প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬
সাইদা মুন
মেহরীনকে গাড়িতে বসিয়ে সরতে যেতেই তার চুলের সাথে বুতাম আটকে টান খায়। সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন হালকা চেচিঁয়ে ওঠে। তালহা তড়িঘড়ি করে শার্টের বুতাম মেহরীনের চুল থেকে ছাড়াতে থাকে। দু’জনের মধ্যে দূরত্ব যেন আর নেই বললেই চলে।
মেহরীনের অবাধ্য মনে আবারও রঙিন হাওয়া বয়ে যায়। কতো উল্টোপাল্টা ভাবনাই যে মাথায় এসে ভিড় করেছে। এই টুকু সময়ে সে তার মনের ডায়রিতে রোমাঞ্চকর এক মুহুর্ত নামে লিখেও ফেলেছে। তবে সেই ঘোর কাটে তাহিয়ার কণ্ঠে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে তালহা ফ্রন্ট সিটে বসে আছে। চুল ছাড়িয়ে চলে গেছে, অথচ সে টেরই পায়নি। এর মধ্যেই গাড়ি বাড়ির পথে ছুটতে শুরু করে। রিতু ভীষণ বিরক্ত মেহরীনের ওপর, তার জন্যই আজ আর কোথাও ঘোরা হলো না। তবে বাকিরা মেহরীনের অবস্থা দেখে সহানুভূতিশীল হয়ে নিজেদের ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখে।
এতক্ষণ তালহাকে নিয়ে লাল-নীল স্বপ্ন বুনলেও এবার কোমরের ব্যথা বেশ চেপে ধরে মেহরীনকে। গাড়ির প্রতিটি ঝাঁকুনি যেন ব্যথাকে আরও টাটকা করে তুলছে। ক্ষণে ক্ষণে হালকা ব্যথাতুর শব্দ তুলে দাঁতে ঠোঁট চেপে ধরে সে। তার এই করুণ অবস্থা দেখে তালহা ড্রাইভারকে বলে, “আস্তে গাড়ি চালাতে।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
প্রায় একঘন্টার রাস্তা শেষে সবাই বাড়ি পৌঁছায়। অন্যরা নেমে যেতেই তালহা আবার মেহরীনকে কোলে তুলে নেয়। হাজারো ব্যথার মাঝেও তালহার এই ছোট ছোট স্পর্শ, যত্ন আর খেয়াল মেহরীনের মনে অদ্ভুত এক ভালোলাগা জাগায়। সে উপভোগ করে প্রতিটি মুহূর্ত। যেনো তালহা তার আশেপাশে থাকলে ব্যথাও সুখ হয়ে উঠে। এ কেমন অনুভূতি, এই অনুভূতিই কি তার সব থেকে বড় দুঃখ হয়ে দাঁড়াবে কোনোদিন।
তবে কেউ একজন তাদের দেখে ভিতরে ভিতরে রাগে ফুঁসতে থাকে, কেন জানি সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না সে।
মেহরীনকে এভাবে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই তিতলি বেগম চিন্তিত হয়ে এগিয়ে আসেন,
-“কি হয়েছে, কি হয়েছে রে মেয়েটার?”
তার উদ্বেগভরা কণ্ঠ শুনে মেহরীন ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে। সত্যিই, একজন মানুষ কতোটা ভালো হলে অন্যের সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো করে এতখানি আগলে রাখতে পারে।
ফারিহার ঘরের চেয়ারে মেহরীনকে বসানো হয়। জামায় কাদা লেগে থাকায় বিছানায় রাখা হয়নি। তিতলি বেগম তালহার সঙ্গে ভেতরে আসেন। মেহরীনের চোখে পানি দেখে তিনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে তার মুখ দুহাতে আগলে নেন,
-“কি হয়েছে রে মা, আমাকে বল। কোথায় লেগেছে? কাঁদছিস কেন?”
মায়াভরা এই কথাগুলোয় তার আরও কান্না আসে। তবে সেটা ব্যথার কান্না নয়, আহ্লাদী কান্না। তালহা তাকিয়ে আছে মেহরীনের মুখের দিকে। একেবারে বাচ্চাসুলভ, কান্নার ধরনেই বোঝা যায়। ঠোঁট উল্টে ফ্যাসফ্যাস করে কাঁদছে, মাঝে মাঝে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিচ্ছে। ফর্সা মুখখানায় লাল আভা জমেছে।
তালহার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। ফিক করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতেই বলে,
-“আম্মু, পিছলে পড়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছে। কাপড় চেঞ্জ করিয়ে একটা ব্যথার ওষুধ খাইয়ে দিয়ো।”
বলতে বলতেই সে বেরিয়ে যায়, তবে মুখে হাসি লেগেই থাকে। কেন জানি না, এক অজানা স্নিগ্ধ হাওয়া তার ভেতর দিয়ে বয়ে যায়। বারবার মেহরীনের মুখ ভেসে ওঠে চোখে। একা একাই হেসে ফেলে। ঠোঁট ফসকে বেরোয়,
-“একদম বাচ্চা…”
মেহরীনকে জামা বদল করিয়ে বিছানায় শোয়ানো হয়। মুভ দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে মালিশ করে দেন তিতলি বেগম। যদিও মেহরীন বলছিল নিজেই পারবে, তবু তিতলি বেগম ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখেন। নিজ হাতেই যত্ন করে মালিশ করিয়ে অল্প কিছু খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দেন। সেদিন সারাদিন ঘুমিয়েই কাটে মেহরীনের।
একেবারে রাত আটটার দিকে তালহার নানুর আসে। দুপুরের পর আর মেয়েটি কিছু খায়নি। তার মন মানছিলো না তাই ডেকে তাকে। তার ডাকে ঘুম ভাঙে মেহরীনের। পিটপিট চোখে তাকায় তার দিকে।
-“কিরে মেয়ে, উঠবি না? দুপুরে খেয়ে আর তো খাওয়া হয়নি। আয়, সবার সঙ্গে রাতের খাবারটা খেয়ে নিবি।”
নানুর কথায় মেহরীন উঠে বসে। কোমর নড়াতে গিয়ে দেখে ব্যথা নেই। তারপর ফ্রেশ হয়ে তাহিয়াদের সঙ্গে নিচে নামে। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে সবাই ফারিহার ঘরে জড়ো হয়। ফারিহারই আইডিয়া, আজ সবাই মিলে মোবাইলে একটা মুভি দেখবে। মেহরীন কৌতূহলভরা চোখে জিজ্ঞেস করে,
-“কি দেখবিরে মোবাইলে…?”
ফারিহা খুশি হয়ে বলে,
-“একটা মুভি। নাম মাই ফল্ট। আমার এক বান্ধুবি নাকি দেখে হেব্বি সুন্দর বলেছে। আমাকেও দেখতে বলেছিলো, তবে একা একা আর দেখা হয়ে উঠেনি। আজ তোরা আছিস, তোদের সাথেই দেখবো।”
তার কথায় বাকিরাও এক্সাইটেড হয়ে ওঠে। তবে খালি হাতে বসে দেখা যায় না। তাই কেউ একজন নিচ থেকে নিমকির ডাবা নিয়ে আসবে বলে ঠিক হয়। কিন্তু সবাই আলসেমি করছে। শেষমেশ মেহরীনই যায়, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে।
রান্নাঘর থেকে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা হাতে নিয়ে ফেরার পথে তালহার গলায় পা থেমে যায়। পেছন ফিরে তাকাতেই চোখে পড়ে তালহাকে, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আর কালো গেঞ্জি গায়ে। শরীরের সাথে একেবারে এঁটে আছে গেঞ্জি যার ফলে ফোলা ফোলা বাহু গুলো স্পষ্ট। এখন যে যার ঘরে তাই ড্রয়িং রুমের আলো নিভানো। তবে আলো নিভে থাকলেও বাইরে থেকে আসা ম্লান আলোতেই তালহার মুখটা দীপ্তিময় দেখাচ্ছে।
-“কি ব্যাপার, এখানে কি করো? ঘুমাওনি?”
-“নিমকি নিতে এসেছিলাম…”
নিমকির কথা শুনে তালহার ভ্রু কুঁচকে যায়,
-“নিমকি..? এখন নিমকি দিয়ে কি করবে? মাত্রই তো ভাত খেলে।”
মেহরীন কিছুটা থতমত খেয়ে বলে,
-“মানে, সবাই মিলে মুভি দেখবো। খালি মুখে নাকি ওরা দেখবে না, তাই পাঠিয়েছে নিতে।”
-“রাত হয়েছে অনেক, এখন কিসের মুভি দেখা?”
-“ওই ফারিহা, বারবার বলছিল ওর নাকি একটা মুভি দেখবে দেখবে করে দেখা হয়নি। তাই আজ আমাদের সাথেই দেখতে চায়।”
একটু থেমে ভেবে মেহরীন হঠাৎ বলে ফেলে,
-“আপনিও আসুন দেখবেন, ভালো লাগবে।”
তালহা মোবাইলে কিছু করতে করতে প্রশ্ন করে,
-“কোন মুভি?”
-“মাই ফল্ট ।”
মুভির নাম শুনতেই তালহার শুকনো গলায় কাশি উঠে যায়। একদম অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে। দ্রুত মেহরীন পাশের টেবিল থেকে পানি এগিয়ে দেয়। তালহা ঢকঢক করে খেয়ে নেয়। চোখ বড় বড় করে তাকায় মেহরীনের দিকে।
-“আপনি ঠিক আছেন তো?”
-“হ..হু…”
তালহার সম্মতি পেয়ে মেহরীন বলে,
-“আচ্ছা, আমি যাই। ওরা আমার জন্য ওয়েট করছে। আপনিও চাইলে আসতে পারেন।”
তালহার চোখ প্রায় কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। এ মেয়ে যে প্রথমবার মুভিটা দেখবে, তা সে ভালোই বুঝছে। না হলে জীবনেও তাকে এভাবে দেখতে বলত না। অল্প বয়সেই মেয়েগুলো পেকেঁ যাচ্ছে। ভাবতে ভাবতেই মনে মনে স্থির করে, একে আটকাবে। তাহলে হয়তো বাকিরাও ওর জন্য অপেক্ষা করে দেখবে না। নিজেকে স্বাভাবিক করে তালহা বলে ওঠে,
-“এসব দেখতে হবেনা।”
মেহরীন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
-“কেনো…?”
তালহা উত্তর খুঁজে না পেয়ে হঠাৎ বলে ওঠে,
-“চলো বাইরে, আজ মুন রেড হবে। দেখবে, চলো।”
তালহা বাইরের দিকে হাঁটতে শুরু করে। মেহরীনও মুহূর্তে নিমকি রেখে খুশি মনে বেরিয়ে পড়ে। এমন সুযোগ মিস করা যায় নাকি। তালহার সাথে কিছুটা সময় কাটাতে পারবে, সেটাই তার কাছে অনেক বড় পাওয়া।
বাড়ির সামনের উঠোনে চেয়ার পেতে বসে তালহা। মেহরীন এলে পাশে বসতে ইশারা করে। সেও বাধ্য মেয়ের মতো গিয়ে বসে। তালহা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, আর মেহরীন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তালহার ঝলমলে মুখে। হালকা বাতাসে ভেসে আসা তালহার পারফিউমের ঘ্রাণ সে চোখ বুজে শ্বাসে ভরিয়ে নিচ্ছে। মনে মনে দোয়া করছে, এই মুহূর্ত যেন এখানেই থেমে যায়।
শান্ত তালহাকে পাশে পেয়ে মেহরীনের মনে অজানা এক অধিকারবোধ একটু একটু জাগছে। এই তালহাকে সে শুধু নিজের কাছে থাকার অধিকার দিবে, আর কারও কাছে নয়। ভেতরে ভেতরে আরও কত কিছু ভেবে নেয়, যা হয়তো তালহার সামনে বললেই মন ভেঙে যাবে। প্রথম দিনই তো সতর্ক করেছিল তাকে তালহা।
হঠাৎ তালহা আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার দিকে তাকায়। দেখে মেহরীন তার দিকেই তাকিয়ে আছে খুব মনোযোগ সহকারে। ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করে,
-“কি দেখো?”
ঘোরের ভেতরেই মেহরীনের মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়,
-“আমার মনের আকাশের চাঁদকে…”
সঙ্গে সঙ্গে তালহার মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। তা দেখে মেহরীনের হুশ ফেরে। কি বলে ফেলল সে। দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নেয়। ভয় মিশ্রিত কণ্ঠে তোতলাতে তোতলাতে বলে,
-“আ..আমি ওই আকাশের চাঁদ দেখছিলাম। কই, এখনো তো লাল হয়নি। আচ্ছা, আপনি থাকেন, আমি যাই… ঘুম পাচ্ছে।”
বলেই তাড়াহুড়া করে সেখান থেকে সরে যায়। তালহাকে কিছু বলার সুযোগই দেয় না। অন্যদিকে তালহা গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকায়,
-“মানুষ নিষিদ্ধ জিনিসেই বেশি আকৃষ্ট হয় কেনো? এটা কি পৃথিবীর নিয়ম, নাকি মানুষের বোকামি?”
রাত বাজে বারোটা।
মেহরীন, তাহিয়া, ফারিহা আর রাফা চারজনেই লজ্জায় লাল। তাহিয়া হালকা রাগে বলে,
-“ছি ছি, এইসব দেখে তোর বান্ধুবি আবার তোকে দেখতে বলেছে? ছি-ই-ই…”
ফারিহা নখ কামড়াতে কামড়াতে বলে,
-“আমি জানতাম নাকি। ভেবেছিলাম ভালো কিছু।”
ওরা নিজেদের মতো পেক-পেক করছে। কিন্তু মেহরীনের মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরছে। নাক-কান-গাল লাল হয়ে আছে, কম্বল দিয়ে ঢেকে রেখেছে মুখ। ইচ্ছে করছে মাটির নিচে ঢুকে যেতে।
এখন বুঝতে পারছে, তখন মুভির নাম শুনে তালহা কেনো বিষম খেয়েছিল। মনে মনে নিজেকে গালি দিতে দিতে মুখ ভার করে ফেলেছে,
-“ছি ছি, আমি কিনা উনাকে আমাদের সাথে এসে দেখতে বলেছিলাম। ইয়া খুদা, ইয়া মাবুদ, উনি কি ভাববেন আমার সম্পর্কে। এখন কিভাবে উনার সামনে দাঁড়াবো…”
তার এই অবস্থা দেখে সবাই জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না। সবাই ভাবে, ও হয়তো তাদের চেয়ে বেশিই লজ্জা পেয়েছে তাই এমন করছে। সে রাতে এভাবেই ঘুমিয়ে যায় সবাই।
পরদিন সকালে,
তালহা ভোরে নানার সাথে নামাজ পড়তে বেড়িয়ে পড়ে। নামাজ শেষ করে দুজনেই হালকা পাতলা হাটাহাটি করে বাড়ি ফিরে।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫
ড্রয়িং রুম পার হয়ে রুমের দিকে যাচ্ছিল তালহা, হঠাৎ কিছু দেখে থমকে দাঁড়ায়। দু’কদম পিছিয়ে বাম পাশে তাকাতেই চোখে পড়ে, মাথায় হাঁটু অব্দি ঘোমটা টেনে জড়সড় হয়ে বসে আছে এক মেয়ে।
অবাক হয়ে যায় তালহা। এ গ্রামে সে বহুবার এসেছে, কিন্তু এভাবে ঘোমটা টানতে কোনো মহিলাকে দেখেনি। নতুন বউয়ের চেয়েও লম্বা ঘোমটা। মনে প্রশ্ন জাগে,
-“কে এই মেয়ে…..
