প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৯
সাইদা মুন
তালহার কণ্ঠস্বর কানে যেতেই দু’জন একসাথে পেছন ফিরে তাকায়। মেহরীন এক চোখে হাত রেখেই অন্য চোখে পিটপিট করে তাকায় তার দিকে। তালহার সেই শক্ত, কঠিন মুখভঙ্গিটা দেখে বুকের ভেতর হঠাৎ ঠক করে ওঠে। নিঃশব্দে ঢোক গিলে নেয় সে। তালহাকে এমন রাগান্বিত দেখলে কেন জানি তার ভেতরটা কেমন কুঁকড়ে যায়। মনে হয় নিজের করা সব ভুল, সব কুকর্ম যেন একে একে চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মাথায় ঘুরছে হাজারটা ভাবনা, আবার কি এমন করলাম? কিছু আন্দাজ করল নাকি? না কি চিঠির ব্যাপারটা জেনে ফেলেছে সে…!
এইসব ভাবনার ভেতরেই তালহা ধীর পায়ে আরও দু’কদম এগিয়ে আসে। তাহসান তখন পকেটে হাত গুঁজে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে। ঠোঁটের কোনে একফোঁটা শয়তানি হাসি খেলে যায়, যেন ইচ্ছে করেই আগুনে ঘি ঢালছে সে। তালহার চোয়াল টানটান হয়ে ওঠল, নিঃশ্বাস তখন ভারী হয়। এরপর হঠাৎই তার দৃষ্টি ঘুরে যায় মেহরীনের দিকে, চোখে কঠোরতা।
–প্রশ্ন করেছি?
মেহরীন হালকা কেঁপে উঠে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝায়। তাতে যেন তালহার রাগ আরও একধাপ বেড়ে যায়। দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,
— মুখে কি ঠুসা পড়েছে?
মেহরীন মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় সঙ্গে সঙ্গে বলে,
—হ..হ্যাঁ, প্রশ্ন করেছেন।
—তো উত্তর কোথায়?
মেহরীন তোতলাতে তোতলাতে বলে,
—চ..চোখে চোখে।
তার কথা শুনে তালহার কপাল কুচঁকে যায়।
—উত্তর চোখে মানে?
মেহরীন চমকে উঠে, নিজের বলার ভুল বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—না না মানে.. আমাকে তাহসান ভাইয়া ডেকেছিলেন…
বাক্য শেষ হওয়ার আগেই তালহার কর্কশ কণ্ঠ বাজে,
— ভাইয়া নয়, স্যার হবে স্যার। টিচাররা মা-বাবার সমান, এটা মনে রাখবে।
তালহার কথার সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন তাড়াতাড়ি মাথা ঝাঁকায়। একবার তাহসানের দিকে তাকাতেই তার তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি তালহার চোখে এসে লাগে। কিন্তু সে তা উপেক্ষা করে নিচু গলায় বলল,
—তারপর?
তালহার প্রশ্নে মেহরীনের মাথা যেন ঘুরে ওঠে। এক্ষুনি কি বলছিল, সেটাই যেন ভুলে গেছে। মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
—তারপর.. তারপর..
কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ে না। মনে হয় মাথার ভেতর সব এলোমেলো হয়ে গেছে। নিজেকে নিজেরই ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করছে। তালহার সামনে দাঁড়ালেই যেন সব ভুলে যায়, ভয়ে নাকি অন্য ধ্যানে, আল্লাহই জানে। তাকে এভাবে আমতা আমতা করতে দেখে তালহা শার্টের হাতার বোতাম খুলতে খুলতে কর্কশ স্বরে বলে ওঠল,
—তাহসান ডেকেছিল, দ্যান? কন্টিনিউ করো…
মেহরীন বিস্ফারিত চোখে তাকায়। তালহা কি তবে তার মনের কথা পড়ে ফেলেছে? সে যে ভুলে গিয়েছে, তা বুঝে গেছে বুঝি। চোরামনে একরাশ ভয় ভেসে ওঠে। না, না… তালহা যদি আর একটাও কথা শুনে ফেলে, তবে সর্বনাশ। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
–তারপর আমি এখানে এসেছি আর আমাকে সাদা কাগ…
বাকিটুকু বলার আগেই গলা আটকে গেল তার। কি বলতে যাচ্ছিল। আথায় আসতেই মনে মনে বলে উঠল,
–এইরে! এখনই তো মুখ ফসকে বলে ফেলতাম। কাগজ বললেই তো দেখতে চাইবে শিওর, আর দেখে ফেললে ধমকের সঙ্গে থাপ্পড় ফ্রী পাবো। না না, এইটা বলা একদমই যাবে না।
ভয়ে ভয়ে তাহসানের দিকে তাকাতেই তাহসান আলতো হেসে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। শান্ত গলায় বলল,
–আমি ডেকেছিলাম আগের ইয়ারের ইংলিশ কুয়েশ্চনটা দিতে। তাহিয়া-মেহরীনের কাজে লাগবে তাই।
তাহসানের এই কথায় তালহা যেন আরও অসন্তুষ্ট হয়ে উঠল। এক ঝটকায় মেহরীনের হাত থেকে কাগজটা ছিনিয়ে নিল সে। মেহরীন ভীতু চোখে চেয়ে আছে তালহার হাতে ধরা কাগজটার দিকে। “যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়” প্রবাদটার অর্থ আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে। মনে মনে শুধু দোয়া করছে,
–আল্লাহ, তুমি দয়া করো… যেন কিছু না পড়ে, কাগজটা ফেরত দেয় আল্লাহ…!
তালহার হাতে কাগজটা দেখে প্রথমে কিছু বলার চেষ্টা করলেও, পরে থেমে গেল তাহসান। ঠোঁটে হালকা এক মুচকি হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে হেসে উঠল সে,
–মেঘ না চাইতেই জল! বাহ, ভেরি গুড তালহা। এতোদিনে একটা ঠিকঠাক কাজ করলি। এবার আরামসে চিঠিটা পড়ে নে, আর আমাদের রাস্তার কাঁটা না হয়ে সরে যা।
–হ্যা, তারপর? একটু আগে কি করছিলে?
তালহা কড়া চোখে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল মেহরীনের দিকে। তার দৃষ্টির সামনে পড়ে মেহরীন একটু থমকে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
–আমার চোখে কি যেন পড়েছিল, তাকাতে পারছিলাম না। তাই তাহসান ভা…স্যার ফুঁ দিয়ে দিচ্ছিল।
কথাটা শেষ হতেই তালহার চোখের দৃষ্টি আরও গাঢ় হয়ে উঠল। একপলকে তাহসানের দিকে কটমটে চোখে তাকিয়ে, পরের মুহূর্তেই মেহরীনের সামনে এসে দাঁড়াল সে। হঠাৎ এত কাছে তালহাকে দেখে মেহরীনের বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল। হৃদস্পন্দন যেন স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বেগে চলছে। হঠাৎই গরম লাগতে শুরু করল, যেন আশেপাশের বাতাসও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
বেশ কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে তালহা ধীরে ধীরে তার হাত বাড়িয়ে মেহরীনের চোখের উপর থেকে হাতটা সরিয়ে দিল। তারপর দুই আঙুলের ফাঁকে তার লম্বা পাপড়িগুলো নিয়ে চেপে ধরল, একটু পেছনে এনে টান দিয়ে ছেড়ে দিল।
–এবার তাকাও, চোখে এখনো কিছু লাগছে কিনা দেখো।
মেহরীন তড়িঘড়ি চোখ এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। না, একদম ঠিক আছে। কোনো গুতা নেই, কোনো জ্বালাও নেই। মনে মনে হেসে উঠল সে। আরে, তার তালহা তো একেবারে থ্রি ইন ওয়ান, বিজনেসম্যান, টিচার, এখন আবার ডাক্তারও। আহা, কী ভাগ্য আমার। ভালোই হলো, বাইরে আর যেতে হবেনা, নিজের জামাই-ই চিকিৎসা করে দিবে। নানা ভাবনা ভাবতে লাগে সে। এই ভাবনায় নিজের মনেই খুশিতে ফেটে পড়ছে। দ্রুত খুশি মনে বলল,
–আর লাগছে না, একদম ঠিক হয়ে গেছে।
শুনতেই তালহা ঘরের দিকে হাঁটা দিল। মেহরীন তার পেছনে তাকিয়ে রইল খুশি চোখে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। কিন্তু পরক্ষণেই যেন কিছু মনে পড়ে দ্রুত পায়ে নিচের দিকে নামতে গেল সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে তাহসানের কণ্ঠ ভেসে এলো,
–তুমি কি কফি বানাতে যাচ্ছো?
মেহরীন পেছন ফিরে বলল,
–জ্বী, আপনিও খাবেন?
তাহসান হালকা হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই মেহরীন নিচে নেমে এলো। রান্নাঘরের দরজার কাছে পৌঁছাতেই তালহার ছোট চাচির মুখোমুখি হলো। তাকে রান্নাঘরে দেখে চাচি ভ্রু কুঁচকে বললেন,
–কি চাই? এই অসময়ে পড়া রেখে রান্নাঘরে কি? খিদে পেয়েছে, কিছু খাবি?
একসাথে এতগুলো প্রশ্ন শুনে মেহরীন হেসে এগিয়ে গিয়ে তার গাল টেনে বলল,
–ওহ্ আমার কিউটি আন্টি! এতো প্রশ্ন একসাথে করলে আমি কোনটার উত্তর আগে দিই বলো তো? হুমমমমম?
চাচিও হেসে উঠলেন নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
–খিদে পেয়েছে?
মেহরীন মিষ্টি গলায় বলল,
–না গো, একটু কফি বানাবো।
বলতে বলতে ছোট পাতিলে দুধ নিতে গেল সে। কিন্তু তার হাত থেকে পাতিলটা নিয়ে চাচি নিজেই চুলোয় বসিয়ে দিলেন।
–তুই যা, পড়তে বস। আমি বানিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
এই কথাটা শুনতেই মেহরীনের মুখ চুপসে গেল। মনটা ভেতরে ভেতরে কেমন কেঁপে উঠল। এটাই তো সুযোগ, কফির বাহানায় তালহার রুমে গিয়ে চিঠিটা চুরি করার প্ল্যান ছিল। না, এখন যদি চাচি কফি বানায়, সব শেষ। প্ল্যানটা ভেস্তে যাবে। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে চাচির হাত ধরে দরজার কাছে টেনে এনে সে নরম গলায় বলল,
–পাঁচ মিনিটের কাজ, আমি করে ফেলব। তুমি বরং যাও, ছোট চাচ্চু ডাকছে তোমাকে। আগে একবার গিয়ে শুনে আসো না।
চাচি কপাল কুঁচকে বললেন,
–কই, আমি তো শুনলাম না কখন ডাকল?
মেহরীন গলা নিচু করে মুখে নিস্পাপ ভান এনে বলল,
–আরে আমি আসার সময় বলল, তোমাকে ডেকে পাঠাতে।
মেহরীনের কথাগুলো শেষ হতেই তিনি হাত মুছতে মুছতে চলে যান। শান্তির নিশ্বাস ফেলে নিজ কাজের মধ্যে মন দিল। দুই কাপ কফি হাতে নিয়ে প্রথমে তাহসানের ঘরে দিয়ে এসে, এরপর সরাসরি তালহার রুমের দিকে এগিয়ে যায়। ভাবছিল, তালহা বাথরুমে আছে, তাই সোজা রুমে ঢুকে পড়ল। কিন্তু রুমে ঢুকতেই থমকে গেল সে। তালহার হাতে চিঠি, এবং সে সেটি মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। মুহূর্তের মধ্যে মেহরীনের শ্বাস চলাচল ধীর হয়ে এলো, যেন ধম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে সে হাতের ট্রেটা আরও জোরে চেপে ধরে, হাত-পা হালকা কাপছে।
কারো উপস্থিতি টের পেতেই পাশ ফিরে তাকাল তালহা। মেহরীনের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি পড়তেই তার ভয়ের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তালহার চোখ-মুখ লাল, যেমনটা সে রাগের সময় হয়। তবে কি সে রেগে গেছে তার এই কাজকর্মের জন্য? তালহাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ নামিয়ে নিল। আস্তে ধীরে এগিয়ে গিয়ে কফি সামনে ধরল,
–আ…আপনার কফি…
কফি এগিয়ে দিতে দিতে মনে মনে ভাবছে, এই বুঝি কফিটা ঝারি মেরে ফেলে দিবে। কিন্তু না, তালহা হাত বাড়িয়ে কাপটা নিল। আজ আর দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে হলো না মেহরীনের, ভয়েই পেছন ঘুরে যাওয়ার জন্য ধীরগতি নিল। ঠিক তখনই তালহা ডেকে উঠল,
–এসব কি, মেহরীন..?
মেহরীন চমকে দাঁড়িয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল। হাত-পা যেন কেউ টেনে আটকে দিয়েছে। ভয়ে ট্রেটা আরও শক্ত করে পেটের সাথে চেপে ধরল। মেহরীনকে চুপচাপ দেখে তালহা আবার বলল,
–কি হলো? উত্তর দাও, এদিকে ফিরো..
তার আদেশে মেহরীন ধীরে ধীরে তালহার দিকে মুখ ঘুরাল, তবে মাথা নিচু। তালহা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
–যদি ভালোবাসতে হয়, তবে সেটা মন থেকে একজনকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে হয়। বারবার…এসব ভালোবাসা নয়। এখন তোমার উঠতি বয়স, এই সময়ে অনেক কিছুই ভালো লাগবে, অনেক নতুন অনুভূতি মনে নাড়া দেবে। সেই অনুভূতিতে ভেসে যাওয়া, উড়ে বেড়ানো হয়তো এখন ভালো লাগবে। কিন্তু মনে রেখো, এসব আবেগ যদি নিয়ন্ত্রণে না রাখো, শেষমেষ তা তোমার ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই বয়সের অস্থির অনুভূতিগুলোকে সংযমে রাখো, সময়কে বোঝো, নিজেকে সামলাও মেহরীন….
মেহরীন চমকে উঠল, সব কথা যেন মাথার উপর দিয়ে গেছে। তবে শেষের শান্ত স্বরের “মেহরীন” ডাকটা মনে যেন ধাক্কা দিল। মনের অশান্ত পরিবেশ নিমিষেই শান্ত নদীতে পরিণত হলো। কানে বারবার তালহার ডাক ভেসে আসছে। তালহা বোঝাল কি, আর মেহরীন সে কিনা বোঝানোর মাঝেও তার রঙিন অনুভূতিতে আবারও ভেসে উঠল। যদি তালহা তা জানত, হয়তো হুদাই বুঝিয়ে নিজের সময় নষ্ট করত না।
মেহরীনকে চুপ দেখে তালহা চিঠিটা এগিয়ে দিল। স্বাভাবিক হলেও কণ্ঠে হালকা তাচ্ছিল্যের আভা,
–এসব বাচ্চামি বাদ দাও মেহরীন। তোমার ফিউচার অনেক ব্রাইট। সেদিকে ফোকাস করো, এসবের পেছনে লেগে না থেকে নিজের বইয়ের সঙ্গে লেগে থাকো। দেখবে, ফলাফল ভালো আসবেই।
তালহার কথায় মেহরীন ফট করে তাকায় তার দিকে। তালহার চোখ এখন সম্পূর্ণ শান্ত, যেন কোনো অনুভূতিই নেই। ঠিক ঝড় থেমে যাওয়ার পরের সেই নির্জন শান্ত পরিবেশের মতো, যেখানে অশান্তি যা ছিল তা ঝড়ের সঙ্গেই উড়ে গেছে। তালহার কথায় মেহরীনের মুখে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল। এখন তার ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে কিছু কথা বলতে, মনের ভেতর জমে থাকা, অনেকদিনের। আশ্চর্যভাবে, এখন আর ধমক খাওয়ার বা বকুনি শুনবার ভয় নেই। বরং মন বলছে, বলে ফেলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর কণ্ঠে বলল,
–শুধু ভালোবাসলেই হয় না, শক্ত করে ধরে রাখতেও জানতে হয়। শুধু পাবো না ভেবে থেমে থাকলে চলে না, বারবার চেষ্টা করে থেকে যেতে হয়। তবে শেষ প্রচেষ্টার পরও যদি না মেলে, তাহলে ভাগ্যের দোষ দিয়েই নিজেকে গুটিয়ে নেবো নাহয়।
কথাটুকু শেষ করে চিঠিটা হাতে নিয়ে পেছন ফিরে বেরিয়ে আসার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। হাঁটতে হাঁটতে আবারও বলল,
–ভালোবাসতে বা কাউকে বুঝতে বয়স লাগে না। এসব অনুভূতি যেকোনো বয়সেই জেগে উঠতে পারে। বয়স লাগে শুধু দায়িত্বের জায়গায়, যেমন বিয়ে, চাকরি বা ভর্তি পরীক্ষায়। কিন্তু ভালোবাসা? সেটা তো হৃদয়ের বিষয়, ক্যালেন্ডারের নয়।
এ কথা বলেই তালহার রুম থেকে বেরিয়ে এলো। এখন মনটা কেমন হালকা লাগছে, যেন বুক থেকে ভারি কিছু নেমে গেছে। একটানা জুড়ে একটা গভীর নিশ্বাস নিল,
–আহ, এখন ভাল্লাগছে। আমি যাকে চাই, সে অন্তত জানে আমি তাকে কতটা চাই। এবার না পেলে, নাহয় সত্যিই ভাগ্যের দোষ দিয়েই নিজেকে সরিয়ে ফেলবো।
শেষ কথাগুলো বলল ভীষণ মনখারাপি নিয়ে। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।
–না, তালহা তো তাকে রিজেক্ট করেনি!
না না, হাল ছাড়া যাবে না।
মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে রুমে ঢুকে পড়ল। অন্যদিকে, তালহা কফিতে এক চুমুক দিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
–ভালোবাসা সুন্দর, তবে ভালোলাগা ভয়ংকর। ভালোবাসা একজনাতে আবদ্ধ থাকে, তবে ভালোলাগা হাজারজনে…
চোখ বন্ধ করে মনে মনে উচ্চারণ করল,
–নতুন গন্ধে মেতে ওঠো তুমি, পুরোনো গন্ধে নাক কুঁচকাও। মনে রেখো একজন ক্ষণিকের জন্য হারালেও, অপরজন হারায় দীর্ঘ মেয়াদে গভীরভাবে।
অন্যদিকে, মেহরীন রুমে এসে দেখে তাহিয়া পড়ার টেবিলে বসে আছে। সে সঙ্গে সঙ্গে পাশে গিয়ে বসে। খাতা-কলম বের করে খাতায় বড় বড় অক্ষরে লিখল, “Nobody’s Problem”। লিখে কলমের মুখটা লাগিয়ে পাশে রেখে। আয়নার সামনে গিয়ে কাগজের দুই কোণা দুই হাতে ধরে বুকের সামনে তুলল। তার আজগুবি কান্ড দেখে তাহিয়ার কপালে ভাঁজ পড়ে। হাতে থাকা কলমের মুখা দিয়ে ঢিল মেরে বলল,
–কি করছিস, পাগল হয়ে গেলি নাকি?
তাহিয়ার কথায় পাত্তা না দিয়ে মেহরীন বলল,
–তোর টিশার্ট আছে না?
তাহিয়া চেয়ারে ঘুরে বসে দুই পা দুদিকে রাখে, চেয়ারের পিঠে দুই হাতে হেলান দিয়ে বসে বলল,
–তা দিয়ে তুই কি করবি? তোর মতলবটা কি বল তো।
মেহরীন মিটিমিটি হেসে বলল,
–একটু পরই দেখতে পাবি।
তাহিয়ার নেভি-ব্লু কালারের একটি লম্বা হাতার টিশার্ট বের করে সঙ্গে সঙ্গে গায়ে জড়িয়ে নেয়। হাতের কাগজটা ফের বুকের সামনে ধরে, হালকা বিরক্ত স্বরে বলল,
–একটা মেরুন রঙের টিশার্টও নেই? থাক, এটা দিয়েই চালবে।
তাদের বকবকের মাঝখানে কখন যে তালহা হাজির হয় বুঝে উঠেনি। দুটোকে পড়ার টেবিলে না দেখে দরজা থেকেই ধমকে ওঠল তালহ,
–সারে সাতটা বাজতে লাগল, আর তোরা এখনো পড়তেই বসিসনি? বুঝেছি, নাছির মিয়ার দোকান থেকে বেত দুইটা আনাতে হবে। অনেক বড়দের মতো ট্রিট করে দেখেছি, ঠিক হওয়ার নয়।
তালহার হঠাৎ কণ্ঠে দুজনই চমকে তাকায়। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাগজটা মুঠো করে নেয়। এক দৌড়ে গিয়ে চেয়ারে বসে পরে। তাহিয়াও ঝটফট চেয়ারে সোজা হয়ে বসে। বলা যায় নাকি, যদি তালহা তাদের জন্য সত্যিই বেত নিয়ে আসে, তবে তাদের পিঠেই ভাঙ্গবে।
এদিকে তালহা তাদের কাজকর্ম দেখে ফুঁসে উঠে। দুটোই ফাঁকিবাজ, সুযোগ পেলেই শুরু করে। এগিয়ে এসে টেবিলে দুই হাত রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। ক্যামিস্ট্রি বই খুলে ১১৮টি মৌলের নাম বের করে দুজনের সামনে রাখে। এদিকে তাহিয়া ভাইয়ের মেরুণ রঙের টিশার্টের দিকে জহুরি চোখে চেয়ে আছে।
টিশার্টের বুকে লেখা “Nobody”, এবার তাহিয়ার দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হলো। চোখ ছোট ছোট করে মেহরীনের দিকে তাকায়। মেহরীনও তার দিকেই তাকিয়ে। দুষ্টু হাসি দিতেই, মেহরীন লজ্জামিশ্রিত হাসি দেয়। একে অপরের সঙ্গে চোখাচোখি কথা বলতে লাগে। দুটোকে ইশারায় কথা বলতে দেখে তালহা টেবিলে জুড়ে বাড়ি মেরে গরম গলায় বলল,
–আমি আসছি দশ মিনিটের মধ্যে। এর মধ্যে যেন ত্রিশটি মৌলের নাম একদম লাইন বাই লাইন মুখস্ত হয়। না হলে পানিশমেন্ট।
বলেই সে গটগট পায়ে চলে যায়। এদিকে তাহিয়া-মেহরীন ভয়ে একবার বইয়ের দিকে তাকাচ্ছে, একবার তালহার যাওয়ার পানে। ঢুক গিলে মেহরীন বলল,
–ধুর, খালি পড়া পড়া, ভাল্লাগেনা।
তাহিয়া তেতে উঠে বলল,
–তুই আয়নার সামনে কেন গেলি? টেবিলে বসে আড্ডা মারলেও বুঝতো আমরা পড়ছি, তাহলে আর পড়া দিতো না।
–এহ, অমনিই আমার দোষ, তুই টেবিল ছেড়ে আমার দিকে ফিরলি কেন?
এক মিনিট তর্কাতর্কি শেষে মেহরীন বলল,
–বাদ দে, এখন কথা বলতে লেগে সময় খুয়াচ্ছি। এর থেকে পড়াই ভালো। কিন্তু এতগুলো মুখস্থ কীভাবে করব? কয়েকটা কমন হলেও বাকিগুলো…
তাহিয়া কিছু ভেবে ঝটপট উঠে মায়ের রুমের দিকে ছুটে। মেহরীন হা হয়ে তাকিয়ে থাকে তার যাওয়ার দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাহিয়া আবার হাজির হয়, হাপাতে হাপাতে চেয়ারে বসে বলল,
–এখন দেখিস, ফটাফট শিখে ফেলবো।
বলতে বলতেই সে মোবাইলে একটি ভিডিও বের করে টেবিলের মাঝে রাখে। প্লে করতেই গান বেজে ওঠল,
“হিলিয়াম লিথিয়াম,
সোডিয়াম বেরিলিয়াম…”
সঙ্গে সঙ্গে মাঝে বাজনা বেজে উঠল, তারপর আবার বলল,
“ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম,
জিংক, সালফার,
গ্যালিয়াম…”
আবারও ব্যাকগ্রাউন্ড সং বেজে উঠল। তাহিয়া গানের সঙ্গে সঙ্গে তালে তালে মৌলের নাম বলছে এবং শরীর দুলাচ্ছে। মেহরীন প্রথমে অবাক হলেও, গানের সুরে তারও নাচ উঠে যায়। বুদ্ধি ভালো গান ও শুনলো পড়ল ও। সেও সাথে গলা মেলাতে থাকে। গানের তালে তালে দুজনই পড়ছে আর নাচছে।
পাশের রুম থেকে গান শুনে তালহা ল্যাপটপ রেখে রেগে পা বাড়ায়। এসময় কে গান শুনে, তাহিয়ারা পড়ছে জানে না সে? ভাবতে ভাবতেই গানের উৎস খুজে তাহিয়ার রুমের সামনে আসে। রুমে ঢুকতেই দেখে দুজন নাচছে এবং গানের সুরে মৌলের নাম উচ্চারণ করছে। তাদের অবস্থা দেখে তালহা বলদ বনে গেল। সে হতবাক, এতটা বিচ্ছু হয় কেউ। সঙ্গে সঙ্গে সে হুংকার মারে,
–স্টপ, স্টপ দিস…
তালহার হঠাৎ হুংকারে দুজনে লাফিয়ে উঠে। চেয়ার থেকে পড়তে যেয়েও চুপচাপ নিজেদের সামলে নেয়। বুকে থু থু দিতে দিতে গান বন্ধ করে।
–আমি তোদের পড়তে বসিয়েছি, আর তোরা গান বাজিয়ে নাচছিলি?
কথাটা বলেই, মেহরীনের দিকে রাগী চোখ দিলে সে হাত বাড়িয়ে তাহিয়াকে দেখায়। তাহিয়ার দিকে তাকাতেই সে ফরফরিয়ে বলে,
–বাংলা স্যার বলেছিলেন, সুরে সুরে পড়লে জিনিস বেশি মুখস্থ হয়। তাই আমরা মৌলের গান বাজিয়ে প..পড়ছিলাম।
তালহা দুই আঙুল দিয়ে কপালে স্লাইড করে। ভীষণ বিরক্ত সে এই দুটোর উপর। এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে বলল,
–অল্প বিদ্যা ভয়ংকর, সেটা তো জানিস নিশ্চয়?
দুজনই মাথা নাড়ে। তালহা এবার বই হাতে নিয়ে বলল,
–এবার বলা শুরু করো।
কথা শুনে দুজন একে অপরের দিকে তাকায়। একজন আরেকজনকে ঠেলছে বলতে। দুজনকেই চুপ থাকতে দেখে তালহা আবারও বলল,
–কি হলো? স্টার্ট।
মেহরীন তড়িৎ স্বরে বলে,
–বাথরুম…
তার কথা শুনে তালহা ফট করে তাকায়,
–হোয়াট! এটা আবার কোন মৌল?
–না, না, মৌল না, আমি আসলে বাথরুমে যাব।
তালহা কঠোর চোখে একবার তাকে পরখ করে বলল,
–যাও, ফাস্ট আসবে।
মেহরীন মাথা নেড়ে চলে যায়। এদিকে বেচারি তাহিয়া ফেসে যায়। তাকে মৌল ধরালে সে প্রথম পঁচিশটা বলে আটকে যায়, এখানেই তার বেশি প্যাচ লাগে। তা দেখে তালহা ধমকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে মুখস্থ করার হুকুম দিলে তাহিয়া তা আবার মুখস্থ করতে শুরু করে।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৮
মেহরীন প্রায় পাঁচ মিনিট পর বাথরুম থেকে বের হয়। দেখে তালহা মোবাইলে কারো সঙ্গে কথা বলছে। সুযোগ পেয়ে সে আস্তে আস্তে পা বাড়িয়ে দাঁড়ায় তার পেছনের ডান দিকে। হাতের মুঠোয় কচলানো কাগজটি সাবধানে বুকে কাছে ধরে। তাহিয়াকে ইশারায় ডাকলে সে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন পোজ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তা দেখে তাহিয়া হেসে উঠে। এদিকে তালহা তীক্ষ্ণ চোখে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও কল কেটে দিয়ে সোজা হয়ে বসে। তাকে নড়াচড়া করতে দেখে, মেহরীন কাগজটি লুকিয়ে নিয়ে বসে জায়গায়।
