Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪
সাইদা মুন

আজ বুধবার, সকাল সকাল সিকদার বাড়ির সকলে রওনা দিয়েছে সিলেট যাওয়ার উদ্দেশ্যে। দু’টো গাড়ি যাচ্ছে প্রথম গাড়িতে বাড়ির বড়রা, আর দ্বিতীয় গাড়িতে করে যাচ্ছে ছোটরা। তাহিয়া ভীষণ এক্সাইটেড, তবে মেহরীন একটু ভয়ে ভয়ে আছে। তার কেমন বমি বমি লাগছে, এসব গাড়িতে চড়ে অভ্যস্ত নয় সে। তবু নিজেকে সামলে রাখছে, ভাবছে তার জন্য কি তারা অন্য গাড়ি করে যাবে নাকি।
তাহিয়া বসেছে জানালার পাশে, তার পাশে মেহরীন, আর মেহরীনের পাশে বসেছে রিতু। মেহরীন বারবার নড়াচড়া করছে দেখে রিতু বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,

-“এই মেয়ে, সমস্যা কি? এত নড়াচড়া করছো কেনো, চুপ করে বসতে পারোনা? ওহ আমি তো ভুলেই গেছি, জীবনেও এসব গাড়ি চড়েছো নাকি? কিভাবে বসতে হয় তাও জানোনা….”
রিতুর কথায় সামনে থেকে তালহা মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। রিতুর দিকে রাগি চোখে তাকাতেই সে চুপ হয়ে যায়। ফের মেহরীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-“এনি প্রবলেম..?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

রিতুর কথার মাঝেই হঠাৎ তালহার গলায় মেহরীন দ্রুত চোখ তুলে সামনে তাকায়। সাথে সাথেই যেনো একটা ধাক্কা খায়। তালহা ঘাড়টা হালকা বাঁকিয়ে আড়চোখে তার দিকে তাকানো, এক ভ্রু উঁচু মুখে গম্ভীর ভাব। এই লুকেই যেনো তার কিশোরী মনে বড়সড় প্রভাব ফেলে। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করে এই প্রভাবকে কি নাম দেবে? রাসায়নিক প্রভাব? নাকি চুম্বকীয় প্রভাব? ভাবতে ভাবতেই মুচকি হেসে নিজেই একে ক্রাশীয় প্রভাব নামে নতুন এক প্রভাবের আবিষ্কার করে বসে। মুহূর্তেই তার ভাবনা কাটে তাহিয়ার ডাকে। সামনে থেকে এখনো তালহা একই লুকে তাকিয়ে, শুধু কপালটা একটু কুচকেছে।
-“কিরে, কোনো সমস্যা হচ্ছে তোর?”
তাহিয়ার কথায় মেহরীন দ্রুত বলে,
-“না না, তেমন কিছু না…”

মেহরীনের কথা শুনে তালহা আবার সামনে ফিরে বসে। মেহরীন বারবার লুকিং গ্লাসে তালহার চোখজোড়া মনোযোগ দিয়ে দেখছে। চোখ দুটো একেবারেই আলাদা। গাঢ় বাদামি রঙ, যেন শুকনো শরতের বিকেলে রোদে ভেজা মাটির মতো শান্ত অথচ গভীর। চওড়া চওড়া চোখ, তাকালেই বুকের ভেতর কেমন জানি হালকা ঝড় ওঠে। সবচেয়ে বেশি সুন্দর লেগেছিলো যেদিন তাকে প্রথম হাসতে দেখেছিলো। চোখ দুটো হাসির ফলে আরও ছোট ছোট হয়ে গিয়েছিলো। হঠাৎ তালহাও লুকিং গ্লাসে তাকাতেই দুজনের চোখে চোখ পড়ে। মেহরীন দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। মনে কাচুমাচু করছে, এতক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিলো তা কি সে দেখে ফেলেছে? ছি, কি না কি ভাববে তালহা। বাজে মেয়ে ভাববে নাকি? তাহলে কি তাকে আর পছন্দ করবে না? মুহূর্তেই নিজেকেই ধিক্কার জানায় মাথায় এত আজাইরা ভাবনা আসায়। যে ছেলে বিয়েকেই মানে না, সে আবার তাকে নিয়ে ভাববে নাকি। এসব নিয়ে গবেষণা না করে ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করলে নিউটনের নাতনি হয়ে যেতো এতক্ষণে।
চলে যায় প্রায় ৩ ঘণ্টা। মেহরীন এতক্ষণ নিজেকে ঠিকঠাক রাখলেও এখন যেনো আউট অব কন্ট্রোল। গাড়ির গন্ধ গলা দিয়ে পেটে গিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছে বেড়িয়ে আসতে। দ্রুত সে উচ্চস্বরে বলে,

-“গাড়ি থামান, গাড়ি থামান!”
তালহা চট করে পেছন ফিরে তাকায়। মেহরীনের অস্থিরতা দেখে জিজ্ঞেস করে,
-“কি হয়েছে?”
পাশ থেকে রিতু বিরক্ত হয়ে বলে,
-“আজব তো, সমস্যা কি এই মেয়ের? গাড়ি কেনো থামাবে? তোমার কথায় চলবে নাকি….”
আর কিছু বলার আগেই মেহরীন গলগলিয়ে বমি করে দেয় রিতুর উপর। সাথে সাথে রিতুর মুখ অফ হয়ে যায়। হাঁ হয়ে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কি হলো। সেকেন্ডেই চিৎকার দিয়ে উঠে,
-“ইউউউউ ইয়াকককক, ভাইয়া গাড়ি থামাও, গাড়ি থামাও।”
ড্রাইভার এতক্ষণে গাড়ি থামিয়ে দিয়েছে। তালহা দ্রুত নেমে পেছনের দরজা খুলতেই তাহিয়া মেহরীনকে নিয়ে বের হয়। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটি বমি করছে। তানহা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বেচারির অবস্থা খারাপ। তালহা পানির বোতল নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে। একপর্যায়ে থামতেই সে পানি এগিয়ে দেয়। মেহরীন কুলি করে ক্লান্ত চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নেয়।

-“গাড়িতে বমি করো আগে বললে না। বমির ওষুধ খাইয়ে আনতাম।”
তালহার কথায় ধীরে উত্তর দেয়,
-“আমি জানতাম না। আসলে বড় গাড়ি-ঘোড়ায় কখনো চড়া হয়নি। গ্রামে ভ্যান বা রিকশায় করেই যেতাম।”
তালহা আশেপাশে তাকায় এটা লোকালয় না, কোনো দোকানপাটও নেই। মেহরীনের অবস্থাও বেশ নাজেহাল।
-“চলো, জানালার পাশে বসো আপাতত। সামনে কোনো ফার্মেসি দেখলে মেডিসিন নিয়ে নেবো।”
তালহার কথায় মাথা নেড়ে উঠে পড়ে গাড়িতে। জানালার বাইরে হালকা মাথা বের করে বসেছে, যেন গাড়ির গন্ধটা নাকে না লাগে। এদিকে রিতুর ওড়না ভরেছিল, তা সে খুলে ব্যাগ থেকে অন্য ওড়না বের করে পরে নিয়েছে। রাগে থরথর করছে, ইচ্ছে করছে মেহরীনকে ধরে দু’টো থাপ্পড় দেয়।

তবে এদিকে মেহরীনের মনে মনে লাড্ডু ফুটছে। বারবার ভাবছে তালহা তার জন্য চিন্তা করেছে। এই তো তাকে জানালার পাশে বসতে বলেছে। আবার তার জন্য মেডিসিন নেবে। এসব ভেবে নিজে নিজেই খুশি হচ্ছে। মনে মনে কত রঙিন স্বপ্ন সাজিয়ে ফেলেছে, যা তার জীবনে আধো হবে কিনা তাও সে জানে না।
দেখতে দেখতেই দীর্ঘ ৬ ঘণ্টার জার্নি শেষে পৌঁছে যায় সিলেট সুনামগঞ্জ। মাঝ পথে বমির ওষুধ খাইয়ে দেওয়ায় আর বমি করেনি মেহরীন। গাড়ি থামতেই একে একে সবাই বেড়িয়ে পড়ে।

সুনামগঞ্জের হাওর ঘেরা এক গ্রাম। চারপাশে ধানক্ষেত, খালের স্রোত, সবুজে ঘেরা সুন্দর পরিবেশ। গ্রামের প্রায় মাঝখানেই বড় একটা টিন-চাল দেওয়া দোতলা বাড়ি। এটাই তালহার নানা বাড়ি। চারপাশে বাগান, নারকেল গাছ, সুপারি গাছ, নানা রকমের ফুলগাছ। উঠোনে লাল ইটের খোয়া বিছানো, একপাশে গোয়ালঘর, আরেক পাশে হাঁস-মুরগির খোপ। তালহার নানা আলি আহমেদ গ্রামের একজন সম্মানিত ব্যক্তি, সহজ-সরল, কিন্তু অভিজ্ঞ মানুষ।
তালহারা প্রবেশ করতেই নানি সালেহা বেগম এসে ঝাপটে বুকে জড়িয়ে নিলেন আদরের দুই নাতি-নাতনিকে। চোখমুখে হাত বুলিয়ে আদর করছেন, খোঁজখবর নিচ্ছেন। আবার চিন্তিত হয়ে মেয়ের সাথে চেঁচিয়ে উঠলেন, খেয়াল রাখে না, শুকিয়ে গেছে তারা। সবই মেহরীন মনোযোগ দিয়ে দেখছে। তার চোখ ছলছল করে ওঠে। নিজের দাদীর কথা মনে পড়ে যায়। সেই তো একমাত্র মানুষ ছিলো, যে খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুমানো অব্দি খোঁজ রাখতো।

এর মধ্যেই বাড়ি থেকে আরও লোক বেরিয়ে আসে। সবাই ভেতরে যেতেই একে একে শরবত-নাস্তা দেওয়া হয়। মেহরীনের নতুন মুখ দেখে সবাই একটু প্রশ্নাত্মক চোখে তাকালেও পরে পরিচিত হয়। তালহার দুই মামা, বড় মামা আরিফ আহমেদ ও তার বউ সোফিয়া আহমেদ। তাদের তিন ছেলে-মেয়ে: বড় ছেলে তাহসান তালহার বয়সি, ঢাকায় নিজের বিজনেসে ব্যস্ত। মেজো মেয়ে ফারাহ আহমেদ এবার অনার্স প্রথম বর্ষে। ছোট মেয়ে ফারিহা আহমেদ তানহার সাথি। ছোট মামা তুহিন আহমেদ, তার বউ তাহেরা। তাদেরও তিন ছেলে-মেয়ে, বড় ছেলে মারুফ অনার্স ২য় বর্ষে, মেজো মেয়ে স্নেহা এবার এইচএসসি দিবে, ছোট মেয়ে রাফা নিউ টেনে পড়ে। এ বাড়ির সবার সাথেই মেহরীনের কথা হয়েছে। তবে রাফা-ফারিহা এরা তার সাথে তাহিয়ার মতোই মিশে গেছে। মুহূর্তেই একটা ছোট গ্যাং তৈরি হয়েছে তাদের। মেহরীনও তাদের সাথে মন খুলে গল্প করছে, হাসাহাসি করছে। এসবই কেউ একজন বেশ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছে।
সবাই চলে যায় ফ্রেশ হতে। তবে মেহরীন পুকুর দেখে অন্য আবদার করে বসে,

-“চলনা প্লিজ, কতদিন ধরে পুকুরে নামি না। আমাদের গ্রামে তো সবসময় পুকুরেই গোসল করতাম…”
তাহিয়া ভয়ে ভয়ে বলে,
-“না না, ভাইয়া বকবে।”
-“আরে তোর ভাইয়া দেখবে নাকি। আমরা সবাই লুকিয়ে যাবো, গোসল করে আবার লুকিয়ে চলে আসবো।”
মেহরীনের কথায় ফারিহা আর রাফাও বলে উঠে,
-“আয় না, দেখিস অনেক মজা হবে…”
সবার রিকোয়েস্টে তাহিয়াও রাজি হয়। সুযোগ বুঝে সবাই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়ে। বাড়ির পিছেই পুকুর এটা তাদের নিজস্ব। চারপাশে দেয়াল দেওয়া, যাতে মহিলারা গোসল করলে রাস্তা থেকে কেউ ভেতর না দেখতে পায়।
সবাই পুকুরে নেমে সে কি আনন্দ। মেহরীন-ফারিহা-রাফা তো সাঁতার প্রতিযোগিতা লাগিয়েছে। তিনজনই সাঁতার পারে। তবে তাহিয়া না জানায় ৪/৫ সিঁড়ি অব্দি গিয়ে এক-দু’টা ডুব দিয়ে ভয়ে আবার উঠে এক সিঁড়িতে বসে থাকে। সবাই বেশ উপভোগ করছে। একজন আরেকজনকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে, তানহাকে সাঁতার শিখানোর চেষ্টা করছে। এসবের মধ্যেই হঠাৎ কারো ভারি কণ্ঠ শুনে আঁতকে উঠে সবাই। দ্রুত সিঁড়ির উপরে তাকিয়ে দেখে তালহা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। সবাইকে তাকাতে দেখেই ধমক দিয়ে বলে,

-“তোরা পুকুরে কি করছিস?”
তালহার কথায় মেহরীনের ভ্রু কুঁচকে যায়। সে সোজা মনে উত্তর দেয়,
-“দেখছেনই তো গোসল করছি। আপনিও আসেন, অনেক মজা হবে…”
মেহরীনের উক্তি শুনে তালহার চোখ স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা ভড় হয়ে যায়, হালকা কেশেঁ উঠে। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রাফা বলে উঠে,
-“ভাইয়া, তুমি কি কাপড়ের চিন্তা করছো? দাঁড়াও, আমি আব্বুর লুঙ্গি এনে দিচ্ছি। ওইটা পরে নামতে পারবে।”
রাফার কথায় তাহিয়া বলে,

-“আরে না না, ভাইয়া লুঙ্গি পরে না। এটা পড়ে অভ্যস্ত নয়, সামলাতে পারবে না…”
মেহরীন কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠে,
-“আরে আপনি লুঙ্গি পড়েন, সামলানোর দায়িত্ব আমার…”
তালহা চমকে তাকায় মেহরীনের দিকে। মেয়ে বলে কি। তালহার তাকানোতে মেহরীনের বোধগম্য হয় সে কি বলছিলো। মুহূর্তেই লজ্জায় পড়ে যায়। দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলে,
-“ইয়ে মানে বলতে চেয়েছি লুঙ্গি পড়া শিখিয়ে দিবো…”
এবার তালহা বিরক্ত হয়ে বলে,
-“শাট আপ। আমি কি একবারো কাউকে বলেছি পুকুরে নামবো? চুপচাপ ৫ মিনিটের মধ্যে যেনো একেকটাকে ঘরে দেখতে পাই, বাদরের দল…”
বলতে বলতে সে জায়গা ত্যাগ করে। মূলত তার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল আসায় এদিকটায় এসেছিলো, বাড়িতে নেট পাওয়া যাচ্ছিলো না। নানুবাড়িতে এই এক কমন প্রবলেম। তবে কথা শেষ করে আসার পথেই তাহিয়াদের গলা শুনে এগিয়ে যায়।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩

সবাই দ্রুত উঠে আসে ভয়ে। ঘরে গিয়ে চেঞ্জ করে নেয়। সেদিন দুপুরের খাবার খেয়ে আর কেউ বের হয়নি। সারাদিনের জার্নিতে ক্লান্ত থাকায় রেস্ট নেয়।
সন্ধ্যার দিকে বাড়ির ড্রয়িং রুমে সবাই বসে আছে। সামনের টি টেবিলে হরেক রকমের নাস্তা। হঠাৎ তালহার বড় মামীর গলায় মেহরীন বিস্ময়ে তাকায়। তিনি তালহার সামনে নুনে গড়া পিঠার বাটি ধরে বলেন,
-“জামাই বাবা, খাচ্ছো না যে! নাও নাও, আমি নিজ হাতে বানিয়েছি….”

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫