প্রিয় বেলিফুল পর্ব ৫
উম্মে হাবিবা
~~~ চোখে মুখে হালকা পানির স্পর্শে ঘুম ভাঙ্গে সোহার। চোখে ঘুমের রেশ নিয়েই সামনে তাকিয়ে এক চিৎকার দুয়ে উঠে।
রুদ্র হতভম্ব হয়ে তারাতারি সোহার মুখ চেপে ধরে।
ইডিয়েট এভাবে চিৎকার করছো কেনো?
রুদ্র মুখ ধরে রাখায় সোহা শুধু উম্ উম্ করছিলো।
এই মেয়ে এভাবে উম্ উম্ করছো কেনো। চুপ একদম চুপ। আমি হাত সরাচ্ছি কিন্তু যদি আবার চিৎকার দাও তবে মুখে টেপ মেরে রেখে দিবো।
রুদ্র হাত সরাতেই সোহা জোরে নিশ্বাস নেয়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে___
এই ভাবে মুখ চেপে ধরেছেন কেনো আর একটু হলেই তো আমি পটোল তুলতাম।
ইডিয়েট এর মতো চিৎকার করছিলে কেনো?
তো চিৎকার করবো না। কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যদি দেখি বেল তুলি সোলেমান ল্যাং”টা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে চিৎকার তো আপনা আপনি আসবে।
রুদ্র কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এসব কি বলছে এই মেয়ে।কলেজে আমাকে দেখলে ভয়ে দশ হাত দূরে থাকে আর এখন এমন অশ্লীল কথা বলছে।
ইডিয়েট এসব কোন ধরনের ভাষা এসব অশ্লীল কথা কই থেকে শিখছো?
দেখুন কথায় কথায় একদম ইডিয়েট ইডিয়েট করবেন না। আর এটা কিসের অশ্লীল। আপনি জানেন এটা কতো ভাইরাল একটা গান। দাঁড়ান আপনাকে দুইলাইন শুনাই।
এটা বলেই সোহা গাইতে শুরু করে__
বেলতুলি সোলেমান ল্যাং___
স্টপ ইডিয়েট।
রুদ্রের ধমক খেয় সোহা একদম চুপ হয়ে যায়।
রুদ্র মনে মনে বলে __আল্লাহ এই কোন পাগল আমার কপালে দিলা।
হঠাৎ রুদ্র খেয়াল করে সোহা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সোহার দৃষ্টি অনুসরন করে তাকাতেই তারাতারি করে নিজের হাতে থাকা গেঞ্জি টা পরে নেয়।
এই মেয়ে তোমার লজ্জা করছে না আমার শরীর দেখতে।
সোহা ফট করে বলে উঠে__
আপনার লজ্জা করছে না আমার সামনে এমন খালে গায়ে ঘুরতে। তাও শুধু একটা তোয়ালে পরে। এই জন্যই তো তখন ভয়ে চিৎকার দিয়েছি।
রুদ্র আর কথা বাড়ায় না।
তৈরি হয়ে নাও। আমরা একটু পরেই বেরোবো।
সোহা বেমালুম ভুলেই গেছিলো। রুদ্র বলতেই লাফিয়ে উঠে বসে আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।
সোহার কান্ড দেখে অজান্তেই রুদ্রের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠে।
এই মেয়েটার মধ্যে কিছুতো আছে। যা আমায় ওকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।
রুদ্র আগেই বাহিরে চলে এসেছে।
সোহা সবার থেকে বিদায় নিয়ে আসতে আসতে একটু দেরি হয়েছে। বাহিরে এসে দেখে রুদ্র গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সে সেইদিকেই এগিয়ে যায়।
কারো পায়ের আওয়াজে সে দিকে তাকায় রুদ্র।
পিচ কালারে শাড়ি মুখে নেই কোনো কৃত্রিম প্রসাধনির ছোঁয়া। হালকা গোলাপি ঠোঁট দুটো চিকচিক করছে। রুদ্র ভেবে পায় না এটা কি কোনো লিপস্টিক নাকি সোহার ঠোঁট এমনি।
উহুম,,স্যার যাবেন না?
সোহার কোথায় রুদ্রের হুশ আসে।
হুম এসো রুদ্র সোহার জন্য গাড়ির দরজা খুলে দেয়। এতে সোহা অনেকটা খুশিও হয়।
গাড়ি চলছে আপন গতিতে সোহা এক মনে বাহিরে তাকিয়ে আছে।
রুদ্র একটু পর পর সোহাকে দেখছে।
এই মেয়েটাকে দেখলে তার কেমন যেনো একটা ফিল হয়। একদম অন্যরকম অনুভূতি। আচ্ছা ওর কি এমন ফিল হয় আমাকে দেখে। রুদ্রের মনে প্রশ্ন জাগে। পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হয়।
এই দিকে সোহা ভাবছে__
এই লোক প্রথম বার শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে তাও খালি হাতে। কই গাড়ি ও দাঁড় করাচ্ছে না কিছু নিচ্ছে ও না।
গাড়ি এসে থামে সোহাদের বাড়ির সামনে। সুন্দর দোতালা বাসাটা। রুদ্রের মতো না হলেও খুব একটা খারাপও না। সোহা তারাতারি নেমে পড়ে গাড়ি থেকে।
রুদ্রের জন্য অপেক্ষা না করেই নিজেই গিয়ে কলিং বেল বাজাতে থাকে। রুদ্র পিছন থেকে এসে বলে__
এভাবে বেল না দিয়ে দরজাটা ভেঙ্গে পেলো।
সোহা মুখ উচিয়ে কিছু বলবে তার আগেই দরজা খানা খুলে যায়।সামনে সোহার মা আর বড় মা দাঁড়িয়ে আছে হাসি মুখে পিছনে আহিয়া,সামিয়া দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া বেগম আর তমা বেগম সোহাকে জড়িয়ে ধরে সোহা ও তাদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়।
তোমরা আমাকে একদম পর করে দিছো আম্মু বড় আম্মু।
দূর পাগলি মেয়ে মায়ের কাছে মেয়ে কখনো পর হয় নাকি।
তখন তাদের চোখ পড়ে রুদ্র দরজায় দাঁড়িয়ে তারা সোহাকে ছেড়ে রুদ্রের দিকে তাকায়।
রুদ্র তাদের সালাম দেয়।
সালামের উত্তর নিয়ে লামিয়া বেগম তাকে ভিতরে আসতে বলে।
ভিতরে এসো বাবা।
রুদ্র হালকা হেসে বলে উঠে আন্টি ঐ গাড়িতে কিছু জিনিস রাখা ছিলো।
আচ্ছা তুমি ভিতরে এসো মতি গিয়ে নিয়ে আসবে। (মতি হচ্ছে এই বাড়িতে কাজ করে)
সোহা অবাক হয় মতি যখন একে একে অনেক জিনিস নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করছে। সবার জন্য গিপ্ট ও নিয়ে এসেছে রুদ্র। তবে এসব কখন কিনলো?
রুদ্র ভিতরে গিয়ে দেখে সোহাকে দুইটা মেয়ে জড়িয়ে ধরে আছে।
কেনো যেনো সহ্য হলো। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
আরে জিজু আসুন আসুন। শালিদের কথা তো আপনার মনেও নাই।
রুদ্র সামান্য হাসে।আরাম করো সোফায় বসে।
তা আপনাদের বুঝি খুব মনে আছে। এসে থেকেই তো বোন কে জড়িয়ে ধরে আছেন।
আপুর জন্য ভিষন মন খারাপ হচ্ছিলো তাই আরকি।
লামিয়া বেগম এসে বলে_
হয়েছে হয়েছে আড্ডা পরে দিতে পারবে। সোহা আম্মু যাও জামাইকে নিয়ে নিজের রুমে যাও ফ্রেশ হয়ে এসো।
সোহা একবার রুদ্রের দিকে তাকায়। তারপর উঠে উপরে নিজের রুমে যেতে থাকে। রুদ্র ও পিছন পিছন যাচ্ছে।
খুব সুন্দর পরিপাটি একটা রুম। রুমের পাশে বেলকনি।সোহা একটা টাওয়াল এগিয়ে দেয় রুদ্রের দিকে।
আপনি ফ্রেস হয়ে আসুন আমি নিচ থেকে আসছি।
রুদ্র ফ্রেস এসে এসে দেখে টেবিলের উপর একটা শরবতের গ্লাস ঢেকে রাখা। বুঝলো সোহা হয়তো বা রেখে গিয়েছে।
এক ঘন্টা হতে চললো সোহা রুমে আসছে না। রুদ্র উঠে বারান্দায় যায়।
কয়েকটা ফুলের গাছ আছে। রুদ্র দেখে সেখানে একটা বেলি ফুলের গাছও আছে। তবে ফুল নেই তেমন একটা। রুদ্র গাছটা ছুঁয়ে দেয় আর বলে #প্রিয়_বেলিফুল। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠে। ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে রাকিব কল দিচ্ছে। রাকিব রুদ্রের বেস্ট ফ্রেন্ড।
কল কানে ধরতেই ওপাশ থেকে রাকিবের জোরে চিৎকার। রুদ্র ফোনটা কানের থেকে দূরে নিয়ে যায়।
ব্রো তুই নাকি বিয়ে করে পেছিস। তাও আমাকে না জানিয়ে। এটা তুই কিভাবে পারলি। আমাকে জানালে কি আমি তোকে বিয়ে করতে দিতাম না। এতো বড় বেইমানি কেমনে করতে পারলি তুই।
চুপ ইডিয়েট। আমি নিজেও জানতাম না।সব হঠাৎ করে হয়ে গিয়েছে৷
আচ্ছা ঠিক আছে মেনে নিলাম। তবে দেখা হলে অবশ্যই ট্রিট দিবি।
রুদ্র আর রাকিব কথা বলছে এমন সময় সোহা রুমে আসে। রুদ্র কল রেখে দেয়।
নিছে আসুন সবাই অপেক্ষা করছে৷ আব্বু আর বড় আব্বুও চলে এসেছে।
হুম।
রুদ্র নিচে এসে তার শ্বশুরদের সাথে কৌশল বিনিময় করে। সবাই একসাথে বসে কথা বলছে। সোহা ও বেশ হাসি খুশি। রুদ্র একটু পর পর সোহাকে আড় চোখে দেখছে। এটা দেখে সামিয়া আর আহিয়া দুজনেই মুচকি হাসছে। তারা ফিসফিস করে রুদ্র কে বলে।
কি বেপার জিজু আপুর উপর থেকেতো আপনার চোখ সরছেই না। আমাদের দিকেও একটু তাকান। আপুকে দেখার জন্য তো সারা জীবন পড়ে আছে।
রুদ্র হালকা হেসে আনমনেই বলে পেলে__
তোমার আপু দেখতেই এমন যে তাকালে আর চোখ সরানো যায় না।
ওহো তাই নাকি। আপুকে জানাবো নাকি এটা। হুম হুম।
রুদ্র থতমত খায়। সে ভেবে পা না তার মতো এমন গম্ভীর পার্সোনালিটি মানুষ এমন বেফাস কথাবার্তা কিভাবে বলে ফেললো। সব দোষ এই মেয়েটার। যাই হোক এদের তো সামলাতে হবে। নাহলে দেখা যাবে সত্যি সত্যি বলে দিয়েছে।
তা শালি সাহেবা রা আপনাদের আবদার পেশ করুন। আপনাদের কোন আবদার খানা পূরণ করলে এতো বড় সত্যি কথাখানা তারা গোপন রাখবে?
আমাদের ট্রিট চাই।
ব্যস এইটুকু ঠিক আছে।
সবার হাসি মজার মাঝে হঠাৎ একজনের আসার শব্দ হয়।
আরে এইতো তমাল এসে গেছে৷ আয় দেখ কে আসছে সোহা আর ওর বর রুদ্র এসেছে।
তমাল হাসি মুখে এগিয়ে এসে রুদ্রের সাথে কৌশল বিনিময় করে। সবাই আবার ও কথায় ব্যস্ত হয়ে যায়। এই বাসার সবাই অনেক বেশি বন্ধুপূর্ণ। এসব কিছুর মাঝে রুদ্র খেয়াল করে সোহার মলিন মুখ খানা।
কি ব্যপার একটু আগেও এই মেয়ে কি সুন্দর সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলো। এই সেকেন্ড এর মাঝে কি এমন গঠলো যে ওর মুখ খানা মলিন হয়ে গেলো? সময় টা এমন করে কাটলো।
সবাই খেতে বসেছে এক সাথে সোহা বসতে চায়নি তবে তমা বেগম আর লামিয়া বেগম জোর করে বসিয়ে দিয়েছেন। সোহার একপাশের চেয়ারে ওর বাবা আর অন্য পাশের টায় রুদ্র। আর ঠিক সামনে বসেছে তমাল। যে একটু পর পর সোহার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত ভাবে হাসছে।
সামিউল শেখ মেয়ের পাতে এটা ওটা তুলে দিচ্ছে। তমা বেগম আর লামিয়া বেগম জামাই আপ্যায়নে কমতি রাখছে না। এই দিকে নিজের প্লেটে এতো খাবার দেখে রুদ্রের ইচ্ছে করছে দৌড়ে পালাতে৷ তার অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।
হঠাৎ সোহার পায়ের সাথে একটা পা বার বার লাগছে মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছে করে করছে। রুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখে সে খাবার নাড়া ছাড়া করছে। বেচারা খেতে পারছে না। সামনে তাকাতেই তার বিশ্রী অনুভূতি হয়। তমাল কেমন করে তাকিয়ে আছে। সোহা বুঝলো এটা তমালের কাজ। সোহা আস্তে করে পা সরিয়ে ফেললো। তার মাথায় হঠাৎ দুষ্টু চিন্তা আসে। নিজের পা আস্তে আস্তে রুদ্রের পায়ের কাছে এগিয়ে নিয়ে যায় কারন সোহার পায়ের সাথে তমাল ও পা নিচ্ছে।
সোহা হঠাৎ পা গুটিয়ে নেয় আর তমাল সোহার পা মনে করে রুদ্রের পায়ে নিজের পা দিয়ে স্পর্শ করতে থাকে। রুদ্রের হঠাৎ খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।ভিষন অসস্তি লাগছে তার কাছে। সে সোহার দিকে তাকায়। মেয়েটা মুচকি আসছে। তার মানে এটা মেয়েটার কাজ৷ তবে পা টা শক্ত কেমন জেনো। রুদ্র সামান্য বেকে নিচে তাকায়।পায়ের মালিক কে চিনতে পেরে সামনে তাকিয়ে দেখে সোহার দিকে তাকিয়ে বিশ্রী হাসছে। এতক্ষণ শান্ত থাকা চোখ দুটো হঠাৎ লাল হয়ে উঠে।
হঠাৎ থপাস_ সবাই অবাক উঠে দাঁড়ায় তমাল চেয়ার সহ চিত হয়ে পড়ে গিয়েছে। তমা বেগম আর তারাতারি নিজের ছেলেকে ধরে সাথে সাইদ সাহেব ও (রুদ্রের বাবার নাম পরিবর্তন করে দিলাম)।
প্রিয় বেলিফুল পর্ব ৪
সবাই এগিয়ে এসেছে শুধু সোহা আর রুদ্র ছাড়া। রুদ্র এখনো রাগ নিয়ে তাকিয়ে আছে। তমাল অবাক হয়ে সোহাকে দেখছে সে ভেবেছে লাথিটা সোহা দিয়েছে। আর সোহা দেখছে রুদ্র কে। কারণ সে জানে কাজটা রুদ্র করেছে।রুদ্র সোহার হাত ধরে।
রুমে চলো।
কিন্তু এখানে সবাই__
রুদ্রের লাল চোখ জোড়া দেখে আর কিছু না বলে সোহা তার সাথে সাথে যায়।
