প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২
রাত্রি মনি
বৃষ্টি থেমেছে অনেক আগেই। প্রভাতে নরম আলোয় ভিজে উঠেছে ঘুমন্ত শহর। শিশির ভেজা ঘাসে প্রকৃতি ধারণ করেছে স্নিগ্ধ সরল রূপ।সূর্য ওঠার আগ মুহূর্তে আকাশে হালকা কমলা আর গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়েছে। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে রোদে স্নান করতে শুরু করে। টিরেনিয়ান সাগরের নীল জলরাশি তখনো শান্ত, শুধু হালকা বাতাসে সামান্য ঢেউ খেলছে। দূর থেকে ভেসে আসে পাখির কূজন, আর মাটির ঘ্রাণে মেশে জোরালো জলপাই গাছের সুবাস।এই প্রভাত যেন ক্লান্ত জীবনকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে, যেন সময় কিছুটা ধীরে চলে শুধু সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে।
তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে নৃশংসতা। ক্যালাব্রিয়া অঞ্চলের ঘন এই জঙ্গলেই রয়েছে বিলাসবহুল পেন্টহাউস। যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাতের বেলা তো দুর দিনের আলোতেও কেউ পা মাড়ায় না এদিকটায়। শোনা যায় এখানে নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত মাফিয়া গোষ্ঠীর বসবাস। শুধু তাই নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এমনকি এশিয়া মহাদেশেও বিস্তার রয়েছে এদের প্রভাব।
বন্ধ ঘরের গুমোট বাতাসে এখন কেবল ভাঙচুরের শব্দ।একের পর এক দামি শোপিস, কাঁচের ভাস্কর্য,শৌখিন আসবাব, সবকিছু ছিটকে পড়ছে মেঝেতে।তবুও বুকের ভেতরের দহন কমছে না, রাগে-ক্ষোভে ফুঁসছে তরুণী। কিছুক্ষণ আগেই জ্ঞান ফিরেছে তার, আর জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে এই বিলাসবহুল খাঁচায় আবিষ্কার করা মাত্রই তার ভেতরের উন্মাদনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
গতরাতের কথা মনে পড়তেই শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল।…….
রাতে জানোয়ারটা যখন তাকে কোলে তুলে নিয়েছিল, সে কোনো প্রতিবাদ করেনি; বরং নিস্তেজ হয়ে লোকটার প্রশস্ত বুকের সাথে মিশে ছিল। অন্য সময় হলে হয়তো ধস্তাধস্তি করত, কোল থেকে নামার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালাত। কিন্তু তখন তার শরীরে অবশিষ্ট ছিল না বিন্দুমাত্র প্রাণশক্তি।
সারাদিনের অনাহার, তার ওপর দুর্গম জঙ্গলের ভেতর দিয়ে উন্মাদিনীর মতো দৌড়ানোর ধকল—সব মিলিয়ে শরীরটা আর সায় দিচ্ছিল না। বুনো লতা আর ধারালো ডালপালার আঁচড়ে ফর্সা শরীরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য লালচে ক্ষত। সেই যন্ত্রণায় আর ক্লান্তিতে চোখ জোড়া বারবার বুজে আসছিল তার। হয়তো একটু পরেই জ্ঞান হারাবে সে।
নিজের ফায়ারফ্লাইকে কোলে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল এজে। ল্যাম্বরগিনি ভেনেনো রোডস্টার—অত্যাধুনিক, দামী, ম্যাট ফিনিশ। এই গাড়িটা নিয়ে স্বচরাচর বের হয় না সে। কেবল তখনই বেরোয়, যখন কোনো অপারেশনে দীর্ঘতম পথ পাড়ি দিতে হয়… অথবা শত্রুকে ধাওয়া করতে হয়। এই গাড়িতে পলাতক শত্রুর নাগাল পাওয়া সহজ। তার ওপর স্পোর্টস রেস করার ভীষণ নেশা—তবে শুধু জেতার জন্যই।
গাড়ির কনসোল থেকে একটি মিনারেল ওয়াটারের বোতল এগিয়ে দিল রমণীর দিকে। অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিল কন্যা। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল এজের।নিচু গলায় থেমে থেমে বললো,
“আই সোয়্যার বার্বিডল…. তুমি যদি এখন আমার অবাধ্য হও…… তবে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না। ইউ নো হোয়াট আই মিন!”
হুমকির সুর টের পেয়ে সন্তর্পণে বোতল হাতে নিল তরুণী। সত্যিই পিপাসা পেয়েছে তার।বুক ফাটা তৃষ্ণায় বোতলের মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে সবটুকু পানি পান করে নিল সে। তৃষ্ণার্ত গলায় পানি নামার সময় তার কণ্ঠমণি ওঠানামা করছিল সমানে।এক ফোঁটা জলধারা গড়িয়ে পড়ল কলারবোন বেয়ে—মুক্তোর মতো চিকচিক করছে।একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল এজে। শুকিয়ে এলো গলা। শক্ত করে স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে চেষ্টা করলো নিজেকে সংযত করতে। পরক্ষণেই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিল। নিমিষে ধোঁয়া উড়িয়ে সাই সাই করে ছুটে চলল গাড়ি।পেছনে ছায়ার মতো অনুসরণ করল কালো গাড়ির বহর।
আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে এক ছায়ার স্রোত বয়ে যাচ্ছে, আর নিচ থেকে যেন কোনো যুদ্ধের মিছিল।
মাত্র কয়েক মিনিটেই গাড়িটি এসে থামল এজের সেই বিলাসবহুল পেন্ট হাউজের সামনে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সিলভার আর স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি কোনো দুর্গ। গাড়ি আসতেই যান্ত্রিক শব্দে গেট খুলে গেল। দুপাশে কালো পোশাকে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে স্নাইপার হাতে নিপুণ সব গার্ড।
গাড়ি থেকে নেমে কোলে তুলে নিল এজে অজ্ঞান রমনীকে। বড় বড় পায়ে এগিয়ে গেল এলিভেটরের দিকে। নির্দিষ্ট ফ্লোরে থামতেই বেরিয়ে এলো। রুমের সামনে আঙুলের ছাপ দিতেই খুলে গেল দড়জা—এই ঘরে প্রবেশের অনুমতি একমাত্র তারই।
নরম মখমলে মোড়া সাদা বিছানায় যত্ন করে শুইয়ে দিল রমণীকে। গায়ে জড়িয়ে দিল কম্ফোর্টার। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখটা ফ্যাকাশে, নিঃশ্বাস অগোছালো। এজে ধীরে কপাল ছুঁয়ে দেখল—জ্বর নেই, কিন্তু শরীর নিঃশেষ।
ডাক্তার ড্রেভেন কে তুলে আনা হয়েছে গার্ডস্ দিয়ে। লোকটার পরনে ঢিলেঢালা নাইট স্যুট—চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তি আর আতঙ্ক। সারাদিন হাসপাতালের খাঁটাখুটনির পর রাতে একটু শান্তির ঘুমে ছিল বেচারা। ঠিক তখনই কয়েকজন কালো পোশাকধারী নির্দয় গার্ড এসে তুলে নিয়ে আসে তাকে। বসের অর্ডার অমান্য করার সাহস নেই কারোর—অকালে প্রাণ ঝরাতে চায় না তারা।
ড্রেভেন মূলত এজের ব্যক্তিগত ডাক্তার। তাই যখনই ডাকা পড়ে, নিরুপায় হয়ে আসতেই হয়। কোন পাপের ফল ভোগ করছে সে—এই সাইকো ছেলের পাল্লায় পড়ে—তা স্বয়ং আল্লাহই ভালো জানেন!
ইতোমধ্যে দু’জন মহিলা সার্ভেন্ট এসে ফ্রেশ করিয়ে পোশাক পাল্টে দিয়েছে তরুণীর। ড্রেভেন চেকআপ করে কিছু ওষুধ লিখে দেয়। চেকআপের সময় এজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সরছিল না। নিজের ফায়ারফ্লাইয়ের ক্ষতে অন্য কোনো পুরুষের হাতের স্পর্শ সহ্য করতে পারে না—ডাক্তারের হাত হলেও না। তাই ড্রেসিং আর ব্যান্ডেজ করার কাজটি মহিলা সার্ভেন্টদের দিয়েই করালো সে।ড্রেভেন চেকআপ শেষ করে একটি স্যালাইন পুশ করলেন।
“না খেয়ে থাকার কারণে শরীর একদম দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার ওপর অতিরিক্ত স্ট্রেস আর চিন্তার দরুন ব্লাড প্রেসার অনেকটাই ফল করেছে। আমি স্যালাইন লাগিয়ে দিয়েছি, আশা করছি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জ্ঞান ফিরবে। তবে নিয়মিত খাবার আর বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে।”
কথাগুলো শেষ করেই ড্রেভেন দ্রুত পা বাড়ালেন প্রস্থানের দিকে। ব্যাগটা গুছিয়ে তিনি যেন এই অভিশপ্ত পেন্ট হাউজ থেকে পালাতে পারলেই বাঁচেন!
জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে সেই বন্ধ কক্ষেই আবিষ্কার করল তরুণী। মুহূর্তেই রাগে মাথার রগগুলো টনটন করে উঠল। শ্বাস ভারী হয়ে এলো। এক ঝটকায় উঠে বসল সে। পরক্ষণেই বিছানার চাদর ছুড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে পড়ল বিছানার পাশে।
হাতের ক্যানুলায় টান লাগতেই ফিকনি দিয়ে সরু ধারা বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল টকটকে লাল রক্ত। কিন্তু সেই শারিরীক যন্ত্রণা তার ভেতরের মানসিক দহনের কাছে কিছুই নয়। চোখে আগুনের ঝিলিক, ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে সে—ঠিক যেন ভেতরে জমে থাকা আগ্নেয়গিরি এখনই ফেটে পড়বে।
ঠিক তখনই আতঙ্কিত হয়ে ছুটে এল দু’জন মহিলা সার্ভেন্ট।
“ম্যাম শান্ত হন প্লিজ! আপনি এভাবে হাইপার হলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়বেন।”
দুজন সার্ভেন্টদের মধ্যে কাঁপা গলায় বলল একজন। অন্য একজন যোগ করলো তার সাথে।
“স্যার যদি জানতে পারেন, আপনি ক্যানুলা খুলে এভাবে রক্তারক্তি করেছন, তাহলে আমাদের আর রক্ষে থাকবে না!”
‘স্যার’- শব্দটা যেন আগুনে ঘি ঢাললো।তারপর ওই শুরু হলো তান্ডব।
একেরপর এক আসবাবপত্র ছুড়ে ফেলতে লাগল সে। কাঁচের টি-টেবিল আছড়ে পড়ে মুহূর্তেই চুরমার। নামি-দামি শোপিসগুলো দেয়ালে ছিটকে ভেঙে পড়ছে। ড্রেসিং টেবিল উল্টে গেল। স্যামসাংয়ের বিশাল এলইডি টিভি বিকট শব্দে আছড়ে পড়ল মেঝেতে। ফুলদানিগুলো ভাঙার শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।
ঝং ঝং শব্দে ভরে গেল ঘর।
বইয়ের তাক থেকে একে একে সব বই ছুড়ে ফেলল সে—পাতাগুলো বাতাসে উড়ে ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। দেয়ালে ঝোলানো সব নামিদামি পেইন্টিং ছিঁড়ে ছুড়ে ফেলল নির্দয়ভাবে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো ঘরটা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো।তবুও রাগ কমল না।একটুও না।
ভয়ে দু’জন মহিলা সার্ভেন্টই প্রায় অবসন্ন। কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না কেউ। শুধু দূরে দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎই—
“আআআআআ… আ… হা… হা… হা…!”
চিৎকার করে, অসহায় কান্নায় ভেঙে পড়ে মেঝেতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল তরুণী। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। কান্নায় বুক ফেটে আসছে তার। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। পুরো শরীর কাঁপছে।দু’জন সার্ভেন্ট মিলেও তাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
হঠাৎ নিচ থেকে ভাঙা কাঁচের একটি টুকরো তুলে নিল সে। এক হাত দিয়ে অন্য হাতের শিরার ওপর ধরে ফোঁস করে বলে উঠল,
“দূরে থাকো তোমরা! ক-কাছে আসবে না আমার। নইলে নিজেকেই শেষ করে দেব আমি!”
এই দৃশ্য দেখে ভয়ে জমে গেল মহিলা সার্ভেন্ট দুজন।যদি এই মেয়ের কিছু হয়—তাহলে তাদের পরিণতি কী হবে, তা খুব ভালো করেই জানে তারা। তাদের স্যার কাউকে মারে না—সে শিকারকে হিংস্র জানোয়ারের মতো ধীরে ধীরে খুবলে, ছিঁড়ে শেষ করে।
একজন মহিলা সার্ভেন্ট আতঙ্কে দৌড়ে গিয়ে খবর জানালো গার্ডদের।পরিস্থিতি বেগতিক দেখে একজন গার্ড দ্রুত সংকেত পাঠাল বসের কাছে, অন্যজন কামরায় ঢুকে তরুণীর হাত চেপে আটকানো চেষ্টা করল।টানাহেঁচড়ার এক পর্যায়ে ভাঙা কাঁচের টুকরোর ঘর্ষণে কেটে গেল হাত। সরুধারা বেয়ে গড়িয়ে পড়ল সামান্য রক্ত।
ঠিক সেই মুহূর্তেই—
ঘরের দরজায় আবির্ভাব হলো এজের।
প্রথম দৃষ্টিটাই গিয়ে আটকে গেল গার্ডটির হাতে—যে হাত দিয়ে সে তার ফায়ারফ্লাইয়ের বাহু আঁকড়ে ধরে আছে। আর পরের মুহূর্তেই চোখে পড়ল… তার ফায়ারফ্লাইয়ের হাতে রক্ত।ব্যস!….
মাথায় যেন রক্ত উঠে গেল এজের। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যেই টকটকে রক্তিম বর্ণ ধারণ করল—জ্বলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো।
“লিভ…!!!!!”
তীক্ষ্ণ এক চিৎকার।
“I said—just leave her!!”
বসের সেই বজ্রকঠিন গর্জন শোনার সাথে সাথে গার্ডটি আঙ্গুল আলগা হয়ে গেল। তড়িৎবেগে হাত ছেড়ে দিল তরুণীর। এজে রক্তিম চোখে একবার সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ হাড়হিম করা গলায় বলল,
“এভরিওয়ান লিভ দ্য রুম!……..”
কণ্ঠটা শান্ত। আশ্চর্য রকম শান্ত।কিন্তু সেই শান্ততাই যেন হৃদয় কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ভয়ংকর।এক সেকেন্ডও দেরি করল না কেউ। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল সবাই।
ঘরজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঁচ, চুরমার শোপিস, উল্টে পড়া আসবাবপত্র। বিছানার চাদর এলোমেলো। চারপাশে ধ্বংসস্তূপ। সেসবে একবার চোখ বুলাল এজে।উফ্… এত তেজ তার ফায়ারফ্লাইয়ের! এতো আগুন,এই জন্যই তো এই মেয়েটার জন্য পাগল সে।
আকস্মিক কোনো সতর্কতা না দিয়েই এগিয়ে এসে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল তার ফায়ারফ্লাইকে।ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে এজের শক্ত বাহুডোরে আবিষ্কার করল তরুণী।মুহূর্তেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। পরক্ষণেই শুরু হলো হাত-পা ছোড়াছুড়ি—কোল থেকে নামার মরিয়া চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠলো সে।
এজে নির্বিকার।উপায় না পেয়ে সে পিঠে একের পর এক কিল-ঘুষি মারতে লাগল। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তখন শেষ অস্ত্র হিসেবে দাঁত বসিয়ে দিল লোকটার ঘাড়ে। সমস্ত শক্তি দিয়ে কামড়। যন্ত্রণায় চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিল এজে।মুখ দিয়ে একটা ‘উঃ’ পর্যন্ত বেরোল না। এমন এইট-প্যাক অ্যাবসওয়ালা বডি বিল্ডারের কাছে নিতান্তই চুনোপুঁটি সে।শেষমেষ ক্লান্ত হয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে নেতিয়ে পড়ল এজের বক্ষভাজে। নিঃশ্বাস ভারী, শরীর নিস্তেজ।এজের ঠোঁটের কোণে খেলল রহস্যময় এক বাঁকা হাসি।
“এত তাড়াতাড়ি শক্তি শেষ, সুইটহার্ট?”
কণ্ঠে মেশানো কৌতুক। ফোঁস করে উঠলো তরুণী।ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে তাকে বিছানায় বসাল এজে। নিজে তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ফ্লোরে। অস্থির ভঙ্গিতে কাটা হাতটা নিয়ে নিল নিজের মুঠোর ভেতর।
“ইশশ… কতটা কেটে গেছে! রক্ত পড়ছে তো… খুব ব্যথা করছে, তাই না? দেখি… এক্ষুনি সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি… আমি ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি, দেখবে একটুও কষ্ট হবে না তোমার।”
কথা শেষ করেই প্রায় পাগলের মতো ড্রয়ার হাতড়ে, ফার্স্ট এইড বক্স বের করে এনে, বসে পড়ল তার সামনে।চোখে-মুখে এমন এক অস্থিরতা, যেন ক্ষতটা মেয়েটির হাতে নয়, বরং তার নিজের কলিজায় লেগেছে।
“ছুঁবেন না আপনি আমাকে! আপনার ওই নোংরা হাত দিয়ে একদম স্পর্শ করবেন না আমায়। ঘৃণা করি আমি আপনাকে!!”
তীব্র ঘৃণায় চিৎকার করে উঠল মেয়েটি।
“আই নো। বাট আই ডোন্ট কেয়ার। হেইট মি এজ মাচ এজ ইউ ক্যান! তুমি যতো বেশি ঘৃণা করবে আমি তোমার মনে ততো বেশি বিস্তার করবো। আর মনে রেখো, ঘৃণা হোক বা অন্য কিছু; দিনশেষে এই আমার কাছেই থাকতে হবে তোমায়।”
“কিছুতেই না!!! ছাড়ুন আমাকে! থাকবো না আমি এখানে।……”
হাত সরিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল সে।মুহূর্তেই এজের পেশিবহুল চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে চায় না তার‘ফায়ারফ্লাই’-এর সামনে নিজের ভেতরের দানবটাকে পুরোপুরি উন্মোচন করতে।গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করলো সে।প্রচণ্ড কষ্টে রাগ সংবরণ করে দাঁতে দাঁত চেপে নিম্নস্বরে বলল,
“ভালো আছি, ভালো থাকতে দাও। আমাকে কি খুব ভালো মানুষ মনে হয় তোমার?”
“জানোয়ার!…… আপনি একটা মানুষরূপী জানোয়ার!”
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠল তরুণী।মুখে ক্রোধের ছাপ স্পষ্ট।ঘন ঘন নিঃশ্বাসে বুক ওঠানামা করছে। চোখে আগুনের ঝিলিক। যেন এই দৃষ্টিতেই ভস্ম করে দিবে যুবকের সর্বস্ব।
হঠাৎই কিটকিটিয়ে, উচ্চস্বরে হেসে উঠল এজে।
ভয়ানক… অস্বস্তিকর… বিশ্রী এক হাসি।অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবকের হাসি যে এতটা বীভৎস আর ভয়ংকর হতে পারে, তা কল্পনা করাও কঠিন। হাসতে হাসতেই সে মুখটা এগিয়ে নিয়ে এল তরুণীর খুব কাছে।
“উহু! ইউ আর রং বার্বিডল। জানোয়ার নয়, আমি তার চেয়েও ভয়ংকর এক হিংস্র হায়েনা। তুমি জানো বিজ্ঞানের রিসার্চ কী বলে? পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র আর নিকৃষ্টতম প্রাণী হলো মানুষ। মানুষের এই হিংস্রতা বনের পশুর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ক্ষতরনাক। আর আমি…?”
এজের ঠোঁটে সেই রহস্যময় বাঁকা হাসিটা আবার ফিরে এল। সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি খারাপ, প্রচণ্ড লেভেলের ব্যাড বয়—তোমার ধারণারও বাইরে। তাই বলছি, আমাকে রাগিও না ফায়ারফ্লাই। কারণ আমি নিয়ন্ত্রণ হারালে কিন্তু…… তোমারই খারাপ হবে। তাই এখন চুপচাপ লক্ষ্মী মেয়ের মতো আমাকে আমার কাজ করতে দাও।”
“বারবার এই সব অদ্ভুত নামে কেন ডাকেন আমায়?”
তীব্র ঘৃণায় প্রতিবাদ করে উঠলো তরুণী।
“রিম… রাত্রিয়ানা সিদ্দিকী রিম, এটাই আমার প্রকৃত নাম, বুঝতে পেরেছেন? আপনার ওসব ডাক অসহ্য লাগে আমার।”
এজে তখনো নিপুণ হাতে রিমের ক্ষতে ব্যান্ডেজ বাঁধছে। মুখ না তুলেই শান্ত অথচ পাথুরে গলায় জবাব দিল সে, “জানি। কিন্তু আমার কাছে তুমি চিরকাল আমার ‘ফায়ারফ্লাই’ হয়েই থাকবে। আমার সারাজীবনের বন্দিনী। এখান থেকে পালানোর কোনো পথ তোমার নেই, বার্বিডল।”
“কোনো দিনও না! থাকবো না আমি আপনার কাছে।….”
রিমের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। প্রথমে তেজী গলায় চিৎকার করলেও ধীরে ধীরে তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এল,
“কেন বন্দি করে রেখেছেন আপনি আমাকে? কি ক্ষতি করেছি আমি আপনার?কি চান আপনি আমার কাছে?”
এবার স্থির দৃষ্টিতে রিমের চোখের দিকে তাকাল এজে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“তোমাকে। তোমাকে চাই আমি। তোমার একটাই দোষ—তুমি আমার এই অন্ধকার জীবনে অনাহুতভাবে প্রবেশ করেছ। আর আমার দুনিয়ায় একবার যখন ঢুকে পড়েছো, মৃত্যু ছাড়া আজীবন মুক্তি নেই তোমার।”
রিম তার চোখের পানি মুছে জেদি গলায় বলল, “আপনার এই ধারণা আমি ভুল প্রমাণ করবই। একদিন ঠিক এখান থেকে বের হব আমি, আর সেদিন আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আসবে… কেউ একজন ঠিক আসবে, যে আমাকে আপনার এই নরক থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে।”
কথাটা শোনামাত্রই এজের মুখে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে রিমের একদম কাছে মুখ নিয়ে এল, তার তপ্ত নিঃশ্বাস রিমের কপালে বিঁধছে।
“তাই? সেই আশা তোমার স্বপ্নই রয়ে যাবে।মানুষ তো দূরের কথা, স্বয়ং স্রষ্টা ছাড়া আর কারো সাধ্য নেই তোমাকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার। আর যদি প্রয়োজন পড়ে…”
এজে থামল, তার চোখে তখন এক ঘোরগ্রস্ত উন্মাদনা। সে ফিসফিস করে বললো,
“দরকার পড়লে আমি সেই স্রষ্টার কাছ থেকেও চেয়ে আনব তোমায়। কারণ তুমি আমার। আমার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে তোমাকে।”
বাংলাদেশ, ঢাকা
“স্যার মেয়েটির খোঁজ পাওয়া গেছে।”
সবে মাত্র স্টেজে পারফর্ম করতে উঠেছে যুবক।চারিদিকে হাজার হাজার মানুষের গগনবিদারী চিৎকার। কনসার্ট গ্রাউন্ডের প্রতিটি কোণ থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটিই নাম—
“RJ… RJ… RJ!”
স্টেজের বিশাল স্ক্রিনে নিওন আলোয় জ্বলজ্বল করছে নামটা: ঋষাভ জাওয়াদ। গিটারের প্রথম তারে আঙুল ছোঁয়াতেই উন্মাদনা যেন বাঁধ ভেঙে গেল। হাজারো তরুণী ডেসপারেট হয়ে চিৎকার করছে,
“আই লাভ ইউ আরজে!”
কেউ কেউ সিকিউরিটির ব্যারিকেড ভেঙে স্টেজে ওঠার চেষ্টা করছে, তাদের চোখেমুখে প্রিয় তারকাকে একবার ছোঁয়ার তীব্র ব্যাকুলতা।
কিন্তু এই বিপুল উন্মাদনা, এই আলোর রোশনাই—কিছুই যেন স্পর্শ করছিল না ঋষাভকে। তার কানের ইন-ইয়ার মনিটরে তখন গিটারের সুর নয়, বরং দেহরক্ষীর বলা সেই একটি বাক্য আছড়ে পড়ছে বারবার।
মুহূর্তের জন্য ঋষাভের হাত থমকে গেল গিটারের ওপর। স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। সে কি ঠিক শুনল? যাকে পাওয়ার জন্য গত কয়েকটা মাস সে নরক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে, যাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছে দেশ থেকে দেশান্তরে, সেই মায়াবিনী তবে কি সত্যিই ধরা দিল?
তার নিয়োগ করা টপ-লেভেল স্পাই, ইনফর্মার—সবাই যেখানে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছিল।কেমন যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল সেই মায়াবিনী। কতগুলো নির্ঘুম রাত সে কাটিয়েছে শুধু ওই এক জোড়া চোখের মায়ায় পড়ে, তার হিসেব নেই।
কিন্তু তার মনে বিশ্বাস ছিল একদিন সে তার মায়াবিনিকে ঠিক খুঁজে বের করতে পারবে।ঋষাভ বুক ভরে একবার শ্বাস নিল। তার বিশ্বাস তাহলে মিথ্যে ছিল না। সে সত্যিই খুঁজে পেয়েছে তার মায়াবিনী কে। ভিড়ের দিকে চেয়েও সে যেন কাউকে দেখছে না; তার চোখের সামনে তখন কেবল ভেসে উঠছে সেই চেনা মুখটা।
হাতের গিটারটা অবহেলায় স্টেজের ওপর রেখে এক মুহূর্ত দেরি না করে নিচে নেমে এল ঋষাভ। মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল কনসার্টের সুর। হাজার হাজার দর্শক যারা এতক্ষণ উন্মাদনায় ভাসছিল, তারা হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। পরক্ষণেই শুরু হলো তীব্র গুঞ্জন। গান শুরু না করেই আরজে-র এভাবে স্টেজ ছেড়ে চলে যাওয়াটা কেউ মেনে নিতে পারছে না। চারপাশ থেকে ক্ষোভের চিৎকার আর গালিগালাজ ভেসে আসতে লাগল। ক্ষুব্ধ দর্শকরা স্টেজ লক্ষ্য করে জলের বোতল আর ঢিল ছুড়তে শুরু করল।
পেছনে ফেলে আসা সেই পরিস্থিতির দিকে একবার ফিরেও তাকাল না ঋষাভ। তার লক্ষ্য এখন স্থির। গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই সে চিৎকার করে উঠল,
“গেট দ্য কার রেডি, মাহিন!”
পিছন থেকে ছুটতে ছুটতে মাহিন আর্তনাদ করে উঠল, “কিন্তু স্যার! এভাবে মাঝপথে চলে গেলে আমাদের বিশাল বড় লস হয়ে যাবে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে এই শো আয়োজন করা হয়েছে। অর্গানাইজাররা তো প্রায় হুমকি দেওয়া শুরু করেছে! আর ফ্যানদের অবস্থা দেখছেন? ওরা পুরো ভেন্যু তছনছ করে দিচ্ছে!”
ঋষাভ গাড়ির দরজা টেনে ধরল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন এক ভয়ংকর শীতলতা। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,
“ডু ইউ থিংক আই হ্যাভ অ্যানি কনসার্ন অ্যাবাউট দিস? চেক বই বের করো আর ওদের মুখের ওপর ছুড়ে মারো। যত টাকা ক্ষতি হয়েছে, তার দ্বিগুণ অ্যামাউন্ট দিয়ে মুখ বন্ধ করো সবার!”
“কিন্তু স্যার এটা তো কোনো…….”
আরও কিছু বলতে চেয়েছিল মাহিন।কিন্তু ঋষাভের রক্তবর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো যেন তার গলাতেই আটকে গেল। সে জানে, এই মুহূর্তে ঋষাভ জাওয়াদ কোনো যুক্তি বা নিয়মের ধার ধারে না। মাহিন আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল।
পেছনের সিটে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল জাদ—ঋষাভের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং দক্ষ স্পাই।তার থেকে শুনেই তখন ঋষাভকে খবরটা দিয়েছিল মাহিন। মাহিন যখন গাড়ি স্টার্ট করতেই, নীরবতা ভাঙল জাদ।
“আমার একজন সহচর স্পাই, এলবো, কাল রাতে মেয়েটার লোকেশন ট্রেস করতে পেরেছে। সে এখন এখানে নেই স্যার… সে ইতালিতে।”
ঋষাভের কুঁচকানো ভ্রু আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জাদের দিকে নিবদ্ধ হলো। জাদ বলতে থাকল,
“ইতালির এক নির্জন জঙ্গলের ভেতরে কোনো এক গোপন ডেরায় আছে মেয়েটি।”
“ইতালি………”
অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে নামটা বিড়বিড়ালো ঋষাভ। গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে, মাহিনের দিকে না তাকিয়েই হুকুমের সুরে বলল,
“ফ্লাইট বুক করো মাহিন। উই আর গোয়িং টু ইতালি। নাও…….”
ইতালি, ক্যালাব্রিয়া অঞ্চল
পেন্টহাউজের নিস্তব্ধ কক্ষে এজে এখন সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মানুষ। রিমের সামনের ফ্লোরে বসে সে অত্যন্ত যত্ন সহকারে ব্যান্ডেজ শেষ করল। তার আঙুলের স্পর্শ এতটাই কোমল, এতটাই আদুরে, যেন কোনো সদ্য ফোটা পাঁপড়ি ছুঁয়ে দিচ্ছে সে—একটু অযত্ন হলেই বুঝি ঝরে পড়বে। চেহারার অস্থিরতা জানান দিচ্ছে, নিজের ‘ফায়ারফ্লাই’-এর সামান্যতম ব্যথায় যেন কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে এজের। রিম পাথর হয়ে বসে সব দেখছে। তর্কে জড়ানোর মতো শারীরিক বা মানসিক শক্তি তার অবশিষ্ট নেই, তাই অবশ হয়ে সে এজের কার্যক্রম অবলোকন করতে লাগল।
ব্যান্ডেজ শেষ করে এজে ওয়াকিটকিতে মেইডকে কিছু নির্দেশ দিল।কিছুক্ষণের মধ্যেই এক মেইড সামান্য খাবার নিয়ে আসে। এজে নিজ হাতে এক লোকমা তুলে ধরে রিমের মুখের সামনে। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো মেয়েটা।তার দ্রুতগামী নিঃশ্বাসে বুকের ভেতরটা ওঠানামা করছে। এজে অত্যন্ত শান্ত গলায় ফিসফিস করে বললো,
“চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতো খাবারগুলো খেয়ে নাও। এগুলো খেয়ে ওষুধ খেতে হবে তোমাকে। না খেলে সুস্থ হবে কী করে? আর তুমি যদি সুস্থ না হও, তবে আমার সাথে পাল্লা দিয়ে ঝগড়াটাই বা করবে কীভাবে?”
“খাবো না আমি! চলে যান আপনি এখান থেকে, অসহ্য লাগছে আপনাকে!”
ফোঁস করে কথাটা বলে উঠলো রিম।এজের কপালের রগটা একবার দপ করে উঠল। লোকমার হাতটা নামিয়ে সে স্থির চোখে তাকাল রিমের দিকে। কণ্ঠস্বর একটু নিচু করে বলল,
“উফ্! কেন বারবার রাগাতে চাইছে তুমি আমাকে?নিজের মা আর বোনের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি?”
মা আর বোনের নাম শোনামাত্রই রিম যেন বিদ্যুতস্পৃষ্ট হলো।ঝটকা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।
“আপনি!… আপনি সত্যিই একটা জানোয়ার!
“জানি। সেটা নতুন কিছু নয়।”
এজে নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার লোকমাটা তুলে ধরল।
“এখন জানোয়ারের হাত থেকেই চুপচাপ খেয়ে নাও।”
“আমার হাত আছে।”
দাঁতে দাঁত চেপে বলে রিম।
“আমি নিজের হাতেই খেতে পারবো। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।”
“তোমার হাতে জখম। নাড়াচাড়া করলে ব্যথা পাবে তুমি।”
“বললাম তো আমি পারব….”
“উহু আর একটাও কথা নয়………”
অগত্যা, নিরুপায় হয়েই জানোয়ারটার হাতে খাবার খেয়ে নিল রিম। প্রতিটা লোকমাই যেন গলার ভেতর কাঁটার মতো বিঁধছিল।তিক্ত ওষুধের স্বাদ ছাপিয়ে তার কাছে এজের সঙ্গ বেশি তেতো মনে হচ্ছিল।খাবার শেষ হতে না হতেই এজে অত্যন্ত সযত্নে রিমকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গায়ে কম্ফোর্টার মুড়িয়ে দিল। রিম চোখ বন্ধ করে রইল, যেন তাকিয়ে ওই মুখটা দেখাও এক মহাপাপ।
কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল সে।নিস্তেজ মুখটা, ধীরে ওঠানামা করা বুক, আধখানা বন্ধ চোখ—সবকিছুই এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগিয়ে তুলল তার ভেতরে। হাত বাড়িয়ে কপালের ওপর একমুঠো চুল সরিয়ে দিল। খুব হালকা স্পর্শ।তারপর কিছু না বলেই ঘুরে দাঁড়াল।ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় আঙুলের ছাপ দিয়ে লক করে দিল পাসওয়ার্ড।
গত চব্বিশ ঘণ্টায় তার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে।শরীর ভীষণ ক্লান্ত, একটু বিশ্রাম চাইছে প্রতিটি কোষ।কিন্তু… তার আগে একটা জরুরী কাজ বাকি।……..
অন্ধকার বদ্ধ কক্ষে জ্বলছে মৃদু হলদেটে আলোর একটি ম্লান শিখা। সেই আলো-আঁধারির মাঝে একটি কাঠের চেয়ারে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে কালো পোশাকধারী এক গার্ড। তার হাত-পা শক্ত করে শৃঙ্খলিত। মুখে সাদা কাপড় দিয়ে গোঁজা।
তার ঠিক কয়েক হাত দূরে একটি বিলাসবহুল ডিভানে আয়েশী ভঙ্গিতে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে যুবক। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে নিঃসৃত হচ্ছে সিগারেটের ধোঁয়ার স্মুদ কুণ্ডলী। যাতে কোনো ঝাঁঝালো গন্ধ নেই। আছে এক অদ্ভুত সুগন্ধি। তার এক হাতে Elf Bar-এর ব্লু রাজ লেমোনেড ফ্লেভারের একটি ইলেকট্রিক সিগারেট। রাসবেরি আর লেবুর টক-মিষ্টি ফ্লেভার যেন এই মৃত্যুপুরীতেও তাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিচ্ছে।এই মুহূর্তে তার চোখে কোনো তাড়া নেই, নেই কোনো উত্তেজনা—শুধু ঠান্ডা নির্লিপ্ততা।
চেয়ারে বাঁধা লোকটি মুক্তির নেশায় পাগলের মতো ছটফট করছে।দড়ির টানে হাত-পা ব্যথায় জ্বলে উঠছে। মুখ থেকে বেরোচ্ছে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ। সে কিছু বলতে চাইছে—কিন্তু বাঁধা কাপড়ে সব শব্দ আটকে যাচ্ছে।
হঠাৎ যুবকটি আঙুলের সামান্য ইশারা করল।সঙ্গে সঙ্গে একজন গার্ড এগিয়ে এলো। লোকটির মুখের কাপড় খুলে দেওয়া হলো।লোকটা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। একের পর এক গভীর শ্বাস টানল। বুক হাঁপাচ্ছে। চোখ ভিজে উঠেছে। শেষবারের মতো বাঁচার আশায় কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
“আ-আমার ভুল হয়ে গেছে, স্যার। আমি ইচ্ছা করে কিছু করিনি। আমি তো শুধু মেয়েটাকে থামাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু টানাহেঁচড়ার মাঝে ভু-ভুলবশত… মেয়েটির হাত কেটে গেছে।…. আমি জানতাম না এমনটা হবে।”
এত বড় আকুতিতেও নির্দয় যুবকের পাষাণ হৃদয়ে সামান্যতম কম্পন সৃষ্টি হলো না। সে তখনো নির্বিকার, ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে সেই ইলেকট্রিক সিগারেট।
“আমাকে আরেকবার সুযোগ দিন প্লিজ স্যার! আর কখনো এমন ভুল হবে না… আমি আপনার পায়ে ধরছি।”
এতক্ষণে মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়ল যুবক। ধোঁয়ার আড়াল থেকে তার চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলে উঠল। শান্ত কিন্তু হিমশীতল কণ্ঠে সে জবাব দিল,
“সুযোগ? হাহ্! আই হেইট দিস ওয়ার্ড। আমার কাছে’দ্বিতীয় সুযোগ’ বলে কোনো শব্দ নেই, আর না আছে ভুলের কোনো ক্ষমা। তোদের আমি বারবার সাবধান করেছিলাম—যেন আমার ফায়ারফ্লাইয়ের গায়ে সামান্যতম আঁচড়টুকুও না লাগে।”
এক মুহূর্ত থেমে, ধীরে বলে উঠল,
“আর তুই কী করলি?”
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার।
“তোর অপবিত্র হাতের ছোঁয়ায় আজ আমার ফায়ারফ্লাইয়ের শরীর থেকে রক্ত ঝরেছে। হাউ ডেয়ার ইউ টাচ হার! তোর সাহস কি করে হলো ওকে স্পর্শ করার… ইউ বা*স্টার্ড!”
দরদর করে শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাম ঝরছে লোকটার। সে জানে—এখন আর হাজারবার অনুনয় করেও কোনো লাভ নেই। তার বস কখনো কাউকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়নি। আজও দেবে না।মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।
“আজ তোর শরীরের মাংস কেটে ট্রেজানকে খাওয়াবো আমি। মানুষের টাটকা মাংস বড্ডপ্রিয় ওর।”
শান্ত কন্ঠ যুবকের। কিন্তু লোকটার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। লোকটার শরীর কেঁপে ওঠে।
ট্রেজান, এজের পোষা বেঙ্গল টাইগার। মানুষ খেকো হিংস্র এ প্রাণী অন্য সকলের জন্য প্রাণঘাতী আর হিংস্র হলেও এজের কাছে বড় প্রিয় সে। যেন নিষ্পাপ এক পোষা বিড়াল ছানা। বড় আদরের। আর সকলের কাছে ভয়ংকর হলেও এজের সব কথা শুনে লক্ষ্মী বাচ্চার মত।
“মাত্তেও,”
কণ্ঠে একফোঁটাও আবেগ নেই।
“জি, ভাই।”
মাত্তেও এজের সকল কাজের দায়িত্ব পালন করে। সব সময় তার আশেপাশে থাকে।এক কথায় বলতে গেলে এজের ডান হাত সে। শুধু সেই নয় আরো একজন আছে ,এলেনা..! তারা দুজনেই বহু বছর ধরে রয়েছে এজের সাথে।
“আই ওয়ান্ট মাই টুলস……..”
কথাটা কর্ণপাত হতেই অজানা ভয় গ্রাস করল লোকটিকে। বুকের ভিতর ধ্বনিত হচ্ছে তীব্র ধুকপুকানির শব্দ।
মাত্তেও ধীরে করে টেবিলের ওপর ধাতব ব্রিফকেসটা রাখে। ঢাকনা খুলতেই ভেতরের ঠান্ডা ঝিলিক আলোয় ঝলসে ওঠে। সেখানে রয়েছে জীবন্ত বিভীষিকা – প্লায়ার্স, হাতুড়ি, স্ক্রু-ড্রাইভার তীক্ষ্ণ নাইফ ও আরো ধারালো সব নাম না জানা অস্ত্র। এজে সেখান থেকে একটি ভারী প্লায়ার্স তুলে নিল।তারপর—
কক্ষটা কেঁপে ওঠে আর্তনাদে। চোখের পলকে এক ঝটকায় উপড়ে ফেলল লোকটির হাতের একটি নখ!
লোকটির বীভৎস চিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল। আশেপাশে থাকা নিশাচর পাখিরাও ভয়ে ডানা ঝাপটিয়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু এজের মুখে তখন এক স্বর্গীয় তৃপ্তির হাসি—ঠিক যেমন কোনো শিশু তার কাঙ্ক্ষিত খেলনা পেলে খুশি হয়। একে একে লোকটির দশটি নখ উপড়ে ফেলল সে। এরপর হাতে নিল একটি অতি সূক্ষ্ম আর চকচকে সার্জিক্যাল নাইফ। এতটাই ধারালো যে, তাতে এজের নিজের মুখের ছায়া দেখা যাচ্ছে। সেই ছুরি দিয়ে আলতো করে চিরে টেনে তুলে আনল লোকটির হাতের চামড়া।বেজমেন্ট জুড়ে আবার সেই আর্তনাদ। কিন্তু এজে তখন রক্তের নেশায় উন্মাদ।
“চিৎকার কর! আরো বেশি চিৎকার কর। তুই যত বেশি চিৎকার করবি আমি তত বেশি আনন্দ পাবো। ভিক্টিমের মুখে যত বেশি ভয় থাকে সে যত বেশি ছটফট করে ততটাই আনন্দ পাই আমি। আরো জোরে চিৎকার কর তুই। আই ওয়ান্ট সাম মোর ইনজয়মেন্ট।”
বলেই সে একেরপর এক পাগলের মতো ছুরিকাঘাত করতে লাগল লোকটির চামড়াবিহীন লাল রক্তিম মাংসে। এরপর এক মুঠো লবণ আর মরিচের গুঁড়ো নিয়ে চেপে ধরল সেই দগদগে ক্ষতের ওপর। অসহ্য যন্ত্রণায় গায়ের রগগুলো ফুলে উঠল লোকটির,নীল হয়ে এলো মুখাবয়ব। চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে রক্ত। এই যন্ত্রণা সে আর সহ্য করতে পারছে না।
“আমাকে মেরে ফেলুন স্যার। মেরে ফেলুন আমাকে।আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এর থেকে মৃত্যু যন্ত্রণা অনেক বেশি সুখের হবে আমার জন্য।”
এজে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করলো,
“সেটাইতো পাবি না তুই। আমি চাই তুই প্রতি সেকেন্ডে নরকের স্বাদ পা। চিৎকার কর আরো জোরে।তোর চিৎকার মিউজিকের মতো বাজছে আমার কানে।”
চটজলদি পাশে থাকা বন্দুকটি হাতে তুলে নিজের মাথায় তাক করলো লোকটি। ‘ক্লিক!’ ট্রিগার টিপল সে… কিন্তু একি বন্দুক তো সম্পূর্ণ ফাঁকা বুলেট বিহীন। তীব্র ভয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো লোকটি। হাড়হিম করা ভয়ানক এক হাসি ধ্বনিত হল কানে।
“হাউ সিল্লি ইউ বি*স্ট। তোর কি মনে হয় আমার হাত থেকে এত সহজে বেঁচে যাবি তুই। এই খেলা এতো সহজেই শেষ হয়ে যাবে? কখনোই না। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার আত্মা শান্তি পাচ্ছে!”
রক্তাক্ত সেই কক্ষের গুমোট বাতাসে এখন মৃত্যুর গন্ধ। এজে এবার হাতে তুলে নিল একটি কাঁচের পাত্র, যার ভেতরে টলটল করছে স্বচ্ছ কিন্তু প্রাণঘাতী হাইড্রোফ্লোরিক এসিড। এই রাসায়নিকের এক ফোঁটা মানেই দেহের ভেতর নিঃশব্দ প্রলয়। এটি সাধারণ এসিডের মতো ত্বক পুড়িয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং মাংস ভেদ করে সরাসরি হাড়ের ক্যালসিয়াম গ্রাস করতে শুরু করে। এটি কোনো মানুষের ওপর প্রয়োগ করা মানে তাকে জীবন্ত গলিয়ে ফেলা—যা আইনত দণ্ডনীয় তো বটেই, মানবিকতার চরম অবমাননা।
এজে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে এসিডের কয়েক ফোঁটা লোকটির ক্ষতবিক্ষত হাতের ওপর ঢেলে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই সেই তরল হাড়ের গহীনে পৌঁছে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করল। হাড়গুলো যেন মোমের মতো গলতে শুরু করেছে। তীব্র যন্ত্রণায় লোকটির মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না; তার স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে এসেছে, চিৎকার করার শক্তিটুকুও আজ নিঃশেষ। তার ঘোলাটে হয়ে আসা চোখে এখন কেবল একটিই প্রার্থনা—মৃত্যু।
নিজের কাজ সম্পন্ন করে তৃপ্তির সাথে উঠে দাঁড়ালো এজে।
“ব্রিং ট্রেজান। আজ ওর ফেভারিট স্ন্যাকস পাবে ও।”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১
কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো এজে। এবার ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নেবে।
কয়েক মুহূর্ত পরেই ভেতর থেকে ভেসে এল টাইগারের গম্ভীর আর ক্ষুধার্ত হুঙ্কার। বাঘের সেই গর্জনের সাথে মিশে গেল মানুষের শেষ এক করুণ আর্তনাদ। হাড় আর মাংস চিবানোর বীভৎস শব্দে ক্যালাব্রিয়ার আকাশ-বাতাস যেন কেঁপে উঠল। সেই শব্দ এতটাই ভয়ংকর যে পুরো অঞ্চল মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর… সব নীরব। সেই পৈশাচিক কোলাহল ছাপিয়ে আবার নেমে এল শুনশান নিস্তব্ধতা
