Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৭

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৭

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৭
সাইয়্যারা খান

দুইদিন হাসপাতালে থেকে তিন দিনের দিনই হইচই শুরু করেছে পৌষ। কিছুতেই আর থাকবে না এখানে। তৌসিফ নানান ভাবে বুঝ দিলেও শুনছে না। তিন বেলা করে স্যালাইনে ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে। বাসায় নিতেই তো ভয় পাচ্ছে তৌসিফ। তায়েফা ভিডিও কল দিয়েছে। সেটাই পৌষের মুখের সামনে ধরে বসে আছে ও। তায়েফাকে আগেই বলেছে যাতে পৌষকে বুঝায়। কথা হচ্ছে তায়েফাকে উল্টো বুঝ দিয়েছে পৌষ। তায়েফা ঐ বুঝ মেনে এখন তৌসিফকে বলছে যাতে বাসায় নিয়ে যায়৷ প্রয়োজনে নার্স রাখবে বাসায়। পৌষ নিজের কথা ননাসকে মানাতে পেরে এখন হাসিমুখে কথাবার্তা বলছে। তৌসিফ তবুও অনড়। কিছুতেই আজ বাসায় নিবে না। তায়েফা ফোন রাখতে রাখতে নার্স আসে, পরপর ট্রলি ঢুকে খাবারের। পৌষের মন-মেজাজের যেন খারাপ হয়ে যায় তাতেই৷ এত বড় হাসপাতাল অথচ খাবার মজা না। তৌসিফ গতকাল থেকে বুঝাচ্ছে কিন্তু বিশেষ লাভ হচ্ছে না। নাক, মুখ কেমন করে তাকিয়ে আছে পৌষ। নার্স স্যালাইন খুলে খাওয়ার আগের ঔষধটা খুলে দিলো। তৌসিফ পানি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। পৌষ শুধু দেখে ওকে। দুটো দিন ধরে দেখেই যাচ্ছে। লোকটা যে এমন করবে তা বুঝে নি পৌষ। জানে সে পৌষকে ভালোবাসে কিন্তু পরিমাণ যে এতটা তা কোনদিন টের পায় নি। নার্স চলে যেতেই পৌষ আগেভাগে বললো,

“আমি কিন্তু এসব খাব না। মিনু আসে না কেন?”
“মিনু আসলেই কি। ও শুধু আমার জন্য আনবে।”
“এক কাজ করুন৷ আপনি আমারটা খান। আমি আপনারটা খাব। ভালোবাসা বাড়বে।”
তৌসিফ হেসে ফেললো এহেন কথায়৷ গিয়ে হাত ধুয়ে এলো। পৌষ কথাবার্তা থামালো না। একাধারে বলে যাচ্ছে,
“মিনুকে ফোন দিন।”
“কোন প্রয়োজন দেখছি না।”
তৌসিফ কাজ থামালো না। খাবার বক্স থেকে খুলে প্লেটে সাজালো। হাতের কাজ তার খুবই চমৎকার, গোছানো। এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে রাখলো পাশের ট্রলিতে। প্লেটে হাত দিতেই পৌষ বলে উঠলো,
“আমি খাব না। ডালটা দেখুন। এত পাতলা ডাল হয়? আমি এই মুরগীও খাব না। হাসপাতালে মুরগী ধোয় না৷ চেহারা দেখুন, আমি রাঁধলে এমন হয়? আপনি হলে খেতেন?”
তৌসিফ চালাক পুরুষ। সে বউয়ের সাথে তর্কে গেলো না। চুপচাপ ভাত মাখালো। মুখের সামনে ধরলো। পৌষ মুখটা সরিয়ে এবারে ত্যাড়া কণ্ঠে বললো,

“খাব না।”
“কারণ কি?”
“এতক্ষণ কি বললাম? মজা না একটুও। বিশ্বাস করুন।”
তৌসিফ নরম স্বরে কথা বললো,
“জ্বরে তোমার মুখ এমন হয়ে আছে তোতাপাখি। এই হসপিটালের খাবার ভালো। এই দেখো আমি খেয়ে দেখাচ্ছি।”
নিজে মুখে দিয়ে দেখালো তৌসিফ। পৌষের এবার খারাপ লাগলো। মুখ ঘুরিয়ে খেয়ে নিলো। কথা বাড়ালো না একটুও। তৌসিফের খারাপ লাগে। ও নিজেও দেখছে পৌষ গিলছে কোনমতে। দরজা নক করে ভেতরে ঢুকে আদিত্য। মিনুর থেকে খাবার নিয়ে ও নিজেই এসেছে। পিছনে অদিতি। গতকাল মীরা এসেছিলো রাতে। অদিতি চেয়েছিলো আসতে কিন্তু টিউশন থাকায় তাকে আনে নি কেউ৷ আজ ভাইয়ের সাথে জোর করে এসেছে। আদিত্যের হাতে ব্যাগ দেখে পৌষ হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো,

“আজকে ম্যানু কি?”
“যাই হোক তুমি তো পাচ্ছো না।”
“কেন? তোমার শশুর বাড়ী থেকে এনেছো? খুলো দেখি।”
আদিত্য হাসছে। অদিতি পেছন থেকে বলে উঠলো,
“গরুর ভুনা দিয়েছে আজকে।”
পৌষ শোনা মাত্রই মুখটা চিলিক দিলো যেন৷ তাকিয়ে রইলো তৌসিফের দিকে। তৌসিফ কথা বাড়ালো না। আদিত্যকে বলে খাবার খুলালো। এক পিস তুলে ভাতের সাথে মুখে দিলো পৌষের তবে লাভ হলো না। পৌষ মুখ ভোতা করেই বললো,

“স্বাদ হয় নি। রান্না করতে পারে নি। বাসায় গিয়ে আমি রাঁধব। কষানোই হয় নি। মাথামুন্ডু রেঁধেছে।”
“ঠিকই রেঁধেছ পুষি। তোমার স্বাদ কুড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছে।”
“কেমন হয় যদি তোমার সুন্দর থোতাটা পাঞ্চ দিয়ে ভেঙে দেই?”
আদিত্য ভয় পেলো না বরং নাটকীয় ভাবে বললো,
“তোমার ঐ শক্তি এখন আর নেই৷”
মুখে খাবার নাহয় পৌষ আদিত্যকে কড়া কিছু কথা শোনাতো।
অদিতির সাথে বেশ কথাবার্তা হচ্ছে পৌষের। তৌসিফ খেতে বসে আদিত্য আর অদিতির মুখে দুবার করে তুলে খায়িয়েছে। পৌষ কথার ফাঁকে বিশেষ ভাবে খেয়াল করেছে বিষয়টা। ভাতিজা, ভাতিজি এত বড় হয়েছে তবুও তৌসিফ যেন তাদের বড় হিসেবে দেখে না। বিষয়টা পৌষের চোখে লাগে, মন ভালো হয়। ওদের কাছে বউ রেখে তৌসিফ গোসলে ঢুকে। খুঁতখুঁত রোগ তো তার নতুন না৷ দিনে দু বেলা বেড সিট বদলে যাচ্ছে তবুও তৌসিফ তাতে গা লাগায় না৷ বাসা থেকে চাদর আনিয়ে বেডে বিছিয়ে নেয়। পৌষ সচক্ষে ওর সমস্যা দেখে। বুঝে। তৌসিফ এসব সহ্য করতে পারে না অথচ পৌষের জন্য তার জানটা দেওয়া বাকি এখন। অবশ্য পৌষের কারণে তার জান নিয়ে টানাটানি লেগেছিলো।
অদিতির দিকে হাত বাড়িয়ে পৌষ বললো,

“ধরো তো অদি। উঠব আমি।”
অদিতি না বুঝেই উঠালো। আদিত্য ফোন চাপতে চাপতে পাশের সিটে পা দুলাচ্ছে। স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে বললো,
“চাচ্চু যে শুয়ে থাকতে বললো।”
“আমি যে উঠতে চাইলাম।”
কথায় পারবে না আদিত্য তাই কথা বাড়ালো না। পৌষ শুধু উঠেই খ্যান্ত হলো না। উঠে দাঁড়ালো নিজ ইচ্ছায়। দুই, তিনদিন ধরে শুয়েই তো আছে। এখন একটু হাটাহাটি করা যাক। অদিতির সাথে তখনও কথা বলছে পৌষ। দরজার কাছে এসে উল্টো দিকে যাবে তখনই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে। পড়তে পড়তেই জৈষ্ঠ্য খপ করে ধরে ফেলে। চৈত্র এসে পেছনে সাপোর্ট দেয়৷ ঘটনা ঘটে খুব দ্রুত। পেছনে বাকি চারজন। আদিত্যও ভয় পেয়ে গেলো। ধরাধরি করে বিছানায় শোয়াতেই নার্স ডেকে এনে দেখালো। গুরুতর কিছু না৷ দূর্বলতা থেকে মাথা ঘুরাচ্ছে বলে তিনি চলে গেলেন৷ ডাক্তার যেতে না যেতেই হেমন্ত জোরে একটা ধমক দিলো৷ পৌষ চোখ বন্ধ করে নিলো পরপর খুলে হেসে বললো,

“তোমার পোলা কই? ফুপিকে দেখতে এলো না?”
“তোর লজ্জা হবে না, না?”
“নাহ্।”
“চটকানা দিব দুটো তখন ঠিকই হবে। বেয়াদব কোথাকার।”
“আজ বাসায় চলে যাব।”
“ঠ্যাং ভেঙে রেখে দিব পৌষ। বাড়াবাড়ি করবি না।”
“তাহনে আপা হাতবে কিবাবে?”
হেমন্ত চোখ গরম দেখালো। ইনি, মিনি চুপচাপ গিয়ে বোনের পাশ দখল করে বসলো। বাসা থেকে আজ হেমু ভাই আনতে চায় নি ওদের। কেঁদেকুদে এসেছে জমজরা। শর্ত দিয়েছে দুষ্টামি করা যাবে না৷ কথা শুনতে হবে। তারাও মেনে নিয়েছে।
তৌসিফ গোসল শেষ করে এসে বেশ খুশিই হয়েছে। বউ অসুস্থ বলে তো শাসন করা দূর জোরে কথা অব্দি বলছে না তৌসিফ। হেমন্ত ধমক দিয়ে সোজা করায় আপাতত তৌসিফ শান্তি পেয়েছে।
এদিকে অদিতি হা করে তাকিয়ে দেখছে হেমন্তকে। পুরুষ মানুষ এমন হয়? এত আদুরে? চাচাতো বোনকে এভাবে রেগে রেগে শাসন করে? আবার অসহায় মুখ করে বুঝায়? অদিতি ততটা চেনে না হেমন্তকে তবে ওর কিশোরী মনে বেশ ধরেছে মানুষটাকে।

“আমাদের বেবি প্ল্যান করা দরকার পলক।”
পলক কথা বলে না। তুহিন আবারও একই কথা বললো। পলক এবার তাকায় ওর দিকে। তুহিনের চোখ দুটো হাসি-হাসি৷ পলকের হাসিটা খুব প্রিয় তবে কেন জানি আজ পড়োয়া করলো না৷ বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
“আমি চাইছি না।”
“আমাদের বিয়ে হয়েছে সাত বছর।”
“হ্যাঁ।”
“এখনও না?”
“না।”
“কারণ কি পলক?”
“আমার ইচ্ছে নেই। এটা কি কারণ না?”
“হ্যাঁ তবে ইচ্ছে না থাকার তো কারণ থাকা প্রয়োজন।”
“ধরে নিন আমি প্রস্তুত নই।”
“এটা ধরারও নিদিষ্ট কারণ দেখছি না৷”
“আমি চাইছি না।”
“সেটাই তো কিন্তু কেন?”

তুহিনের মুখের হাসি এখনও সামান্য লেগেই আছে তবে কপালে ভাঁজ জমেছে। পলক অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
” বিয়ের সাত বছর গুনলেন অথচ এটা দেখলেন না আদৌ কয়বছর একসাথে ছিলাম। আমি আপনাকে কতটুকু পেয়েছি তুহিন? সারাটা জীবন পালিয়ে বেড়িয়েছেন আপনি। যখন পালানো শেষ তখন নেশায় ডুবে আমাকে দূর করলেন৷ এরপর? এরপর কি করলেন তুহিন? আমাকে রেখেই চলে গেলেন? এখন বলছেন বাচ্চা চাই? গ্যারান্টি আছে যে বাচ্চা রেখে চলে যাবেন না?”
ঠোঁটে থাকা সামান্য হাসিটুকুও গায়াব হয়ে গেলো তুহিন। পলকের কোলে থাকা মাথাটা তুলে সরাসরি মুখ করে বসলো। কপালের ভাজ বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। গলার স্বরেও পরিবর্তন আসলো ততক্ষণাৎ,
“না পালালে আমাকে কোথায় পেতি? প্রেম করে বিয়ে করিস নি আমাকে? যদি তখন পলাতক না থাকতাম তাহলে আমাকে ছুঁয়ে দেখে আমার সংসার করতে পারতি? এই যে আজও অক্ষত বেঁচে আছিস কার দয়া? কি ভাবিস মেঝ ভাইয়ার সাথে এত বড় ধোঁকার পর ভাই তোকে ছেড়ে দিতো? ছিড়েখুঁড়ে ফেলে দিতো তোর মতো পলককে। না তুই সেদিন পিয়াসীকে ভাগতে সাহায্য করতি, না তুই গয়না গুলো পাঠাতি, না পিয়াসী পালিয়ে যেতো, না আমার নজর আমার মেঝ ভাইয়ের সামনে এতটা ঝুঁকে যেতো। আর নাই আমি নেশায় জড়াতাম। তুই দায়ি পলক। শুধু মাত্র তুই দায়ি।”

তুহিনের রাগ ঠিক আগের মতোই রয়ে গিয়েছে। পলক সামান্য সিটিয়ে বসে আছে। চোখে পানি জমেছে। তুহিন মূল্যায়ন করলো না। খড়খড়ে কণ্ঠে বললো,
“আমি জানি দোষ তোমার একার ছিলো না কিন্তু নিজের বোনকে সাহায্য করতে গিয়ে আমার মেঝ ভাইকে ধ্বংস করে ফেলেছো তুমি।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৬

“আপনার ভাই কোন ভালো মানুষ ছিলো না।”
“পিয়াসীর মতো রেড লাইট এড়িয়ার মেয়ে ছিলো না।”
“আমার বোন ওমন না৷”
পলক চিৎকার করে উঠলো। তুহিন ঝুঁকে পলকের সামনে এলো। ফিসফিস করে বললো,
“ওমন না হলে ঘরে একজন রেখে তারই ভাইয়ের সাথে গয়নাগাটি নিয়ে ভেগে গেলো কিভাবে? ভালো ঘরের মেয়েরা তো এমন করে না পলক।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৮