প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৫
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
বিকেল হতে না হতেই বাগান বাড়ি থেকে ঘুরতে বেরিয়েছে ইসলাম বাড়ির পাঁচ সদস্য লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা আর তোয়া। দুপুরে শুভ্র পায়ের কাঁটা তুলে দেওয়াতে লামিয়ার পায়ের ব্যথা অনেকটা কমেছে। তাই হাঁটতে বের হয়েছে চারজন। হাঁটতে হাঁটতে একটা বড় বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। বাড়িটি বেশ সুন্দর, বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন ধরনের বারোমাসি ফলের গাছ লাগানো।
তাঁর মধ্যে আম গাছ ও দেখা যাচ্ছে। লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির একজন আরেকজনের দিকে তাকালো। চারজন ই সয়তানি হাঁসি দিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ আছে নাকি। আশেপাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে পা টিপে টিপে প্রবেশ করলো বাড়ির বাগানের সাইডে। বাগানের আশেপাশে আরো বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ দেখা যাচ্ছে কিন্তু তাদের চোখ আটকে গিয়েছে কাঁচা আমের দিকে। গাছ টা বেশ নিচু আর আমের ভারে নুয়ে পড়েছে আরো। তা দেখে পাঁচজন আর কিছু না ভেবে ফটাফট আম ছিঁড়ে হুডির পকেটে পুরছে। যে যতগুলো পারছে নিচ্ছে। ইচ্ছে মতো আম নেওয়া শেষ করে যেই না বাগান থেকে বের হতে যাবে অমনি পিছন থেকে কেউ বলে উঠলো ” টাকা না দিয়েই দেখি চলে যাচ্ছো তোমরা..?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
হঠাৎ কারোর কথা শুনে চমকে উঠলো পাঁচজন হাঁটা থামিয়ে আস্তে আস্তে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরা এক উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের এক সুদর্শন পুরুষ কে। হাতে তার বড় মোটা লাঠি। তাঁর পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে লুঙ্গি পরা দুটো লোক তাদের হাতেও লাঠি।
তা দেখে তায়েব ফিসফিস করে বললো ” কী রে ভাই আম চু*রি করার জন্য কী এখন মারবে নাকি..?
লামিয়া তায়েব এর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললো ” আমরা চুরি করেছি এর প্রমাণ কী..? এতো বেশি কথা বলিস কেনো চুপচাপ থাক।”
তাদের ফিসফিসানি দেখে সামনে থাকা লোকটা সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো ” কী ফিসফিস হচ্ছে..? পালাতে চাইছো হুহহহ, পালাতে পারবে না। কারণ পালানোর সব রাস্তা বন্ধ বুঝতে পারলে..?”
পিছনে কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে পাঁচজন পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখলো আরো দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে তাদের পিছনে। তা দেখে পাঁচজন আবার সামনে তাকাতেই দেখলো সামনে থাকা লোকটা বাঁকা হাসছে।
লামিয়া তা দেখে বললো ” হেঁসে লাভ নেই আর পালানের পথ বন্ধ করলেও লাভ নেই কারণ আমরা পালাই না আর যদি পালাই তা আপনাদের এই দুটো মানুষ কেনো বাড়ি শুদ্ধি মানুষ আসলেও আমাদের আটকে রাখতে পারবে না।”
লামিয়ার কথা শুনে লোকগুলো বেশ অবাক হলো। আজ পর্যন্ত জমিদার বাড়ির মানুষদের দিকে কেউ চোখ তুলে কথা বলে নি আর এই মেয়ে কি না জমিদার বাড়িতে দাঁড়িয়ে জমিদার বাড়ির সব চেয়ে আদরের ছোট্ট ছেলের সাথে এভাবে কথা বলছে দেখেই সবাই বেশ অবাক হলো। লামিয়ার কথা শুনে পাশের এক লোক বলে উঠলো
” ওইই মাইয়া তুমি কি জানো তুমি কার লগে কথা কইতাছো?”
তায়েবা মুখ বাঁকিয়ে বললো
” জানতে চাই ও না।”
তায়েবার কথা শেষ হতেই তোয়া বেশ ভাব নিয়ে বলে উঠলো ” আর জানার প্রয়োজন ও নেই।”
তোয়ার কথা শুনে সবাই আরো আশ্চর্য হলো। তখনই পিছন থেকে কেউ বলে উঠলো ” নূর কী হয়েছে এখানে?”
কারোর কন্ঠ শুনে সবাই পিছনে তাকালো। দেখলো একটা বয়স্ক লোক লাঠি ভর করে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তা দেখে নূর দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাত ধরে সামনে এনে দাঁড় করালো। লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। বয়স্ক লোকটি সামনে এসে দাঁড়াতেই পাঞ্জাবি পড়া লোকটির দিকে তাকিয়ে বললো
” এরা কে নূর..? আর এভাবে ঘিরে রেখেছো কেনো..?”
নূর লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো
” দাদা জান এই পাঁচজন টাকা না দিয়েই মাল নিয়ে যাচ্ছিলো। তাই ঘিরে রেখেছি।”
” মাল মানে..?”
” দাদা জান তোমার মহা মূল্যবান আম গাছ থেকে ওরা ওদের হুডি ভরে আম নিয়ে পালাচ্ছিলো।”
নাতির এমন কথা শুনে মীর আদনান আলী ইসলাম বাড়ির চার বিচ্ছুদের দিকে ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে তাকালেন। তার সামনেই নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা,তোয়া। তাদের দেখে মনে হচ্ছে না তাঁরা চু*রি করেছে। আর দেখতে বেশ ভদ্র পরিবারের সন্তান ই মনে হচ্ছে । আদনান আলী সামনে তাকিয়ে তাদের উদ্দেশ্য করে বললো ” কে তোমরা..? আর এখানে কী করছো? এর আগে তো তোমাদের এই গ্রামে দেখি নি।”
আদনান আলীর কথা শুনে মাহির গলা পরিষ্কার করে বললো ” আসলে দাদা আমরা ঢাকা থেকে এসেছি আমাদের বাগান বাড়িতে বেড়াতে।”
আদনান আলী মাহিরের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে বললো ” কোন বাগান বাড়িতে..?”
তায়েব হাত উঁচিয়ে বাগান বাড়ি দেখিয়ে বললো ” ওই তো আই.কে বাগান বাড়ি।”
আদনান আলী তায়েব এর দিকে তাকিয়ে বললো ” আই. কে ওই টা তো ইসলাম আর খান বাড়ির বাগান বাড়ি। তোমরা কী হও তাদের..?”
লামিয়া হুডির পকেটে হাত রেখে সামনে ভ্রু কুঁচকে থাকা নূরের দিকে তাকিয়ে সামনে থাকা চুল গুলো ফু দিয়ে উড়িয়ে নূরের দিকে দৃষ্টি ফেলে জবাব দিলো ” আমরা ওই বাগান বড়ি এবং ইসলাম বাড়ির সমস্ত প্রপার্টির ফিউচার মালিক।”
নূর লামিয়ার দিকে ঠিক আগের মতোই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। লামিয়া ও নূরের দিক থেকে একচুলও দৃষ্টি সরায় নি। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখ দেখে মনে হচ্ছে তারা চোখে চোখে বিশাল বিশ্ব যুদ্ধ করছে।
আদনান আলী এবার টনক নড়তেই ঝটপট বলে উঠলো ” তোমরা তার মা..।”
আদনান আলী কে থামিয়ে চারজন এক সাথে বলে উঠলো ” ইয়েস ব্রো আমরা ইসলাম বাড়ির সন্তান।”
তাদের কথা শুনে আদনান আলীর ঠোঁটে হাঁসি ফুটে উঠলো। উনি লাঠি ভর দিয়ে এগিয়ে গেলো তাদের সামনে। তারপর একে একে চারজনের মাথায় হায বুলিয়ে তায়েব আর তায়েবার দিকে তাকিয়ে বললো ” তোমরা দুজন আনিসুল এর ছেলে – মেয়ে তাই না..?”
তায়েব তায়েবা অবাক হয়ে মাথা নাড়ালো। তা দেখে আদনান আলী হেঁসে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বললো ” আর তুমি হাশিমের ছেলে, তাই না..?”
মাহির ও মাথা নাড়াতেই আদনান আলী লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ” আর তুমি হামিদের মেয়ে..?”
লামিয়া পিটপিট করে চোখ করে মাথা নাড়ালো। আদনান আলী এবার উচ্চ স্বরে হেঁসে বললো
” তাহলে তোমরাই ইসলাম বাড়ির চার দুষ্টু সন্তান যাদের নিয়ে বাড়ি শুদ্ধ লোক টেনশনে থাকে। আমি ঠিক বললাম তো..?”
লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে আদনান আলীর দিকে তাকাতেই উনি আবার হেঁসে উঠলো। তারপর হাসিমুখেই বললো ” আমাকে চিনো..? আমি আদনান আলী। জমিদার বাড়ির প্রধান কর্তা। আমি আনিসুল, হামিদ, হাশিম, আজমিরের চাচা হই। আর তোমাদের দাদাজান। আমরা কিন্তু এক ই রক্ত। তোমারা আমাদের বংশধর। কিছু দিন আগে তোমার বাবা – মা রা এখানে আমার সাথেই দেখা করতে এসেছিলো কিন্তু। তখনই তোমাদের গল্প শুনেছি, ওদের কাছ থেকে। ”
লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে আদনান আলীর দিকে। তা দেখে আদনান আলী হালকা হেঁসে বললো
” তোমরা আমাকে চিনবে না। তোমরা একবার এসেছিলে তবে সেইই ছোট্ট বেলায় এসেছিলে তারপর আর আসো নি। তাহলে কীভাবে চিনবে তোমাদের দাদা ভাই কে। যাই হোক এসো বাড়িতে এসো আর কেউ আসে নি তোমাদের সাথে..?”
তখন ই পিছন থেকে রাশেদের গলা শোনা গেলো ” তোরা এখানে কী করছিস..?” বলতে বলতে সামনে এগিয়ে আসতেই আদনান আলী কে দেখে হেঁসে বললো ” দাদা জান কেমন আছো..? শরীর এখন কেমন তোমার..?”
আদনান আলী রাশেদ কে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো ” ভালো আছি ইয়াং ম্যান। তুমি কেমন আছো..?”
” আলহামদুলিল্লাহ দাদাজান।”
” তোমরা এখানে এসেছো কবে..? আর এসে আমার সাথে দেখা করো নি কেনো..?”
” দাদাজান আজ সকালেই এসেছি। তোমার সাথে রাতে দেখা করে যেতাম।” বলেই সামনে তাকিয়ে ভাই বোন দের একবার দেখে নিলো। তারপর আবার বললো ” ওদের কে চিনেছো..? ওদের সাথে পরিচয় হয়েছে তোমার..?”
” হ্যাঁ আম চু*রি করতে এসে ধরা পরেছিলো। তখন পরিচয় পর্ব শেষ হয়ে গিয়েছে।” বলতে বলতে বেশ বিরক্ত হয়ে এগিয়ে আসলো নূর।
আদনান আলী হেঁসে উঠলো নাতির এমন কথা শুনে। রাশেদ আড়চোখে ভাই – বোনদের দিকে তাকিয়ে নূরের সাথে হাত মিলিয়ে বললো ” কিছু মনে করবে না নূর। ওরা একটু দুষ্টু, আর টক জিনিস ওদের ভীষণ পছন্দ। তাই কাঁচা আম দেখে হয়তো নিয়ে নিয়েছে। তুমি বলো কতো টাকা হয়েছে আমি দিচ্ছি।” বলেই টাকা বের করতে যাবে অমনি নূর হাত ধরে ফেললো। তারপর ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো ” ছিঃ ছিঃ রাশেদ ভাই তুমি টাকা বের করছো কেনো..? আমি মজা করেছি ওদের সাথে। আমি প্রথমে চিনতে পারি নি তারপর পরিচয় দেওয়াতে চিনতে পারলাম। আর ছোট্ট মানুষ ওরা, ওরা মজা করবে না তো কে মজা করবে বলো তো..?” বলেই তায়েবার দিকে তাকালো।
রাশেদ নূরের কথা শুনে হেঁসে ভাই – বোনদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তারপর আর কিছুক্ষণ কথা বলে বিদায় নিলো।
আদনান আলী তাদের কে বাড়ির ভিতরে যেতে বলেছিলো কিন্তু রাশেদ পরে যাবে বলে ভাই – বোনদের নিয়ে বেরিয়ে আসলো।
লামিয়া গেট থেকে বের হতেই কী মনে করে যেনো জমিদার বাড়ির ছাদের দিকে তাকাতেই এক জোড়া কালো চোখে চোখ পড়তেই লামিয়া ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে তাকালো। জমিদার বাড়ির ছাদের উপর ২৭ বছর বয়সী শ্যামবর্ণের একটি যুবক দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লামিয়া তা দেখে বিরক্ত হয়ে রাশেদের সাথে কথা বলতে বলতে চলে গেলো। লামিয়া যুবকটির চোখের আড়াল হতেই যুবকটি ঘাড় কাত করে বিরবির করে বললো
” আমার কেশবতী।”
বাগান বাড়ির সামনে এগিয়ে আসতেই দেখলো সবাই রেডি হয়ে
দাঁড়িয়ে আছে। মূলত তাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। লামিয়া সামনে আসতেই শুভ্র লামিয়ার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো। লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকাতেই হকচকিয়ে উঠলো। শুভ্র এমন অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেনো তা সে জানে না। লামিয়া শুভ্রর থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। তাদের আসতে দেখে লাবিব বিরক্ত হয়ে বললো ” এখন সবাই হাঁটবে নাকি এখনো এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে..?”
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো ” কোথায় যাচ্ছি আমরা জানতে পারি..?”
লামিয়ার কথা শুনে লাবিব লামিয়ার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কিছু ভেবে মুখ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বললো ” মেলায় যাবো মেয়ে দেখতে।”
” মেলায় মেয়ে দেখতে..? কিন্তু কেনো মেয়ে দেখতে যাবো কেনো..? আর কার জন্য মেয়ে দেখতে যাবো..?”
লামিয়ার কথা শুনে লাবিব মনে মনে সয়তানি হেঁসে বলল ” শুভ্রর নাকি গ্রামের মেয়ে পছন্দ। পুতু মিয়া চাচা বললো মেলায় নাকি লাল টুকটুকে মেয়ে পাওয়া যায়। তা শুনে শুভ্রর নাকি লাল টুকটুকে বউ ঘরের তোলার ইচ্ছে জেগেছে। তাই ওর জন্যেই মেলায় মেয়ে দেখতে যাচ্ছি।”
লাবিবের কথা শুনে লামিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো লাবিব এর দিকে। তা দেখে লাবিব গা জ্বালানি হাঁসি দিলো। লাবিবের হাসি দেখে লামিয়া তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে শুভ্রর দিকে তেজি চোখে তাকাতেই দেখলো শুভ্র স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। লামিয়া ধাপ ধাপ দু পা এগিয়ে গিয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো ” লাবিব ভাই কে আপনি কিছু বলবেন নাকি আমি কিছু করবো..?”
শুভ্র লামিয়ার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ঘাড় কাত করে লবিব এর দিকে তাকালো। লাবিব মুখ চেপে হাসছে। পাশ থেকে আবির হাসতে হাসতে বললো ” পুড়লো রে লামু পুড়লো তর কপাল পুড়লো।” বলেই হেঁসে উঠলো।
লামিয়া ফুসফুস করতে করতে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে অন্য দিকে মুখ করে সামনে হাঁটা ধরলো। তা দেখে মুখ চেপে হাসতে হাসতে লামিয়ার পিছু হাঁটতে লাগলো।
মাহির, তায়েব, তায়েবা দৌড়ে লামিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে লাগলো সামনের দিকে।
অর্ধেক রাস্তায় আসতেই হঠাৎ পিছন থেকে অনার্দ শুনে সবাই ঘাড় ঘুরে তাকাতেই দেখলো লাবিব নাক ধরে রাস্তায় বসে আছে। পাশেই শুভ্র বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে।
তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে রাশেদ আর জাহিদ মুখ চেপে হাসছে। লাবিব রাস্তা থেকে উঠে বসে শুভ্রর দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকাতেই দেখলো শুভ্র স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে এখানে কী হয়েছে সে কিছুই জানে না। শুভ্র লাবিব এর চাহনি দেখে বিরক্ত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে এসে লামিয়ার হাত ধরে সামনে এগোতে লাগলো। লামিয়া আশ্চর্য চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আবার পিছনে ফিরে লাবিবের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেঁসে উঠলো। শুভ্র লামিয়ার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে হাঁটতে লাগলো সামনের দিকে।
রাশেদ হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে লাবিব কে উদ্দেশ্য করে বললো
” আরো যা ওর বউ কে জ্বালাতে।”
বলেই শারমিন কে কিছু ইশারা করে হাঁটা ধরলো।
সবার আগে লামিয়া আর শুভ্র। পিছনে সবাই গল্প করতে করতে হাঁটছে। তখনই শুভ্র উল্টো পথে হাঁটতেই লামিয়া চেঁচিয়ে উঠলো
” আরে আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন..?”
শুভ্র হাঁটতে লাগলো কিন্তু জবাব দিলো না। লামিয়া পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখলো তাদের পিছনে কেউ নেই। বিরক্ত হয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো ” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন শুভ্র ভাই..? ওরা তো চলে গেলো মেলায়। ছাড়ুন আমার হাত।যাবো না আমি আপনার সাথে।”
” ওরা যা ইচ্ছে করুক। আমি যেখানে যাবো তুই ও সেখানেই যাবি। ” হাঁটতে হাঁটতে বললো শুভ্র।
” না আমি যাবো না।” বলেই রাস্তায় বসে পড়লো।
শুভ্র হাঁটা থামিয়ে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
” তুই যাবি না..?”
” না..! আপনি আমাকে মারবেন। জানি আমি।”
” মারবো কেনো..?” ভ্রু কুঁচকে বললো শুভ্র।
” জানি না..! কিন্তু আমার মনে হয় আপনি রেগে আছেন আমার উপর। তখন রেগে তাকিয়ে ছিলেন আপনি আমার দিকে।
” কেনো তাকিয়েছি তুই বুঝিস নি..?”
লামিয়া দু – পাশে মাথা নাড়ালো। শুভ্র লামিয়ার হাত হেঁচকা টান দিয়ে বসা থেকে দাঁড় করালো। লামিয়া পিটপিট করে তাকাতেই শুভ্র লামিয়ার হুডির ফিতা টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে গাল শক্ত করে চেপে ধরে বললো ” তুই জানিস না কেনো রেগে আছি..?”
লামিয়া গালের ব্যাথায় চোখমুখ কুঁচকে বললো ” না..!”
শুভ্র তা দেখে আরো চেপে ধরে নিজের মুখের সামনে নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললো ” জমিদার বাড়ির ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলি কেনো..?”
লামিয়া চোখ খুলে শুভ্রর দিকে তাকাতেই শুভ্র লামিয়ার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে কোলে তুলে নিলো। লামিয়া শুভ্রর গলা পেঁচিয়ে ধরে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো ” আমি নূরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আপনি কী করে দেখলেন..?”
শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো ” এইটুকু সময় নাম ও জেনে নিয়েছিস..?”
” তো জানবো না কেনো..? ওও তো আমাদের ভাই হয় তাই না..?”
শুভ্র মুখ কুঁচকে বললো ” জানি না..!”
লামিয়া তা দেখে মনে মনে হাসলো তারপর বললো ” কেমন জানি স্মেল আসছে না??”
” আমি তো পাচ্ছি না।”
” উঁহু আমি পাচ্ছি। ” বলেই শুভ্রর বুকে হাত রেখে বললো ” গন্ধ টা এখান থেকে আসছে শুভ্র ভাই।”
শুভ্র হাঁটা থামিয়ে লামিয়ার দিকে তাকালো। লামিয়া তা দেখে খিলখিল করে হেঁসে বললো
” আপনি জ্বলছেন শুভ্র ভাই..?”
” আমাকে কী তোর কাগজ মনে হয় যে জ্বলবো..?”
” তাহলে পোড়া গন্ধ কোথা থেকে আসছে..?”
” তোর নাক পচে গিয়েছে।” বলেই বিরক্ত হয়ে হাঁটতে লাগলো।
লামিয়া হাঁসি মুখে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে তাঁর শুভ্র পুরুষের দিকে। শুভ্র বাঁকা দৃষ্টিতে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে অনুরোধ কন্ঠে বললো ” এভাবে তাকাস না ভ্রমর। তোর চোখের চাহনি আমাকে…আমাকে খুন করে দেয়। নিজেকে হারিয়ে ফেলি তোর এই বাদামী চোখে। আমার কালো ভ্রমর, আমার জান এভাবে তাকাস না প্লিজ। তোর ওই চোখ আমাকে বদ্দ বেসামাল করে তোলে।” বলতে বলতে হাঁটা থামিয়ে দিয়ে লামিয়ার দিকে তাকালো। লামিয়া শুভ্রর দিকে এখনো এক ধ্যানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শুভ্র তা দেখে হালকা হেসে লামিয়া কে বসিয়ে দিলো একটা দোলনায়। দোলনায় বসতেই লামিয়ার হুশ ফিরলো। ঝটপট আশেপাশে তাকিয়ে দেখতেই চোখ গোল গোল হয়ে গেলো। লামিয়া বড় বড় চোখ করে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
” এটা কোথায় এনেছেন..?”
শুভ্র হেঁসে বললো ” কালো ভ্রমর কে শুধু তার নিজস্ব জায়গাতেই মানায়। কালো ভ্রমরের আসল সৌন্দর্য কোথায় জানিস..? এই ফুলে। তারা যখন ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায় দেখতে ভীষণ ভালো লাগে। যেমন এই হাজার ফুলের মাঝে আমার কালো ভ্রমর বসে আছে। তাঁকে দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগছে। ”
লামিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো চারপাশ।গোটা একটা ফুলের বাগানের মাঝে এনে বসিয়েছে শুভ্র তাঁকে। হঠাৎ মাথার উপর থেকে কিছু ফুল তার উপর পড়তেই লামিয়া চমকে মাথা তুলে উপরের দিকে তাকাতেই লামিয়ার মুখ আপনাআপনি হা হয়ে গেলো। মাথার উপর লাল টুকটুকে তাঁর প্রিয় ফুল কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখে। লামিয়া অবাক হয়ে শুভ্রর দিকে তাকাতেই দেখলো শুভ্র মুচকি হেঁসে লামিয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে। লামিয়া দোলনার রশি দু হাত দিয়ে চেপে ধরলো শক্ত করে। তাঁর যে কী ভালো লাগছে সে বলে বোঝাতে পারবে না। শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ দৃষ্টিতে। লামিয়ার মুখে হাঁসি। দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে চোখ বন্ধ করে।
স্নিগ্ধ বাতাসে চুল গুলো হালকা উড়ছে। শুভ্র তা দেখে এগিয়ে গিয়ে লামিয়ার পিছনে দাঁড়ালো। তারপর হাত বাড়িয়ে এক টানে খুলে দিলো লামিয়ার চুলের কালো ফিতা। ফিতা খুলতেই লম্বা সিল্কি চুলের ঢিলে ঢালা বেণীর ভাঁজ খুলে আঁচড়ে পড়লো পিঠের উপর। লামিয়া দোল খাইয়া থামিয়ে দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকাতেই শুভ্র কে দেখতে পেলো। শুভ্র লামিয়ার চাহনি দেখে এবার এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো। লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্র এবার হাঁটু গেড়ে লামিয়ার সামনে বসলো। স্নিগ্ধ বাতাসে লামিয়ার এলোমেলো চুল গুলো কপালে, মুখে এসে আঁচড়ে পড়ছে। শুভ্র তা যত্ন করে সরিয়ে কনের পিছনে গুঁজে দিয়ে লামিয়ার দু গাল ধরে কপালের বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে চুমু খেলো। তারপর উঠে গিয়ে বাগান থেকে একটা একটা ফুল ছিঁড়ে শুভ্র লামিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে কানে ফুল গুঁজে দিয়ে হালকা হেসে খালি গলায় গেয়ে উঠলো
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৪
~ ভালোবাসার স্বপ্ন সব তোমায় ঘিরে।। ছায়া হয়ে রবো তোমার পাশে।।।
শুভ্র থামতেই লামিয়া হাত বাড়িয়ে শুভ্রর গলা জড়িয়ে ধরে ঘাড় কাত হয়ে মুগ্ধ নয়নে শুভ্রর চোখে চোখ রেখে গেয়ে উঠলো
~ ভালোবাসার সব সুখ তোমার ই মাঝে।। এএ কোন মায়ায় তুমি জড়ালে..?

Next part