প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৩
সাইদা মুন
পেছন ফিরতেই তাহসানকে দেখতেই দুজন হালকা কেঁপে উঠে। তাহসান কড়া চোখে তাকিয়ে তাদের দিকে। ধীর পায়ে একটু এগিয়ে এসে দাঁড়ায়, ভাড়ি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—এসব কি মেহরীন, তাহিয়া?
মেহরীন-তাহিয়া দুজনই মাথা নিচু করে ফেলে। তা দেখে তাহসান একই কন্ঠে বলল,
—আর যেন এসব মজা করতে না শুনি। একবার যদি অন্য টিচার্সদের কানে যায়, গার্জিয়েন্ট ডাকাবে। বেয়াদবের খেতাব দিবে, নিশ্চয় এগুলো ভালো লাগবে না?
দুজনেই মাথা নেড়ে একসাথে বলে উঠল,
—সরি স্যার, আর হবেনা।
তাহসান একপলক মেহরীনের দিকে তাকিয়ে সাইড কাটিয়ে সোজা চলে যায় অফিসরুমে। সকাল ৯টা, ক্লাসরুমে সবাই চুপচাপ বসে ফিজিক্স ক্লাসে মনোযোগ দিয়েছে। বাতাসে একটা হালকা থমথমে অনুভূতি, কাগজের পাতার খসখস শব্দ আর শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন। সব মিলিয়ে শান্ত ও গভীর মনোযোগি পরিবেশ চারিদিকে।
টানা পয়তাল্লিশ মিনিটের ক্লাস শেষ করিয়ে স্যার বেরোতেই একেকজন শান্তির নিশ্বাস ছাড়ে। মুহুর্তেই শান্ত পরিবেশ হয়ে উঠে সবজি বাজার। রাফি আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে তাহিয়াদের পেছনের সিটে এসে বসে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—শা*লার বেটার নাম আইনস্টাইন তো আইন নিয়ে পড়াশোনা করনা, তোকে কে কইছে ফিজিক্স নিয়ে নাড়াচাড়া দিতে, অসহ্য।
মেহরীন খাতা ব্যাগে রাখতে রাখতে বলল,
—তুই গাধা, তুই পড়াশোনা বাদ দিয়ে মানুষের বাসায় কাজে লেগে পড়না। তোকে কে বলছে সাইন্স নিয়ে পড়াশোনা করতে।
মেহরীনের কথায় রাফি সোজা হয়ে বসে, শার্টের কলার ঠিক করে বলল,
—এহহহ, আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো, তাই সাইন্স নিছি।
মেহরীন আড়চোখে তাকিয়ে খোঁচা মেরে বলল,
—ফিজিক্সের সামান্য সূত্রই বুঝতে হিমশিম খেয়ে মরা বিজ্ঞানিদের গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলিস, আবার ইঞ্জিনিয়ার।
পাশ থেকে ফারিন গালে হাত দিয়ে আফসোস নিয়ে বলল,
—জানিস, আমার না ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার অনেক সখ।
তাহিয়া কিছু একটা ভেবে বলল,
—তো সাইন্স নিলি কেনো, আর্টস নিলেই তো হতো।
ফারিন তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—আব্বু আম্মুর ইচ্ছা ডাক্তার বানাবে, তাই বাধ্য হয়ে সাইন্স নিতে হয়েছে।
মেহরীন কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করল,
—ওমা, এটা আবার কেমন, তুই তাদের বলিসনি নিজের ইচ্ছা?
ফারিন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
—বলেছিলাম, তবে এটা নাকি তাদের জন্য অসম্মানজনক।
তার কথায় তিনজনেই অবাক হয়ে তাকায় ফারিনের দিকে। তাদের তাকানো দেখে ফারিন ঠোঁটের কোণে তপ্ত হাসি রেখেই বলল,
—আমার আব্বু হার্ট সার্জন, আর আম্মু নিউরোলজিস্ট। তাদের একটাই কথা তাদের মেয়েকেও ডাক্তার হতে হবে। ওসব ছোট-খাটো ফ্যাশন ডিজাইনারদের দাম নেই।
তার হাসির মধ্যে কেমন তিক্ততা লুকিয়ে ছিল, যা মেহরীন খুব করে লক্ষ্য করেছে। তাহিয়া ফট করে বলে উঠল,
—কোনো কাজই ছোট না, মানুষের দেখার ধরন শুধু আলাদা। আর নিজের পেশা বাছাই করার স্বাধীনতা ছেলে-মেয়েদের দিতে হয়। জোর করে তো আর সব হয়না, মনের সায়ও থাকতে হয়। আমার ভাইয়া তো আমি সাইন্স নেওয়ার আগে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে নিজ ইচ্ছাতে নিচ্ছি কিনা।
—তোর ভাগ্য ভালোরে ওমন ভাই ওমন সাপোর্টিব পরিবার পেয়েছিস। আমিও বুঝানোর চেষ্টা করেছি অনেক। তবে ব্যর্থ, তারা তাদের কথাতেই অটুট। আব্বু আম্মুর সব কলিগদেরদের ছেলে-মেয়েও ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনেই পড়াশোনা করছে। ডাক্তার হচ্ছে, ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে, তারা বুক ফুলিয়ে বলতেও পারছে। আমার মা-বাবাও তাই চায়, যেন তারা মেয়ে নিয়ে গর্ব করতে পারে। কিন্তু শা*লার মেয়ে কি চায় সেটাই দেখার প্রয়োজন বোধ করে না।
ফারিনের কথায় সকলে চুপ হয়ে যায়। তার বাবা-মায়ের কথা শুনে তারা কিছুটা বিস্মিত। কোনো পেশাই নিচু নয়, কোনো কাজই অসম্মানজনক নয়। আর বাবা-মায়ের সন্তানের প্রতি কঠোর হওয়া কি উচিত? নিজেদের পছন্দ তাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কি ঠিক? কাউকে দিয়ে জোর করে কিছু করানো যায় না। মানুষের জীবনে তার ইচ্ছে ও পছন্দই সবচেয়ে বড়, তাই যার যা করতে ইচ্ছে করে, তার সেটাই করার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
মেহরীন ফারিনের কাধে হাত রেখে স্বান্তনার স্বরে বলল,
—থাক, হতাশ হওয়ার কিছুই নেই। তোর একটা ভালো ফিউচারের জন্যই তারা তোকে প্রস্তুত করছে। এসব নিয়ে মনে কোনো দুঃখ রাখবি না, তারা তোকে ভালোবাসে বলেই তোকে নিয়ে এতো ভাবে।
ফারিন বিরক্তি নিয়ে বলল,
—হয়েছে, বাদ দে এসব। তাদের কাছে আমি একটা পুতুল ছাড়া আর কিছুই না। প্রয়োজনে নাচাবে আবার এমনেই এক কোনায় ফেলে রাখবে। পড়াশোনার ক্ষেত্রে আসে মা-বাবার দায়িত্ব পালন করতে। এছাড়া একটু টাইমও নেই আমার জন্য। সারাদিন নিজেদের মতো কাজ নিয়ে ব্যস্ত, মেয়ে খেয়েছে কিনা সে খুঁজও নেই।
তার কথায় তিনজনেই স্তব্ধ। এই হাসি-খুশি চঞ্চল মেয়েটার ভেতরে এতো কিছু গেঁথে আছে। এখন না বললে হয়তো ঘুনাক্ষরেও টের পেতো না। তিনজনই চোখ চাওয়াচাওয়ি করে। বুঝলো, মেয়েটার বাসার পরিস্থিতি ভালো না। শুনেছে, সে মা-বাবার একমাত্রই মেয়ে। তাই হয়তো আরও একাকিত্ব বোধ করে। তিনজনেই একসাথে বলে উঠল,
—এহ, আমরা আছি তো নাকি খুঁজ নিতে।
রাফি কলম দিয়ে ঠোঁটের উপর মুছ বানিয়ে, গলা ঝেরে মোটা গলায় বলল,
—এহেম, ফারিন মা, এইযে আমি তোমার বাবা, মিস্টার রাফি, একদম কষ্ট পাবেনা মা। আমি তিনবেলায় চারবার খুঁজ নেব, চলবে তো?
পাশ থেকে তাহিয়া গলার ওড়নাটা শাড়ির মতো পেচিয়ে, মাথায় ঘুমটা দিয়ে গলা চিকন করে বলল,
—আর আমি তোর মা, তাহিয়া। আজ থেকে আম্মা ডাকবি, কেমন?
তাদের দেখতেই সকলে উচ্চস্বরে হেসে উঠে। ফারিন “তবে রে” বলেই দৌড়ানি দেয়। এভাবেই হাসি-ঠাট্টায় তাদের বাকি ক্লাসগুলোও শেষ হয়ে যায়। কিছু মানুষ থাকে খুবই চঞ্চল প্রকৃতির। তারা সবসময় হাসিখুশি দেখায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাদেরও কিছু নিজস্ব দুঃখ লুকিয়ে থাকে। আজ ড্রাইভার পাঠিয়েছে তাদের কলেজ থেকে নিতে। তালহা আসেনি দেখে মেহরীন হাসফাস করছে, তা দেখে তাহিয়া বোঝালো, হয়তো কোনো কাজে আটকে গেছে।
বিকেল পাঁচটা বাজে, তাহিয়া মায়ের আগে-পিছে ঘুরছে,
—আম্মু দেখোনা, কিছু একটা তো থাকবেই, দেখো দেখো।
তিতলি বেগম পুরো রান্নাঘর তছনছ করেও খুঁজে পাননি কাঙ্খিত জিনিসটি। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে মেয়েকে ঝারি মেরে বললেন,
—এই কি করবি! বলবি তো, ফারিসদের কোনো কিছু নেই, কিছু দিলে সাথে সাথেই বাটি ফিরিয়ে দেই।
তাহিয়া হতাশ হয়ে বলল,
—নাহ, এমনি যেতে চাচ্ছিলাম ওদের বাড়ি। কিছু থাকলে নিয়ে যেতাম আরকি।
তিতলি বেগম রাগী চোখে তাকিয়ে ফ্রিজের দিকে এগোতে এগোতে বললেন,
—বাদর মেয়ে একটা। আগে বললেই হতো, এতোক্ষণ নাচিয়ে শেষে এসে কাজের কথা বলছিস। আমি আরও ভেবেছি না জানি কি আছে তাদের। নে, রিতুকে দেখতে আসার মিষ্টি পাঠানো হয়নি, তুই যেহেতু যাবি, দিয়ে আয়।
তাহিয়া হাসিমুখে মিষ্টির বাটিটা হাতে নিয়ে ছুটে যায়। মেয়েকে ছুটতে দেখে তিতলি বেগম পেছন থেকে চিল্লিয়ে উঠলেন,
—তাহিয়া, এভাবে ছুটিসনা পড়বি মা।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! ছুটে ড্রয়িং রুমে এসে থেমে মেহরীনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ফারিসদের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বের হওয়ার আগে দাদি পান চিবোতে চিবোতে সাবধান করলেন,
—মিষ্টি ডেকে নিয়ে যা, রাস্তা ঘাটে এভাবে নিলে আবার তানারা পিছে পড়বে।
তাহিয়ারা গেট পেরিয়ে বেরোতেই ওড়না দিয়ে মিষ্টির বাটি ঢেকে ফেলে। ভূতের ভয় আছে প্রচুর দুজনেরই। তার উপর মেহরীনও তার দাদির কাছ থেকে কত কাহিনি শুনেছে, মিষ্টি নিয়ে কেউ রাস্তা দিয়ে আসলে তানারা পিছে পড়ে।
গেট পেরিয়ে ঢুকতেই হঠাৎ কারো গমগমে আওয়াজে দুজনই ভয় পেয়ে উঠে,
—কি চুরি করে এ বাড়িতে গা ঢাকতে এসেছো, চুন্নির দল!
দুজনেই এদিক সেদিক তাকাতে থাকলে, দু’তলার বারান্দা থেকে ফারিস বলল,
—হেই কানা’স আমি এখানে।
তার কথায় এবার তাদের নজর পরল ফারিসের দিকে, হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে তাহিয়া বুকে থু থু দিয়ে কোমরে হাত রেখে বলল,
—ফারিস ভাইয়া, আপনিও না একদম ভয় পাইয়ে দিয়েছেন।
ফারিস চোখ ছোট ছোট করে বলল,
—তারমানে সত্যি চুরি করে এসেছো?
তাহিয়ার নাক এবার ফুলে উঠে। লোকটা যখনই দেখে তখনই তাকে অপমান করে। রেগে বলল,
—আপনি এতো বেশি কথা বলেন কেনো?
—কারণ তুমি বেশি ছোট মানুষ, তাই আমার কথাগুলো বেশি বড় লাগে।
তাহিয়া দু’পা এগিয়ে বলল,
—এই, আপনি কি জানেন, আমার জন্য এখনই বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব আসে। তার মানে আমি ছোট নই, বিয়ের বয়সি হয়ে গেছি।
কথাটুকু ভাব দেখিয়ে বলতেই ফারিসের চোখ মুখের রঙ হঠাৎ বদলে যায়। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, রাগী চোখে একবার তাকিয়ে চুপচাপ ঘটঘট পায়ে ঘরে চলে যায়। কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যেতে দেখে তাহিয়া বেশ অবাক। মেহরীন ফারিসকে লক্ষ্য করে বলল,
—ফারিস ভাইয়া হঠাৎ রেগে গেল কেন?
তাহিয়া এগিয়ে যেতে যেতে অবাক কন্ঠে বলল,
—আমিও তো জানি না, আমার কথার পাল্টা জবাবও দিলেন না, এতো ভালো মানুষ কি করে হলেন। চিন্তার বিষয়।
—আচ্ছা উনি কি পড়াশোনা বা চাকরি, কিছু করেনা? যখনি দেখি বাড়িতেই…
—আরে, উনি তো এতোদিন অ্যামেরিকায় ছিলেন। এসেছেন তুই আমাদের বাড়িতে আসার কয়েকদিন আগেই। ইন্টার শেষে হায়ার স্টাডির জন্য গিয়েছিলেন, এখন ওখানেই সেটেল্ড হয়ে গেছেন। বেড়াতে এসেছেন দেশে, আর মেবি বেশিদিন থাকবেন না। বিয়ে করে হয়তো বউ নিয়ে চলে যাবেন।
—ওহহ…
বাড়ির কলিং বেল বাজানোর আগেই ফাতেমা দরজা খুলে দেয়। হয়তো ফারিস বলেছে তারা এসেছে। দরজা খুলে তাহিয়াকে দেখেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল মেয়েটি,
—তাহুপু, তুমি আমাদের বাসায় আসোই না একদম।
তাহিয়া হেসে বলল,
—এই তো এসেছি, তুমিই তো যাওনা আমাদের বাসায়, হুহ। খেলাধুলার সাথী পেয়ে গেছো বুঝি? তা কাকে পেলে ওই রবিন দাদা?
তার কথায় ফাতেমা বাচ্চাদের মতো খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
—কি যে বলোনা! ওইদিন যেই দৌড়ানি দিয়েছিল, উনার সাথে খেলার শখ মিটেছে।
তার কথায় তাহিয়াও হাসে। তাদের হাসির কারণ কিছুই না বুঝে মেহরীন অবুঝের মতো চেয়ে আছে। তা বুঝে তাহিয়া বলল,
—আরে, আমাদের বাসার সামনে যে একটা মাঠ আছে, তার এক কোণে রবিন দাদার বাড়ি। ওখানে বিকেলে৷ খেলতে গেলে উনিও প্রায় আমাদের সাথে খেলতেন, মজা করতেন।
মেহরীন কপাল কুচকে বলল,
—ওহ, তবে আর যাস না দেখি। আমি আসার পর একবারও তো খেললি না।
তাহিয়া মিষ্টির বাটি ফাতেমার হাতে দিয়ে বলল,
—একদিন উনার সাথে খেলতে খেলতে, ছলেবলে উনার বাড়ির আম গাছ থেকে আম চুরি করেছিলাম, তারপর যেই দৌড়ানি দিয়েছিল আমাদের। সেই থেকে আর যাই না খেলতে। আবার ফাতেমা, তারপর দলের আরও কয়েকজনেরও পরীক্ষা শুরু হয়েছে, তাই খেলা বন্ধ ছিল।
দল কথাটুকু শুনে মেহরীন প্রশ্ন করতেই তাহিয়া বলল,
—আমাদের পাড়ার পুচঁকে গ্যাং, পরে পরিচয় করাবোনে। এখন চল, আগে মিশন সাকসেসফুল করি।
তারপর ফারিসের আম্মু-দাদিরা তাহিয়ার সাথে টুকটাক কথা বলতে লাগে। আর সেই ফাঁকেই তাহিয়া মেহরীনকেও পরিচয় করায়। তার সাথেও তারা বেশ ভালোই মিশে গেছে। কথার মাঝেই ফারিসের দাদি ফারিসের মাকে বললেন,
—বউমা যাও, ওদের একটু করে আচার এনে দাও তো।
আচারের নাম শুনতেই তাহিয়ার চোখ জ্বলজ্বলে হয়ে উঠল। পাশে ফিরে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে একবার হেসে নিল সে। এটাই ছিল তাদের ফার্স্ট মিশন, ফারিসের দাদির আচার খাওয়া, আর সেই মিশন তাহিয়ার সাকসেসফুল হয়েছে। তাহিয়ার এই বাচ্চামি দেখে মেহরীন মনে মনে হেসে উঠল।
ফারিসের মা আচার দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলে তাহিয়া মনের সুখে আচার খেতে থাকে আর আচারের প্রশংসা করতে থাকে। তার প্রশংসায় দাদি খুশি হয়ে তাকে আরও একটু তুলে দিলেন। তা দেখে তো তাহিয়াকে আটকায় কে! সোফায় দু’পা তুলে বসে আরও প্রশংসা জুড়ে দিল,
—উফফ দাদি, তোমার হাতের যেই জাদু। এতো মজার আচার। দাদা তো নিশ্চয় আচার খেয়েই তোমার জন্য পাগল হয়েছিল। আমারই তো ইচ্ছে করে তোমার আচার টানে তোমার বাড়িতেই সারাজীবনের জন্য চলে আসি।
কথাটুকু উচ্চারিত হতেই উপর থেকে কেউ গম্ভীর সুরে বলে উঠল,
—তোমাকে তো এমনিতেই আসতে হবে।
ফারিসের কণ্ঠ শুনে তাহিয়া চটজলদি সিঁড়ির দিকে তাকায়। দেখে ফারিস পকেটে এক হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল,
—এমনিতে কিভাবে আসবো?
ফারিস একপলক তাকিয়ে বলল,
—আমার দাদির আচার খাওয়ার জন্য।
বলেই ফাতেমাকে ডাকল,
—ফাতেমা, ভাইয়ার জন্য এক গ্লাস পানি আনিস তো।
ফারিস চলে যেতেই তাহিয়াও সেসব কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। তবে ফারিসের দাদি মিটিমিটি হেসে উঠলেন। পাশে মেহরীন চুপচাপ বসে তাদের কাহিনী দেখছে। তার মনে কিছু খটকা লাগলেও সেসবে সেও পাত্তা দিল না। তাহিয়া দ্রুত আচার খেয়ে উঠে বাটি হাতে ফাতেমার পিছে রান্নাঘরে ছুটে যায়। তাকে দেখে ফারিসের মা এগিয়ে এসে বাটি নিয়ে বললেন,
—টি টেবিলে রাখলেই হতো, এখানে নিয়ে আসতে গেলি কেনো?
—না না আন্টি, এমনি। বাসায়ও কিছু খেলে সাথে সাথে ধোয়ার অভ্যাস তো, তাই।
তিনি মুঁচকি হেসে তার সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে, একটি ছোট ট্রেতে একগ্লাস পানি আর ছোট বাটিতে দুটো মিষ্টি সাজিয়ে ফাতেমার হাতে দিলেন,
—নে মা, পানির সাথে মিষ্টিগুলোও দিয়ে আসিস। তালহাদের বাসা থেকে এসেছে বলিস।
ফাতেমা মাথা নেড়ে বের হতেই তাহিয়াও তার পিছু নেয়। মেহরীনকে বসতে বলে সে ফাতেমার সঙ্গে উপরে উঠে। ফারিসের ঘরে ঢোকার আগেই সে ফাতেমাকে আটকে দিয়ে বলল,
—দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি বরং গিয়ে মেহরীনকে নিয়ে আসো। তোমাদের ছাদে যাবো। দাও, এগুলো আমি দিচ্ছি ফারিস ভাইকে।
ফাতেমা ট্রেটা তাহিয়ার হাতে দিয়ে যেতে নিয়ে থেমে যায়। করিডোরের ফুলদানি থেকে নিচে পড়ে থাকা ফুল দেখে, তা উঠিয়ে ঠিক করতে শুরু করল। তা দেখে তাহিয়া দাঁড়িয়ে হাসফাঁস করতে থাকে, সে না গেলে এই কাজ শেষ হবে কিভাবে। ফুলদানি ঠিক করা শেষেও তাহিয়াকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফাতেমা বলল,
—কি হলো আপু, যাও না কেনো? ভাইয়ার তেষ্টা পেয়েছে, দেরি হলে চিল্লাবে নয়তো।
ফাতেমার কথায় আর উপায় না দেখে ঢুকে গেল ঘরে। তার প্ল্যান ব্যস্তে গেছে ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই দেখে ফারিস নেই। ওয়াশরুমের দিকে তাকাতেই দেখে, দরজাটা ভেতর থেকে লাগানো, লাইটও জ্বালানো। মানে সে ভেতরে। সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়ার মুখে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।
দ্রুত ট্রেটা পাশের ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে কোমরে গোঁজা কাগজ বের করল। কালো মিষ্টিটা দুই ভাগ করে তাতে কাগজে আনা মরিচের গুঁড়ো ঢোকাতে লাগল মনোযোগ দিয়ে। নিজের কাজের ফাঁকে হঠাৎ ফারিসের কণ্ঠ শুনে চমকে উঠে। তড়িঘড়ি দুই হাত লুকিয়ে নিয়ে পেছন ফিরে তাকায়।
—কি করছিলে?
—ক… কই? কিছু না, কিছু না?
ফারিস সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলল,
—তোমাকে মেয়ে আমার সুবিধার ঠেকছে না। সত্যি করে বলো।
তাহিয়া দ্রুত মাথা নাড়ল,
—না না, সত্যি বলছি কিছু না। শুধু আপনার জন্য পানি আর মিষ্টি নিয়ে এসেছিলাম।
ফারিস স্থির হয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ হেসে উঠে বলল,
—তো দাও পানি।
তাহিয়া তাড়াহুড়ো করে পেছন ফিরে মিষ্টিটা বাটিতে রেখে হাত ঝেড়ে ট্রে হাতে এগিয়ে গেল,
—এই নিন, এই কালো মিষ্টিটা আগে খাবেন।
—কেনো?
—ইয়ে মানে ওইটা বেশি মজার আরকি। আমি খেয়েছিলাম, ভালো লেগেছিল, তাই বলেছি।
ফারিস মনে মনে হেসে উঠল, তবে মুখে হাসি না এনে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—তাহলে তুমি ওটা খেয়ে নাও।
তাহিয়া তড়িঘড়ি বলল,
—না না, আপনি খান। বাসায় আরও আছে, আমি ওখানেই খাবো।
তা শুনে ফারিস পানি খেতে খেতে বলল,
—তাহলে এগুলো ফাতেমাকে দিয়ে দিও, আমি মিষ্টি খাইনা।
—এহহ, তা বললে হবে না। আপনার খেতেই হবে।
বলে ট্রেটা পাশে রেখে কালো মিষ্টি হাতে নিয়ে ফারিসের মুখের সামনে ধরে। তাহিয়ার আচমকা কাণ্ডে ফারিস থমকে দাঁড়ায়। মেয়েটা এমন করবে সে ভাবেইনি। সে আরেকটু এগোতে ফারিসের মুখ হা হয়ে যায়। আর তাহিয়াও সুযোগ বুঝে পুরো মিষ্টিটাই ঢুকিয়ে দিল তার মুখে, সাথে সাথে মুখে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটে ওঠে তার।
তাহিয়ার মুখের সে হাসিতে ফারিসের চোখ যেন আরও আটকে গেল। হঠাৎ মনে হচ্ছে যেন বুকে কিছু একটা ভীষণ জুড়ে ধাক্কাধাক্কি করছে। কোনো রিয়েক্ট না করে চুপচাপ চিবিয়ে নিল মিষ্টিটা। আর তাহিয়া তাকিয়ে আছে তার ঠোঁটের দিকে, কখন গিলবে, আর ঝালে চিৎকার করবে, সে অপেক্ষায়। কিন্তু পুরোটা খাওয়ার পরও তার কোনো রিয়্যাকশন না দেখে তাহিয়া হতভম্ব,
—আপনার কি কিছু লাগেনি?
ফারিস শুধু মাথা নাড়ল। তাহিয়া হতাশ। হয়তো মরিচে ঝাল কম ছিল, অথবা ফারিস ঝাল খেতে পারে। তার প্ল্যান ফ্লপ। মনটা খারাপ হয়ে যায়। তারঘর থেকে বের হতে হতে বলল ,
—শুনুন, আমি বাসায় যাচ্ছি। পাঁচ মিনিট পর আমি ছাদে উঠব। আপনিও আপনাদের ছাদে আসবেন। একটা জিনিস দেখাবো।
বলেই চলে গেল। তাহিয়া বের হতেই ফারিস দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে মুখের চিবানো মিষ্টিটা ফেলে কুলি করতে লাগল। ঝালে তার মুখ লাল হয়ে গেছে। যদিও গিলেনি, কিন্তু চিবিয়েছে, আর এতেই এতো ঝাল লেগেছে। এমনিতেও ঝাল খেতেই পারে না সে। কুলি করেও আরাম না পেয়ে বাটির সাদা মিষ্টিটা মুখে পুরে নিল। আয়নার দিকে তাকিয়ে আনমনেই হেসে উঠল,
—মেয়েটা এতো বুদ্ধু! আয়নায় তো সবই দেখা যাচ্ছিলো। তবে বেশ মাথা খাটিয়েছে প্রতিশোধ নিতে।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর পানিটানি খেয়ে নিজেকে ঠিক করে ছাদে যায় সে। ছাদে উঠতেই তাহিয়াদের ছাদের দিকে এগোয়। তাদের ছাদে কেউ নেই, তা দেখে কপাল কুচকে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ায়। মেয়েটা তাকে আসতে বলে নিজেই আসেনি। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে মোবাইল বের করতে যায় সে। অমনি তাহিয়ার গলা ভেসে উঠে,
—ফারিস ভাইয়া, আপনার নাম কী?
এহেন প্রশ্ন শুনে ফারিস হতভম্ব হয়ে যায়, মাথা তুলে বোকা চাহনিতে তাকায় সামনে। তবে সামনের ছাদে কেউ নেই, তখনি শুনে মেহরীনের ফিসফিসিয়ে দেওয়া বকা,
—গাধা, নাম নিয়েই তো ডাকলি, আবার নাম জিগাচ্ছিস কেন। অন্য প্রশ্ন কর।
তা শুনে তাহিয়া থতমত খেয়ে যায়। এদিকে ফারিস হেসে উঠে। কিছু একটা ভেবে, তাহিয়াকে না দেখে কপাল কুচকে বলে,
—তাহিয়া, তুমি কি ছাদে এসেছো?
তাহিয়া সাথে সাথে বলে,
—আরে, আপনার সামনেই তো দেখছেন না?
তার কথা শুনে ফারিস ফিঁক করে হেসে উঠল,
—আমার ট্রিক্স আমার সাথে খাটালে কিন্তু চলবে না। আমি বুঝে গেছি তুমি যে রেলিঙের নিচে।
সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়া বলল,
—তবে খুঁজেই দেখুন, যদি পেয়ে যান।
তার অভার কনফিডেন্স দেখে ফারিস উকিঁ দিয়ে ছাদের চারপাশে চোখ বুলায় তবে কেউ নেই। খোলামেলা ছাদে লুকিয়েছে কোথায়। ভাবতেই চোখ পড়ে সিঁড়ির দরজায়,
—তুমি সিঁড়ির রুম থেকে কথা বললে তো আর আমি দেখবোই না।
—এহ! আমি আপনার সামনেই সিঁড়ির রুমে নেই, বিশ্বাস না হলে আমাদের ছাদে এসে চেক করে দেখুন।
এবার ফারিসের কপালে ভাঁজ পড়ল, মেয়েটাকে কোথাও দেখছে না। এবার দেয়াল টপকে তাদের ছাদে যায়। অবুঝ মুখে, সিঁড়ির রুমসহ পুরো ছাদ খুঁজে, তবুও তাহিয়াদের পায় না। তা দেখে সে ফের তাদের ছাদে ফিরে আসে।
—তাহিয়া, তুমি কোথায়? সত্যি করে বলো।
তার অবস্থা দেখে তাহিয়া মিটিমিটি হেসে বলল,
—আরে, আমি তো আপনার সামনেই, মিষ্টির সাথে চোখ ও খেয়ে ফেলেছেন নাকি।
—আমার কথা আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে?
—আরে না, আপনার মন্ত্র তো কাজ করেছে, আমি ম্যাজিক শিখে ফেলেছি।
ফারিস দু‑হাত গুঁজে বলল,
—এসব আবুলতাবুল মন্ত্র সারাজীবন মুখে জপলেও কাজ হবে না। সো ফাজলামো বাদ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াও।
—আমি তো আপনার সামনেই, হুহ বিশ্বাস না করলে নাই, আমি গেলাম নিচে।
কথাটুকু বলতেই হঠাৎ বাতাসে তাদের ছাদের দরজা নড়ে উঠে। তা দেখে সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়া বলল,
—বিশ্বাস না হলে দেখুন দরজা নাড়িয়েই গেলাম। এখনো দরজার কাছেই হুহ টাটা।
তাহিয়ার কণ্ঠ থেমে যেতেই ফারিস বাকাঁ হেসে উঠল। তারপর বিরবিরিয়ে বলার নাটক করে জুড়েই বলে উঠে,
—মেয়েটা কোথায়? পাচ্ছিই না। সে কি নিচে?
নিচের দিকেও দেখে কিন্তু সেখানেও কেউ নেই। আনমনে কিছু ভাবতে ভাবতে পেছন ঘুরতে যাবে হঠাৎ কয়েকজন একসাথে লাফিয়ে এসে চিল্লিয়ে উঠে,
—ভাউউ!
হঠাৎ করে আসায় ফারিস দু’কদম পেছনে যায়, চিৎকারে দু‑হাত কানে দিয়ে দাঁড়ায়। সামনে তাকিয়ে দেখে তাহিয়া, মেহরীন, ফাতেমা তিনজনই হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছে। তাহিয়া তো হাসতে হাসতে বলে,
—ইয়ে, আমিও বোকা বানিয়েছি। ভয় আমি দেখিয়েছি।
ফারিস ধপধপ পা ফেলে এগিয়ে এসে বলে,
—ইডিয়ট, কোথায় ছিলে?
ফাতেমা পাশ থেকে বলে,
—আমরা তো আমাদের ছাদের এপাশে ছিলাম। তুমি বুঝতেই পারনি। সত্যি ভয় পেয়ে গেছো ভাইয়া।
বলে সে আবারও হাসতে লাগল। যেন সার্কাস দেখেছে। তা দেখে ফারিস এক ধমক দিয়ে বলল,
—শাট আপ! আমি ভয় পাইনি, জানতাম এমন কিছুই। আর এভাবে ষাঁড়ের মতো কে চিল্লায়?
তাহিয়া মুখ ভেংচে মেহরীনকে নিয়ে নামতে নামতে বলে,
—এহ, শিকার করেন, বোকা বনে ভয় পেয়েছেন। হুহ, আপনি শুধু একাই পারেন না আমিও পারি।
বলেই আবারও মুখ মোচরে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ফাতেমাও ছুটে, তাদের বিদায় দিতে। তাহিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে হালকা হাসে ফারিস। বোকা আসলে কে হয়েছে তা তো সেই জানে। সে তো প্রথমেই তার কথা শুনে বুঝে নিয়েছিল শব্দ তার পেছন থেকেই আসছে। তবুও কন্টিনিউ করেছে মেয়েগুলোর বাচ্চামিগুলো উপভোগ করতে।
রাত নয়টা পঞ্চাশ মিনিট,
চায়ের দোকানে বসে আছে সব বন্ধুরা। গল্পে গল্পে একেকজনের দুই-তিন কাপ করে চা শেষ হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। অক্টোবরের শেষভাগ, হাওয়ায় এখন হালকা ঠান্ডার ছোঁয়া। রাত নামলেই সেই শীতল বাতাস চায়ের দোকানের টিনশেড ছুঁয়ে কেমন একটা নরম আরাম এনে দেয়।
এই জায়গাটাই তাদের আড্ডাখানা। বেশিরভাগই যে যার কাজ শেষে এখানেই এসে বসে। ছ’টা কখনো বা সাড়ে ছয়টায় সবাই এখানে একত্রিত হয়। তারপর নিজেদের গল্প, হাসাহাসি,সব মিলিয়ে রাত আট-নয়টা পর্যন্ত জমজমাটই থাকে পরিবেশ।
সকলেই দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে বসে আছে, তবে তালহা তাদের থেকে কিছুটা দূরে, রাস্তার এক পাশে, নিজের গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। আশেপাশের নিরিবিলি পরিবেশটা দেখছে আর নিজের সাথেই বোঝাপড়া করছে। এই বয়সে এসেও নিজের মনের সঙ্গে ছোট ছোট বিষয়ে লড়াই করতে হবে, তা ভাবতেও পারেনি।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত তুলনা চলছিল। একদিকে তার চোখে ভেসে উঠছিল স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের, যাদের প্রেম রোজ দেখা, ছোটখাট ঝগড়া, একটুখানি রাগ, সঙ্গে সঙ্গে মন ভোলা। তাদের সেই হালকা, দৌড়ঝাঁপ ভরা প্রেমের চিন্তাগুলো সহজ, সরল, ভাঙনও ছোট, আর মানিয়ে নেওয়াটাও সহজ। তাদের কাছে প্রেম-ভালোবাসা কতো সহজ, সহজেই নিজের মনের ভাব সামনের ব্যক্তির কাছে উপস্থাপন করতে পারে।
আর অন্যদিকে সে নিজেই, বয়সে বড়, বোঝাপড়ায় আরও পরিণত, তার কাছে তো এগুলো আরও তুচ্ছ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। যে বয়সে ভেবেছিল সবকিছু সহজ হবে, সিদ্ধান্তগুলো পরিষ্কার হবে, সেই বয়সেই উল্টো অনুভব করছে নিজের মনের গভীর দ্বন্দ্ব। একসময় যেসব অনুভূতি নিয়ে হাসাহাসি করত, আজ সেগুলোই যেন তাকে পিছু টানছে। এই ফারাকটা ভাবতে ভাবতে তার মনে হলো, হয়তো সে সোজা জিনিসটাকেই জটিলভাবে দেখছে।
তূর্যরা ওদিক থেকে একের পর এক ডাকছে, কিন্তু তালহা যাচ্ছে না। তার মাথা-হাতের চোট দেখে ওরা সেই আসছে থেকেই মজা উড়াতে শুরু করেছে। এমনকি খোঁচা মেরে গান ও ধরেছে,
“তোর প্রেমে পিছলে আমি মাথা ফাটিয়েছি,
হোক না বয়সের ফারাক, সব সাইডে ফেলেছি,
মাইক নিয়ে বলল সবাই শোন শোন শোন,
বেশ করেছি প্রেম করেছি, করবোই তো।
তাদের এসব ফাজলামো দেখে বিরক্ত হয়ে তালহা এদিকে চলে এসেছিল। কিন্তু তারা ডাকাডাকি করেই যাচ্ছে। না গেলে যে শান্তিতে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেবে না, তা জেনেই বাধ্য হয়ে দোকানের বেঞ্চে গিয়ে বসল। চায়ের কাপটা ছোট ছেলেটার হাতে দিয়ে সি*গারেট ধরাল।
রিশাদ একটু ঝুঁকে তাকালো তার মুখের দিকে, ভ্রু তোলার ভঙ্গিতে বলল,
—ভাই, ব্যাপার কি? অন্যদিন হলে সাতটা বাজতেই বাসায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকিস। যেন বউ অপেক্ষা করছে। আজ দেখছি দশটা বেজে যাচ্ছে কোনো তাড়াই নেই।
সামী তাকে থামিয়ে টিটকারি মেরে বলল,
—আরে বউই তো রেখে আসে বাসায়। দেখছিস না মেহরীন আসার পর থেকে কেমন তাড়া থাকে বাসায় ফেরার?
তাদের কথায় তালহা ঠোঁট শক্ত করে, গরম চোখে তাকাতেই ওরা মিটিমিটি হেসে চুপ হয়ে গেল। তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—বাসায় যেতে অস্বস্তি লাগছে, তাই যাচ্ছি না।
রিশাদ মৃদু হাসল, ছেলেটাকে বেশ অপদস্ত করতে পেরেছে তারা।
—ধুর ভাই, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আরও কতো কি হয়। তুই তো সামান্য টাচই করেছিস।
তার কথায় তালহা বিরক্ত মুখে চোখ উপরে তুলে কয়েকসেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—আমাদের মধ্যে তো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটাই নেই। আমি নিজেই অস্বীকার করেছি তাকে।
রিশাদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—তো কি হয়েছে? শরীয়ত মোতাবেক তো তোদের হালাল সম্পর্ক। সেখানে একটু আকটু টাচ মাচ নরমাল জিনিস।
তালহা বিরক্ত হয়ে চুল টেনে ধরে চোখ শক্ত করে বন্ধ করল, স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল তার ভেতরকার অস্বস্থি। এক মুহুর্ত নিঃশব্দ থেকে অপরাধী কন্ঠে বলল,
—কিন্তু সে আমার ক্যারেক্টারের দিকে আঙুল তুলবে। মেহরীন কি ভাববে আমাকে নিয়ে? আমি নিজেই তার মুখের উপর তাকে অস্বীকার করেছি আবার নিজেই…. ছি হাউ লেইম…।
তালহার কথার মাথামুণ্ডু কেউ বুঝতে পারছিল না।
সামান্য ছোঁয়েছে বলে মেয়েদের মতো এমন নাটক শুরু করেছে কেনো। তূর্য রেগে গিয়ে বলল,
—তুই কি মেয়ে নাকি শা*লা? বউকে টাচ করতেই পারিস, এতে এত ডং করার কি আছে?
হঠাৎ সামী সন্দেহজনক চোখে তাকাল তালহার দিকে। চোখ দু’টো সরু করে, মুখ ফসকে বলে ফেলল,
—তাহলে কি বউ মানিস না মানিস না বলে বলে বাসর সেরে ফেললি?
তার এইসব উলটাপালটা ভাবনা শুনতেই তালহা বড়বড় চোখ করে চেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সামীর পিঠে এক ঘুষি মেরে বসল,
—শা*লা আমি জাস্ট কিস করেছি, আর কিছু করিনি।
তাদের কথার জালে ফেসে সেও যে মুখ ফসকে স্বীকার করে বসল, তা বুঝে মুখটা ভোতা হয়ে গেল তার। এদিকে তার কথা শুনতেই সবাই বিস্ফোরিত চোখে তাকায় তার দিকে। একসাথে চেচিয়ে উঠে,
—কীইইইইইইই?
রিশাদ তালহার কপাল গাল ধরে পরীক্ষা করতে করতে বলল,
—তুই ঠিক আছে তো? জিন ভূত ধরেছে নাকি? কেমনে কী?
তালহা ঝারা মেরে হাত সরিয়ে দিল,
—সর! আমি ঠিক আছি।
এরপর শুরু হলো তাদের ডাবল মজা। কেউ হাসতে হাসতে উল্টে পড়ছে, কেউ বয়স বয়স বলে মাথা খেয়ে ফেলছে। এক কথায় মশলা ছাড়াই যেন তালহাকে রান্না করে ফেলছে একেকজন।
—ভাই, তোকে তো নিরামিষ ভাবতাম। তুইও এসব করতে জানিস, ছি ছি তোর সাথে তো বসতেই লজ্জা লাগছে।
—হো হো আমারও, শালা হেব্বি শেয়ানা। দেখতে মুল্লা কিন্তু টুপির নিচে সব শয়তানি।
—ছি ছি তালহা বেপি তুমিও শেষমেশ বয়সের ফারাক ভুলে…
তাদের একেকজন এমন নাটক করছে যেন সে না জানি কি করে বসেছে। তাদের কথায় তালহাই লজ্জা পাচ্ছে। বেচারার কান লাল হয়ে উঠেছে অলরেডি। রেগে সবকটাকে চেপে ধরে সে,
—আর একটা কথা বলবি তো বংশের বাতি নিবিয়ে দেব। এই আবালের দল দুনিয়ায় এত শুদ্ধ পুরুষ কে আছে? সবাই-ই নিজের বুঝ বুঝে।
রিশাদ গলা থেকে তালহার হাত সরিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
—তাই বলে বউকে অস্বীকার করে আবার তার উপরই অধিকার খাটানো? ছি ছি তালহা হোয়ার গেল উইর সো কলড স্টেইটমেন্ট…
—শাট আপ! আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। সব ওই তাহসানের দোষ।
তাহসান নামটি শুনতেই ছেলেগুলো এবার একটু সিরিয়াস হলো। হাসি মিলিয়ে গেল। সবার চোখে এক প্রশ্ন, তাহসান আবার এলো কোথা থেকে। সে আবার কী করলো? তালহা সি*গারেটে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিল, জুড়ে একটা নিশ্বাস নেয়, শ্বাসটা দীর্ঘ আর রাগে মোড়ানো। যেন ভীষণ রেগে আছে কারো উপর। পকেট থেকে চুইংগাম বের করে মুখে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—মেহরীনকে দেখলেই তাহসান আর তার ওই ইন্সিডেন্টটা মাথায় আসে। আর তখন ভীষণ রাগ লাগে, নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না। কালও তাই হয়েছিল। রাগে কামড়ে দিয়েছি। ইচ্ছে করছিল ঠোঁট, মুখের অবস্থা এমন বানিয়ে দেই। যেন আর কোনো ছেলে ফিরেও না তাকায়।
কথা বলতে বলতে গরম হয়ে উঠল সে। বুক উঠানামা করছে, কপালে হালকা ঘামের রেখা। ফুসতে ফুসতে শার্টের উপরের বোতাম খুলে ফেলল। শরীর থেকে যেন গরম হাওয়া বের হচ্ছে। তার অবস্থা দেখে তারা এবার আর হাসল না। সকলেই অল্প হলেও আন্দাজ করল তার ভেতরের অবস্থা। ছেলেটা নিজের পার্সনালিটি ধরে রাখতে গিয়েই ঠিকমতো ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারছে না। যেন নিজের অনুভূতির সাথে নিজেই লড়ে যাচ্ছে। সে চেষ্টা করছে স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু তার স্বভাব, তার ইগো, তার অভ্যাস এসবকিছুই যেন তাকে আটকে দিচ্ছে অনুভূতি প্রকাশ করতে। কিন্তু যতই আড়াল করে রাখুক, নিজের ভেতরের টানাপোড়েন লুকানো যায় না। এসব মানুষের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়। তাদের মন টানে একদিকে, আর মাথা থামিয়ে দেয় আরেকদিকে।
রিশাদ এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রাখল, বুঝিয়ে বলল,
—যা হওয়ার হয়েছে, ভুলে যা ভাই। ছোট্ট একটা ঘটনা। মেহরীনকে একবার বুঝিয়ে দিস তোর ওইরকম কোনো ইন্টেনশন ছিল না।
তালহা চোখ এড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,
—আমি নাহয় বলে দিলাম তারপর যদি জিজ্ঞেস করে কেন রাগ উঠেছিল? কি বলবো? মেহরীন কি ভাবছে আমাকে নিয়ে? ওর সামনে যেতেই তো কেমন অস্বস্তি লাগছে।
রিশাদ বলল,
—তা ঠিক। তোর একটু ভেবেচিন্তে করা উচিত ছিল। মেহরীন এখনো ছোট। মেয়েটার যদি একবার তোর সাথে আনকম্ফোর্টেবল লাগে, দূরত্ব আরও বেড়ে যাবে কিন্তু। আর ফিউচার নিয়ে ভেবেছিস কিছু?
তালহা প্রশ্নবোধক চোখে তাকাল। তা দেখে রিশাদও সরাসরি বলল,
—মানে তোদের ফিউচার।
তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল চোখ নামিয়ে রাস্তার কংক্রিটের উপর রাখল ধীর গলায় বলল,
—জানিনা, এখনো ক্লিয়ার না। আগে তার দিক ক্লিয়ার হই।
রিশাদরা হতাশ। এ ছেলেটা নিজের অনুভূতি মুখে স্বীকার করতেই চায় না। তবে আগে এমন ছিল না, তালহার বাবা চলে যাওয়ার পর যেন পুরো তালহাটাই বদলে গেছে। ছন্নছাড়া তালহা হঠাৎই গম্ভীর, ভারবহ মানুষ হয়ে উঠেছে। এখন কেমন সবকিছু নিজের ভেতরে রাখে। তবে তারা তো তাকে চিনে তাই জোর করে হলেও কথা বের করেই ছাড়ে। হয়তো এজন্যই হাজার ব্যস্তার ভেতরেও তালহা প্রতিদিন ছুটে আসে তাদের কাছে, একটু শান্তির জন্য। বাইরে যতই রুক্ষ হোক, এই বৃত্তেই তার নিশ্বাস নেওয়ার নিরাপদ জায়গা।এটাই তার একমাত্র কম্ফোর্ট জোন, একমাত্র জায়গা যেখানে সে মন খুলে থাকতে পারে। বন্ধুত্ব এমন এক বন্ধন, যা কখনো রক্তের সম্পর্ক থেকেও ঘন হয়। এই মানুষদের পাশে, মন ভার করে বা দুঃখ নিয়ে বেশিক্ষন টিকা যায় না। তাদের কথা, হাসি, কিংবা শুধুমাত্র পাশে থাকাই যেন সব সমস্যার নীরব সমাধান। বন্ধুত্বের এই ছোঁয়ায়, আমরা একাকীত্ব ভুলে যাই, আর খুঁজে পাই শান্তির ছোট ছোট আলো। যা আমাদের ভালো থাকার পথ দেখায়।
এভাবেই আরও আধাঘন্টা মতো থেকে সকলেই বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়। সবাই যাওয়ার আগে একবার করে বলে যায়,
“সময় থাকতে নিজের টা নিজে বুঝে নে তালহা, তুই মেহরীনের প্রতি অবসেসড স্বীকার কর নিজের মনের অনুভূতি “।
এখন সে নিজেই এক হাতে গাড়ি চালাচ্ছে, বাঁ হাতের হাড়ে চোট লেগেছে, তাই ব্যথা বেশি। ডাক্তার দেখিয়েছিল, বলেছে সমস্যা নেই। ঔষুধ নিলেই চলবে। ড্রাইভ করতে করতে নিজের ভেতরে প্রশ্নটা ঘুরছিল, আসলেই কি আমি ওর প্রতি অবসেসড?
আমি কি মেহরীনের জন্যই বাসায় তাড়াতাড়ি ফিরি? বিয়ের পর কি মানুষ এমনই বদলে যায়? আমিও কি বদলে গেছি? কিন্তু আমি তো এই বিয়ে মানি না, তাহলে বদলালাম কীভাবে? নিজেকে নিজেই বুঝতে পারছে না। ইদানিং সেও খেয়াল করেছে এখন কেমন জানি বাসার জন্য টান লাগে, যেন বাসায় নিজের কিছু ফেলে এসেছে। বাসায় থাকলে শান্তি লাগে। যেন আশেপাশে নিজের কিছু একটা সেইফ আছে মনে হয়। এগুলো কি ভালোবাসা? প্রশ্নটা আসতেই মাথা ঝাঁকাল।
—না না ভালোবাসা এত সহজ না।
বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা বাজে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর মেহরীন মাত্রই বিছানায় শুয়ে ছিল, তাহিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। আজ লোকটা বাসায় ফিরছে না, ছুটির পর আসলো না, পড়াতেও আসেনি। হলোটা কী? কোথায় গেল তালহা? ঠিক আছে তো? বারবার এই ভাবনাই ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মাথায়।
নিচে একবার গিয়েছিল, সোফায় বসে তিতলি বেগম ঘুমে ঢুলছে, ছেলের অপেক্ষায়। তাই বুঝল তালহার আসা এখনো বাকি। এভাবেই নানান কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আবারও বাইরে গাড়ির শব্দ হতেই মেহরীন আবার উঠে দাঁড়ায়। এ নিয়ে অনেকনার গাড়ির শব্দে বারান্দায় গিয়েছে তবে গিয়েই হতাশ তালহাকে না দেখে। এবার বুকভরা আশা নিতে এক ছুটে বারান্দায় যায়, নাহ এবার ঠিকই আছে, তালহাই এসেছে। গাড়ি থেকে নেমে তালহাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখতেই তার অশান্ত মনটা শান্ত হলো। যেন বুকের ভেতরের জমে থাকা ভয়টা বের হয়ে গেল নিঃশ্বাস হয়ে। এরপর চুপচাপ গিয়ে বিছানায় বসে পড়ে। এবার ভাবছে অন্য চিন্তা। কথা বলবে কিভাবে? জিজ্ঞেস করবে কি, কোথায় ছিল এতক্ষণ?
মাত্রই যেহেতু আসলো এখন খেতে বসবে। তাই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় ধরে রাখল, একঘণ্টা পরে বের হবে, তখন হয়তো খাওয়া শেষ হবে। কফি দেওয়ার অজুহাতেই কথা বলে নেবে,ব্যস। ইচ্ছে আর কাজের ফারাক রাখল না সে, ঘুমঘুম চোখে বারোটা বাজা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগল। ঘন ঘন চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল, আবার সোজা হয়ে বসছিল। আজ যেন ঘুমটা অকারণে বেশি চেপে বসছে। কিন্তু ঘুমানো চলবে না, তাই চোখ-মুখে পানি দিয়ে টেবিলে বসল। গালে হাত রেখে বিড়বিড় করতে লাগল,
—আমি যে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে এত উতলা হই, তা কি আপনি জানেন?
বারোটা বাজতেই ওড়নাটা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ল মেহরীন। চারপাশ নিস্তব্ধ, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তালহার দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল লাগানো। নিচে উঁকি দিয়ে দেখল কেউ নেই। লাইটও নিভানো। বাইরের নিয়ন লাইটের আলো ঘরে ঢুকছে। সেই আলোতেই মেহরীন পা টিপে টিপে নিচে নেমে রান্নাঘরে গেল। গিয়েই নিজের কাজে লেগে পড়ল। আজ তারও চা খেতে ইচ্ছে হলো। তাই নিজের জন্যও এক কাপ করে নিল।
বেশ কিছুক্ষন পর, দুই কাপ হাতে নিয়ে রান্নাঘরের লাইট বন্ধ করে তালহার রুমের দিকে এগোয়।
দরজায় দুই তিনবার টোকা দিল,কিন্তু কোনো সাড়া নেই। এবার ধাক্কা দিতে গিয়ে দেখে দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে হতাশ হলো, তালহা নেই। এত রাতে আবার কোথায় গেল? তাহলে আজ আর কথাই হবে না? ভাবতেই মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। চুপচাপ বেরিয়ে আসল। নিজেদের ঘরে যাবার সময় হঠাৎ ছাদের কথা মনে পড়তেই, দ্রুত পায়ে সেদিকে এগোল। ছাদের দরজা খোলা। তা দেখে সেদিকে আগ বাড়ায়। শেষ সিঁড়ি পেরিয়ে দরজার সামনে আসতেই দেখে দূরে রেলিঙে বসে থাকা তালহাকে। হালকা বাতাসে তার শার্ট উড়ছে, হাতের সিগারেটটা জ্বলছে অল্প আলোয়। তাকে দেখতেই মেহরীনের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল।
তবে তার হাতের সেই জিনিসটা দেখে মনটা অদ্ভুতভাবে জড় হয়ে গেল। তালহাও এসব খায়, সে তো জানে এসব বাজে ছেলেরা খায়। ভালো ছেলেরাও খায়? কথাগুলো মাথায় আসলেও এসব ভাবনা পাশ কাটিয়ে সে এগিয়ে গেল। তার পাশে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন করল,
—আপনি এত রাতে ছাদে কি করছেন?
তালহা আকাশের দিকে তাকিয়ে হিসাব মিলাচ্ছিল আর সি*গারেটে টান দিচ্ছিল। আজ কাল এ নেশাটা যেন একটু বেড়েই গেছে। যখনি মনের ভেতর উতালপাতাল লাগে, তখনই চাপ সামলাতে সিগারেটের সাহায্য নেয়। মেহরীনের কণ্ঠে কিছুটা চমকে তাড়াহুড়া করে সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলে দিল। পেছন ফিরে তাকায়, মেহরীনের নিরীহ মুখটা দেখতেই অদ্ভুতভাবে তার মনটা শান্ত হয়ে গেল। সারাদিনের সব ভার যেন হালকা লাগছে। সারাদিন শেষে এই মুখটা দেখলে যেন সব চিন্তা ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। কিন্তু এই স্বীকারটাই তার জন্য কঠিন।
বেশিক্ষণ তাকায়নি, সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে আবার সামনের দিকে রাখল। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—এমনি এসেছিলাম, তুমি ঘুমাওনি?
মেহরীন হাতে থাকা কফিটা এগিয়ে দিল। তালহা কফিটা নিয়ে মুচকি হাসল। মেয়েটা কি তার মন বুঝে যায়? মাথাটা একটু ধরেছিল৷ আর সেও কফি নিয়ে চলে এসেছে। মেহরীন তার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। চোখে অদ্ভুত মনোযোগ নিয়ে তালহাকে দেখতে লাগল,
—খেয়েছেন?
আজ যেন তালহার নিজেকে হালকা লাগছে, মুডটা অন্যরকম হয়ে আছে। আজ আর নিজেকে তার সামনে এতো গম্ভীর করে রাখতে মন সায় দিল না। সে হেয়ালি করে বলল,
—সত্য বলব না মিথ্যা?
মেহরীন একটু এগিয়ে তাকাল তার দিকে। বিস্ময় আর আগ্রহ মিলিয়ে চোখে পড়ল তার। সংক্ষেপ কথার মানুষের মুখে বাড়তি কথা শুনে কিছুটা অপ্রত্যাশিত লাগল। তবে পরমুহূর্তে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
—যদি সত্য বলতে সমস্যা হয়, তাহলে মিথ্যাই বলুন। তবে মিথ্যা বললে পাপ হয়।
তালহা আলতো হাসল। মেয়েটা বেশ কথা ঘোরাতে জানে। ইন্ডিরেক্টলি যে তাকে সত্য বলতেই বলল। শান্ত চোখে তাকিয়ে ধীরে প্রশ্ন করল,
—আর যারা একজনকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্যজনের হয়ে যায় তাদের পাপ হয় না?
মেহরীন কথার কিছুই বুঝল না। চোখে গভীর প্রশ্ন নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে?
তালহা মাথা নাড়িয়ে “কিছু না” বোঝালো। তবে মেহরীনের মনে প্রশ্ন রয়েই গেল। সে কয়েক সেকেন্ড তালহাকে লক্ষ্য করল। কেমন যেন মনে হলো, তালহার মন খারাপ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নরম কন্ঠে জানতে চাইল,
—আপনার কি মন খারাপ?
তালহা একটু চমকে তাকাল। মেয়েটা কি তবে তাকে নিয়ে ভাবছে। মাথা কাত করে আড়চোখে তাকায় তার দিকে। সে তো উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। তালহা ভ্রু তুলে বলল,
—যদি বলি মন খারাপ, তাহলে কি ভালো করে দেবে?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলল,
—হুম।
তার এত আত্মবিশ্বাস দেখে তালহা আর দেরি না করে বলল,
—হুম, মন খারাপ।
বলেই তার চোখ মেহরীনের দিকে স্থির হলো,
এবার সে দেখবে মেয়েটা কি করে তার মন ভালো করার জন্য। এদিকে মেহরীন একটু ভাবনায় পড়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত ভাবনার পর তার মুখে মুচঁকি হাসি ফুটল। তালহা সেই হাসিটা লক্ষ্য করে আন্দাজ করল, হয়তো কোনো বুদ্ধি পেয়েছে। মেহরীন তৎক্ষনাৎ বলল,
—গান গেয়ে শুনান।
তালহা চোখ-মুখ কুঁচকে নিল। তার মন খারাপ দূর করতে তাকেই গান গাইতে বলছে, এটা তার কাছে অদ্ভুতই লাগল। এক হাত রেলিঙে ভর দিয়ে ঝুকে জিজ্ঞেস করল,
—গান গাইলে মন ভালো হয়ে যাবে?
মেহরীন চোখ চকচক করে উঠল,
—হ্যাঁ!
তালহা মাথা এদিক-সেদিক ঝাঁকিয়ে সোজা হয়ে বলল,
—না না, ওতে তোমার মন ভালো হবে, আমার না।
মেহরীন এবার একটু মিনতি মেশানো স্বরে বলল,
—আরে সত্যি, আপনি একটু গেয়েই শুনান। তারপর দেখবেন কিভাবে আপনার মন ঠিক করি আমি।
তালহা ভ্রু তুলে বলল,
—আমি গান গাইলে তুমি কিভাবে ঠিক করবে? তার চেয়ে বরং তুমি গাও, আমার মুড ঠিক হলেও হতে পারে।
মেহরীন দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
—না না তাহিয়া থেকে শুনেছি আপনার গানের গলা খুব সুন্দর। প্লিজ গান না, তারপর আমি প্রশংসা করব। তখন আপনার মন ভালো হয়ে যাবে।
তার এমন সরল উক্তিতে তালহা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
—প্রশংসা শুনলে মন ভালো হয়ে যায়?
মেহরীন সেই একই ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
—হুম। আমার দাদি বলতো, মানুষের প্রশংসা করলে নাকি মানুষ খুব খুশি হয়। প্লিজ গেয়ে শোনান না প্লিজ…প্লিজজজজ!
এই শেষের আদুরে স্বরটা, তালহার ভিতরকে আরও নরম করে তুলল। আবদারটা সে আর ফেরাতে পারল না। মেহরীনের চোখে সরাসরি তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে তালহা গান ধরল,
“কন্যার চিরল বিরল চুল, তাহার কেশে জবা ফুল,
কন্যার চিরল বিরল চুল, তাহার কেশে জবা ফুল,
সেই ফুল পানিতে ফেইলা কন্যা করল ভুল,
কন্যা ভুল করিস না, ওহ কন্যা ভুল করিস না,
আমি ভুল করা কন্যার লগে কথা বলব না..”
গানটা শেষ না করেই তালহা থেমে গেল। মেহরীন প্রথমে গানেই ডুবে ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারল তালহার চোখ দুটো পুরোটা সময় তার ওপরই ছিল। কেমন যেন শান্ত, গভীর, অদ্ভুত দৃষ্টি। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, গানটা যেন তাকে নিয়েই গাইছে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই তা আবার ঝেড়ে ফেলল। সে কে? তাকে নিয়ে গান গাইবে কেনো? নিজেকে নিজেই এইসব প্রশ্ন করে নিজেই অপমানবোধ করল। তবে তালহা হঠাৎ থেমে যাওয়ায় মেহরীন ভাবনা থেকে বেরিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—কি হলো? থামলেন কেনো? ভালোই তো হচ্ছিল।
তালহা রেলিঙ থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখে-মুখে হালকা একটা টান, যেন কিছু একটা চেপে রাখছে। শান্ত গলায় বলল,
—এমনিই ভাল্লাগছে না আর।
তার কথায় মেহরীনের একটু আফসোস হলো, বেশ ভালোই তো লাগছিল শুনতে। আরেকটু গাইলে কি এমন হতো। তবে সবটা নিজের ভেতরেই চেপে রেখে বলল,
—আপনার গানের গলা কিন্তু সত্যিই দারুণ। মনে হচ্ছিল যেন কোনো পেশাদার সিঙ্গারের লাইভ শো দেখছি। মাশাল্লাহ, আপনি চাইলে নিশ্চিন্তে গায়কও হতে পারেন।
মেহরীনের মুখে নিজের গলার প্রশংসা শুনে তালহা মুচকি হেসে উঠল। মেয়েটার প্রশংসা করার পদ্ধতিটা ভালোই কাজে লেগেছে। মানুষ আসলে অনেকসময়ই অবিশ্বাস্যভাবে সরল। তাদের একটু প্রশংসা করলেই গলে যায়, খুশি হয়ে ওঠে। মানুষকে খুশি করা, সত্যি বলতে খুব কঠিন কিছু নয়। দু’হাত বুকে ভাঁজ করে হালকা মজার ছলে বলল,
—ওহ আচ্ছা?
মেহরীন উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল,
—হ্যা সত্যি। আপনি চাইলে শুধু ভয়েজ রেকর্ড করে নেটে ছাড়তে পারেন। তারপর ভাইরাল হয়ে গেলে তো হয়ে গেল, তখন সেলিব্রিটি হয়ে যাবেন। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে সবাই বলবে, আরে আপনি ওই তালহা ভাই না?
মেহরীনের চিন্তাভাবনা শুনে তালহা এবার শব্দ করে হেসে উঠল। হাসিটা এমন, যেন তার বহুদিনের আটকে থাকা অনুভূতি একটু খুলে বেরিয়ে এলো। তালহাকে হাসতে দেখে মেহরীন দ্রুত তার দিকে তাকায়, এই সুন্দর মুহূর্ত মিস করতে চায় না সে। হাসতে হাসতেই তালহা বলল,
—নেটে শুধু ভয়েজ রেকর্ড করে ছাড়লে তারা আমাকে না দেখে চিনবে কিভাবে? হিসাবটা মিলল না।
কথাটা শুনে এবার মেহরীন নিজেই ভাবতে লাগল।
আসলেই তো শুধু ভয়েজ শুনে তো কাউকে চেনা যায় না। ভেবে বলল,
—তাহলে আমরা গায়কদের কিভাবে চিনি? গান দিয়েই তো, তাই না?
—হুম, গান দিয়েই চিনি, তবে তাদের চেহারাও দেখেছি। গানের ভিডিওতে গায়কদের কিন্তু দেখা যায়।
তা শুনে মেহরীন বলল,
—হ্যা, তাহলে আপনিও ভিডিওসহ গান ছাড়লে সবাই চিনবে।
তালহা মাথা নাড়িয়ে তার বাচ্চামিতে সায় দিয়ে ভাবার ভঙ্গিতে বলল,
—আচ্ছা, তাহলে ভেবে দেখি।
তবে এবার হঠাৎই মেহরীনের মাথায় অন্য কিছু এলো। ঝট করে তালহার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
—না না! ভিডিও ছাড়বেন না।
হঠাৎ তাকে এতটা হাইপার হতে দেখে তালহা বিস্মিত চোখে তাকাল। মাত্রই তাকে এতো সুন্দর করে এডভাইস দিচ্ছিল এখন আবার কি হলো। কিছুটা চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করল,
—কেনো?
মেহরীন একটু ইতস্তত করে বলল,
—তখন তো অনেক মেয়েও আপনাকে দেখবে, পছন্দ করবে।
শেষের কথাটা বলতে তার গলা একটু খাদে নেমে আসল। তালহা গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দিকে। ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—আসলেই মেয়েরা পছন্দ করবে আমাকে?
মেহরীন মাথা নেড়ে বলল,
—হুম।
এক সেকেন্ড নীরবতার পর তালহা অপ্রস্তুত একটি প্রশ্ন করে বসল। তার কণ্ঠ নরম, কিন্তু খুব সরাসরি ছিল।
—আর তুমি?
তালহার হঠাৎ এই প্রশ্নে মেহরীন চমকে উঠে। সে তালহাকে পছন্দ করে কিনা, এই প্রশ্নটাই করছে তালহা? ভাবতেই তার ভেতরটা কেমন আলোড়িত হয়ে উঠল, যেন বুকের ভেতর হঠাৎ একটা ঢেউ এসে আঘাত করলো। মেহরীন তালহার দিক থেকে তাড়াহুড়ো করে চোখ সরিয়ে সামনের রাস্তায় চোখ রাখল। আলো-অন্ধকার মিশে থাকা সেই রাস্তাটাকে দেখার ভান করছে। আসলে যে সে নিজের দৌড়ানো হৃদস্পন্দনটাই লুকোনোর চেষ্টা করছে তা বুঝতে দিচ্ছে না। আপাতত তার চোখ রাখতে পারছে না তালহার দিকে, তার দৃষ্টিতে সে আজ প্রশ্নের চেয়েও বেশি কিছু দেখেছে। সেই গভীর, অনুসন্ধানী চোখদুটো মনে হচ্ছিল তার সবকিছু পড়ে ফেলার চেষ্টা করছে।
যে ছেলেটাকে মনে মনে পছন্দ করে, যাকে দেখলেই তার ভেতরে অজানা উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। সেই মানুষ নাকি সরাসরি জানতে চাইছে তাকে পছন্দ করে কিনা। লজ্জা তো লাগারই কথা, মেহরীনেরও গাল হালকা গরম হয়ে উঠেছে। লজ্জা, অস্বস্তি, সব মিলেমিশে এমন এক অনুভূতি তৈরি হয়েছে, যা তার পক্ষে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে গেল যেন।
তাকে অস্বস্তিতে পড়ে যেতে দেখে তালহা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। কাপটা রেলিঙে রেখে নিজেও হেলান দিল। প্রসঙ্গ ঘোরাতে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—তোমরা মেয়েরা কেমন ছেলে পছন্দ করো?
মেহরীনের মুখ থেকে হুট করেই বেরিয়ে গেল,
—আপনার মতো..।
বাক্যটা শেষ হতে না হতেই তালহা তড়িৎ চোখ তুলে তাকায়, তার তীক্ষ্ণ, অবাক একটা দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি সরাসরি নিজের দিকে বুঝতে পেরে মেহরীন তড়িঘড়ি বলল,
—ইয়ে মানে, আপনি তাহসান ভাই, আপনাদের মতো ছেলেকেই পছন্দ করে মেয়েরা।
‘তাহসান’ নামটা শুনতেই তালহার মুখভঙ্গি যেন পাল্টে ফের আগের মতো হয়ে গেল। যে মেজাজ এতক্ষণে একটু ঠাণ্ডা হয়েছিল, আবার যেন তা বিগড়ে গেল। অল্পক্ষণ আগের নরম ভঙ্গিটা যেন মুহূর্তেই উধাও। যেন মেহরীন নিজেই ঠিক করে, আবার নিজেই তার শান্তিতে দাগ কেটে দিলো। হাত মুঠো করে নিয়ে রাগ চেপে ধমক্স উঠল সে,
—এতো রাত হলো, এখনো ঘুমাওনি কেনো?
সুরের এ হঠাৎ পরিবর্তন মেহরীনকে ভড়কে দেয়। মাথায় ঘুরতে লাগে এর আমার হঠাৎ কি হলো? কি বলল সে যে রেগে গেল? মনে মনে খুঁজে দেখল কি কি বলেছে সে, তবে তেমন কিছুই পেল না। যা তাকে রাগিয়ে দিবে। তার ভাবনার মাঝে তালহা আবারও একই প্রশ্ন করতেই সে ধীরে বলল,
—এমনি ঘুম আসছিল না।
—তো ছাদে এসেছিলে কেনো?
এবার উত্তর না দিয়ে মেহরীন নিজের মনের যেই প্রশ্ন নিয়ে এসেছিল তা উল্টো জিজ্ঞেস করে বসল,
—আপনি আজ এতো দেরি করে এলেন কেনো?
তালহা তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে গলা আরেকটু শক্ত করে বলল,
—এটা আমার উত্তর নয়।
কথাটা মেহরীনের মনে কেমন খোঁচা দিল। এতক্ষণ ভালোভাবে কথা বলার পর হঠাৎ এত রূঢ় কন্ঠস্বর, একটু খারাপ লাগল তার। মাথা নিচু করে নরম কণ্ঠে বলল,
—আপনি আজ পড়ালেনও না, তাই জিজ্ঞেস করতে এসেছিলাম।
তালহা একটা জুড়ে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
—কেনো? পড়তে গিয়ে সমস্যা হচ্ছিল? কোনটা বুঝোনি? বলো এখন-ই বুঝিয়ে দিচ্ছি।
মেহরীন কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে রইল, চোখে তার দুর্বলতা, কিছু বলার চেষ্টা, আবার থেমে যাওয়া। খুব আস্তে করে বলল,
—এখন ফিজিক্স,কেমিস্ট্রি, কিছুই বুঝতে চাই না, আমি আপনাকে একটু বুঝতে চাই।
কথাটা কানে আসতেই তালহা থমকে গেল। মেয়েটার চোখে এখন সত্যি সত্যি তাকে বোঝার বাসনা, এটা সে এড়াতে পারল না। মেহরীন যেন চোখের ভাষায় বলতে চাইছে অনেক কিছু। কিন্তু তালহার মনে আবার ফিরে এলো পুরনো সেই সন্দেহ, চিঠি? তাহসান? সে কি তবে ভুল ভাবছিল এতদিন? নাকি মেহরীন সম্পর্কে এখনের ভাবনা তার ভুল। সে তো মানুষের চোখ পড়তে পারে। নিজের বেলায় কেন পড়তে অক্ষম হচ্ছে। মনে সন্দেহের ঝড় নিয়েই প্রশ্ন করল,
—আমার কি বুঝতে চাও?
মেহরীন কোনো দ্বিধা না রেখে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—পুরো আপনিটাকেই বুঝতে চাই..!
—আমাকে বুঝে কি হবে?
মেহরীন ধীরে হাসল, চোখ নিচু,
—অনেক কিছু।
—যেমন?
—যেমন আপনাকে ভালো রাখতে পারব। বোঝাবুঝি হলেই তো বনিবনাও হয়।
কথাটা শুনে তালহার ভেতরটা হালকা দুলে উঠল। কিন্তু গম্ভীরমুখে জিজ্ঞেস করল,
—আমাদের বনিবনা হয়েও কি? সবসময় কি একসাথে থাকব?
তালহার কথাটুকু যেন মুহূর্তেই হাসিখুশি মেহরীনকে অন্ধকারে ঠেলে দিল। তার ভেতরটা হঠাৎ ব্যথাতুর হয়ে উঠল। মাথা নিচু হয়ে গেল নিজে থেকেই। মনে ভাবনা আসতে লাগল, আসলেই তো তারা কি সবসময় একসঙ্গে থাকবে? তালহার তো একদিন না একদিন বিয়ে হবেই। তখন সে কোথায় থাকবে? কেন সে নিজেকে বারবার তালহার ভাবনায় ডুবিয়ে ফেলছে? কেন বাস্তবতা ভুলে যায় বারবার? মেহরীনের এই নীরবতা দেখে তালহা ভেবে নিল তার পুরো উল্টো।
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে।
তখনি মেহরীন মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি চান?
তালহার নিরব চাহনির স্থির হলো মেহরীনের চোখে।
—আমি চাই তুমি ভালো থাকো, আবেগ বাদ দিয়ে নিজেকে নিয়ে ভাবো। তুমি বড় হলে আমি নিজে ভালো পাত্র দেখে তোমাকে বিয়ে দিব, খুব হ্যাপি রাখবে তোমায়।
কথাটা বলতে বলতে তালহা ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য এগোল। তার গলার সুরে অদ্ভুত ভার, যেন নিজেকেও বোঝাতে কষ্ট হচ্ছে। সিঁড়ির কাছে এসে একটু থেমে ফিরে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২২
—আমি কিন্তু সবসময় এভাবে পাশে থাকব না তোমাকে বুঝানোর জন্য। নিজের বুঝ নিজে বুঝতে শিখো, মেহরীন। আই নো, ইউ আর আ ব্রিলিয়ান্ট গার্ল। ঘরে গিয়ে এখনই ঘুমিয়ে পড়বে।
বলেই যেতে নিলে, মেহরীন আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। এক ছুটে গিয়ে তালহার হাত দু’হাতে আঁকড়ে ধরে। তালহা জায়গায় থেমে দ্রুত চোখে সেদিকে তাকাতেই মেহরীনের চোখ বেয়ে দু’ফোটা পানি নেমে এল। নিস্তেজ কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
—আপনি আছেন বলেই আমি এতো ভালো থাকি,
আপনি না থাকলে আমি কোনোদিনই ভালো থাকতে পারব না….
