Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৮

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৮

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৮
রাত্রি মনি

“কিন্তু আমি তো চাইনি… ও আমাকে ভালোবাসুক। চাইনি ও আমায় মনে রাখুক। আমি চেয়েছিলাম ও আমাকে ঘৃণা করুক। নিজের জন্য ঘৃণা তৈরি করতে চেয়েছিলাম ওর মনে। তাই তো নিজেকে ওর সামনে সবসময় খারাপ ভাবে উপস্থাপন করছি।”

রোমের সকালটা যেন নতুন জীবনের সূচনা। মৃদু সোনালি রোদের আলো পুরনো পাথরের দেয়াল আর সরু রাসতাটা স্নিগ্ধ করে তোলে। বাতাসে মিষ্টি ফুলের গন্ধ ভাসছে, দূরে পাখিদের কাকলি শোনাচ্ছে। ছোট ক্যাফেগুলোয় কফির সুগন্ধ মিশে শহর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, যেন প্রতিটি কোণায় লুকানো থাকে এক নতুন গল্পের আভাস।
বিছানায় পড়ে ঘুমাচ্ছিল লিও । সারারাত মদ আর মেয়েদের সঙ্গে মেতে উঠেছিল সে, ভোরের দিকে ক্লান্ত শরীর টেনে নিজের বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে , তখনই ফোনটা কর্কশ সুরে বেজে উঠে। মনের মধ্যে বিরক্তির আগুন জ্বলে উঠে তার, ইচ্ছে করছে ফোনটা ছুড়ে ভেঙে দিতে। কিন্তু ফোনটা আবারো বেজে উঠে, সে অলস হাতে তুলে ধরে এক আছাড় মারতে যাচ্ছিলো।
তখনই স্ক্রিনে ঝলমল করে ওঠে বাবার নাম্বার। সে থমকে যায়, কানে ফোনটা ধরতেই একটা নরম, কিন্তু কাঁপানো গলায় একজন বডিগার্ড বলে ওঠে,

“স্যার, আপনার বাবা আর নেই। হি ইজ ডেড!”
মনের ভিতর একটাই অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরণের মতো রাগ। এই মৃত্যুর পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল তার সবচেয়ে বড় শত্রু, জেইন। বাবার মৃত্যু খবর শুনে লিওর মাথায় আগুন জ্বলে উঠে, চোখে অন্ধকার ঢুকে।
সে ফোনটা জোরে ফ্লোরে ছুড়ে মেরে দেয়, চুরমার হয়ে যায় সেই স্মার্ট ফোন। কিন্তু তার রাগ ততক্ষণে ছাই হয়ে যায়নি, বরং শরীর থেকে আগুনের মতো গরম ধোঁয়া বেরোতে লাগল। লিওর জন্য বাবার মৃত্যু কোনো বড় শোক নয়, তবে জেইনের প্রতি ঘৃণা ছিল অসীম, কারণ জেইন একের পর এক লিওর কাছ থেকে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো কেড়ে নিয়েছ তাদের কলো দুনিয়ার বিজনেস কিন্তু শুধু এটাই নয় তার সম্মান, আত্মমর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

সেই মুহূর্তে লিও নিজের মধ্যে কঠিন সংকল্প নেয় যেভাবে জেইন তার জীবনের সব কিছু নিয়েছে, ঠিক তেমনি সে ছিনিয়ে নিয়ে নেবে তার সবকিছু, তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটিও।
লিও ধীরে ধীরে ওঠে , গায়ে একটা পাতলা টি-শার্ট আর পায়ে স্লিপার পরে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। সে অলিভার রুমের সামনে গিয়ে তাকে ডেকে ওঠে। অলিভা তার রুমে বসে পিয়ানোতে সুর তোলে যাচ্ছিল, আঙুলগুলো যেন নাচছিলো কীবোর্ডের ওপর। পিয়ানো বাজানোতে মগ্ন থেকে সে লিওর দিকে না তাকিয়েই ঠান্ডা কণ্ঠে বলে,

“Coming…..”
লিও ঘরে ঢুকে পড়ে, চোখে জ্বলন্ত আগুন, গলার স্বর আঁটসাঁট তীক্ষ্ণ,
“Did you hear the news?”
অলিভা মুচকি হাসে, ঠাণ্ডা অথচ বড্ড চালাক হাসি, “আমি অনেক আগেই শুনেছি।”
লিওর রাগ আরও প্রবল হয়, চোখে আগুন দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“Then why the hell are you so calm? That bastard killed our father! How can you be so cold after that?”
অলিভা নির্লিপ্ত সুরে বলে,

“So what? বুড়ো হয়ে গেছিল, কদিন পরেই মারা যেত। জেইন মেরে কাজটা সহজ করে দিয়েছে।”
লিওর গলা কেঁপে উঠে, চোখে ক্ষোভের জ্বলন,
“You’re blinded by love. Don’t forget. জেইন কখনো তোর দিকে মুখ ফিরিয়েও তাকায়নি। সেদিন পার্টিতে তুই সব দেখেছিস। He’s obsessed with that girl. ম্যাক্স সামান্য হাত দিয়েছিল বলে, ওর কলিজা ছিঁড়ে ফেলেছিল। ও জীবনেও তোর দিকে ফিরে তাকাবে না।”
মুহূর্তেই অলিভার মুখভঙ্গি বদলে যায়। চোখে আগুন ঝলসে ওঠে। সে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলে,
“If I have to lose Zain because of her, I’ll end her. আমি ওকে এমন মৃত্যু দেবো, যা ওর আত্মাকে কাঁপিয়ে তুলবে। ওর সুন্দর নিষ্পাপ মুখটা বিকৃত করে দিব। যেন জেইন কেন কেউ ওর দিকে ফিরেও তাকাতে না পারে। কারণ জেইন শুধু আমার। কারোর না।”
লিও ঠান্ডা গলায় অথচ ভেতরে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে হিসহিসিয়ে বলে,

“Don’t you dare even think of hurting her. She’s mine. For life. She’s not just any girl she’s my angel.”
সে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
“Now I understand why Zain is obsessed with her. আর কেনই বা ওকে এতদিন সবার চোখের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। তোর জেইনকে চাই তো? আর আমার সেই এঞ্জেল কে। তুই কি বুঝতে পারছিস আমি কি বলতে চাইছি? ডিল? What do you say?”
অলিভা প্রথমে কিছু একটা মনে মনে ভাবে। তারপর মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে দেয়। দুজনে হাত মেলালেও মনের মধ্যে চলতে থাকে শয়তানি বুদ্ধি । অলিভার মনে চলছিল রিমকে শেষ করার পরিকল্পনা, আর লিওর মনে গোপনে জেইনকে ধ্বংস করার অঙ্গীকার।

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রাত গভীর। ঘরের জানালা খোলা, বাইরে দূরে শহরের আলো চিকচিক করছে। ঘরে আধো অন্ধকার, শুধু টেবিল ল্যাম্পের নরম আলো। জেইন কাঁচের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ব্লুরাজ লেমোনেড ফ্লেভারের ইলেকট্রিক সিগারেট। ধোঁয়া ঘূর্ণি তুলে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। যার থেকে একধরনের মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়াশ সোফায় বসে চুপচাপ তাকিয়ে আছে তার দিকে।
জেইন হঠাৎ ধীর গলায় বলে উঠে,
“তুই জানিস… ও এখনো আমাকে মনে রেখেছে। সেই সাত বছরের ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটা আজও তার ‘আরাত্র’কে মনে রেখেছে। শুধু মনে রাখেনি ভালোবাসে। ইজ দ্যাট ইভেন পসিবল?”
ইয়াশ কোনো বিস্ময় দেখাল না, শান্ত গলায় বলে,
“পসিবল। ও তোকে তার আরাত্র’কে মন থেকে ভালোবেসেছে… তাই ভুলতে পারেনি।”
জেইনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য আবছা হয়ে যায়,
“কিন্তু আমি তো চাইনি… ও আমাকে ভালোবাসুক। চাইনি ও আমায় মনে রাখুক। আমি চেয়েছিলাম ও আমাকে ঘৃণা করুক। নিজের জন্য ঘৃণা তৈরি করতে চেয়েছিলাম ওর মনে। তাই তো নিজেকে ওর সামনে সবসময় খারাপ ভাবে উপস্থাপন করছি।”

ইয়াশ সাবলীল গলায় বলে,
“আমি জানি তুই ভালোবাসায় বিশ্বাস করিস না। তার কারণ তোর নিজের বাবা-মা। কিন্তু তাদের ভালোবাসা হয়তো সত্যি ছিল না, শুধু প্রয়োজন ছিল। আসল ভালোবাসা ধোঁকা দেয় না, তুই সেটা ভুল জায়গায় খুঁজেছিস।”
জেইন মুখ ঘুরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়। যেন কিছু একটা এড়িয়ে যেতে চাইছে। ইয়াশ আবারো বলে ওঠে,
“তুই’ই বল… ও যখন তোর কাছে ছিল না, তুই কতটা ছটফট করেছিস? ওর সামান্য কষ্ট সহ্য করতে পারিস না, ওর পাশে কেউ দাঁড়ালেই মাথায় আগুন ধরে যায়। নিঃশ্বাস আটকে আসে, পাগল হয়ে যাস‌। এগুলো যদি ভালোবাসা না হয়, তাহলে কি?”
জেইনের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। চোখে জেদ নিয়ে বলে,

“না, এটা ভালোবাসা না। এটা আমার আসক্তি। ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়, আসক্তি না।”
ইয়াশ তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
“আর যদি একদিন তোর ওই থিওরি ভুল প্রমাণিত হয়?”
জেইনের গলা ঠান্ডা, ধারালো হয়ে উঠে
“কক্ষনো না। আমার এই ধারণা কোনোদিন বদলাবে না। ও আমার আসক্তি হয়েই সারাজীবন থাকবে আমার কাছে। ওকে আমি কখনো নিজের থেকে আলাদা হতে দেব না।”
ঠিক তখনই দরজার ফাঁক দিয়ে এক মহিলা সার্ভেন্ট দ্বিধাভরা ভঙ্গিতে ভেতরে এল।
“স্যার… ম্যামের জ্ঞান ফিরে এসেছে। কিন্তু… উনি অনেক কাঁদছেন। আমাদের কারো কথাই শুনছেন না।”
জেইনের চোখে হঠাৎ এক ঝলক অস্থিরতা। মুহূর্তের মধ্যে সিগারেট ফেলে দিয়ে সে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে তাকায়, যেন বোঝার চেষ্টা করছে এই মানুষটা আসলে কতটা কেয়ার করে। এই একদিন রিম যখন সেন্সলেস ছিল সে একটুও তার থেকে আলাদা হয়নি। আর না দুচোখের পাতা এক করেছে। সর্বক্ষণ মেয়েটার পাশে থেকে তার সেবা যত্ন করেছে। অস্থির পাগলের মতো ছটফট করেছে।

মাত্তেও ড্রেভেনকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই ইয়াশের চোখ হঠাৎ আটকে গেল জেইনের উন্মুক্ত পিঠে। সে খুক খুক করে কেশে উঠে।
“এহেম… শার্টটা আগে পরে নে।”
জেইন ভ্রু কুঁচকে তাকাল, যেন বুঝতেই পারছে না কথাটা কেন বলা হল। ইয়াশ গলা ঝেরে ক্ষীণ কন্ঠে বলে,
“পিঠে খামচির দাগ দেখাচ্ছে, আর বুকে কামড়ের দাগটা তো একেবারে হাইলাইট। সব লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে।”
এক মুহূর্তে জেইনের চোখ নিচে নামল। নিজের অবস্থা দেখে কানের আগা পর্যন্ত লাল হয়ে গেল। তার দৃষ্টি পড়ল ফ্লোরে পড়ে থাকা ভেজা শার্টটার দিকে যেটা ওয়াশরুমে ভেজা অবস্থায় রিমের গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল। ইশ এতক্ষণ তারমানে সবাই দেখেছে এগুলো। সে একেবারেই চায় না, তাদের সেই নিঃশব্দে বোনা মুহূর্তগুলো অন্য কারও চোখে ধরা দিক। কারণ সেগুলো শুধু তাদের দুজনার অনুভূতিতে গড়া একান্ত, অমূল্য স্মৃতি। সে লজ্জা পেলেও সেটা চেপে মুখে বিরক্তি এনে বলে,

“তুই আগে বের হ এখান থেকে। নিউ কাপলদের একটু প্রাইভেসি দিতে হয়, জানিস না? বাবা-মাকে নিয়ে এসব বলতে তোর লজ্জা করে না?”
বলেই তাড়াহুড়ো করে নিজের জন্য একটা শার্ট বের করে, গায়ে জড়িয়ে নেয়। তারপর ফ্রিজের সামনে গিয়ে কয়েকটা আইস কিউব বের করে সরাসরি প্যান্টের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
ইয়াশ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল,
“এটা কি করলি তুই!”
জেইন বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
“গরম লাগছে তাই।”
ইয়াশ‌ কন্ঠে বিস্ময় এনে বলে,
“ওখানে!”
জেইনের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, রাগ আর বিরক্তি একসাথে গলা চেপে ধরছে,

“না, পুরো শরীরে। দেখতে পাচ্ছিস না, এসি বন্ধ?”
ইয়াশ হা করে তাকাল,
“তাহলে ওইখানে বরফ দিলি কেন?”
জেইন বহু কষ্টে নিজের রাগ সামলে চাপা ফিসফিস কণ্ঠে বলে,
“কারণ ওটা ঠান্ডা থাকলেই পুরো শরীর ঠান্ডা থাকে।”
ইয়াশের যেন মাথা চক্কর দিয়ে উঠল, মুখে অবিশ্বাসের ছাপ। জেইনের চোখে এবার বিরক্তির আগুন জ্বলে উঠল,
“বহুত হয়েছে, এবার তুই এখান থেকে বের হ।”
ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে বলে,
“যাবো ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, আমার মা কিন্তু অসুস্থ। বেশি রকম বাড়াবাড়ি করা যাবে না। তোর মতো গন্ডারকে সামলানোর মতো এবিলিটি ওর নেই।”
রাগে জেইনের চোখে লাল রেখা ফুটে উঠে,

“সে নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই। আমার বউ, আমি বুঝে নেব।”
ইয়াশ ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“কিন্তু তোর বউ হলেও, সে আমার মা। কিছু হয়ে গেলে আমি কোথায় পাবো?”
জেইন বিরক্ত চোয়াল শক্ত করে বলল,
“তুই যাবি এখান থেকে!”
ইয়াশ দুই হাত তুলে শান্ত ভঙ্গিতে বলে,
“আরে, আচ্ছা, আচ্ছা কুল ডাউন… যাচ্ছি।”
তারপর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। স্বাভাবিক সুরে, কিন্তু এবার একদম সিরিয়াস হয়ে বলে,
“একটা কথা বলি, ও আমার ছোট বোনের মতো। নিজের ছোট বোনকে হারিয়েছি আমি। চাই না ওর কিছু হোক। ওকে দেখে রাখার দায়িত্ব তোর।”

তখনই সেখানে মাত্তেও প্রবেশ করে। সাথে একজন ফিমেল ডাক্তার। ডাক্তার ভেতরে ঢুকেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল, চোখ গিয়ে সরাসরি আটকাল জেইনের দিকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার ভ্রু কুঁচকে গেল, তারপর বিস্ময়ে মুখে হাত দিয়ে বলে ওঠে,
“উনার প্যান্ট ভিজা কেন? উনি কি প্যান্টের মধ্যেই…?”
বাকিটা শেষ করার আগেই জেইন মাথা ঘুরিয়ে মাত্তেওর দিকে তাকায় চোখে এমন আগুন, যেন কথাটা আরেকবার শোনা মাত্র কাউকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। মাত্তেও হকচকিয়ে যায়, তারপর তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো,
“আরে কিছু না, কিছু না… পানি পড়ে গিয়েছিল।”
ডাক্তার লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে হালকা স্বস্তির ভঙ্গিতে বলল,

“ওওহ্…”
মাত্তেও আবার জেইনের দিকে তাকায়, আর তাকাতেই বুক কাঁপতে শুরু করে ওই চোখের চাহনিতে স্পষ্ট রাগের শিখা জ্বলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গলা নিচু করে বলল,,
“ঐ তো আপনার পেশেন্টন্, দয়া করে আগে পেশেন্টকে দেখুন । নয়তো কিছুক্ষণ পর আমরাই পেশেন্ট হয়ে যাবো।”
ডাক্তার কথার মানে ঠিক বুঝতে না পেরে রিমের পাশে গিয়ে বসে । স্লো মোশনে চেকআপ শুরু করে। কিন্তু মাঝে মাঝে কৌতূহলী চোখে জেইনের দিকে তাকাচ্ছে, আর ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি খেলছে। জেইনের বিরক্তি যেন মিনিটে মিনিটে বেড়ে চলেছে। সে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাত্তেওর দিকে, আর মাত্তেও হাবলার মতো মাথা চুলকে দাঁত বের করে হাসছে।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার স্যালাইন লাগিয়ে সঙ্গে কিছু ওষুধ বের করে বলল,
“জ্বরের সাথে শরীরে অনেক দুর্বলতা আছে, তাই এখনই জ্ঞান ফেরানো সম্ভব না। তবে যত্ন করলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। দিনে তিনবার শরীর মুছিয়ে দিতে হবে, আর ওষুধ ঠিকমতো খাওয়াতে হবে। আপনি চাইলে আমি একজন নার্সের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।”

জেইনের কপাল সাথে সাথে কুঁচকে যায়, কণ্ঠে কাটা শীতলতা,
“তার প্রয়োজন নেই। আমার বউয়ের যত্ন আমি নিজেই নিতে পারবো।”
মুহুর্তের মধ্যে ডাক্তারের মুখে হালকা অন্ধকার ছায়া নেমে এলো। মনটা যেন ভাঙা কাঁচের মত কয়েকশো টুকরো হয়ে গেছে। এত সুন্দর, হ্যান্ডসাম একটা ছেলে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলেছে! তাও আবার এমন ছোটখাটো দেখতে পিচ্চি বউ! এক মুহূর্তের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আর তাতেই জেইনের বিরক্তি দ্বিগুণ হয়ে উঠল।
জেইন মাত্তেয়োর দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠে,
“মাত্তেও… এই মহিলার কাজ শেষ। এবার ওকে এখান থেকে যেতে বল।”
মাত্তেও তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে বলে,
“জি ভাই।”
তারপর সে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
“আসুন, আপনাকে এগিয়ে দিই।”

মহিলা আর কিছু না বলে ভাঙা মন নিয়েই তার সাথে বেরিয়ে গেল। ঘর ফাঁকা হতেই জেইন ধীরে ধীরে রিমের পাশে গিয়ে বসে। বাইরে হাওয়ার হালকা গুঞ্জন, নিঃশব্দ ঘরে স্যালাইনের ফোঁটা টুপটুপ পড়ছে। রিম নিস্তেজ, ক্লান্ত শ্বাসে যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
জেইনের চোখ আটকায় তার ফ্যাকাশে মুখে এই মেয়েটা যেন তার অচেনা পৃথিবীর একমাত্র আলো। তারপর থেকে শুরু হয় তার সেবা যত্ন। সে নিরবে ঝুঁকে রিমের মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে অল্প অল্প করে চামচে কিছু তরল খাবার রিমকে খাইয়ে দেয়। রিম অবচেতনেই একটু একটু খাচ্ছে। সে একে একে রিমকে ঔষধ গুলো খাইয়ে দেয়। আর সেই মুহূর্তগুলোতে জেইনের ভেতরে এক অদ্ভুত কোমলতা ভর করে।

তারপর ভিজে তোয়ালে নিয়ে সাবধানে খুব যত্ন সহকারে তার শরীর মুছিয়ে দেয়। প্রতিটি ছোঁয়ায় যেন নিজের ভেতরের ঝড়কে ঠেকিয়ে রাখছে। অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। পোশাক পাল্টানোর সময় সে চোখে কাপড় বেঁধে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে আন্দাজ মতো নিজের একটা সাদা টি-শার্ট আর একটা কালো থ্রি-কোয়াটার প্যান্ট পরিয়ে দেয়। কারণ সে জানে, চোখ যদি একবারও বেশি কিছু দেখে ফেলে, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। তখন হয়তো অসুস্থ অবস্থাতেই মেয়েটাকে আবার চেপে ধরবে… আর তারপর হয়তো মেয়েটাকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না।

তবুও, যত্ন নিতে গিয়ে তার হাত যখন রিমের উষ্ণ ত্বকে স্পর্শ করে, শরীরের ভেতর দিয়ে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে যায়। সেই উষ্ণতা যেন তীব্র বিদ্যুতের মতো সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে। রিমের নিকটে থাকলে যেন তার মাথা ঝিমঝিম করে, বুক জুড়ে অস্থিরতার ঢেউ ওঠে,আর এক অদৃশ্য নেশা যেন রক্তের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে।
নিজেকে সামলাতে না পেরে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়য। রুম থেকে বেরিয়ে সোজা বারে গিয়ে একের পর এক ড্রাগস নিতে শুরু করে। সাদা গুঁড়া, কালো ধোঁয়া সব চেষ্টা করে মাথা ঝিমিয়ে দেওয়ার। কিন্তু অবাক করা কান্ড কোনো নেশাই তার উপর চড়ে না। শরীরে রক্ত গরমই থাকে, হৃদস্পন্দন ঠিক ততটাই অস্থির। কারণ ইতোমধ্যেই এর থেকেও বড় নেশা তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে । যে নেশা সে চাইলেও ছাড়তে পারবে না। আর না তো সে কখনো ছাড়তে চায়। সে জানে এই নেশা তাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। আর সে চায় নিজেকে পুড়িয়ে শেষ করে দিতে। সে কাঁপতে কাঁপতে বলে

“আমার শিরা-উপশিরায় মিশে গেছো তুমি… আমার নিশ্বাসে, আমার রক্তে । তোমার নেশা থেকে মুক্তি পাবার আর কোনো পথ নেই যদি না সেই পথের শেষ হয় আমার মৃত্যুর অন্ধকারে।”
তারপর সে একটা সিগারেট ধরায়। নীলচে ধোঁয়া ধীরে ধীরে ঘর ভরে যায়। সে উঠে দাড়িয়ে কাঁচের দেয়ালের দিকে মুখ করে তাকায় বাইরে আলো-অন্ধকারে মিশে থাকা শহরের দৃশ্য যেন তার ভিতরের ঝড়ের সঙ্গে মিল খুঁজে নিচ্ছে।
ঠিক তখনই ঘরে ইয়াশ ঢুকে পড়ে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ড্রাগসের প্যাকেট, সিরিঞ্জ, ছেঁড়া ফয়েল দেখে তার চোখ মুহূর্তেই রাগে লাল হয়ে যায়। চেয়ারে ধপ করে বসে সে গর্জে উঠে,
“তুই আবারও ড্রাগস নিচ্ছিস! জানিস না এগুলো তোর ব্রেনের জন্য কতটা হার্মফুল? কেন এভাবে জেনে শুনে নিজের ক্ষতি করছিস?”

জেইন ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়, তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি। কণ্ঠে ঠান্ডা কিন্তু ধারালো সুর,
“এসব ফা*কিং ড্রাগস আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমার যা ক্ষতি হবার তা তো অনেক আগেই করে ফেলেছে ঐ অবুঝ মেয়েটা। ওর নেশার কাছে এ সব, সবকিছু তুচ্ছ! ”
তাদের কথোপকথনের মাঝেই একজন মহিলা সার্ভেন্ট এসে রিমের জ্ঞান ফিরে আসার খবর দেয়। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে যায়। মুখে কোনো কথা না থাকলেও শরীর জুড়ে অস্থিরতা। চোখে অদ্ভুত তীব্রতা। যেন এক মুহূর্তে তার ভেতরের সমস্ত ঝড় উথলে উঠছে।
ইয়াশ তার পেছনের ছায়ামূর্তির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নিচু গলায় বিড়বিড় করে নিজের সাথে বলে,
“তুই যতই অস্বীকার করিস যে তুই ওকে ভালোবাসিস না… তোর এই অস্থিরতা, এই ছুটে যাওয়া বলে দেয় তুই ওকে ঠিক কতটা ভালোবাসিস। একদিন তুই নিজেও সেটা স্বীকার করবি…”

রিম বিছানায় বসে আছে, দুই হাতে হাঁটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মাথা গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। কান্নার দমকে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে, যেন প্রতিটি শ্বাসে তার বুকের ভিতর জমে থাকা যন্ত্রণা বেরিয়ে আসছে। হাতের ক্যানোলা ইতিমধ্যেই খুলে গেছে, লালচে রক্ত ধীরে ধীরে ঝরে বিছানার চাদরে দাগ ফেলে দিচ্ছে।
দরজার কাছে দাঁড়ানো জেইন এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে যায় তার বুকের ভেতর যেন কেউ মুঠি চেপে ধরেছে। তারপর নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চোখে অসহায় মমতা, কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা। নরম আদুরে কন্ঠে বলে,

“ফায়ারফ্লাই….হেই সোনা, কি হয়েছে তোমার? বার্বিডল কাঁদছো কেন? কি হয়েছে সোনা আমাকে বলো। কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার? তাকাও আমার দিকে।”
কিন্তু রিম কাঁদতেই থাকে। তার বারাবর কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই দৃশ্য দেখে জেইনের অস্থিরতা তীব্র হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে তার কাঁধে হাত রাখে, সেই স্পর্শে নিজের উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে বলে,
“আমার সোনা… প্লিজ, বাবু, আমার দিকে একবার তাকাও। বলো আমাকে, কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার?”
রিম হঠাৎ ছ্যাত করে পেছনে সরে যায়। চোখ-মুখ কান্নায় ফুলে লাল হয়ে উঠেছে, শ্বাস ভারী আর অনিয়মিত। এলোমেলো চুলগুলো তার মুখের চারপাশে লুটিয়ে আছে, যেন প্রতিটা গোছা তার ভেতরের অস্থিরতার সাক্ষী। রাগে ঘৃণায় তার কন্ঠ কাঁপছে।
“কাছে আসবেন না আমার।‌ আপনার লজ্জা করে না একটা মেয়ের অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে। কেন করলেন আমার সাথে এমনটা? নিজের প্রতি’ই ঘৃণা হচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে শরীরটা পঁচে গেছে আপনার ছোঁয়ায়।‌ অপবিত্র হয়ে গেছে।”

জেইনের বুকের ভেতর হঠাৎই তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। যেন অদৃশ্য কোনো ছুরি গভীর থেকে তার হৃদপিণ্ডে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। নিঃশ্বাস নিতে গিয়েও কষ্ট হয় তার। সে কাতর গলায় বলে,
“এসব কি বলছো তুমি?”
রিমের চোখে জল, সে রাগের উত্তাপে জ্বলছে। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
“আপনি জানেন না আমি কিসের কথা বলছি?”
সে নিজের গলার পাশের টি-শার্ট টেনে ত্বকের ছোপ ছোপ দাগ গুলো দেখায়। কিছুটা পার্পেল আর গোলাপী রঙের মিশ্রণে।

“এই দাগ এই জামাকাপড় এগুলো কোথা থেকে আসলো? বলুন! আপনি একটা খারাপ অমানুষ জানতাম কিন্তু তাই বলে এতো নিচ!”
সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে নিজের দুহাতে জেইনের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে। চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে প্রতিটি ফোঁটায় জমে আছে অসহায়তা, ঘৃণা আর আঘাত।
“কেন আমার ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেললেন। একটুও লজ্জা করলো না এরকম একটা জঘন্য কাজ করতে। এটাই তো চেয়েছিলেন না আপনি? ভোগ করতে চেয়েছিলেন আমাকে। মিটেছে না আপনার আশা? এবার মুক্তি দিন আমাকে।”
মুক্তি! শব্দটা মুহূর্তেই জেইনের ভেতরের পৈশাচিক সত্যাকে জাগিয়ে তুলল। চোখে তখন আর মানুষের কোমলতা নেই শুধু দমিয়ে রাখা আগুনের শিখা। সে বন্য পশু হয়ে গেছে। হঠাৎ তিন আঙুলে রিমের মুখ চেপে ধরে। এত জোরে চেপে ধরে যে আঙুলগুলো যেন তার গালের হাড় ভেদ করে মাংসে ঢুকে যাবে। রিমের ঠোঁট চাপের কারণে হাঁসের ঠোঁটের মতো গোল হয়ে ফাঁক হয়ে আছে, শ্বাস আটকে আসছে। জেইন দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে

“মুক্তি…. না? ভুলে যা। সেটা এই জনমে কখনো পাবি না তুই!”
তার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ বিষের মতো ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে।
“আর তোর ইজ্জত হুম? অধিকার অধিকার বলে চেঁচাচ্ছিলি না এতদিন, তোর ওপর এখন থেকে শুধু আমার অধিকার আছে। আইনত, ধর্মীয়ত আর আত্মার সাথে আত্মার। শরীরের সাথে শরীরের। নিঃশ্বাসের সাথে নিঃশ্বাসের। শুধু আমার অধিকার। তুই যেটাকে ভোগ বলছিস, সেটা আমার হক। আর আমি আমার জিনিস আদায় করে নিতে জানি, হোক সেটা আপসে কিংবা জোর করে ছিনিয়ে।”
শেষ কথাটা বলে সে ঝাঁকি মেরে রিমের থুতনি ছেড়ে দেয়। ব্যথায় রিমের চোয়াল অবশ হয়ে আসে, জায়গাটা মনে হচ্ছে জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু তার মুখ এখনও টানটান, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, চোখে আগুনের ঝিলিক। সে তাচ্ছিল্য গলায় বলে,
“অধিকার থাকা স্বত্ত্বেও যে পুরুষ মন না ছুঁয়ে শরীর ছুঁতে চায় তাকে যে অধিকার প্রাপ্ত রেপিস্ট বলে, সেটা কি জানেন?

জেইনের মুখে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। হঠাৎ সে রিমের কোমর জাপটে ধরে হেঁচকা টানে নিজের বুকের ওপর ফেলে দেয়। তাদের শরীরের ফাঁক মুছে যায়, রিমের মাথা তার বুকের সাথে গেঁথে যায়। জেইন তার কানের পাশে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে নির্মম কন্ঠে বলে,
“অধিকার থাকা সত্ত্বেও তোমাকে ছুঁয়ে দেওয়ায় যদি আমাকে রেপিস্ট হতে হয়, তবে আমি বারবার তোমার অধিকার প্রাপ্ত রেপিস্ট হতে চাই।”
রিম তার বুকের ভেতর ছটফট করে ওঠে, যেন বন্দি পাখি মুক্তি খুঁজছে। চোখের জল আর নাকের জল মিলেমিশে মুখ ভিজে গেছে। জেইন এক হাত দিয়ে তার মাথাটা নিজের বুকের সাথে আরও চেপে ধরে, আর অন্য হাত দিয়ে আলতো করে চুলে হাত বোলায়। তারপর কপালে এক দীর্ঘ, উষ্ণ চুমু খায় যার মধ্যে অদ্ভুত এক বিপরীত মিশ্রণ একধরনের স্নেহও, আবার দখলদারির ঘোষণাও।

“বেশি ব্যাথা পেয়েছো হুম? সঅরি। তুমি তো জানো রাগ হলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না আমি।”
রিম শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। জেইন তাকে বুকের সাথে আরো শক্ত করে চেপে বিরক্ত কন্ঠে বলে,
“উফ্ এতো ছটফট করো কেন তুমি? দূর্বল শরীরে এত হাইপার হতে নেই। সোওনা। আগে সুস্থ হও তারপর তোমার সাথে পাকরাম-পাকরাই খেলবো, ওকে?”
রিম তার দিকে চোখ ফেরায়, দৃষ্টি ভরা ঘৃণায়। ঠোঁট কেঁপে উঠে শুধু একটি শব্দ বের হয়।
“ছিঃ!”
জেইনের ঠোঁটে কুটিল হাসি খেলে যায়। ঠোঁট কামড়ে মৃদু স্বরে বলে,
“ছি বলার মতো কী-ই বা করলাম আমি? তবে তুমি চাইলে করতে পারি। করবো?”
রিম রাগে কিড়মিড় করে ওঠে। হঠাৎই জেইনের বুকের বাঁ পাশে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে। তীব্র বিষাক্ত যন্ত্রণায় আর সুখানুভূতি’তে জেইনের আঙুল বিছানার চাদরে শক্ত করে খামচে ধরে, নখ প্রায় কাপড় ছিঁড়ে ফেলছে। শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত, যেন হৃদস্পন্দন ফেটে বেরিয়ে আসবে। বড় করে শ্বাস টেনে সে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ফিসফিস করে,

“মুখে বলতে পারছো না দেখে এভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছো? কিন্তু তুমি তো এখন অসুস্থ। আগে সুস্থ হও তারপর সব হবে। তাই এখন আর নেগেটিভ ফিল দিলেও কোনো লাভ হবে না।”
রিম ফণা তোলা সাপের মতো ফোঁস করে উঠে। জেইন ঠোঁট কামড়ে কুটিল হেসে বলে,
“আচ্ছা, তুমি সবসময় আমার বুকেই কামড়ে দাও কেন, বলোতো? But I like it… no, I f*cking love it. চাইলে শুধু বুক না—আমার পুরো শরীরে দাঁতের ছাপ বসিয়ে দিও। The pain you give me… it’s not just pain, it’s sinfully sweet… mouthwateringly delicious.”
রিমের কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হতে থাকে। সে আর কিছু বলতে চায় না। তার বলার মতো ইচ্ছে বা শক্তি কোনোটাই নেই। সে জেইনের বুকে নেতিয়ে পড়ে থাকে। জেইন তার মুখটা আলতো করে বুক থেকে সরিয়ে নেয়, হাতের মুঠোয় পুরে চোখ-মুখে অবিরাম চুমু এঁকে যায়। আদুরে, কিন্তু অধিকারভরা স্বরে বলে,

“ভয় পেয়ো না আমাদের মাঝে তেমন কিছুই হয়নি। জাস্ট একটু কামড়াকামড়ি হয়েছিল। বাট শুরুটা তুমি নিজেই করেছো।‌ আমাকে উস্কে দিয়েছো তুমি নিজেই।”
তারপর সে ঠোঁট কামড়ে বলে,
“আমি তো ভাবতেই পারিনি, আমার লিটল মাউস এতটা ওয়াইল্ড হতে পারে… But damn, I like it.”
তার ঠোঁটে শিকারির মতো হাসি খেলে যায়, গলায় নেশা জমে ওঠে,
“And you know what? You’re dangerously yummy… so f*cking beautiful… তোমার শরীর just like warm butter… soft… and silky.”
রিম হঠাৎ জেইনের হাতটা ঝাড়ি মেরে সরিয়ে নিল। তার শরীর রাগে আর ঘৃণায় থরথর করে কাঁপছে, কণ্ঠ কাঁপলেও কথাগুলো ধারালো ছুরির মতো,

“কিছু না করলেও আমার পোশাক তো আপনিই পাল্টেছেন। কি কি দেখেছেন, বলুন?”
জেইন অবাক হয়ে চোখ বড়বড় করে তাকায়, তারপর ঠোঁটে এক প্রকার মজা মেশানো অবিশ্বাস এনে বলে,
“ছিঃ বউ এসব কি মুখে বলা যায় না কি?”
তারপর সে এক মুহূর্ত চুপ থেকে মুখের অভিব্যক্তি বদলায় একটু সিরিয়াস হয়ে বলে,
“দেখার মতো তেমন কিছুই নেই তোমার। তুমি তো একটা বাচ্চা মেয়ে। শুধু….. কোন জায়গায় কয়টা তিল আছে সেই মানচিত্র’টা একটু মুখস্থ করেছি।”
রিমের মাথায় যেন বজ্রপাত হল। কী পরিমাণ নির্লজ্জ, নোংরা এই লোকটা! তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল, চোখে আগুনের ঝিলিক নিয়ে সে কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলে,
“তাহলে এই বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করলেন কেন?”

জেইনের ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক শয়তানি হাসি ফুটে উঠে। সে ঠোঁট কামড়ে রিমের দিকে ঝুঁকে আসে। কানে মুখ রেখে হুইস্কির মতো গাঢ়, নিচু স্বরে ফিসফিস করে ওঠে,
“কারণ… বাচ্চাটাকে আমি নিজের হাতে বড় করব। চাকে ধীরে ধীরে মধুতে ভরাবো… তারপর একসাথে, সব মধু শুষে নেব। শেষ ফোটা পর্যন্ত।”
রিমের শরীর শিউরে ওঠে। মুখ খুলে কিছু বলতে নেয়, তার আগেই জেইন শয়তানি ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“বাট যা’ই বলো না কেন, বাচ্চাটা কিন্তু ওপর থেকে দেখতে কিউট হলেও ভেতরে একদম জলন্ত আগুন হ*ট এন্ড সে*ক্সি।”
রিম চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে নেয়।এত এত নির্লজ্জ কথা শুনে তার মাথাটা যেন ভো করে চক্কর দিয়ে উঠে। যেন শ্বাস নেয়াও কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। জেইন অস্থির হয়ে পড়ে,

“কি হয়েছে সোনা? তোমার কি এখন খুব বেশি খারাপ লাগছে? কিছু খাবে ? বলো আমি বানিয়ে আনছি। খাবার খেয়ে ওষুধ খেতে হবে তো।”
রিম মুখ ফুলিয়ে বলে ,
“খাবো না।”
জেইন তার কাছে ঘেষে বসে। দুহাতে জড়িয়ে নিজের কোলে বসিয়ে ঘাড়ে মুখ গুজে দেয়। তার পিঠ ঠেকে আছে জেইনের বুকের সাথে। জেইন নেশালো কন্ঠে ফিসফিস করে ওঠে,
“কেন সোনা? রাগ করেছো?”
রিম নাক টেনে বলে,
“না। আপনি কে হ্যাঁ, যে আপনার সাথে রাগ করবো?”
জেইন একটু ভাবুক হয়ে বলে,

“হুমমম… ঠিক বলেছ আমি কে যে তুমি আমার সাথে রাগ করবে? তার মানে তুমি আমার সাথে রাগ করোনি?”
রিম নাক টেনে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“না একটুও না।”
জেইন এক ভ্রু উঁচিয়ে সন্দেহভরে তাকায়,
“সত্যি তো?”
“হুম।”
জেইন মুচকি হাসে,
“ওকে তাহলে বলো, কি খাবে?”
রিম এক ঝটকায় তার দিকে ঘুরে তাকায়, তারপর থুতনিতে আঙুল রেখে ভাবতে থাকে। যেন কোনো বড় দার্শনিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেই ভঙ্গিতে বলে,
“উমমমম…. ডিম ভর্তা, আলু ভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত। ”
“হোয়াট?”

জেইনের ভ্রু অটোমেটিক কুঁচকে যায়।‌ যেন জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথাটা শুনতে পেল সে।
রিম তার শার্টের বোতামে আঙুল নিয়ে খেলতে থাকে আল্লাদি কন্ঠে বলে,
“এগুলো বানিয়ে দিন না। খাবো তো।”
জেইন বুঝতে পারে মেয়েটাকে আবারও জ্বর কাবু করে ফেলছে। তাই ঘোরের মধ্যে তার সাথে এমন ব্যবহার করছে। নয়তো এতো লক্ষী বউয়ের মতো আচরণ করার মতো মেয়ে তো তার ফায়ারফ্লাই নয়! তাই সে আর কিছু বলে না। রিমের কপালে একটা কোমল চুমু দিয়ে বলে ,
“ওকে তুমি যা খাবে তাই বানিয়ে আনছি।”
তার কন্ঠ নমনীয় আদুরে হয়,

“তুমি শুধু এখানেই শুয়ে রেস্ট করবে। একদম উঠবে না, ওকে? বি আ গুড গার্ল। আমি যাচ্ছি আর আসছি।”
রিম হঠাৎ তার দুই হাত তুলে জেইনের গলা জড়িয়ে ধরে। মাথাটা গুঁজে দেয় তার বুকে, যেন সেখানেই লুকিয়ে থাকতে চায় সারাজীবন। নরম, কিন্তু জেদি স্বরে বলে,
“না আমিও আপনার সাথে যাবো।”
জেইন ধৈর্যের সঙ্গে তার চুলে হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বোঝাতে থাকে।
“না সোনা তুমি শরীর ভালো না। তোমার এখন রেস্ট প্রয়োজন। তুমি এখানেই থাকো আমি যাবো আর আসবো।”
রিম ঠোঁট ফুলিয়ে জেদ ধরে,
“না আমি যাবোই।”
জেইন একটু বিরক্তির সঙ্গে বলে,
“কিভাবে যাবে? ঠিক করে তো দাঁড়াতেও পারছো না।”
রিমের চোখে হঠাৎ জল ভরে উঠে। মুখটা কেঁদে যাওয়া বাচ্চার মতো ভেঙে পড়ে। আর সেই সাথে জেইনের বুকের ভেতর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে

“আরে, ককাঁদছো কেন?”
রিম ভেজা গলায় ফিসফিস করে,
“আমি যাবো… আপনি আমায় কোলে নিন।”
জেইন রিমের কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠে
এত তাপ! হঠাৎ এত বেড়ে গেল কিভাবে? মুহূর্তেই মনে হল, দোষটা হয়তো তারই। নিজের অযথা রাগ, অবাধ্য জেদ সব মিলিয়ে মেয়েটাকে এই অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে সে। ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে এসেছে তার আগে তাড়াতাড়ি কিছু খাওয়াতে হবে।

কোনো কিছু না ভেবেই সে রিমকে কোলে তুলে নিল। রিমের দুই পা তার কোমরে জড়িয়ে ধরে, দুই হাত গলার চারপাশে শক্ত করে বাঁধা। দুর্বল শরীরে সে জেইনের গলায় মুখ গুঁজে দেয়।
এক মুহূর্তের জন্য জেইন থমকে দাঁড়ায়। বুকের ভেতর কোথাও গভীর একটা ঢেউ উঠে, বারবার আছড়ে পড়তে লাগে। গলা শুকিয়ে আসে, কষ্ট করে শুষ্ক একটা ঢোক গিলে, সে নিজেকে সামলে নিল। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনের দিকে পা বাড়ায়।
সে কিচেনে গিয়ে রিমকে কেবিনেট এ বসিয়ে দিতে চায়। রিম তাকে আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে। যেন একটা শুপোরি গাছ বেয়ে ওপরে উঠতে চাইছে। আর নেমে আসার কোনো ইচ্ছে নেই। জেইন তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে স্বরে বলে,
“কি হয়েছে সোনা? বসো এখানে। আমি তোমার জন্য খাবার বানিয়ে নিচ্ছি এক্ষুনি।”
রিম তাকে আরও শক্ত করে জেইনের কোলে পেঁচিয়ে ধরে। পারলে যেন ভেতরে ঢুকে যেত। সে মিনমিনে গলায় বলে,

“না আমি এখানেই থাকবো। আমার এখানেই বেশি ভালো লাগছে।”
জেইনের ঠোঁটে একটুকরো মিষ্টি হাসি খেলে যায়।
“তাই! আচ্ছা ঠিক আছে। তোমাকে আর কোল থেকে নামাবো না।”
খুশিতে রিম জেইনের ঘাড়ে একটা চুমু বসিয়ে দেয়। জেইন ব্যালেন্স হারিয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। কেবিনেটা শক্ত করে আকড়ে ধরে শুষ্ক একটা ঢোক গিলে। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। মেয়েটা নিজেই তাকে উস্কে দেয়। আবার হুশ ফিরলে তার ওপর’ই সমস্ত দোষ চাপিয়ে দেয় । কি জ্বালারে বাবা! এভাবে কি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না কি? মেয়েটা তো বড্ড পাজি! কি আর করার যেমন’ই হোক তার’ই তো বউ। তাও আবার যে সে বউ না খুব আদরের।

সে রিমকে কোলে নিয়েই একটা ইলেকট্রিক কুকারে রাইস আর একটা কুকারে ডিম আর আলু সেদ্ধ বসিয়ে দেয়। ২০ মিনিটের মধ্যেই সব রেডি হয়ে যায়। এরপর সে কিছু শুকনা মরিচ বের করে নেয়। তেলের মধ্যে দিয়ে ভাজতে গিয়ে কাঁশতে কাঁশতে দম বন্ধ হয়ে যায় তার। চোখের জল নাকের জলে এক হয়ে গেছে।
আর এদিকে, রিম সেখানেই তার কোলে অতি সুন্দর আরামে গভীর ঘুমে ডুবে গেছে। জেইন এক হাত দিয়ে রিমকে কোমলভাবে সামলে রাখছে, অন্য হাত দিয়ে সাবধানে রান্নার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও হিমশিম খাচ্ছে। তবুও খুব ধৈর্য ধরে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক পরিশ্রমের পর সে সফল হয়। এরপর প্লেটে সুন্দর করে খাবার সাজিয়ে রিম সহ রুমে চলে যায়।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৭

রুমে গিয়ে খাবারটা টি টেবিলে রেখে রিম’কে আলগোছে বিছানায় শুইয়ে দেয়। ঘাড়ে ভেজা অনুভব করতেই হাত রেখে দেখে রিমের আঠালো লালা। সে রিমের মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ে সেখানেও কিছুটা লেপ্টে আছে। সে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছে দেয় সেটা। তার কাছে মনে হয় এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে মজার লোভনীয় খাবার। অচেতনভাবে সে এক নেশার মধ্যে ঢুকে যায়। নিঃশব্দে আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় রিমের ঠোঁটের দিকে। এক সেকেন্ড হঠাৎ ধপ করে উঠে দাঁড়ায়। বড়বড় করে শ্বাস টানতে থাকে। আবারও একি ভুল করতে যাচ্ছিলো সে। সে বিরক্ত মুখে বিড়বিড় করে,
“উফ্ এই মেয়েটা এত্তো লোভনীয় কেন? দেখলেই শুধু খেতে ইচ্ছে করে…………….. চুমু।”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৯