Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪১

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪১

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪১
রাত্রি মনি

রাত তখন সম্ভবত ৯টা বা ৯.৩০ মিনিট হবে।
রাস্তার মৃদু স্ট্রিট লাইটের হলুদ আভা কেবল দিনের স্মৃতিটুকুকে ধরে রাখছে। চারিদিকে শুনশান নীরবতা, যেন গোটা শহর ঘুমিয়ে পড়েছে। দু’এক জন মানুষের আনাগোনাও নেই বললেই চলে। কেবল দূরের কোনো গলিতে কয়েকটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ চাপা পড়ে আসা নিস্তব্ধতাকে ভাঙছে, আর মাঝে মাঝে কয়েকটা বাসের আসা-যাওয়া রাতের বুক চিরে যাচ্ছে।

হঠাৎ করেই সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে একটি কলেজ বাস এসে থামল, ঠিক বিশাল কাঁচঘেরা আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। বাস থেকে নেমে এলো এক কলেজ পড়ুয়া মেয়ে। বয়স তার সতেরো-আঠারোর কোঠায়। পরনে একটি সাধারণ ক্রপ টপ আর লেগিংস প্যান্ট, কাঁধে তার কলেজ ব্যাগ।
সে নামতেই বাসের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তার বন্ধু উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“বায় ইশা! আজকে ক্যাম্পিং-এ যা মজা হলো! তুই না এলে সব মাটি হয়ে যেত একদম! আমার কথায় রাজি হয়ে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ। কালকে কলেজে দেখা হচ্ছে কিন্তু!”
ইশা কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটা আলতো করে সামলে নিয়ে, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলল। হাত নেড়ে বলল,
“বাই, কালকে আবার দেখা হবে।”

তৎক্ষণাৎ বাসের স্পট লাইট জ্বলে উঠল, এক ঝলক তীব্র সাদা আলো। পরক্ষণেই বাসটি ধীরে ধীরে রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেল।
ইশা কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে রইল, তারপর একটা গোপন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অ্যাপার্টমেন্টের দিকে এগোলো। শরীরটা তার প্রচণ্ড ক্লান্ত। এই মুহূর্তে রুমে গিয়ে ঝটপট একটা শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ না হলে বিরক্তি ভাবটা কমবে না। এনির জোরাজুরিতেই তাকে যেতে হয়েছিল, কিন্তু এখন সে শুধু শান্তি চায়।
ক্লান্তভাবে সে ব্যাগ থেকে রুমের কার্ডটা বের করে দরজার সামনে ধরল। হালকা ‘বিপ’ শব্দে দরজার লক খুলে গেল।

ইশা ভেতরে ঢুকেই কাঁধ থেকে ব্যাগ খুলে আক্রোশে ছুঁড়ে মারল সোফায়। নিজের রুমে ঢুকেই সে সোজা চলে গেল ওয়াশ রুমে।
ওয়াশ রুম থেকে পানির ঝির ঝির শব্দ ভেসে আসতে শুরু করল। কিন্তু ইশার খেয়ালই নেই, যে তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢোকার সময় সে দরজাটা ভেজিয়ে রাখতে ভুলে গেছে! বাইরের দরজার পাল্লা সামান্য ফাঁক হয়ে রইল, যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে কাউকে…
বেশ কিছুক্ষণ পর, শাওয়ার নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো ইশা। ওয়াশ রুমে কাপড় নিতে ভুলে যাওয়ায়, তার পরনে কেবল একটা টাওয়াল জড়ানো।

ঠিক সেই মুহূর্তে…
বাইরের লিভিং রুম থেকে ভেসে এলো খট খট করে জুতোর আওয়াজ। ইশার ভ্রু কুঁচকে গেল। মনের মধ্যে একটা তীব্র শঙ্কা দানা বাঁধল। এটা কোনো সাধারণ বিড়ালের শব্দ হতে পারে না। আর তার ভাই তো কখনও এভাবে জুতো পায়ে ভেতরে ঢুকবে না, আর এই সময়ে তার আসার কথাও নয়! সে তো এখন কাজের জন্য দেশের বাইরে। তাহলে কে হতে পারে?
ইশা মুহূর্তের জন্য নিজের নগ্ন অবস্থার কথা ভুলেই গেল।সে সন্তর্পণে দরজার আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। বুকের ভেতর ধক ধক করে হৃদস্পন্দন হচ্ছে। বছরখানেক ধরে এখানে থাকছে, কিন্তু আজ সবকিছু কেমন যেন অদ্ভুত, অচেনা মনে হচ্ছে। তার মনের মধ্যে গাঢ় ভয় জেঁকে বসেছে।
হঠাৎ, আর একবার ‘খট’ শব্দ! হৃদস্পন্দন এখন কর্ণফাটানো জোরে বাজছে। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

“কে ওখানে?” তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
“ভাইয়া? তুমি কি এসেছো?”
কোনো উত্তর নেই। শুধু নরম ছায়া নড়ে ওঠে পর্দার পাশে। ইশা এক পা পিছিয়ে আসে। শ্বাস আটকে যায় গলায়। মুহূর্তেই সে আতঙ্কে পেছনে ফিরে তাকাল, কিন্তু না, পেছনে কেউ নেই। সে যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল… কিন্তু এই শব্দটা কোথা থেকে আসছে? সেটাই বুঝতে পারল না। আর তখনই, ঠিক তার পেছন থেকে, একটা গভীর, হিমশীতল হাস্কি ভয়েস বাতাস কেটে আসে,

“Don’t move, little mouse…”
ইশার বুকের ভেতর দিয়ে যেন হিমশীতল একটি হাওয়া বয়ে গেল। তার শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। হ্যাঁ, সে চেনে এই আওয়াজটা! ধীরে ধীরে কাঁপা কাঁপা বুক নিয়ে সে থমকে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকাল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার নজরে পড়ল, পিয়ার্সড ভ্রু আর ধুসর চোখ ওয়ালা এক পুরুষ! শরীরে কালো পোশাক আর অজস্র রহস্যময়ী ট্যাটু।
সে দু’পা ছড়িয়ে আয়েশ করে সোফার মধ্যে বসে আছে। মুখে কালো মাক্স থাকলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তার ঠোঁটে খেলছে এক বাঁকা, নিষ্ঠুর হাসি।
ইশার শরীর যেন জমে গেল। তার নড়ার শক্তি যেন সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। দৃষ্টি আটকে আছে সামনে বসা সেই পুরুষটির দিকে।
ছেলেটি ধীরে ধীরে তার মাক্সটি খুলল। তারপর হালকা ঝুঁকে, সেই ধুসর চোখ দিয়ে ইশার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত, আলতো করে পুরোটা শরীর স্ক্যান করতে শুরু করল। ঠোঁট সামান্য বাঁকিয়ে সে ফিসফিস করে বলল,

“Wow, little mouse… ভাবতেই পারিনি তোমাকে এখানে এসে এভাবে দেখতে পাবো! It’s a beautiful surprise for me।”
ছেলেটার সেই ঠান্ডা, গাঢ় কথায় ইশা চমকে উঠল। চকিতে নিজের শরীরের দিকে চোখ গেল তার। আলগা করে জড়ানো টাওয়ালটা হাঁটুর ওপরে উঠে আছে, আর বুকের ওপরের অংশ অনেকটা উন্মুক্ত। সে বুঝতে পারে না কীভাবে নিজেকে আড়াল করবে! পিছিয়ে যেতে চায়, কিন্তু তার পা দুটো যেন মেঝেতে জমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তার শ্বাস আটকে গেল বুকের ভেতর। নীরব সেই ফ্ল্যাটের মধ্যে এখন কেবল দুটি শব্দ—তার নিজের হৃদয়ের ধকধক স্পন্দন, আর সামনে বসা সেই পুরুষটির ঠান্ডা, হিসহিসে শ্বাস।
নীরবতা ভেঙে গেল ইশার কম্পিত গলায়,

“তু… তুমি এখানে কেন এসেছ? কী চাই তোমার?”
ছেলেটা ঠোঁট কামড়ে একটা বিকৃত, বাঁকা হাসি হাসল। তার চোখ দুটি ইশার শরীর থেকে মুহূর্তের জন্যও সরছে না। গাঢ়, প্রায় ফিসফিস করে বলল সে,
“তুমি জানো না আমি কী চাই? That’s so silly, babe… এটা তো তোমার খুব ভালো করেই জানার কথা! এতদিন ধরে তোমার পিছনে ঘুরঘুর করছি। অথচ তুমি পাত্তাই দিচ্ছ না। তাই… ডিরেক্ট তোমার বাড়ি চলে এলাম।”
সে ধীরে ধীরে সোফায় তার বসার ভঙ্গিমাটি বদলাল একটু ঝুঁকে এলো সামনের দিকে।
“তোমাকে প্রাণ ভরে দেখতে। And look… God আমার ইচ্ছেটা কী সুন্দরভাবে পূরণ করেছে! পুরোটা শুধু আমার জন্য…”

ইশার মনে পড়ল সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতিগুলো। অনলাইনে তার সাথে পরিচয় হয়েছিল এই সুদর্শন পুরুষটির। শুরুতে তাদের সম্পর্কটা ছিল খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ। ছেলেটা নিজেকে পুরোপুরি ‘জেন্টলম্যান’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। ইশার মনে মনে তাকে পছন্দ করা শুরু করেছিল। তারপর একদিন ছেলেটি ইশার সাথে দেখা করতে চাইল। ইশাও রাজি হলো।
আর সেখানেই ঘটল বিপত্তি। প্রথম দিনেই ছেলেটা ইশাকে বাজে প্রস্তাব দেয়। ইশা রাজি না হলে, সে তার সাথে জোরজবস্তি করতে শুরু করে। আতঙ্কে দিশেহারা ইশা তখন নিজের সমস্ত শক্তি একত্র করে ছেলেটার গালে চাপা শব্দে একটা চড় বসিয়ে দেয়!

ছেলেটা তখন কিছু বলেনি। শুধু রক্তচক্ষু নিয়ে, চোয়াল শক্ত করে, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল। রাগে সে ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছিল, যেন একটা হিংস্র পশু। ইশা সেদিকে আর কোনো পাত্তা না দিয়ে, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল। সে ভেবেছিল, আর কোনোদিন এই নরকের কীটটার সাথে দেখা হবে না।
এরপর কয়েকদিন সে পড়াশোনার ব্যস্ততা আর বন্ধুদের ভিড়ে ছেলেটার কথা বেমালুম ভুলেই বসেছিল।
কিন্তু… আজ, এভাবে হঠাৎ করে, তার বাড়িতে, এই নির্জন রাতে, সে কী করে চলে এলো! নিরাপত্তার এই প্রাচীর ভেঙে সে কীভাবে ভেতরে ঢুকল?
এই ভাবনাগুলো ইশার নিঃশ্বাস আটকে দিল। শরীর জুড়ে এক অসহ্য কাঁপুনি শুরু হলো। সে নিজেকে আরও একবার সংবরণের বৃথা চেষ্টা করল, এবং কম্পিত, প্রায় শোনা যায় না এমন ফিসফিস স্বরে বলল,

“তুমি এখান থেকে চলে যাও… প্লিজ…”
ছেলেটা এবার কর্কশ স্বরে হেসে উঠল। সেই হাসিটা ইশার কানের মধ্যে তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো বিঁধতে লাগল। সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার উচ্চতা ইশার চেয়ে অনেক বেশি। ধীরে ধীরে সে ইশার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। প্রতিটা পদক্ষেপ যেন ইশার বুকে মৃত্যুর ঘণ্টা বাজাচ্ছিল।
“চলে যাব? এত সহজে? যখন তোমার জন্য এত দূর এলাম? তুমি কি ভাবছ, সেই দিনের চড়টার হিসাব বাকি রেখে দেব? নাকি আমার প্রত্যাখ্যানের অপমান আমি ভুলে যাব? Little mouse….
ছেলেটার প্রতিটি শব্দে ছিল শীতল প্রতিশোধের হুমকি। সে এখন ইশার খুব কাছে। ইশা আর এক পা-ও নড়তে পারছে না। তার চোখে-মুখে মৃত্যুভয়।
হঠাৎ, ছেলেটা ইশার আরও কাছে ঝুঁকে এলো। ইশার কান ঘেঁষে সেই হাস্কি ভয়েসটা এবার আরও গাঢ়, আরও মারাত্মক শোনাল,

“আজকে আমি তোমার এই ঘর থেকে তখনই যাব, যখন তুমি আমাকে সেই জিনিসটা দেবে, যার জন্য আমি এত পরিশ্রম করে এখানে এসেছি… সেই জিনিসটা যা তুমি সেদিন দিতে অস্বীকার করেছিলে…”
ছেলেটার সেই উন্মত্ত স্পর্শে ইশা শিউরে উঠল। সে পিছু হটতে চাইতেই, লোকটা তার কোমর আঁকড়ে ধরে হিংস্র শক্তিতে কাছে টেনে আনল। ইশা মুক্তির জন্য মোচড়াতে থাকে, তার প্রতিটি পেশীতে অসহায় প্রতিরোধ।
“ছাড়ো আমাকে! প্লিজ! আমার অস্বস্তি হচ্ছে। তুমি যেমন ভাবছো, আমি তেমন মেয়ে নই!”
ছেলেটা তার কথায় কর্ণপাত না করে ইশার গলায় মুখ গুঁজে দিল। তার ধূসর চোখে তখন পৈশাচিক আনন্দের ঝিলিক। এক মুহূর্তে, এক টানে সে ইশার শরীর থেকে টাওয়াল খুলে নিল, ছুঁড়ে ফেলল ঘরের এক অন্ধকার কোণে।

ইশা যেন মূর্তি হয়ে গেল। টাওয়ালটি খুলে যাওয়ায় তার শরীর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। আতঙ্কে তার বুক থরথর করে কাঁপছে। সে নিজেকে আড়াল করার জন্য মরিয়া হলেও পারল না, কারণ ছেলেটা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, যেন এক শিকারি তার শিকারকে।
হঠাৎ ইশা তার শরীরের শেষ শক্তিটুকু একত্রিত করে লোকটার কাঁধে দাঁত বসিয়ে দিল এক হিংস্র কামড়।
ব্যথার তীব্র যন্ত্রণায় লোকটার হাতের বাঁধন মুহূর্তে আলগা হয়ে যায়।
মুক্তির সুযোগ! ইশা বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে পালাতে চাইল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই ছেলেটা পেছন থেকে তার পা টেনে ধরল। মেঝেতে আছড়ে পড়ল ইশা। বিশাল অ্যাপার্টমেন্টের সেই ঠান্ডা, কাঁচের টাইলসের ওপর তার ছোট্ট শরীরটা পড়ে যাওয়ায় অসহ্য ব্যথা অনুভব হলো।

সে উঠে দাঁড়াবার আগেই ছেলেটা খপ করে বসে পড়ল তার উদরের ওপর। তার ভারে ইশার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল। বাঁচার জন্য ইশা ছটফট করতে লাগল, নখ দিয়ে খামচে দিল ছেলেটার মুখের চামড়া।
পশুসুলভ ক্রোধে ছেলেটা এবার ইশার দুই হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। এরপর তার উন্মুক্ত বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে শুরু করল সেই ঘৃণ্য খেলা। একের পর এক দাঁতের হিংস্র কা/মড় বসতে শুরু করল ইশার সং/বেদন/শীল ত্বকে।
যন্ত্রণায় ইশা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। সেই আর্তনাদ যেন ছেলেটার শিরায় শিরায় আরও পৈশাচিক উত্তেজনা বাড়াল।

সে মুখ তুলে তাকাল ইশার দিকে, তার মুখে ও কাঁধে ইশার রক্তের পাশাপাশি নিজের দাঁতের কামড়ে সৃষ্ট রক্তও লেগে ছিল। রক্তের নেশায় তার চোখ যেন আরও বেশি জ্বলজ্বল করছে। সে চোখ বুজে, ঠোঁট ফাঁক করে, সেই শ্বাসরুদ্ধ করা দৃশ্যটার আবেশে শ্বাস টেনে নিল।
ভয়ে ইশার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। ছেলেটা আবার ঝুঁকে পড়ল তার বুকের মাঝে। ইশা যন্ত্রণায় ছটফট
করতে থাকে।

ঠিক তখনই, তার চোখ গেল পাশে রাখা বিশাল ফ্লাওয়ার ভেজটার দিকে।
ইশা তার সমস্ত সাহস ও বাঁচার আকাঙ্ক্ষা সঞ্চার করল। মৃদু শ্বাস টেনে নিল সে। তার হাত পৌঁছালো সেই ভারী, কাঁচের পাত্রের দিকে। ছেলেটা তখনো তার কামড়ে মগ্ন। ইশা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, সর্বশক্তি দিয়ে ‘ঠাস’ করে একটা বাড়ি বসিয়ে দিল ছেলেটার মাথার পেছনে।
মুহূর্তে বিষ্ময়ে চোখ বড় হয়ে যায় লোকটার। হাত চলে যায় ক্ষতস্থানে। কাঁপা কাঁপা হাতে চোখের সামনে এনে ধরতেই দেখতে পায় তরতাজা লাল রক্ত।
এই সুযোগ! ইশা কোনোমতে তাকে ধাক্কা মেরে, নিজেকে টেনে-হিঁচড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
ছেলেটা তখন যেন এক উন্মত্ত হিংস্র জানোয়ারে পরিণত হলো। আগের থেকেও দ্বিগুণ বেশি রাগ আর প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে লাগল তার চোখে। ঘনঘন, কর্কশ নিশ্বাস নিতে নিতে সে উঠে দাঁড়াল। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে, তবুও সে ছুটল ইশার পেছনে।

“Little mouse! তুমি যে কত বড় ভুল করেছ, সেটা তুমি নিজেও জানো না। ভেবেছিলাম তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব… কিন্তু তুমি সেটাও হতে দিলে না! এবার তুমি মরবে!”
ইশা দ্রুত ভেতরের একটি ঘরে ঢুকে আপ্রাণ শক্তিতে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে সে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলছে। আতঙ্কে তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা। চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। এখন কীভাবে বাঁচবে সে? ভাই তো বাড়িতে নেই, এই মুহূর্তে তার পক্ষে আসাও অসম্ভব।
তার মনে ভয় এতটাই জেঁকে বসেছে যে, সে আতঙ্কে প্রায় দিকবিদিকশূন্য। কী করবে, কোনো দিশা খুঁজে পায় না।
বাইরের দরজা থেকে ধড়াম ধড়াম করে ধাক্কা মারার শব্দ শুনতে পেল সে। তার ভয় এবার পারদ সীমা ছাড়িয়ে গেল। ছেলেটা একের পর এক লাথি আর আঘাত করে যাচ্ছে দরজার গায়ে। ধীরে ধীরে ভেতরের ছিটকিনিটা আলগা হয়ে আসছে।

ইশা আতঙ্কে হাত দিয়ে দরজার পাল্লা চেপে ধরে রাখার চেষ্টা করে—এক নিষ্ফল, হাস্যকর প্রতিরোধ।
ছেলেটার রাগ ততক্ষণে চূড়ান্ত হিংস্রতায় রূপ নিয়েছে। সে দরজা খুলতে না পেরে আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে। অবশেষে তার নজরে আসে—বড় দেয়ালটিতে শোভা পাচ্ছে ক্রস আকৃতির দুটো অলঙ্কারিক কুঠার।
সে দ্রুত হাতে কুঠারগুলোর মধ্যে থেকে সবচেয়ে ধারালো একটি তুলে নেয়।
তারপর পাগলের মতো সেই বন্ধ দরজায় একের পর এক আঘাত করতে থাকে। কুঠারের প্রতিটি আঘাতে কাঠ চুরমার হয়ে যাচ্ছে, আর ইশার হৃদস্পন্দন যেন থেমে যাচ্ছে।
ঠিক এই সময়েই ইশা ল্যান্ডলাইন থেকে দ্রুত কল লাগায় তার ভাইয়ের ফোনে। কিন্তু… একের পর এক রিং হয়ে যাচ্ছে, কেউ ফোন তুলছে না।

ওদিকে ছেলেটা কুঠার দিয়ে আঘাত করে চলেছে, যেন দরজা নয়, ইশার ভাগ্যকেই টুকরো টুকরো করছে।
এক বীভৎস কাঠের আর্তনাদ তুলে, শেষমেশ মেঝেতে ভেঙে পড়ল কাঠের দরজাটি।কাঠের দরজা ভেঙে মেঝেতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধুসর চোখগুলো ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। কুঠার হাতে সেই পুরুষের অবয়ব। রক্ত আর ক্রোধে উন্মত্ত, যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর দূত। তার কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, যা তার পৈশাচিকতাকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।

ইশা তখন আতঙ্কে, দরজার কোণার দিকে গুটিয়ে গেছে, তার শরীর কাঁপছে। আলো-ছায়ার খেলায় তার মুখ বিবর্ণ।
ছেলেটা একপা বাড়িয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। তার হাঁটার শব্দে কাঁচের টুকরোগুলো চুরমার হলো। সেই শব্দ ইশার কানে যেন ভাঙা হাড়ের শব্দ মনে হলো।
কুঠারের ভারী মাথাটি মেঝেতে ঠেকিয়ে, ছেলেটা এক হিংস্র হাসি হাসল।
“Your time to hide is over, little mouse. Now let the game begin!”
সে দ্রুত কুঠারটি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। এবার তার লক্ষ্য কেবল ইশা।
ইশা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই সে দ্রুতগতিতে এগিয়ে এসে তার কাঁধে চেপে ধরল। ইশা চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু ছেলেটা তার মুখ শক্ত হাতে চেপে ধরল। ইশার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। সে বাঁচার জন্য আপ্রাণ ছটফট করতে লাগল, ছেলেটার উন্মুক্ত হাতে আঁচড় কাটতে চাইল, কিন্তু লোকটির কাছে সে যেন এক দুর্বল খেলনা।
ছেলেটার পুরুষালী শক্তি আর হিংস্র ক্রোধ যেন একসঙ্গে ফেটে পড়ল। ইশা অনুভব করল তার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে চলে গেছে। যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
ছেলেটা ইশার কানে ফিসফিস করল, তার সেই হাস্কি ভয়েস এখন মৃত্যুর শীতলতা বহন করছে,

“You rejected me? You denied my wishes? You don’t know what the consequences could be! Now You are mine!”
ইশার প্রতিটি ছটফট যেন লোকটির পৈশাচিক উল্লাস বাড়াতে লাগল। এই মুহূর্তে ইশা যেন কোনো মানুষ নয়, কেবল তার ক্ষমতার প্রমাণ, তার প্রতিহিংসা মেটানোর উপায়। সে বুঝতে পারল, তার বাঁচার কোনো পথ নেই। এই অন্ধকার ঘরে সে সম্পূর্ণ একা। বাইরে শুধু নিস্তব্ধ রাত আর তার নিরুপায় আর্তনাদ যা কেউ শুনতে পাচ্ছে না। তার হৃদয়ের গভীর থেকে শুধু একটাই প্রার্থনা উঠে এলো , মৃত্যু।

রাত তখন তিনটা কিংবা চারটা।
পৃথিবী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
ক্লান্ত ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নেমে তার পরনের কোটটা খুলে হাতে রাখল যুবক। হাতে ধরা একটি চকলেটের বক্স। শরীর ক্লান্ত থাকলেও তার ঠোঁটে একটি মৃদু, স্নেহের হাসি। কাজে যাওয়ার সময় বোনটা অনেক অভিমান করেছিল। ভাইকে ছাড়া সে কখনো একা থাকেনি। কিন্তু কাজের জন্য তাকে যেতেই হত। তাই বোনকে বন্ধুদের সাথে ক্যাম্পিংয়ে পাঠিয়েছিল। সে জানত, আজকেই তার ক্যাম্পিং শেষ হয়েছে। দ্রুত কাজ সেরে সে ফিরে এসেছে, আদরের বোনকে সারপ্রাইজ দেবে বলে।

নিজের কাঙ্ক্ষিত ফ্ল্যাটের সামনে আসতেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার। দরজাটা পুরোপুরি খোলা রয়েছে। সে বুঝতে পারে না, তার বোন কবে থেকে এতটা বেখেয়ালি হয়ে গেল! দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলে সে ভেতরে ঢুকল।
মুহূর্তেই চোখ জুড়ে ভর করল সন্দেহ। ঘরের সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে রয়েছে। বুকের ভেতর অজানা এক ভয় চেপে বসলো। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকল সামনের দিকে, প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ভারী সীসার মতো।
হঠাৎ থমকে গেল তার পা দুটো। ভেঙে যাওয়া দরজা দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে পা রাখল ভাঙা সেই কাঠ এবং কাঁচের স্তূপ ডিঙিয়ে ঘরের ভেতর।

সাথে সাথেই ‘ঠাস’ একটা বিকট শব্দ! হাতের চকলেট বক্সটা মেঝেতে পড়ে গেল, কোটটাও খসে পড়ল হাত থেকে। তার চোখ বিস্ময়ে, আতঙ্কে সামনের দিকে স্থির। নিশ্বাসের সাথে তার বুক অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাচ্ছে। মাথার ভেতর সমস্ত দুনিয়া যেন এলোমেলো হয়ে ঘুরছে। অন্ধকার ভড় করল চোখের সামনে।
তার চোখের সামনে পড়ে আছে তার আদরের ছোট বোনের… রক্তাক্ত, নগ্ন দেহ।
শরীরের উপরিতল জুড়ে অসংখ্য কামড়ের দাগ। চুলগুলো যেন থোকা থোকা হয়ে উঠে এসেছে, পাতলা ঠোঁট ছিন্ন/ভিন্ন হয়ে র/ক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। একপাশে শরীরের সং/বেদন/শীল অংশে হিংস্র আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন, ব্রে/স্টের নি/প/ল কে/টে ঝু/লে রয়েছে র/ক্তা/ক্ত অবস্থায়। নিচের দিকে পা দুটো ফাঁ/ক হয়ে রয়েছে, যেখানে সং/বেদন/শীল অংশে র/ক্ত জমাট বেঁধে এক ভয়ংকর চিহ্ন তৈরি করেছে।
যুবক খিঁচে চোখ বন্ধ করে নিল। সে আর দেখতে পারছে না এই বীভৎস দৃশ্য। বুকের ভেতর হাহাকার জমে উঠল, যেন হাজার বছরের জমাট বেদনা।
সে দ্রুত নিচে পড়ে থাকা কোটটা তুলে নিল।ঢেকে দিল তার আদরের ছোট বোনের নিথর শরীর। সাবধানে, ধীরে ধীরে, যেন মায়ের মমতায়, ইশাকে আলতো করে বুকে টেনে নিল। হাহাকার মেশানো, কাঁপা কাঁপা গলায় হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলতে লাগল,

“ইশা… বোনু আমার! চোখ খোল। এই কী হয়েছে তোর? কথা বলছিস না কেন? হ্যাঁ? দেখ, তোর ভাই এসেছে! আমার সাথে কথা বলবি না? আমি আর কখনো তোকে একা ছেড়ে যাবো না, বিশ্বাস কর! একবার আমার দিকে চোখ তুলে দেখ! তোর এই ভাইয়ের যে তুই ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ নেই! তুই চলে গেলে আমি একা কীভাবে বাঁচব, বোন? একবার আমার দিকে চোখ খুলে তাকা, প্লিজ!”
কিন্তু কোনো নরম নড়নচড়ন নেই। কোনো শব্দ নেই।
নিষ্প্রাণ ইশার ঠান্ডা দেহটা লুটিয়ে রইল ভাইয়ের উষ্ণ বুকের মাঝে। যুবকটি শ্বাস আটকে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু বিন্দু। তার ভেতরের সমস্ত বাঁধন ভেঙে গেল। হাহাকার আর ক্রোধে ফেটে যাওয়া, হিংস্র এক চিৎকার সেই নিস্তব্ধ রাতকে চিরতরে চিরে দিল,
“ইশাআআআআআআআ!”

অন্ধকার কক্ষে ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে যুবক। কপালের রগে স্পষ্ট ঘামের রেখা। তার সম্পূর্ণ শরীর ঘামে ভিজে গেছে, যার ফলে পরনের টি-শার্টটা শরীরের সাথে লেপটে আছে।
হঠাৎ, ‘খট’ শব্দে দরজা খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করল এক রুশ কন্যা।
অন্ধকার কক্ষের মৃদু আলোয় সে দেখল, অস্থির হয়ে থাকা যুবকটিকে। এক মুহূর্ত দেরি না করে হাত বাড়িয়ে কক্ষের লাইট জ্বালিয়ে দিল সে। উজ্জ্বল আলোয় যুবকের বিধ্বস্ত চেহারাটা স্পষ্ট হলো।
মেয়েটি দ্রুত এগিয়ে এলো সামনে, যুবকের পাশে বসে পড়ল। এমন অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে সে কোনো কিছু বুঝতে না পেরে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ইয়াশ! কী হয়েছে তোমার? এভাবে চিৎকার করলে কেন? আমি তো ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছি তোমার কিছু…..”

সাথে সাথে ইয়াশ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার সেই আলিঙ্গনে ছিল ভয়, যন্ত্রণা এবং গভীর অসহায়তা। কাঁপা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল,
“এলি… আ… আমার বোন! আমার ছোট্ট বোনটা! ওর তো কোনো দোষ ছিল না! তাহলে ও কেন নরক যন্ত্রণা নিয়ে দুনিয়ায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল? অথচ আমি এখনো আমার বোনের নৃশংস অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারলাম না! আমি ব্যর্থ, এলি… ভাই হিসেবে আমি ব্যর্থ! না পেরেছি নিজের বোনকে রক্ষা করতে, আর না পেরেছি অপরাধীদের শাস্তি দিতে!”

এলেনা বুঝে গেল ইয়াশ আবারো হয়তো কোনো বাজে স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু সে ইয়াশকে কীভাবে সান্ত্বনা দেবে বুঝতে পারল না। সে জানে, ইয়াশের কাছে তার বোন ইশা কতটা স্নেহের ছিল। ইশার জন্মের সময়ই মা মারা যান, আর সেই শোক সইতে না পেরে বাবা ‘ইসান্দ্রো রিচি’ হার্ট স্ট্রোক করে মারা যান। তারপর থেকেই ইয়াশ ছোট বোনকে পরম আদরে, বাবা-মায়ের ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে।
আর সেদিন, বোনের সেই নিশংস অবস্থা দেখে ইয়াশ নিজেকে সামলাতে পারেনি। সে প্রায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। তখন জেইন ভাইয়ের মতো তার পাশে ছিল, তাকে আগলে রেখেছিল। আর সেখান থেকেই তার পরিচয় এলেনার সাথে।

এলেনা ইয়াশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল।কিছুক্ষণ পর ইয়াশ কিছুটা শান্ত হলো। সে এলেনার কাছ থেকে সরে এসে, চোখে চোখ রাখল। ইয়াশের চোখে তখন বিশাল শূন্যতা এবং এক অচেনা নেশা যেন সে ঘোরের মধ্যে আছে। তার এই নেশাগ্রস্ত ও স্থির দৃষ্টি দেখে এলেনার বুক কাঁপতে শুরু করল। নিশ্বাস ভারী হয়ে এলো। শুষ্ক ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিল সে। ঠোঁট জোড়া তির তির করে কাঁপছে।
মুহূর্তে ইয়াশ ঝাঁপিয়ে পড়ল এলেনার সেই কম্পমান ঠোঁটে। এলেনার হাত চলে গেল ইয়াশের চুলের ভাঁজে। সে শক্ত করে খামচে ধরে রইল। ইয়াশ চুমুতে বেপরোয়া হয়ে উঠল। উন্মাদের মতো সে এলেনার ঠোঁটজোড়া টেনে নিল। এলেনা নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। বুক কাঁপতে কাঁপতে সেও ইয়াশকে খামচে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট মেলাল। চুমু খাওয়া অবস্থাতেই ইয়াশ, এলেনাকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঠোঁট ছেড়ে সে এবার মুখ গুঁজে দিল এলেনার গলায়।

এলেনার শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। এই স্পর্শ তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন। তার কী প্রতিক্রিয়া করা উচিত, সে জানে না। তার মধ্যে কোনো মেয়েলি স্বভাব নেই। ছোট থেকেই সে হিংস্রতার মাঝে বড় হয়েছে। কিন্তু আজ ইয়াশের এই উন্মাদের মতো স্পর্শে তার ভেতরের কোমল মেয়েলী সত্তাটা যেন বেরিয়ে আসছে। তার শরীর যেন শিহরণে গলে পড়ছে। ইয়াশের বেপরোয়া হাত এলেনার টপ ভেদ করে ঢুকে গেল উদরের ওপর। ধীরে ধীরে অবাধে তা বক্ষের মাঝে বিচরণ করতে লাগল।
এলেনা ছটফট করে উঠল। তার ভেতরের আতঙ্ক ও নতুন অনুভূতির দ্বন্দ্ব তাকে থামিয়ে দিল। সে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,

“ইয়াশ… স্টপ প্লিজ! আমার কেমন যেন লাগছে।”
ইয়াশ যেন পুরোপুরি ঘোরের মাঝে চলে গেছে। তার অবাধ্য হাতের চাপ তীব্র হয়ে উঠল। এলেনা শব্দ করে গোঙিয়ে উঠল। সেই যন্ত্রণার শব্দে ইয়াশের ঘোর ভাঙল। মুহূর্তে চোখ বড় করে তাকাল ইয়াশ। নিজের সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সে দ্রুত সরে গেল এলেনার কাছ থেকে। ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে, কাঁপা গলায় সে বলল,
“আমি সরি, এলি… I didn’t mean it! হঠাৎ করে আমার কী হয়ে গিয়েছিল, আমি নিজেও জানি না।”
এলেনা বিছানায় শুয়ে হাঁসফাঁস করছে। টেনেটুনে নিজের টপ’টা ঠিক করে উঠে বসল। চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রু। ভেতরে এক অদ্ভুত, অচেনা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে, যার সাথে সে পূর্ব পরিচিত নয়। সে ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা চালাল। নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
“ইট’স ওকে। আমি কিছু মনে করিনি। আমি বুঝতে পারছি তোমার অবস্থা। তুমি বিশ্রাম করো, আমি আসছি।”
এলেনা উঠে নিজের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। দরজার সামনে পৌঁছাতেই থমকে দাঁড়ায় সে। পেছন থেকে ডেকে উঠল ইয়াশ

“আজকে কোথায় ছিলে তুমি? আমি আর মাত্তেও যখন পানি মন্ত্রণালয়ের সচিবে গিয়েছিলাম, তোমাকে পাইনি। না বলে হুট করে অচেনা জায়গায় কোথায় গিয়েছিলে তুমি? আমি কি জানতে পারি?”
এলেনা পেছনে ফিরে তাকাল না। শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়েই নিষ্ক্রিয় গলায় বলল,
“কিছু জানতে গিয়েছিলাম। কিছু লুকানো রহস্য… তোমাকে অনেক কিছু বলার আছে আমার। কিন্তু সেসব এখন না। সময় হলেই জানতে পারবে তুমি।”
আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না এলেনা। বড় বড় পা ফেলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। এলেনার কথার কোনো মানেই বুঝতে পারছে না সে। কিসের রহস্যের কথা বলল এলেনা? তার চোখের সামনে বোনের নিথর দেহ, আর এখন এলেনার অদ্ভুত আচরণ… দুটো মিলিয়ে এক গভীর রহস্যের জাল বুনছে, যা ইয়াশকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে শুরু করেছে।

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
বিকেলের নরম আলো পেড়িয়ে আকাশ ধারণ করেছে রক্তিম লালচে মেশানো সোনালী আভা যেন দিনের শেষ বিষণ্নতা।
মখমলে নরম বিছানায় মুখ ডুবিয়ে প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে আছে রিম। জানালার পর্দার ফাঁক গলে মৃদু ঠান্ডা বাতাস শরীরের স্পর্শ করতেই নড়েচড়ে আবারো মুখ গুঁজে দিল বালিশে। জেইন এখন নেই। সে রিমকে ঘুম পাড়িয়ে বেড়িয়ে পড়েছে কোথায় একটা। কিন্তু তার ছোঁয়াগুলো যেন এখনো রিমের ত্বকের গভীরে জ্বলজ্বল করছে।

ভোরের মৃদু আলোয় বারান্দার দোলনায় মিশে ছিল তাদের দুই আত্মা। জেইনের উন্মাদনায় গুটিয়ে গিয়েছিল রিম। অজস্র সুখময় যন্ত্রণার চিহ্ন ছড়িয়ে পড়েছিল তার সমস্ত শরীরে।
একসময় জেইন তার ছোট্ট শরীরটা খুব সাবধানে কোলে তুলে নেয়। দুজনের গায়েই জড়ানো একটি সিল্কের চাদর। রুমে এসে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় ওয়াশ রুমে। নিজের কোমরে একটা টাওয়াল জড়িয়ে নেয়। তারপর চাদরসহ খুব যত্নে রিমকে বসিয়ে দেয় বেসিনের ওপর।
রিমের শরীরে দাঁড়ানোর বিন্দুমাত্র শক্তি নেই। সে পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছে। রাতে ঘুম না হওয়ায় চোখ খুলে তাকাতেও পারছে না, কেবল ঢুলতে থাকে। জেইন তাকে খুব সাবধানে বাহুর মাঝে আগলে রাখে। বুকের মধ্যে পিষে কপালে একটা গাঢ় চুমু এঁকে দেয়। এক হাত দিয়ে তুলে নেয় ইলেকট্রিক ব্রাশ। রিম ভ্রু কুঁচকে তাকায়,

“এটা আমার ব্রাশ না।”
জেইন নির্বিকার গলায় বলে,
“জানি, এটা আমার। চুপচাপ ব্রাশ করে নাও।”
রিমের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। তার ভ্রু দ্বিগুণ কুঁচকে গেল।
“তোমার টা দিয়ে আমি কেন করব?”
জেইনের চোখগুলো মুহূর্তেই হিংস্র হয়ে ওঠে। কিন্তু সে শান্ত চোখে রিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কারণ তোমারটা এখন নেই। আর তোমার-আমার বলতে কিছু নেই। যা আমার, তা তোমার, আর যা তোমার, তা আমার। সব আমাদের দুজনেরই।”
রিম জেদ ধরে,
“না, আমি তোমার টা দিয়ে ব্রাশ করব না।”

এবারে জেইনের ভেতর থেকে রাগের মাত্রা বাড়তে থাকে। কিন্তু সে দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। এই মুহূর্তে রিমের শরীর ঠিক নেই, তাই সে রাগ দেখাতে চায় না। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শীতল,
“চুপচাপ এটা দিয়েই ব্রাশ করবে তুমি। নয়তো রোজ সকালে ঘুম ভাঙবে আমার মুখের থুতু খেয়ে ।”
রিমের চোখ ছলছল করে ওঠে। এটা কেমন অত্যাচার! সে না চাইতেও জেইনের হাতে ব্রাশ করতে থাকে।
এরপর জেইন ধীরে ধীরে রিমের শরীর থেকে চাদর সরিয়ে দেয়। এতেই যেন তার নিঃশ্বাস আটকে যায়। মাথা ঝটকা দিয়ে উঠল। নেশাগ্ৰস্থ পুরুষের মতো আঙুল দিয়ে নাক ঘষে নিল। শরীরের রগ ফুলে উঠলো। ঠোঁট ফাঁক করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো সে। রিমের শরীরে জ্বলজ্বল করছে রাতের সমস্ত চিন্থ দাঁতের গভীর দাগ, নখের আঁচড়ের সরু রেখা, আর কালশিটে। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। রিমকে এভাবে দেখে তার পুরুষত্ব আরও চরম মাত্রায় উন্মাদ হয়ে উঠছে। এখনি তাকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে আরও গভীরে, আরও তীব্রভাবে। এক মুহুর্তে সে ভুলে গেল রিমের দূর্বল শরীরের কথা। তার কাছে রিম শুধু শরীর নয়, এক নেশাদ্রব্য, যার প্রতি সে চরমভাবে আসক্ত। অজান্তেই ধীরে ধীরে চলে এলো রিমের খুব কাছে। ঠোঁট ছুঁয়ে গেল রিমের শরীরের ছোট ছোট ক্ষতচিহ্নতে। রিম কুঁচকে গেল। তার সহ্য করার ক্ষমতা আর নেই। কিন্তু এই পুরুষ যে বেপরোয়া উন্মাদ! জেইনের এলোমেলো স্পর্শ আরও গাঢ় হতে থাকে।

রিম ফুঁপিয়ে ওঠে। তার কান্নার শব্দে জেইনের হুঁশ ফিরে আসে। দ্রুত সে সরে দাঁড়ায়। ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়ে, রিমের গালে আলতো হাত রেখে, আদুরে গলায় বলে,
“আমি সরি সোনা… তোমার কি বেশি কষ্ট হচ্ছে?”
রিম গাল ফুলিয়ে কেঁদে ওঠে,
“কষ্ট হবে না তো কী? এভাবে কেউ করে! আপনি খুব পঁচা। থাকবই না আপনার সাথে!”

অভিমানে মুখ ফসকে অজান্তেই বলে ফেলে রিম। কিন্তু এতে করে রাগে ফুঁসে ওঠে জেইন, তার চোখ যেন রক্তের মতো লাল। চোয়াল শক্ত করে এক হাতে ফাঁসীর দড়ির মতো চেপে ধরে রিমের গলা। খুকখুক করে কেশে ওঠে রিম। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অনবরত। কিন্তু এতে জেইনের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রচন্ড রাগে তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“থাকবি না মানে? তোকে আমার সাথেই থাকতে হবে! আমি তোকে অপশন দিয়েছিলাম! কি দেইনি? আগেই সাবধান করেছিলাম? করিনি সাবধান? বলিনি আমার সাথে থাকলে রোজ সহ্য করতে হবে যন্ত্রণা? তুই নিজে আমার কাছে এসেছিস, আমাকে বেছে নিয়েছিস। এখন আবার আমার বুক জ্বালিয়ে চলে যাবি বলছিস? তার আগে তোর কবর খুঁড়বো আমি, নিজের হাতে!”

রিম কাঁদতে কাঁদতে তার বুকে এলোমেলো আঘাত করতে থাকে। কিন্তু জেইনের শক্তির কাছে চুনোপুঁটি সে। এমনিতেও তার শরীর দূ্র্বল। শেষমেষ সে নিজের শক্তি হারিয়ে ঢলে পড়ে জেইনের বাহুতে। জেইনের হাতের বাঁধন আলগা হয়ে আসে। বুকের ভেতর অস্থিরতা নেমে আসে। গলার স্বর নরম হয়ে আসে। আদর মিশিয়ে বলে,
“সরি সোনা… আর কষ্ট দেব না তোমাকে। রাগ করো না লক্ষ্মীটি। তুমি তো জানোই, তোমাকে হারানোর ভয় আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তুমি এক পলক আমার চোখের আড়াল হলে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় আমার। তুমি আমার অক্সিজেন নেওয়ার একমাত্র কারণ। আর কখনো এভাবে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবে না। এখন তোমাকে হারিয়ে আমি বাঁচতে পারব না!”

রিম গাল ফুলিয়ে তার শরীরে নখের আঁচড় কাটতে থাকে। জেইন চুপচাপ সবটা সহ্য করে।
রিম শান্ত হয়ে এলে, জেইন গলায় আহ্লাদ মিশিয়ে বলে,
“আমার সোনার রাগ কমেছে? হুম…”
“কথা বলবি না তুই আমার সাথে। খালি মারে! একটুও আদর করে না।”
জেইন রিমকে নিজের সাথে মিশিয়ে ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসে,
“তাই আমি আদর করি না তোমায়? আমি আদর করতে শুরু করলে তুমি তো সহ্যই করতে পারো না। বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করার এই এক সমস্যা! আমি তোমাকে যতটা দিই, তার এক শতাংশও নিতে পারো না তুমি।
রিমের ক্রোধে ফুঁসে ওঠে

“বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করতে বলেছে কে আপনাকে?
“কি করবো বলো? আমার যে তোমাকেই লাগতো। বিশ্বাস করো লাইফে এতো মেয়ে দেখেছি এতো কাছ থেকে! কিন্তু তোমার মতো নিষিদ্ধ ফল আর একটাও নেই। ওদের সাথে ওসব করে মজা পাবো নাকি? যেটা তোমার সাথে পাই। তুমি তো মাথা থেকে পা অব্দি পুরোটাই একটা মিসাইল। আমার জন্য তৈরি এটম বোমা!”
মুহূর্তেই রিমের মুখ চুপসে গেল। অন্ধকার ছায়া নেমে এলো। জেইন ধীরে ধীরে তাকে বাথটাবের গরম জলে নিয়ে ফ্রেশ করিয়ে দিল। এর মাঝে বারবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল সে, রিমের ভেজা শরীর তাকে উন্মাদ করে দিচ্ছিল, তবুও ধৈর্য ধরে নিজেকে সামলে রাখলো। এতোক্ষণে রিমের মুখ থেকে একটাও শব্দ বের হলো না। নিষ্প্রাণ মূর্তির মতো বসে ছিল সে।

জেইন রিমের শরীরে টাওয়াল জড়িয়ে কোলে তুলে রুমে নিয়ে এলো। আলতো করে সোফায় বসিয়ে সে সাবধানে শরীরটা মুছে দিল। তার চোখ রিমের প্রতিটি ইঞ্চিতে তীক্ষ্ণভাবে বিচরণ করছে—যেন নিজের শিল্পকর্ম দেখছে। এরপর ক্ষতস্থানগুলোতে আঙুল দিয়ে শীতল মলম লাগিয়ে দিতে শুরু করল।
প্রতিটা স্পর্শে কেঁপে কেঁপে উঠল রিম। শুধু ব্যথায় নয়, জেইনের অদম্য আকাঙ্ক্ষার আঁচ অনুভব করে।আর জেইন… সে বারবার শুষ্ক ঢোক গিলল। তার মনে হলো, সে পারলে চব্বিশ ঘন্টাই এই মেয়েকে নিজের শরীরের নিচে পিষ্ট করে দিত। এই মেয়ে তার পুরো পৃথিবীতে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে—এক দহন, যা তাকে ধ্বংস করে আরও উন্মত্ত করে তোলে।

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাবার্ড থেকে একটা হালকা, আরামদায়ক লেডিস শার্ট নিয়ে রিমকে পরিয়ে দিল, যেন তার শরীর কম্ফোর্ট ফিল করে। তারপর রিমকে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল। রিম তখনো উদাসীন, নিষ্প্রাণ।
জেইন আগে থেকেই সার্ভেন্ট দিয়ে কিছু স্যান্ডউইচ আর জুস আনিয়ে রেখেছিল। সে খাবার নিয়ে রিমের মুখের সামনে ধরল। রিম মুখ ঘুরিয়ে নিল। জেইনের কপালে ভাঁজ পড়ল।
“এখনো রাগ করে আছো আমার ওপর? বললাম তো আর হবে না। চুপচাপ খেয়ে নাও, লক্ষ্মীটি।”
রিম অন্যদিকেই মুখ ঘুরিয়ে রাখল। তার চোখে অশ্রু জমে উঠলো, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। আর সেই সাথে অস্থির হয়ে উঠল জেইন।

“কী হয়েছে সোনা? কাঁদছ কেন? আমাকে বলো, কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার? পেটে ব্যথা হচ্ছে এখনো? নাকি ওখানে? দেখি…”
রিম নিঃশব্দে কেঁদে ফেলল। কান্নায় যেন তার বুক ফেটে যাচ্ছে। জেইন বারবার তাকে জিজ্ঞেস করতে থাকল ‘কী হয়েছে তার?’ কিন্তু রিমের তরফ থেকে কোনো উত্তর এল না। তার কান্নার গতি আরও বাড়ল।
জেইনের ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ এবার ভেঙে গেল।
“ইডিয়ট! কাঁদছ কেন, হ্যাঁ? আমি কি কান্নার অনুমতি দিয়েছি তোমায়? আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছ? আমার সামনে একদম কাঁদবে না! সেই অধিকার আমি দেইনি তোমায়!”
রিম এবার শব্দ করে কেঁদে উঠল। জেইন হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জোরে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল বিছানায়। রিম ভয়ে কেঁপে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে তার হেঁচকি উঠে গেছে।
জেইন তার চুলের মুঠিটা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল।
“এই! তোকে বলেছি না কাঁদবি না! তোর কান্নার শব্দ শুনতে চাই না আমি। আরে ইডিয়ট, কবে বুঝবি তুই? তোকে কাঁদতে দেখলে আমার বুকের পাঁজর ছিঁড়ে যায়! কষ্ট হয় আমার! বুঝিস না তুই? কেন আমর কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছিস তুই?
রিম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে। অভিমানী গলায় বলল,

“আমার জন্য কেন কষ্ট হবে? আমি কে? আমি মরে গেলে কী আসে যায় তোর? মেয়ের অভাব আছে নাকি তোর জীবনে? এত মেয়েকে এত কাছ থেকে দেখেছিস! তাহলে আমাকে কি প্রয়োজন? তাদের কাছেই যা!”
এক মুহূর্তে জেইনের কপাল চওড়া হয়ে গেল। মুখে খেলে গেল হালকা বাঁকা হাসি। রিমকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। রিম ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করলে জেইন তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁটে শক্ত করে একটা চুমু দিয়ে বলল,

“এইজন্য এত রাগ! উফ্, আমার Angry Bird একটা।”
রিম জড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই জেইনের বুকে হিংস্রভাবে দাঁত বসিয়ে দিল।
জেইন বুক কাঁপতে কাঁপতে ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ে বলল,
“হেই Wildcat, বিলিভ মি, আমার জীবনে একমাত্র নারী তুমি। তুমিই আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ নারী। তুমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারীর ছায়াও স্পর্শ করিনি আমি। একমাত্র তুমিই সে, যাকে আমি গভীর থেকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছি। তুমি ছাড়া এ জীবনে দ্বিতীয় কোনো নারীর অস্তিত্ব নেই। আর না… কোনোদিন আসবে না।”
বলেই একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে।

“খাবারটা খেয়ে নিও। তোমার কষ্ট হলে আমি আর কখনো এভাবে স্পর্শ করব না তোমায়।”
রিমের বুক ধক করে উঠল। নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হলো। সে বুঝতে পারল, সে কত বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। যেই পুরুষ তার জন্য এতটা উন্মাদ, বেপরোয়া তাকে নিয়ে কীভাবে এমন ভুল ধারণা রাখতে পারে সে? রাগে-দুঃখে কান্না আসছে তার। কিন্তু এখন কাঁদলে হবে না। জেইনের অভিমান ভাঙতে হবে।
সে উঠে দাঁড়াল। অসহায় গলায় বলল,
“শোনো না, তুমি কি সত্যিই আমাকে আর স্পর্শ করবে না?”
“তোমার যদি ভালো না লাগে, তাহলে করব না। কষ্ট হলেও নিজেকে সামলে রাখব।”
রিম সাথে সাথেই উত্তর করল,
“কে বলেছে তোমার স্পর্শ আমার ভালো লাগে না? আমি তোমার স্পর্শ পেতে চাই। রোজ চাই!”
জেইনের মুখে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু সে সেটা আড়াল করে বলল,
“তাই? দেন প্রুভ ইট!”

রিম তার আরও কাছে চলে এল। জেইন বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে। রিমের হাইট এতটাই ছোট যে সে বিছানায় দাঁড়িয়েও জেইনের কাঁধ ছুঁতে পারছে না। রিম পায়ের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়াল। দু’হাতে জেইনের কাঁধ জড়িয়ে আচমকাই তার ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দিল।
জেইনের চোখ বিস্ফোরিত। রিম তার উচ্চতা মেলাতে পারছে না, তাই ঠোঁট মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। জেইন একটু বিরক্ত হয়, মেয়েটা ঠিকমতো চুমুও খেতে পারে না! এত দিনে তার কাছ থেকে এই শিখল?
সে রিমকে উঁচু করে কোলে তুলে কোমরে জড়িয়ে নেয়। মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে বলে,

“তোমার হাইট এত ছোট কেন বলতো?”
রিম রাগে ফোঁস করে ওঠে। হাইট নিয়ে কিছু বললে একদমই সহ্য করতে পারে না সে। সে জানে তার হাইট ছোট। সে কি ইচ্ছে করে নিজের হাইট ছোট বানিয়েছে নাকি? রাগে কিছু বলতে নিলেই জেইন হাস্কি ভয়েসে বলে ওঠে,
“But I like it! You know what? হাইটে ছোট মেয়েদের কোলে বসিয়ে চুমু খাওয়ার মজাই আলাদা।”
মুহূর্তেই রিমের গাল রক্তিম হয়ে ওঠে। লজ্জায় মুখ গুঁজে দেয় জেইনের বুকে। জেইন ঠোঁট কামড়ে শুষ্ক ঢোক গিলল।
“আমাকে খাবারের লোভ দেখিয়ে এখন লজ্জা পেয়ে লাভ নেই সোনা। তোমার ওই তুলতুলে ঠোঁট দুটো আমার এখনি চাই। চায়ই চাই!”
রিম অসহায়ভাবে তার দিকে তাকায়। জেইন তার ঠোঁটের দিকে নেশালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবারও শুষ্ক ঢোক গিলল।

“Kiss me, Sona… More deeply! I wanna…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই রিম তার ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে দিল। আশ্লেষে শুষে নিতে থাকল জেইনের ঠোঁট দুটো। তবুও শান্তি পায় না জেইন। রিমকে কোলে নিয়েই বসে পড়ল বিছানায়। চুম্বনের মাঝেই বলে উঠল,
“উমম্! More deep, baby! ফ্রেঞ্চ কিস পারো না? I want to taste your tongue!”
রিম ধীরে ধীরে নিশ্বাস নিয়ে বলল,
“ক… কীভাবে? আমি পারি না তো…”
“ওকে, লেট মি টিচ ইউ। এবার আমি যেভাবে করব, তুমিও আমার সাথে রেসপন্স করবে। ওকে?”
রিম ফাঁকা ঢোক গিলে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝায়। জেইন এবার অধৈর্য হয়ে ক্ষুধার্তের মতো হামলে পড়ে তার ঠোঁটের ওপর। রিম প্রথমে হাঁসফাঁস করে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয় নিজেকে। তার শরীর শিহরণে কেঁপে ওঠে বারবার। জেইন তার জিহ্বা সম্পূর্ণ নিজের দখলে নিয়ে রেখেছে। ধীরে ধীরে শুষতে থাকে নিজের ভেতর।

সময়ের পর সময় গড়িয়ে যায়। কিন্তু জেইন তাকে একটুও ছাড়ে না। একসময় রিম মরার মতো ছটফট করে উঠল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। জেইনের চুল শক্ত করে খামচে ধরে অস্ফুটে বলে উঠল,
“এখন ছাড়ো প্লিজ। আর পারছি না। আমাকে একটু শ্বাস নিতে দাও।”
সাথে সাথেই জেইন তাকে ছেড়ে দেয়। ভয়ে রিমের মুখ শুকিয়ে যায়।
“তুমি কি আবারও রাগ করেছ? আমার সত্যিই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তুমি চাইলে এখন আবার করতে পারো। আমি এইবার আর কিছু বলব না।”
জেইন তার গালে আলতো হাত রাখে।
“না সোনা, আমি রাগ করিনি একটুও। আমার বোঝা উচিত ছিল, যে তোমার কষ্ট হচ্ছে। এরপর থেকে আমি খেয়াল রাখব। এখন তুমি খেয়ে নাও। পেট ব্যথা কমেছে?”

রিম মাথা নাড়িয়ে না বলে। এত কিছুর পর তার শুধু পেট নয়, পুরো শরীরেই ব্যথা করছে। জেইন বুঝতে পারছে, সবটাই তার উন্মাদনার ফল। কিন্তু সে কী করবে? শত চেষ্টা করলেও এই মেয়ের সামনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সে।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রিমকে খাবার খাইয়ে দেয়।
জেইনের আদরে আহ্লাদী হয়ে ওঠে রিম। মেয়েরা এমনিই হয়, তার মাঝে যতই ম্যাচিউরিটি থাকুক না কেন, ভালোবাসার মানুষের সামান্য যত্নেই বাচ্চাদের মতো হয়ে যায়। রিমের ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। ছোট থেকে বাবা-মায়ের ভালোবাসা না পেয়ে সবসময় একা একা চুপচাপ থাকত সে। দেখলে মনে হতো অনেক ম্যাচিউর। কিন্তু হঠাৎ একসাথে এতটা ভালোবাসা পেয়ে তার ভেতরের বাচ্চা রিম যেন বেরিয়ে এসেছে। সে খেতে খেতে আহ্লাদী সুরে বলে,

“আমি বিরিয়ানি খাবো।”
“আচ্ছা, এখন এটা খাও। পরে এনে দেব, কেমন?”
রিম বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝায়। জেইন টুপ করে একটা চুমু বসিয়ে দেয় তার গালে। তার কাছে মনে হয়, সারাক্ষণ এই মেয়েকে সামনে বসিয়ে শুধু চুমু খাবে সে। রিম লজ্জায় লাল হয়ে যায়। এখন তো তার আরও কাছে পেতে ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে। সে তাড়াতাড়ি রিমকে খাইয়ে দেয়। এরপর ২টা ট্যাবলেট রিমকে খেতে দেয়। রিম ভ্রু কুঁচকে তাকায়,

“এগুলো কী?”
“পেইনকিলার। খেয়ে নাও। শরীরের ব্যথা কমে যাবে।”
রিম ওষুধগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে,
“একটা তো পেইনকিলার, আর অন্যটা?”
জেইন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
“দুটোই খাও। ব্যথা তাড়াতাড়ি কমে যাবে।”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪০

রিম আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ খেয়ে নেয় ওষুধ দুটো। জেইন তাকে বুকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। সারারাত নির্ঘুম থাকার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় রিম। জেইন আলগোছে উঠে কম্ফোর্টারটা রিমের গায়ে টেনে দেয়। ঘুমন্ত ঠোঁটে শক্ত করে একটা চুমু খায়। তারপর নিজে ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। সবশেষে দরজাটা টেনে বেরিয়ে পড়ে কক্ষ থেকে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪২