প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫০
সাইয়্যারা খান
আজ পৌষ মাসের তেরো তারিখ। ঠান্ডা এতটাই জোড়ালো যে বাইরে ভোর থেকে দেখা যাচ্ছে না। দিন বাড়ার সাথে সাথে সূর্য উঠার কথা থাকলেও তার কিছুই হয় নি। সামান্য কুয়াশা কেটেছে অবশ্য। ডিসেম্বর মাসে আজই পৌষের শেষ ক্লাস। তৌসিফ ওকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছে নয়টা নাগাদ। পৌষ যাবতীয় কাজ সেরেছে। আদিত্যর অপেক্ষায় আপাতত বসে আছে বাউন্ডারি করা জায়গাটায়। ঠান্ডায় হাত দুটো বরফ হয়ে আসছে যেন। এই শীতে পৌষের অদ্ভুত কিছু সমস্যা দেখা দেয়, তারমধ্যে অন্যতম নাকের ডগা ব্যথা, হাত আর পায়ের তালু ব্যথা। অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায় মাঝেমধ্যে।
একবার ক্যাম্পাসটাকে দেখলো ভালোমতো। পড়াশোনার মাঝপথে চলে এসেছে পৌষ। আর কিছুটা সময় শেষ হবে। মাস্টার্স করবে কি করবে না এটা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধা কাজ করে আজ-কাল। পৌষের মন চায় মনোযোগ দিয়ে সংসার করতে, তৌসিফ ওকে ঠিক যেভাবে চায় ওমন হয়ে যেতে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তন নিজের মাঝে আনতে। তাকে আগলে ধরে ভালোবাসতে। একটা মানুষ এভাবে অসহায় হয়ে যখন পৌষের মুখে শুনতে চায় ভালোবাসে কি না, পৌষ তখন উত্তর করতে পারে না। নিজের কাছে নিজেকে ছোট মনে হয়। পৌষ কেন জানি চাইলেও নিজেকে মেলে দিতে পারে না অথচ সম্পূর্ণ এক খোলা বই ও যাকে প্রতিনিয়ত পাঠ করে স্বয়ং তৌসিফ তালুকদার তবুও তার পৌষের থেকে অনেক কিছু পাওনা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
তার আকুতিভরা টলটলে স্বর পৌষকে নাড়িয়ে দেয় মাঝেমধ্যে। সন্তানের জন্য তৌসিফের হাহাকারও পৌষ বুঝে। ও নিজেও চাইছে কিন্তু তৌসিফ এতে যেন বাঁধ হিসেবে ‘ভালোবাসা’ নামক শব্দটা এনে রেখেছে। চাইলেও পৌষ ওকে দোষারোপ করতে পারছে না। এই মানুষটাকে শুরু থেকে পৌষ জ্বালিয়ে এসেছে। নিষিদ্ধ জায়গায় পদচারণ করে এসেছে। অবাধ্য হয়ে নানান অপ্রিয় কাজ করেছে অথচ বিপরীতে তৌসিফকে পেয়েছে ধৈর্য আর শাসনের মূল হিসেবে। নানান প্রশ্ন আজও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে পৌষের কিন্তু তৌসিফকে এবিষয়ে আজ জ্বালাচ্ছে না পৌষ। যেই মানুষ নিজ হাতে ওকে নিয়ে সম্রাটের সাম্রাজ্য ঘুরিয়ে এনেছে তাকে এই অতীত ঘেঁটে আর বিব্রত করতে চাইছে না পৌষ কিন্তু একেবারে ছেড়েও দিচ্ছে না ও। শুধু সময়ের অপেক্ষা করছে। হয়তো কোনদিন নিজ থেকেই তৌসিফ বলবে অথবা বলবে না। পৌষ অপেক্ষা করবে।
সামান্য ধাক্কা তো পৌষ নিজেও খেয়েছে অবশ্য। সেই কিশোরী মনটা আটকে ছিলো সম্রাটের ঐ ছবির উপর। আশেপাশে মানুষ থেকে শোনা এত গুনগান, এত সুনাম, এত আধিপত্য আর চাক্ষুষ এত এত কাজ যার সবটা ছিলো এলাকাবাসীর জন্য, সেই মানুষটার প্রতি সবার মনই ছুটে যেতো। পৌষ প্রতিবছর সম্রাটের জন্মবার্ষিকী আর মৃত্যুবার্ষিকীতে দেয়ালে দেয়ালে লাগানো পোস্টার গুলো দেখে যেতো। মাঝেমধ্যে তুলে নিয়ে এসে যত্ন করে রেখে দিত নিজের বইয়ের ভাজে। কতই না বিস্তর প্রতিপত্তি ছিলো তার, মৃত জেনেও মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়তো। পৌষের কিশোরী মনও আটকে ছিলো। ভালোবাসার মতো গভীর অনুভূতি না হলেও ভালোলাগা আর মোহের পরিমান ছিলো খুব বেশি তাই তো সহজে কাটতে চাইলো না। কতটাই জোড়ালো ছিলো যে তার সাথে সম্পৃক্ত থাকা সেই বাগান বাড়ীর রহস্য জানতেও উন্মুখ হয়ে ছিলো পৌষ। পৌষ এতটুকু তো খুব করে বুঝেছে সম্রাট তালুকদার মানেই ক্যারিশমাটিক যার জন্য নারীগুলো এভাবে মোহান্ধতা আর মত্ততা নিয়ে উতলা হয়ে থাকতো।
“পুষি?”
আদিত্যের ডাকে পৌষ তাকালো। আদিত্যের হাতে গরম কফির দুটো কাপ। পৌষের হাতে একটা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি অবস্থা? চাচ্চু কিছু বলেছিলো?”
পৌষ মাথা নাড়ে। আদিত্য বসে আবারও বললো,
“বেতন সব দিয়েছো?”
“উনি দিয়েছেন আজ। ব্যাগেই আছে। দিব এখন। তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
আদিত্য ধোঁয়া উড়া কফির কাগজের কাপে চুমুক দিলো। মাথা তুলে সন্দিহান কণ্ঠে বললো,
“সব ঠিকঠাক আছে? চাচ্চু কি খুব রাগারাগি করেছিলো?”
“উনি আমাকে বাগান বাড়ীর ট্যুর দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
আদিত্য প্রথমে খেয়াল করে নি। মুখ গোল করে ‘ওহ’ বলেই চেঁচিয়ে উঠলো,
“কিহ!”
পৌষ মাথা নাড়ে এবারেও। আদিত্য চঞ্চল হলো। পলক ঝাপটালো বারংবার। পৌষের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু কথা শুনার আশায়। পৌষ প্রতিবারের মতো খুব কথা বললো না বরং সংক্ষিপ্ত ভাবেই বললো,
“চলো, বেতন দিয়ে আসি।”
“আচ্ছা” বলে আদিত্য আর ঘাটলো না৷ বুঝলো পৌষ অসুস্থ বা ঝামেলা হয়েছে চাচ্চুর সাথে। হাঁটতে হাঁটতে দু’জন যখন বুথের কাছাকাছি এলো। পৌষের ব্যাগ থেকে নিজের টাকা বের করে আদিত্যের হাতে দিয়ে বললো,
“দিয়ে এসো, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”
মাথা নেড়ে আদিত্য চলে গেলো। পৌষ তখনও কফি পান করতে করতে ফাঁকা রাস্তা দেখছে। সাধারণত এতটা খালি থাকে না। ডিসেম্বর বলে একটু বেশিই ফাঁকা।
“পৌষ? এখানে কি করছো?”
পরিচিত কণ্ঠে পৌষ তাকালো। সিনা টানটান করে রাফিদ শিকদার দাঁড়িয়ে। পৌষ সাথে সাথেই দাঁত খামটি দিয়ে চোয়াল শক্ত করলো। রাফিদ এগিয়ে এসে পৌষের মুখের সামনে নিঃশ্বাস ছাড়তেই আভ বেরিয়ে এলো। সাথে সাথে দুই’পা পিছিয়ে গেলো পৌষ। আজ এমনিতেই মন ভালো ছিলো না৷ রাফিদকে তেমন কিছুই হয়তো বলতো না পৌষ কিন্তু এই ছেলে ইচ্ছে করে ওকে রাগীয়ে দিলো। পৌষ কিছু বলার আগেই আচমকা ওর হাত ধরে রাফিদ। ভড়কে গিয়ে পৌষ কিছু বলার আগেই রাফিদ ওকে টেনে পাশে নিলো। মানুষজন নেই বললেই চলে। পকেট থেকে একটা ডায়মন্ডের আংটি বের করে পৌষের আঙুলে ঢুকিয়ে দিয়ে চটপটে কণ্ঠে বললো,
“আমার বউ হয়ে যাও।”
দুই সেকেন্ড সময় লাগলো বোধহয়। আংটি পড়ানো হাতটা দিয়েই রাফিদের ডান গালে সজোরে একটা চড় দিলো পৌষ। এতেই থেমে রইলো না, আংটি খুলে রাফিদের মুখে ছুঁড়ে মেরে পায়ের থেকে জুতা খুলে হাতে নিয়ে একদম রাফিদের মুখ বরাবর তুলে শাসালো ঝাঁঝালো গলায়,
“জুতা দেখেছিস, জুতা? এই জুতা দিয়ে পিটিয়ে সোজা বানিয়ে ফেলব হা’রামির বাচ্চা। তোর সাহস কত, তুই জানিস না আমি কে? যা এখানে, ভাগ! ভাগ বলছি!”
তখন দুই একজন এগিয়ে এলো এদিকটায়। রাফিদ মাথা নিচু করে নিয়েছে ততক্ষণে। এক পলক রক্তচক্ষু নিয়ে পৌষকে দেখেই উল্টো পথে চলে গেলো। রাগে তখনও ফুঁসছে পৌষ। ওর মাথা ধরে আসছে। কত বড় সাহস এই ছেলের।
এখনও আদিত্য না আসায় পৌষ বুথে ঢুকলো। ঢুকেই বেয়াক্কেল বনে গেলো যেন। আদিত্যের মতো শান্ত ছেলে বুথে আগে দেয়া নিয়ে এক মেয়ের সাথে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করছে। পৌষ থামাতে গেলেও থামানো যাচ্ছে না যেন। আদিত্যকে অগত্যা ধমকালো পৌষ। এতে কাজ হলো। আদিত্য সরে আসলো। পৌষ ওকে নিয়ে অন্য বুথে যেতেই আদিত্য অবাক হয়ে বললো,
“তুমি আমার বান্ধবী হয়ে এ’কাজ করলে পুষি? আমাকে সাপোর্ট না করে পালিয়ে এলে?”
“ঝামেলা করো না তো আদি। বেতন দিয়ে এসো তারাতাড়ি।”
আদিত্য মাথা চুলকে এগিয়ে গেলো। তার পুষিকে কোন জংলী বিড়ালই না থাবা মারলো যে একদম শান্ত হয়ে গেলো। কথাটা ভেবেই পরপর আদিত্য ভাবলো, জংলী বিড়াল তো তাহলে তার মেঝ চাচ্চু হয়ে যাবে।
ওরা দু’জন বেতন দিয়ে দাঁড়িয়ে যখন কথাবার্তা বলছিলো তখনই কালো গাড়িটা থামলো ওদের সামনে। ভেতরে তৌসিফ। পৌষ আদিত্যের দিকে না তাকিয়েই বললো,
“আমাদের সাথে চলো। আজ তো বাইক আনো নি।”
আদিত্য মাথা ঝাঁকিয়ে না করবে তখনই গাড়ির ডোর খুলে তৌসিফ বললো,
“দুটোই ভেতরে এসো।”
আদিত্য মানা করার দুঃসাহস দেখালো না। চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে ওরা দু’জন পেছনে বসতেই তৌসিফ নেমে পৌষকে পাশে বসালো। ড্রাইভার গাড়ি ছাড়তেই তৌসিফ যখন পৌষের হাতটা ধরলো তখনই যেন বিদুৎ খেলে গেলো। বরফ ঠান্ডা হাত। রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে চাইলেও পারলো না তৌসিফ। এই মেয়েটার বিষয়ে চাইলেও কঠিন হতে ব্যার্থ তৌসিফ। ডান হাতের উল্টো পিঠ পৌষের নাকে ছুঁয়েই ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললো। হাত দুটো নিজের হাতের ভাজে নিয়ে ঘষে ঘষে গরম করতে করতে বললো,
“হ্যান্ড গ্লাভস্ পরতে বলেছিলাম সকালেই৷ কথা তো শুনবে না আমার।”
পৌষ কথা বলে না৷ আদিত্য চুপচাপ কানে হেডফোন গুঁজেছে। আপাতত তার ধ্যানজ্ঞান সম্পূর্ণই সেখানে। তৌসিফ পৌষের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ অতঃপর আস্তে করে পাশ থেকে টেনে মাথাটা নিজের কাঁধে নিলো। গায়ে থাকা শল দিয়ে ঢেকে দিলো নাক মুখ। পুরুষ গায়ের মত্তগন্ধ আর ওমওম ভাব যেন চোখ বুজে ফেলতে বাধ্য করলো ওকে। আরেকটু কাছে এসে কাঁধে নিজের ঠান্ডা নাক ডলে সেই মোহসুগন্ধ টেনে নেয় পৌষ। তৌসিফ তখনও ওর ঠান্ডা হাত গরম করতে ব্যাস্ত।
গালে আলতো স্পর্শে ঘুম ভাঙে পৌষের। তৌসিফ হাস্যমুখে তাকিয়ে ওর দিকে। পৌষ জড়ানো কণ্ঠেই জিজ্ঞেস করে,
“চলে এসেছি?”
“হ্যাঁ।”
পৌষ সোজা হয়ে বসতেই তৌসিফ গাড়ির পেছন থেকে একটা ব্যাগ নিলো। সেখান থেকে ভেজা টিস্যু বের করে নিজ হাতে পৌষের মুখ মুছতেই কপালে ভাজ ফেলে পৌষ বলে,
“বাসায়ই তো চলে এসেছি।”
“বাইরে তাকাও।”
অবাক হয়ে পৌষ দেখলো ওরা রাস্তায় আছে। আদিত্যকে বাসায় নামিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে এখানে এসেছে তৌসিফ। দু’জন নামে রেস্টুরেন্টের ভেতরে যেতেই অবাক হয়ে গেলো পৌষ। তৌসিফের বাহু জড়ানো হাতটা আরো শক্ত করে ধরে উচ্ছসিত হয়ে শুধালো,
“আপনি এনেছেন? থ্যাংকইউ থ্যাংকইউ।”
বলেই দৌড়ে যেতে লাগলো পৌষ। ওপাশ থেকেও ধেয়ে আসছে পাঁচজন। তাদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা লেগেছে কে আগে আসবে। কিছুটা গিয়েই হাঁটু ভাজ করে বসে পৌষ। ইনি, মিনি ধপ করে বুকের দু’পাশে দখলদারিত্ব করে। পিহা পেছন থেকে গলা জড়িয়ে নিতেই জৈষ্ঠ্য আর চৈত্র বোনের দু’পাশে থেকে কাঁধে মাথা রাখে। আপা ডাকের গুঞ্জন শোনা গেলো সেখানে৷ বেশ খানিকটা সময় তাদের আদর আহ্লাদ করে পৌষ সামনে তাকায়। হেমন্ত দাঁড়িয়ে সেখানে। পৌষ চোখের ইশারায় ডাকতেই শ্রেয়াকে রেখে হেমন্ত এগিয়ে এলো। পৌষ নিজ থেকে আবদার জুড়ে দিলো,
“আমাদের জড়িয়ে ধরো, অপেক্ষা করছি হেমু ভাই।”
পৌষের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হেমন্ত যতটুকু পারলো আগলে নিলো ওদের নিজের বুকে। বুকের মাঝে পিহার পিঠটা ঠেকলো হাতের মাঝে দুই ভাইয়ের বাহু অথচ মনে হচ্ছে সেদিনকার ছোট্ট পৌষ তার বুকে, যাকে কোলে তুলতো হেমন্ত নিজের অপরিপক্ক হাতে।
তৌসিফ সময় দিলো ওদের। মাঝেমধ্যেই তাদের দেখা হয় কিন্তু সময় যতই দেওয়া ততই বোধহয় কম হয়ে যায়। কিছু সম্পর্কই থাকে যা রক্তের মধ্যে এমন ভাবে মিশে থাকে যার বন্ধন থেকে মুক্ত কারো সাধ্যে নেই৷ খেতে বসে তাদের মাঝে নানান গল্পগুজব যখন চলছিলো তখন হেমন্ত খুব তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করলো তার বোনের সুখ। পৌষ যেমন ভাই-বোনদের খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত ঠিক তেমনই তৌসিফ ব্যাস্ত পৌষের খাওয়া নিয়ে। যত্ন নিয়ে দুই একবার মুখে এটাসেটাও দিচ্ছে। হেমন্ত স্বস্তি পায়। শান্তি মিলে বুকে। জীবন মানুষকে যেমন দুঃখে ঠেলে দেয় তেমনই দুঃখ থেকে তুলার জন্য শক্ত, বিশ্বাসযোগ্য একটা হাতেরও ব্যাবস্থা করে দেয়।
পৌষ আড়ালে শ্রেয়ার পেটে হাত রাখে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
“কবে আসবে ও?”
শ্রেয়া হাসলো। আস্তে করে বললো,
“অধৈর্য ফুপির ভাতিজা অধৈর্যই আসার জন্য।”
“ইশ, আমার তো সহ্যই হচ্ছে না। আসলে আমি পেলে দিব।”
শ্রেয়া ওর গাল টেনে দিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“এভাবেই হাসিখুশি থাকো পৌষ। ভাবী তোমার জন্য খুব দোয়া করি।”
“জানি তো।”
পৌষের এই হাসিখুশি মুখটা দেখে শ্রেয়াও হাসলো। মেয়েটার জন্য মনভরে দোয়া করে দিলো। এভাবেই সুখের চাদর মুড়িয়ে রাখুক মেয়েটাকে।
বিদায় কালে হেমন্ত আজ আড়ালে তৌসিফের হাতটা ধরে ফেললো। তৌসিফ প্রশ্নাত্মক চোখে তাকাতেই হেমন্ত বলে উঠলো,
“আমি যেটা পারি নি সেটা আপনি পেরেছেন ভাই। আপনি তো জানেন বোন কম সন্তান ভাবি ওকে আমি। আপনি ওকে এভাবেই আগলে রাখবেন ভাই। আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।”
তৌসিফ হেমন্তকে জড়িয়ে ধরলো। জানালো,
“আজীবন আগলে রাখব।”
“আমরা কি আজ বাসায় যাব না?”
রাত তখন নয়টা বেজে আটত্রিশ মিনিট। তৌসিফ হাঁটতে হাঁটতেই উত্তর দিলো,
“আজকের দিনটা তোমার নামে। যা খুশি করো।”
ঠান্ডায় হাঁটু কাঁপার উপক্রম তখন। গাড়ি থেমেছে সেই মিডফোর্ডের সিঁড়ির ওখানে। ওপাড় থেকে খেয়েদেয়েই রওনা হয়েছিলো বাড়ীর দিকে দু’জন। গাড়িতে ড্রাইভার অপেক্ষারত। আজ ব্রীজে জ্যাম তো নেই, উল্টো পথঘাট খালি। পৌষ সেটা দেখে বললো,
“সব কত খালি দেখেছেন?”
“হুঁ।”
তৌসিফ তখন পানির দিকে দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে। চারপাশে সবুজ, লাল মরিচা বাতি জ্বলছে। ডিসেম্বর মাস বলে কথা, বিজয়ের মাস জুড়ে এই বাতি জ্বলে। তৌসিফ আচমকা পৌষের কোমড় জড়িয়ে ধরে। দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেখে কুয়াশায় ঢাকা নিঃস্তব্ধতার চাদরে ঘেরা বুড়িগঙ্গাকে। তৌসিফ আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো,
“ঠান্ডা লাগছে?”
“হুঁ।”
কিছুক্ষণ নীরবতায় কেটে গেলো তাদের। তৌসিফ পৌষের সাথে দূরত্ব ঘোচাতেই পৌষ বললো,
“ঠান্ডা বেশি লাগলে গাড়িতে চলি আমরা?”
“উঁহু। এখানে থাকি। ভালো লাগছে।”
“আচ্ছা।”
“পৌষরাত?”
গম্ভীর অথচ আদুরে ভাব সেই ডাকে। পৌষ আস্তে করে বলে,
“জি।”
“কতদিন আমরা একসাথে খেয়াল করেছো?”
“হুঁ।”
“তোমাকে বিয়ের আগে আমি এমন ছিলাম না পৌষরাত। আমি জীবন নিয়ে এতোটা পরোয়াও করতাম না। রাজনীতির প্রাঙ্গনে যতটা হালকা ভাবে চলতাম তার পুরোটাই বংশীয় রীতিনীতির অংশ ছিলো। তুমি আসার আগ দিয়ে খুব বড় একটা পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। চতুরতায় আমাকে ধরা অসম্ভব কিন্তু মাঝেমধ্যে আজকাল ভয় পাই। তোমার জন্য হলেও আমার নিজেকে সুস্থ চাই। ছোট থেকে আমি হারিয়েছি পৌষ। তুমি জানো না কিন্তু আমি অনেক হারিয়েছি। আম্মু, আব্বু সহ আরো… ”
পৌষ স্তব্ধ। তৌসিফ বলতে চাইলেও আর বলতে পারলো না। হঠাৎ ওর পিঠের পেছনে গুলি এসে লেগেছে। শব্দটা এতই তীব্র ছিলো যে পৌষ বা তৌসিফ কেউ বুঝে উঠতে পারে নি। পৌষ আচমকা চিৎকার করে উঠলো,
“তৌসিফ!”
তৌসিফ দাঁড়ানো থেকে ধপ করে বসে পড়লো। পৌষ জড়িয়ে নিলো ওকে বুকের মাঝে। চিৎকার করে আর্তনাদ করে উঠলো,
“কেউ ধরুন। একটু এদিকে আসুন। ভাই, কেউ আসুন। ড্রাইভার চাচা!”
পৌষ পাগলের মতো ডাকতে লাগলো, কেউ আসলো না। ওদের ঠিক সামনেই একটা লাল গাড়ি দাঁড়িয়ে। তৌসিফ কপাল কুঁচকে নিলো। পৌষ হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। এই প্রথম, এই প্রথম তৌসিফ ওকে কাঁদতে দেখলো। চিৎকার করে কাঁদছে তৌসিফের পৌষ। তৌসিফের রক্তে ওর হাতটা তখন মেখেঝুকে গিয়েছে। পৌষ বিলাপ করে বলতে লাগলো,
“অ্যাই, অ্যাই উঠুন। তৌসিফ উঠুন৷ দয়াকরে উঠুন। আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচব না৷ আমি সত্যিই মরে যাব। আমার শ্বাস আটকে আসছে।”
পৌষ চিৎকার করে আবার ডাকে। দুই একজন যাও মানুষ ছিলো তারা উপেক্ষা করে গেলো। গাড়িগুলো সাই সাই গতিতে চলে গেলো। এই উটকো ঝামেলা কেউ চাইলো না। তৌসিফ আস্তে করে বললো,
“ড্রাইভারকে ডাকো। প..পৌষরাত। ভয় পেও না৷ আ..আমি আছি তো।”
ড্রাইভার ততক্ষণে দৌড়ে আসছে এদিকে। পৌষ কাঁদছে এবার গলা ফাটিয়ে। তৌসিফের জন্য এভাবে কাঁদবে তা কোনদিন ভাবে নি তৌসিফ। পৌষ ওকে নিজের বুকে ভরতে চাইলো। পাগলের মতো কপাল ভরে চুমু খেলো। বলে উঠলো হঠাৎ করে,
“আমি আপনাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি আমি আপনাকে। চোখ খুলুন। চোখ খুলুন বলছি।”
“আই লাভ ইউ ঠু হানি।”
মৃদু চোখ খুলে তৌসিফ বলতেই ড্রাইভার এলো। তৌসিফকে পাঁজা কোলে তুলে দু’জন কোনমতে গাড়ির দিকে যেতেই আচমকা লাল গাড়িটা থেকে দু’জন বেরিয়ে এলো। পেছন থেকে পৌষকে চেপে ধরতেই পৌষ চিৎকার করে নিজেকে ছাড়াতে চায় কিন্তু ব্যর্থ হয়। তৌসিফের থাকা সামান্য জ্ঞান তখন যেন বুঝে নেয় তার পৌষরাতের অবস্থা কিন্তু আসার হয়ে আসা শরীর আর টিকতে পারে না। অস্পষ্ট ভাবে ডেকে উঠলেও শোনা যায় না তা।
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৯
“ওনাকে নিয়ে হাসপাতালে যান চাচা।”
শেষ এতটুকু বাক্যই পৌষের মুখে শোনা গেলো। কোন কিছু করার বা বলার আগেই পৌষ হারিয়ে গেলো ততক্ষণে। লাল গাড়িটা ছুটে গেলো দূরে কোথাও। এই ভর কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে বিচ্ছেদ ঘটলো এক দম্পতির যেন ইতি টানা হলো তাদের প্রেমের।

ভালের গল্প।
এরকম এন্ডিং দিবেন না
Next part dinnna and end ta tik holo na