প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১১
উম্মে হাবিবা
~~~ দুপুরে রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শোয়া মাত্রই চোখে ঘুম চলে এসেছিলো সোহার। রুদ্র যখন ফ্রেশ হয়ে বাহিরে আসে সে দেখে সোহা ঘুমাচ্ছে। সে ও সোহার পাশে শুয়ে পড়ে। সোহার ঘুম ভাঙ্গে ঠিক মাগরিবের পর। হাই তুলতে তুলতে উঠে বসে। তখনি রুদ্র হাতে দুই মগ কফি নিয়ে রুমে প্রবেশ করে।
উঠে পড়েছো?
সোহা চোখ ঢলে সামনে তাকায়। ঘুম ঘুম চোখে মাথা নাড়ে। রুদ্র একটা মগ সোহার হাতে ধরিয়ে দেয়।
কফি টা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে পড়তো বসো। পড়া শুনা নিয়ে কোনো ফাঁকি বাজি চলবে না।
সোহা কাঁদো কাঁদো মুখ করে রুদ্রের দিকে তাকায়। রুদ্র সে সবে পাত্তা না দিয়ে চোখের ইশারায় কফি শেষ করতে বলে। একটু খানি কফি মুখে নিয়ে সোহা রুদ্রের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে __
কফি আপনি বানিয়েছেন?
হুম,, কেনো ভালো হয় নি।
অসাধারণ হয়েছে, আমি নিজেও এতো ভালো কফি বানাতে পারি না।
সমস্যা নেই আমি আছিতো। আমি বানিয়ে খাওয়াবো।
আপনি এতো ভালো কফি বানানো শিখলেন কই থেকে। আগে কারো জন্য বানাতেন নাকি?
হুম বানাতাম তো। খুব কাছের একজনের জন্য।
সোহার চোখের ঘুম ঘুম ভাবটা যেনো এবার পুরো উভে যায়। সে রুদ্রের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকায়। তারপর মুখটা কালো করে রুদ্রকে বলে__খুব কাছের মানে?কতো টা কাছের।
সোহার মুখটা দেখে রুদ্রের ভিষন হাসি পায় তবে উচ্চ সুরে হাসা রুদ্রের ব্যাক্তিত্বের সাথে যায় না সে সামান্য হেসে চট করে সোহার মুখের সামনে চলে আসে। হয়তো এক ইঞ্চি কিংবা তার কম দূরত্ব আছে তাদের মাঝে। রুদ্রের নিশ্বাস সোহার মুখে পড়তেই লজ্জা আর অস্বস্তিতে চোখ বন্ধ করে নেয়। রুদ্র ফিসফিস করে বলে __
কাছের মানে খুব খুব কাছের। আমার কাছে সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন ছিলো।
তারপর সোহার মুখে হালকা ফু দিয়ে সরে দাঁড়ায়।
সোহা চোখ মেলে তাকায়__ আমতা আমতা করে বলে __
কিন্তু আপনি যে বললেন আমার আগে আপনার জীবনে কোনো নারী ছিলো না তাহলে?
সোহার কথা শুনে এবার রুদ্র একটু শব্দ করেই হাসে _ কি সুন্দর হাসি, আচ্ছা লোকটা সব সময় এমন হাসতে পারে না। লোক টা কি জানে না হাসলে তাকে কি মারাত্মক সুন্দর লাগে।
রুদ্র হাসি থামিয়ে সোহার দিকে তাকায় তারপর বলে__
এই কেউ ছিলো মানে যে সে আমার কোনো মেয়ে বা আমার গার্লফ্রেন্ড হবে এমন তো কোনো কথা নেই তাই না।
সোহা কি যেনো একটা বুঝে জোরে বলে উঠে__ছিঃ তাহলে কোনো ছেলে ছিলো। আপনি কি ইয়ে নাকি আর ছেলেদের সাথে ঐ সব ইয়ে মানে। সরুন আমার বুমি পাচ্ছে।
সোহার কথা বুঝতে রুদ্রের কয়েক মিনিট সময় লাগে। যখন বুঝতে পারে সে তাজ্জব হয়ে সোহার দিকে তাকায়। এই পাগল মেয়েকে আমি কি বুঝাতে চাইলাম আর এ কি বুঝলো। আসলেই কি মেয়েদের বুদ্ধি হাটুতে?
সোহার গা গোলানোর ভাব করা আর মুখের ভঙ্গি দেখে রুদ্র ধমকে বলে উঠে।
তোমাকে তো আমি এমনি এমনি ইডিয়েট বলি না তুমি আসলেই একটা ইডিয়েট। কিসব অশ্লীল ইঙ্গিত তার পর ইয়ে ইয়ে এসব কি পাঁজি মেয়ে।
আপনার কথা তে তো এসব ঐ বুঝা যায়।
রুদ্র কপাল চাপড়ে বলে__
আরে আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ফয়সালের কথা বলছিলাম। আমার অনেক কাছের বন্ধু আমরা এক সাথে পড়া শুনা করছি। কানাডায় ও এক সাথে ছিলাম।
সোহা রুদ্রের কথা বুঝতে পেরে লজ্জায় জ্বিবে কামড় বসায়। ছিঃ ছিঃ আর আমি এসব কি ভাবছিলাম, এখন উনি আমাকে কি ভাববেন।
ইডিয়েট এর মতো চিন্তা বাদ দিয়ে পড়তে বসো। আমি মগ গুলো রেখে আসছি।
রাতে সবাই একসাথে খেতে বসে। রাজিয়া চৌধুরী মুখটা কালো করে বসে আছে সোহা নিজের শাশুড়ীর সাথে টেবিলে খাবার নিয়ে আসছে। রুদ্র বসতেই আদিবা এসে রুদ্রের পাশের চেয়ার টায় বসে পড়ে। এসব দেখে রৌদ আশরাফ মেহতাব কে খোঁচা মেরে কিছু বুঝাতে চায়। আশরাফ মেহতাব তা বুঝতে পেরে আদিবার দিকে তাকিয়ে বলে __নানুভাই তুমি আমার পাশে এসো।
আদিবা নিজের নানার দিকে তাকিয়ে বলে___
কেনো নানাভাই,,এখানে বসলে কি সমস্যা।
সমস্যা না তোমাকে অনেক দিন পর দেখলাম এসো আমার পাশে বসে খাও। আর তা ছাড়া রুদ্র দাদুভাইয়ের পাশের চেয়ার টায় আমার নাতবউ বসবে।
আদিবা রেগে সোহার দিকে তাকায় তারপর বলে___ আমি পারবো না নানাভাই আমি আগেও এই চেয়ার টায় বসতাম এখনো এটাতেই বসবো। এটা কারো বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে আসে নি যে এটাতে শুধু সে বসতে পারবে অন্য কেউ পারবে না।
কথাটা চেয়ারের না আদিবা আপু কথাটা হচ্ছে ভাইয়ার পাশে বসা নিয়ে যেটার অধিকার ভাবির আছে।
বাবার বাড়ি তোলায় সোহা এবার মুখের উপর জবাব দিয়ে বসে__
চেয়ার টা তো আপনিও আপনার বাবার বাড়িতে নিয়ে আসেন নি আপু। আর আমি আমার বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে না আসলেও এটা আমার স্বামীর বাড়ির। আমার শ্বশুর বাড়ির টাকায় কেনা তাই এটাতে আপনার থেকে অধিকারটা আমার অনেকটাই বেশি।
রৌদ হাতে তালি দিয়ে বলে __ ঠিক ঠিক ভাবি একদম ঠিক বলেছে। রাজিয়া বেগমের মুখের দিকে নজর পড়তেই রৌদ একটা বোকা হাসি দিয়ে বলে _ এক্সাইটেড হয়ে গিয়েছিলাম হিহি।
রাজিয়া নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রাগি গলায় বললো__
ঐ মেয়ের সাহস দেখেছেন ভাইজান। আমার মেয়েকে কিভাবে অপমান করছে দেখেছেন।
রেদওয়ান মেহতাব বোনের কথা শুনে বলে__ আ,হা রাজিয়া
বাচ্চারা বাচ্চারা কথা বলছে এটাতে আমাদের বাম হাত না দেয়াই ভালো,, চুপ চাপ খাও ওদের বিষয় ওরা সামলে নিক।
কি করে চুপ থাকবো ভাইজান। আমার মেয়েকে আসছে থেকে এই ছোটোলোক মেয়েটা অপমান করছে। না আছে রুপ না আছে গুন আমার মেয়ের সাথে কথা বলার কোনো যোগ্যতা আছে ওর৷
রেদওয়ান মেহতাব কিছু বলবে তার আগেই রুদ্র ঠান্ডা কিন্তু কঠিন গলায় বলে উঠে__
আমার স্ত্রীকে অপমান করার সাহস আপনাকে কে দিয়েছে। আপনি আমার ফুফু হন তাই এখনো সম্মান দিয়ে কথা বলছি। কিন্তু এর পর আমার স্ত্রী কে নিয়ে একটা বাজে কথাও আমি সয্য করবো না। এটা আপনার বাবা ভাইয়ের বাড়ি তাই আসবেন থাকবেন খাবেন কিন্তু আমার স্ত্রীকে নিয়ে কোনো কিছু বলার সাহস দেখাবেন না। ও কোন পরিবার থেকে এসেছে ও কেমন এসব কোনো কিছুই আমার কাছে ম্যাটার করে না ওর বড় পরিচয় হচ্ছে ও আমার স্ত্রী।
পুরো ড্রইং রুম স্তব্ধ। সবার নিশ্বাসের শব্দ টাও যেনো খুব জোরে শুনা যাচ্ছে। সোহা সহ বাকি সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে রুদ্রের দিকে। রেদওয়ান মেহতাব সব থেকে বেশি অবাক। কারণ তিনি ভেবেছেন ছেলেকে জোর করে অল্প বয়সী একটা মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছেন ঠিকি ছেলে হয়তো তাকে সহজে মেনে নিবেন না। কিন্তু সেখানে সে নিজের বউয়ের জন্য এভাবে স্টার্ন নিবে এটা ভাবনার বাহিরে।
রাজিয়া চৌধুরী নিজের ভাইয়ের ছেলের কাছে এভাবে অপমন হবে ভাবতেও পারেন নি। তিনি খাবার টেবিল ছেড়ে সোজা উঠে চলে যায়।তার পিছু পিছু আদিবাও চলে যায়।এখানে বসে থেকে নিজেকে জোকার বানানোর কোনো কারণ খুজে পায় না।
সোহাকে হা করে দাড়িয়ে থাকতে দেখে রুদ্র ধমক দিয়ে বলে উঠে __
কি সমস্যা বসছো না কেনো,,বসে খাবার শেষ করে তারাতারি উপরে এসো। বলেই রুদ্র নিজের খাওয়া শেষ করে রুমে চলে যায়।
রুদ্র যেতেই সোহা বাদে বাকি সবাই উচ্চ সুরে হেসে উঠে। রৌদ বলে_ যাই বলো আম্মু ভাইয়া তো ফুফুকে একদম ধুয়ে দিয়েছে। সবাই নিজেদের মধ্যে এসব নিয়ে হাসি মজা করছে। সোহা খাবার শেষ করে বসে আছে। তখনি রুদ্র আবার ডেকে উঠে সোহাকে।
সবার সামনে এভাবে ডাকায় সোহা ভিষন লজ্জা পায়। রুনিয়া বেগম সেটা বুঝতে পেরে সোহাকে যেতে বলে। ইতস্তত করে আস্তে আস্তে উঠে যায়।
কি সমস্যা আপনার এভাবে সবার সামনে ডাকছেন কেনো?
আমার বউকে আমি ডাকবো না তো কি পাশের বাড়ির মতিন মিয়া ডাকবে।
আমার বউ শব্দটা সোহাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে তোলে কিন্তু তাও দমে যায় না।
আপনার না হয় লজ্জা শরম নাই সব বিক্রি করে দিয়েছেন কিন্তু আমার তো আছে।
নিজের বউকে ডাকতে আবার লজ্জা কিসের আমিতো আর পাশের বাড়ির জরিনা ভাবিকে ডাকি নি।
কি তখন থেকে পাশের বাড়ির জরিনা মতিন এসব লাগিয়ে রাখছে।
ওহ পাশের বাড়ির জরিনা মতিন এসব বার বার শুনেছো, আর তখন থেকে যে বউ বউ করছি সেটা শুনতে পাও নি?
সোহা কি বলবে ভেবে পায় না। রুদ্রকে তার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কেমন যেনো হচ্ছে। মনে হচ্ছে পেটের ভিতর হাজার হাজার প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। কোনো রকম ঠোঁট নাড়িয়ে বলে __ আমি ঘুমাবো সরুন। এটা বলেই বেলকনিতে চলে যায়।
রুদ্র হাসতে হাসতে বলে_ ঘুমাবে ভালো কথা কিন্তু বেলকনিতে কেনো গিয়েছো? নাকি ওখানে ঘুমাবে?
সোহা কি বলবে ভেবে পায় না আসলেইতো সে ঘুমাবে বলে এখানে কেনো আসলো। সোহা বুঝতে পারে, নার্ভাসনেসে সে আবার ও ভুল কাজ করে পেলেছে। পিছন ফিরতেই জোরে কিছুর সাথে সোহার নাক আর কপাল বাড়ি খায়। একটা কড়া পারফিউম এর ঘ্রান নাকে আসে। হালকা মাথা তুলতেই নজর পড়লো রুদ্রের গলায় থাকা সুতীক্ষ্ণ অ্যাডামস অ্যাপেলটার দিকে। সোহা এক নজরে তাকিয়ে আছে সেটার দিকে।হঠাৎ মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজের হাত খানা উঠিয়ে আঙ্গুল দ্বারা আলতো ছুঁয়ে দেয় সেটা।
আচমকা এমন ছোঁয়াতে রুদ্র চোখ বন্ধ করে ঢোক গিলে। সে ভাবেনি সোহা এমন কিছু করবে। সোহার এমন সামান্য ছোঁয়াতেও রুদ্রের ভিতরের পুরুষসত্তা যেনো জেগে উঠছে। সারা শরীরে যেনো আগুন বয়ে যাচ্ছে। তার মন বলছে সোহাকে কাছে টেনে নিতে। আর মস্তিষ্ক বলছে এতো তারাহুড়ো কিসের এখন অনেক সময় বাকি।
রুদ্রের বার বার ঢোক গিলাতে অ্যাডামস অ্যাপেলটা বার বার উঠা নামা করছে। যেটা সোহাকে আরো বেশি করে আকর্ষন করছে। সে আবার ও ছুঁতে যাবে তার আগেই রুদ্র তার হাত ধরে পেলে। সোহা রুদ্রের ধরে রাখা হাতের দিকে তাকায়। রুদ্র নিজের মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে সোহার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠে___
আমায় এভাবে ছুঁয়ে দিবেন না মিসেস রুদ্র। আমি বেসামাল হয়ে গেলে আপনি সামলাতে পারবেন না আমাকে।
তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবেন না।
প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১০
কথা গুলো বলে রুদ্র সোহার দিকে তাকায় মেয়েটা কেমন চোখ বন্ধ করে আছে। রুদ্র মুচকি হেসে সোহার মুখে হালকা ফুঁ দিয়ে রুমে চলে আসে।
রুদ্র যেতেই সোহার হুশ আসে। কিছু সময় আগের কথা মনে পড়তেই লজ্জায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তার শুধু বার বার একটা কথায় মনে পড়ছে__
আমায় এভাবে ছুঁয়ে দিবেন না মিসেস রুদ্র। আমি বেসামাল হয়ে গেলে আপনি সামলাতে পারবেন না আমাকে।
