Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৯

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৯

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৯
সাইদা মুন

রাত এগারোটা বেজে ত্রিশ মিনিট।
তালহারা মেডিকেল থেকে সদ্য বাসায় ফিরেছে। সঙ্গে আছে তালহার মামাতো ভাই-বোন, ছোট মামী-মামা আর নানুরা। তাহসানের বাবা-মা ছেলের সঙ্গে মেডিকেলে থাকবে তাই আসেননিম আর তাদের সাথে রয়েছে মারুফ। অর্থাৎ, তালহার ছোট মামার ছেলে। তাই তালহা বাসায় চলে এসেছে।
বাড়ির সবাই তাদের আগমনের জন্য অপেক্ষায় ছিল। বাসায় ঢুকতেই ফারিহা ও রাফা ঝাপিয়ে পড়ল মেহরীন ও তাহিয়ার উপর। অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় সকলেই উচ্ছ্বসিত। তনিমার সঙ্গে ইতিমধ্যেই মেহরীনদের ভাব জমে গেছে, তাই তার সঙ্গেও রাফাদের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। বাকিরাও একে একে সকলের সঙ্গে টুকটাক ভালোমন্দ কথায় ব্যস্ত।

রাত বারোটা পনেরো বাজে। সকলেই রাতের খাবার খেয়ে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। শুধু তালহা আর তার মামা-চাচারা বাদে। ফারহা আর তালহার ছোট মামি তাহেরা বেগম তনিমাকে মাঝে রেখে বসে আছে। আর বাকিরাও আশেপাশের সোফায় চেয়ারে তাদের ঘিরে বসে আছে। এই মুহূর্তে সবার মধ্যমনি একজনই, তা হলো তনিমা। ফারহা তো তাকে স্নেহে দু’একবার জড়িয়ে ধরে আদর করেও দিয়েছে।
ফারহা আবেগে ভরা কণ্ঠে বারবার বলছে,
—তোমাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেবো। আমার ভাইয়া, আমাদের পুরো পরিবারের জান বাঁচিয়েছ তুমি। ভাইয়ার কিছু হলে মা যে পাগল হয়ে যেতেন!
সবার এত এত প্রশংসায় তনিমার লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠছে। নিজের নামে সরাসরি এতো প্রশংসা কি শোনা যায়। তাকে থামাতে ফারহার হাত আলতো করে ধরে মুচকি হেসে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—আপু, এভাবে বলবেন না। আমি তো শুধু আমার দায়িত্বটাই পালন করেছি। একজন মানুষকে বিপদে ফেলে রেখে চলে যাওয়া কখনোই ঠিক নয়। যেখানে পারি, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মানুষ হিসেবে দায়িত্ব শুধু নিজের প্রতি নয়, অন্যের প্রতিও সমানভাবে থাকে। আমি শুধু আমার কাজটা করেছি। তাই দয়া করে আমাকে বাড়তি প্রশংসা করবেন না।
তার এমন গুছানো, পরিপক্ব কথাবার্তায় সবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মেয়েটা বয়সে ছোট হলেও কথাবার্তা সুন্দর বলে। এতেই তো সকলের মন জয় করে নেয়। তালহার নানু হাতের ইশারায় কাছে ডাকলে তনিমা উঠে গিয়ে তার পাশে বসে। নানু তার চেহারায় হাত বুলিয়ে, আলতো করে থুতনি ধরে মমতাভরা হাসিতে বললেন,
—অনেক গুছিয়ে কথা বলতে পারো দেখছি। মাশাল্লাহ, যেমন তোমার কাজকর্ম, তেমন তোমার কথাবার্তাও। এমন মনমানসিকতার মেয়ে ক’জনই বা হয়!

তনিমাকে সবাই এত মাথায় তুলছে দেখে রিতুর মেজাজ একেবারে বিগড়ে গেল। তার মনে তো একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে, “এই মেয়েটাকে নিয়ে এত মাতামাতি কেন? যার নেই ঠিকঠাক পরিচয়, নেই নিজের বাড়ি, নেই কোনো ঠিকানা, তাকে নিয়ে এভাবে নাচার কী দরকার? সাহায্য করেছে টাকা দিয়ে বিদেয় করো শেষ। ” বিরক্তি যেন বেড়েই চলেছে তার ভেতরে। তাই কথার মাঝে ফোঁড়ন কেটে বলে উঠল,
—এটাকে গুছিয়ে কথা বলে না। এটাকে বেশি কথা বলে। বাচাল মেয়ে, সব বিষয়ে খালি পক পক করে!
রিতুর ঠ্যাস মারা কথায় তনিমা পিটপিট চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। পাল্টা ঠ্যাস মারতে মুখ খুলছিলই, ঠিক তখন মেহরীনের কথায় থেমে যায় সে,

—আপু, এভাবে বলছেন কেন? ও তো খারাপ কিছু বলেনি।
মেহরীনের মুখ থেকে উত্তরটা বেরিয়েই যেন রিতুর মনের আগুনে আরও ঘি পড়ল। চোখ-মুখ শক্ত করে ঝাড়ি মেরে বলে উঠল,

—ওই মেয়ের দেখাদেখি তোমারও মুখে খই ফুটতে শুরু করেছে নাকি? কথা শিখে যাচ্ছো?
কথাটুকু শুনেই মেহরীন চুপসে গেল। রিতুর আচরণ ঘরটাকে মুহূর্তে ভারী করে তুলল। সে তো ভালোভাবেই কথা বলেছিল। তবুও রিতুর তার সঙ্গে এমন আচরণ। মেহরীনের মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে গেল। রিতুর সাথে মিশতে সে বহু চেষ্টা করেছে, কিন্তু অপমান ছাড়া রিতুর মুখ থেকে
একটা ভালো কথাও সে কখনো পায়নি। তবু এসব নিয়ে মেহরীন সাধারণত ভাবেও না। সে জানে, দশ জনের মধ্যে দুইজন তো ত্যাড়া হবেই, ওদের মানিয়ে নিয়ে চলতে পারলেই জীবন সহজ। এই ভাবনা থেকেই মেহরীন এবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে নিল। বাকিরাও রিতুর আচরণে চুপ মেরে গেল। কারোই ভালো লাগেনি ব্যাপারটা। তানিয়া বেগম এত মেহমানের সামনে
মেয়েকে কী বলবেন না বলবেন, তাই লজ্জায় নিশ্চুপ বসে রইলেন। তালহা থাকলে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই রিতুকে ঝারি দিত তার ব্যবহারে, কিন্তু সে তো উপরে। হয়তো অফিসের কাজে ব্যস্ত। মেহরীন একবার উঁকি দিয়ে দেখেছিল ল্যাপটপে ডুবে আছে মহাশয়।

তবে নিরবতার মাঝখান থেকে একজন মজার ছলেই রিতুকে পাল্টা জবাব দিয়ে বসল
—পাশের বাসার কিছু আন্টি থাকেনা? তাদের সামনে বেশি কথা বললে বাচাল, কম কথা বললে বোকা, আর হঠাৎ করে কথা বললে, ও মা গো কথা শিখে গেছে! আমার তো মনে হয় রিতু আপুর মাঝেও সেই পাশের বাসার আন্টির ভূতটাই ভর করেছে!
নিরবতার মাঝে তনিমার এমন কথায় হঠাৎ চারদিকের সকলে ফেটে পড়ল হাসিতে। একেকজন তো হাসতে হাসতে বলছে, রিতুর উপর নাকি সত্যিই পাশের বাসার আন্টির ভূত ভর করেছে। সবার এই খিলখিল হাসি রিতুকে আরও রাগিয়ে তুলল। সে কটমট চোখে তনিমার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর গটগট পায়ে জায়গা থেকে উঠে
সোজা উপরের দিকে হাঁটা দিল। যেতে যেতে রাগে গজগজ করে বলে উঠল,

—বেহায়া মেয়ে, বেশি কথা বলে!
রিতু যেতেই তানিয়া বেগম তনিমার দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বললেন,
—কিছু মনে করিস না মা, রিতুটা একটু ত্যাড়া স্বভাবের।
তনিমা মাথা নেড়ে আশ্বাস দিল সে কিছু মনে করেনি। কিন্তু পেটের কথা চেপে রাখল না, হাসিমুখেই তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

—আন্টি, রিতু আপুকে পেটে নিয়ে তুমি কাকে বেশি দেখতে? রিনা খানকে, নাকি ঘষেটি বেগমকে?
এক মুহূর্তে আবার পুরো ড্রয়িংরুমজুড়ে হাসির রুল পড়ে গেল। সকলেই গল্প, আড্ডা আর হাসাহাসিতে মেতে আছে। এইসবের ফাঁকে হঠাৎ ফারহা চুপচাপ উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
মেহরীন লক্ষ্য করলেও তেমন গুরুত্ব দিল না। কিন্তু প্রায় পাঁচ মিনিট পর, রান্নাঘর থেকে কফির মগ হাতে বেরিয়ে আসতে দেখেই মেহরীনের বুকটা ধক করে উঠল। ফারহা সোজা উপরের দিকেই উঠছে, বোঝাই যাচ্ছে এই কফিটা তালহার জন্যই নেওয়া। মুহূর্তেই মেহরীনের মনটা গুছিয়ে রাখা সব ভাবনাসহ ধপ করে নিচে নেমে গেল। সে তো ভেবেছিল, সবাই একটু রুমে গেলে কফির বাহানায়
চুপিচুপি তালহার রুমে যাবে। তার সাথে একটু কথা বলবে। কিন্তু ফারহা যেন সেই সুযোগটাই
হাতিয়ে নিল। তপ্ত শ্বাস ফেলে মেহরীন চুপচাপ বসে রইল। অকারণ মনখারাপের ভারটা যেন ধীরে ধীরে তার বুকের ওপর জমতে লাগল।

এভাবে আরও দশ মিনিট কেটে যায়, তবু ফারহার আসার কোনো খোঁজ নেই। ধীরে ধীরে মেহরীনের ভেতরের অস্থিরতাগুলো মাথা তোলে, ফারহা কি এখনও তালহার রুমেই আছে? মেয়েটার তালহার প্রতি যত্নশীল আচরণগুলো মেহরীনের একদমই ভালো লাগে না। এত মানুষ থাকতে কেন শুধু তালহার কাছেই তাকে যেতে হয়। এ প্রশ্নটা মেহরীনের মনে বারবার খোঁচা দেয়। তবে নিজেকে বারবার বোঝাতে চায়, ওরা নরমাল ভাইবোনের মতো, আমি নিশ্চয়ই বেশি ভাবছি। কিন্তু তালহার বড় মামির সেই প্রথমদিনকার “জামাই” বলে সম্মোধনটা মনে আজও কাঁটার মতো লেগে আছে।

চাইলেও তুলে ফেলতে পারছে না, উল্টো মনে মনে ভয়টা আরও গভীরে গেঁথে যাচ্ছে। হঠাৎই বুকের মধ্যে একটা আশঙ্কা দানা বাঁধে, যদি সত্যিই এই কথায় কোনো গোপন ইঙ্গিত থাকে? যদি তার আশঙ্কাই সত্যি হয়ে দাঁড়ায়? তাহলে তার অবস্থাটা কী হবে?
তালহাকে কেন্দ্র করেই তো মেহরীন আজকাল নিজেকে দাঁড় করিয়েছে। দিনের শুরু হয় তাকে ভেবে শেষ ও হয় তাকে ভেবেই। তালহা যেন তার মেরুদণ্ড, যে না থাকলে সে সোজা ঘুরে দাঁড়াতেও পারবে না। তার পুরো পৃথিবীটাই তালহার চারপাশ ঘুরে। সেই মানুষটাকে অন্য কারও হাতের ছায়ায় হারিয়ে ফেলার চিন্তা মেহরীনের মনে ধীরে ধীরে
ঘন কুয়াশার মতো ভয় তৈরি করছে। যা তাকে প্রতি মুহূর্তে আরও দুর্বল করে তোলছে।

আর বসে থাকতে পারল না। বাহানা দিয়ে উঠে উপরে চলে গেল সে। তালহার দরজার সামনে দিয়ে দু’একবার চক্কর দিল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো শব্দ শোনা যায়নি, দরজাও বন্ধ। অশান্তির এই নিঃশব্দ চাপ যেন তার ধম বন্ধ করে দিচ্ছিল। ভেতরে ফারহা আছে নাকি নেই, এই চিন্তায় সে একাকার। কী করবে, কিভাবে যাবে, এই ভাবনাগুলো ঘিরে ঘিরে মাথা ভারী হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ মাথায় একটা আইডিয়া আসতেই। দৌড়ে নিজের ঘরে ফিরে গেল। হাতে খাতা-কলম নিয়ে আবার তালহার রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। কিছু না ভেবে, দ্রুত পায়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ঢুকতেই চোখে পড়ল সোফায় বসা তালহাকে। হাটুতে ল্যাপটপ রেখে, চশমা চোখে, মনোযোগের সঙ্গে কাজ করছে। টি টেবিলে রাখা কফির মগটিও তার নজরে পড়ল। তা দেখতেই হঠাৎই হালকা রাগ লাগল। এদিকে তালহার মনোযোগ হঠাৎ নষ্ট হয় কারো আগমনে। চোখ তুলে তাকাতেই মেহরীনের মুখটা দেখে আলতো হেসে উঠে। তবে পরমুহূর্তেই হাসিটা মিলিয়ে যায়। দ্রুত উঠে গিয়ে দরজাটি ভেতর থেকে লাগিয়ে মেহরীনের সামনে এসে দাঁড়ায়, পকেটে হাত দিয়ে। এদিকে মেহরীন আশেপাশে চোখ বোলাতে ব্যস্ত। সে খুঁজছে ফারহা আছে কিনা। সামনে যে তালহা দাঁড়িয়ে সে খেয়াল নেই। তবে তালহার কথায় তার ধ্যান ভাঙে, সঙ্গে সঙ্গে সে তার দিকে তাকায়।

—হঠাৎ কি মনে করে?
তালহার প্রশ্নে মেহরীন আমতাআমতা করতে লাগে। সে তো নিজের সন্দেহ দূর করতে এসেছিল, তবে তা বলা সম্ভব নয়। মাথা নেড়ে বলল,
—আসলে আমি একটা ম্যাথ বুঝিনি, একটু বুঝিয়ে দিন।
মেহরীনের কথায় কয়েক পলক তার চোখের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেয়েটি নেহাতই মিথ্যে বলছে, তা তার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তালহা হাত দিয়ে সোফার দিকে ইশারা করে বলল,
—বসুন, ম্যাম।
মেহরীন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ে। তার পাশে তালহা তৎক্ষনাৎ বসেছে। তবে তার সেদিকে খেয়াল নেই, তার চোখ বারান্দায়। কারন বারান্দার দরজা খোলা, ফারহা কি ওখানে? ওখানে না থাকলে কোথায় থাকবে নিচেও তো নেই। মেহরীনের এতো হাসফাস লক্ষ্য করে তালহা কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করল,

—এনিথিং রং?
তালহার গলায় চমকে উঠে তার দিকে ফিরে বলল,
—না না…
—তাহলে দেখান কোনটা বুঝেননি।
মেহরীন ছটফট হাতে একটা পেইজ বের করে আগের করা একটা অংক বের করে সামনে রাখল। তারপর এটা দেখিয়ে বলল,
—এ..এটা, এটা বুঝিনি।

তার কথা শুনে তালহা কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার এহেন চাহনিতে মেহরীন কিছুটা থতমত খায়। তালহা কি তবে তার আসল উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছে? চোখের চাহনি তো তাই বলছে। ছি, যদি বোঝে তো তাকে কী ভাববে? এই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ তালহা মেহরীনের হাত থেকে কলমটা সরিয়ে
টি টেবিলে রেখে দেয়। তারপর মেহরীনের কোলের ওপর নিজের মাথা রেখে সোফায় শুয়ে পড়ল। তালহার এই আচরণে মেহরীন হকচকিয়ে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ ছোঁয়ায় যেন মেয়েটি জমে গিয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেছে। চোখ বড় বড় করে কোলের ওপর রাখা তালহার মুখটা দেখছে। তালহাও চুপচাপ তাকিয়ে। কিছুক্ষণ মেহরীনকে নীরবে দেখে,
তারপর তার অবস্থা বুঝতে পেরে ঠোঁট প্রসারিত করে টেডি স্মাইল দেয়।
মেহরীনের হতবাক অবস্থা যেন আরও বেড়ে উঠছে। চোখ যেন কোটর থেকে বের হওয়ার উপক্রম। তালহার আচরণ তাকে দিনকে দিন বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। তালহা মেহরীনের এক হাত নিয়ে নিজের চুলের ওপর মৃদু ছোঁয়ায়। অতঃপর নরম কণ্ঠে তালহা বলল,

—আপনি এই ম্যাথটা ভালো করেই পারেন। এখন আসল কথায় আসুন।
তালহার কথায় থমকে যাওয়া চেহারা আরও ফেকাসে হয়ে উঠল। মেহরীনের মন কেমন যেন ঘুমন্ত খাম থেকে ঝপ করে উঠল। চোর ধরা পড়ার মতো অবস্থা এখন তার। তবে ফারহার ব্যাপারটা বলা যাবে না। তাই ইনিয়েবিনিয়ে বলল,
—আপনার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।
কথাটুকু শুনতেই তালহা হালকা করে মুচকি হাসল। সেই হাসি দেখে মেহরীন এবার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে অসন্তুষ্ট কন্ঠে বলল,

—আপনি হাসলে দাঁত বের করে হাসবেন।
তালহা ভ্রু কুচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কেনো?
মেহরীন এক চিলতে হেসে বলল,
—ওভাবে হাসলে আপনার বাম দিকের গেজ দাঁতটা বের হয়ে আসে। অনেক সুন্দর লাগে।
তার কথাতেই এবার তালহা দাঁত বের করেই হেসে উঠল। মেয়েটির কথার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন যেন মুখে এক অপ্রকাশ্য উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। তার হাসি দেখে মেহরীনও হালকা করে হেসে বলল,
—এইবার ঠিক আছে।
একপর্যায়ে তালহা এক হাত মেহরীনের চুলের পেছনে নিয়ে মাথা ধরে। হালকা টানে তার মুখটি নিজের মুখের একদম কাছাকাছি নিয়ে আসে। পরপরই নাকের সাথে নাক ঘেঁষে বলে ওঠল,

—একটু চুল টেনে দিবেন ম্যাডাম?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাকিয়ে আস্তে আস্তে নরম হাতজোড়া দিয়ে চুল টানতে লাগল। তালহা চোখ বন্ধ করে নেয় আরামে। ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে সে, যেন দেহের প্রতিটা ক্লান্তি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। চেহারায় স্পষ্ট অসুস্থতা, যা এতোক্ষণ মেডিকেলে থাকার প্রভাব। এক হাতে চুল টানছে, অন্য হাতে কপাল টিপছে মেহরীন। এরমাঝে একবার নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—খুব ক্লান্ত আপনি?
তালহা চোখ বোঝা অবস্থাতেই মৃদ্যু হেসে বলল,
—ছিলাম। তবে এখন আপনার সেবায় সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে।

তালহার কথায় মেহরীন হেসে ফেলল শব্দ করে। হাসির শব্দ শুনেই তালহা চোখ খুলে এক পলক তাকাল, মেহরীনের হাসিমাখা মুখটা তার দৃষ্টিতে ধরা পড়ল। তা দেখেই আবার চোখ বন্ধ করে নিল সে। তালহার চোখ বন্ধ হতেই মেহরীনও হাসি চেপে নিল, তারপর আরও যত্ন করে তার চুলগুলো টেনে দিতে লাগল।
তালহার এই ঘরটায় এলে মেহরীনের ভীষণ ভালো লাগে। এ ঘরের প্রতিটা কোণায় যেন শুধু তালহার গন্ধ, তালহার স্পর্শ, তালহার ছায়া। থাকতে ভীষণ ইচ্ছেও করে। তবে থাকবার মতো অধিকার থাকলেও পরিস্থিতি নেই। এ ভেবে তার বুকটা হালকা চিনচিন করে ওঠে। মনে প্রশ্ন জাগে, তাদের বিয়েটার কথা এই পরিবারের কেউ কোনদিন জানতে পারবে? আর জানলেও, তাকে মেনে নেবে তো?

ভাবনার ভেতরেই কয়েক মিনিট কেটে যায়। তালহা তখনো চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। মেহরীন ধরে নিয়েছে তালহা ঘুমিয়ে পড়েছে। আর সেই সুযোগেই সে খেলতে শুরু করেছে তালহার চুল নিয়ে। কখনো লাভ বানাচ্ছে, তো কখনো আবার মেয়েদের মতো করে উপরে বেঁধে দিচ্ছে। তার এমনই কাণ্ডকারখানার মাঝখানে হঠাৎ তালহা নিচু স্বরে ডেকে উঠল,

—মেহরীন…
তালহার মুখে হঠাৎ নিজের নাম শুনে হাত থেমে যায়। মেহরীনের ভেতর যেন একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। কেমন অচেনা উচ্ছ্বাস আর মৃদু লাজ মুখে ভেসে উঠল। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণটা নরমভাবে হাসিতে বাঁক নিল। তার মনটা হঠাৎ কেমন গরম হয়ে উঠল, হৃদয় যেন দ্রুত তালে ধাক ধাক করতে লাগল।
কথার মাঝে ভালোবাসার মানুষের মুখে নিজের পুরো নাম শুনলেই মেয়েরা যেন মুহূর্তেই গলে যায়। এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভেসে ওঠে মেয়েদের মন। আর ছেলেরা এই ছোট্ট কিন্তু শক্তিশালী কৌশলটি বেশ চতুরভাবে ব্যবহার করে, মেয়েদের অনুভূতিকে নরম করতে এবং মন জয় করতে। যেমনটা তালহা করছে। সে আবারও ডেকে উঠল মেহরীনের নাম ধরে আরও কোমল কন্ঠে,

—মেহরীন…
মেহরীন ধীর গলায় জবাব দিল,
—হুম…
—এভাবে হুটহাট ঘরে আসবেন না কেমন?
কথাটা শোনার পরই মেহরীনের মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে যায়। আবার একটু ইগোতেও লাগল। তাকে আসতে মানা করছে। তবে কি তালহা বিরক্ত তার আসাতে? তাকে চুপ দেখে তালহা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
—মন খারাপ করলেন বুঝি?
মেহরীন আস্তে করে বলল,
—না..
তার কথা শুনতেই তালহা ফট করে তাকায়। মেহরীনের মুখে চোখ আটকে রেখে কিছু বোঝার চেষ্টা করে। কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে মৃদু কণ্ঠে বলল,

—তবে আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে মনটা খারাপ হয়ে গেছে।
কথাটা শুনে মেহরীন মাথা নিচু করে ফেলল। মাথা হালকা দোলাতে দোলাতে অভিমানী সুরে বলল,
—না, তেমন কিছু না।
মেহরীনের এই অভিমানী সুর শুনে তালহা মনে মনে হাসল। শোয়া থেকে ধীরে উঠে বসে। মেহরীন তখনও মাথা নিচু করে বসে আছে। বিছানা থেকে উঠে গা ঝাড়া দিয়ে তালহা বেডসাইডের ছোট টেবিলের দিকে এগোয়। উপরের ড্রয়ার থেকে কিছু একটা নিয়ে আবার ফিরে আসে। মেহরীনের পাশে বসে হঠাৎ তার পা ধরে। হঠাৎ কান্ডে মেহরীন হকচকিয়ে উঠল। দ্রুত পা সরাতে চাইলে তালহা তা আটঁকে দেয়। তার এক পা আঁলতো করে সোফার ওপর তুলে রাখে।
তা দেখে মেহরীন অস্থির হয়ে বলল,

—কি করছেন? আপনি আমার পা ধরছেন কেনো?
তালহা হাতের প্যাকেটটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে শান্ত স্বরে বলল,
—মন খারাপ যেহেতু হয়েছে আমার জন্য, তাহলে মন ভালো করার দায়িত্বটাও তো আমার।
তালহার কথায় মেহরীন চুপ করে যায়। সে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে। তালহা এখন কী করবে তার মন ভালো করতে, তা জানতে ইচ্ছুক। তালহা হাতের প্যাকেটটা ছিঁড়ে ভেতর থেকে একজোড়া নুপুর বের করে। তারপর সযত্নে এক পায়ে তা পরিয়ে দিতে লাগে। মেহরীনের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। লোকটা সত্যিই ভীষণ খেয়ালি। নিজেই জখম দিল, নিজেই আবার তার চিকিৎসা করছে।
নুপুর পরানোর ফাঁকে একবার চোখ তুলে মেহরীনের দিকে তাকিয়েই তার হাসিটা দেখে বলল,

—মন ভালো হয়েছে?
মেহরীন মাথা নেড়ে ‘হ্যা’ বলতেই তালহা তার অন্য পা’টাও আলতো করে তুলে সেই পায়েও নুপুর পরাতে লাগল। পায়ের দিকে তাকিয়েই স্বল্প স্বরে বুঝিয়ে বলল,
—বুঝলেন ম্যাডাম, আপনি এখন যথেষ্ট বড় হচ্ছেন। আর সকলের চোখে আমি একজন অবিবাহিত ছেলে। তো একটা অবিবাহিত ছেলের রুমে একটা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে দেখলে কি ভাববে বুঝতে পারছেন? যদিও আপনি আমার চোখে এখনো অনেক ছোট।
তালহার কথায় এবার মেহরীনের মাথায় আসলো আসল ঘটনা। সে কেনো তাকে তার ঘরে আসতে মানা করেছিল। সত্যিই তো, একটা ছেলের ঘরে অচেনা মেয়েকে দেখলে মানুষ খারাপই ভাববে। তবে তালহার কথা শুনে সে এবারও কোনো জবাব দিল না, শুধু মাথা নেড়ে হ্যা বোঝাল।

তা দেখে তালহা উঠে দাঁড়ায়। মেহরীনও সাথে সাথে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক হাঁটতে লাগল। নুপুরে তেমন শব্দ নেই, কিন্তু নড়ালে কেমন যেন ভালো লাগছে। তার এই নিঃশব্দ বাচ্চামো দেখে তালহা মুচকি হেসে সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর হঠাৎ তার হাত ধরে বারান্দার দিকে নিয়ে গেল।
মেহরীনকে নিজের সামনে এনে দু’হাতে তার দু’ বাহু ধরে গভীর চোখে চেয়ে বলল,
—আপনি আমার স্ত্রী, আর আপনার সম্মান রক্ষা করা স্বামী হিসেবে আমার দায়িত্ব। আমাদের বিয়ের কথা এখনো কেউ জানে না। তাই চাই না এই সত্য জানার আগেই কেউ আপনার দিকে বা আপনার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলুক। সেই কারণেই আমি আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে চাই, বুঝলেন?

তালহার থেকে তাকে ঘিরে এমন সুরক্ষামূলক কথায় মেহরীনের মনটা পরক্ষণেই নরম হয়ে উঠে। চোখ ভিজে উঠে। তালহার থেকে নিজের প্রতি দায়িত্ব, সম্মান আর গভীর অনুভূতির অনুভব পেয়ে তৃপ্তির ঢেউ ওঠে মনে।
মেহরীনের চোখে পানি দেখে তালহা বাহু থেকে হাত সরিয়ে তার দু’গাল আগলে নেয় নিজের হাতের মধ্যে। চোখ মুছে হালকা স্বরে গেয়ে উঠল,

“তুমি তো চেয়েছিলে
ঠিক এমনি একজন..
দেখো না আমি পুরোটাই
তোমার ইচ্ছে মতন..
তুমি আমার অনেক শখের
খুঁজে পাওয়া এক প্রজাপতি নীল,
আমি রংধনু রঙে সাজিয়েছি
দেখ এক আকাশ স্বপ্নীল…”

মেহরীন চোখ বন্ধ করে তালহার বুকে মাথা ফেলে এলিয়ে দেয়। তালহাও খুব যত্ন করে তাকে আগলে নিল। মেহরীন হালকা ফুপিয়ে কাঁদছে, আর তালহাও তাকে কোনো বাধা দিচ্ছে না। মেয়েটার মনের সব দুঃখ যদি তার বুকেই কান্নায় ভেসে বেরিয়ে যায়। তাহলে এর চেয়ে ভালো আর কীই বা হতে পারে। মেহরীন ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
—আমার জীবনে যত মানুষকে ভালোবেসেছি, ততজনই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আপনি কখনো যাবেন না তো আমায় ছেড়ে?
তালহা আলতো করে তার মুখটা তুলে স্পষ্ট ও দৃঢ় গলায় বলল,

—আমি আপনাকে আর ছাড়ছি না। রাগের বসে হয়তো দু-একটা ঝারি দিবো, বকা দিবো, কথা না শুনলে জোর খাটাবো, ধমকও দেবো। ঝগড়া করব, দরকার হলে মারামারি করব। তবে ছাড়ব না।
মেহরীন চোখ ভেজা হাসিতে হেসে বলল,
—তাহলে আমিও আপনার পিছু ছাড়ছি না।
রাত বেশ হয়ে যাওয়ায় তালহা আর কথা বাড়াল না। মেহরীনও চুপচাপ দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। বলা যায় না কখন কে দেখে ফেলে। নিঃশব্দে নিজেদের রুমে ঢুকে গেল।
আজ রাতটা বেশ মজার হতে চলেছে। সব বিচ্ছুরা একসাথে। রাফা আর ফারিহাও আছে তাদের সঙ্গে। এক বিছানায় সবাই মিলে গাদাগাদি করে ঘুমাবে। এটাই তাদের মজা। সারা রাত গল্প, আড্ডা, হাসাহাসি আর লুডু খেলায় মেতে থাকবে একেকজন।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৮

সকাল ৯ টা বাজে সিকদার বাড়ির গেট থেকে শুরু করে দরজা অব্দি পুলিশ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে। সকলের চোখ-মুখে চিন্তার ছাপ। কেউই বুঝতে পারছে না, পুলিশ কেনো এসেছে..?

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩০