প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৬
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
প্রতি বছর শীতে এই গ্রামে বিশাল বড় করে মেলার আয়োজন করা হয়। এক বিশাল বড় খালি জায়গা জুড়ে বিশাল বড় মেলা বসেছে। বিভিন্ন ধরনের সারি সারি দোকান বসেছে। চারপাশ মেতে উঠেছে হৈ হুল্লোড়ে। ইসলাম ও খান বাড়ির ছেলেমেয়েরা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে আশেপাশে। ঢাকাতেও মেলা হয় কিন্তু এইরকম খোলামেলা মেলা এই প্রথম দেখছে তারা। জীবনের প্রথম এমন মেলা দেখে ছবির চোখ চিকচিক করে উঠলো। ছবি লাবিবের হাত ধরে লাফিয়ে উঠলো। লাবিব ছবির দিকে তাকিয়ে তাঁর বাচ্চামো দেখে মুচকি হাসলো। ছবি মুগ্ধ নয়নে দেখছে চারপাশ। আজমেরী,আবিরা বেগম এবং শফিকুল খান এগিয়ে গিয়ে একটা দোকানে প্রবেশ করতেই দোকানিরা তাদের দেখেই কৌশল বিনিময় করলো। খান ও ইসলাম বাড়ির ছেলে মেয়েরা তাদের কথা শুনে বুঝলো আজমেরী এবং শফিকুল খান কে চিনেন এই দোকানিরা। কিছুক্ষণ কথা বলে তারপর বিদায় নিয়ে ছেলেমেয়েদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে আজমেরী বেগম ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করলো ” শুভ্র আর লামিয়া কুথায়..? এতোক্ষণ লাগে ওগো আইতে..? ওই রাশেদ অখন্নি ফোন কর শুভ্র রে।”
রাশেদ আজমেরী বেগমের কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে শুভ্র কে ফোন লাগাতেই দেখলো শুভ্র আর লামিয়া এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। তা দেখে রাশেদ ফোন পকেটে রাখতে রাখতে বলল ” ওই তো এসে গিয়েছে। ”
রাশেদের কথা শুনে সবাই পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো লামিয়া হুডির পকেটে হাত রেখে কপাল কুঁচকে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। আর তার পিছনে শুভ্র স্বাভাবিক মুখেই লামিয়ার পিছু পিছু হাঁটছে।
লামিয়া আর শুভ্র সবার সামনে এসে দাঁড়াতেই লাবিব বিরক্ত হয়ে বললো ” এতোক্ষণ লাগে তোদের আসতে..?” বলেই শুভ্রর দিকে তাকাতেই লাবিব চুপ করে গেলো।
শফিকুল খান এবার সবার উদ্দেশ্যে বললো ” তাহলে চলো এবার মেলা টা ঘুরে দেখি।”
সবাই একসাথে মাথা নাড়িয়ে ঘুরতে লাগলো পুরো মেলা জুড়ে।
সাফওয়ান হামিদার হাত ধরে আস্তে করে সাইডে একটা দোকানে নিয়ে বললো ” কোনটা পছন্দ হয় বল।”
হামিদা মুচকি হেসে বলল ” আমার কিছু লাগবে না।”
সাফওয়ান ভ্রু কুঁচকে বললো ” না লাগলেও নিতে হবে।”
” আপনি বদ্দ জেদী তো। বললাম তো কিছু লাগবে না। ”
” আমি এতো কিছু শুনবো না। আচ্ছা দাঁড়াও এভাবে হবে না আমি দেখছি।” বলেই চোখ ঘুরিয়ে সামনে সাজানো রঙ – বেরঙের চুড়ির দিকে তাকালো। সেখান থেকে এক মুঠো লাল চুড়ি হাতে তুলে নিয়ে হামিদার হাত টেনে পড়িয়ে দিতে লাগলো। হামিদা বড় বড় চোখ করে পাশে তাকাতেই দেখলো দোকানি রা মুখ টিপে হাসছে। তা দেখে হামিদা লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেললো। তারপর নিচু স্বরে বললো ” হাত ছাড়ুন সবাই দেখছে।”
হামিদার কথায় সাফওয়ান মাথা তুলে হামিদার দিকে তাকাতেই হামিদা চোখ দিয়ে পাশে ইশারা করতেই সাফওয়ান সেদিকে তাকাতেই দেখলো দোকানিরা মুখে হাত দিয়ে হাসছে। তা দেখে সাফওয়ান মুচকি হেঁসে বললো
” দেখুক আমি আমার বউ কে চুড়ি পড়িয়ে দিচ্ছি তাঁতে কার কী..?” বলেই চুড়ির টাকা মিটিয়ে চলে গেলো অন্য দোকানে।
” এই কানের দুল টা দেখ তোকে ভীষণ মানাবে জান। ”
” আমি এতো ভারি দুল পরি না এটা জানেন না..?”
” তো কী হয়েছে পরিস না পড়বি এখন থেকে। দেখ তোর কানে সুন্দর মানিয়েছে দুল টা।”
লামহা আবিরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এঈ লোক কে বলে লাভ নেই। যেহেতু উনি চাচ্ছে এই দুল গুলো নিবে তাঁর মানে নিবেই সে। লামহা আর কিছু না বলে চুপচাপ দেখতে লাগলো আবিরের কাহিনী। আবির একের পর এক কানের ঝুমকা তুলে লামহার কানে ধরছে। যেটা লামহা কে মানাচ্ছে সেটাই নিয়ে নিচ্ছে। লামহা ও চুপচাপ আবির কে দেখছে। একের পর এক কানের ঝুমকা নিতে নিতে প্রায় বিশ টার মতো ঝুমকা নিয়ে নিয়েছে। তবুও তার নেওয়া শেষ হচ্ছে না। এবা লামহা আর চুপ থাকতে পারলো না। বিরক্ত হয়ে ধমকে বললো ” আর কতো নিবেন?? আমার এতেই হবে। রাখুন এসব আর নিতে হবে না।”
আবির লামহার দিকে তাকিয়ে বুঝলো লামহা রেগে যাচ্ছে তাই ক্যাবলা হাঁসি দিয়ে বলল ” এই গুলোতেই হবে জান..?”
” হ্যাঁ এইগুলোতেই হবে আর লাগবে না। ”
আবির ভোঁতা মুখ করে দোকানি কে ঝুমকার টাকা দিয়ে হাঁটা ধরলো উল্টো দিকে। লামহা আবিরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো আবির অভিমান করেছে।
তাই বিরক্ত শ্বাস ফেলে হাঁটা ধরলো আবিরের পিছন পিছন।
ছোট্ট একটা কাঠের আয়নায় মুখ দেখেছে আয়না। আয়না টা তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আরিফ আয়নার দিকে তাকিয়ে বললো
” পছন্দ হয়েছে মেডাম..?”
আয়না আরিফের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসতেই আরিফ আয়নার হাত থেকে কাঠের আয়না টা নিয়ে দোকানি কে বললো ” এই আয়না টা কতো চাচি..?”
” একশো ট্যাহা বাপ।”
” আমাকে এইটা প্যাকেট করে দিন।”
দোকানি মাথা নাড়িয়ে আয়না টা সুন্দর করে প্যাকেট করতে লাগলো। আরিফ আয়নার দিকে তাকিয়ে বললো
” আর কিছু পছন্দ হয়েছে??”
আয়না মাথা নাড়ালো মানে না । আরিফ ভ্রু কুঁচকে বললো ” আর কিছু পছন্দ হয় নি..?”
” না..!”
” সত্যি বলছো..?”
” হ্যাঁ..!”
আরিফ ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে আয়নার দিকে তাকাতেই আয়না হেঁসে উঠলো। আরিফ মুখ বাঁকিয়ে আয়না কে আরো কিছু কিনে দিলো জোর করে। সব কিছুর বিল মিটিয়ে আয়নার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বললো
” তোমার স্বামীর টাকা কম ঠিক আছে কিন্তু এতোটাই কমে যায় নি যে নিজের স্ত্রীকে তাঁর শখের কোনো কিছু কিনে দিতে পারবে না। ” আয়না আরিফের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকাতেই আরিফ মুচকি হেসে হুট করে চুমু খেতেই আয়না আরিফের বাহুতে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।
মেলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা । আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে চারপাশ। তাদের কেনাকাটা নিয়ে প্যারা নেই। তাদের সাথে সবাই কিছু না কিছু কিনছে। শুধু মাত্র তারাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে সবকিছু।
” চল ঝালমুড়ি খেয়ে আসি।” বলেই পাশে থাকা তিনজনের মুখের দিকে তাকালো তায়েব।
” আজকে তুই খাওয়াবি তাহলে..?কয় টাকা আছে তোর কাছে..?” ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো লামিয়া।
তায়েব পকেট হাতিয়ে একশত টাকা বের করতেই মাহির, তায়েবা, লামিয়া কপাল কুঁচকে ফেললো।
” বাল খাওয়াবি এই একশত টাকা দিয়ে..?” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো তায়েবা।
” একটা থাপ্পড় দিয়ে চোপড় দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব। বড় ভাইয়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তা জানিস না..?” বেশ ধমকে বললো তায়েব।
” তুই বড় ভাই হওয়ার যোগ্যতা রাখিস..? এই বাল এইটাকে বাহির কর দল থেকে বেশ বড় হয়ে গিয়েছে।” বিরক্ত হয়ে বললো তায়েবা।
লামিয়া আর মাহির তাদের ঝগড়া দেখে দুজনেই তায়েব আর তায়েবার পিঠে ধাম্মুর করে দু খানা কিল বসিয়ে দিতেই দুজনই কুঁকড়ে উঠলো।
” বালের ঝগড়া বাসায় গিয়ে কর নয়তো দূরে গিয়ে কর। আমাদের সামনে করবি না। তোদের ঝগড়া দেখার জন্য বসে থাকি না আমরা।” ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো লামিয়া।
মাহির পরিস্থিতি সামলে বললো ” সব চুপ কর। ঝগড়া – ঝাটি বাদ দিয়ে এখন এইটা বল কি খাবি..?”
লামিয়া বাঁকা দৃষ্টিতে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বললো
” তোর কাছে টাকা আছে..?”
” হুমম আমার কাছে একশো আছে। আর তায়েবের কাছে একশো। সব মিলিয়ে দুইশো।” বলেই মাহির টাকা বের করতে পকেটে হাত দিতেই। চমকে উঠলো। ভালো মতো পকেট হাতিয়ে চিন্তিত গলায় বললো
” এই পকেটেই তো রেখেছিলাম টাকা কোথায় গেলো..?”
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো ” কোন পকেটে রেখেছিস ভালোমতো দেখ।”
” আমি তো এই পকেটেই রেখেছি। দাঁড়া দেখছি সব পকেট।” বলেই সব পকেট চেক করতেই মাহির কপালে ভাঁজ ফেলে বললো
” কোথায় নেই তো।”
” তুই সিউর পকেটেই রেখেছিলি..?”
” হ্যাঁ..! হান্ড্রেড পার্সেন্ট। ”
” তাহলে কোথায় যাবে..? তোর নানী এসে নিয়ে গিয়েছে নাকি..?”
পাশ থেকে তায়েবা বললো ” দেখ কেউ চুরি করে নিয়ে গিয়েছে নাকি।”
” কোন বালে ওর পকেট থেকে টাকা নিতে আসবে..?”
লামিয়ার কথা শুনে পাশ থেকে তায়েব বললো ” আমার মনে হয় না টাকা কেউ নিয়েছে। আমার মনে হয় টাকা পড়ে গিয়েছে কোথাও।”
তায়েব এর কথায় মাহির মাথা নাড়িয়ে বললো ” তাও হতে পারে।”
লামিয়া মাহিরের পিঠে কিল মেরে বললো ” মাংঙ্গের নাতি টাকা সামলে রাখতে পারো না..? এখন কি হবে..?”
পাশ থেকে তায়েব বললো ” আমার মনে হয় এইখানে কোথাও পড়েছে। এই চল আমরা একটু খুঁজে দেখি। ”
” তোর মনে হয় আশেপাশে খুঁজলে এই টাকা পাবো..?” বেশ তিক্ত কন্ঠে বললো লামিয়া।
” আরেহহ খুঁজে দেখ না। পেলেও পেতে পারিস।” মুখ গোল করে বললো তায়েব।
” আরেহ চল ভাগ্য ভালো থাকলে পেলেও পেতে পারি।” বলেই আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো মাহির। তায়েব ও আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে খুঁজতে তায়েবা আর লামিয়া কে ধাক্কা দিয়ে বললো ” কী রে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো খুঁজ আমাদের সাথে।”
লামিয়া আর তায়েবা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ খুঁজলো পুরো মাঠ জুড়ে। কিন্তু কোথাও টাকা পায় নি। লামিয়া এবার তীক্ষ্ণ মেজাজ নিয়ে বললো ” বালের টাকা খুজতাছো তোমরা..? ওই বাল এখনো থাকবে বলে মনে হয় তোদের..?”
পাশ থেকে তায়েবা বললো ” আমার মনে হয় না টাকা কোথাও পড়েছে। আমার মনে হয় কেউ মাহিরের পকেট থেকে টাকা টা মেরে দিয়েছে।”
তায়েবার কথায় মাহির রেগে বললো
” কোন বাই….।” বলার আগেই তায়েব মাহির কে রেগে বললো ” যা বলার এইভাবেই বল। গালাগালি করছিস কেনো..?”
” গালাগালি করবো না কেনো..? কোন চু…।” মাহিরের কথার মাঝে তায়েব আবার রেগে বলে উঠলো
” আবার গালাগালি করছিস..? মুখের ভাষা ঠিক কর মাহির।”
তায়েবা পাশ থেকে বিরক্ত হয়ে বললো
” ওইই তুই এতো রিয়েক্ট করছিস কেনো?? মাহির তো ওই চোর টা কে গালাগালি করছে তোকে তো না..?”
তায়েবার কথা শুনে মাহির ভ্রু উঁচিয়ে বললো ” এই তায়েবা, লামিয়া টাকা চুরি হয়েছে আমার। আমি চোর কে গালি দিচ্ছি কিন্তু রেগে যাচ্ছে তায়েব কাহিনী কী..?”
মাহিরের কথা শুনে তায়েবা , লামিয়া, মাহিরের দিকে তাকাতেই তাদের টনক নড়তেই ঝটপট তায়েব এর দিকে তাকাতেই তায়েব চোরা মুখ করে চোরা হাঁসি দিতেই লামিয়া চেঁচিয়ে উঠলো
” মাংঙ্গের নাতি তার মানে তুই..?”
তায়েব ব্যাক্কেলের মতো হেঁসে বলল
” আসলে হয়েছে কী..?”
মাহির রেগে বললো
” আসলে নকলে রাখ তুই। এতোক্ষণ কিছু হয় নি কিন্তু এখন হবে। তায়েব এর বাচ্চা আমার পকেট মেরেছিস তুই। তোকে আমি ছাড়বো না।”
বলতে বলতে তায়েব এর দিকে এগিয়ে যেতেই তায়েব ভৌ দৌড় দিলো। তাঁর পিছন পিছন লামিয়া, মাহির, তায়েবা।
” আজকে তোকে ধরতে পারলে তোর পিঠের চামড়া তুলে নিবো তায়েব।” দৌড়াতে দৌড়াতে বেশ চেঁচিয়ে বললো মাহির।
” মাফ করে দে আর কোনোদিন চুরি করবো না।” নিজের জান বাঁচাতে দৌড়াতে দৌড়াতে বললো তায়েব।
” গোলামের নাতি তোর কপালে শনি আছে। এতোক্ষণ শুধু শুধু কেনো আমাদের দিয়ে টাকা খোঁজালি ??”
বলতে বলতে তায়েবা পায়ের জুতো খুলে তায়েবের দিকে ছুঁড়ে দিলো।
” হারামজাদা তোকে আজ কুত্তার মতো পেটাবো এই ভরা মেলায়। দাঁড়া বলছি নয়তো খারাপ হয়ে যাবে অনেক।” বেশ চেঁচিয়ে বললো লামিয়া।
” হ পাগলা কুত্তায় কামড়াইছে আমি দাঁড়াতে যাবো।” বলতে বলতে দৌড়াতে লাগলো তায়েব।
পুরো মেলার মধ্যে দৌড়াচ্ছে চারজন। আজ তায়েব কে ধরতে পেলে তিনজনে কাঁচা চিবিয়ে খাবে এতে কোনো ভুল নেই।
মেলা থেকে সব দোকান থেকে চাঁদা তুলছে বেশ কিছু হিজলা। তাদের চারজন কে দৌড়াতে দেখে হিজলা গুলো বিরক্ত হয়ে বললো ” এহনকার মাইয়া পোলা গুলাও সব কয়ডা অজাতের বিছন। দেখ দেখ কেমন কইরা দৌড়াইবার লাগছে পুরা মেলা।”
বলতে বলতে টাকা তুলতে লাগলো।
লাবিব আর ছবি বেশ কিছু কেনাকাটা করে দোকান থেকে বের হয়েছে। হাতের মধ্যে বেশ কিছু ব্যাগ। ছবি লাবিবের হাত টেনে টেনে এই দোকান ওই দোকান ঘুরছে। লাবিব ও ছবির সাথে মনের সুখে আনন্দ নিয়ে ঘুরছে ।
মেলার মধ্যে রঙিন কাগজ দিয়ে এক পাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন রকমের ইয়া বড় বড় ষাঁড় , গরু, মহিষ, রাম ছাগল। তায়েব সেখানেই গিয়ে চুপচাপ গিয়ে একটা ষাঁড়ের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়লো। লামিয়া, মাহির, তায়েবা এসে থামলো সেখানে। আশেপাশে তাকিয়ে তায়েব কে খুঁজতে লাগলো তিনজনে। তায়েব আড়ালে লুকিয়ে তিনজনের দিকে তাকিয়ে একটা মোটা রশি ধরে অনমনে টানাটানি করতে লাগলো। হঠাৎ পিছন থেকে কিছুর খোঁচা খেতেই তায়েব বিরক্ত হয়ে পিছনে তাকাতেই ভয়ে গলা শুকিয়ে আসলো। চিৎকার করে দৌড় দিতেই রশির সাথে পা বেজে পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়ে এক ছুট লাগালো নিজের জান বাঁচাতে। লামিয়া, মাহির, তায়েবা, তায়েবের চিৎকার শুনে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো তায়েব পালিয়ে যাচ্ছে। তা দেখে মাহির চেঁচিয়ে উঠলো ” ওইতো হারামজাদা ধর ওকে।” বলেই দৌড় দিলো তায়েব এর পিছনে। তার পিছন পিছন লামিয়া আর তায়েবা ও।
বেলী ফুলের মালা হাতে নিয়ে হতাশ চোখে আশেপাশে চোখ বুলাচ্ছে শুভ্র। তবুও লামিয়ার টিকি টা পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছে না সে। গেলো কোথায়? একটু আগেই তো চারজন এখানেই ছিলো। আর এখন নেই ভেবেই শুভ্র বিরক্ত হলো। তাঁর সাথেই দাঁড়িয়ে আছে বাড়ি শুদ্ধ লোক অপেক্ষা করছে লাবিব, ছবি, লামিয়া, মাহির, তায়েবা, তায়েব এর জন্য। সবার ই মোটামুটি কেনা কেটা শেষ। রাশেদ তোয়া কে কাঁধে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজমেরী, আবিরা বেগম আর শফিকুল খান চোখে কালা চশমা পড়ে হা হা হি হি করছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে তাঁরা তাঁদের যৌবনে ফিরে গিয়েছে।
তারা কেউ আসছে না দেখে হামিদা চিন্তিত গলায় বললো ” কী ব্যাপার ওরা আসছে না কেনো এখনো..?”
হামিদার কথায় লামহা বললো
” আপা ওদের কাউকে ফোন কর তো। দেখ কোথায় আছে। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে বাড়ি যেতে হবে তো।”
লামহার কথায় হামিদা মাথা নাড়িয়ে সাফওয়ান কে ফোন করতে বললে সাফওয়ান পকেট থেকে মোবাইল বের করে লাবিব কে ফোন করতে লাগলো।
শুভ্র চিন্তিত হয়ে হাতের ফুলের দিকে তাকালো। ফুলের মালা টা কেমন নেতিয়ে পড়েছে। শখ করে ভ্রমরের জন্য বেলী ফুলের মালা কিনেছিলো তাঁর লম্বা চুলে পেঁচিয়ে দিবে বলে কিন্তু তাঁর ভ্রমর যে কোথায় উড়ে বেড়াচ্ছে কে জানে।
শুভ্রর ভাবনার মাঝেই কেউ তাদের ঠেলে ঠুলে, ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সামনের দিকে দৌড়াতে শুরু করলো। সবাই ভ্রু কুঁচকে সামনে তাকাতেই তোয়া চেঁচিয়ে উঠলো
” আরে তায়েব বস কোথায় যাচ্ছো তুমি..? বিগ বস কোথায়?? আমাকেও নিয়ে যাও।”
তায়েব তোয়ার কথা শুনেও শুনলো না। তাই রাশেদ রেগে চেঁচিয়ে উঠলো ” তায়েব কোথায় যাচ্ছিস? পাগলের মতো দৌড়াচ্ছিস কেনো..?আর লামিয়ারা কোথায়..?
” আল্লাহর দোহাই লাগি এতো প্রশ্ন করো না বড় ভাই। বাঁচতে চাইলে পালাও সবাই। নয়তো কেউ বাঁচবে না।” বলেই জান হাতে নিয়ে দৌড়াতে লাগলো তায়েব।
সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকালো তায়েব এর দিকে। এই ছেলে এভাবে দৌড়াচ্ছে কেনো? বুঝতে পারছে না কেউ। আবির তায়েব এর কথা শুনে চোখ বড় বড় করে বললো
” আমি সিউর ওরা কোনো না কোনো গন্ডগোল বাঁধিয়েছে। ভাই নাক কাটার আগে চল সবাই আগে ভাগে কেটে পরি।”
আবিরের কথা শুনে লামহা চোখ পাকিয়ে তাকাতেই আবির গোমড়া মুখ করে দাঁড়ালো।
তায়েবের দৌড়ানোর দিকে সবাই তাকিয়ে পিছন ফিরতেই দেখলো লামিয়া, তায়েবা, মাহির চিৎকার করে দৌড়াচ্ছে। আজমেরী বেগম তা দেখে বলে উঠলো ” দেখছোস দেখছোস তোরা?? ওরা কতো সুন্দর মেলা আনজন করতাছে?? আহ ওগো মতো এক কালে আমিও আনজয় করতাম। আহা ওগো দেইখা আমার আগের কথা মনে পইরা গেছে বুঝলি আবিরা।” বলেই হাত বাড়িয়ে পাশে আবিরা বেগম এর কাঁধে হাত দিতেই দেখলো আবিরা বেগম নেই। তা দেখে আজমেরী বেগম পিছনে ঘুরতেই দেখলো তাঁকে রেখে সবাই দৌড়াচ্ছে। আজমেরী বেগম তা দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো ” ওইইই আবিরা ওইইই তোরা দৌড়াইবার লাগছোস ক্যান ওমন কোইরা??”
আবিরা বেগম তাঁর গাঁয়ের পরণের শাড়ি হাঁটু পর্যন্ত উঠিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বললো ” ওওও বুবু গোওও আমি বাঁচবার চাই বুবু। তুমি পালাও বুবু পালাও নয়তো ওইহানেই মইরা থাহো। পিছনে দেহো কি আইতাছে বুবু।”
আজমেরী বেগম আবিরা বেগম এর কথা কিছু বুঝতে না পেরে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো লামিয়া, মাহির, তায়েবা তার দিকেই এগিয়ে আসছে। তা দেখে বিরক্ত হয়ে বললো ” পিছনে তো আমার নাতি – নাতনি রা আইবার লাগছে।”
রাশেদ তোয়া কে কাঁধে তুলে দৌড়াতে দৌড়াতে বললো
” আরে দাদী ওদের পিছনে ভালোভাবে তাকাও।”
আজমেরী বেগম সামনে তাকিয়ে ভালোমতো মাহির দের পিছনে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললো
” পিছনে তো দেহি ঘুটঘুটা অন্ধকার। কি দেখবার কছ..?”
শফিকুল খান রেগে দৌড়ে দৌড়ে চেঁচিয়ে উঠলো ” বুড়ির বাচ্চা চোখের কালা চশমা খুলে সামনে তাকাও।”
আজমেরী বেগম এবার রেগে চোখের কালো চশমা খুলে সামনে তাকাতেই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ঠাঁটিয়ে এক চিৎকার করতেই মাহির দৌড়াতে দৌড়াতে আজমেরী বেগম এর হাত ধরে আবার সামনে দৌড়াতে লাগলো। তাঁর পিছন পিছন লামিয়া, আর তায়েবা। আর তাদের পিছনে ইয়া বড় একটা পাগলা ষাঁড় দৌড়াচ্ছে। নিজেদের জান বাঁচাতে সবাই ছুটছে।
” আল্লাহ গো এই পাঁঠা কোই থেক্কা আমদানি করছোস তোরা..?” চেঁচাতে চেঁচাতে বললো আজমেরী বেগম।
” আগে জান বাঁচাও তারপর এটা কোথা থেকে আমদানি করেছি তখন জিগ্যেস করো। ” দৌড়াতে দৌড়াতে বললো তায়েবা।
” আল্লাহ গো আর দৌড়াইবার পারতাছি না। ওই মাহির ভাই আমারে কোলে নে।”
” এইখানে কী সিনেমার শুটিং চলছে যে তুমি আমার কোলে উঠতে চাইছো দাদী..?”
” আমি তো আর দৌড়াইবার পারতাছি না ভাই।” হাঁপাতে হাঁপাতে বললো আজমেরী বেগম।
” না পারলে ওই ষাঁড়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরো। ” বলেই আজমেরী বেগম এর হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়াতে লাগলো মাহির। দৌড়ানোর উপরেই আজমেরী বেগম এর হাত ছেঁড়ে দিতেই আজমেরী বেগম তাল সামলাতে না পেরে ধপাস করে মাটিতে পড়ে যেতেই চেঁচিয়ে উঠলো ” হারামজাদা একবার তোকে সামনে পাই তোর হাড় গোড়া ভেঙে দিবো আমি। গুট ইট।”
তায়েবা দৌড়াতে দৌড়াতে বললো
” আরে দাদী আগে নিজেকে বাঁচাও। তোমার গলায় লাল মাফলার ঝুলিয়ে রেখেছো। ওইটাকে ছুঁড়ে ফেলো। নয়তো ষাঁড় তোমার উপরে উঠে যাবে।”
তায়েবার কথা শুনে আজমেরী বেগম এর টনক নড়তেই নিচু হয়ে গলার দিকে তাকালো। তার পর ঝটপট মাফলার গলা থেকে খুলে সামনের দিকে ছুঁড়ে দিতেই মাফলার গিয়ে পড়লো লামিয়ার হুডির টুপি তে।
সবাই যে যার মতো দৌড়াচ্ছে। শুভ্র দৌড়াতে দৌড়াতে পিছন ফিরে লামিয়া কে দেখে দৌড় থামিয়ে দিয়ে উল্টো দিকে লামিয়ার দিকে দৌড়াতে লাগলো। লামিয়া শুভ্র কে তেড়ে নিজের কাছে আসতে দেখে ভয়ে ডান পাশে দৌড়াতে লাগলো। ষাঁড় সবাই কে রেখে এবার লামিয়ার পিছু ছুটলো। শুভ্র তা দেখে চেঁচিয়ে উঠলো ” ভ্রমর দৌড়াস না। হুডি থেকে ওই মাফলার ফালিয়ে দে।”
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে পিছনে ফিরে শুভ্রর দিকে তাকাতে তাকাতে দৌড়াতে লাগলো। শুভ্র কোন মাফলারের কথা বলছে তা বুঝে নি লামিয়া।
বরফের গোলা খেতে খেতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো লাবিব তার সামনেই ছবি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। হঠাৎ দৌড়ানোর শব্দ শুনে লাবিব বরফের গোলা মুখে নিয়ে পিছন ফিরতেই ধাম করে কারোর সাথে ধাক্কা লাগতেই লাবিবের হাত থেকে বরফের গোলা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়লো আর লাবিব মাটিতে। লামিয়া নাকে হাত রেখে মাটিতে বসে পড়েছে। লাবিবের জিম করা শক্ত – পোক্ত পিঠে লামিয়ার নাকে বারি খেতেই লামিয়ার মাথা ঘুরে উঠেছে। চোখ মুখে অন্ধকার দেখছে সে । ষাঁড় দৌড়ে লামিয়ার কাছে আসতেই শুভ্র লামিয়ার হাত টেনে ধরে উঠিয়ে নিজের কাছে এনে লামিয়ার টুপি থেকে থেকে লাল মাফলার টা ছুঁড়ে ফেলে দিতেই মাফলার গিয়ে পড়লো লাবিবের ব্যাকসাইডে। লাবিব তা খেয়াল করে নি। সে নিচু হয়ে মাটি থেকে ব্যাগ গুলো তুলছে আর বিরক্ত হয়ে লামিয়া কে বকছে। শুভ্র লামিয়ার দু গাল ধরে মুখ উপরে তুলতেই দেখলো লামিয়ার চোখের কোনে পানি জমে গিয়েছে। নাকটা লাল টুকটুকে হয়ে গিয়েছে। শুভ্র তা দেখে মলিন কন্ঠে বললো ” ঠিক আছিস ভ্রমর..?”
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৫
লামিয়া মাথা নেড়ে বললো ” হুমম ঠিক আছি।”
শুভ্র আর কিছু বলতে যাবে তার আগেই ছবির চিৎকার শোনা গেলো।
” লাবিব ভাইইইই।”
লাবিব ছবির চিৎকার শুনে ভ্রু কুঁচকে পিছনে তাকাতেই। ঠাসসসসসসস।
লামিয়া, শুভ্র, ছবি, সবাই স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো সামনের দিকে। বাড়ি শুদ্ধ লোক দৌড়ে এগিয়ে আসতেই সবাই থমকে গেলো।
