বা বার কাউন্টার চকচকে মার্বেলের, যেখানে গ্লাসে ঢেলে পড়ছে গা জ্বালানো হুইস্কি, রেড ওয়াইন, আর রক্তের মতো গাঢ় শ্যাম্পেন।
চারপাশে ঘোরাফেরা করছে লাস্যময়ী নারীরা কারো ঠোঁট লাল, কারো চোখে কালো মাস্কারার গাঢ় ছায়া, কারো হাই হিলের শব্দ শুনলে মনে হয় পিস্তলের গুলি। কেউ সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে, কেউ হালকা গালে হাত বুলিয়ে কথা বলছে কোনো ক্ষমতাধর পুরুষের সাথে।

সামনের কোণার একটি ছোট মঞ্চে বেজে চলছে জ্যাজের মত স্লো, গভীর সে*ক্সি মিউজিক যেন শরীরের ভেতর ঢুকে পড়ে। নাচছে এক লাল গাউন পরা মেয়ে, তার চলাফেরা যেন কামনার ভাষা। বিপজ্জনক পুরুষদের জন্য এই জায়গা। যারা গুলি চালায় ঠান্ডা মাথায়, আবার চুমু খায় দাবানলের মতো।
বার কাউন্টারের ওপর ঘাড় ঝুঁকিয়ে চেয়ারে বসে আছে জেইন। গলা অবধি মদ ঢেলে নিজেকে ভিজিয়ে ফেলেছে সে। চোখ রক্তলাল। তার চারপাশে কোলাহল, নাচ, আলো ঝলমলে এক নেশাময় দুনিয়া। কিন্তু তার চোখে এখনো সেই নিখোঁজ ছায়া…ফায়ারফ্লাই।

জেইন এখনো রিমকে খুঁজে পায়নি। সকাল থেকে ড্রোন, হেলিকপ্টার, সেন্সর, সেনা সব নামানো হয়েছে শহরের রাস্তায় তবু কোথাও নেই রিম।
সে গ্লাসটা আবার ঠোঁটে নিয়ে যায়। মাত্তেও এক কোণে দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে। কেউ কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না। কারণ জেইন এখন আগ্নেয়গিরির শেষ প্রান্তে বিস্ফোরণের একচুল আগে। ঠিক তখনই এক হট, টাইট ড্রেস পরা মেয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়।
চোখে স্পার্ক, ঠোঁটে আগ্রাসী হাসি।
“Hey handsome… wanna dance?”
জেইনের দিকে হালকা ঝুঁকে আসে। শরীর তার বাহু ছুঁয়ে যায়। প্রথমে জেইন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। মেয়েটি একটু কাছে সরে আসে,

“You’re alone? I thought someone like you should never drink… alone.”
এবার জেইন মাথা একটু কাত করে তাকায় মেয়েটার দিকে। চোখে একধরনের কৌতুক মেশানো নিষ্ঠুরতা।
“Maybe I was waiting… for something entertaining,”
তার ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যমাখা হাসি।
মেয়েটা আরও কাছে আসে। জেইন এর সামনে দাঁড়িয়ে বুকটা এগিয়ে দেয় ইচ্ছে করে।
“Well, then let me entertain you…”
সে তার গলায় আঙুল রাখে, স্লাইড করতে থাকে। জেইন চোখ বন্ধ করে যেন কষ্ট আর ক্রোধ গিলে ফেলে। তারপর সে ধীরে হাত তোলে… মেয়েটির কোমরে ঠেলে এক ধাক্কা দেয় নিজের দিকে।
মেয়েটা তার কোলে বসে পড়ে, জেইন কিছু বলে না। চোখ দুটো শীতল… যেন তার ইচ্ছেতেই সব চলছে। মেয়েটা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে,

“You’re a wild one, right?”
সে তখন জেইনের গালে হাত রেখে তার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে আসে চুম্বনের জন্য মুখ বাড়ায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই জেইনের চোখ হঠাৎ জ্বলে ওঠে। সে এক নিমিষে টেনে ধরে মেয়েটার চুলের মুঠি! মেয়েটা গোঙিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
“What the hell!”
জেইনের কণ্ঠ নিচু, ঠান্ডা, কিন্তু ভিতরে লুকিয়ে থাকা পাগলামি ফেটে পড়ছে,
“How DARE you touch me?”
তারপর এক ঝটকায় মেয়েটার মুখ তার মুখের সামনে টেনে আনে।
“Do you have a fu*cking death wish, you sl*utty parasite?”
তার চোখে রিমের ছায়া তার নিঃশ্বাস, তার আগুন।
“MY body is not for you! You think you can touch me like SHE did? FU*CK OFF, you cheap knockoff.”
সে এক হাতে মেয়েটার গাল চেপে ধরে ঠেলে দেয় পেছনে। মেয়েটা হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় সোফার ওপর। আতঙ্কিত সবাই থমকে যায়। জেইনের গলা গর্জে ওঠে
“Don’t even BREATHE near me again unless you wanna die with a smile carved across your face!”

সে মেয়েটার দিকে বাঘের মতো তেড়ে যায়, যেন মারবেই এবার। কিন্তু ঠিক তখনই মাত্তেও ঝাঁপিয়ে পড়ে জেইনের ওপর।
“ভাই! ভাই না! দয়া করে! Enough!”
সে জোর করে জেইনকে পেছনে টেনে ধরে। জেইনের চোখ লাল, নিঃশ্বাস কাঁপছে। পুরো শরীর উত্তাল আগুনে জ্বলছে।
“She touched me, Matteo… THIS FU*CKING SL*UTT TOUCHED ME!”
মাত্তেও চিৎকার করে,
“আপনি পাগল হয়ে গেছেন ভাই… আপনার নেশা হয়ে গেছে। চলুন এখান থেকে।”
জেইন হিংস্র বাঘের মত গর্জে ওঠে,
“নো আই’ম নট!!!”
তারপর সে থেমে যায়। সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দ। হঠাৎ গ্লাসটা পুরো ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কাচ ছিটকে পড়ে চারদিকে। তার কণ্ঠে বিষ, অন্ধ আসক্তি, আর হিংস্রতার অঙ্গীকার,
“তুমি যেখানেই যাও না কেন ফায়ারফ্লাই… আমি আসব। এবার শুধু নিয়ে যাব না তোমাকে এমনভাবে বেঁধে রাখবো, তোমার ছায়াও পালাতে পারবে না।”

মাঝরাত। রোম শহরের ব্যস্ততা অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে এসেছে। কেবল কিছু দুর্বল স্ট্রিটলাইট আর কুয়াশার মতো হালকা ধোঁয়ায় ঢাকা রাস্তা। সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কালো, চকচকে একটা SUV। চারপাশ নিস্তব্ধ, কিন্তু গাড়ির ভেতর যেন আগুন জ্বলছে।
গাড়ির ভেতরে বসে আছে জেইন, কণ্ঠ বৃষ্টিভেজা ছাদের মতো ভাঙা,
“মাত্তেও বুকটা জ্বলছে রে। কী করব বল? সহ্য করতে পারছি না। একটু শান্তি চাই। শান্তি দিবি আমায়?”
স্টিয়ারিং হুইল আঁকড়ে ধরা জেইনের হাত কাঁপছে। চোখজোড়া অন্ধকারে ঝলকানো দু’টো নেকড়ের মতো।
মাত্তেও কিছু বলে না। সে জানে এই যন্ত্রণার নাম রিম।

যদি না পায়, জেইন বাঁচবে না। পাগলের মতো রাস্তায় ঘুরবে। ধুঁকে ধুঁকে মরবে। সে জানে, রিমই ওর ভাইয়ের একমাত্র প্রাণভোমরা। আর যেভাবেই হোক, তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। সে মনে মনে শপথ করে, এই শহর, এই দেশ, এমনকি পুরো পৃথিবী চষে ফেললেও খুঁজে বের করবে। কারণ Rim isn’t just a girl… she is his brother’s last breath, his only pulse.”
জেইন শরীরটা ঝাড়ি মেরে সোজা করে নেয়। বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে বল,
“পেন্ট হাউজে যেতে হবে। কিছু অপূর্ণ কাজ এখনো বাকি আছে।…..”
তারপর SUV আবার গর্জে ওঠে। আঁধার চিরে সামনে এগিয়ে চলে তারা ভবিষ্যতের এক অজানা যুদ্ধের দিকে।

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
হাউজের সামনের বিশাল লন গভীর রাত, আকাশে কালো মেঘ বজ্রপাতের মত থমথমে পরিবেশ। চাঁদের আলোয় হালকা ঝিকমিক করছে ঘাস। ঠান্ডা বাতাসে এক ধরনের অশরীরী শীতলতা।
জেইন বসে আছে চকচকে কালো মার্বেলের মেঝেতে। তার মাথা নিচু। পরনে খালি বুকে কালো কোট, চোখে শীতল হিংস্রতা। তার সামনে সারি দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত গার্ড প্রায় ত্রিশজন, সবাই কালো পোশাকে। কাঁধ ঝুঁকে গেছে, কেউ চোখ তুলেও তাকাতে পারছে না।
চারপাশ নীরব। হঠাৎ জেইন ঠোঁট ভিজিয়ে ঠান্ডা, নিচু স্বরে বলে ওঠে
“ঘুমানোর খুব শখ না তোদের? এবার । আমি । তোদের। এমন । ঘুমের ব্যবস্থা করব… যেই ঘুম থেকে আর কখনো উঠে দাঁড়াতে পারবি না তোরা। চিরনিদ্রা, পশুর দল!”

তার স্বর এত ঠান্ডা, এত থেমে থেমে বলছিল তাতে ঘুমিয়ে থাকা মৃত্যু জেগে উঠতে পারে।
গার্ডদের শরীর কাঁপছে, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। তারা জানে, ক্ষমা এখানে কোনো বিকল্প নয়। তারা ভুল করেছে। এখানে ভুলের সাজা মানেই মৃত্যু। এবং সেটাও সহজ মৃত্যু নয়।
জেইন ধীরে ঘাড় কাত করে তাকায় মাত্তেওর দিকে।মাত্তেও কিছু না বলেই সামনে থাকা স্টিল শাটারটা উঠিয়ে দেয়। সেই আওয়াজ যেন আগুনে তেল ঢালার মতো।
শাটার খুলতেই কালো, অন্ধকার ঘরটা থেকে একসাথে গর্জে ওঠে একটা নয় দুইটা নয়, আশিটির মতো হাইব্রিড নেকড়ে মেশানো জেনেটিক্স, যার মধ্যে আফ্রিকান হান্টার আর আর্টিক ওলভের মিল। চোখগুলো আগুনের মত লাল, লকলকে জিভে গা ছমছমে শব্দ। দাঁত বেরিয়ে আছে রক্তপিপাসু পশুর মতো।
আর ঘরের এক পাশে, কাঁচে মোড়া শক্ত খাঁচার মধ্যে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে Trejan—এক বিশাল বাঘ। চোখে শিকারির ক্ষুধা, দাঁতের কোণা থেকে গড়িয়ে পড়ছে লালা।
গার্ডদের একজনের মুখ থেকে ফিসফিসিয়ে বেরিয়ে যায়,

“God help…”
কিন্তু God এখানে নেই।
জেইন ঠাণ্ডা চোখে নেকড়ে গুলোর দিকে তাকিয়ে একটা হালকা ইশারা করে। তারপর ঘ্যাঁও!!!… ঘ্যাঁও!!!… গর্জন…! নেকড়েরা একসাথে ছুটে আসে। ঝাঁপিয়ে পড়ে গার্ডদের ওপর।
চিৎকার, আর্তনাদ, ছিন্নভিন্ন শরীরের শব্দ বাতাস কাঁপিয়ে তোলে। কেউ হাতজোড় করে, কেউ দৌড়াতে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। একেকটা নেকড়ে গলায় কামড় বসিয়ে ছিঁড়ে ফেলছে রক্তাক্ত মাংসের দলা।
একজনের পেট ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ছে নাড়ি, এক নেকড়ে দাঁত বসিয়ে চিবোতে চিবোতে রক্তমাখা মুখ তুলে তাকায় জেইনের দিকে।
জেইনের মুখে এক ধরনের বিকৃত, পৈশাচিক শান্তির ছায়া। মাথা হালকা নিচু করে সে শ্বাস নেয়,

“Can you hear it, Matteo? That’s what betrayal sounds like.”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাত্তেও আর সহ্য করতে পারে না। তার মুখে বমির ভাব। বুকটা ধরে ছুটে যায় হাউজের ভেতরে। মানুষের ভেতর থেকে ছিঁড়ে আনা কলিজা, মাংস সব দেখে তার শরীর জমে যায়।
এইদিকে, খাঁচার ভেতর Trejan, বিশাল বাঘটা সামনের পায়ে ধাক্কা মারছে খাঁচায়। জেইন ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
“My baby boy Trejan… are you hungry? Do you like fresh meat?”
Trejan হুংকার ছাড়ে। চোখ লালচে আগুনে জ্বলছে। জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নিচ্ছে সে। জেইন নিচু স্বরে বলে
“না… এখন না। একটু অপেক্ষা করো। তোমার জন্য স্পেশাল মিট আনব আমি। Very… special.”
তার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি হিংস্র, ঠান্ডা, পাগলাটে। পেছনে রক্তের স্রোত, ছিন্নভিন্ন মানুষের দেহ… আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে একটা ট্র্যাজিক অন্ধ আসক্তির ঠান্ডা মাথার খুনি, যাকে কেউ আর থামাতে পারবে না।

ঘরজুড়ে নেমে এসেছে এক ধরণের অন্ধকার তাণ্ডব। দামি ভাস, বুকশেলফ, মদের বোতল একটার পর একটা ছুঁড়ে ভাঙছে জেইন। শরীরজুড়ে পাগলামি, মাথার চুল দুহাতে ধরে উল্টোপাল্টা টানছে। গলা দিয়ে বেরোচ্ছে গর্জনের মতো কান্না। দেয়ালে সজোরে ঘুষি মারছে বারবার, রক্ত জমে গেছে আঙুলে।
“I WANT HER BACK! I WANT HER BACK RIGHT NOW, IN FRONT OF ME!”
চোখজোড়া জ্বলছে রক্তে, নাড়ির স্পন্দনে গতি নেই যেন, শুধু ধ্বংস। ইয়াশ ছুটে আসে তার দিকে,
“ড্যুড, প্লিজ… শান্ত হ লিটেল সিস্টারকে খুঁজে বের করব আমরা! তুই ভেঙে পড়লে তো সব শেষ…”
জেইন ঝটকা দিয়ে থেমে যায়। ধীরে ধীরে তার চোখ ওঠে ইয়াশের দিকে। ঠান্ডা, শীতল, মৃত্যুতে মোড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

“কাছে আসবি না! আমার কাছে আসার চেষ্টা করলেই… তোকে মারতে একটুও ভাবব না। আমার ভেতরটা… দাউদাউ করে জ্বলছে… বুচ্ছিস না তুই?
আমি সহ্য করতে পারছি না ইয়াশ… আমি ওকে চাই… এখনই, এই মুহূর্তে… আমার সামনে… না হলে সবকিছু ধ্বংস করে দিব আমি।”
তার চিৎকারে দেয়ালের কাঁচ কেঁপে উঠে যেন। চোখজোড়া ছলছল করছে, কিন্তু তাতে জল নেই শুধু আগুন।
ইয়াশ ধীরে ধীরে এগোয়, শান্ত গলায়, শান্ত ভঙ্গিতে,
“ড্যুড তুই এমন করলে আমরা কিভাবে খুঁজব লিটেল সিস্টারকে? তুই চাইলে আমরা আকাশ-পাতাল খুঁড়ে বার করব ওকে… কিন্তু আগে নিজেকে সামলা।”

জেইন এবার পুরোপুরি কাঁপছে। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলছে,
“ও আমার… আমার ছিল… আমার থাকবে… কেউ ওকে আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না… ওর গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না?… আমি ওকে খুঁজে বের করবো… খুঁজে বের করবো ওকে… আমার চাই ওকে….”
ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ছায়ার মতো এগিয়ে এল মাত্তেও। ইয়াশ তাকিয়ে মাথা নাড়ে, চোখ ইশারা করে,
“এখন!”

মাত্তেও নিঃশব্দে একটা শক্তিশালী সিডেটিভ ইনজেকশন পুশ করে দিলো সোজা জেইনের ঘাড়ে। জেইনের চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে এক মুহূর্ত। দেহটা কাঁপে। তারপর ধীরে ধীরে গলে পড়ে মেঝেতে। ইয়াশ ছুটে গিয়ে ধরে ফেলে তাকে। জেইনের ঠোঁটে তখনো এক অসহায়, ভাঙা, বিকৃত হাসি।
“মাত্তেও…তুইও… তুইও বুঝলি না আমার কষ্টটা?তুইও আমার সাথে ছলনা করলি…সবাই… সবাই আমার সাথে ছলনা করছে… কেন?”
ভারী চোখের পাতা দুটো একসময় বুজে এল। নিঃশ্বাস হয়ে এল গভীর আর শান্ত। ঘর জুড়ে নেমে এল এক বিষণ্ণ নিস্তব্ধতা। তারপর ইয়াশ ফিসফিস করে বলে,
“ওর জ্ঞান ফেরার আগেই… যে করেই হোক, রিমকে খুঁজে বের করতেই হবে। না হলে পুরো পৃথিবীটা গুঁড়িয়ে দেবে ও।”
মাত্তেও ঘাম মুছতে মুছতে শুধু নিচু স্বরে উত্তর দিল,
“জি ভাই।”

ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যাচ্ছে দিগন্তরেখা। নরম অথচ মরা রঙের আকাশ। নিস্তব্ধতা যেন এক অলক্ষ্য মৃত্যুপুরী।
হাউজের কমান্ড রুমে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ ও মাত্তেও।
চোখের নিচে গভীর ক্লান্তির ছাপ, তবুও তন্ন তন্ন করে চলেছে খোঁজ; রেলস্টেশন, এয়ারপোর্ট, জাহাজঘাট, পাহাড়, নদী, জঙ্গল সব জায়গা চষে ফেলেছে তারা।
সেনা, গার্ড, ড্রোন, ট্র্যাকার সব কিছু কাজে লাগানো হয়েছে। তবুও রিমের কোনো খোঁজ নেই।
ইয়াশ চাপা গলায় বলে,
“আর বেশি সময় নেই, ইনজেকশনের এফেক্ট মুছে যাবে যে কোনো মুহূর্তে ও ঘুম থেকে উঠলেই আবার… শুরু হয়ে যাবে তান্ডব।”
মাত্তেও নিচু স্বরে মাথা নাড়ে,
“আমি জানি ভাই, কিন্তু ভাবী যেন ধোঁয়া হয়ে গেছে… কোনো চিহ্ন নেই ওনার। একা এভাবে কোথায় যেতে পারেন উনি?”

আর কথা শেষ হতে না হতেই পাশের ঘর থেকে হঠাৎ এক গম্ভীর গর্জনের মতো আওয়াজ ভেসে আসে।
ধড়াম! একটা চেয়ার উল্টে পড়ে যায়। কাঁচ ভাঙার শব্দ। দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে যায়। জেইন উঠে পড়েছে। চোখ দুটো লালচে, ফোলা। চুল এলোমেলো। শরীরজুড়ে অস্থিরতা যেন জ্বলে উঠেছে আগুন হয়ে।
সে পশুর মতো গর্জন করে হুংকার ছাড়লো,
“Where is she?! আমার ফায়ারফ্লাই কোথায়? ওকে এনে দে! আমি আর এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না!”
সে পাগলের মতো রুমের ভেতর পায়চারি করতে শুরু করল। তার হাঁটাচলায় কোনো শৃঙ্খলা নেই, আছে শুধু এক আদিম উন্মাদনা। হঠাৎ সে ইয়াশের কলার চেপে ধরল, চোখে এক অদ্ভুত আর করুণ আতঙ্ক।

“কতক্ষণ হয়ে গেছে বল তো?! ও-ও তো এই শহরের কিছুই চেনে না… এই জঙ্গল, এই দানব ভর্তি শহর! জঙ্গলে কত হিংস্র পশু আছে তুই জানিস? ওকে যদি কিছু করে ফেলে? ও যদি কোনো খারাপ লোকের হাতে পড়ে?”
সে ইয়াশকে ছেড়ে নিজের সাথে একাই বিড়বিড় করতে লাগলো,
“ও তো… ওকে তো কাল সকালে খাইয়ে দিয়েছিলাম আমি। তারপর তো আর কিচ্ছু খায়নি।ও খেতে চায় না যদি আমি না খাইয়ে দিই।”
তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। হঠাৎ দম নিয়ে বলে
“আমি বাঁচব না… আমি বাঁচব না ইয়াশ আমি মরে যাব, যদি ওর কিছু হয়। ওকে খুঁজে বের করতে হবে… এখনই… আমাকে যেতে দে!”
সে ছটফট করতে করতে দরজার দিকে দৌড় দেয়।
মাত্তেও তার পেছনে ছুটে যায়। ইয়াশ কিছু বলার মতো করে মুখ খোলে, আবার বন্ধ করে ফেলে। সে শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে জেইনের দিকে। কারণ সে জানে একবার যখন হিংস্র বাঘ শিকার খুঁজতে বেরোয় তখন তাকে আটকে রাখা যায় না।

হোটেল অরেলিয়াস প্রাইভ
সূর্য উঠেছে একটু আগে, আলো এসে বারান্দায় ছায়া ফেলেছে। রিম চুপচাপ বসে, চোখ থমথমে, চিবুকে ক্লান্তি। যেন সারারাতও ঘুমায়নি।
রিশাব হাতে এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় আসে। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ধীরে বলে,
“রিম, কফিটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কাল থেকে কিছু খাওনি তুমি… শরীর ভেঙে পড়বে।”
রিম শব্দ না করে হাত বাড়িয়ে কফিটা নেয়। কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালেও চুমুক দেয় না। রিশাব কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। এক মুহূর্ত নীরবতা।…….
সে রিমকে নিয়ে আসার পর আর কিছু জিজ্ঞাসা করে নি। ভেবেছিল রিম কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারপর সব জানবে। কিন্তু রিম একেবারেই চুপচাপ হয়ে গেছে। হঠাৎ রিম নিস্তেজ গলায় বলে ওঠে,
“আপনি জানতে চান না, আমি এতদিন কোথায় ছিলাম?”

রিশাব তাকায় তার দিকে। রিশাব কিছু না বলে মাথা হেলে দেয়। রিমের কণ্ঠে একটা অদ্ভুত ভার
“একটা মনস্টার আমাকে বন্দী করে রেখেছিল… আমি সেখান থেকেই পালিয়েছি। সেখানকার প্রতিটা রাত, প্রতিটা সকাল ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। একটা বন্ধ ঘর, এক পৃথিবী থেকে কেটে ফেলা জীবন।”
সে ধীরে ধীরে সব খুলে বলে। রিশাব বিস্ময়ে শোনে।
“হাউ রিডিকিউলাস! পুরো সাইকো প্যাথ! বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা, কোনো স্বাধীনতা নেই…। কোনো সুস্থ্য মানুষের পক্ষে এই ধরনের কাজ করা আদৌ সম্ভব! আমি জানতাম তুমি বিপদে আছো। কিন্তু একটা প্রশ্ন… রিম, তুমি বিয়ের আসর থেকে পালাওনি, তাই তো?
রিম বিস্ময়ে চেয়ে বলে,

‘মানে? আমার বিয়ে কি আপনার সাথে হওয়ার কথা ছিল?”
রিশাব হতবাক। তার মানে রিম জানতোই না কার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে?
“হ্যাঁ। মা তোমার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন। তুমি জানতে না?”
রিম ধীরে মাথা নাড়ে, চোখে দৃষ্টিশূন্যতা।
“আমি বিয়ে করতে চাইনি। ছোট থেকে একজনকেই আমার রাজকুমার ভাবতাম। বড় হতে হতে সেই ভাবনা ভালোবাসায় বদলে যায়। মা যে আপনার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছেন, সেটা আমি জানতাম না। আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করি, আইডল মেনে এসেছি… কিন্তু ভালোবাসিনি কখনো। বিয়ে করার প্রশ্নই আসে না।”
রিশাবের মুখ এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। পায়ের নিচে যেন মাটি নেই। গলায় ক্লান্ত ব্যথা মেশানো সুর,
“তোমার সেই ভালোবাসার মানুষটা কে?”
রিম শান্ত স্বরে বলে,

“আরাত্র। ছয় বছর বয়স‌ থেকে চিনি। যখন সাত বছর বয়স ছিল অনেক দূরে চলে যায়। বলেছিল, ফিরে আসবে আমাকে নিতে।”
রিশাব হালকা তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসে। যাকে ভালোবাসে সেই মেয়েটি এত বছর ধরে অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করছে। তার জীবনটা এমন কেন?
রিম আবার বলে,
“আপনি আমার খোঁজ কিভাবে পেলেন?”
রিশাব একটুখানি হাসে,
“তোমার গলায় যে পেন্ডেন্টটা দেখছো, ওটাতে লোকেশন ট্র্যাকার আছে। আমি দিয়েছিলাম।ভেবেছিলাম যদি কখনো বিপদে পড়ো, যেন খুঁজে পেতে পারি।”
রিম ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসি ফেলে।
“মানে… এটাও মায়ের একটা মিথ্যে ছিল? যাইহোক… এত কিছু যখন করেছেন, শেষ আর একটা উপকার করুন- আমাকে বাড়ি নিয়ে চলুন। অনেক উত্তর এখনো পাওয়া বাকি।”
রিশাব শান্তভাবে বলে,

“চিন্তা কোরো না। টিকিট বুক হয়ে গেছে। আজই বাংলাদেশ ফিরবো আমরা।
রিম একটু থেমে বলল,
“আপনি কি আমার কথায় আঘাত পেয়েছেন?”
রিশাব বুকের যন্ত্রণা চেপে মুখে হাসি টেনে আনে
“না… জোর করে ভালোবাসা হয় না। আমি ঠিক আছি। তবে চেষ্টা করবো, তোমার ভালোবাসা তোমার কাছে ফিরিয়ে দিতে। তোমার সেই আরাত্রর… কোনো ছবি আছে তোমার কাছে?”
রিম মাথা নাড়ে।
“না… কিছুই নেই। একটা চিহ্ন ছিলো সেটাও হারিয়ে গেছে। মুখটাও ঝাপসা। মনে নেই। শুধু অনুভব করি, সে ছিল।”
রিশাব তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে, মুখে চাপা এক দীর্ঘশ্বাস।

এয়ারপোর্ট আবছা আলোয় ঢাকা, চারপাশে সেনা ঘিরে রেখেছে গেট। স্ক্যানার ছাড়া কেউ ঢুকতে পারছে না। রিম ও রিশাব ছদ্মবেশে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল। কিন্তু চারদিকে মুখ স্ক্যান শুরু হতেই রিম থমকে দাঁড়ায়। তার চোখে আতঙ্কের ছায়া।
“এটা… এটা ওর কাজ। এখানে থাকা যাবে না।এখান থেকে বের হতে হবে, এখনই।ষ।”
রিশাব কিছু না বলেই তার হাত ধরে বের হতে উদ্যত হয়।
কিন্তু ঠিক তখনই গর্জে ওঠে কয়েকটা SUV।
চৌদিকে ঘিরে ধরে রিম-রিশাবকে। গাড়িগুলো কালো, কোন মার্কিং নেই। তাতে থাকা লোকগুলোর মুখ আবৃত, পোশাক অজানা ধাঁচের। রিম স্তব্ধ হয়ে যায়। গাড়ির দরজা খোলে। একজন মধ্যবয়সী লোক ধীরে ধীরে নেমে আসে। চোখে রোদচশমা, ঠোঁটে বিকৃত হাসি।
রিশাব অবাক হয়ে বলে,

“এরাই কি সেই লোক যারা তোমাকে আটকে রেখেছিল?”
রিম ভয় আর আতঙ্কিত গলায় বলে,
“না… না! এরা ওর লোক হতে পারে না। ওদের পোশাক, ওদের ভাষা সব আলাদা। এরা অন্য কেউ।”
লোকটা রিমকে এক দৃষ্টিতে দেখে বলে,
“আরে! এজের আত্মা আজ হঠাৎ বাইরে কিভাবে এলো? হোয়াট এ ট্র্যাজেডি! এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!”
তার ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপ ফুটে ওঠে,
“এইবার এজে বুঝবে… আমার জিনিস কেড়ে নেয়ার ফল কতটা ভয়ংকর হতে পারে।”
রিম তড়াক করে দুই কদম পিছিয়ে যায়। রিশাব সামনে এসে দাঁড়ায়, রিমকে আড়াল করে।
“আপনি কে? আমাদের পথ ছাড়ুন!”

লোকটা কিটকিটিয়ে তীক্ষ্ণ, বিদ্বেষে ভরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
“আমি কে, সেটা তোর জানার দরকার নেই বাচ্চা।
সরে দাড়া। নয়তো অকালে প্রাণটা ঝরবে।”
লোকটা একটা ইশারা করে। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন গার্ড ঝাঁপিয়ে পড়ে রিমের দিকে। তার পেছনে কাঁধ চেপে ধরে টানাটানি শুরু হয়। রিশাব এক ঝটকায় একজনকে মাটিতে ফেলে দেয়। ধস্তাধস্তি শুরু হয়, রিম চিৎকার করছে, হাত-পা ছুঁড়ছে । তারা তাকে গাড়িতে তুলতে যাচ্ছে ঠিক তখনই…
আকাশজুড়ে বিকট শব্দ

“WHUP-WHUP-WHUP!”
আকাশ ছিঁড়ে নামছে এক বিশাল হেলিকপ্টার। ধাতব শব্দে কেঁপে ওঠে জমি, বাতাস ঘূর্ণিতে ভরে যায়।
সবাই থমকে যায়। হেলিকপ্টারের দরজা খুলে যায় ধীরে ধীরে। ধোঁয়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটা ছায়া।কালো ট্যাকটিক্যাল স্যুট, চোখে হেলমেটের নিচে হিংস্র দৃষ্টি। পিছনে ৮ জন অস্ত্রধারী ইউনিট। ছায়াটির কণ্ঠ ভেসে আসে হেলিকপ্টারের শব্দ ছাড়িয়ে

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৩

“Step. The. Fu*ck. Away. From. My. Firefly.”
চারপাশ স্তব্ধ। সে লাফিয়ে নিচে নামে মাটি থেঁতলে। চোখে আগুন, হাতে একটা কাস্টম পিস্তল। যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক আগের মুহূর্ত।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৫