Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৬

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৬

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৬
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

মা – চাচী দের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভাঙলো লামিয়ার। পিটপিট করে তাকাতেই দেখলো সকাল হয়ে গিয়েছে। হাত বাড়িয়ে মোবাইলে সময় দেখতেই লাফিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে, বিছানা থেকে দ্রুত ফ্রেশ হতে চলে গেলো।
আট টা বেজে গিয়েছে আজকে ভার্সিটিতে যেতে হবে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে যেটা মিস দেওয়া যাবে না। তাই দ্রুত ফ্রেশ হতে চলে গেলো।

ফ্রেশ হয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলো বেণী করতে করতে চোখ গেলো গলার দিকে। গলার কালো কুচকুচে তিলটার পাশের লাল টুকটুকে হয়ে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। তা দেখে লামিয়া বিরক্ত হয়ে কালকে রাতের কথা ভাবতে লাগলো। ফালতু লোকটা তাঁর গলায় কালকে বেশ শক্ত ভাবে পোক্ত কামড়ে ধরেছিলো। ভেবেই বিরক্ত হয়ে চুল গুলো বেণী করতে করতে মনে মনে বকে উঠলো শুভ্র কে।
আয়নার দিকে তাকাতেই দেখলো তায়েবা, তায়েব, মাহির দাঁড়িয়ে আছে। তবে তায়েবার মুখটা বেশ গম্ভীর। তা দেখে লামিয়া হাতঘড়ি পড়তে পড়তে বললো ” তুই ওমন কুকুরের পশ্চাৎদেশে মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? কি হয়েছে?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

লামিয়া বলতে দেরি মাহির আর তায়েব এর দাঁত কেলাতে দেরি হলো না। তাঁদের দুজনের দাঁত কেলানো দেখে লামিয়া ভ্রু নাচিয়ে বললো ” এতো খুশি কেনো তোরা কী হয়েছে বল তো সত্যি করে।”
তায়েবা মুখ বাঁকিয়ে অন্য দিকে তাকালো। সে জানে এখন সব বলে দিবে তাঁকে। তারপর এইসব নিয়ে মজা করবে তাঁর সাথে কতক্ষন। ভেবেই গালি দিয়ে উঠলো জাহিদ কে। ওই খচ্চর বেডার কারণে আজ মজা নিবে তাঁর সাথে। সামনে পেলে কাঁচা মরিচ লাগিয়ে দিতো জায়গায় মতো। ভেবেই রাগ লাগছে তাঁর।
এইদিকে লামিয়ার কথা শুনে তায়েব আর মাহির কালকের ঘটনা খুলে বলে ফোন বের করে ভিডিও দেখাতেই লামিয়ার চোখ গোল গোল হয়ে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তায়েবার দিকে তাকালো। তায়েবা মুখ বাঁকিয়ে বসে আছে। তা দেখে লামিয়া ফিক করে হেসে উঠলো।

তার সাথে তায়েব, আর মাহির ও। তায়েবা তা দেখে মুখ ফুলিয়ে বসে রইলো। লামিয়া হাঁসি থামিয়ে টেবিল থেকে ফোন তুলে মাহিরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো ” তোমরা তলে তলে টেম্পু চালাও আর আমরা বললেই বলেই হরতাল…! বাহ্ নানীর নাতি – নাতনি বাহ্।”
তায়েবা তা শুনে মুখ ফুলিয়ে বললো ” দেখ এসবে আমি নেই। ওই হারামজাদা বেডা আমাকে জোর করে কিস করছে এতে আমার কী দোষ?”
পাশ থেকে তায়েব বললো ” তুই ও তো চুপ করে ছিলিস, আর এখন বলছিস তোর কী দোষ?”
তায়েব এর কথায় তায়েবা ফুস করে উঠলো।
” দেখেছিস তুই দেখেছিস কী বললো?”
লামিয়া তায়েবের বাহুতে থাপ্পড়ে বললো ” তুই ভাই হয়ে বোনের প্রেম দেখিস লজ্জা করেনা? আর এসব নিয়ে কথা বলবি না। তায়েবার টা তায়েবাই দেখবে। আমরা এসব নিয়ে কথা আর না বলি।” বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। তাঁর পিছন পিছন মাহির আর তায়েব ও । তায়েবা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সেও চললো তাদের পিছনে।

খাবার টেবিলে আসতেই দেখলো খান বাড়ির সব ছেলে মেয়েরা ইসলাম বাড়ির খাবার টেবিলে বসে আছে। চার জা সাফওয়ান,আবির কে জামাই এবং আয়না কে বৌ আদর করে খাওয়াচ্ছে।
তা দেখে চারজন নীরবে এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে এক সাথে বসে পড়লো। তাহমিনা বেগম চারজন কে বসতে দেখে বললো ” তোরা কী আজ ভার্সিটিতে যাবি?”
তাহমিনা বেগম এর কথায় চারজন মাথা নেড়ে হুঁ বললো।
তা দেখে দ্রুত তাদের খাবার বারতে লাগলো রাশেদা বেগম।
তায়েবা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে পানি খেতে খেতে সামনে তাকাতেই দেখলো জাহিদ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তায়েবা তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের।
চোখাচোখি হতেই জাহিদ দুষ্টু হেঁসে চোখ মারতেই তায়েবা বিষম খেয়ে উঠলো। খেক খেক করে কাঁশতে কাঁশতে চোখ মুখ লাল টুকটুকে বর্ণ ধারণ করলো।

রাশেদা বেগম খাবারের প্লেট এগিয়ে দিয়ে তায়েবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো ” আরে আস্তে খাবি তো নাকি…! তোরা যে কি করিস না। এতো তাড়াহুড়ো করার কি আছে?”
এদিকে জাহিদ মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসছে। তায়েবা কাঁশতে কাঁশতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। জাহিদ রুটি মুখে পুরে মাথা তুলে তায়েবার দিকে এমন ভাবে তাকালো যেনো সে কিছুই জানে না। তায়েবা কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে অন্য দিকে চোখ ফেরালো।

এতোক্ষণ ধরে তায়েব, মাহির, লামিয়া বিষয়টা খেলায় করেছে। তবুও না দেখের ভান করে খাওয়া শুরু করলো। তায়েবা কাঁশি আস্তে আস্তে থেকে গিয়েছে। তাই আস্তে ধীরে খাবার খেতে শুরু করলো।
খাবার খেতে খেতে কারোর পায়ের শব্দ পেতেই সবাই ঘুরে তাকাতেই দেখলো শুভ্র আসছে তাঁর সাথে মিলি ও আছে। লামিয়া খাবার চিবুতে চিবুতে মাথা ঘুরিয়ে পিছন ঘুরতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। এক পলক মিলি কে দেখে আবার সামনে ঘুরে খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
শুভ্র এগিয়ে আসতেই লতিফা বেগম দেখে বললো
” আব্বা তোর এতোক্ষণে আসার সময় হলো? সেই কখন আসতে বলেছি তোকে।”
” ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে মামুনি।”

বলতে বলতে চেয়ার টেনে বসলো। তাঁর পাশে মিলিও। লামিয়া খাবার খেতে খেতে তাকালো সেদিকে। শুভ্র লামিয়ার দৃষ্টি দেখে চেয়ার একদম রাশেদের চেয়ারের সাথে লাগিয়ে একদম রাশেদের সাথে ঘেঁষে বসলো।
“আচ্ছা তাড়াতাড়ি বস আমি খাবার আনছি।” বলেই খাবার আনতে চলে গেলো রান্না ঘরে।
রাশে খাবার খেতে খেতে বললো ” তোর দেরি হয়েছে উঠতে এটা বিশ্বাস করতে বললি?”
রাশেদের কথা শেষ হতেই আবির বলে উঠলো

” গতকাল রাতে স্পেশাল মানুষের হাতের রান্না খেয়েছে তাও স্পেশালে মানুষ নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছিলো। হয়তো সারা রাত ঘুম হয়নি কি বলো শালিকা আমি ঠিক বলেছি তো?”
বলেই লামিয়ার দিকে তাকালো। লামিয়া মাথা নিচু করে খাবার খাচ্ছিলো। আবিরের কথা শুনে চোখ বুলিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো মা – চাচিরা কেউ আছে নাকি। শুভ্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
লামিয়া আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে না দেখে হালকা হেঁসে খাবার শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে আবিরের দিকে তাকালো। তাকিয়ে দেখলো আবির পানি খাচ্ছে। লামিয়া বাঁকা হেঁসে আবিরের কানে ফিসফিস করে কিছু বলতেই আবিরের মুখ থেকে পানি ছিটকে মুখ থেকে পরে গেলো। কাঁশতে কাঁশতে ভয়ার্ত চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে। লামিয়া আবিরের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো। ততক্ষণে তায়েব, তায়েবা, মাহির ও খাবার শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। খাবার টেবিলে সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে আবির আর লামিয়ার দিকে।
লামিয়া সবার থেকে বিদায় নিয়ে খাবার টেবিল ছাড়তেই জাহিদ খাবার খেতে খেতে পিছন থেকে বলে উঠলো

” এমন কি বলেছিস যে আবির ভাই ভয় পেয়ে গিয়েছে?”
জাহিদের কথা শুনে চারজন হাঁটা থামিয়ে পিছন ফিরে তাকালো। লামিয়া জাহিদের দিকে তাকিয়ে সয়তানি হেঁসে বললো ” টপ সিক্রেট জাহিদ ভাইইইইইইইই।”
‘টপ সিক্রেট’ কথাটা শুনের জাহিদ বিষম খেলো। তা দেখে লামিয়া আবিরের দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে তায়েবার কাঁধে হাত রেখে গেয়ে উঠলো
~ ও শ্যাম রে তোমার সনে
শ্যাম রে তোমার সনে,
একেলা পাইয়াছিরে শ্যাম
এই নিগুড় বনে ।।
বলতেই তার সাথে তায়েবা, মাহির,তায়েব গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠলো ~ আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম…….।”
বলতে বলতে চলে গেলো বাড়ির বাহিরে। এইদিকে সবাই হা করে তাকিয়ে আছে আবির আর জাহিদের দিকে। তাঁদের মধ্যে কি কথা হলো কারোর মাথায় কিছু ঢুকছে না। সব মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো। ওইদিকে লামহা মাথা নিচু করে খাবার খাচ্ছে, আবির মুখ ভোঁতা করে বসে আছে। আর জাহিদ আহম্কের মতো তাকিয়ে আছে লামিয়াদের যাওয়ার পাণে।

বাড়ির নিচে গাড়ি নিয়ে ফোন কানে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিহিড়। প্রায় এক ঘন্টা যাবত কায়সার কে কল করছে কিন্তু সে ধরছেই না। বেশ বিরক্ত নিয়ে আরো একবার কল করলো কিন্তু কলটা আগের ন্যায় কেটে গেলো। বিরক্ত হয়ে আর না দাঁড়িয়ে একাই চলে গেলো অফিসে।
বিশাল বড় একটা রুমে, রাজকীয় বিছানায় ঘুমিয়ে আছে নাসির কায়সার। চারপাশে অন্ধকার। পর্দা ভেদ করে দিনের আবছা আলো পরছে রুমটায়।

হঠাৎ খট করে বাথরুমের দরজা খুলে গাঁয়ে টাওয়াল পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলো এক অতি সুন্দরী রমণী। দুধে আলতা গাঁয়ের রং, সোনালী রঙের চুল। সোনালী রঙের ভেজা চুল গুলো থেকে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে। পা টিপে টিপে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। ফর্সা শরীরে অসংখ্য কামড় আর আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তা দেখে মুচকি হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে দৃষ্টি ফেললো বিছানায় শুয়ে থাকা সুদর্শন পুরুষ কায়সারের দিকে। মেয়েটি পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো প্রাণ প্রিয় মানুষটিকে। একটু ঝুঁকে কায়সারের উন্মুক্ত বুকে ঠোঁট ছুঁয়ে দিতেই কায়সার খপ করে মেয়েটির চুল গুলো শক্ত করে চেপে ধরলো। মেয়েটি মাথা তুলে কায়সারের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিতেই কায়সার মেয়েটিকে ঘুরিয়ে তুলতুলে নরম বিছানায় শুয়ে দিয়ে নিজে তার উপর উঠে শরীরের সমস্ত ভার ছেঁড়ে দিয়ে মেয়েটার গলায় মুখ ডুবিয়ে নাক দিয়ে মেয়েটার গলা ঘষতে ঘষতে হাস্কি কন্ঠে বললো

” লেটস ডু ইট এগেইন বেইবি।”
কায়সারের কথা শুনে মেয়েটি তাঁর চুল গুলো খামচে ধরতেই কায়সারের অধরে হাঁসি ফুটে উঠলো। গলা থেকে মুখ তুলে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো লামিয়ার ছবির দিকে। তারপর কিছু ভেবে সয়তানি হেঁসে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে হারিয়ে গেলো নিজের গন্তব্যে।

সময়টা দুপুর দুইটা।
দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই যে যার রুমে রেস্ট নিচ্ছে। লামিয়ার রুমে তায়েব,, তায়েবা, মাহির, লামিয়া চারজন চার দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।
হঠাৎ নিচ থেকে আজমেরী বেগম এর গলা ফাটানো চিৎকার শুনে চারজন ধরফর করে উঠলো। সবেই ত্রিশ মিনিট হলো ঘুমের রাজ্যে পারি জমিয়েছিলো লামিয়া
কিন্তু এমন চিৎকার শুনে আঁতকে লাফিয়ে উঠেছে। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে চারজন ছুটে গেলো নিচের দিকে।

” ওওও বোইন তুই আইছোস বোইন, কত্তো দিন পর দেখলাম তোরে। কেমন আছোস বোইন?”
” ভালা আছি বুবু। তুমি কেমন আছো?”
” আমিও ভালা আছি..!”
” তো তোমার বাড়ির সকল্লে কুতায় দেখবার লাগছি না ক্যান?”
” ওরা আইবো দেখিস এহন ই তুই আয় বয় এইহানে।”
দুজনের কথার মাঝেই বাড়ির সবাই উপস্থিত হলো হল রুমে।
তায়েব, তায়েবা, মাহির, লামিয়া হল রুমে আসতেই সামনে থাকা মহিলাকে দেখেই চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। চার জায়ের ও মুখ কুঁচকে গিয়েছে। কারণ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের খালা শাশুড়ি আবিরা বেগম। আজমেরী বেগম এর ছোট্ট বোন।
আজমেরী বেগম এর চেয়ে এই মহিলা বেশ ডেঞ্জারাস। ওকে তো আজমেরী বেগম কে নিয়ে হিমশিম খেতে হয় এখন আবার আবিরা বেগম এসেছে , এইবার কী হবে? ভেবেই চার জায়ের মাথা চক্কর দিচ্ছে।
ওইদিকে আনিসুল, হামিদ, হাশিম, আজমির সাহেব নিজেদের বৌদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে তাকালো।

আবিরা বেগম সবার দিকে তাকিয়ে পান খাওয়া দাঁত কেলিয়ে হেঁসে বললো ” ওও বৌমা রা আমি আইছি দেইখা কি খুশি হও নাই তোমরা? আমারে দেইখা মুখ ওমন কইরা রাখছো কিল্লাই?”
আবিরা বেগম এর কথা শুনে রাশেদা বেগম মেকি হেঁসে বলল ” আরে না খালা কী বলেন খুশি হবো না কেনো? আমরা ভীষণ খুশি হয়েছি তাই না রে?”
বলেই তিন জা এর দিকে তাকালো। তাঁরা ঠোঁট টেনে হেঁসে বললো ” হুমম অনেক খুশি হয়েছি।”
পাশ থেকে তাহমিনা বেগম বলে উঠলো ” আমার তো খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে।”
তাহমিনা বেগম এর কথায় আবিরা বেগম হি হি করে হেঁসে বলল ” আরে নাচার বয়স কি আর আছে তোমগো? বয়স হইছে তো নাকি।”

আবিরা বেগম এর কথায় চার জা মুখ চুপসে ফেললো। তাঁদের নাচার বয়স নেই তবে আপনার আছে ঠিকই। মনে মনে ভেবে মুখ বাঁকিয়ে নিলো চার জা।
আবিরা বেগম একে একে সবার সাথে কৌশল বিনিময় করে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা
লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবার দিকে। এগিয়ে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে তায়েবা কে বলে উঠলো ” ওই ছেড়ি তুই আবারো এই বেডা গো জামা কাপড় পড়ছোস?”

তায়েবা গম্ভীর গলায় বললো ” এটা লেডিস গেঞ্জি আর লেডিস প্যান্ট। বেডা গো জামা না বুঝতে পেরেছো?”
তায়েবার কথায় আবিরা বেগম ধমকে বললো ” চুপ কর আমারে শিখাইবার আহোস? ”
ধমক শুনে তায়েবা আর কিছু না বলে মুখ ভোঁতা করে দাঁড়িয়ে রইলো। আবিরা বেগম পাশ ফিরে এবার লামিয়ার দিকে তাকালো। লামিয়া শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। আবিরা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললো ” তোরে যহন দেহি তখন ই ওমন মুখ কুঁচকায় রাখছ ক্যান? কেমন দেহা যায় বান্দরের মতো?”
লামিয়া শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত গলায় উত্তর দিলো
” আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছো কখনো পান খেয়ে খেয়ে দাঁতের অবস্থা কী করেছো? তোমাকে দেখতে তো পুরো হলুমানের ব্যাক সাইডের মতো লাগে। আবার আমাকে বলছো?”
লামিয়ার কথা শুনে আবিরা বেগম তেতিয়ে উঠলো।

” দেখছো বুবু দেখছো আমারে কী কইলো…!”
আজমেরী বেগম বোন কে শান্তনা দিয়ে বললো ” আরে ওরা ওমনি এইহানে আয় তুই।”
আবিরা বেগম বললো ” আগে দেখবার দেও তোমার গুণধর নাতি – নাতনি গো।”
বলেই তায়েব আর মাহির এর দিকে তাকিয়ে বললো
” ওই তগো রে কইছি না এই মাইয়া ছিলা গো লগে থাকবি না কথা কানে যায় না? এতো মাইয়া গো লগে ঘুরঘুর করছ ক্যান?”
তায়েব আর মাহির চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো কথা গুলো হজম করে কিছু বললো না।
” উফফ ডিসকাসটিং দাদী কোথায় এনেছো তুমি আমাকে? দেখো এই কুকুর টা আমার পিছনে পড়ে আছে।” বলতে বলতে আট বছরের বাচ্চা মেয়ে প্রবেশ করলো বাড়ির ভেতরে।
সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে দৃষ্টি ফেলতেই দেখলো গোলগাল চেহারার একটা মেয়ে, গোল গোল চোখ, ফর্সা গায়ের রং , পরনে সাদা রঙের গেঞ্জি আর কালো রঙের প্যান্ট পড়া, চোখের কালো চশমা মাথায় উঠিয়ে রেখেছে, চুল গুলো ঝুঁটি বাঁধা।
লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। আবিরা বেগম নাতনির কথা শুনে হেঁসে বলল

” তুমি কুতায় আছিলা দাদাভাই?”
” বাগানে ছিলাম দাদী।”
আবিরা বেগম নাতনির চুলে হাত বুলিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললো ” তোরা চিনেছিস ওকে? ওও হলো আমগো তুহিনের মাইয়া নাম তোয়া মণি। তোরা না গেছিলি সবাই ওরে দেখতে মন নাই?”
আবিরা বেগম এর কথা শুনে রাশেদা বেগম তোয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো ” ওমা এটা আমাদের তুহিনের মেয়ে। মাশাআল্লাহ কতো বড় হয়ে গিয়েছে। ”
রাশেদা বেগম এর কথা শুনে তোয়া মিষ্টি একটা হাসি দিলো। আবিরা বেগম সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো তোয়ার সাথে।
তোয়া চোখ ঘুরিয়ে মাহিরদের দিকে তাকিয়ে বললো” দাদী ওরা কে?”

” ওরা হলো তোমার বড় ভাই বোন হয়।”
বলেই সবার সাথে কথা বলতে লাগলো। এইদিকে তোয়া এগিয়ে এসে মাহির দের সামনে দাঁড়িয়ে তায়েব এর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তায়েবের পেটে খোঁচা দিয়ে বললো ” আই হেইট মুটকা ম্যান।”
তোয়ার কথা শুনে চারজনের মুখ আরো কুঁচকে গেলো।
ওইদিকে তায়েব হা করে আছে তোয়ার কথা শুনে।
এইটুকু মেয়ে ও তাঁকে ইজ্জত দিয়ে দিলো? ভেবেই মুখটা দুঃখি করে ফেললো।

তোয়া এইবার মাহিরের দিকে তাকিয়ে বললো ” এই ছেলে বাহিরে আমার ব্যাগ আছে সেটা ভিতরে নিয়ে এসো। ” বলেই তায়েবার দিকে তাকিয়ে বললো ” আর তুমি আমার রুমটা কোথায় সেটা দেখিয়ে দাও, উফফ আমি ভীষণ ক্লান্ত।” বলেই এইবার লামিয়ার দিকে তাকালো ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে।
লামিয়া ও ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে সেম ভাবে তাকালো। তা দেখে তোয়া বিরক্ত হয়ে বললো ” শুনো তুমি বুঝলে? তুমি আমার পা টা একটু টিপে দিও বড্ডো ব্যাথা করছে পা দুটো। ”

এইদিকে তোয়ার কথা শুনে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে চারজন।
তাঁদের এইভাবে তাকাতে দেখে তোয়া বিরক্ত হয়ে বললো ” এইভাবে তাকিয়ে আছো কেনো তোমরা? কী বলেছি কানে যায় নি? আমি এখানে যতোদিন থাকবো ততদিন আমার সব কাজ তোমরা করবা বুঝেছো?”
” তোর কী আমাদের কাজের বুয়া মনে হয়?”
বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো তায়েবা।

” মনে হয় কী তোমরা দেখতেই বুয়াদের মতো।” মুখ বাঁকিয়ে বললো তোয়া।
লামিয়া নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তোয়ার দিকে। তোয়া একটার পর একটা কথা বলতেই আছে। বেচারি তোয়া জানে না সে ভুল করে শিয়ালের গর্তে ঢুকে পড়েছে। তোয়া মেয়েটা এমন ই সে চায় সবাই তার গোলামী করবে আর সে প্রিন্সেসের মতো বসে তাদের কে গোলামী খাটতে দেখবে। তবে সে যে এইবার ভুল জায়গায় পা দিয়েছে তা সে বুঝতে পারছে না।

এদের কথার মাঝেই বাড়িতে প্রবেশ করলো শুভ্র, রাশেদ আর ছবি।
ছবি কে দেখে আবিরা বেগম দৌড়ে গিয়ে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। আজমেরী বেগম এর থেকে শুনেছে ছবি বেঁচে আছে। ছবির সাথে কথা বলে চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই শুভ্রর দিকে দৃষ্টি দিলো। শুভ্রর পায়ে থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে আজমেরী বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো ” বুবু এই পোলা কেঠা?”
আজমেরী বেগম হেঁসে বলল ” হামিদের বন্ধুর কথা মনে আছে তোর শাহরিয়া আছিলো? ওর পোলা এইডা। ”
আজমেরী বেগম এর কথা শুনে আবিরা বেগম ছবি কে ছেঁড়ে শুভ্রর দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো ” দাদু ভাই আমারে চিনবার পারছো? আমি তোমার আবি দাদু আগে না কতো কোলে চরতা আমার মন আছে?”
শুভ্র আবিরা বেগম কে হালকা জড়িয়ে ধরে বললো ” তোমাদের কী করে ভুলে যাই বলো তো দাদী? বাবা – মায়ের পরে তোমরাই তো ছিলে আমার আপন মানুষ।”

শুভ্রর কথা শুনে আবিরা বেগম হালকা হেসে টুকটাক কথা বলতে লাগলো।
ওইদিকে শুভ্র কে দেখে তোয়ার চোখ জ্বলে উঠলো।
” ওও গট এতো হট বয়। ওমাগো আই লাইক ইট।”
তোয়ার কথা শুনে লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা গোল গোল চোখ করে তাকালো। এইটুকু মেয়ে বলে কী?
তোয়া দৌড়ে গিয়ে শুভ্রর সামনে দাঁড়িয়ে বললো ” হাই হ্যান্ডসাম আমি তোয়া মনি।”
তোয়ার কথা শুনে শুভ্র হালকা হেঁসে একটু ঝুঁকে তোয়ার ফুলা ফুলা গাল টিপে বললো ” হাই বেবি গার্ল আমি শাহরিয়া শুভ্র।”

শুভ্রর কথা শুনে তোয়া লজ্জা পেলো। শুভ্র যে গাল ধরেছিলো সেই গালে হাত রেখে লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো।
ওইদিকে লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা হা করে তাকিয়ে আছে তোয়ার দিকে। তোয়ার গাল লাল আভা দেখে দিচ্ছে।
তা দেখে তায়েব বললো ” আমি তো মনে করেছিলাম এই মেয়ে একটু পাকা, ওমা এখন তো দেখছি পুরো পাকা।”
টুকটাক কথা বলে লতিফা বেগম রাশেদ, শুভ্র আর ছবি কে খাওয়ার জন্য তাঁরা দিলো। আজমেরী বেগম বোন কে নিয়ে রুমে যেতে বলতেই আবিরা বেগম নাতনি কে নিয়ে রুমে যেতে চাইলো কিন্তু তোয়া জেদ ধরেছে সে যাবে না এখন কোথাও। আবিরা বেগম জোর করতেই তোয়া শুভ্রর হাত চেপে ধরলো।
তা দেখে শুভ্র আবিরা কে শান্তনা দিয়ে বললো ” থাকুক বাচ্চা মানুষ এখানে থাকুক পরে যাবে।”
আবিরা বেগম আর কিছু না বলে বোনের সাথে রুমে চলে গেলো। এইদিকে আজমেরী বেগম যাওয়ার আগে
ভালো মানুষদের কাছেই তোয়া কে দ্বায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে দেখে রাখতে।
আজমেরী বেগম যেতেই তায়েবা বাঁকা হেঁসে বললো ” শিয়ালের কাছে উমা মুরগি পাহারা দিয়ে গিয়েছে। যাক ভালো ভালো।”

লামিয়া সয়তানি হেঁসে বলল ” এইটার মুখ বড্ড বেশি চলে। মুখ বন্ধ করার ব্যাবস্থা করতে হবে। ” বলেই তিনজন কে ইশারা করতেই তিনজন দাঁত কেলিয়ে হেঁসে এগিয়ে গেলো তোয়ার দিকে।
তোয়া শুভ্রর কোলে বসে কথা বলছিলো। তায়েব, তায়েবা, মাহির তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই শুভ্র আর তোয়া মাথা তুলে তাকালো।
তিনজন কে এভাবে দাঁড়াতে দেখে তোয়া বিরক্ত হয়ে বললো ” এই তোমরা এখানে কী করছো? দেখছো না আমরা পাইবেট টাইম ইসপেন্ট করছি। ”

তোয়ার কথা শুনে রাশেদ খেক খেক করে কেশে উঠলো। ছবির সবেই ভাত মুখে পুরে ছিলো তোয়ার কথা শুনে ভাত গলায় আটকে গিয়েছে। শুভ্র বড় বড় চোখ করে তাকালো তোয়ার দিকে।
তবে তায়েব,, তায়েবা, মাহির চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে তোয়া আরো বিরক্ত হয়ে বললো ” কী হলো শুনতে পাও না কথা? তোমাদের যে কাজ দিয়েছি সেগুলো কেনো করছো না? আর ওই মেয়েটা কোথায়, যাও ওকে ডেকে নিয়ে আসো আমার পায়ে ব্যাথা করছে ওকে বলে এখানে এসে পা টিপে দিতে।”
পা টিপে দিবে মানে? লামিয়া কে বলেছে এই মেয়ে পা টিপে দিতে? ভেবেই চোখ বড় বড় করে ফেললো রাশেদ,ছবি আর শুভ্র।
হঠাৎ তায়েব আর মাহির তোয়া কে শুভ্রর কোল থেকে উঠিয়ে শূন্যে তুলে নিলো।

” আরে আরে এভাবে তুলেছো কেনো, আমাকে কী তোমরা দোল খাওয়াবে নাকি?”
” জ্বি না প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট দিবো তোকে। পা টিপে দিবো সাথে গলাও।” পিছন থেকে বলে উঠলো লামিয়া।
সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে লামিয়ার দিকে তাকাতেই দেখলো হাতে রশি আর টেপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লামিয়া এগিয়ে এসে মাহির আর তায়েব কে চোখ রাঙিয়ে বললো ” তাড়াতাড়ি এই আপদ কে বাড়ির বাহিরে নে আমি আসছি।” বলেই টেপ দিয়ে তোয়ার মুখ আটকে দিলো।
মাহির, তায়েব দ্রুত বাড়ির বাইরে নিয়ে গেলো তোয়া কে। লামিয়া বাড়ির বাহিরে যেতেই আড়চোখে শুভ্রর দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। লামিয়া চোখ সরিয়ে তায়েবা কে কিছু বলতে বলতে চালে যায়।
লামিয়া আর তায়েবা যেতেই, রাশেদ খেতে খেতে বলে উঠলো

” দেখ এইটুকু মেয়ে ও তোর উপর ক্রাশ খেলো।”
শুভ্র গম্ভীর গলায় জবাব দিলো ” হুম শুধু তোর বোন বাদে।”
শুভ্রর কথা শুনে রাশেদ আর ছবি হেঁসে উঠলো। একটু নীরবতা পালন করে ছবি বলে উঠলো ” শুভ্র ভাই।”
শুভ্র খেতে খেতে জবাব দিলো ” বল।”
” বলছিলাম কি চলো না আজ সন্ধ্যায় সবাই মিলে শপিংয়ে যাই, তারপর একটু ঘুরা ঘুরি করে, বাহিরের থেকে খাবার খেয়ে আবার বাসায় চলে আসবো। যদি তুমি বলো তাহলে।”
” হঠাৎ আমার থেকে অনুমতি চাইচ্ছিস কেনো? একা একা বিয়ে করে নেওয়ার সময় তো আমার থেকে অনুমতি নিস নি তাহলে ঘুরা ঘুরি করার জন্য অনুমতি কেন?”

শুভ্রর কথায় ছবি চমকে উঠলো। এক সপ্তাহ আগে লাবিব আর ছবি বিয়ে করে নিয়েছে, কাউকে না জানিয়ে । অবশ্য ছবি এতে রাজি হয় নি তবে মনিকা কে নিয়ে ছবির ভিতরে যেনো কিছু না থাকে সেটার জন্যই বিয়ে করে রেখেছে লাবিব। তাঁরা দুজন ভেবেছিলো আজ সব ভাই – বোনদের বলে দিবে কিন্তু তাঁর আগেই শুভ্র জেনে গিয়েছে তা শুনেই ছবি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৬

শুভ্র তা দেখে খেতে খেতে গম্ভীর গলায় বললো ” হয়েছে হয়েছে এখন এসব নিয়ে ভেবে লজ্জা পেতে হবে না। সবাইকে বলে দিস তৈরি হয়ে থাকতে আমরা বের হবো। আর ওই শত্রু কে ও বলে দিস। ”
বলেই খাবার শেষ করে রান্না ঘরে গিয়ে চার জায়ের থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটা ধরলো বাড়ির দিকে।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৬ (২)