Home প্রিয়তে তুমি প্রাণ প্রিয়তে তুমি প্রাণ পর্ব ২৫

প্রিয়তে তুমি প্রাণ পর্ব ২৫

প্রিয়তে তুমি প্রাণ পর্ব ২৫
মিমি মুসকান

সকলের রোদের ঝিলিমিলি আলো পর্দা ভেদ করে আছড়ে পড়ছে মেঝেতে। হালকা মৃদু হাওয়ায় জানালার দু ধারের পর্দা নেচে উঠছে খানিক বাদে বাদে। চৌধুরী বাড়ির পিছনের দিকে বাগান নেই তবে বড় বড় দুটো পেয়ারা গাছ আছে। আফসোসের বিষয় সেই গাছে এখন অবধি কোনো পেয়ারা হয়নি। যাও হয়েছিল কস কস। খাওয়া যায় না। তবে সেখানে পাখিরা বাসা বানিয়েছে। সেই পাখির গুঞ্জন রব প্রান্তিকের কান ভেদ করে মস্তিষ্কে প্রবেশে বাঁধা পড়ছে। তার মস্তিষ্কে বিচরণ করছে অপরূপা এক রমণী। যে এই মুহূর্তে বালিশ ছেড়ে তার বাহু আঁকড়ে ঘুমাচ্ছে। বাচ্চাদের তার ঠোঁট দুটো উল্টে আছে। স্বপ্ন টপ্ন দেখছে বোধহয়। চোখের পাতা নড়ে উঠছে বারংবার। একটু নড়েচড়ে উঠতেই মুখ ঢেকে গেল নিকষ কালো কেশে। আনমনে হেসে উঠল ওপ্রান্তে থাকা ব্যক্তিটি।

আলোর তেজ বেড়েছে। উদাম পিঠের উপর আলোর রশ্মি এসে চিকচিক করছে। বালিশে মাথা নেড়ে আঙুল নাচিয়ে খেলছে তার নিকষ কালো চুলের সাথে। চোখের পাতা ফেলে ফেলে সে দেখছে মুগ্ধ দৃষ্টিতে। অ্যালার্ম ঘড়িটা বেজে উঠল। শরীর আলস্যে ভরে উঠল। উঠতে ইচ্ছে করছে না যে। হাতড়ে অ্যালার্ম বন্ধ করে করল সে।
কিন্তু তার ঘুম যে বড্ড কাঁচা। কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর শব্দ হতেই চোখ মিনিমিনি করল সে। ওপাশের ব্যক্তিটি তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করে বালিশে মাথা গুঁজল। অভিনয় পাক্কা খেলারি। উঠে বসল সে। ঘাড় ব্যথা করছে খুব। কে যে বলেছিলো শখ করে বালিশ ছেড়ে এদিকে ঘুমাতে। প্রেমে পড়লে মানুষ পাগলের সাথে সাথে গাধাও হয়ে যায়। ঘুম ঘুম চোখে এদিক ওদিক ফিরে তাকাল সে। ঘুমন্ত মানুষটির মুখখানি দেখতে পেয়ে সমস্ত কষ্ট ভুলে গেলে চট করে। শরীর আবারো এলিয়ে দিলো বিছানায়। উপুড় হয়ে দেখতে লাগল তাকে। হাতের আঙ্গুল দিয়ে ঘুরিয়ে নাচিয়ে দেখছে তাকে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

চেহারার চারদিকে আঙ্গুল দিয়ে নাচিয়ে যাচ্ছে কেবল। দেখতে দেখতে আঙুল এসে ঠেকল ঠোঁটের কাছে। লজ্জায় শিউরে উঠল পুরো শরীর। মুখ টিপে হেসে উঠল সে। লজ্জা শরমের মাথা না খেয়ে হাত সরিয়ে নিতে গেল। তৎক্ষণাৎ হাত কাম*ড়ে ধরল সে। আঁ*তকে উঠল আচমকা।
মুখ ফুটে উচ্চারণ করল “ইশ”! হাতের আঙ্গুল অন্য হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। ভ্রু যুগল কুঁচকে আছে তার। ব্যথাই বোধহয় পেয়েছে। এভাবে কাম*ড়ে ধরে কেউ!
বেপোরোয়া ভঙ্গিতে হাসছে সে। চোখ মুখ কুঁচকে উঠল আরো। অভি*মানী হয়ে উঠছে ভীষণ। মুখে অন্ধকার নেমে এলো। চলেই যাবে সে। আচমকা হেঁচকা টানে তাকে কাছে আনল সে। তার উদাম বুকের উপর আছড়ে পড়ল সে। দুহাতে শক্ত করে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিল তাকে। মুখে দুষ্টু মিষ্টি হাসি। এবার যাবে কোথায় তুমি?
নরম মসৃণ বুকের উপর হাতটা রাখল শক্ত করে। ছাড়িয়ে নেবার বহু চেষ্টা ইতোমধ্যে ব্যর্থ। এতো বড় একটা ভালু*কের সাথে তার পিচকুর পেড়ে উঠা যায় না। বুকের মধ্যে মার*ল কয়েকটা কি’ল ঘু’ষি। মুখের রঙ বদলে গেলো। ছেড়ে দিয়ে আঘাতের স্থান আঁকড়ে ধরল। ভাব টা এমন ব্যা*থা পেয়েছে খুব।

বিচলতি হয়ে উঠল তার মুখখানি। রমনীর চঞ্চল দৃষ্টি এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। অ*পরাধ বোধে চোখে অ*শ্রু জমছে দ্রুত বেগে। সে কি আর ব্যথা দিতে চেয়েছিল নাকি। প্রিয় সোনা বউয়ের চোখের জল তার সহ্য হলো না। ফিক করে হেসে উঠলো সে। আহ্লাদী সুরে বলল,
“আহ মজা করছিলাম। কি করো কি? এই সকাল সকাল আমার সোনা বউয়ের চোখের জল দেখবো নাকি। থামো বলছি, এই বউ!”
প্রিয়তার অভি*মানী মন মানতে চায় না। আ*ঘাতের জায়গাটা হাতের নরম স্পর্শে একটু পরখ করে দেখে নেয়। ফিরে চায় সেই মুখখানির দিকে। হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে কপালের সেই ক্ষত আওড়ায় গভীর যত্নে। মনের মধ্যে ব্যাথার দানা যেন দল বেঁধে ছোটাছুটি করে। মুখটা নামিয়ে চাঁপা স্বরে বলে উঠে,
“আমার জন্যে আপনি সবসময় কষ্ট পান তাই না। কতো গুলো আ*ঘাতের চিহ্ন। বার বার আমিই আঘা*ত দেই আপনাকে!”

না! সকালটা বেশ ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছে। এই মেয়ে এবার নির্ঘাত ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলবে। এসব হতে দেওয়া যায় না। উঠে বসল সে। দুই হাতে তার মুখশ্রী আগলে নিল শক্ত দুই হাতের নরম তালুতে। সা*পের মতো বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে তার দেহ। পরম যত্নে বলে উঠলো,
“আ*ঘাত গুলোই দেখছো? ভালোবাসা দেখলে না! আমার সারাজীবনে যেই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিলাম তা যে তুমিই পূরণ করলে। ওসবের কি দাম নেই?”
চোখের অশ্রু টলমল। এই কেঁদে দিলো বলে। যা! এমন সকাল সে চায়নি। দ্রুত চোখের অশ্রু মুছিয়ে নিল। আলিঙ্গন করে নিল পুরো দেহকে। স্নিগ্ধ স্বরে বলে উঠলো, “প্লিজ বউ কেঁদো না! তোমার ভারী ভারী‌‌ মুখ দেখলে আমার দিনটাই মাটি হয়ে যাবে!”
অগত্যা তাকে কান্না থামাতে হলো। নিজের জন্য না হলেও তার জন্য। প্রান্তিক চৌধুরী তিন আঙুলে তার থিতুনিতে হাত রাখল। চুমু খেল চোখের পাতায়। কোন এক অলৌকিক শক্তি টানছে তাদের। চুম্বকের ন্যায় আগাচ্ছে সে। আসন্ন ঘটনার উপস্থিতি পেয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল সেই। দুই প্রান্তের অধর ছুঁই ছুঁই। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো ঘর কাঁপিয়ে!

মুডের বারোটা বেজে গেল চট করে। ফোন আসার আর সময় পেলো না। শুভ কাজটা এই হতো বলে। ওমা দেখো! তার সোনা বউ খুশিতে আবার হাসছে। এতো খুশির কি আছে? তাকে না জ্বা*লিয়ে তার শান্তি হয়না। অতঃপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফোন ধরল। না হলে তা থামবে না।
রাফির ফোন! ধরার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। ফেলে আসা কাজ পূরণে অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা তাকে ঘিরে রেখেছে। কে শুনে কার কথা। ফোন তো বেজেই যাচ্ছে। রাফিও আস্ত একটা নাছোড়বান্দা। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ঝড়ের গতিতে সে বলে উঠলো,
“আরিনা শেখের জ্ঞান ফিরেছে!”
কথাটা এতো জোরেই বলল যে প্রিয়তা অবধি শুনল। সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। এক অন্যরকম বাহানা তার চোখে মুখে। প্রান্তিক চৌধুরী না করবে কিভাবে?

হাসপাতালের বাইরে দুজন। প্রিয়তা তার বাহু আঁকড়ে ধরে আছে। মোটামুটি ভাবে তাকে জোর করিয়েই আনা হয়েছে। নাহলে প্রান্তিকের বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না আসার। ওসব ঘটনার পর তার মুখ দেখলেও মাথা গর*ম হয়ে যাবার কথা। সেখানে তার বউ ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে। মানা করতে পারবে না। গলায় কাঁটা বেঁধে যাবে যে!
তবে এসেও ভালো হয়েছে। একজনের সাথে আলাপের বেশ ইচ্ছে আছে। ইজান শিকদার! নিশ্চয়ই সেও আসবে এখানে!
দুজনেই একসাথে এগিয়ে যাচ্ছে। পা মিলিয়ে হাঁটছে প্রান্তিক। তার চোখ নিচের দিকে প্রিয়তার হাঁটার পথ দেখছে। সে আরেকটু দ্রুতই হাঁটে কি না! পা মিলিয়ে সমান তালে হাঁটতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
আচমকা থেমে গেল সেই পা। প্রান্তিক চৌধুরী পা থেকে মাথা অবধি পরখ করে চোখে চোখ মিলিয়ে ভ্রু নাচালো। অর্থ “কি হলো?”
প্রিয়তার চোখ মুখ স্বাভাবিক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে খুব অস্থির। আজ এখানে এসেছে একটা হেস্তনেস্ত করতে। এভাবে হয় না। আজ আরিনা শেখের সাথে কথা বলে একটা মিটমাট তাকে করতেই হয়। নয়ত ক’দিন চলবে এই খেলা।
আবারো শুধায়! এবার ইশারায় নয় মুখেই বলে, “কি হয়েছে?”

“আমায় কথা দিন!”
“কি কথা?”
“ইজান শিকদারের সাথে আপনি কিছু করবেন না!”
তাচ্ছিল্য করে হাসল সে। অন্য হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিল। সাদা শার্টের উপর কালো ব্লেজার পরা সে। ব্লেজারের ফাঁক দিয়ে সাদা শার্ট উঁকি দিচ্ছে। মুখে ফিকে হাসি!
“পাগল হলে?”
“না, আপনি কথা দিল। যা হয়েছে হয়ে গিয়েছে। আমি চাই আর কিছু হোক। এবার আপনি তাকে কিছু করবেন, সুযোগ বুঝে সে আবার আপনার ক্ষ’তি করবে। এভাবে করে পালা চলতেই থাকবে। একজনকে তো থামতে হবে!”
মুখে মেকি হাসিটা সে বজায় রাখল। মুখ ঘুরিয়ে নিল সামনে। ঠিক ধরেছে! ইজান শিকদার তো তার সামনেই। মুখোমুখি শ’ত্রু আবারো! দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলো, “আর ম*রে গেলে! ম*রে গেলে তো শত্রু রইল না, একবারে খত*ম!”

প্রিয়তে তুমি প্রাণ পর্ব ২৪

রীতিমতো আঁ*তকে উঠল সে। এক ঝটকায় হাত ছেড়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। চোখ মুখ শুকিয়ে এসেছে। বিবর্ণ ফ্যাকাশে তার দৃষ্টি। কোটরে মণি দুটি নিশ্চল, প্রাণহীন! এতো ভয়ং*কর কথা কেউ বলতে পারে বুঝি। অতঃপর…

প্রিয়তে তুমি প্রাণ পর্ব ২৬