Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৬

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৬

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৬
রাত্রি মনি

পেন্টহাউজের একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আছে একটা সাউন্ডপ্রুফ, জানালাহীন, ধাতব দরজাওয়ালা ঘর। বাইরের দিক থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী আছে। দরজার ওপর একটা ছোট্ট ফলক
“Hellchamber”
দরজাটা খুললেই ঘ্রাণে ভেসে আসে জং ধরা লোহার, শুকনো রক্তের, আর antiseptic-এর একটা গন্ধ ,মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো।
ঘরের ভেতরটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়‌ ছাদ থেকে ঝুলে আছে একটাই লাল আলো। আলোর নিচে একটা কালো লেদার চেয়ার বেঁধে ফেলার জন্য স্টিলের চেন আর হাতকড়া লাগানো। চেয়ারটার চারপাশে ছড়ানো –
তীক্ষ্ণ ছুরি, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র, একটা রাবারের হ্যামার, একটা রডে গেঁথে থাকা আগুনে পুড়িয়ে নেওয়ার জন্য প্যাড। এবং একটা ছোট্ট ট্রে, যেটাতে রাখা থাকে ৩টা সিরিঞ্জ। একধরনের বিষাক্ত Poison!
দেয়ালে হালকা করে খোদাই করা কিছু লাইন কেউ বুঝতে পারবে না প্রথমে, যতক্ষণ না আলো পড়ে,

“Welcome to the kingdom of hell.”
ঘরের এক পাশে একটা জলের পাইপ ঝুলে আছে কোনো সময় প্রেশার দিয়ে টর্চার করার জন্য।
আরেকদিকে একটা ছোট্ট ক্যামেরা ঘোরাফেরা করে… রেকর্ড করে প্রতিটা মুহূর্ত। জেইন মাঝে মাঝে ভিডিওটা দেখে নিজেই নিজের রাগ শান্ত করে।
ঘরের মেঝে কংক্রিটের, জায়গায় জায়গায় লাল দাগ – কেউ জানে না ওগুলো আগের কার রক্ত। একবার ঢুকলে বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। এখানে কান্না, অনুনয়, ক্ষমা কোনোটাই মূল্যহীন।
চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু জং ধরা চেনের হালকা ঠনঠন শব্দ। রিশাবের দেহটা চেয়ারে বাধা, গলা পর্যন্ত ব্যান্ডেজ। চোখ বন্ধ, ঠোঁট ফেটে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে গেলেই মনে হয় বুকের হাড় ভেঙে যাবে।
তার সামনেই আরাম করে বসে আছে জেইন ।একটা রাজকীয় চেয়ারে, ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আছে তার শিকারের দিকে। হাতে এক গ্লাস ওয়াইন, চোখে খুনি আরাম।
হঠাৎ জেইনের কণ্ঠ বিস্ফোরণ হয়ে ঘরের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে দেয়,

“কেমন লাগছে এখন?”
তার গলায় এমন ঠান্ডা যন্ত্রণা, যেন প্রশ্ন নয়, উপহাস।
রিশাব চোখ খুলতে পারে না। শরীর কাঁপছে। একফোঁটা শ্বাস টেনে বলে
“রিম কোথায়?”
ঠিক তখনই , বzzzট!
একটা শক ডিভাইস চেপে ধরেছে জেইন। রিশাবের সারা শরীর কেঁপে ওঠে, চিৎকার থেমে গিলে ফেলে সে। ব্যথায় শরীর মোচড় দেয়। জেইন ঠান্ডা গলায় বলে
“এই নামটা মুখে নিবি না… ও এখন আমার বউ। আমার একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি। নিজের বউয়ের নাম পরপুরুষের মুখে শুনতে আমার ভীষণ বাজে লাগে। আন’ইজি ফিল করি। আই ডোন্ট লাইক দ্যাট।”
রিশাবের বুক ধক করে ওঠে। যন্ত্রণায় থরথর করছে। কষ্টে গলা শুকিয়ে গেছে। তবু সে ফোঁস করে বলে,

“মিথ্যে বলছিস তুই। রিম কখনোই তোকে বিয়ে করতে পারে না।”
জেইন ঠোঁট কামড়ে এক নেশাগ্রস্ত হাসি দেয়,
“শুধু বিয়ে না… আরও অনেক কিছুই করেছে। এই যে দেখছিস ঠোঁটের কোণে লাল দাগ? লাভ বাইট! ওরই দেয়া। জংলি বিড়ালের মতো কামড়েছে। টেস্ট করেছি… ভেরি সুইট। আশ মিটেনি এখনো মাংস চিবোতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে তো করছিল ওভাবেই চিপকে থাকি জনম জনম। কিন্তু কি বল তো- বাচ্চা মেয়ে তো, তাই সামলাতে পারে না। বাট ডোন্ট ওয়ারি আস্তে আস্তে সব শিখিয়ে পড়িয়ে নেব ওকে।‌ অভ্যেস করিয়ে দেবো।”
তার চোখে এক রকম পৈশাচিক আরাম। ওর কথার প্রতিটি শব্দ রিশাবের বুক চিরে ঢুকে যায়। রিশাব ফুঁসে ওঠে,
“তুই ওকে জোর করে আটকে রেখেছিস! ও তোকে ঘৃণা করে। কখনো সুখী হবে না তোর সাথে।”
জেইন ঠোঁট কামড়ে হাসে,

“ও আমার সাথেই সুখী থাকবে। সুখের চাদরে মুড়িয়ে রাখবো ওকে জীবনেও আর…….”
সে এবার একটু ঝুঁকে আসে, রিশাবের কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
“বিছানাতেও।”
সে এক চোখ মেরে দেয়। তারপর আবার বলে,
“তুই যে কাজটা রাতে একবার করবি, সেটা আমি দিনে ন’বার আর রাতে…..”
সে একটা বাকা হাসি দেয়।
“হোল নাইট সুখ দিয়ে ভরিয়ে রাখবো ওকে। এতটা সুখ দেবো যে ও শুধু ফিসফিস করে একাই নাম ডাকবে….. জেইন!! ও চিৎকার করবে কিন্তু সেটা সুখের, আমি নামক সুখ।”
রিশাব ক্রোধে জ্বলে ওঠে,কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে ওঠে,
“বা*স্টার্ড!!!!!!”
জেইন ব্যঙ্গ করে ওঠে,

“অ্যা অ্যা আ… একদম না। এত মারলাম তারপরেও শরীরে এত জোর? গন্ডারের চামড়া মনে হচ্ছে! তোকে চাইলে একেবারেই শেষ করে ফেলতে পারতাম। উফ্! কিন্তু কি বলতো? আমার বউয়ের আবার দরদ একটু বেশি। ওর বাকি সব ভালো লাগলেও এই জিনিসটা না একদম বিরক্তিকর। আমি ছাড়া সারা দুনিয়ার সবার জন্য যত মায়া।সে যাই হোক বউয়ের কথা তো আর ফেলতে পারি না। বউটা বড্ড আদরের। তাই তোকে বাঁচিয়ে রাখলাম। তবে শাস্তি তো পেতে হবে। তোকে প্রতিদিন টর্চার করবো। তারপর যত্ন সহকারে চিকিৎসা দিয়ে সারিয়ে তুলবো। তারপর আবার যন্ত্রণা দিবো। ওর থেকে দূরে থেকে যতটা যন্ত্রণায় ছটফট করছি আমি তার থেকে হাজার গুণ বেশি যন্ত্রণা ফেরত দিব তোকে।”

তারপর সে একটু পিছিয়ে যায়। তার চোখে একটা খুনি উল্লাস, যেন পরের মুহূর্তটাই তার সবচেয়ে প্রিয়। সে একটা লোহার ট্রে থেকে ধাতব টুল তুলে নিল একটা পাতলা কিন্তু ধারালো surgical knife। ঘরের বাতাসেই যেন শিরশিরে ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ল। সে ঠান্ডা গলায় বলে,
“ওর নাম মনে আছে তো? আজ সেই নাম মুখে আনার শাস্তি দিচ্ছি।”
সে এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে রিশাবের বুকের ওপর হ্যাঁচকা টানে ব্যান্ডেজ ছিঁড়ে ফেলে। ওই জায়গাতেই আচমকা ছ্যাঁক!! একটা গভীর দাগ কেটে দিল নাহ, মেরে ফেলার জন্য না। শুধু ব্যথাটা টানতে থাকবে, অনেকক্ষণ।
রিশাব আর্তনাদ করে ওঠে। শরীরটা মোচড় দেয় চেয়ারে বাঁধা অবস্থায়। জেইন থেমে যায় এক মুহূর্ত। হাত তুলে হামি দিতে দিতে বলে,

“উফ্ আরেকটু জোরে চিৎকার কর। মজা পাচ্ছি না তো!”
তারপর সে হঠাৎ ব্যথার জায়গায় অ্যালকোহল ঢেলে দেয়। রিশাবের শরীর আরও একবার খিঁচকে ওঠে। মুখে যন্ত্রণার ছাপ থাকলেও চোয়াল শক্ত। ক্র্যাক! জেইন হঠাৎ রিশাবের এক পা ভেঙে দেয় একটা মোচড়ে।
ব্যথায় রিশাবের চোখ লাল হয়, কিন্তু সে তবুও একফোঁটা জল ফেলেনা। শুধু ঠোঁটের কোণে রক্ত মেশানো একটুখানি ব্যঙ্গের হাসি ফেলে।
“আমাকে ভাঙতে পারবি কিন্তু হারাতে নয়।”
রাগে জেইনের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। হাতের মুষ্টি আঁটসাঁট হয়ে ওঠে। তার সমস্ত পেশি দৃশ্যমানন। সে এবার ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার চোখে এক ভয়াবহ প্রশ্রয়,

“তুই মরবি- রোজ। একবার নয়, একেকবার, একেকভাবে। আমার ফায়ারফ্লাইকে ছুঁতে গিয়েছিলি! এখন আমি তোর প্রতিটা হাড়ে আমার দখল রাখবো।
সে এবার ঘড়ির দিকে একবার তাকায়, তারপর তার ঠান্ডা গলায় বলে
“Now, he’s ready…Doctor, you may come in.”
ঘরের দরজা খুলে এক সাদা কোট পরা ডাক্তার ভয়ে ভয়ে ভিতরে ঢোকে। জেইনের ঠাণ্ডা নির্দেশ
“ওর প্রতিটা হাড় যেন জোড়া থাকে, কিন্তু ব্যথা ঠিকই টিকে থাকে। ওর চিকিৎসা করো, একদম নিখুঁতভাবে।এটা আমার স্পেশাল গেস্ট। যত্ন করতে হবে।”
জেইন বড়বড় পা ফেলে বেরিয়ে যায়, ঘরের চারদিকে আবার নেমে আসে সেই নরকসম নিস্তব্ধতা।

জেইন “Hellchamber” থেকে বেরিয়ে লিফটের বদলে নেমে আসে সরাসরি একটা underground metallic vault-এর মতো এক জায়গায়। দোতলার নিচে পাথরের দেয়াল, ছাদের গায়ে লাল-বেগুনি আলো। বাতাস ঘন, ঘামে ও রক্তে ভেজা। একটা বিশাল শাটার ধীরে ধীরে খুলে যায়। আর তখনই সামনে দেখা যায়- ‘Zain’s Beast Chamber’।
সেখানে দু’দিক-
একদিকে বিশাল কাঁচের খাঁচায় বন্দী একটা সাদা বাঘ তার চোখে পাগল হিংস্রতা, থাবা দিয়ে সমানে কাঁচের দেয়ালে আঘাত করছে।
আরেকদিকে, আশিটি হাইব্রিড নেকড়ে , শৃঙ্খলিত, কিন্তু তাদের ঘড়ির কাঁটার মতো ঠাণ্ডা, ক্ষুধার্ত চোখ শুধু সামনে তাকিয়ে।

আর ঠিক মাঝখানে শিকলে ঝুলে থাকা রক্তাক্ত একটা দেহ। আন্তোনিও। তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ঠিক বাঘটার চোখের সামনে।তার দেহের চামড়া ছিড়ে গেছে অনেক জায়গায়, রক্ত জমাট বাঁধা, পাঁজরগুলো দৃশ্যমান। দম নিতে পারছে না, কিন্তু চোখ এখনো খোলা ভয়ে, আর অজানা আতঙ্কে।
জেইন এগিয়ে যায় ধীর পায়ে। তার হাঁটার শব্দই ঘরের ভেতরে ধাতব প্রতিধ্বনি তোলে। বাঘটা গর্জে ওঠে। কিন্তু জেইন থামে না। সে গিয়ে বাঘটার খাঁচার সামনে দাঁড়ায়।একটা ঠান্ডা স্বরে বলে,
“Shhhh… Trejan… সে এখনো মরেনি। Wait, baby boy…”
তার গলায় মাতৃস্নেহ আর খুনে প্রশ্রয়ের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। বাঘটা থেমে যায়। কানে যেন কেউ ফিসফিস করে আদর করছে। বাঘটা সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ধীর হয়ে আসে। তারপর জেইন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় আন্তোনিওর সামনে। তার রক্তাক্ত শরীরের কাছাকাছি গিয়ে সে থুতনিতে আঙুল রাখে। তার চোখে অদ্ভুত এক উল্লাস, ঠোঁটে নিঃশব্দ ফিসফাস

“তুই ভাবছিলি আমি ভুলে গেছি? ভেবেছিলি আমার ফায়ারফ্লাইয়ের খবর লুকিয়ে, Alessandro-কে আমার বিপক্ষে পাঠিয়ে আমাকে থামাতে পারবি? No, Antonio. I don’t forget. I don’t forgive. আমি অপেক্ষা করি… আর তারপর খেলা শুরু করি।”
সে একটু থামে, মাথা কাত করে আন্তোনিওর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর ঠান্ডা গলায় ইশারা করে। দুই গার্ড এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে শিকলটা খুলে দেয়।
আন্তোনিওর দেহ ধপ করে পড়ে যায় মাটিতে। সে দাঁড়াতেই পারে না, হাঁটুতে ভর দিয়ে লাফাতে চায়, কিন্তু এক ইঞ্চিও নড়তে পারে না। তখনই জেইন ধীরে ধীরে বাঘের খাঁচার রিমোটটা তোলে। একটা শব্দ—চট
বাঘের খাঁচা খুলে যায়। আর তারপর, নরকের দরজা যেন খুলে যায়।

বাঘটা ঠিক এক সেকেন্ড থেমে দেখে, তারপর এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্তোনিওর ওপর। ঘরজুড়ে একটা ভয়ংকর গর্জন, একটা অস্ফুট চিৎকার, আর তারপর,
ছিঁড়ে যাওয়া মাংসের শব্দ। হাড় ভাঙার আওয়াজ।
জেইন সরে এসে পাথরের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।তার চোখের সামনে পেশী ছিঁড়ে যাচ্ছে, রক্ত ছিটিয়ে পড়ছে কিন্তু তার মুখে একটুও ভয় নেই। বরং এক ধরনের পাগলামি আর তৃপ্তির হাসি।
বাঘটা যখন কুকুরের মতো কামড়ে কামড়ে শরীর ছিঁড়ে নিচ্ছে, তখন জেইন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। তার কোটের রক্ত ছিটে গেছে, কিন্তু সে থামে না। বেরিয়ে যেতে যেতে ফিসফিস করে বলে,
“The beast is hungry. And I’m just getting started…”

জেইন বেরিয়ে আসতেই সামনেই ইয়াশকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। অলস ভঙ্গিতে হামি দিতে দিতে বলে,
“তুই এখনো যাসনি? নাকি আজ এখানে থেকেই যাওয়ার প্ল্যান করছিস? শোন, আমার নতুন বিয়ে হয়েছে। আই নিড সাম ‘প্রাইভেসি’। এক মাস রুম থেকেই বের হবো না। বিজনেসের সব দায়িত্ব তোর এবার যেতে পারিস।
ইয়াশ ঠান্ডা কণ্ঠে বলে,
“দেখ, ও একটা বাচ্চা মেয়ে। বন্দী করে রাখা কোনো সমাধান না। এটা ওর জন্য সঠিক নয়। তুই একটু বেশিই জুলুম করছিস না?”
জেইনের চোখ মুহূর্তেই আগুনের মতো জ্বলে ওঠে। কিন্তু কণ্ঠে থাকে বরফের শীতলতা,
“আমি যা করছি, ওর ভালোর জন্যই করছি। বাইরের দুনিয়া ওর জন্য নিরাপদ নয়। শকুনে ভরা চারদিক। আমিই ওর একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।”
ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে বলে ওঠে,
“আর সেই শকুনের একটা তুই নিজেই!”
জেইনের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হালকা টান পড়ে। ঠান্ডা স্বরে বলে,
“ঠিক বলেছিস। কিন্তু আমি ওই শকুনদের মধ্যেও সেই একমাত্র জন্তু… যে ওর গায়ে আঁচড় পড়তে দেবে না। যতদিন আমি আছি, কেউ ওকে ছুঁতেও পারবে না।”

ইয়াশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ চোখ পড়ে জেইনের ঠোঁটের কোণে। চোখ কুঁচকে যায়।
“তোর ঠোঁটের ওই দাগটা কীসের? মনে হচ্ছে যেন কোনো জানোয়ার কামড়েছে। Is it… Trejan?”
তখনই জেইনের চোখের পাতা কাঁপে। বুকের ভেতরে ধ্রিম ধ্রিম শব্দ। গলা শুকিয়ে আসে। কান দুটো লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়। লিফটে রিমের সাথে ঘটে যাওয়া মুহূর্তটা মনে পড়ে যায়। কি জানি কি হয়েছিল তখন! হয়তো রিমের মুখে রিশাবের নামটা সহ্য করতে পারেনি। তাই ওমন কাজ……
সে একটু শ্বাস নিতে চায়, কিন্তু ফুসফুসে যেন বাতাস ঢুকছে না। হঠাৎ করেই গলা শুকিয়ে কাঠ। যেন পানি না পেলে এখনই দম বন্ধ হয়ে যাবে।
সে শুষ্ক ঢোক গিলে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়, কণ্ঠ খাদে নামিয়ে মিনমিনে স্বরে বলে,

“কিছু না… এমনিতেই… তুই যা।”
ইয়াশ কিছুক্ষণ সন্দেহভরে তাকিয়ে থাকে। তারপর আর কিছু না বলে ঘুরে চলে যায়। জেইন যেন একটা দীর্ঘ হাফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু বুকের ভেতরে কেমন এক অজানা যন্ত্রণা। যেন সেই ঠোঁটের ছোঁয়া এখনো জীবন্ত হয়ে আছে। সে আর স্থির থাকতে পারে না। এলিভেটরে উঠে সোজা নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেয়। বুকের ভেতরে হৃদস্পন্দন যেন এলোমেলো ছন্দে নাচছিল।দরজা খুলে যায়। সে দাঁড়িয়ে থাকে থমকে। এই প্রথম… রিম এই ঘরে। তার রুমে। তার শয্যায়।
মনে হয়, পুরো ঘর জুড়ে শুধু একটাই গন্ধ রিম। যেন তার নিঃশ্বাস, তার ত্বকের উষ্ণতা, তার শূন্য চাহনি সব মিলিয়ে এই রুমটাকে মোহময় করে তুলেছে।

তখন, যখন মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে অচেতন অবস্থায় ছিল সে তাকে নিজের হাতে কোলে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। খুব যত্ন করে, খুব সাবধানে, যেন একটা পবিত্র প্রতিমা।
এখন সে ঘুমাচ্ছে গভীর ঘুমে। কম্ফোর্টার সরে গিয়ে পড়ে আছে এক পাশে। বাতাসে তার চুলের সুবাস।
রিমের শরীরটা ঘুমের তীব্রতায় সামান্য বাঁকানো। কোমরের পাশ দিয়ে তার ঢিলেঢালা শার্টটা খানিকটা উঠে গেছে। উন্মুক্ত হয়েছে তার সরু কোমরের নিখুঁত বাঁক, ধনুকের মতো বাঁকানো, নিটোল মসৃণ ত্বক। যেন নিখুঁত ভাস্কর্য। জেইনের চোখ সেই সৌন্দর্যের দিকে স্থির হয়ে গেল।

চোখ গভীর হয়ে আসে। তার নিঃশ্বাস ভারী হতে থাকে। সে নিঃশব্দে ভেতরে পা রাখে ধীরে, ধীরে, যেন এক অলিখিত টান তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিছানার দিকেই।
সে মেঝেতে বসে পড়ে, মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। যেন সেই মুখেই তার সমস্ত শান্তি লুকিয়ে আছে। হঠাৎ, তার চোখ আটকে যায় সেই ঠোঁটজোড়ার দিকে ,যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেই তাদের প্রথম আস্বাদ ঘটেছিল। শিহরণে গা শিউরে ওঠে। এক অদ্ভুত নেশা জমে ওঠে সারা শরীরে। মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে, সে নিজের হাতের তর্জনী দিয়ে নাকের নিচটা ঘষে। তীব্র কামনায় পোড়া এক নেশাগ্রস্ত পুরুষ যেন নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছে।

কিন্তু নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। সে হাত বাড়িয়ে রাখে মেয়েটার কোমরের মাঝ বরাবর, নাভির কাছে ছুঁয়ে দেয় আলতোভাবে। শরীর যেন কেঁপে ওঠে রিমের ঘুমের মধ্যেই। সেই কাঁপুনি জেইনের বুকেও ছড়িয়ে পড়ে। তারপর, ধীরে, খুব ধীরে… সে তার লালচে খয়েরী ঠোঁট এগিয়ে দেয় রিমের কোমরের সেই নরম ত্বকে। একফোঁটা, দুই ফোঁটা ভেজা চুমু বসিয়ে দেয় তার উষ্ণ নাভীতে। তারপর হঠাৎ, যেন সব কিছুর বাঁধন ছিঁড়ে যায়।
ঘুমের মাঝেই রিমের শরীরে শিরশিরানি অনুভূত হয়।সে ঘুমের মধ্যেই শক্ত চেপে ধরে জেইনের মাথার সিল্কি চুল। তীব্রতা বেড়ে যায় জেইনের। সে চুমুতে আরও গভীর হয়ে যায়, হঠাৎ সেই কোমল ত্বকের মাঝে দাঁত বসিয়ে দেয়।
ব্যাথায় ছিটকে রিমের চোখ খুলে যায়। ঘুমচোখে প্রথমে কিছুই বোঝে না। তারপর মুহূর্তেই আতঙ্ক। চোখের কোণে ব্যাথার জল। ঠোঁট কেঁপে ওঠে। সে কাঁপা গলায় বলে,

“আ-আপনি… আমার রুমে কি করছেন?”
জেইন নেশাগ্ৰস্থের মতো, গভীর অথচ শান্ত গলায় বলে, “তোমার না, আমার রুম। ভুলে গেছো আমরা বিয়ে করেছি? এখন থেকে তোমার ঘর মানেই আমার ঘর। তুমি এ রুমেই থাকবে। দিনরাত, চব্বিশ ঘণ্টা আমার চোখের সামনে, আমার শ্বাসের ভেতর… আমার হৃদয়ের নিচে।”
জেইন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রিমের কাঁপতে থাকা আঙুলে নিজের আঙুলগুলো ঢুকিয়ে দেয়। চোখে চোখ মেলে। এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায়। অথচ রিম ভয় পেয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে ওঠে তার শরীরজুড়ে, দূরে সরে যায় ছিটকে।
লিফটের সেই ভয়াল মুহূর্তটা তার মনে পড়ে যায়। শরীর জুড়ে আতঙ্কের ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। চোখে ছায়া পড়ে চরম আতঙ্কের।
জেইন অবাক হয়ে যায়। তার কণ্ঠ বদলে যায়, হয়ে ওঠে একেবারে কোমল ও আদুরে

“হেই কি হয়েছে। ভয় পাচ্ছো কেন?”
রিমের কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে জল চিকচিক করছে। ভাঙা গলায়, কেঁপে কেঁপে বলে ওঠে,
“আ-আমার কাছে আসবেন না প্লিজ।”
জেইনের চোখ কুয়াশায় ঢেকে যায়। সে কেঁপে ওঠে। কী করবে, কী বলবে—নিজেই যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে। তার কণ্ঠে তীব্র অস্থিরতা,
“কি হয়েছে সোনা আমাকে বলো?”
হঠাৎ রিমের পেটে, নাভির ঠিক কাছে এক তীব্র ব্যথার শ্বাসরোধী ঢেউ ওঠে। সে হঠাৎ পেটে হাত রেখে কুঁকড়ে যায়। মুখে যন্ত্রণার কষ্ট। জেইনের চোখ ছলকে ওঠে দুশ্চিন্তায়। সে ছুটে যায় সামনে, শার্ট তুলে দেখতে চায় সেই জায়গা।
“কি হয়েছে সোনা, দেখি?”
রিম এক ধাক্কায় আরও একটু দূরে সরে যায়। গলার স্বর কাঁপছে আতঙ্কে,
“ন-নাহ্….”

কিন্তু জেইন জেদ ধরে। সে দেখবেই । সে অধৈর্য হাতে রিমের শার্টটা টেনে টুনে উঁচু করে। রিম লজ্জায় ঘৃণায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। জেইন নজরে পড়ে সাদা ত্বকে লালচে কামড়ের দাগ। তার নিজের ছাপ। বিরক্তিতে তার ঠোঁটের ফাঁক থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে,
শিট!!! সরি সরি খুব বেশি লেগেছে? আমি ভেরি ভেরি সরি সোনা। জানি না…. তোমার কাছে আসলেই কি হয়ে যায় আমার? পাগল হয়ে যাই আমি। নিজের মধ্যে থাকি না । তোমাকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে। মনে হয় যতক্ষণ না খুব তোমাকে কাছে পাবো এই আগুন মিটবে না।”
রিম ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

“আমি এখানে থাকবো না। আমার ভালো লাগছে না। আপনি এমন করছেন কেন?”
তার কান্নার গতি বাড়াতে থাকে। নাকের পাটা ফুলে ওঠে,
“আমাকে যেতে দিন প্লিজ। আমি থাকতে পারবো না।”
রিমের কান্নায় জেইনের অস্থিরতা বাড়ে। কিন্তু সেই কান্না… সেই অসহায় চোখ দুটো… যেন তার ভেতরে এক ভয়ঙ্কর শিহরণ তৈরি করে। একধরনের নিষিদ্ধ, অনিয়ন্ত্রিত চাওয়া।
“প্লিজ এভাবে কেঁদো না সোনা। তোমার কান্নার শব্দ আমার শরীরে… আই কান্ট কন্ট্রোল। কাঁদলে তোমার কষ্টটা একটু বেশিই বেড়ে যাবে।”

হঠাৎ রিম উঠে দাঁড়ায়। কাঁপা পায়ে বলে ওঠে,
“আমি এখানে থাকবো না! এক মুহূর্ত না! আমাকে যেতে দিন।”
সে বিছানা থেকে নেমে দাড়াতেই জেইনের ঠান্ডা চোখ দুটো মুহুর্তের মধ্যে রক্ত লাল হয়ে ওঠে। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রিমকে পেছন থেকে চেপে ধরে। পিশাচের মত গর্জে ওঠে তার সত্তা। সে রিমের ঘাড়ে মুখ গুজে দেয়। হিংস্র জানোয়ারের মতো দাঁত বসিয়ে দেয় সেখানে। রিম ব্যাথায় গুঙ্গিয়ে ওঠে। কাঁদতে থাকে ফুঁপিয়ে।
“কোথায় যাচ্ছো হ্যাঁ? আমার ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে পালানো হচ্ছে। এতো সহজে ছেড়ে দেব ভেবেছো? তোমাকে এখানেই থাকতে হবে। এ রুমেই আমার সাথে। এখান থেকে বের হতে পারবে না তুমি।”

“আমাকে ছাড়ুন। আমার কষ্ট হচ্ছে, ব্যাথা পাচ্ছি তো।”
জেইন তাকে এতটাই শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে যেন শরীরের সমস্ত হাড় গুড়িয়ে যাবে। সে আরও শক্ত করে হাতের বাঁধন। তার কণ্ঠ শিশুর মতো জেদি, আর পুরুষের মতো তীব্র,
“না ছেড়ে দিলে যদি তুমি আবার পালিয়ে যাও।তাহলে আমি আর নিজেকে বাঁচাতে পারবো না…
I can’t take any more risks,… তুমি আমার। শুধু আমার…”
রিম ছাড়ানোর চেষ্টা করে… পাগলের মতো। তার কণ্ঠ ফেঁসে যায় কান্নায়, চোখ ফেটে জল নামে। ফোপাতে ফোপাতে বলে,

“আপনি একটা পাগল। আপনার সাথে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ থাকতে পারে না। আমাকে যেতে দিন।”
এই বলে সে জোরে একটা ধাক্কা দেয়। জেইন ব্যালেন্স হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যায়। ঠিক সেই ফাঁকে রিম ছুটে যায় দরজার দিকে। কিন্তু ঠিক যেই মুহূর্তে সে দরজার হাতলে হাত দেয়, জেইন এক ঝটকায় তার পা টেনে ধরে।
“বলেছি না কোত্থাও যাবি না তুই!! তোকে আমার সাথে এখানেই থাকতে হবে!!”
রিম পা বাড়ানোর চেষ্টা করে। সে লাথি মেরে, তার পা ছাড়িয়ে নেয়। দরজার কাছে পৌঁছে গেলেও… জেইন বিদ্যুৎবেগে উঠে সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। তারাহুরো করে এলোমেলোভাবে কতগুলো ডিজিট টাইপ করে ডোর লক করে দেয়।

“এবার এ রুমের পাসওয়ার্ড আমি নিজেও জানি না। এই রুম আর কক্ষনো খুলবে না। সারাজীবন এখানেই থাকবে তুমি।”
রিম স্তব্ধ হয়ে যায়।
“জানোয়ার!!!”
তারপর চোখের সামনে আগুন জ্বলে ওঠে। কাঁপা হাতে সে নিজের কান্না মুছে ফেলে। এবার আর ভীতু সেই মেয়ে নেই , এ যেন এক আগুনে রূপ।
“তুই একটা জানোয়ার! আমার সাথে কেন এমন করছিস তুই?”
সে ভেঙে পড়ে। ইচ্ছে মতো কিল ঘুষি ছুড়তে থাকে জেইনের বুক লক্ষ করে। জেইন তার হাত দুটো ধরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে। রিম প্রথমে ছটফট করতে করতে আস্তে আস্তে শক্তি ফুরিয়ে শান্ত হয়ে যায়। জেইন তার কপালে একটা ভেজা চুমু একে দেয়। হঠাৎ তার নাকে ভেসে আসে একটা অচেনা ঘ্রাণ, রিশাবের শরীরের! হ্যাঁ এই স্মেল’টাই তো রিশাবের কাছ থেকে পেয়েছিল সে যখন তাকে টর্চার করছিল। মুহূর্তেই তার চোখ আগুন হয়ে ওঠে।

“এই কি করেছিস তুই ওই ফাটাস্টারের সাথে?!!!”
সে এক হাত চালিয়ে দেয় রিমের গলায়। খুক খুক করে কেশে ওঠে রিম। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। প্রচন্ড যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকে। নিজের দুহাতে ছাড়ানোর চেষ্টা করে জেইনের হাত । কিন্তু জেইনরে শক্তি এই মুহূর্তে হাজার দানবের সমান।
“এই বল রাত কাটিয়েছিস না ওর সাথে হ্যাঁ? এই জন্যই ওর জন্য এতো দরদ তোর! এই সাহস কি করে হলো অন্য ছেলের সাথে রাত কাটানোর?!!!!! আমি ছিলাম না? আমাকে বলতিস। আমি কি মানা করতাম? বল আমাকে? বল!!!!!”
রিম যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। কিন্তু শরীরের যন্ত্রণা থেকে বুকের যন্ত্রণাটাই যেন হাজার গুণ বেশি। এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে মাটি ফাঁক হয়ে যাক। আর সে সেখানে ঢুকে পড়ুক। নিজের নামে এমন অপবাদ সহ্য করতে পারছে না সে। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অজস্র জলধারা। তার দূর্বল শরীর আরও দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। সে কোনো মতে কাশতে কাশতে নিজের ভাঙ্গা গলায় বলে,

“হ্যা কাটিয়েছি রাত। কি করবি তুই? আমার শরীর আমার ইচ্ছা। যা খুশি করবো আমি। তোর তাতে কি?”
মুহূর্তেই জেইনের রাগ আরও শতগুণ বেড়ে যায়। তার হাতের বাঁধন আরও শক্ত হয়ে আসে।
“কি বললি তুই? এত সাহস! কলিজাটা খুব বেশি বড় হয়ে গেছে না? তোর শরীর হ্যাঁ? শরীরটা তোর হলেও তার মালিক আমি!!!!!!”
সে এমন জোরে চিৎকার করে,তার চিৎকারে যেন পুরো ঘরটা কেঁপে ওঠে। তারপর সে এক আছড়ে রিমকে ছুড়ে ফেলে মেঝেতে। কপালে আঘাত পেয়ে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে রিমের। রক্ত গড়িয়ে পড়ে কপালের কোন বেয়ে। রিমের কাঁদতে থাকে। কান্নার তোরে তার ঠোঁট তার শরীর তিরতির করে কাঁপতে থাকে। সে দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করে।
অন্যদিকে জেইন পাগলের মত ছটফট করতে থাকে। হাতে একটা হকিস্টিক তুলে এক ঝটকায় বাড়ি বসিয়ে দেয়, কাঁচের ড্রেসিং টেবিলে। ঝন শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো ঘর। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ভাঙা কাঁচ। সে চিৎকার করে ওঠে।

“কেন? কেন, কেনওওওও? আআআআআআআ!!!!
চিৎকার করে সে মেঝেতে বসে নিজের চুল টেনে ধরে।
“কেন এমনটা করলি? তুই তো আমার আমানত ছিলি! নিজেকে কেন সঁপে দিলি অন্যের কাছে। এই যন্ত্রণা কিভাবে মেটাবো আমি।”
সে এক মুহূর্ত থামে। বড় করে নিঃশ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। মুখে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

“তুই তো বলেছিল- তুই আমি ছাড়া আর কোনো ছেলের দিকে তাকাবি না। তাদের স্পর্শ নিজের গায়ে মাখবি না। তাহলে কেন করলি এমনটা? কেন বল? ঠকিয়েছিস তুই আমাকে। ছলনাময়ী! বেইমান! ঠকবাজ!”
সে উঠে গিয়ে আবার রিমের চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে,
“অ্যাই! বল কিসের কমতি রেখেছিলাম আমি তোর? মেটাতে পারতাম না শরীরের জ্বালা? ওর কাছে কেন গেলি তুই? চুপ করে আছিস কেন? কথা বল! কথা বল হারামির বাচ্চা!!!”
রিমের শরীর দূর্বল। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। তবুও শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চার করে ঠাঁটিয়ে এক চড় বসিয়ে দেয় সোজা জেইনের গালে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“জানোয়ার তুই একটা জানোয়ার। একটা মেয়ের চরিত্র নিয়ে কথা বলতে লজ্জা করে না? কতটুকু জানিস তুই আমার সম্পর্কে? কি জানিস?”

সে অসহায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ে। অতিরিক্ত কান্নায় তার চোখ ফুলে লাল হয়ে উঠেছে। গলার মধ্যে শ্বাস আটকে আসছে। হেঁচকি উঠছে বারবার। সে কান্নায় ভেজা অসহায় গলায় বলে,
“আমি আমার শরীরে আজ পর্যন্ত কোনো পুরুষের ছায়া পর্যন্ত পড়তে দেইনি। শুধুমাত্র একটি পুরুষের জন্য! ভালোবাসি সেই মানুষটাকে। ভীষণ ভালোবাসি।‌কিন্তু সেই মানুষটা স্বার্থপর! আমাকে একা রেখে চলে গেছে। আমার যে কষ্ট হচ্ছে, সেটা বুঝতেই পারছে না? আমি বলেছিলাম আমাকে ছেড়ে যেও না। কিন্তু সে শোনেনি।”
জেইন আবার এগিয়ে আসে তার কাছে। তিন আঙুলে তার থুতনি চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“কি বললি? কাকে ভালোবাসিস তুই? কে সেই পুরুষ? বল আমাকে। বল!”
রিম নাম বলতে মুখ খুলতে নিলেই জেইন বলে ওঠে।
“কে সেই ছেলেটা? রিশাব না? বল। ওর কথা বলছিস তুই হুম?”
রিম ফেটে পড়ে। থুতনি থেকে হাত‌ ঝাড়ি মেরে সরিয়ে বলে,
“না, না, না!!!! আমি একজনেই ভালোবাসি। আমার আরাত্র! আমার ছেলেবেলার সাথি।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। শুধু রিমের বুকটা ফাটা কান্নার আওয়াজ শোনা যায়।
আরাত্র! নামটা যেন একটা বারি মারে জেইনের মাথায়। তার মানে রিম এতক্ষন তার কথাই বলছিল! তার ফায়ারফ্লাই এখনো মনে রেখেছে তার আরাত্র’কে কিন্তু কিভাবে সম্ভব! সাত বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে এতো পুরোনো কথা কিভাবে মনে রাখতে পারে? আর এতো বছর ধরে অপেক্ষা করছে! শুধুমাত্র তার জন্য! তার আরাত্র’র জন্য! এটা কি সত্যি? নাকি স্বপ্ন?
জেইন অস্থির হয়ে ওঠে। রিমের মুখটা দুহাতের আজলায় পুরে বলে,

“কি বললে তুমি? কার জন্য অপেক্ষা করছিলে তুমি? কার জন্য অন্য পুরুষের ছায়া নিজের শরীরে পড়তে দাওনি।”
রিমের দৃষ্টি ঝাপসা হতে থাকে। সে অস্ফুট স্বরে ধরে আসা গলায় বলে,
“আরাত্রহ্ আমার আরাত্র… আমার… ছেলেবেলার…..”
জেইন তাকে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে। উন্মাদের মতো চোখে মুখে একে দেয় অজস্র চুমু। ভেজা ভেজা চুমুতে লিকলিকে হয়ে যায় রিমের মুখ‌। সে তাকে আবার বুকে জড়িয়ে ধরে হাঁপাতে থাকে।
“তার মানে তুমি ঐ ছেলেটার সাথে কিছু করোনি।”

রিম কথা বলতে পারে না। মাথা নাড়িয়ে না বলে। জেইন তার শরীরে এলোমেলো হাত রাখে। ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তাহলে ওর ঘ্রাণ তোমার শরীরে লেগে কেন?”
এবার রিম অতি কষ্টে গলা দিয়ে আওয়াজ বের করে, ক্লান্ত গলায় ফিসফিস করে,
“জানি না। হয়তো রিশাবের শার্ট-প্যান্ট পরেছি তাই।”
মুহূর্তেই জেইনের কুঁচকানো ভ্রু জোড়া আরও কুঁচকে যায়।
“এই তোমার কি জামা কাপড়ের অভাব পড়েছে? ওর শার্ট কেন পড়বে তুমি? এই শার্টে ওর ছোঁয়া লেগে আছে। তোমার গায়ে অন্য কারো স্পর্শ সহ্য করবো না আমি। কিছুতেই না। খোলো এটা এক্ষুনি।”
রিম ভয়ে শিউরে ওঠে। আগেরবারের কথা মনে পড়ে যায়। জেইন কিভাবে তার শাড়ি টেনে টেনে খুলেছিল। ‌সে কাঁপা গলায় ভয়ে ভয়ে বলে,

“না প্লিজ। এমন করবেন না।”
কে শোনে কার কথা। জেইনের কানে রিমের কোনো কথাই ঢুকছে না। সে শুধু এতটুকু জানে, রিমের গায়ে অন্য পুরুষের গন্ধ থাকবে না। কিছুতেই না। সে থাকতে দিবে না। জেইন তার শার্ট টেনে ধরতে নিলে, রিম তার বাহু আঁকড়ে ধরে। একটা শুষ্ক ঢোক গিলে বলে,
“না প্লিজ।”
জেইন বিরক্ত হয়। তার ভ্রু জোড়া আরো কুঁচকে যায়।
“কি না হ্যাঁ? এটা খুলতে হবে। শুধু খুললে হবে না। তোমার শরীর থেকে ওর সমস্ত স্পর্শ মুছে ফেলতে হবে। ওর গন্ধ ধুয়ে ফেলতে হবে। আমি আমার স্পর্শ দিয়ে ওর সমস্ত স্পর্শ মুছে দেব তোমার শরীর থেকে।”
এই বলে সে রিমের ছোট্ট শরীরটা তুলে নেয় কোলে। ওয়াশ রুমে নিয়ে ঝর্ণার নিচে দাড় করিয়ে ছেড়ে দেয় ঝর্ণা। ঠান্ডা পানির স্রোতে কেঁপে কেঁপে ওঠে রিমের শরীর। ঝাকুনি দিয়ে ওঠে একটা। সে দাঁড়াতে পারে না। জেইন তার শার্ট টেনে খুলতে নিলে সে তার শেষ শক্তি দিয়ে আবারো চেপে ধরে জামা।

“আমার সাথে এমন করবেন না প্লিজ।”
জেইন যেন একটুও শুনছে না রিমের কথা। চোখে মুখে পাগল রকমের স্থিরতা। এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলে তার পরনের বড়সড় চেক শার্টটা। মুহূর্তেই উন্মুক্ত হয়ে পড়ে রিমের মসৃণ দেহ। রিম লজ্জায় কুঁকড়ে যায়, নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের ছোট শরীরটাকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করে।
কিন্তু জেইনের চোখে কোনও দ্বিধা নেই। আরেক টানে খুলে ফেলে তার কালো ট্রাউজারটাও।
রিমের গায়ে তখন কেবল একটি হালকা অন্তর্বাস, যা কেবলমাত্র তার লজ্জা ঢাকা দিচ্ছে। সে মেঝেতে বসে পড়ে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজেকে আড়াল করতে চায়। ঝর্ণার টলটলে ঠান্ডা পানি তাদের দুজনকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। চারপাশে শুধু নিঃশব্দে ঝরে পড়া জলের শব্দ।
জেইন ধীরে ধীরে তার ন*গ্ন শরীরটা নিজের গায়ে মিশিয়ে নেয়। গলায় কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস। সারা গায়ে ছড়িয়ে দিতে থাকে তার হাতের এলোমেলো স্পর্শ। তাক থেকে শাওয়ার জেলটা তুলে নিয়ে মাখিয়ে দিতে শুরু করে রিমের শরীরজুড়ে। প্রতিটা স্পর্শ তার কাঁপন জাগায়। তারপর নিজের হাতে পরিষ্কার করে দেয় সযত্নে, ধীরে, গভীর মনোযোগে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৫

হঠাৎ সে নাকটা রিমের ঘাড়ের কাছে নিয়ে গিয়ে গভীরভাবে ঘ্রাণ টানে। নাহ্ আগের সেই স্মেলটা নেই।
এখন যে ঘ্রাণটা আছে, সেটা একেবারে রিমের নিজস্ব নরম, কোমল, মেয়েলি। সেই ঘ্রাণ যেন কোনো নেশার মতো। সে ঘ্রাণ টেনে নেয়, ঠিক ড্রাগসের মতো গিলে নেয়, নিজের শরীরে মিশিয়ে নিতে চায়। তারপর রিমের শরীরের প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে দিতে থাকে নিজের ঠোঁটের উষ্ণ, অবাধ, অধিকারী ছোঁয়া।
রিম প্রতিটি ছোঁয়ায় কেঁপে কেঁপে ওঠে। তার শরীর যেন জলে মিশে ভেঙে পড়ছে। চেষ্টাও করে না আর প্রতিরোধের। শেষমেশ সমস্ত শক্তি হারিয়ে সে ঢলে পড়ে জেইনের বাহুতে।…………

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৭