Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১
রাত্রি মনি

তরুণীর ন*গ্ন পায়ের পাতা থেকে চুঁইয়ে পড়ছে তাজা রক্ত।রাঙিয়ে দিচ্ছে শুকনো পাতার ধূসর পথ। ঘন অরণ্যের বুক চিরে প্রাণপণে দৌড়ে যাচ্ছে তরুণী। চোখে মুখে আতংকের ছাপ স্পষ্ট।পরনের পোশাক ছিঁড়েখুঁড়ে অবিন্যস্ত; ঝোপঝাড়ের কাঁটায় শরীরের আনাচে-কানাচে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসতে চাইছে, ফুসফুস যেন বাতাসে অভাবে ফেটে যাওয়ার উপক্রম—তবুও থামার জো নেই। যেন এই নিচ্ছিদ্র অন্ধকার থেকে মুক্ত হওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য।

রাত তখন নিঝুম, চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার যেন শরীরী রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে অরণ্যের গভীরে জেগে উঠেছে হিংস্র শ্বাপদদের হাড়হিম করা হুঙ্কার। তরুণীর মরণপণ দৌড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তৈরি হচ্ছে শুকনো পাতার ‘মড়মড়’ শব্দ।যা এই নির্জনতায় চিৎকার করে জানিয়ে দিচ্ছে তার অবস্থান। প্রতিটি শব্দ এখানে বিপদের আহ্বান। পরিবেশটা এমনই গা ছমছমে যে সাধারণ কেউ হলে এতক্ষণে ভয়ে স্থির হয়ে যেত, অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত আতঙ্কে।
চারদিকে ওত পেতে আছে হিংস্র জন্তুর দল—নেকড়ের চোখ জ্বলছে অন্ধকারে, শিকারির একটুখানি অসতর্কতার অপেক্ষায়। একবার চোখে পড়লেই ছিঁড়ে খাবে, হাড় পর্যন্ত ফেলে দেবে না।
তবুও এই ভয়ংকর গা ছমছমে পরিবেশ, এই অন্ধকার জঙ্গল- তরুণীর মনে কোনো আতঙ্ক জাগাতে পারছে না। যেন এর থেকেও বহু গুণ ভয়ংকর কিছুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পালাতে চাইছে সে।যেন পেছনে পড়ে আছে এমন এক দানব—যার ছায়া হিংস্র জন্তুর থেকেও নিষ্ঠুর, অন্ধকারের থেকেও গভীর।……..

~~খুঁজেছি তোকে রাতবেরাতে,
জ্বলেনি আলো স্বপ্নে….
লুকিয়ে চিঠি তোকে লেখা,
তুলে রেখেছি যত্নে…..
মনের অলি-গলি, হয়ে কেন পালালি?
রাতেও মরিচিকা, দেখছি একা একা,
গিয়েছে ঘুম উড়ে,বুক পুড়ে,ছাই উড়ে
ট্রালা লালা লা… ও হো হো হো…..🎶
“স্যার, আপনি এখনো ঘুমাননি?”

নিস্তব্ধ ঘর ফুঁড়ে হঠাৎ ভেসে আসা শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো যুবক। বারান্দার রেলিং থেকে সরে এসে হাতের গিটারটি সযত্নে নামিয়ে রাখলো স্ট্যান্ডে। যুবকের দুচোখ জুড়ে রাজ্যের বিষণ্ণতা। মনে মনে উত্তর দিলো— ‘আমার রাতের সমস্ত ঘুম তো সেই মায়াবী কন্যাই কেড়ে নিয়েছে।’ কিন্তু মনের আগল না খুলে ঠোঁটে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ঘুম আসছে না। তুমি এত রাতে? এখনো বাড়ি যাওনি কেন?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
“স্যার, আপনি তো একা… তাই আমি…”
“আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না মাহিন। একা থাকাটা এখন আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তুমি এখন যেতে পারো, গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
“কিন্তু স্যার…”

মাহিনকে থামিয়ে দিয়ে যুবক কিছুটা কড়া স্বরেই বলল,
“কোনো কিন্তু না। তুমি এখন যাও।”
আর কথা বাড়ালো না মাহিন। যেভাবে নিঃশব্দে এসেছিল, সেভাবেই আলগোছে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেল। কক্ষটিতে নেমে এলো ভারী নিরবতা।

বিলাসবহুল কক্ষটি যেন এক জীবন্ত গ্যালারি। দেয়ালজুড়ে বড় বড় পোস্টার আর দামী ফটো ফ্রেমে বন্দি যুবকের বর্ণিল জীবন। কোথাও সে গিটার হাতে হাজারো শ্রোতার সামনে মঞ্চ কাঁপাচ্ছে, কোথাও বা তার রাজকীয় স্টাইলিশ পোজ। কাঁচের বিশালাকার শোকেসে সাজানো অসংখ্য ট্রফি আর সম্মাননা—যা তার আকাশচুম্বী সাফল্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু এই বিপুল প্রাপ্তি আর অর্জনের সার্থকতা কোথায়, যদি ভালোবাসার মানুষটিই পাশে না থাকে?
বিশাল রুমের এক কোণে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে ইলেকট্রিক গিটার। তার ঠিক বিপরীত পাশে আভিজাত্য ছড়াচ্ছে একটি Steinway & Sons Model-D গ্র্যান্ড পিয়ানো। এছাড়াও ছোট-বড় নানা বাদ্যযন্ত্রে ঠাসা ঘরটি যেন কোনো শৌখিন মিউজিক স্টুডিও। অথচ এত সুরের মাঝেও ঘরটিতে কেবল এক বুক হাহাকার আর নিঃস্তব্ধতার প্রতিধ্বনি।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল যুবক, যেন শূন্যতার মাঝে নিজের জীবনের হারিয়ে যাওয়া হিসেবগুলো মেলাতে চাইছে। কিন্তু না, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির সমীকরণগুলো আজ আর মিলছে না। যতোই ভাবছে, ততোই ব্যর্থতার তিতকুটে স্বাদ জিভে লেগে আসছে।

ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে যুবক বিশাল ‘মাস্টার বেড’-এ গা এলিয়ে দিল। নরম বিছানা আর এসির ঠান্ডা বাতাসও আজ তার শরীরের ক্লান্তি মুছতে পারছে না। দুচোখে ঘুমের ছিটেফোঁটা নেই, আছে কেবল এক নিদারুণ দহন। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে মনে মনে বিড়বিড় করল সে,
“কোথায় তুমি? কোন সুদূরে হারিয়ে গেলে? এই বিশাল পৃথিবীর ভিড়ে আর কোথায় গেলে খুঁজে পাবো তোমায়…?”

ইতালি—
সভ্যতার পাদপীঠ হলেও এর মাটির গভীরে মিশে আছে ‘মাফিয়া’ সংস্কৃতির বিষাক্ত ইতিহাস।ইতালির মানচিত্রের প্রতিটি ভাঁজে মাফিয়াদের আদিম আধিপত্যের গল্প লুকিয়ে থাকলেও, দক্ষিণ ইতালির ক্যালাব্রিয়া অঞ্চল যেন এক নিষিদ্ধ সাম্রাজ্য।যেখানে আইনের আগে চলে নীরব শপথ, আর রক্তই শেষ সাক্ষ্য। সেখানকার গহীন অরণ্য আর মেঘে ঢাকা পাহাড়গুলো সাধারণ মানুষের জন্য কেবল দুর্গমই নয়, বরং এক অলিখিত মৃত্যুদণ্ড।
এই জঙ্গলের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালাকার মাফিয়া পেন্টহাউস—পাথর আর লোহার তৈরি এক দুর্গ, যেখানে জানালার চেয়ে বন্দুকের মুখ বেশি। চারপাশে উঁচু দেয়াল, নজরদারি টাওয়ার, আর ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা সশস্ত্র প্রহরী। বাইরে থেকে এটি নিঃশব্দ, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতর জমে আছে অসংখ্য আর্তনাদের প্রতিধ্বনি।
দিনের আলো সেখানে পৌঁছাতে ভয় পায়, আর রাতের অন্ধকার যেন কোনো এক অতৃপ্ত তৃষ্ণায় হাহাকার করে ওঠে। সেই পেন্টহাউসের নিরেট দেওয়াল ভেদ করে মাঝেমধ্যেই ভেসে আসে মানুষের এমন হাড়হিম করা আর্তনাদ, যা বাতাসের স্বাভাবিক ছন্দকে তছনছ করে দেয়। সেই মরণ-চিৎকারের সাথে পাল্লা দিয়ে গর্জে ওঠে মাফিয়াদের পোষা শিকারি শ্বাপদদের বিকট ধ্বনি।

সেই পৈশাচিক আওয়াজ যখন পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন আশেপাশের গাছের ডালে থাকা কাকপক্ষীরাও আতঙ্কে ডানা ঝাপটিয়ে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে দিগ্বিদিকে ছুটে পালায়। অরণ্যের প্রতিটি পাতা যেন সেই খুনে নিস্তব্ধতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে বাতাস ভারী হয়ে থাকে বারুদের গন্ধে আর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ঘ্রাণে। ক্যালাব্রিয়ার এই অংশটি পৃথিবীর মানচিত্রে থাকলেও, এর নিয়ম চলে কোনো এক অন্য জগতের বিভীষিকায়, যেখানে ক্ষমা শব্দটি অভিধানে নেই।
বিলাসবহুল পেন্টহাউসের নবম তলা।ট্রান্সপারেন্ট দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে যুবক। দৃষ্টি নিবদ্ধ সুদূর নীল দিগন্তে।হাতে ধরা একটি চকচকে সিলভারের কুঠার, যা থেকে এখনো টুপটুপ করে চুইয়ে পড়ছে তরতাজা লাল রক্ত।শুভ্র শার্টটি রক্তের কারুকার্যে বিভীষিকাময়। ধারালো মুখাবয়বেও লেপ্টে আছে সেই তপ্ত রক্তের ছিটে।
“Sorry boss… আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছি না এত করা সিকিউরিটির মধ্যেও মেয়েটা কিভাবে পালিয়ে গেল!”

পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পোশাকধারী লোকটির কপাল বেয়ে দরদর করে ঝড়ে পড়ছে ঘাম।গলার স্বর কাঁপছে—যেন সাক্ষাৎ যমদূতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের মৃত্যু পরোয়ানা পড়ছে। অপরপ্রান্তে যুবকটি সম্পূর্ণ নিরব।………..
তার এই নিথর নীরবতা লোকটির আতঙ্ককে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।ভয়ে ঢোক গিলে লোকটি আবারও তোতলানো স্বরে বলে উঠল,
“মেয়েটি এখনো বেশি দূর যেতে পারেনি । এ জঙ্গল থেকে এত সহজে বের হতে পারবে না। আমরা খুব শীঘ্রই ওকে খুঁজে আনব। আর একটা সুযোগ দিন।”
শেষের কথাখানায় অসহায়ত্ব ফুটে উঠল লোকটির কন্ঠে। যেন মরার আগে শেষ চেষ্টা করছে বাঁচার জন্য।
‘সুযোগ’ শব্দটা শুনতেই এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল বস নামক লোকটির ঠোঁটের কোণে। সে ধীরস্থিরভাবে ঘুরে দাঁড়াল। বরফশীতল কণ্ঠে উত্তর দিল,
“সুযোগ? তাও আবার আমার কাছে? আমার ডিকশনারিতে ‘দ্বিতীয় সুযোগ’ বলে কোনো শব্দ নেই। আই হেট দিস ফা*কিং ওয়ার্ড!”

কথাটি শেষ হওয়ার আগেই বিদ্যুৎগতিতে হাতের কুঠারটি চালাল সে। কোনো আর্তনাদ করার সময়টুকুও পেল না লোকটি; ধারালো ফলার আঘাতে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল মাথা। ছিটকে আসা তাজা রক্তে আবার ভিজে উঠল যুবকের মুখ। সে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে চোখ বুজে ফেলল। তপ্ত রক্তের সেই মেটালিক গন্ধ যেন তার স্নায়ুতে মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। মুহুর্তেই চাঙ্গা হয়ে উঠল শরীর, মন। লোকটির প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। ঘরজুড়ে নেমে এল এক পৈশাচিক নিস্তব্ধতা।
ঠিক সেই মুহূর্তে টি-টেবিলে রাখা ফোনটি ‘টুইং’ শব্দে কেঁপে উঠল। যুবক শান্ত ভঙ্গিতে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকালো এক ঝলক। চোখের মণি জ্বলে উঠল ক্রুর লালসায়। ঠোঁটের রেখায় এক দানবীয় হাসি টেনে ফিসফিস করে বলল,
“আই’ম কামিং, বেইব…”

ইতালি— সিসিলি।
সিসিলি অঞ্চলের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে ভয়ংকর সৌন্দর্যের নাম— মাউন্ট এটনা।
প্রায় ৩,৩৩০ মিটার উঁচু এই পাহাড় দূর থেকে যতটা মোহনীয়, ভেতরে ততটাই নিষ্ঠুর।শান্ত সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক জীবন্ত নরক।ওপর থেকে দেখলে মনে হয় আকাশের বুক চিরে বেরিয়ে আসা কোনো প্রাচীন অভিশাপ। পাহাড়ের জ্বালামুখ থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়া আর তপ্ত লাভার লাল আভা জানান দিচ্ছে—প্রকৃতি আজ কোনো এক মহাপ্রলয়ের সাক্ষী হতে চলেছে। পায়ের নিচে সুবিশাল অতল সমুদ্র, যার নীল জলরাশি দিগন্তে গিয়ে মিশেছে এক ধূসর শূন্যতায়।
এই নরক আর স্বর্গের সন্ধিক্ষণে,পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় একেঅপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ। পঞ্চাশোর্ধ শরীর, কিন্তু হাড়ের খাঁচায় এখনো বাঘের তেজ।
একপাশে দাঁড়িয়ে ডন সালভাতোরে রিসো। মাফিয়া জগতের গডফাদার—‘প্যাড্রিনো’।
অন্য প্রান্তে ধুলোবালি মাখা পোশাকে মাফিয়া দমনের প্রধান সহযোদ্ধা, পাউলো বোরসেলিনিও।
“হার মেনে নাও সালভাতোরে। তোমার সাম্রাজ্যের প্রতিটি ইঁট আজ ধসে পড়েছে। পালানোর সব রাস্তা বন্ধ। আত্মসমর্পণ করো!”

এক মুহূর্ত নীরবতা। জবাব দিল না সালভাতোরে রিসো। বিনিময়ে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক হাসি। সেই হাসির শব্দ এতই ভয়ংকর যে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—এক বীভৎস আর্তনাদের মতো। আশেপাশে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব থাকলে সেই শব্দে হৃদপিণ্ড থমকে যেত নিশ্চিত।
“আমি মাফিয়া সাম্রাজ্যের একমাত্র গডফাদার…
প্যাড্রিনো।যাকে ধরার ক্ষমতা এই পৃথিবীর কোনো আইনের নেই। আজ আমার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে এই পৃথিবী থেকে। কিন্তু মাফিয়া সাম্রাজ্যের কোনো সমস্যা নেই।মাফিয়া সাম্রাজ্য কোনো ব্যক্তি নয়, এটি একটি বিষবৃক্ষ।আবার শুরু হবে সব।আবার জন্ম নেবে নতুন গডফাদার। নতুন প্যাড্রিনো।এটা কোনো সমাপ্তি নয়… এখান থেকেই শুরু হবে এক নতুন রক্তক্ষয়ী মহাকাব্য!……..”

কথা শেষ হতেই, সে শূন্যে দু’হাত মেলে ধরে। শরীর থেকে ছেড়ে দেয় সমস্ত ভার।যেন সে কোনো অতল গহ্বরে নয়, বরং নিজের সিংহাসনে বসতে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে তার ভারী শরীরটা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে তলিয়ে গেল নিচের ওই নীল অতল সমুদ্রের অন্ধকারে। যেখানে একবার পড়লে পৃথিবী থেকে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় চিরতরে।
স্তব্ধ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল পাউলো,
“নাআআআআআআআআ……..!!!”
তার কণ্ঠ পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তোলে,কিন্তু সমুদ্র উত্তর দেয় না।কারণ মাফিয়ারা মরলেও,কিংবদন্তি মরে না।গডফাদারের পতন হলো ঠিকই, কিন্তু রেখে গেল এক ভয়াবহ উত্তরাধিকারের বীজ।

“স্যার, সমস্ত ফাইল নিয়ে এসেছি। সবকিছু রেডি।”
হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠের ডাকে কার্লোর মস্তিষ্কের নিউরনে ইলেকট্রিক শকের মতো লাগল।সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বস্ত সহকারী, বেনজি। এতক্ষণ অত্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে পুরোনো ডায়েরিটি পড়ছিল কার্লো। ডায়েরির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা রহস্যের জাল তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, পারিপার্শ্বিক জগতের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। কাহিনীর শেষটুকু জানার জন্য তার ভেতরে তীব্র কৌতূহল কাজ করছিল, কিন্তু ডায়েরিটার লেখা এখানেই শেষ।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরিটা সাবধানে রেখে তালা মেরে দিল ড্রয়ারে।
কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে সে বলল,

“ঠিক আছে। তুমি এখন যেতে পারো।”
রাত তখন প্রায় সাড়ে তিনটা। চারপাশ নিস্তব্ধ। টেবিলে ওপর পড়ে আছে স্তূপাকার ফাইল।প্রতিটি কেস যেন একেকটি জটিল গোলকধাঁধা। একটি জট খুলতে না খুলতেই আরও দশটি নতুন রহস্যের উদয় হচ্ছে। যুক্তি আর প্রমাণের সমীকরণগুলো কিছুতেই মিলছে না।
চেয়ারে হেলান দিয়ে কপালে হাত রাখল কার্লো। তার মনে হচ্ছে, হয়তো সবটা আবার একদম শুরু থেকে তলিয়ে দেখতে হবে। কোথাও বড় কোনো ভুল হয়ে যাচ্ছে না তো?

এদিকে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্তির শেষ সীমায় তরুণী। সারাদিন পেটে দানাপানি পড়েনি, তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। অন্ধকার জঙ্গলটা কোনোমতে পেরিয়ে আসতেই দূরে একটি ল্যাম্পপোস্টের ক্ষীণ আলো তার চোখে পড়ল। ওইটুকু মৃদু আলো দেখেই তার নিষ্প্রাণ চোখেমুখে খেলে গেল খুশির ঝিলিক। যেন এই আলোই তার অন্ধকার জীবনের নতুন কোনো আশার প্রদীপ।
হাঁপাতে হাঁপাতে মেইন রোডে এসে পা রাখা মাত্রই এক তীব্র স্পটলাইটের আলো আছড়ে পড়ল তার মুখে।আলোর প্রচণ্ড দাপটে সে অন্ধের মতো দুহাতে চোখ ঢেকে ফেলল। চারপাশটা নিস্তব্ধ, শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের হালকা ঘড়ঘড়ানি আর তার নিজের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি শোনা যাচ্ছে।ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক অতি পরিচিত, গম্ভীর আর ভরাট কণ্ঠস্বর,

“লং টাইম নো সি, বেইব…!”
ভয়ে শরীর রি রি করে উঠল তরুণীর। এক ঝটকায় হাত সরিয়ে চোখ মেলতেই দেখল— সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো রঙের গাড়িটির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই সুঠাম দেহী যুবক। ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি, যা বিষাক্ত সাপের ছোবলের চেয়েও ভয়ংকর।
হ্যাঁ, সে ঠিকই চিনেছে। এই সেই ‘জানোয়ার’,যে এতো দিন বন্দী করে রেখেছিল তাকে।যার সোনার খাঁচা থেকে পালানোর জন্য মরণপন লড়াই করলো সে।ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আবার সেই জানোয়ারটার সামনেই এনে দাঁড় করালো তাকে।
চারিদিকে শুনশান নিস্তব্ধতা, যেন থমকে আছে সময়। আকাশে জমেছে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা—এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের পূর্বাভাস।

নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ির বনেটের ওপর লাফিয়ে উঠল এক যুবক।এক হাঁটু ভাঁজ করে রাখা, অন্য পা ঝুলে আছে নিচে। সম্পূর্ণ অ্যাটিটিউডে, নিঃশব্দ অথচ ভয়ংকর এক উপস্থিতি।
তার হাতে ধরা একটি Beretta 92FS। অতি সূক্ষ্ম, ছোট অথচ মারাত্মক সেই বন্দুক।নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পিস্তলের নল দিয়ে কপালে স্লাইড করতে লাগলো।আজকাল এমন অস্ত্র খুব কমই দেখা যায়। সাধারণত মাফিয়ারাই ব্যবহার করে। ছোট, নিখুঁত আর বহনে সহজ—এই কারণেই এটি মাফিয়াদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। সহজে পাওয়া যায় না; চোরাই কিংবা স্মাগলিংয়ের মাধ্যমেই আসে।ভাবলেশহীন, আয়েশি ভঙ্গিতে বসে ঠোঁট বাঁকলো যুবক।
“হ্যাপি টু সি ইউ, ফায়ারফ্লাই…!”
ঝলমলে দাঁতের সেই বাঁকা হাসি যুবকের—যে কোনো রমণী মুহূর্তেই ঘায়েল হয়ে যেতে পারে।কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীর কাছে সেই হাসি মনে হলো বিষাক্ত তীরের ফলার মতো। যা মুহূর্তেই বিষিয়ে দিল তার অন্তর।
যুবকটি ঠান্ডা কণ্ঠে আবার বলল,
“তুমি কি ভেবেছিলে Barbie doll এত সহজেই পালিয়ে বাঁচতে পারবে AJ-এর হাত থেকে? How silly. এই জীবনে সেটা আর সম্ভব নয়। যেখানে আমার অনুমতি ছাড়া একটা কাক-পক্ষীও ডানা ঝাপটানোর সাহস পায় না, সেখানে তুমি তো একটা জলজ্যান্ত মানুষ!
সে ধীরে মাথা কাত করল।

“যেখানেই থাকো না কেন—পাতাল থেকে হলেও খুঁজে আনবো তোমায়। আমার থেকে পালানো এত সহজ নয়, Firefly। তুমি যেখানেই যাবে, Destiny তোমাকে বারবার আমার সামনেই এনে দাঁড় করাবে।এন্ড ইউ নো হোয়াট? তোমার সেই ডেসটিনি হলাম আমি! আর তোমার ভাগ্য… সেও নির্ধারণ করব আমি।”
আকাশ কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠল বজ্রপাত। বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানিতে চারপাশ মুহূর্তের জন্য সাদা হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।হাঁটু ভেঙে রাস্তায় বসে পড়ল তরুণী।সে জানে—এখান থেকে আর পালানোর কোনো পথ নেই।তাই আর ব্যর্থ চেষ্টা করল না।নিঃশব্দে… আত্মসমর্পণ করল যুবকের কাছে।
“আগেও বারবার পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছ তুমি। আবারও একই ভুল করছ!কেন বারবার নিজের এনার্জি লস করছ, Barbie doll?আমি কখনো কাউকে দ্বিতীয় সুযোগ দেই না। সেখানে তুমি বারবার একই ভুল করে নিস্তার পেয়ে যাচ্ছ। এতে তো অন্যদের প্রতি অবিচার হয়ে যাচ্ছে।”
সে আবারো বন্দুক ঠেকালো কপালে।

“নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাচ্ছি আমি। ছ্যাহ্!শেষমেষ কিনা একটা মেয়েকেই নিজের কন্ট্রোলে আনতে পারলাম না! যেখানে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড আমার ইশারায় চলে।ছ্যাহ্! ছ্যাহ্! এটা কি সমাজ মানবে বলো?”
ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি,
“যদিও সমাজের পরোয়া আমি করি না।”
কথাগুলো শেষ করেই এক ঝটকায় গাড়ি থেকে লাফিয়ে নিচে নামল AJ। ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ ভেঙে নামল প্রবল বর্ষণ। ভ্যাপসা মাটির সোঁদা গন্ধে ভারী হয়ে উঠল বাতাস, আর চারপাশ মুখরিত হলো বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে। বৃষ্টির ঝাপটা থেকে বাঁচাতে একজন গার্ড দ্রুত ছাতা হাতে এগিয়ে এলো, কিন্তু AJ হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিজে একাকার দুজনে। কতক্ষণ তারা এভাবে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির তোড়ে ভিজল, তার হিসাব নেই। দুজনেরই শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির শব্দের মাঝেও হার্টবিট যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

অকস্মাৎ নিচু হয়ে তার ফায়ারফ্লাইকে দুহাতে কোলে তুলে নিল AJ।আকস্মিক এই স্পর্শের উত্তাপে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মেয়েটি।চিৎকারও করতে পারল না। AJ এর ঠোঁটের কোণে খেলে গেল ক্রুর হাসি। তরুণীর কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে বলল,
“Let’s go, Barbie doll…”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২