প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১
সাদিয়া সাদু
_”৬ বছর পর দেশে ফিরে নিজের এক্সগার্লফ্রেন্ড কে নিজের বাসার কাজের মেয়ে হিসেবে দেখে । বাকরুদ্ধ দিগন্ত । ”
৬ বছর পর ইতালি থেকে ফিরেছে দিগন্ত খান । আজ থেকে ঠিক ৬ বছর আগে প্রেমিকার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাই ইতালি । দীর্ঘ ৬ বছর পর দেশ দেশের মাটিতে পা রাখে দিগন্ত খান । খান বাড়ির বড় রাজপুত্র হওয়ার সুবাদে খান বাড়ির গিন্নি জহুরা খান নিজে এসেছে এয়ারপোর্টে । হাতে বিশাল বড় একখান জারুল ফুলের তোরা ।
দিগন্ত এয়ারপোর্টে থেকে সামনে এগোতেই দেখা হয় জহুরা খানের সাথে । দাদিকে দেখেই জড়িয়ে ধরে দিগন্ত । জহুরা হাসি হাসি মূখে হাতের তোরাটা এগিয়ে দেয় ।
তোরা-র ফুলগুলো দেখে গম্ভীর মুখটা আরেকটু ফোঁসে ওঠে । নাকে পাকা ফুলে ফেঁপে উঠে । দাদির দিকে তাকিয়ে ঝাঁজালো কন্ঠে সুধায় ।
_’ আই হেইট জারুলফুল দাদি । এই ফুলের নাম বা এই ফুল কে কক্ষনো আমার সামনে আনবে না ।’
জহুরা চোধুরী চোখেমুখে হাসির খেলে যায় । সে প্রতিত্তুরে কোনো শব্দ প্রয়োগ না করে নাতিকে নিয়ে মহলে ফিরে ।
দিগন্ত ৬ বছর পর নিজ গৃহে ফিরেছে দিগন্ত সে সুবাদে দীনা বেগম ছেলের জন্য পুরা বাড়ি সাজিয়েছেন । তারসাথে ছেলের পছন্দের সকল খাবার রান্না করেছেন ।
দিগন্ত বাড়িতে প্রবেশের সাথে সাথে সকল ছেলে মেয়েরা লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বর্ষণ করে । দীনা বেগম হাতে মিষ্টির প্লেট নিয়ে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকে ।
দিগন্ত বাড়ি ফেরার সাথে সাথে দীনা বেগমের চোক্ষু দুইটা ছলছল করে উঠলো ।
দিগন্ত মায়ের চোখের পানি দেখে এগিয়ে এসে নিজ থেকে জড়িয়ে ধরে মুলায়েম কণ্ঠে সুধায় ।
_” ডোন্ট ক্রাই মা । দেখো ফিরে এসেছি আমি । ‘
দীনা বেগম জামদানি শাড়ির আঁচলের কোণা দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে অস্পষ্ট স্বরে বলে ।
_’ আআর যাবি না । ‘
_’ উহু । ‘
দীনা বেগম ছেলের মুখে মিষ্টি তুলে দেয় । দিগন্ত মিষ্টি পছন্দ না করলেও মায়ের হাত ফিরিয়ে দিতে পারেনি । নিচু হয়ে মিষ্টি মুখে নিয়েই মাকে পানি দিতে ইশারা করে ।
_’ আল্লাহ পানি আনতে ভুলে গেছি । জারুল পানির গ্লাসটা নিয়ে আয় তো ।’
জারুল গায়ে ময়লা হাত মুছতে মুছতে এক হাতে পানির গ্লাস নিয়ে উপস্থিত হয় হলরুমে । _” বড় মা পা..’
সম্পুর্ন কথা শেষ করার আগেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে চমকে উঠে জারুল। অন্যপাশে দিগন্ত জ্বলন্ত আগুনের ন্যায় তাকিয়ে আছে জারুলের মুখে । তার প্রাক্তন প্রেমিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।
আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে এই বিশ্বাসঘাতকতার কারণে দীর্ঘদিন দেশ ছেড়েছিলো সে । অন্য এক পুরুষের হাত ধরে তার চার বছরের ভালোবাসাকে অস্বীকার করে চলে যায় সে । দেশে ফিরতে না ফিরতেই তারে সাথে দেখা !
দিগন্তের পিছনে একজন রহস্যময়ী মানব দাঁড়িয়ে আছে । তার চোখেমুখে খেলে যাচ্ছে হাসির রেখা ।
দিগন্ত হিসাব মিলাচ্চে জারুল তার বাড়িতে কি করছে । সরাসরি প্রশ্ন করলে বাড়ির সবাই সন্দেহ করবে। দিগন্ত ঠোঁটে উপর নীচ চেপে নিম্ন স্বরে বলে
_’ এই মেয়েকে তো চিনলাম না । ‘
_’ অ্যা তো জারুল । আমাদের বাড়িতে ২ বছর ধরে কাজ করছে । ‘
কাজ করছে কথাটা কানে পৌছাতেই দিগন্ত মুচকি হেসে উঠলো। এ তো সেই মানুষ, যার হাত একদিন নিজের হাতে ধরে আজীবন একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।
তার প্রাক্তন প্রেমিকা।
ছয় বছর আগে যে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই তার হাত ছেড়ে অন্য একজনের হাত ধরেছিল।
এক মুহূর্তে দিগন্তের ভেতরে শত শত অনুভূতির সংঘর্ষ শুরু হলো। বিস্ময়, অপমান, অভিমান, ক্ষোভ, অপূর্ণতা—সবকিছু যেন একসঙ্গে তার হৃদয়ে আঘাত হানল।
সে নিজেকে প্রশ্ন করল—
“এ কি সেই মেয়ে, যে আমাকে ছেড়ে বিলাসিতার স্বপ্ন দেখেছিল? যে আমার ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে অন্য কারও সঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছিল? আজ সে আমার বাড়িতে… একজন কাজের মানুষ?”
তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক তিক্ত হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর এক শূন্যতা। কারণ সত্যি কথা হলো, মানুষটি তাকে কষ্ট দিয়েছিল, কিন্তু একসময় সে মানুষটিকেই নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল।
সে অনুভব করল, প্রতিশোধের আগুনের চেয়েও স্মৃতির দহন অনেক বেশি নির্মম।
জারুল ট্রে হাতে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করার সময়ও সে জানত না, ভাগ্য আজ তার সঙ্গে এমন নিষ্ঠুর পরিহাস করবে।
মাথা নিচু করে এগিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির জুতোর দিকে চোখ পড়ল।
তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ওপরে উঠতেই…
হাত থেকে ট্রেটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
দিগন্ত!
তার নিঃশ্বাস যেন বুকের ভেতর আটকে গেল।
ছয় বছর আগে যে মানুষটিকে নিজের সিদ্ধান্তে হারিয়েছিল, আজ সেই মানুষটির বাড়িতেই সে কাজের লোক।
লজ্জা, অনুশোচনা, অপমান আর অপরাধবোধ একসঙ্গে তাকে গ্রাস করল।
তার মনে পড়তে লাগল অতীতের প্রতিটি সময় । দিগন্ত এক মূহূর্তের জন্য তাকিয়ে রয় । গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করে সিঁড়ির দিকে পা রাখে । নিজের রুমের ফটক সশব্দে খোলে নিজের ঘরে পা রেখে এগিয়ে যায় ওয়াশ রুমের দিকে ।
ট্যাপ ছেড়ে নিজের ফর্সা বলিষ্ঠ দেহে উন্মুক্ত করে দাড়ায় । দেয়ালে হাত দিয়ে চুল বারে বারে স্লাইড করে পিছনে নিচ্ছে । আর বন্ধ চোখ জোড়ায় ভেসে উঠছে হলরুমে দাঁড়িয়ে থাকা জামরুলের অসহায় মুখটা । সেই মুখটাই ছিলো না বরা হাজারো আকুতি মিনতি। জারুল এর মায়াবী মুখটা তার চোখে ভেসে উঠতেই এক ঝটকায় চোখ খোলে ফেলে । ব্যাঙ্গালোর স্বরে বলে ।
‘ এই মুখ মায়াবী ফেইসের আড়ালেই ছিলো তার এক নির্মম চেহারা । এই চেহারাটা আমি জ্বালিয়ে দিবো । আই প্রমিজ। ‘
দীর্ঘ সময় সাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে দিগন্ত । রুমে প্রবেশ করতেই দীনা হুরমুরিয়ে খাবার প্লেট হাতে নিয়ে প্রবেশ করে রুমে। দিগন্ত মাকে দেখে ছোট একটা শ্বাস ফেলে । সে না চাইতেই বলে বসে ।
_’জারুল মেয়েটা আমাদের বাসার কাজ করার রিজন কি ? ‘
লীনা ছেলের কথায় ব্রু কুঁচকে থাকায় ।
দিগন্ত মায়ের চাহনী পরখ করে থমথমে খেয়ে ফের বলে ।
_’ না মানে দেখতে তো শিক্ষিত সুন্দর তাহলে এইভাবে মানুষের বাসায় কাজ করার কারণ টাই জিজ্ঞেস করছি । ‘
দীনা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে ।
_’ এই মেয়েটার ও একটা ৬ বছরের মেয়ে আছে । সাথে প্যারালাইসিস মা । তাদের দুইজনকে নিয়েই তার সংসার । এই মেয়েটাই দুইজনকে চালাই । আর পড়াশোনা বলতে মেট্রিক পাশ । ‘
দিগন্ত জ্বলন্ত আগুনের ন্যায় তাকিয়ে আছে । ৬ বছরের মেয়ে আছে শুনতেই যেনো সে চমকে উঠে । তার সাথে সম্পর্ক শেষ হয়েছে । ৬ বছর , আর মেয়েটার বয়স ও ৬ বছর ।কোনোভাবে মেয়েটা তার মেয়ে নয়তো !
