Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৭

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৭

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৭
রাত্রি মনি

ঠাস!! একটা হিংস্র আঘাত। হুইস্কির বোতলটা ঠিক ড্রেভেনের কপালের উপর ভেঙে পড়ে। চিড়চিড় করে রক্ত ছিটকে উঠল। ড্রেভেন স্তব্ধ। তিন সেকেন্ড চুপচাপ।
তারপর ধীরে ধীরে কাঁপা হাতে মাথায় হাত রাখে। টিপ টিপ করে গড়িয়ে পড়ে রক্ত। সে হাতটা সামনে আনতেই দেখা যায় লাল তরল তার আঙুলের ফাঁকে। মাথাটা যেন মুহূর্তেই চক্কর দিয়ে ওঠে।

জেইন রিমের শরীরের প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে দেয় নিজের ঠোঁটের উষ্ণ, অবাধ, অধিকারী ছোঁয়া।
রিম প্রতিটি ছোঁয়ায় কেঁপে কেঁপে ওঠে। তার শরীর যেন জলে মিশে ভেঙে পড়ছে। চেষ্টাও করে না আর প্রতিরোধের। শেষমেশ সমস্ত শক্তি হারিয়ে সে ঢলে পড়ে জেইনের বাহুতে।
রিম ঢলে পড়তেই জেইনের বুকের অস্থিরতা বেড়ে যায়। সে ছটফট করে ওঠে। রিমের গালে হালকা চাপর মেরে বলে,

“ফায়ারফ্লাই…..সোনা কি হয়েছে তোমার? Hey….. Sona, open your eyes.”
জেইনের বিচলতা বাড়তে থাকে। তার কন্ঠ কেঁপে ওঠে, মনের মধ্যে ভয় ঝেকে বসে।
“কথা বলো সোনা। প্লিজ আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।”
রিমের শরীর নিথর। একটুও নড়াচড়া নেই। নিঃস্পন্দ। নিস্তেজ। জেইন এক মুহূর্তের জন্যও বুঝে উঠতে পারে না মাথা কাজ করছে না। তার ভিতরটা তীব্র আতঙ্কে হাহাকার করে ওঠে। বুকের ভিতর কোথাও একটা বিশ্রী শূন্যতা ফেটে পড়তে চায়।

তার দৃষ্টি পড়ে রিমের অনাবৃত ফর্সা দেহটা তার বাহুর মধ্যে লেপ্টে আছে। এক মুহূর্তে যেন তার রক্ত জমে যায়।
তার গাল দুটো লাল হয়ে ওঠে, কান জ্বলতে থাকে, গলা শুকিয়ে আসে। হঠাৎ করে তার ভেতর থেকে যেন এক প্রলয় উঠে আসে। মনের মধ্যে জেগে ওঠে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার।
শ্বাসের শব্দ ক্রমেই ভারী হয়ে ওঠে। বুকের ধ্রিমধ্রিম শব্দ যেন বুক ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। সে নিজের শরীরের ভিতরকার পাগলামি সামলাতে না পেরে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
জেইনের সমস্ত শরীর কাঁপছে। সে বুঝতে পারে‌ এক মুহূর্তের উন্মাদনায় সে ভুলের পর ভুল করে ফেলেছে। রিমের শরীরে রিশাবের ছোঁয় মুছে ফেলতে গিয়ে, সে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে শুষ্ক একটা ঢোক গিলে নিজের শার্ট খুলে নিয়ে কাঁপা হাতে রিমের নগ্ন শরীরটা ঢেকে দেয়। কিন্তু ছোঁয়া দিয়েই আঁতকে ওঠে। মেয়েটার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। সারা শরীর যেন আগুনের লেলিহান শিখায় মোড়ানো। চোখেমুখে লালচে আভা। নিঃশ্বাস দ্রুত, অস্বাভাবিক। জেইনের হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ হয়, তারপর , ধাড়াম! সে নিজের পুরো শক্তি দিয়ে ফ্লোরে ঘুষি মারে। রক্ত গড়িয়ে পড়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে।

“আআআআআআ!!!!!!”
তার গলার শিরাগুলো ফুলে উঠে, কপালের নীল শিরাগুলো যেন ফেটে যাবে যে কোনো মুহূর্তে। সে নিজের চুল মুঠো করে টেনে ধরে, ছিঁড়ে ফেলতে চায় নিজেকে। কণ্ঠে এক বিষাক্ত যন্ত্রণা, শিরায় শিরায় দগদগে অপরাধ।
“আমি সরি, সোনা…”
সে রিমকে বুকের মাঝে চেপে ধরে রাখে। যেন নিজের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয় তাকে। যেন তাকে আর কেউ কখনো ছুঁতে না পারে, আঘাত করতে না পারে।
“আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি বিশ্বাস করো। সব দোষ ঐ জঘন্য গুইসাপটার। ওর জন্যই তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি আমি। আর কক্ষনো কষ্ট পেতে দিব না তোমাকে, একটুও না। প্রমিস।”
তার ঠোঁট স্পর্শ করে রিমের কপালে। কিন্তু রিমের গায়ে তাপ এতটাই বেশি যে, নিজের ঠোঁটটা পুড়ে যাচ্ছে তার হুবহু আগুনের মতো।

জেইন আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। সে উন্মাদের মতো রিমকে কোলে তুলে নেয়, বুকে চেপে ধরে রুমের ভিতর নিয়ে আসে। তার চোখে এখন শুধু একটাই উদ্দেশ্য তার ফায়াফ্লাইকে বাঁচাতে হবে। তাকে সুস্থ করতে হবে।
সে খুব আস্তে, অত্যন্ত যত্নে রিমের ভেজা দেহটা মখমলের বিছানায় শুইয়ে দেয়। যেন সদ্য ফোটা এক নরম গোলাপ যার পাপড়ি একটু ছোঁয়াতেই ঝরে পড়বে।
তার বুক ওঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে। শরীর ভেজা না থাকলে হয়তো দৃশ্যমান হতো তার কপালে দুশ্চিন্তার চিকচিকে ঘাম । সে শ্বাস নিতে পারছে না ঠিকমতো যেন গলা অবরুদ্ধ হয়ে আছে। রিমের দেহের দিকে তাকিয়ে তার চোখে নামে অন্ধকার এক ঝড়।

সে দ্রুত টাওয়ালটা হাতে নিয়ে রিমের সামনে ঝুঁকে পড়ে। তার কাঁপা হাতে ধীরে ধীরে রিমের শরীর থেকে ভেজা শার্টটা সরিয়ে দেয়। তারপরেই এক ঝটকায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। যেন কিছু একটা দেখা বারণ, কিছু একটা তাকে ভেতর থেকে চূর্ণ করে দিচ্ছে। কিন্তু তাও চোখের পাতার ফাঁকে সেই দৃশ্য ঠিকই উঁকি দেয় এক অনাবৃত, নিষ্পাপ নারী-শরীরের অপার্থিব রূপ।
সে ডিপলি শ্বাস টেনে নেয়। নিজের শরীরটা সামলাতে না পেরে ঠোঁট কামড়ে ধরে। ভেতরে আগুন, বাইরে নিঃশ্বাসে বরফ। কিন্তু হৃদস্পন্দন চেপে রাখা যায় না। ধক্ ধক্। ধক্ ধক্।
শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে শিহরণ খেলে যায়। রক্ত ফুটতে থাকে গলানো লাভার মতো। সে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। তার শরীর গরম হয়ে ওঠে। যেন পিঠ বেয়ে আগুন নেমে যাচ্ছে। রিমের শরীর‌ মোছাতে হবে । চেঞ্জ করতে হবে।

একজন মহিলা সার্ভেন্টকে কল দিতে গিয়ে হঠাৎই তার মনে পড়ে ডোর লকড। আর পাসওয়ার্ড? সে জানে না। তারপর মনে মনে ভাবে সে তার ফায়ার ফ্লাইকে ছুঁতে দেবে না কাউকে। এমনকি কোনো মেয়ে মানুষকেও না।
সে টাওয়াল দিয়ে শরীর মুছতে শুরু করে। মেয়েটার শরীর মুছতে গিয়ে হাত থেমে যায় বারবার। সে নিজেকে ধরে রাখে, ঠোঁট চেপে রাখে, বুক চাপড়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা। তারপর খুব ধীরে, অসম্ভব ধৈর্য ধরে, রিমের শরীর মুছে দিতে শুরু করে সে। হাতটা কাঁপছে। আঙুলের স্পর্শে যেন জ্বলে উঠছে সারা দেহ। কিন্তু এরপর? অন্তর্বাস? চেঞ্জ করতে হবে পোশাক পড়াতে হবে। সেখানেই সে এক মুহূর্ত থেমে যায়। দ্বিধায় পড়ে যায়। পর মুহুর্তে নিজের মনকে বোঝায়, ‘এটা তো আমারই বউ। এত ঘাবড়ানোর কি আছে আজব!’
তবু মন মানে না। তবু শরীর কাঁপে। তবু চোখ আটকে যায় সেই নিষিদ্ধ উষ্ণতায়।
সে রিমকে তুলে নিয়ে নিজের খালি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। তাদের শরীরের উষ্ণতা এক হয়ে মিশে যায়। জেইন চোখ বন্ধ করে। সে নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে তার হাত নামায় রিমের পৃষ্ঠদেশে। একটানে খুলে ফেলে ব্যাল্টের হুক। চিকন কালো ফিতেটা ঘাড় বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে।

সে রিমকে আবার বিছানায় শুইয়ে দেয়। তখনই ঘটে সেই মুহূর্তটা যে মুহূর্তের কোনো তুলনা হয় না।
জেইনের চোখ স্থির হয়ে যায় রিমের বক্ষের মাঝখানে।দৃষ্টি যেন আটকে যায়, থেমে যায় সময়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক করবে। জ্ঞান হারবে। চোখ খুলে রাখতেই কষ্ট হয়। গলার অ্যাড্যাম অ্যাপেল নড়ে ওঠে, বড় করে ঢোক গিলে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, তাও ভিজিয়ে নেয়।
এই দৃশ্য কি আসলেই পৃথিবীতে সম্ভব? না, এটা স্বর্গ। স্বর্গের এক টুকরো রূপ। একজন নারী নয়, যেন সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক।

সে আগেও বহু নারী দেখেছে খোলা, উলঙ্গ। কিন্তু এ অনুভূতি? এই বুকে শিহরণ, এই অদ্ভুত কম্পন শুধুমাত্র এই মেয়েটার জন্যই। তার সেই ইস্পাতের মতো শরীর এখন গলে যাচ্ছে, যেন কেউ আগুনের ঢাল দিয়েছে তার উপর। পাথরের মতো অনুভূতিহীন হৃদয়ে ছুরি চালিয়েছে এই এক রত্তি মেয়েটা।
অগত্যা, সে তাড়াতাড়ি কাভার্ড খুলে নিজের টি-শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট বের করে। তারপর অনেক যত্নে, নিঃশ্বাস আটকে, নিজের জ্বলন্ত বুকের আগুন সামলে রিমের শরীরে পোশাক পড়িয়ে দেয়। তারপর সে দীর্ঘ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে যেন ভিরাট একটা যুদ্ধ জয় করে ফিরল।
কিন্তু অন্তরের ভেতর চলমান আরেকটি যুদ্ধ আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে।‌ রিম জ্বরে কাঁপছে। শরীরটা লাল, মুখ পুড়ে যাওয়া গোলাপের মতো। সে দ্রুত ড্রয়ারের ফার্স্ট এইড বক্সে হাতড়ায়, কিন্তু কিছুই কাজে আসছে না। দিশেহারা হয়ে পড়ে জেইন। বুকের ভেতর আতঙ্ক জমে ওঠে। সেই মুহূর্তে সে ওয়াকি টকি তুলে নেয়।

“মাত্তেও….”
প্রথমবার সাড়া না পেয়ে আর্তনাদ করে ওঠে,
“এই জানোয়ারের বাচ্চা!!! একটা কল ধরতে এতো দেরি লাগে তোদের? হারামির বাচ্চা কোথায় মরছিস?”
মাত্তেও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ওর ঘুম এক লাফে উড়ে যায়।
“জ-জি ভাই, বুঝতে, পারিনি। আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম।”
জেইন বিস্ফোরণে ফেটে যায়, চোয়াল তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“জানোয়ারের বাচ্চা!!! এদিকে আমার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে, আর তুই আরামে ঘুমাচ্ছিস। তোর সারাজীবনের ঘুম হারাম করে দিব আমি। ফা*কিং ডি*ক। তুই পুরো একমাস রাতে জঙ্গলে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি।”
তার কন্ঠ আরও তীক্ষ্ম ওঠে।

“বুঝতে পেরেছিস? হারামির বাচ্চা!”
মাত্তেও কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“ভাই আমি আবার কি করলাম? আমার মত অবলাকে কেন আপনি ঐ হিংস্র জানোয়ারগুলোর খাবার বানাতে চাচ্ছেন? আমি তো অতো টেস্টিও না।”
জেইন বিরক্ত হয়। তার রাগ আরো দ্বিগুন বেড়ে ওঠে,
“চুপ কর বেকুবের বাচ্চা। এক্ষুনি লুকা’কে নিয়ে আমার রুমের সামনে আয়। ডোর লক হয়ে গেছে পাসওয়ার্ড হ্যাক করতে হবে।”
মাত্তেও অবাক হয়ে বলে,

“লক কিভাবে হলো? আপনার ফিংগার প্রিন্ট, ফেস লক সবি তো দেয়া আছে।”
জেইন বিরক্ত হলেও তার অস্থিরতা বাড়ে। গলার মধ্যে কান্নার মতো শ্বাস আটকে আসে।
“এটা প্রশ্ন করার সময় নয় ইডিয়ট! আমি যা বলেছি তাড়াতাড়ি কর। ড্রেভেনকে তুলে নিয়ে আয় এক্ষুনি।”
মাত্তেও আর কথা বাড়ায় না। সে জেইনের কন্ঠ শুনে বুঝতে পারছে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটেছে। সে সম্মতি জানিয়ে কল কেটে দেয়। দ্রুত তৎপর হয়ে পড়ে ভাইয়ের আদেশ পালনে।
কল কেটেই জেইনের দৃষ্টি ফেরে রিমের দিকে। ঠকঠক করে কাঁপছে মেয়েটা। সে ছুটে যায় এসির রিমোটের দিকে, ধ্বস্ত হয়ে তা অফ করে দেয়। তারপর কালো কম্ফোর্টারটা দিয়ে জড়িয়ে দেয় রিমের গায়ে একটু যেন তার শীত কমে।

তারপর সে উঠে গিয়ে একবাটি ঠান্ডা জল আর সাদা রুমাল নিয়ে আসে। বিছানায় বসে রিমের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নেয়, খুব যত্নে… যেন তার স্পর্শেই মেয়েটা না গলে যায়। ধীরে ধীরে রুমাল ভিজিয়ে রিমের কপালে জলপট্টি দিতে থাকে। তার হৃদয়টা দুলছে অস্থিরতায়, চোখে কুয়াশা জমে।
তার কণ্ঠ নেমে আসে কোমল মৃদু সুরে,
“সোনা… চোখ খোলো সোনা। খুব কষ্ট হচ্ছে না তোমার? একটু চোখ খুলে দেখো আমাকে… প্লিজ… আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তো…”
রিমের চোখের পাতাগুলো যেন একটু কাঁপে, কিন্তু খুলে না। ঠোঁট ফেটে গেছে। কপালের একপাশে আঘাতের ক্ষত লাল হয়ে আছে। জেইনের চোখ ছলছল করে ওঠে।
“আমি সরি সোনা… আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। বিশ্বাস করো। আর কখনো কষ্ট দিব না তোমাকে … প্লিজ চোখ খোলো…”
হঠাৎই রিম বেহুঁশ থাকা অবস্থায় দুর্বল হাতে জেইনের কোমর চেপে ধরে। তার নরম মুখটা ঠেসে দেয় জেইনের পেশিবহুল পেটে। আর সেই মুহূর্তেই জেইনের শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ নেমে আসে। রিম অস্ফুটে বিড়বিড় করে কিছু একটা। জেইন কান পাতে‌ অস্থির, উৎকণ্ঠিত।
“আরাত্র… তুমি… যেও না প্লিজ… আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না… প্লিজ যেও না… আমার কষ্ট হবে তো…”

রিমের গলা কাঁপছে। ভেতরে জমে থাকা কান্না, অভিমান, এবং একটা অব্যক্ত ভয় তার কণ্ঠে স্পষ্ট।
জেইনের বুক ফেটে যায়। সে রিমকে বুকের সাথে পুরোপুরি মিশিয়ে নিয়ে বলে
“এই তো আমি সোনা… কোত্থাও যাবো না। আর কোনোদিনও না। আমি প্রমিস।”
রিম চোখ খুলে না, কিন্তু ঠোঁট ফোলায় বাচ্চাদের মতো
“গড প্রমিস?”
জেইন মাথা হেলে দেয়, গলা ভারী হয়ে আসে
“গড প্রমিস…”
“পিংকি প্রমিস?”
একটুকরো হাসি খেলে যায় জেইনের ঠোঁটে বেদনার ভিতর একরাশ কোমলতা
“পিংকি প্রমিস।”
রিম কাঁপা গলায় বলে,
“তুমি আমাকে ভালোবাসবে তো?”

জেইন থমকে যায়। ভালোবাসা? সে কি সত্যিই ভালোবাসে? সে তো এই শব্দটাকেই ঘৃণা করে। ভালোবাসা মানেই তার কাছে মিথ্যে একটা ঠকবাজি, একটা ফাঁকা প্রতিশ্রুতি। সে তো ভালোবাসা বিশ্বাস করে না।
কিন্তু রিমের কণ্ঠে আবার ভেসে আসে একখণ্ড কষ্ট… এক টুকরো আকুতি…
“কি হলো ? বলো আমাকে ভালোবাসবে। জানো আমাকে না, কেউ ভালবাসে না কেউ না। তুমি আমাকে ভালোবাসবে না?”
সে জেইনের বুকের ওপর হাত রাখে। ধ্যান ভেঙে যায় তার। সে শুষ্ক ঢোক গিলে ফেলে। গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে
“হ্য..হ্যাঁ…”
রিমের ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক দুর্বল হাসি। অসহায়, নিষ্পাপ, নিঃশর্ত।
“আমাকে আদর করবে তো?”
জেইন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে রিমকে বুকের সাথে চেপে ধরে, নিঃশ্বাসে মিশিয়ে দেয় রিমের দহন,

“করবো তো… খুব বেশি করবো সোনা… অসহ্য আদর করবো…”
“সত্যিই?”
“সত্যিই… সত্যি… সত্যি।”
“আমাকে কখনো ছেড়ে দেবে না তো?”
“না… কক্ষনো না। পৃথিবী ভেঙে পড়লেও না।”
রিম ধীরে ধীরে ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
“তাহলে… চুমু দাও।”
জেইনের বুক ধক ধক করতে থাকে। শ্বাস আটকে আসে। ঠোঁট শুকিয়ে যায়।
“ইম…”
তার কণ্ঠে বাষ্প জমে ওঠে।
“চুমু খাবো…”
রিম বলেই যায়… বাচ্চাদের মতো একরোখা জেদে।
জেইনের শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। তার বুকের ভিতর প্রলয় ঘূর্ণি তোলে। তার ঠোঁট কাঁপে।
“এখন না সোনা।”
রিমের কন্ঠ কাঁচা, একটা অবুঝ বাচ্চার মতো,

“না এক্ষুনি চাই….”
জেইন এবার রিমের কপালে হালকা চুম্বন এঁকে দেয়।
তারপর আরেকটা… নাকের ডগায়। আর রিম?
সে চোখ বন্ধ করেই প্রতিটা স্পর্শ অনুভব করে।
তারপর হঠাৎ করেই রিম ধীরে ধীরে জেইনের গলায় মুখ গুঁজে দেয়। কাঁপা ঠোঁট থেকে পরপর নরম চুমুগুলো নামতে থাকে।
জেইনের মাথা ঝিমিয়ে যায়। তার হৃদয়ে এখন যুদ্ধ তীব্র অন্ধ জ্বালা, আর এক নিষ্পাপ স্পর্শের ইচ্ছার মধ্যে দোল খাচ্ছে সে। আচমকা রিমের দাঁতের হালকা কামড়ে জেইন যেন এক মুহূর্তের জন্য দম আটকে যায়, ভারসাম্য হারিয়ে বিছানায় ধপ করে পড়ে যায় রিম সহ। রিম পুরোপুরি তার বুকের উপর। দুইজনের দম একে অপরকে ছুঁয়ে যায়, বুকের তাল ঠোকা শব্দ যেন এক হয়ে গেছে।
জেইন আর নিজেকে সামলাতে পারে না। হরিণী যদি নিজে থেকে এসে ধরা দেয় তাহলে বাঘ তো শিকার করবেই। তার বুকের গভীর থেকে হঠাৎ এক পশুর মতো ক্ষুধা জমে ওঠে। যেন বহুদিনের পিপাসা মিটাতে মরিয়া কোনো হিংস্র প্রেমিক। সে রিমকে হেঁচকা টানে নিজের নিচে নিয়ে এসে তার ওপরে উঠে পড়ে। তারপর মাথা নিচু করে তার কপালে একটি চুমু, তারপর চোখের পাতায়, গাল বেয়ে ঠোঁটের পাশে একেকটা চুমু যেন একেকটা প্রতিজ্ঞা, একেকটা আগুন।

সে রিমের গলায় মুখ গুঁজে দেয়, তার নিঃশ্বাসে যেন আগুন লেগে যায়। রিম চোখ বুজে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব জেইনের মাঝে বিলিয়ে দিতে চায়। জেইনের ঠোঁট এবার নামে রিমের কলার বোনের ওপরে, সেই কুচকুচে কালো তিলটার গায়ে দীর্ঘ এক গভীর চুমু এঁকে দেয়, যেন সেই তিলই তার পৃথিবীর কেন্দ্র।
রিমের শরীর যেন আগুনে জ্বলছে। তার উষ্ণতা জেইনের বুক ভেদ করে প্রবেশ করে তার শিরায় শিরায়। এলোমেলো হাতে সে ছুঁয়ে দেয় রিমের স্পর্শকাতর স্থানগুলো সাবধানে, অথচ নির্ভুলভাবে। যেন সে পড়ে নিয়েছে রিমের শরীরের ভাষা। রিম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। এক হাতে তার চুল টেনে ধরে, অন্য হাতে পিঠ খামচে দেয়। তার নখ যেন ভালোবাসার ছাপ কেটে দেয় জেইনের পিঠে।
জেইন এবার তার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে গভীরভাবে নিশ্বাস নেয়, যেন রিমের সুবাসই তার একমাত্র নেশা। তার একমাত্র ড্রাগস।

তার এক হাত ধীরে ধীরে রিমের টি-শার্টের নিচে ঢুকে যায়। কোমরে রাখে নিজের শক্ত হাত। রিমের শরীর তার ছোঁয়ায় গলে পড়তে চায়। রিম গুঙিয়ে ওঠে। ঠোঁটের ফাঁক থেকে ফস করে বেরিয়ে আসে অস্পষ্ট শব্দ। এক ধরনের সুখ যন্ত্রণার মিশ্র অনুভব। জেইন নেশাগ্ৰস্থের মতো তার ঠোঁটে আঙুল রাখে। তীব্র উন্মাদনায় ফিসফিসিয়ে বলে,
“Shhh… ডিস্টার্ব করে না সোনা। Tonight, I want to feel everything.”
সে রিমের টি-শার্ট আস্তে আস্তে উপরের দিকে তোলে, যেন কোনো মূল্যবান শিল্পকর্ম উন্মোচন করছে। রিমের শরীরে টি-শার্ট ছাড়া আর কিছু নেই। জেইনের চোখে তীব্র আগুন, ঠোঁটে নরম মাদকতা। সে রিমের বুকের নরম জমিনে আলতোভাবে ঠোঁট ছোঁয়ায়। এক ফিসফিস কণ্ঠে বলে,
“উমম্… সফ্ট এন্ড বাউন্সি…I like it.”

রিম তখন চোখ বন্ধ করে রাখে, কিন্তু তার শরীর শিহরণে মুচড়ে মুচড়ে ওঠে, প্রতিক্রিয়া বলে দেয় । সে অনুভব করছে, ভালোবাসছে, এবং ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণ করছে।
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে, নিঃশ্বাস যেন আটকে যায়। বাইরে কোথাও বৃষ্টি পড়ছে কিনা, কেউ জানে না। এই ঘরেই এখন ঝড় চলছে এক নিঃশব্দ প্রেমের ঝড়।
জেইন এবার একটু উঠে আসে। তারপর তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় রিমের ঘাড়ের কোমল ত্বকে। একেকটা চুমু যেন আগুনের আঁচ… আস্তে আস্তে উঠে আসে কানের পাশে নরম তুলতুলে লতির ওপর দাঁত বসিয়ে দেয় সে। রিম শরীরটা কেঁপে ওঠে এক ঝাঁকুনিতে… হঠাৎ করেই যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় সারা শিরায়-উপশিরায়। অবচেতনেই রিম তার মাথা নামিয়ে এনে জেইনের বুকের পাশে সেই ছোট্ট লালচে গোলাপি বিন্দুতে দাঁত বসিয়ে দেয়।
জেইনের আঙুল শক্ত হয়ে আসে… খামচে ধরে বিছানার চাদর। তার ভিতরের হিংস্র শিকারী যেন হঠাৎ জেগে ওঠে হিংস্র, লোভী, নেশাগ্রস্ত। সে হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে রিমের ঠোঁটের ওপর, চেপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট। চুমুটা ছিলো আগুনের মতো, যেন দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে শরীরজুড়ে।

রিমের গরম, দগদগে নিঃশ্বাস তার মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়ে জেইনের বুকে, গলায়, আঙুলের ফাঁকে… জেইন চুমুতে আরও গভীর হয়ে যায়। সেই চুমু আর স্নেহময় নয়, সেটা এখন পিপাসু… যেন রিমের ঠোঁটের প্রতিটা বিন্দু সেই লালা যুক্ত ঠোঁট তার কাছে অমৃতের মতো।
সে রিমের ঠোঁট এমনভাবে শুষে নিচ্ছে, যেন পুরোটা গিলে নিতে চায়। সময় গড়ায়, কিন্তু জেইনের তৃষ্ণা থামে না ততক্ষণ অবধি না, যতক্ষণ না রিম পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
তার জিহ্বা এবার ছুঁয়ে যাচ্ছে রিমের মুখের প্রতিটা কোণা… একটা ঘোর তৈরি হয়, রিম যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছে… একেকটা স্পর্শে সে কেঁপে ওঠে। বাঁধন ছিঁড়ে যায়… একসময় রিম নিজেও চুমুর মাঝে হালকা হালকা দাঁত বসিয়ে দেয়… যেন প্রতিরোধের একটা অস্পষ্ট চেষ্টা।
কিন্তু সেই প্রতিরোধ জেইনের কাছে আরেকটা উস্কানি হয়ে দাঁড়ায়। রিমের শরীর মুচড়ে ওঠে, চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে উষ্ণ, নোনা জল।
জেইন তার ঠোঁটগুলো আরও গভীর করে টেনে নিতে থাকে, যেন সেই ব্যথা, সেই প্রতিবাদ, সেই কান্না সবটুকু নিজের ভিতরে শুষে নিতে চায়।
রিম হাঁপিয়ে ওঠে, নিঃশ্বাস আটকে আসে… সে ছটফট করে, ঠেলতে থাকে জেইনের বুক। কিন্তু জেইন অমানবিক। একরাশ নেশায় বুঁদ হয়ে গেছে সে। সে রিমের দুই হাত একহাতে ধরে বিছানার সাথে চেপে রাখে। মুখে একটা বিরক্তির ছায়া,

“উফ্… এত নড়াচড়া করো কেন? Disturb হচ্ছে তো। একটু শান্ত থাকতে পারো না? খুব বেশি জ্বালাতন করো তুমি। দেখছো না আমি কত Important একটা কাজ করছি? এবার একদম নড়বে না… ওকে সোনা?”
রিম শান্ত হয়ে আসে। নিজের ছোট্ট দূর্বল হাতে জেইনকে শক্ত করে আকড়ে ধরে। জেইন আবারো তার গলায় মুখ গুঁজে দেয়। তারপর একের পর এক চুমু থেকে আস্তে আস্তে ছোট ছোট কামড়ে ভরিয়ে দেয়। রিমের গলা, কাঁধ, ঘাড়জুড়ে জেইনের দাঁতের ছাপ বসে যায়। প্রতিটা কামড়ের সাথে রিমের দেহটা কেঁপে ওঠে। একপাশে ব্যথা, অন্য পাশে এক বিষাক্ত শিহরণ। যেন নিজের চিহ্ন পুরোটা গায়ে এঁকে দিতে চায়। রিম ব্যাথায় কুঁচকে যায়। ছটফটানি বাড়তে থাকে। সেই সাথে জেইনের বিরক্তি। সে একটু থেমে ঠোঁট ফাঁক করে নিঃশ্বাস টেনে আবারও ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। এক গভীর কামুক চুমুতে। চুমুর গভীরতা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। মুখের লালা মিশে একাকার হয়ে যায়। প্রথমে আদুরে ছোঁয়া থাকলেও, ক্রমে জেইনের ভেতরে যেন এক আগ্রাসী সত্তা জেগে ওঠে। সে আবারও চুমুর মাঝে দাঁত বসিয়ে দেয়। রিম সহ্য করতে পারে না। তার দুই হাত জেইনের এক হাতে বন্দী। তার শরীর যেন জড় হয়ে আসছে। দুর্বল হয়ে পড়ছে এক টানটান ছোঁয়ার মাঝে। শ্বাস নিতে চায়… কিন্তু জেইনের নিঃশ্বাসেই যেন দম আটকে যাচ্ছে।
সে ফিসফিস করে উঠে,

“আই কান্ট… ব্রিথ…”
কিন্তু জেইন তখনো চুমুর গভীরে ডুবে। তার শরীরের প্রতিটা পেশিতে একরকম উন্মাদনা। সে হঠাৎ করেই ঠোঁট কামড়ে দেয়। শক্ত করে। রিমের ঠোঁট থেকে রক্তের সোঁদা স্বাদে ভরে ওঠে তার মুখ। একটা চাপা গোঙানিতে কুঁচকে যায় রিমের চোখমুখ। তপ্ত নোনা জল গড়িয়ে পড়ে চোখের কোণ বেয়ে।
শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার, সে গলা ছেড়ে নিতে চায়। কিন্তু জেইন তার নিঃশ্বাসও গিলে ফেলে। একটুও ফাঁক রাখে না। হাতটা রিমের কোমর ছুঁয়ে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকে। সে রিমের প্যান্টে হাত রাখে।
ঠিক তখনি এক তীব্র, কর্কশ শব্দ মাথায় আঘাত করে।
জেইনের চোখে রাগ জ্বলে ওঠে, তীব্র বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ে তার মুখে। ওর ভিতরটা জ্বলে যায় বিরক্তিতে। সে থামে না। ঠোঁট ফাঁক করে রিমের গরম নিঃশ্বাস টানতে টানতে আবার মন বসাতে যায় তার “কাজে”।
ঠিক তখনই আবার

“ভাইইই… শুনছেন? ড্রেভেন’কে নিয়ে এসেছি! সাথে লুকা’কেও…”
জেইন থেমে যায়। রিমের ঠোঁট থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে হঠাৎই হাঁপাতে শুরু করে। তার আকাশি আর ধূসর মেশানো চোখদুটো রক্তাভ হয়ে উঠেছে। শ্বাসগুলো যেন গলার নিচে আটকে আছে। চোখ আটকে যায় রিমের লাল হয়ে ওঠা, ফোলা ঠোঁটে।
সে আবারও ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে… আবারও চাইছে।
আর ঠিক তখনই,
“ভাই, পাসওয়ার্ড খুলে গেছে। আমরা কি ভেতরে আসবো?”
মাথার শিরা ফেটে যাওয়ার উপক্রম! জেইনের চোখ ঘোলা হয়ে ওঠে রাগে। বিছানায় ঘুষি মেরে উচ্চারণ করে
“Fu*ck off…”

সে রিমের দিকে তাকায়। আর সেই মুহূর্তেই যেন বজ্রাঘাত। মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে। নিঃসাড় দেহ। ঠোঁট রক্তমাখা। ঠোঁটে কোনো নড়াচড়া নেই। সে পুরোপুরি অবচেতন হয়ে গেছে।
এক মুহূর্তে মনে পড়ে যায়, মেয়েটা অসুস্থ…তাপপ্রবাহে জর্জরিত! সে কী করছিল এতক্ষণ…? জ্ঞান থাকলে হয়তো এখনই তাকে থাপ্পড় মেরে দিত। বাসরের আগেই বনবাসে পাঠিয়ে দিত।
শরীরটা কেঁপে ওঠে। চোখ বড় হয়ে যায় লজ্জায়, অপরাধবোধে, বিস্ময়ে।
সে কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকায়। বাইরে ভোরের আলো ঢুকে পড়েছে। নির্লজ্জ আলো, যা তার গোপনতম দানবটাকে ফাঁস করে দিচ্ছে।
“ভাই? কি হয়েছে? সাড়া দিচ্ছেন না কেন?”
জেইন হঠাৎ করেই বাস্তবে ফেরে। সে দ্রুত হাতে রিমের টি-শার্টটা ধরে টেনে টুনে ঠিক করে দেয়, তারপর কম্ফোর্টারটা টেনে নিয়ে যত্ন করে ঢেকে দেয় তার পুরো শরীর। যেন কিছুই ঘটেনি। যেন কেউ কিছু দেখবে না।
তারপর এক গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে গলা নিচু করে বলে

“ভেতরে আয়।”
দরজা খোলার সাথে সাথেই তিনজন হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায় মেঝেতে। মাত্তেও, ড্রেভেন, লুকা তিনজনই জেইনের পায়ের কাছে পড়ে আছে, যেন তিনটা বেওয়ারিশ কুকুর হাড় খুঁজতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
জেইনের চোখের রঙ তখন বদলে যায় আগুনে লালচে। তার সাদা-আকাশি মেশানো চোখদুটো যেন মরুভূমির গরম হাওয়ার মতো ঝলসে দিচ্ছে তাকানো মাত্রই।
সে একবার নিচের দিকে তাকায়, তারপর ঠান্ডা, শুষ্ক কণ্ঠে বলে
‘তোরা দু’জন যা…”
মাত্তেও হাবলার মতো মাথা চুলকে ওঠে, তার কণ্ঠটা গলা শুকনো ভয়ের মতো কাঁপছে,
“জি ভাই…?”

জেইনের চোয়াল টাইট হয়ে ওঠে, মুখটা বীভৎস রকম থমথমে হয়ে যায়। এক পা সামনে বাড়িয়ে সে ওঠে ,
“তোদের যেতে বলেছি আমি, শুনিসনি?”
তার কণ্ঠে এমন হাড়-কাঁপানো শীতলতা যে মনে হয় মুহূর্তেই রক্ত বরফ হয়ে যাবে।
ড্রেভেন আর লুকা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। জেইন মাত্তেওকে ঠেলে দেয় পেছনে,
“Get out, before I rip your tongue out and feed it to my’s pet wolf.”
ঠিক তখনই দরজার পাশ দিয়ে ছুটতে ছুটতে আসে ইয়াশ। হন্তদন্তভাবে। শ্বাস কন্ট্রোলে আনতে পারছে না সে। মুখটা লাল হয়ে আছে দৌড়ের পর। জেইনের চোখ সেখানে গিয়ে থামে। ঠোঁটে একরকম বিদ্রূপ ঝুলে পড়ে।
“ও এখানে কী করছে?”
তার কণ্ঠ যেন বুলেট ঠাসা বন্দুকের মতো।
মাত্তেও এবার সত্যি কাঁপতে থাকে। সে নিচু গলায় আমতা আমতা করে,
“ইয়ে মানে ভাই… আমি ভেবেছিলাম আপনি বা ভাবী… মানে কিছু হয়ে গেলে যদি… আমি একটু টেনশনে ছিলাম… তাই ইয়াশ ভাইকে ডাকছিলাম আরকি।”
জেইনের মুখ ঠান্ডা, কিন্তু চোখ আগুনে। একধরনের শিকারীর ক্ষুধা আর অত্যাচারীর অধিকারবোধ তার চোখে ফুটে ওঠে।
সে নিজেই গলার নিচে একবার চেপে ধরে রাগ চেপে রাখে। ঠোঁট বেয়ে একটা শব্দ বের হয়,

“ইডিয়ট…”
ইয়াশ সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে সন্দেহ, কণ্ঠে ধৈর্য।
“কি হয়েছে টা কি? আমাকে একটু বলবি তোরা?”
সে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে রিমের দিকে তাকায়, মেয়েটি তখনো অচেতন, মুখে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। তার ঠোঁট ফুলে আছে,ক্ষতরঙ। এই দৃশ্য দেখে ইয়াশের ভ্রু কুঁচকে যায়। প্রশ্নটা তার চোখেই ঝুলে থাকে।
মুহূর্তেই জেইন অস্থির হয়ে ওঠে। তার ফায়ারফ্লাই সেন্সলেস হয়ে আছে আর সে এখানে দাঁড়িয়ে ইডিয়ট গুলোর নাটক সহ্য করছে? রিডিকিউলাস!
তার চোখের মণি লালচে আভা নিয়ে জ্বলজ্বল করে উঠল। সে ড্রেভেনের শার্টের কলার খামচে ধরে একইসাথে টেনে নিয়ে এল ঠিক নিজের সামনে।
ড্রেভেন ভয়ে হকচকিয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জেইন তাকে ঠেলে ছুঁড়ে ফেলে বিছানার সামনে।

“এক্ষুনি ওর জ্ঞান ফিরিয়ে দে। নইলে ট্রেজানের গর্তে ঠেলে দেবো তোকে।”
ড্রেভেন চুপচাপ প্রাণপণে নিজেকে সামলে রিমের দিকে এগুতে যায়। ঠিক তখনই জেইন চেঁচিয়ে ওঠে, গর্জনে ছিন্নভিন্ন করে দেয় ঘরের নিস্তব্ধতা।
“হেই.. don’t touch her.!”
আচমকা থমকে যায় ড্রেভেন। পেছনে সরে যায়। তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে।
“না ছুঁলে… চেকআপ করব কীভাবে?”
জেইনের চোয়াল টনটন করে ওঠে। ঠোঁট কাঁপছে রাগে, চোখদুটোতে আগুন।
“সেটা তোর সমস্যা। আমি শুধু জানি, ওর জ্ঞান ফিরে আসা উচিত। এক্ষুনি। না হলে তোর শ্বাস বন্ধ করে দেবো।”
ড্রেভেন কোনোভাবে হাত কাঁপিয়ে এগোয়। দূর থেকে স্টেথোস্কোপ এগিয়ে শুনতে চায়, কপালে হাত না রেখেই থার্মোমিটার ধরে। গলার স্বর অস্পষ্ট।
“জ্বর ভয়ানক। তাপমাত্রা ১০৪ ছাড়িয়ে গেছে। স্যালাইন লাগাতে হবে। কিন্তু মনে হচ্ছে দু’দিনের আগে ওর জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা নেই…”

এক মুহূর্তে ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে হিংস্র স্নায়ুবিক চাপ। জেইনের স্নায়ুতে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। চোখের পাতা না ফেলেই সে তাকিয়ে থাকে ড্রেভেনের দিকে।
তার ঠোঁট থরথর করে। গলার স্বর আগ্নেয়গিরির গর্জনের মতো।
“দু’দিন মানে! বলছিস আমার ফায়ারফ্লাই দুইদিন এইভাবে পড়ে থাকবে? তুই বুঝি আমাকে পাগল বানাতে চাস? ওর জ্ঞান ফেরাবি Right now.”
ড্রেভেন কাঁপছে, ফিসফিস করে।
“এটা মেডিকেল রিয়্যালিটি। ওর মাথায় ধাক্কা লেগেছে, শরীর দুর্বল, জ্বর তীব্র…”
চটাস!! জেইন কোনো কথা না বলে হুইস্কির বোতলটা টেবিল থেকে তুলে নেয়।
“তুই আমাকে ডাক্তারি শেখাচ্ছিস!!”
চোখে খুনচাপা শ্বাস টেনে সে গর্জে ওঠে,
“ওর যদি কিছু হয়… তোকে আমি গুলি করবো না, খালি হাতে ছিঁড়ে ফেলবো। বুঝেছিস?”
ঠাস!! একটা হিংস্র আঘাত। হুইস্কির বোতলটা ঠিক ড্রেভেনের কপালের উপর ভেঙে পড়ে। চিড়চিড় করে রক্ত ছিটকে উঠল। ড্রেভেন স্তব্ধ। তিন সেকেন্ড চুপচাপ।

তারপর ধীরে ধীরে কাঁপা হাতে মাথায় হাত রাখে। টিপ টিপ করে গড়িয়ে পড়ে রক্ত। সে হাতটা সামনে আনতেই দেখা যায় লাল তরল তার আঙুলের ফাঁকে। মাথাটা যেন মুহূর্তেই চক্কর দিয়ে ওঠে।
রিমের পাশে দাঁড়ানো জেইনের বুক উঠানামা করছে ভারি নিঃশ্বাসে। তার চোখে আগুন, আর ঠোঁটে ফিসফিস,
“আমার ফারারফ্লাই কষ্ট পাচ্ছে। এটা সহ্য করতে পারি না আমি…”
সে ছটফটে বিছানায় রিমের মাথাটা কাছে বসে। গালের দুপাশে নিজের দুহাত রাখে।
“সোনা তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে না। কিচ্ছু হবে না তোমার। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে দেখো।”
সে ঠোঁট ডাবিয়ে রিমের কপালে চুমু খায়। সেই স্পর্শে যেন চিরস্থায়ী মালিকানা ছুঁকে দেয় সে। আর তখনই পেছন থেকে ইয়াশ তাকে গলা থেকে ধরে হিঁচড়ে টেনে তোলে।
ইয়াশ গর্জে ওঠে,

“এসব কী হ্যাঁ?তুই তো বলেছিলি, তুই ওর গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত পড়তে দিবি না! এখন দেখ, একদিনেই কী অবস্থা করেছিস ওর? ওর চোখে শুধু ভয়, মুখে রক্ত একে তুই সুরক্ষা বলিস?”
জেইন থেমে যায়। তার চোখের মণি যেন মুহূর্তে পাথরের মতো হয়ে ওঠে। হঠাৎ সে ঝাঁকুনি দিয়ে ইয়াশকে সরিয়ে ফেলে। ইয়াশ ধাক্কা খেয়ে পেছনে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। কিন্তু জেইন থামে না দু’হাতে ধরে ওর কলার টেনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“হ্যাঁ, আমি-ই ওকে মেরেছি। আবার আমিই আদর করবো। ওর উপর সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমার। ও আমার। ওর শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি, প্রতিটা দাগ আমার নামে লেখা। আমার ছায়া ছাড়া কারো ছোঁয়া পর্যন্ত সহ্য করবো না।”
সে এক আছড়ে ইয়াশকে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দেয়। মার্বেলের মেঝে কেঁপে ওঠে। ড্রেভেন’কে আগলে বসে থাকা মাত্তেওকে ঠান্ডা স্বরে বলে,

“ওটাকে নিয়ে যা এখান থেকে। ওর মুখ আর দেখতে চাই না আমি।”
ইয়াশ গোঁ গোঁ করে উঠে বসে, মুখে রক্ত জমে আছে। সে থুতু ফেলে বলে,
“তুই যে ওকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিলি। এবার রিমের চিকিৎসাটা হবে কি করে?”
বলতেই মুহূর্তেই জেইনের হাত আবার চলে যায় ওর গলায়। এবার সে এক হাতে ওকে শ্বাসরুদ্ধ করে তোলে।
“তোকে কতবার বলেছি, ওর নাম মুখে নিবি না। বলেছি মা বলবি। এখনি বল!”
ইয়াশ গলা চেপে ধরা অবস্থাতেই ঠোঁট কামড়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
“হোয়াট ননসেন্স ইজ দিস ইয়ার? মনে হচ্ছে তোর হাতেই একদিন মারা পড়বো আমি।”
জেইনের চোখে আগুন। রক্ত যেন তার কানে উঠে গেছে। চাপা গর্জনে বলে,
“একদম ঠিক বলেছিস। আমার হাতেই মরবি যদি আর একবার ওর নাম উচ্চারণ করিস।”
ইয়াশ জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। চোখ জ্বলে যাচ্ছে, কিন্তু তবুও ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি। সে গলা ঝেড়ে বলে,
“ঠিক আছে, আব্বা। আপনার কলিজার টুকরা, সোনার খনি, চাঁদের টুকরো বউ’কে আমি এখন থেকে ‘আম্মা’ বলেই ডাকবো।”

জেইনের কপালে লাইন পড়ে যায়।
“আব্বা মানে?”
ইয়াশ গম্ভীর মুখে বলে,
“কেন? যদি ও আমার মা হয়, তবে তুইই তো আমার আব্বা! … Am I wrong?”
জেইন কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে ফেলে। অস্বস্তিকর এক নীরবতা ঘরে ভর করে।
“রাইট। শেষমেষ তোর ভাগ্যেও বাবা-মা জুটলো। এবার ভালো ছেলে হ হয়ে একটু প্রাইভেসি দে আমাদের। কেটে পড় এখান থেকে।”
ইয়াশ জেদ করে মুখ ফুলিয়ে বলে,
“না না, আমি মায়ের কাছে থাকবো।”
সেই মুহূর্তে, জেইনের হাত এক ঝটকায় ওর পেটে ঘুষি বসায়। ইয়াশ বেঁকে যায়। মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত “উপ্…” শব্দ বের হয়। জেইন তার থুতনি চেপে ধরে কানে ফিসফিস করে বলে,
“মায়ের কাছে থাকতে শখ তো? তোকে আমি ছেলে হিসেবে আর মানি না। তোকে এতিমখানায় রেখে দেবো। একটা নতুন প্রোডাক্ট ডাউনলোড করতে হবে‌ যে আমাদের প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু তার আগে… আগে আমার বউ’কে সুস্থ করতে হবে।”
সে মাত্তেও’র দিকে তাকিয়ে হুকুম দেয়,

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৬

“তুই এখনো দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিস? ওটাকে নিয়ে বিদেয় হ। নইলে ওর কলিজা ছিঁড়ে বের করবো। আর শোন, এখনই একজন স্পেশালিস্ট ফিমেল ডাক্তার পাঠাবি। এমন একজন যার মুখে কথা কম, কাজে মন থাকবে”
মাত্তেও শুষ্ক গলায় ঢোক গিলে ফেলে। তাড়াতাড়ি ড্রেভেনকে নিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ভেতরে ভয় জমে আছে আজ যদি সামান্য কিছু ভুল করে, তবে হয়তো সত্যি সত্যিই এই পাগলটা কারো বুক চিরে কলিজা হাতে নেবে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৮