Home প্রিয় বেলিফুল প্রিয় বেলিফুল পর্ব ৪

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ৪

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ৪
উম্মে হাবিবা

~~~ব্লু শার্ট চারকোল গ্রে প্যান্ট ব্লাক সু,, পারফেক্ট কম্বিনেশনে ফরমাল লুকে নিচে নামছে রুদ্র।
সোহা হা হয়ে তাকিয়ে আছে রুদ্রের দিকে।
এই লোকটাকে আজ একটু বেশি সুন্দর লাগছে মনে হচ্ছে। আ,,হা পুরাই মাখন। তুই কি কখনো ভাবতে পেরেছিস রে সোহা তোর এমন মাখনের মতো বর হবে?
পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হয়। ছিহ্ এসব কি সোহা! উনি তোর স্যার হয়। এসব ভাবা ও পাপ।
কিন্তু উনিতো এখন আমার হালাল জামাই। ভাবলে কি গুনাহ্ হবে?
এহেম এহেম,,

কারো গলা ঝাড়ার শব্দ পাশে তাকায় সোহা।
বলছি কি ভাবি তোমার ডালটা মনে হয় পানসে তাই না?
সোহা বললো___ হ্যাঁ তুমি ঠিক বলছো রোদ। আসলে আমার কাছে পানসে লাগছে৷
তাতো লাগবেই ভাবি তুমি তো ভাইয়াকে দেখতে এতোটাই মগ্ন যে ডালের বদল পানিতে পরোটা ভিজিয়ে খাচ্ছো।
বলেই শব্দ করে হেসে উঠে। রেদওয়ান আর রুনিয়া মুচকি হাসছে। এসব ছেলে পেলেদের ব্যাপার তাদের এখানে হাসা উচিত হবে না।
দাদা আশরাফ মেহতাব চৌধুরী জোরে জোরে হাসছে।
ইতি মধ্যে রুদ্র এসে সোহার সামনের চেয়ার টায় বসে।
তা নাত বউ আমার দিকে তো একটু দেখো।
সবার এমন রসিকতা শুনে সোহার কাশি উঠে যায়।
রুনিয়া তারাতারি এগিয়ে এসে সোহার মাথায় হাত রাখে।
আ/হ আব্বা কেনো সবাই মিলে মেয়েটাকে জালাচ্ছেন। তুমি খাও মা৷
রুদ্র যেনো এসব দেখেও দেখেনি। সে নিজের মতো নাস্তা করছে।
রুনিয়া ছেলের উদ্দেশ্যে বলে__

আজ এসব সালাট খেতে হবে না৷ এই নে পরোটা খা।
এগুলা সরাও আম্মু। এসব তেলে বাজা আনহেলদি খাবার আমি খাই না।
সোহা মুখ ভেংছে বিরবির করে বলে__ সারা দিন মুখটা রাখে গন্ডারের মতো আবার খায় ঘাস লতা পাতা। উফ আল্লাহ এই লোকটাকে রাখতে হলো আমার কপালে।
কি বিরবির করছো ভাবি।
সোহা আমতা আমতা করে বলে কি_কিছু না।
তা তুমি আজ এমন রেডি সেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছো?
কলেজে বাবা।
আজকে কলেজ যেতে হবে না। বিয়ের পর দিন কলেজ কে যায়?
বিয়ে করেছি বলে কি আমি শিক্ষকতা ছেড়ে দিবো?
আমি তা বলি নি। আমি বলেছি কয়েদিন ছুটি নাও। আজ বিকালে বউমা কে নিয়ে ওদের বাসায় যাবে।
রেদওয়ান সাহেবের কথা শুনে সোহার চোখ চকচক করে উঠে। কিন্তু পরক্ষণেই রুদ্রের কথায় তা মলিন হয়ে যায়।
আমি যেতে পারবো না বাবা। ওখানে যাওয়ার থেকেও জরুরি কাজ আছে আমার৷
তোমার জরুরি কাজ দুইদিন পর করো।

সম্ভব না বাবা। তুমি গিয়ে দিয়ে এসো । সম্ভব হলে আমি পরে গিয়ে নিয়ে আসবো।
বিয়ে তুমি করেছো আর বউ দিয়ে আসবে অন্য কেউ। আশরাফ মেহতাব চৌধুরী গম্ভীর গলায় কথা খানা বলে উঠেন।
রুদ্র নিজের ব্রু জোড়া কুঁচকে একবার সোহার দিকে তাকায়। মেয়েটার মুখটা কেমন মলিন দেখাচ্ছে ।
ঠিক আছে নিয়ে যাবো তৈরি হয়ে থাকতে বলিও।
রুদ্র কথা শুনে সোহার মলিন মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠে।
আম্মু আমি আসছি।
এই বলে রুদ্র বেরিয়ে যায়। বাকি সবার ও নাস্তা করা শেষ। আশরাফ সাহেব বাহিরে যান। আর রেদওয়ান সাহেব অফিসের জন্য তৈরি হতে যান।
রুনিয়া বেগম সব কিছু গোছাতে থাকেন। সোহা নিজেও হাত লাগাতে যায়।
আম্মু আমার কাছে দিন আমি রেখে আসে।

এই কি করছো তুমি। রাখো এসব করতে হবে না। তুমি বরং তোমার আর রুদ্র কয়েকটা জামা কাপড় গুছিয়ে রাখো।
আম্মু এগুলা তো পরেও করতে পারবো। দিন না আপনাকে একটু সাহায্য করি।
একদম না এবাড়িতে রোদ যেভাবে থাকে তুমিও সে ভাবে থাকবে। রোদ যেমন আমার মেয়ে তুমিও আমার মেয়ে।
ভাবি তুমি আসতে না আসতেই আমার আদরে ভাগ বসিয়ে পেলেছো!
ঘরে গিয়ে পড়তে বস পাজি মেয়ে। সন্ধ্যায় তোর স্যার আসবে পড়াতে।
উফ আম্মু এসব পড়া লেখা ভালো লাগে না। তুমি বরং আমাকে বিয়ে দিয়ে দাও। এসব পড়া লেখার ঝামেলা চুকিয়ে যাবে। কি বলো ভাবি?
তবে রে পাজি মেয়ে দাঁড়া, দিচ্ছি তোকে বিয়ে।
ভাবি বাঁচাও। এই বলে সোহার পিছনে লুকিয়ে পড়ে।
আম্মু আমি বরং ভাবিকে আমাদের বাড়িটা ঘুরে দেখাই। চলো ভাবি।
সোহা রোদের পিছন পিছন যায়।বাড়ির সব গুলা রুম দেখার পর নিচের একটা রুম থেকে যায়। সোহা কৌতূহল বসতো জিজ্ঞেস করে__

এটাতে তালা দেয়া কেনো রোদ?
এটা ভাইয়ার স্টাডি রুম এখানে ভাইয়া ছাড়া বাকি সবার আসা নিষেধ। চলো তোমাকে আমাদের ছাঁদ দেখাই।যানো ওখানে অনেক ধরনের ফুলের আর ফলে গাছ আছে।
সোহা ছাদে এসে একদম অবাক। জানা অজানা অনেক ফুলের গাছ। সবগুালতেই কমবেশি ফুল আছে। অন্য পাশে ফলের গাছ গুলো সারি করে রাখা। আর একপাশ পুরা খালি।
এতো এতো ফুল গাছের মাঝে সোহার চোখ আটকে আছে একটা বেলিফুলের গাছে। গাছ ভর্তি ফুল। ফুলের কুড়ি গুলা যেনো রোদের আলোয় মুক্তার মতো ঝলমল করছে। সোহা হাত বাড়িয়ে ছুয়ে দেয় ফুল গুলা।
তখনি রোদ কিছুটা জোরেই বলে উঠে__
সাবধান ভাবি পুরা বাগানের যে কোনো ফুল তুমি ছিড়তে পারো যতো গুলা খুশি শুধু এই বেলিফুল গাছটা বাদে।
রোদের কথা শুনে সোহা তারাতারি সরে আসে।

কেনো রোদ এটাতে কি স্পেশাল কিছু আছে।
এটা রুদ্র ভাইয়ার সব থেকে পছন্দের গাছ এই যে বাগানটা দেখছো এখানের প্রায় সব গাছ ভাইয়ার লাগানো অল্প কয়েকটা গাছ আমার আর বাবার লাগানো। আর ভাইয়ার সব থেকে পছন্দের গাছ এই বেলি ফুলের গাছ টা। কাউকে ছুঁতে দেয় না এটাকে। এমনকি আমাকে ও না।
আরে ভয় পেও না একটা ফুল ছিড়লে তোমার ভাই জানতে পারবে না।
একদম না ভাবি তুমি যানো না গতবার আদিবা আপু শুধু মাত্র একটা অর্ধ নষ্ট হয়ে যাওয়া একটা ফুল ছিড়ে নিজের কানে গুঁজে ছিলো।আর সেই অপরাধে রুদ্র ভাইয়া আদিবা আপুকে রোদের মধ্যে পঞ্চাশ বার কান ধরে উঠবস করিয়েছিলো। এর পর আপু হসপিটালে এডমিট ছিলো দুইদিন।
একটা ফুলের জন্য এমন করেছিলো উনি। কিন্তু উনি কিভাবে জানলো ফুল ছিঁড়ার কথা?
রোদ এবার নিজে ঝকঝকা দাঁত গুলো দেখিয়ে একটা বোকা বোকা হাসি দিয়ে হাতের আঙ্গুল উঁচিয়ে ছাদের কার্ণারে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরা খানা দেখায়।
সোহা এাব দেখে হা হয়ে হয়ে যায়। সমান্য একটা গাছের জন্য এতো কিছু?
এটা সামান্য না ভাবি ভাইয়ার কাছে এটা অনেক স্পেশাল।
আচ্ছা চলো এবার তোমাকে নিচের বাগান দেখাই।

রোদ!
জি ভাবি।
আদিবা মেয়েটা কে?
উনি আমার ফুফাতো বোন। উনারা পনেরো দিনের জন্য দেশের বাহিরে গিয়ে ঘুরতে।
ওহ আচ্ছা।
হুম যদি দেশে থাকতো তাহলে এতক্ষণ কি যে হতো।
মানে কি হতো?
সে তারা আসলেই দেখবে ভাবি। ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের থেকেও ভয়ানক অভিনয় করে এরা।
রোদের কথায় সোহা হাসতে থাকে।
রুদ্র মাত্র ক্লাস নিয়ে নিজের অফিস রুমে আসে।
চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে ভেসে উঠে সকালের একখানা মলিন মুখে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকায় রুদ্র।
এসব কি হচ্ছে। ঐ মেয়েটার মুখটা বার বার চোখের সামনে আসছে কেনো?
উফ বিরক্তিকর। এটা বলেই আবারও চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে। তার গত কাল রাতের কথা মনে পড়ে। কুভাবে মেয়েটার কথা শুনতে শুনতে তার ঘুম এসে পড়েছিলো।
হঠাৎ দরজা ঠেলে কেউ প্রবেশ করে রুমে।
রুদ্র নিজের কপালে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে তাকায়।
সামনের মানুষ টাকে দেখে তার চেহারায় রাগে আর বিরক্তি ভর করে। হাত খানা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে জোরেই বলে উঠে__

What the hell is this?
এসব কোন ধরনের অসভ্যতা মিস তানহা?
তানহা এই কলেজের একজন শিক্ষিকা। অতিরিক্ত মাত্রায় সুন্দরী হলেও এখনো বিয়ে করেন নি। কলেজের এবং কলেজের বাহিরেও অনেকর থেকে তিনি বিয়ের প্রপোজাল পেলেও সেগুলা রিজেক্ট করে দেন তিনি। এমন নজর কাড়া সুন্দরী হয়েও সে রুদ্র মেহতাব চৌধুরীর নজর কাড়তে পারেনি। গত দুই বছর ধরে হাজার বার হাজার ভাবে রুদ্রের নজরে আসার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতেও কোনো বিশেষ লাভ হয়নি। কাজের বাহিরে রুদ্র কারো সাথেই তেমন কথা বলে না।
একসময় এই কলেজের ছাত্র ছিলো রুদ্র। টপার ছিলো সে। এখন পর্যন্ত কেউ তার রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। তারপর বাহির থেকে নিজের পড়া শুনা শেষ করে। বাবার এতো বড় কোম্পানি থাকার পরও শখের বসে শিক্ষকতা বেছে নিছেন। হট্টগোল অনেক বেশি কথা পছন্দ যারধরুন প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে আলাদা অফিস রুম ও নিয়েছেন।
আমার কথার উত্তর দিচ্ছেন না কেনো মিস তানহা।
স্যরি মিস্টার রুদ্র আমি ভেবেছি আপনি অসুস্থ তাই ___

তানহা কে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে রুদ্র বলে উঠে।
তাই তাই কি মিস তানহা? আপনার মধ্যে কি সামান্য ম্যানার টুকুও নেই? আপনি জানেন না কারো রুমে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হয়।
তানহা মাথা নিচু করে পেলে সামান্য একটু কাজের জন্য এই ভাবে কথা শুনাবে?
আর কখনো আমার অনুমতি ছাড়া আমার রুমে আসবেন না। আর আমাকে টাচ করার চেষ্টা করবেন না।আপনি দিন দিন যা করছেন এগুলাকে বেহায়াপনা বলে। মিস তানহা আপনার প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। তাই আমার থেকে দূরে থাকুন।
কিন্তু কেনো মিস্টার রুদ্র? আমি কি দেখতে খারাপ নাকি আমি___তানহা কে আর কিছু বলতে না দিয়ে রুদ্র এবার চিৎকার করবে বলে উঠে __
Shut up! Get out of my room right now.
লজ্জায় আর অপমানে রুদ্রের রুম থেকে বেরিয়ে যায় তানহা৷
রুদ্র বিরক্তি নিয়ে নিজের হাতের ঘড়িতে সময় দেখে। পিয়ন মানিক কে ডেকে আর ডেস্ক গুছিয়ে রাখতে বলে বেরিয়ে যায়।

সোহা দুপুরে খাওয়ার পর রুমে এসে কিছু সময় রুমটা ঘুরেঘুরে দেখছিলো। সামান্য খারাপ লাগায় বেডবোর্ডে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ছিলো। কখন যে এই ভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও বুঝতে পারে নি।
বিকাল হতে চললো । রুদ্র মাত্র বাড়ি ফিরেছে। আজ একটু তারাতারি ফিরে এসেছে। রুমে ডুকে এক সুন্দর দৃশ্যের দেখা পায়। বেডে হেলেন দিয়ে এক শ্যাম কন্যা ঘুমাচ্ছে। শ্যামলতার মুখের উপর অগোছালো ভাবে পড়ে আছে কয়েক গোচা চুল। রুদ্র এগিয়ে খুব কাছ থেকে দেখতে থাকে মুখ খানা।
আঙ্গুলের সাহায্যে কিছুটা চুল কানের পিছনে গুঁজে দেয় রুদ্র।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ৩

সোহা নড়ে উঠলে হুশ ফিরে রুদ্রের।
এসব কি করছিলাম আমি। মেয়েটা যদি আমাকে এই ভাবে দেখে পেলতো তখন। উফ বিরক্তিকর।
রুদ্র নিজের টাওয়েল নিয়ে সোজা ফ্রেশ হতে চলে যায়।
চোখে মুখে হালকা পানির স্পর্শে ঘুম ভাঙ্গে সোহার। চোখে ঘুমের রেশ নিয়েই সামনে তাকিয়ে এক চিৎকার দিয়ে উঠে।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ৫