ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮০ (২)
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
বিএমডব্লিউ ৭ সিরিজের কালো গাড়িটা এসে বিভৎস ভাবে ফেঁসে গেছে ঢাকা শহরের বিখ্যাত জ্যামে।
চার দিকে যানবাহনের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, টাটা পড়া রোদ আর জটলা পাকানো মানুষের ক্যাচ ক্যাচ— মাথা ধরে যায় যেনো।
মিনিট ২০ একটানা ঠাঁয় বসে থাকতে থাকতে বিরক্তি ধরে যাচ্ছে প্রণয়ের। কপালের নিচে তৈরি হচ্ছে একের পর এক দৃঢ় ভাঁজ।
হাতের ঘড়িতে সময় দেখে নিলো প্রণয়। অস্বস্তিকর ব্যপসা গরম থেকে বাঁচতে এসি অন করে দিলো।
শিকদারদের সুদর্শন বড়ো ছেলে সাথে থাকলে কোনো টাইমই বোরিং লাগে না প্রিয়তার নিকট। তাই এবারও লাগলো না— বরং সাউন্ড সিস্টেমে ফুল ভলিউমে গান ছেড়ে দিলো।
প্রণয়ের উরুর ওপর বসে শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে প্রিয়তা। কেবল বসে থেকেই ক্ষেন্ত হয়নি— রীতিমতো প্রণয়ের নিশ্বাস অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
শরীরের সাথে চেপে বসতে বসতে চেষ্টা চালাচ্ছে একদম বুকের গভীরে ঢুকে পড়ার। প্রিয় পুরুষটাকে আদর করতে করতে তার রীতিমতো খপাত করে খেয়ে ফেলার মুড হচ্ছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কখনো দুই গাল টেনে দিচ্ছে, তো কখনো দুই গাল চেপে ধরে ঠোঁটে ঠেসে ঠেসে চুমু খাচ্ছে— আবার মাঝে মাঝে অতিরিক্ত উগ্রতায় আঁচড়, কামড়, খামচি এসবও দিচ্ছে। কী এক বিড়ম্বনা।
প্রিয়তার ধারালো নখ আর দাঁতের ভালোবাসায় ইতিমধ্যে রক্তাক্ত হয়ে গেছে প্রণয়। তার ডার্ক রেড ঠোঁটের চামড়া উঠে ব্লাড গ্লিচ করছে। পিঠ ও বাহুতে অসংখ্য খামচির দাগ পড়েছে— সম্ভবত; তবে ফুলহাতা শার্টের জন্য দৃশ্যমান নয়।
গলায় ও গালে ছোট বড় অসংখ্য কামড়ের দাগ।
প্রিয়তা চাচ্ছে প্রণয় ভাই তাকে কিছু বলুক, একটু বকুক, একটু শাসন করুক— তবে সে সবের ধারেকাছে ও নেই প্রণয়।
বারণ করতো দূরের কথা, প্রিয়তার এতো এতো আদর আহ্লাদ পাত্তাই দিচ্ছে না। এতে করে আরও বেশি অধৈর্য হয়ে উঠছে প্রিয়তা।
শার্টের কলার টেনে ধরে মুখ ঢুবাল গলায়। সাথে সাথে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং চেপে ধরলো প্রণয়। দুই চোখের পাতা বুঝে এলো অটোমেটিকলি।
গলায় নরম নরম ঠোঁটের স্পর্শ আঁকতে আঁকতে কাঁধের শার্ট সরিয়ে ঘাড়ে নাক ডুবলো প্রিয়তা। সেখানে ও আলতো স্পর্শে নরম ঠোঁট বুলিয়ে দিল— তপ্ত একখানা চুমু আঁকল নিবৃত্তে।
বুক ভরে একটা মাত্র নিঃশ্বাস টানলো প্রিয়তা। এতেই যেনো সব উগ্রতা শিথিল হয়ে গেল নিমিষে। প্রিয় ঘ্রাণটা মস্তিষ্কে পৌঁছাতেই বেসামাল হয়ে পড়ল প্রিয়তা। নেনোসেকেন্ডের মধ্যে মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত হলো লক্ষাধিক ডোপামিন ও অক্সিটোসিন। এক প্রকার কড়া ড্রাগের নেশায় আচ্ছাদিত হলো প্রিয়তার ইন্দ্রিয়।
লম্বা লম্বা নিশ্বাসে পুরুষালি দেহের প্রিয় ঘ্রাণটা ফুসফুসে ভরে মরিয়া হয়ে উঠল সে।
নিশ্বাস ভারি হয়ে উঠছে প্রণয়ের। হাত কাঁপছে। হৃৎপিণ্ড ছুটছে তুফানের গতিতে। উগ্রে আসা বেসামাল অনুভূতির জোয়ার গিলতে ব্যস্ত প্রণয়— নিশ্বাসের অস্থিরতা শান্ত করার চেষ্টায় মরিয়া।
তাদের শারীরিক ও আত্মিক নৈকট্য দেখে বুঝার উপায় নেই যে তাদের দুটি দেহ দুটি প্রাণ— বরং এক দেখাতেই যে কেউ বুঝে যাবে, তাদের দুটি শরীরে একটি প্রাণ।
সিগন্যাল গ্রিন হতেই গাড়ি চলতে শুরু করে আপন গতিতে।
প্রিয় মানুষটা বুকের উষ্ণতায় ঘুম ধরে যাচ্ছে প্রিয়তার। কিন্তু এখন তো ঘুমালে চলবে না। পুনরায় মতলব ফাঁদলো প্রিয়তা।
দুই হাতে শক্ত করে পেট জড়িয়ে ধরল প্রণয়ের। ঘাড়ে গলায় নাক ঘষতে ঘষতে গলার উঁচু হাড়টায় টুকুস করে একটা কামড় দিল— চুমু আঁকল শব্দ করে।
বার বার ফোকাস নষ্ট হচ্ছে প্রণয়ের। বুকের ভেতর প্রলয়ংকারী অনুভূতির সুনামি উঠছে। মেয়েটা কি বুঝতে পারছে— রাইট টাইমে সে রং কাজটা করছে? কেনো এমন ভাবে উত্তপ্ত করছে তাকে, কেনো নিচ্ছে ধৈর্যের পরীক্ষা— এখন কী বাসর করার সময়?
প্রিয়তা খুঁচা খুঁচা দাড়ি যুক্ত গালে গাঢ় চুমু খেলো।
চাপা নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো প্রণয়। ডান হাতে কোমর আগলে ধরে বাঁ হাতে ড্রাইভ করছে। আবারও ঠোঁটের দিকে দৃষ্টি গেল প্রিয়তার।
সুদর্শন মুখটার পানে চেয়ে থাকতে থাকতে উষ্ণ মনে শীতল ভাবনা এল—
এতো কাছে থাকা মানুষটা নাকি কিছু দিন আগেও তাকে অপমানে লাঞ্ছনার বিষাক্ত বাক্যবাণে জর্জরিত করতো। সমস্ত যন্ত্রণা উপেক্ষা করে যতবারই কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতো, ততবারই মানুষটা বুঝিয়ে দিতো— সে তার জীবনে কতোটা মূল্যহীন, অপ্রয়োজনীয়।
সেই মানুষটাই আজ তার হাতে নিজের প্রাণটা সমর্পণ করতে ক দ্বিধা করে না। আগে ও হয়তো করতো না। ভালোবাসা তো এক দিনে আসে না। এই মানুষটা তাকে বহুকাল আগে থেকেই ভালোবাসতো।
ভালোবাসতো বলেই না এতো আদর করতো, আগলে রাখতো। এই নিষ্ঠুর স্বার্থের দুনিয়ায় বিনা স্বার্থে মানুষ কিছুই করে না। কই— আরো তো অনেক ভাই বোন ছিলো, তাদের প্রতি তো এতো মায়া কখনো দেখাতো না।
অথচ তাকে একটা মশা কামড় দিলে ও উন্মাদের করতো।
এতটাই যখন ভালোবাসতো, তাহলে বার বার কেনো ভালোবাসতে দেওয়াল তুলে দিতে চাইতো? কেনো তার ভালোবাসাকে পিঞ্জরে বন্ধী করতে চাইতো?
এর উত্তর নেই প্রিয়তার কাছে। জানে— এই মানুষটা ও দেবে না।
তার মনে জমানো কোটি খানেক প্রশ্ন। তবে একটারও সৎ উত্তর নেই। আর সত্যি বলতে— জানতে ও চায় না প্রিয়তা।
কী হবে জেনে? কিছু জানার, বোঝার দরকার নেই। শুধু এই মানুষটা তার কাছে থাকুক— রবের দরবারে এতোটুকুই চাওয়া প্রিয়তার।
একটা সময় যে মানুষটার চোখে চোখ পড়লে দৃষ্টি লোকাতে হতো, যে মানুষটার প্রতি ছিল পাহাড় সম অভিমান— আজ সেই মানুষটা তার সম্পূর্ণটাই তার। তাকে সে অনুমতি বিহীন যা ইচ্ছা তাই করে।
যে ভাবে ছুঁতে মন চায়, সে ভাবে ছুঁয়ে দেয়। ইচ্ছে হলে সারাদিন চোখের সামনে বসিয়ে রাখে।
কতো বড়ো বেহায়া সে। এই মানুষটাকে পাওয়া মাত্রই কত সহজে সে ভুলে গেল অতীতের বিষাক্ত দিনগুলো। যে দিনগুলোতে এই মানুষটাই তাকে কুকুর বিড়ালের মতো দুরদুর করেছে। কতই না কষ্ট দিয়েছে, যন্ত্রণা দিয়েছে।
ভিক্ষুকের মতো বারবার তার দুয়ারে ফিরে আসার পরেও ভালোবাসা দেয়নি— অপমান দিয়েছে, অবহেলা দিয়ে মানসিক যন্ত্রণায় পিষে মেরেছে।
প্রত্যক্ষ— কত সহজে সেসব ভুলে গেল প্রিয়তা।
অন্য কোনো আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মেয়ে হলে কি পারত?
নিজের ভাবনায় নিজেরই হাসি পেলো প্রিয়তার। আত্মমর্যাদা— ওটা আবার কি খায় না মাথায় দেয়? এসব ভারি ভারি অলংকার যুক্ত শব্দ তার সাথে যায় না।
সে উচ্চ মাত্রার একজন অত্যন্ত বেহায়া, নির্লজ্জ মেয়ে মানুষ।
সে মুখ বুজে সব অপবাদ অপমান মেনে নিয়েছে। এত কষ্টই না এই ছোট্ট বুকটাতে সইতে হতো— যন্ত্রণা রাখার জায়গা হতো না। তবুও ভিক্ষুকের মতো সেই নিষ্ঠুর মানবের দুয়ারে পড়ে থাকত প্রতিদিন— তড়পাত শুধু সামান্য ভালোবাসার তৃষ্ণায়।
তবে কেবল শুধু ৬ বছর কেন— সারাটা জীবনও যদি মানুষটা একইভাবে কষ্ট দিত যেত, তবুও কিছু করার ছিল না প্রিয়তার।
অপমান, অসম্মান— গোটা একটা জন্ম শেষ করার পর জীবনের শেষ দিনে যদি মানুষটা এসে বলত—
“ভালোবাসি রক্তজবা”
তবে ওটুকুই হয়তো যথেষ্ট হতো সারাজীবনের অপমান ভুলার জন্য।
প্রিয়তার মতে—
“তোমার যদি অতিরিক্ত মান সম্মান থাকে, তুমি যদি অতিরিক্ত আত্মমর্যাদা সম্পন্ন হও— তবে সারা পৃথিবীর সমস্ত সম্মান তোমার জন্য। সব কিছুতে তুমি সুযোগ্য হলেও ভালোবাসাতে তুমি অযোগ্য। নিজের অস্তিত্বের বাজী লাগিয়ে কাউকে তুমি কোনদিনও ভালোবাসতে পারবে না। কারণ তোমার প্রথম ভালোবাসা তুমি নিজে।”
তার মতে—
“ভালোবাসতে হয় নিজের সর্বস্ব লুটিয়ে দিয়ে, নিজের অস্তিত্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে। ভালোবাসতে হয় বেহায়া হয়ে, নির্লজ্জের মতো। ভালোবাসলে তোমার লাথি ঝাঁটা খাওয়ার অভ্যাস রাখতে হবে। অপমান অসম্মান অভ্যস্ত হতে হবে। ভালোবাসার অমৃত পান করার আগে বিপরীত দিকের প্রাণনাশি নীল রঙের বিষটাও তোমায় পান করতে হবে। তুমি যদি সম্মানের আহুতি দিতে না পারো— তবে আর যাই হোক, ভালোবাসাটা তোমাকে দিয়ে হবে না।”
প্রিয়তা হাসল। নরম আঙুলগুলো আনমনেই ছুঁয়ে দিল রক্তিম ওষ্ঠে।
মতলব বুঝতে পেরে ছোট্ট সত্তাটাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল প্রণয়।
গভীর অশান্ত কণ্ঠে বলল,
“বড্ড জ্বালাচ্ছিস তুই জান। খুব বেশি জ্বালাচ্ছিস। অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে তো।”
প্রণয়ের কণ্ঠস্বরটা ঘোলাটে। চোখ দুটোতে স্পষ্টতই নেশার জোয়ার।
বুকে মাথা রাখতেই হার্টবিটের অস্বাভাবিক গতিবিধি টের পেল প্রিয়তা। অজান্তেই হাত চলে গেল বুকের বাঁ পাশে।
অবুঝ চোখে তাকিয়ে বোকার মত প্রশ্ন করল,
“ওটা ওভাবে লাফাচ্ছে কেন প্রণয় ভাই? আর আপনি এত ঘামছেন কেন?”
প্রশ্ন শুনে দাঁতের দাঁত চাপলো প্রণয়। অশান্ত করে তুলে আবার জিগায় কটমট করে বললো,
“হরমোনে নাড়া দিচ্ছে বউ। আসো— শান্ত করে দাও।”
চোখ পিটপিট করে তাকালো প্রিয়তা। ফের নির্বোধের মত বললো,
“আ-আ… আমি কিভাবে?”
“ঢং! দিনে ১০ বার গোসল করা মেয়েটা নাকি জামাইয়ের হরমোন সম্পর্কে জানে না! তুই আমাকে উত্তপ্ত করিস না। খোদার কসম— গাড়ি চালাতে না পারলে সব ঝাল ঝেড়ে দেবো তোর উপর।”
প্রণয়ের উত্তাল পাথাল নিশ্বাসের অস্থিরতা দেখে ভড়কে গেল প্রিয়তা। দূরে সরে গিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল।
মোমের পাহাড়ে আগুন দিয়ে দূরে সরে যাওয়াটা যেন সহ্য হলো না প্রণয়ের। ধমকের সুরে বলল,
“সরে গেলি কেন? বুকে আয় তাড়াতাড়ি।”
প্রিয়তা ভয় পেয়ে আবারও বুকে মাথা রাখল।
“ডিস্টার্ব করবি না— কবুতরের বাচ্চা। আরেকবার জ্বালালে কী করবো আমি নিজেও জানি না। প্রয়োজনে তুই আলাদা করে পরীক্ষা দিবি— তবুও তোকে দেখে ছাড়ব।”
শীতল হুমকি শুনে কলিজায় কামড় দিয়ে উঠল প্রিয়তার। বেশ কিছুক্ষণ ঘাপটি মেরে পড়ে রইল বুকের ওপর।
কিন্তু প্রিয়তা আবার বেশিক্ষণ মুখ বন্ধ করে বসে থাকতে পারে না। পেটের মধ্যে কথা জমতে জমতে বদহজম হওয়ার উপক্রম।
তাই হলো— শুধু শুধু বসে থেকে শান্তি পাচ্ছে না প্রিয়তা। পেটের ভেতর কিলবিল করছে শয়তানি। কথায় আছে না— অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা। মিথ্যে নয়।
প্রিয়তার পেটের ভেতর উঁকি দিল একটা ঝাক্কাস বুদ্ধি।
ভয়ে ভয়ে তাকাল প্রণয়ের মুখের দিকে।
প্রণয় একদম সিরিয়াস। তার একাগ্র দৃষ্টি সামনে সড়কে। ডান হাতে সুনিপুণ ভঙ্গিতে ঘুরাচ্ছে গাড়ির স্টিয়ারিং।
শালার এ সামান্য দৃশ্যটা দেখে ও লোভ সামলাতে পারলো না প্রিয়তা। মুখ হা করে বিশাল একটা ক্রাশ খেয়ে বসলো
— গরম গরম।
মনে মনে বললো— কী চিজ পাঠালে দয়াল! যতই দেখি ততই তৃষ্ণা বাড়ে। কোনভাবেই মন ভরাতে পারি না। শিকদারদের ডিএনএ তে কিছু তো একটা ব্যাপার আছে।
দেখতে দেখতে হঠাৎ মুখ ফসকে বলে বসলো,
“বড়ো হয়ে অনেক সুদর্শন হয়েছো।
তোমাকে দেখে মনের মধ্যে দুষ্টু দুষ্টু ফিলিংস জাগে।”
“তুমি ও বড়ো হয়ে ইডিয়েট, মাথামোটা হয়েছো। ভেবেছিলাম বড়ো হলে হাঁটুর বুদ্ধি মাথায় উঠবে— কিন্তু তার বদলে গাঁধী হয়েছো।”
পাল্টা জবাব দিতে নিলেই ফন্দির কথা মনে পড়ে গেল প্রিয়তার। লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার জন্য নিজেই নিজেকে গালমন্দ করল।
খানিক থিতু হয়ে বাঁকা হাসল প্রিয়তা।
প্রণয়ের খুঁচা খুঁচা দাড়ি যুক্ত গালে নিজের মুলায়ম গালটা আস্তে করে ঘষে দিলো। মসৃণ চামড়ায় ইচ্ছাকৃত ঘষা লাগতেই চেঁচিয়ে উঠল প্রিয়তা,
“আহ্ প্রণয় ভাই, ব্যাথা লাগে তো!”
মেয়েটার বাদরামিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো প্রণয়। মেয়েটা চালাক হয়ে গেছে— এখন আর খুছা দিলে গায় মাখে না।
ধৈর্য ধরল প্রণয়। অসহনীয় কণ্ঠে বলল,
“উফফ! আবার জ্বালাচ্ছিস তুই! জানলা দিয়ে বাহিরে ছুড়ে মারবো এবার!”
প্রিয়তা গাল ফুলাল। প্রণয়ের দুই গালে হাত বুলিয়ে অভিমানী কন্ঠে বলল,
“আপনার এগুলো আমায় ব্যথা দিল, আর আপনি উল্টো আমাকেই বকলেন। আপনি খুব খুব খুব পচা, প্রণয় ভাই।”
ঠোঁট চেপে হাসল প্রণয়।
প্রিয়তা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। সন্দিহান হয়ে বলল,
“আপনি হাসছেন! সত্যি সত্যি আপনার এগুলো ব্যথা দিয়েছে আর আপনি হাসছেন!
নতুন বেডি পেয়েছেন বুঝেছি— তাই এখন আমি ব্যথা পেলেই বা আপনার কি!”
“হোয়াট নতুন বেডি? পুরনো শাকচুন্নিই সামলাতে পারি না, আবার নতুন ভূতনি আনবো? পাগল নাকি!”
সিরিয়াস মুখে বললো প্রণয়।
প্রিয়তা এবার রেগে গেলো। প্রণয়ের বুকে কিল ঘুষি মারতে মারতে বললো,
“আমি শাকচুন্নি সি? দেখুন আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখুন— আমার মতো সুন্দরী আর কোথাও দেখেছেন!”
প্রণয় চোখ সরু করে তাকালো। ভালো মতো দেখার চেষ্টা করে বলল,
“সুন্দর কোনদিক থেকে?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, নতুন বেডি পাইছেন তো— আমার সৌন্দর্য এখন চোখে পড়বে না আপনার। আপনার দাড়ি গুলো আমায় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ব্যথা দিলো আর আপনি কিছুই বললেন না। সরুন, আপনার সাথে কথা নেই।”
মুখ ঘুরিয়ে নিলো প্রিয়তা।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল প্রণয়। এক হাতে প্রিয়তার লম্বা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে অতিধীর কণ্ঠে বলল,
“একটু আগেই কে জানি আমাকে আঁচড়ে কামড়ে রক্ত বের করে দিয়েছিল— আমি কি তাকে অভিযোগ করেছি? অথচ এখন সে ইচ্ছে করে আমার সাথে পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করতে চায়। এটা কি দুর্বলের উপর বল প্রয়োগ না? তাকে কি করা উচিত বলতো?”
ধরা পড়ে গিয়ে লজ্জায় মিইয়ে গেল প্রিয়তা। তবে নিজ কুকর্ম স্বীকার করল না। না বোঝার ভান ধরে বলল,
“কি করা উচিত আবার? কেউ ইট ছুড়লে তাকে পাথর মারতে হয়। সে আপনাকে আঁচড়ালে কামড়ালে— আপনি ও তাকে আঁচড়ে কামড়ে দিন। হিসাব বরাবর।”
প্রণয় চোখ ঘুরিয়ে তাকালো। ওষ্ঠ কোণে খেলে গেল চমৎকার এক বাঁকা হাসি। ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,
“সত্যি বলছিস? আমি কামড়ালে কিন্তু ইঁদুরের মতো কুটকুট করে কামড়াব না। আমি ধরলে ভালোমতো।”
বলে থামলো প্রণয়। বাঁকা হেসে কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
“ইউ নো হোয়াট আই মিন। বিশ্বাস না হলে তুর জামাটা সরিয়ে চেক করে দেখতে পারিস— প্রুভ গুলো এখনো তরতাজা জ্বলজ্বল করছে।”
প্রণয়ের কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠল প্রিয়তার। অদৃশ্য হাতে নিজেই নিজের মাথায় চাঁটি মেরে বলল,
“এই অসভ্য লাগামহীন লোকটার সাথে আর কোনোদিনও লাগব না। আগে এমন ভান ধরে থাকতো— যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না, আর এখন!”
প্রিয়তার এক্সপ্রেশন দেখে শব্দ করে হাসল প্রণয়। প্রিয়তার তুলতুলে গালে টপাটপ দুটো চুমু খেয়ে বলল,
“অভিনয়ে তুই সব সময় কাঁচা ময়না পাখি।”
মত পাল্টে নিল প্রিয়তা। ভেংচি কাটল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“আমাকে লজ্জা দেওয়া ব্যাটা, দেখাচ্ছি মজা।”
কোল থেকে নেমে পাশের সিটে বসে পড়ল প্রিয়তা। সন্তর্পণে ব্যাগের চেইন খুলে ডিওর লিকুইড ম্যাট মারুন লিপস্টিকটা বের করল।
ফোন আর লিপস্টিক নিয়ে আবারও লাফিয়ে প্রণয়ের কোলে চড়ে বসল প্রিয়তা।
পূর্বের ন্যায় পরম মমতায় আগলে নিল প্রণয়।
এই বাচ্চাটাকে বুকে নিলে একসাথে অনেকগুলো অনুভূতি মিলেমিশে এক স্বর্গীয় মিশ্র অনুভূতির সুখ অনুভূত হয়। এই মেয়েটা কেবল স্ত্রী বা প্রেমিকার সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয় প্রণয়ের কাছে।
এগুলোর থেকে হাজার গুণ শক্তিশালী অন্য এক অনুভুতি হানা দেয় হৃদ গহীনে— এই মেয়েটাকে বুকে নিলে সবকিছু ছাপিয়ে কেন জানি পিতৃত্বের স্বাদটা বেশি ভারি লাগে।
হয়তো সেইদিনের সেই সদ্য নবজাতক দুধের শিশুটাকে বুকে আগলে নেওয়ার পরিণাম এই অনুভূতিটা।
এই মেয়েটা তার কাছে প্রেমিকা বা স্ত্রীর থেকে অনেক অনেক অনেক বেশি— প্রণয়ের সন্তান, তার আত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভালোবাসার এক জীবন্ত পুতুল, যাকে ভালোবেসে মরে যেতে এতটুকু দ্বিধা নেই প্রণয়ের। ওই নিষ্পাপ রমণীর ভালোবাসায় ফাঁসির দড়িও যেন সুরভিত ফুলের মালা।
হেসে পাখিটাকে বুকের সাথে ঝাপটে ধরল প্রণয়।
কোলে বসেই ঠোঁট বরাবর একটা চুমু ছুড়ে দিল প্রিয়তা। মিষ্টি করে হেসে বলল,
“আই লাভ ইউ, প্রণয় ভাই।”
“হুম, তো?”
“তো আবার কি? আনসার দিন।”
“দেব, সময় হলে।”
ভেংচি কাটল প্রিয়তা। মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আপনার সময় হতে হতে দেখবেন প্রিয়তার চুল পেকে বুড়ি হয়ে গেছে।”
“বুড়ি হলেও ছাড়ব না। সেই একই নিয়মে দিনে ১০ বার গোসল করাব।”
দায়সারা জবাব প্রণয়ের।
“অসভ্য লোক।”
কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল প্রিয়তা। পদ্ম লাল ঠোঁট জোড়ায় লুকিয়ে লুকিয়ে গাঢ় করে লিপস্টিক দিল।
শুকিয়ে যাওয়ার আগেই টপ টপ করে চোখে, ঠোঁটে, গালে, গলায় ২০–২৫টার মতো চুমু দিল প্রিয়তা।
সারা মুখ জুড়ে লাল লাল ঠোঁটের ছাপ। যদিও ব্যাপারটা লক্ষ্য করল না প্রণয়।
প্রিয়তা আবার কৌশলে টিস্যু পেপারে রিমুভার দিয়ে ঠোঁটের লিপস্টিক তুলে দিল।
প্রণয়কে দেখিয়ে দেখিয়ে রক্তিম ঠোঁটে স্ট্রবেরি লিপ জেল দিল প্রিয়তা।
প্রণয়ের নির্বিকার কন্ঠ,
“লোভ দেখাচ্ছিস?”
শয়তানি হাসল প্রিয়তা। কণ্ঠে হতাশা নিয়ে বলল,
“কি লাভ? আপনি তো লোভীত না।”
“শুধু এক্সামটা দিয়ে বের হ। তারপর দেখাব আমি লোভীত কিনা বা কতখানি লোভীত। এতক্ষণ যা জ্বালিয়েছিস— তার ১০০ গুণ উসুল করে নেব, প্রমিজ।”
“দুঃখিত, ভয় পেলাম না।”
“ঠিক আছে, এনএসইউ এর সবচেয়ে কাছের হোটেলটার নাম কি যেন?”
আঁতকে উঠল প্রিয়তা। চোখ বড় করে তাকাল।
গাড়িটা বসুন্ধরা আবাসিক চত্বরে ঢুকতেই প্রিয়তা বায়না ধরে বসল। প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরে ঠোঁট উল্টে বলল,
“আইসক্রিম খাব।”
“এখন না, পরে খাবি।”
“না, আমি এখনই খাব।”
“জান?”
“প্লিজ।”
অসহায় চোখে তাকাল প্রণয়। তার আহ্লাদি বউয়ের এতো আদুরে আবদার তো আর না করা যায় না।
গাড়ি সাইড করে দাঁড় করাল প্রণয়। দুই হাতে পিঠ জড়িয়ে ধরে মসৃণ কপালে চুমু দিল।
নরম গলায় আদেশ দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি আর আসছি। তুই চুপটি করে বসে থাক।”
প্রিয়তা ওপর নিচে মাথা ঝাঁকাল।
হাসল প্রণয়। গাল টেনে দিয়ে বলল,
“গুড গার্ল।”
প্রিয়তাকে ছেড়ে বাহিরের রাস্তায় পা রাখতেই ভ্রু কুঁচকে গেল প্রণয়। কিছুদূরে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চাপলো। যাওয়ার পূর্বে চাবি দিয়ে ডোর লক করে গেল।
জনবহুল নগরীতে ব্যস্ত সড়কের অবস্থা যাচ্ছে তাই। দ্রুত পা চালাচ্ছে প্রণয়। কেমন অদ্ভুত লাগছে তার— পথচারীরা কেমন অদ্ভুত নজরে তাকাচ্ছে তার দিকে। সবার এমন চাহনি দেখে খানিক আশ্চর্য হলো প্রণয়। এভাবে দেখার কোনো কারণ খুঁজে পেল না।
আইসক্রিম পার্লারের স্টাফগুলোও কেমন হাঁ করে তাকিয়ে ছিল মুখের দিকে।
তবে এসবের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিল না প্রণয়। ম্যাঙ্গো আর চকলেট— এই দুটো ফ্লেভারের আইসক্রিম কিনে ফিরে এল প্রিয়তার কাছে।
আইসক্রিম দুটো প্রিয়তার কোলে রেখে বলল,
“কি বাদরামি করেছিস?”
প্রিয়তা কথায় পাত্তা দিলো না। আইসক্রিমের প্যাকেট খুলে মনের সুখে চকলেট আইসক্রিমটা খেতে লাগল।
কথা বলতে নিয়ে হঠাৎ প্রণয়ের চোখ পড়ল ফ্রন্ট মিররে। লোকের অদ্ভুত চোখে তাকানোর কারণ মুহূর্তেই বুঝে গেল প্রণয়। বউয়ের কল্যাণে আজ তার অর্জিত ইজ্জতের দফা-রফা।
কাল নিশ্চয়ই দেশের প্রথম পত্রের দৈনিক সংবাদের প্রথম পত্রে বড় বড় করে ছাপা হবে— PS Crops এর ওনার আবরার সিকদার প্রণয় সারামুখে ঠোঁটের ছাপ মেখে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়।
বুক চিরে দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল প্রণয়ের।
রুমাল দিয়ে ঠোঁটগুলো উঠাতে নিলেই দায়সারা কণ্ঠে প্রিয়তা বলে উঠল,
“ঘষে ঘষে লাল করে ফেললেও এই ঠোঁটগুলো আমি ভালোবেসে এঁকেছি— ওগুলো অত সহজে উঠবে না।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
শয়তানি হাসি দিল প্রিয়তা। রসিয়ে রসিয়ে ফের বলল,
“আপনার পকেটের পুরো ৩৫ হাজার টাকা মেরে ওই লিপস্টিকটা কিনেছি। যদি সামান্য রুমালের ঘষায় উঠে যায়— তাহলে কি ইজ্জত বাঁচবে?”
কপালের ভাঁজ আরও কুঞ্চিত হলো প্রণয়ের। আবরার সিকদার প্রণয় সামান্য বাচ্চা বউয়ের কাছে হেরে যাবে— ইম্পসিবল। এটা তো হতেই পারে না।
প্রিয়তার হাতের কবজি ধরে হ্যাঁচকা টান দিল প্রণয়।
আইসক্রিমের খেয়ালে ডুবে থাকা প্রিয়তা তাল সামলাতে পারল না। ঝড়ের বেগে মুখ থুবড়ে পড়ল প্রণয়ের প্রশস্ত বুকে।
হাতে থাকা আইসক্রিম গলে গলে টপ টপ করে পড়ছে কনুই বেয়ে।
কোমর চেপে ধরে প্রিয়তার ভাসা ভাসা মনোমুগ্ধকর চোখ দুটোর দিকে তাকাল প্রণয়। বাঁ হাতে আস্তে করে চেপে ধরল প্রিয়তার চোয়াল। গভীর নীলাভ চোখে চোখ রেখে উত্তপ্ত কণ্ঠে বলল,
“তাহলে চল আজ বাজী হয়ে যাক। দেখি কে কার গায়ে কতটা উগ্রতার সাথে ঠোঁট আঁকতে পারে। ব্যথা পাবি বলে নিজেকে কন্ট্রোল করে সবসময় আস্তে করে ধরি। তাহলে চল— আজকে একটু বন্য হওয়া যাক।”
বলতে বলতে প্রিয়তার নরম গলায় শক্ত করে দাঁত বসিয়ে দিল প্রণয়।
শীতল হুমকিতে গল বিল শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল প্রিয়তার। প্রখর তৃষ্ণায় পানির ভীষণ অভাব বোধ করল মেয়েটা। অটোমেটিকালি ঠোঁট ফাঁক হয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এল,
“আহহহ…”
বুকের ওঠানামা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে প্রিয়তার। সে এখন কিছুতেই খেই হারাতে চায় না।
লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে দ্রুত প্রণয়কে নিজের থেকে আলাদা করার চেষ্টা করল প্রিয়তা। কিন্তু তার অতটুকু নরম শরীর কি আর পারে ওই বিশাল দেহী মানুষটার সাথে!
প্রণয়কে আরও গভীরে হারিয়ে যেতে দেখে হাঁসফাঁস করে উঠল প্রিয়তা। প্রণয় পিঠ আঁকড়ে ধরলে শক্ত করে। শরীরের উত্তাপ বাড়ছে, দেহ মনের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ধীরে ধীরে। সীমানা ছাড়ানোর পূর্বেই হার মেনে নিল প্রিয়তা।
অস্ফুট কন্ঠে বলার চেষ্টা করল,
“আ-আ… আমি রিমুভার দিচ্ছি। প্লিজ, এখন না।”
“সরি, জান।”
“প্লিজ প্রণয় ভাই, এক্সাম মিস হয়ে যাবে।”
উদ্দেশ্য যদিও ছিলো প্রিয়তাকে সায়েস্তা করা, কিন্তু স্পর্শের গভীরতায় কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছে প্রণয়। চোখ মুখ চেপে আসছে ভয়াবহ নেশায়।
“প্রণয় ভাই, হুঁশে আসুন।”
হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এল প্রণয়ের। বুকের ভেতর উথলে উঠছে লাভার নদী।
প্রিয়তার ওপর থেকে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে নিল প্রণয়।
গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দিল দ্রুত। শার্টের বোতাম খুলে ভেতরের জ্বলে উঠা আগুন শান্ত করার প্রচেষ্টায়।
ওড়না ঠিক করে উঠে বসল প্রিয়তা। লজ্জায় তাকাতে পারছে না প্রণয়ের দিকে।
তাদের কর্মকাণ্ডে লজ্জায় আইসক্রিম দুটোও গলে পানি পানি হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
প্রিয়তা রিমুভার দিয়ে নিজে হাতে সযত্নে লিপস্টিকের দাগগুলো তুলে দিল প্রণয়ের মুখ থেকে। এই পাগলাটে উন্মাদ লোকটা নিয়ে মহা বিপদে আছে সে।
প্রণয় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল প্রিয়তার দিকে। দু’মিনিট মেয়েটাকে এলোমেলো করে দিয়েছে সে।
প্রণয় কোমর টেনে ফের কাছে টেনে নিল নিজের বাবুই পাখিটাকে। কেমোল ঠোঁট চিরে বেরোনো রক্তটুকু পরম যত্নে মুছে নিতে নিতে বলল,
“ব্যাথা পেয়েছিস খুব?”
“উহু।”
“লিপস্টিক রিমুভার যেহেতু আছে, সেহেতু ধরে নিতে পারি— ওতে আয়না, চিরুনি, টিপ— সবই আছে। বের কর ওগুলো।”
প্রিয়তা চোখের ভারি পল্লব ঝাপটে থাকালো। লজ্জা রাঙানো লাল লাল গাল দুটোতে ভারি সোহাগের ছাপ। প্রিয়তা কিছু বললো না। ব্যাগ থেকে চিরুনি আর এক পাতা কালো টিপ করে দিল প্রণয়ের হাতে।
প্রণয় পুনরায় আদরে গুছিয়ে নিল নিজের ময়না পাখিকে। যত্ন করে ছোট্ট একখান কালো টিপ পরিয়ে দিল দুই ভ্রু এর মাঝে।
প্রিয়তার লজ্জায় মাথা নিচু করলো।
দেখতে দেখতে গাড়ি এসে থামলো নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পার্কিং লট এ। সম্মুখে ঝা চকচকে বিশাল অট্টালিকা ভবন, বিশাল ক্যাম্পাস জুড়ে সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর আনাগোনা।
প্রণয় গাড়ি থেকে নেমে হাত বাড়িয়ে দিল প্রিয়তার সম্মুখে। স্বামীর নির্ভরযোগ্য হাত ধরে নেমে এলো প্রিয়তা।
গাড়ি থেকে নামতেই হাসি হাসি মুখটা মলিন হয়ে গেল প্রিয়তার। প্রচণ্ড হিংসায় জ্বলে গেল মুহূর্তেই।
আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো, উপস্থিত সব মেয়েরাই হাঁটা থামিয়ে দিয়েছে, চুয়াল ঝুলিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার একটা মাত্র স্বামীর দিকে। ভাবখানা এমন যেন জীবনে প্রথম বারের মতো কোনো পুরুষ দেখলো।
আর থাকবে নাই বা কেন—পিএস ক্রপস এর ওনার, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট আবরার সিকদার প্রণয় কে তারা জীবনে প্রথমবারের মতোই তো দেখল। এতদিন তো শুধু ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজে দেখে এসেছে। এতদিনের ক্রাশ কে আচানক সামনাসামনি দেখলে রিএকশন তো এমনই হওয়ার।
তবে প্রণয় এর সেসবের কোনো ধ্যান নেই। সে গাড়ির ডোর লক করে প্রিয়তার মাথায় হাত রেখে ধীরে বললো,
“তোকে যা শিখিয়েছি সব মনে আছে তো তোর? পেপারে সব লিখতে পারবি তো? সারারাস্তা শুধু চুমাচুমি করতে করতে এলি। একটু পড়ে নিলে ও তো পারতি।”
নরম স্বরে বলা কথাগুলো প্রিয়তার কানে ঢুকলো কিনা কে জানে। সে তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত—উপস্থিত মেয়েগুলোর কেউ তার থেকেও বেশি সুন্দরী কিনা, কারো ড্রেসিং সেন্স তার থেকে আপডেট কিনা।
ওকে অন্যমনস্ক দেখে মাথায় আলতো করে গাট্টা মারলো প্রণয়। চাপা রাগ দেখিয়ে বললো,
“কি সব ভং চং ভাবছিস? সব মনে আছে তোর?”
“হ্যাঁ, সব মনে আছে। আপনি এখন এখানেই থাকবেন।”
“হ্যাঁ, তোকে তো সাথে নিয়েই যাবো।”
জবাব শুনে মুখ শুকিয়ে গেল প্রিয়তার। মাথামোটা ব্রেইনলেস লোকটাকে এখন কিভাবে বুঝবে যে আশে পাশের ডাইনি গুলো তার জামাইকে গিলে খাচ্ছে।
না না, জামাইকে এখানে কিছুতেই রাখা যাবে নাহ্।
পেটের ভেতর কথা গুছিয়ে নিয়ে প্রিয়তা বলতে শুরু করলো,
“আপনি কিন্তু—”
অসমাপ্ত বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলো না প্রিয়তা। আচমকা বাহু টেনে ধরে হেঁচকা টানে তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল প্রণয়।
কিছু বুঝে ওঠার পূর্বে চোখের পলকে একটা দ্রুতগামী বুলেট এসে ছিটকে লাগলো কালো গাড়ির কাচে। বুলেটপ্রুফ গাড়ির জানালার তো কিছুই হলো না। তবে এর জায়গায় যদি প্রিয়তা থাকতো—ব্যাপারটা কল্পনা করতেই কলিজা ছ্যাঁত করে উঠলো প্রণয় এর, বুকের রক্ত শুকিয়ে গেল যেন মুহূর্তেই।
সম্ভাব্য অনর্থের ভয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারালো প্রণয়। শক্ত করে বুকপাঁজরে ঝাপটে ধরলো তার প্রাণ পাখিকে।
মুহূর্তের মধ্যেই কি থেকে কি হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারলো না প্রিয়তা। জনবহুল জায়গাটায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো নিমিষেই।
প্রণয় পাগলের মতো প্রিয়তার চোখ মুখে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করতে লাগলো,
“তুই ঠিক আছিস জান? আমার ময়না পাখি, তুই ঠিক আছিস? আমার প্রাণের কোথাও লাগেনি তো?”
প্রিয়তা যেন আজ ভয় পেতে ভুলে গেল। অবাক চোখে চেয়ে দেখলো চিরাচরিত গম্ভীর পুরুষটার সেই অচেনা উন্মাদনা। আজ ওই ভয়ার্ত চোখ দুটোর ভাষা পড়তে অক্ষম নয় প্রিয়তা—শান্ত চোখ দুটোতে আজ তাকে হারানোর প্রবল ভয়।
প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেছে প্রণয়। আসলে পোষা ময়নার যে কতো জ্বালা, যার ময়না আছে কেবল সেই বলতে পারবে।
প্রণয় বুকে মাথা এলিয়ে দিল প্রিয়তা। আস্তে করে বললো,
“শান্ত হোন প্রণয় ভাই। দেখুন ঠিক আছি আমি।”
মানুষ জড়ো হয়ে হট্টগোল বেধে গেল মুহূর্তেই। প্রিন্সিপাল ছুটে এলেন।
প্রণয় পরিস্থিতি শান্ত করে প্রিয়তাকে পাঠিয়ে দিল পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পূর্বে। ললাটে দীর্ঘ চুম্বন এঁকে বললো,
“একদম উল্টাপাল্টা চিন্তা করিস না। ঠান্ডা মাথায় দিস, কেমন। আমি এখানেই আছি।”
হেসে ভেতরে চলে গেল প্রিয়তা।
উপস্থিত সব মানুষ অবাক হয়ে দেখলো আবরার সিকদার প্রণয় এর অবিশ্বাস্য সেই অস্থিরতা, প্রবল হারানোর ভয়। এতদিন যে তারা শুনে আসতো—আবরার সিকদার প্রণয় এর কোনো দুর্বলতা নেই, সে কারো পরোয়া করে না। তাহলে এই মেয়েটা কে কি হয় প্রণয় শিকদারের? আর এত ভালোবাসা মেয়েটার জন্য—বিস্ময়ে সকলের অন্ত রইলো না।
গুলিটা তবে ছুঁড়লো কে? আবরার সিকদার প্রণয় এর কোনো শত্রু নিশ্চয়ই।
“জাভেদ।”
“ইয়েস স্যার।”
এনএসইউ এর গেট এর বাহিরে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয়। চোখ দুটো ভয়াবহ লাল, মুখটা বীভৎস।
মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধে কাঁপছে প্রণয়। ঘাড় ও কপালে শিরা ফুলে দৃশ্যমান হচ্ছে ধীরে ধীরে। তবে অবয়বে শান্ত।
কণ্ঠস্বরে এক হিমেল শীতলতা। জাভেদ কে উদ্দেশ্য করে ঠান্ডা কণ্ঠে আদেশ ছুড়লো প্রণয়,
“জাস্ট ১০ মিনিটের মধ্যে ভাটারা থানা আমার খালি চাই। রিমেম্বার—জাস্ট ১০ মিনিট। ১০ মিনিটটা যদি ১১ মিনিটে যায়, তবে আজকেই হবে তোমার জীবনের শেষ দিন। মাইন্ড ইট।”
বলেই খট করে ফোন কেটে দিল প্রণয়। জাভেদকে হ্যাঁ হুঁ না কিছু বলারই কোনো ফুরসত দিলো না।
তার চোখ-মুখের সাবলীল রঙটা পাল্টাচ্ছে খুব দ্রুত।
যেমন কথা তেমন কাজ। ১০ মিনিটের মধ্যেই থানা চত্বর একদম ফাঁকা হয়ে গেল। পুলিশ তো কথা, একটা কাক-পক্ষীরও অস্তিত্ব নেই সেথায়।
এর মিনিট দুই একের মধ্যেই কালো পোশাক পরিহিত সুঠাম দেহী কিছু গার্ডস তিনজন লোককে হিড়হিড় করে টানতে টানতে এনে ছুঁড়ে মারলো অন্ধকার লকাপে।
লোক তিনটার চোখ-মুখ মৃত্যু ভয়ে নীলচে বর্ণ করেছে। তারা গার্ডদের হাতে-পায়ে ধরে গড়াগড়ি খেয়ে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো, জোর হস্তে প্রাণের ভিক্ষা চাইতে লাগলো। কিন্তু বিশাল দেহী লোকগুলো একদম নিশ্চুপ—যেন তারা মানুষ নয়, কোনো যন্ত্র, কারো দম দেওয়া পুতুল।
জাভেদ দূরে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত চোখে ভয় ভয় তাকাচ্ছে লোক দুটোর দিকে। এদের পরিণতি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই জাভেদের। তবে সে সঠিক বুঝতে পারছে না যে এই মদন দুটো আসলে কি এমন করেছে যার জন্য স্যার এত রেগে গেল। এদের আয়ু যে আজ এখানেই শেষ হতে চলেছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু কী পদ্ধতিতে মরতে চলেছে, সেটাই দেখার বিষয়।
ভাবনার মধ্যেই আচমকা বিশাল একটা ছায়া পড়লো দরজায়। আঁতকে উঠে তাকালো জাভেদ। হিংস্র মুখের শান্ত অবয়বটা দেখে রুহ কেঁপে উঠলো তার। দেখতে দেখতে ৯টা বছর পেরিয়ে গেছে, আজও সে এই মানুষটার সহিংসতার সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি।
প্রণয় শান্ত। একজন গার্ড এসে নিরবে লকআপের তালা খুলে দিল।
হিমেল কণ্ঠে ডেকে উঠলো প্রণয়,
“জাভেদ।”
চমকে ফিরে চাইলো জাভেদ। লাফিয়ে পৌঁছে গেল প্রণয় এর নিকট।
“ইয়েস স্যার।”
প্রণয়ের ছোট্ট আদেশ,
“কাম।”
বিশেষ জিনিসপত্রের অর্ডার ছুঁড়ে দিয়ে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার লকআপে ঢুকে পড়লো প্রণয়। ভয়ে ভয়ে পিছু নিলো জাভেদ।
অন্ধকারাচ্ছন্ন লকআপের ভেতর ভেজা ভেজা ভ্যাপসা দুর্গন্ধ। কেবল মাথার ওপর টিমটিম করে জ্বলছে একটা ক্ষীণ পাওয়ারের হলুদ আলো।
ওইটুকু ঝাপসা আলোয় প্রণয় এর তখনকার সুদর্শন মুখটা কী ভয়ানক বীভৎস দেখাচ্ছে এখন। যেন রক্তপিপাসু কোনো দানব। মুখের হাড়ের সাথে লেগে থাকা টানটান মাংসের ভয়াবহ আদল দেখে লোক তিনটার হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল লাফিয়ে।
কিছু না করতেই হাত-পা মচকে প্যানিক অ্যাটাক এসে গেল। তারা প্রাণভিক্ষা চাইতেও ভুলে গেল তীব্র ভয়ে। কার কলিজা ধরে টান দিতে যাচ্ছে জেনেও দুঃসাহস দেখিয়েছিল—এর নিষ্ঠুর পরিণাম তো ভুগতেই হবে।
প্রণয় ভেতরে প্রবেশ করতেই তার হাতের কাছে সকল যন্ত্রপাতি এনে উপস্থিত করলো গার্ডরা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—দড়ি, রেত, অ্যাসিড, রড, কাঁচি, নাইফ, রেজার ব্লেড, সিজার, ছুরি ইত্যাদি।
ঝকঝকে শার্প করা টুলসগুলো দেখতেই গা শিউরে উঠলো জাভেদের।
প্রণয় ঘাড় বাঁকিয়ে বীভৎস এক ঠান্ডা হাসি দিল। চোখ-মুখে লেগে থাকা নির্মম নিষ্ঠুরতা টুকু দেখে তারা বুঝতে গেল—প্রাণের ভিক্ষা চাওয়া নিরর্থক।
প্রণয় চেয়ার টেনে পায়ের ওপর পা তুলে বসলো লোকগুলোর সামনে। চুলে আঙুল চালিয়ে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে বললো,
“বাবা, সাহস তো বলিহাড়ি! তা কী নাম বাচ্চাদের?”
এমন প্রশ্নে লোক দুটো ভড়কালো। একজন তো প্যান্ট নষ্ট করে দিল এমন ঠান্ডা আচরণে।
লোক দুটো চেষ্টা করলো, তবে গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে পারলো না। অবস্থা অবলোকন করে হাসলো প্রণয়। থুতনি চুলকে বললো,
“চিনিস আমায়?”
“এ-এ-এস-আর।”
“হুম। তাহলে জানতিস? ভালো ভালো যে পাঠিয়েছে, বলেই পাঠিয়েছে।
রাইট?
তোদের কলিজার সাহস দেখে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
প্রশংসার দাবি রাখে তোদের সাহস।
এমন কলিজা থাকলে প্রশান্ত মহাসাগর সাঁতরে পারি দেওয়া যাবে।”
লোক দুটো কম্পিত চোখে তাকালো।
প্রণয় স্থির থেকে বললো,
“কিছুক্ষণ আগে কাকে গানপয়েন্ট করেছিলি জানিস? ওর কিছু হয়ে গেলে আমার কী হতো জানিস?”
এমন ঠান্ডা আচরণ দেখে লোক দুটো সিঁটিয়ে গেল।
প্রণয়ের চোখের ইশারা পেতেই একটা গার্ড এসে লোক দুটোর মধ্যে থেকে একটাকে টেনে আলাদা করলো। মোটা মোটা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধলো বোবার মতো ছটফট করা উষ্ণ লোকটা।
প্রণয় ফের ঠান্ডা মেজাজে বললো,
“এই যে দেখছিস—তোদের সামনে বসে আছি। তোদের মৃত্যু দূত। বিশ্বাস কর, তোদের একটু ও মারতাম না যদি না আমার দুর্বলতাকে গানপয়েন্ট না করতি।
তোরা আমাকে গানপয়েন্ট করতি, একের পর এক বুলেটে ঝাঝরা করে দিতে আমার হৃদপিণ্ড।
আমার জানকে নিশানা না করে যদি আমার বুক বরাবর নিশানা লাগাতি—বিশ্বাস কর, একটু ও তোদের খুঁজতাম না। মারা তো দূরের কথা।
কিন্তু তোরা কী করলি? জেনে-শুনে আমার সেই জায়গায় আঘাত করলি—যেটা আমার শরীরের সবথেকে নরম জায়গা। যে জায়গাটায় আমি দুর্বল। যে জায়গায় আঘাত করলে আমি আমার বাপকেও ছাড়বো না।
তোদের এমন কঠিন মৃত্যু দেবো যে মৃত্যুর পর তোদের রুহগুলোও তোদের দেহ সনাক্ত করতে পারবে না।
আহত বাঘ একবার তাকে ছেড়ে দেয় যে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাকে কোনোদিনও ছাড়ে না যে তার শাবকের ক্ষতি করার চেষ্টা করে।”
“স্যার, স্যার, দয়া করে আমাকে মারবেন না। দয়া করে।”
বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো প্রণয়। নিচে ফেলে রাখা টুলসগুলো টেনে লম্বা গরম লোহার রড টেনে হাতে তুলে নিল। লোকটা কথা সম্পন্ন করার পূর্বেই চোখের মণি বরাবর ঢুকিয়ে দিল। ঠোঁটে তার নৃশংস হাসি।
কলিজা লাফিয়ে উঠলো জাভেদের।
মরণ যন্ত্রণায় শরীরের সর্বশক্তি উজাড় করে চিৎকার দিয়ে উঠলো লোকটা। তার আর্তনাদ-মিশ্রিত শব্দগুলো জেলের চার দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো বারবার।
প্রণয় পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে জাভেদকে ডাকলো,
“জাভেদ।”
“জ-জি স্যার।”
“ওপেন ক্যামেরা অ্যান্ড রেকর্ড দ্য ভিডিও।”
আদেশ শুনে চোখ বড় বড় হয়ে গেল জাভেদের। কণ্ঠ দিয়ে আপনা আপনি বেরিয়ে এলো,
“ক-ক-কিন্তু স্যার—”
রক্ত লাল চোখে তাকালো প্রণয়। আর কিছু বলার সাহস হলো না জাভেদের। কাঁপা হাতে প্রণয় এর ফোনটা নিয়ে ভিডিও করতে লাগলো।
লোকটা আবারো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রডটা টেনে বের করে অন্য চোখে ঢুকিয়ে দিল প্রণয়।
হাতে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠলো জাভেদের।
আকস্মিক ব্যথায় আবার আসমান-জমিন এক করে চিৎকার দিয়ে উঠলো লোকটা। দুই চোখ বেয়ে ঝরনার ধারার মতো রক্তের প্রপাত ছুটেছে।
পাশে বেঁধে রাখা লোকটা জ্ঞান হারালো এসব দেখে।
প্রণয় ভয়ানক কণ্ঠে হুংকার দিয়ে বললো,
“আমার জানের দিকে, আমার পবিত্র ফুলের দিকে যে যে জানোয়ারের বাচ্চা বেজর্মা জারজ নজর দেবে—সেই নজর দেওয়া চোখ দুটো জ্যান্ত উপড়ে নেবে আবরার সিকদার প্রণয়।”
বলে রামদা তুলে লোকটার হাত বরাবর সজোরে কোপ দিল। রক্ত ছিটকে এসে লাগলো মুখে।
এক কোপেই শরীর থেকে আলাদা হয়ে হাতটা ছয় হাত দূরে গিয়ে পড়লো।
পুনরায় গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠলো লোকটা। পরপর কোপে হাত-পা সবই আলাদা করে দিল প্রণয়। লোকটা গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগলো।
তার মুখ দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না—কেবল গুঙানি। সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠছে প্রণয়।
পায়ের নিচে ফেলে জ্যান্ত জবাই করে দিলো। অন্য লোকটার ঘাড় চেপে ধরে জবরদস্তি অ্যাসিডের ড্রামে চুবিয়ে দিলো।
তবে চিৎকার করতে দিলো না লোকটাকে। মুখে কাপড় ঠেসে ভরে দিল।
অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধে উন্মাদ হয়ে উঠলো প্রণয়।
উঁচু কাঠের পাটাতনে শুইয়ে বিসমিল্লাহ বলে এক কোপে হালাল করে দিলো এই লোকটাকেও। এক নিমেষে সব ছটফটানি শান্ত হয়ে গেল।
লোক দুটোর রক্তে পুরো জেলের মেঝে ঢেকে গেছে।
রামদা ছুঁড়ে ফেলে মাংস কাটার চাপাতি হাতে নিল প্রণয়। নিজের হাতে মাংস কিমা করার মতো করে প্রথম লোকটার শরীরকে ছোট ছোট পিসে ১১০০ পিসে করলো।
মাংস কাটতে কাটতে ঘেমে গেছে প্রণয়। হাত দুটো শুকনো রক্তে চ্যাট চ্যাট করছে। শার্টের হাতায় কপালের ঘামটুকু মুছে নিয়ে অন্য লোকটাকে ধরলো। তবে অজ্ঞান অবস্থায় মারলো না—এএসআর ডিকশনারিতে সহজ মৃত্যু নেই।
লোকটার জ্ঞান দিয়ে একই পদ্ধতিতে মারলো। পুনরায় ১১০০ পিসে করলো।
ঘামের সাথে মিলিত তাজা রক্তের ঘ্রাণে কেমন নেশা নেশা লাগছে প্রণয় এর মাথায়। খুন চেপে ছিল যেন এতক্ষণ।
জাভেদ ভয়ে পুরো ফ্রিজ হয়ে গেছে। তার পা পর্যন্ত গড়িয়ে এসেছে রক্তের ঢেউ। ফোনে রেকর্ডিং চলছে ৫০ মিনিটের একটি নৃশংস ভিডিও।
প্রণয় বসা থেকে উঠে পড়লো। হাত বাড়াতেই টিস্যু এগিয়ে দিল গার্ড। মাথা এখন পুরো ঠান্ডা।
প্রণয় টিস্যুতে হাতের রক্ত মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো জাভেদ এর নিকট। ভয়ে হাঁটু কেঁপছে জাভেদের।
মুচকি হাসলো প্রণয়। কাঁধ চাপড়ে বললো,
“গুড জব। ভিডিওটা সেন্ড দাও। জানো তো কাকে করতে হবে।”
বলে বেরিয়ে গেল প্রণয়।
তব্ধা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো জাভেদ। এত নৃশংস হত্যার পরও কোনো মানুষ কিভাবে হাসতে পারে—বুঝে আসে না জাভেদের। তবে এসব দৃশ্য নতুন নয়। তবুও সে অভ্যস্ত হতে পারে না এসবে।
ঠিক আছে। একটাও শব্দ পরিবর্তন করা হয়নি।
শুধু—
টানা তিন ঘণ্টার পরীক্ষা শেষে ফুরফুরে মনে বেরিয়েছে প্রিয়তা। সারাবছর না পড়েও যে এমন দুর্দান্ত আনসার করা যায়—তা তনয়া সিকদার প্রিয়তাকে না দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না।
অন্যরা সারাবছর না পড়লেও ফাটিয়ে আনসার করতে পারবে কেবল নকল করার সুযোগ পেলে। কিন্তু ওসব ছোটলোকি কাজকারবারের প্রয়োজন পড়ে না প্রিয়তার। কারণ ঘরে তার আইনস্টাইনের মগজওয়ালা দুর্দান্ত সুদর্শন স্বামী আছে। যা কমন দিয়েছে—তার ওপরেই পেপার এসেছে।
আরও একটা কারণে সাংঘাতিক খুশি প্রিয়তা। প্রায় ছয় ছয়টা মাস পর আবারও সেই প্রিয় বন্ধুর দেখা পেয়েছে।
প্রিয়তার এমন রোদ্দুর-ঝলমলে হাসি দেখে অবাক না হয়ে পারছে না অন্যতমা।
চার চারটা বছর যে মেয়েটাকে হাসানোর জন্য প্রাণপাত করেছে অন্যতমা—তবুও হাসেনি মেয়েটা। আজ সেই মেয়েটার ঠোঁট থেকে হাসি সরছেই না।
“কি রে, ওভাবে কি দেখিস? আমি কি বেশি সুন্দর হয়ে গেছি?”
“যাই হোক, তুই বাংলাদেশে এসেছিস আর আমাকে একটাবার ফোন করিসনি পর্যন্ত। ভেরি ব্যাড।”
দৃষ্টি সরিয়ে মুখ বাঁকালো অন্যতমা। ঝাড়া মেরে হাত ছাড়িয়ে বললো,
“তুই তো আর কথাই বলিস না। হঠাৎ করে কর্পূরের মতো উবে গেলি।”
“টেক্সট এর পর টেক্সট দিতাম, কোনো রিপ্লাই করতি না। ফোন দিলেও আনসার করতি না। দিনের পর দিন তোর জন্য অপেক্ষা করতাম, কিন্তু তুই আসতি না। তারপর একদিন জানলাম তুই নাকি কাউকে কিছু না বলে বিডি চলে এসেছিস।”
প্রিয়তা মন খারাপ করলো না। অন্যতমার হাত শক্ত করে ধরে বললো,
“অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। বলবো তোকে কোনো একদিন।”
“সে ঠিক আছে। কিন্তু চির শ্রাবণের দেশে রোদ্দুর উঠলো কিভাবে? গল্পের পরের অংশ পরে বলবি বলে তো হারিয়ে গেলি। আজ পেয়েছি, আজ বল।”
প্রশ্ন শুনে খানিক থমকালো প্রিয়তা। অতীত জীবনের সেই অভিশপ্ত দিনগুলোকে সে কিছুতেই মনে করতে চায় না। নো নেভার।
“কিরে, বল।”
প্রিয়তা ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। কথা কাটাতে বললো,
“ধুর, কি হবে ওসব পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে। আমি ওসবের কিছুই মনে রাখিনি। তাও যখন এত করে জানতে চাচ্ছিস, চল তোকে এক বাক্যে উত্তর দেই।”
ভ্রু কুঁচকে গেল অন্যতমা। এত বড় কাহিনী এক বাক্যে কিভাবে বলবে।
“কেমনে পসিবল?”
“চল, দেখাচ্ছি।”
দুজন গল্প করতে করতে চলে এসেছে ইউনিভার্সিটির পার্কিং লট এ।
গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ফোন টিপছে প্রণয়। চোখে কালো সানগ্লাস, হাতের কবজিতে চকচকে রোলেক্স ব্র্যান্ডের ঘড়ি। কালো শার্টের হাতা গুটিয়ে কনুই অবধি।
ব্ল্যাক ফরমাল শার্টের সাথে ফুল ব্ল্যাক ফরমাল প্যান্টে তাকে দেখাচ্ছে স্বপ্ননগরের কোনো এক কল্পিত সুপুরুষ।
তার সুনিপুণ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রল করার ঢংটাও কেমন অভাবনীয়। দেখা মাত্রই মন হারাতে বাধ্য হবে যেকোনো তরুণী।
প্রিয়তার সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ কথা বন্ধ হয়ে গেল অন্যতমার। পার্কিং লট এ পা রাখা মাত্রই জীবনের সব থেকে বড় ক্রাশটা সবে সবে খেয়ে বসলো বেচারি।
“প্রণয় ভাইইইইই!”
বেশ খানিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাকলো প্রিয়তা।
ফোন থেকে চোখ উঠিয়ে সামনে তাকালো প্রণয়। প্রাণ পাখিটাকে দেখা মাত্রই ঠোঁটে ফুটে উঠলো বিস্তর হাসি।
প্রণয়কে দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো প্রিয়তা। অন্যতমাকে ফেলে দৌঁড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো প্রণয়ের বুকে।
তৃপ্ত হেসে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল প্রণয়। আদুরে কণ্ঠে সুধালো,
“পরীক্ষা ভালো হয়েছে ময়না পাখি?”
প্রিয়তা ওপর-নিচ হ্যাঁ সূচক মাথা দুলালো।
“ভেরি গুড।”
এসব দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে গেল অন্যতমা। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
কানাডায় থাকা কালীন ১০০০-১০০০ ছেলের প্রেম প্রস্তাব রিজেক্ট করেছে যে মেয়েটা, এমনকি ছেলেদের সাথে কথা পর্যন্ত বলতো না যে মেয়েটা—সে কোনো পুরুষের এত কাছে দাঁড়িয়ে আছে, আবার হেসে হেসে কথাও বলছে।
এসব দেখে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম অন্যতমার।
প্রিয়তা অন্যতমার দিকে ফিরে বললো,
“কিরে, তুই ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এদিকে আয়।”
নির্বোধের মতো এগিয়ে গেল অন্যতমা।
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো। প্রশ্ন করার পূর্বেই প্রিয়তা বললো,
“ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।”
অন্যতমা হাঁ করে তাকিয়ে আছে প্রণয়ের মুখের দিকে। এত লম্বা ছেলেটা, তপ্ত রোদে চেহারা দেখতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও হাঁ করে গিলছে অন্যতমা।
“উনি আমার প্রণয় ভাই, অন্যতমা—আমার পৃথিবী, আমার স্বামী, আমার সবকিছু।”
প্রিয়তার কথা শুনে মনে আকাশের রঙিন বেলুনটা ফাট্টাহ করে ফেটে গেল অন্যতমার। মাত্র মাত্র প্রেমে পড়ে নগদে ছ্যাঁকা খেয়ে গেল মেয়েটা।
মুখ ঘুরিয়ে অবাক চোখে তাকালো প্রিয়তার দিকে, যেন চোখের ইশারায় জানতে চাইলো—সত্যি?
মাথা নাড়িয়ে পুনরায় সম্মতি জানালো প্রিয়তা।
অন্যতমা মুগ্ধ চোখে তাকালো প্রণয়ের দিকে। এই মানুষটার আদর-যত্ন আর ভালোবাসা সম্বন্ধে কত শুনেছে অন্যতমা। সেই মানুষটা সুন্দর জানতো, কিন্তু এতটা সুন্দর হবে কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করেনি।
সারা বিকেল ঘুরে প্রিয়তাকে নিয়ে বাসায় ফিরলো প্রণয়।
রাত ১০ টায় তুরস্কের ফ্লাইট। প্রিয়তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করেছে প্রণয়, হাজারটা শর্ত দিয়ে। অবশেষে রাজি হয়েছে প্রিয়তা।
মুখ গোমড়া করে বাড়ির পার্কিং এরিয়ায় দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়তা। ভাসা ভাসা চোখ দুটোতে ঘোর আপত্তি, হাত দুটো শক্ত করে ধরে রেখেছে তার প্রণয় ভাইকে।
অসহায়ত্ব অনুভব করল প্রণয়। এক হাত মাথার পেছনে রেখে ললাটে দীর্ঘ চুম্বন আঁকলো প্রিয়তমার। দুই গালে হাত রেখে নরম গলায় বলল,
“আমি দ্রুত ফিরে আসব, জান।”
“না গেলে হয় না?” চোখে পানি চলে এলো প্রিয়তার।
প্রণয় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বুকে টেনে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমি যাব আর আসব। আমি আমার জানকে কথা দিয়ে যাচ্ছি তো। আমি কি আমার জানকে ছাড়া থাকতে পারি?”
বুকে মাথা রেখে দুই হাতে পেট জড়িয়ে ধরল প্রিয়তা। গাল ফুলিয়ে বলল,
“আমি ফোন করার সাথে সাথেই ফোন তুলবেন, তাড়াতাড়ি আসবেন আর কোনো মেয়ের দিকে তাকাবেন না।”
হাসি পেলো প্রণয়ের, তবুও ও হাসল না।
ফের প্রিয়তার কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, তাহলে আসি জান।”
প্রণয় যেতে ধরলে প্রিয়তা আবার হাত টেনে ধরল। কান্না-মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“মিস করব অনেক।”
ছুটে এসে বুকে নিলো প্রণয়।
“ইস, আমার জানটা আবার কাঁদে কেন? এই চোখে পানি দেখে কি যেতে মন চাইবে?”
“আর কাঁদব না। একটু নিচু হন।”
“কেন?”
“এত প্রশ্ন করেন কেন! নিজে তো তালগাছের মতো লম্বা, মাথা নিচু করেন।”
অগত্যা আর বাক্য ব্যয় করল না প্রণয়। মাথা নিচু করে দিল।
প্রণয়ের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তা। মাথার চুল টেনে আরও নিচে নামালো। দুই গালে হাত রেখে পুরুষালি চওড়া কপালে চুমু আঁকলো শব্দ করে।
হাসল প্রণয়।
গালে আর ঠোঁটেও চুমু আঁকলো প্রিয়তা। অতঃপর চুলগুলো পুনরায় ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
“সাবধানে যাবেন।”
“আচ্ছা, এবার যাই তাহলে, ম্যাডাম।”
“হুমম।”
“টাটা।”
প্রণয় টাটা দিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। সিট বেল্ট লাগিয়ে পাশে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকালো।
“একি! তুই এখানে!”
মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটল শুদ্ধর। প্রিয়তার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে চাইল প্রণয়ের দিকে। বিরক্তি নিয়ে বলল,
“এত এক্সপ্রেশন দেওয়ার কী আছে?”
কপালের সূক্ষ্ম ভাঁজ আরও দৃঢ় হলো প্রণয়ের। ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,
“কোথায় যাবি?”
“তুই যেখানে যাবি, সেখানে।”
“তুই জানিস আমি কোথায় যাব?”
“হ্যাঁ।”
আর কোনো প্রশ্ন করল না প্রণয়। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল শিকদার বাড়ির সীমানার বাইরে।
চুপচাপ ড্রাইভ করছে প্রণয়। পাশে বসে নেক্সট ওয়ান উইকের সব শিডিউল ক্যানসেল করছে শুদ্ধ।
প্রণয় হঠাৎ বলে উঠল,
“একটা ছোট্ট মেয়ের আবেগের সাথে এমন নিখুঁত অভিনয় করা কি ঠিক হচ্ছে? বেইমানি জিনিসটা তোর সাথে যায় না। এসবের কিন্তু কোনো দরকার ছিল না। ভালো যেহেতু বাসিস না, তাহলে বিয়েটা না করলেও পারতি।”
কল কেটে চোখ সরু করে তাকালো শুদ্ধ।
প্রণয় ফের বলল,
“এখনও সময় আছে। এসব বাদ দে। শুধু মাত্র উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমার বোনকে এভাবে ব্যবহার করিস না। ভালো না বাসলে ছেড়ে দে।”
বিচলিত হলো না শুদ্ধ। সামনের পানে দৃষ্টি রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“এখানে আমি কাউকে ব্যবহার করছি না। পুরো ব্যাপারটাই একটা অঘোষিত সমঝোতা বা ডিল। প্রিয়স্মিতা আমাকে বিয়ে করেছে নিজের স্বার্থে, আমি প্রিয়স্মিতাকে বিয়ে করেছি নিজের স্বার্থে। হিসাব বরাবর। এখানে কেউ কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না।”
“তারও নিজের স্বার্থে শিকদার বাড়ির সবার বিশ্বাস অর্জন করতে হতো। আমাকেও নিজের স্বার্থে তার বিশ্বাস অর্জন করতে হতো। আর তুই তো জানিস—আমি আমার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যা কিছু করতে পারি।”
“কিন্তু এসব করে তোর স্বার্থটা কোথায়? এছাড়া সব মিথ্যে হলেও মেয়েটার ভালোবাসা কিন্তু মিথ্যে নয়। কিন্তু তোর দিক থেকে তো—”
“ফাক ইউর লাভ। স্বার্থ তো আছেই। বিরাট বড় স্বার্থ আছে। এটা আমার জীবন-মরণের প্রশ্ন। ওকে আমি কিছুতেই ওর লক্ষ্যে সফল হতে দেব না।”
“তোর স্বার্থ সম্বন্ধে আমি জানতে চাই না। শুধু বলব—কোনো কিছু করেই ভবিতব্যকে আটকাতে পারবি না। যা হওয়ার তা নিশ্চয়ই হবে। হয়তো মাঝে একটু ঝামেলা হবে, কিন্তু যা অবধারিত তা তো হবেই।”
শুদ্ধর ভেতর নড়ে উঠল, তবে মুখাবয়ব শান্ত। মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল—
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮০
প্রাণ থাকতে এমনটা হতে দেব না। আমার নিজের জন্য হলেও তোকে আমায় বাঁচাতেই হবে। তুমি মরলে আমার জানও মরে যাবে, আর তার কিছু হলে আমিও মরে যাব। তোর সাথে আমাদের জীবন জড়িয়ে আছে। তোকে তো বাঁচতেই হবে।
