প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ২৮
নওরিন কবির তিশা
তপ্ত রৌদ্র কিরণে আবৃত উজ্জ্বল সকাল। বৃষ্টি পরবর্তী আবহাওয়াটা যেন চড়মড়িয়ে উঠেছে। জানলার ফাঁকফোকর দিয়ে রুমে ঢুকছে সোনালী রৌদ্ররেখা। ঘুম ঘুম চোখে একবার আশেপাশে তাকালো তিহু। পাশ হাতড়িয়ে নীলের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করল একবার। কিন্তু জায়গাটা শূন্য পড়ে আছে। নীলকে অনুপস্থিত অনুভূত হতেই দ্রুত বিছানায় উঠে বসলো তিহু। দেওয়াল ঘড়িতে চেয়ে দেখলো সকাল পাঁচটা বেজে পনেরো মিনিট।
গরমের দিন হওয়ায় বেলা হয়েছে বেশ। নীলকে খুঁজতে এক ঝলক ওয়াশরুমের পানে তাকালো সে। চটজলদি হেঁটে গিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,,—’শুনছেন? আপনি কি ভিতরে…
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই খুলে গেলো ওয়াশরুমের দরজাটা অর্থাৎ ভিতরে কেউ ছিলোই না। তিহু চিন্তিত দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকালো। কাল রাতে তো তারা দুজনে এই রুমেই ছিল তাহলে হুট করে আজ সকালে… হঠাৎ মনে হলো নীল বাইরে থাকতে পারে। চটজলদি ওয়াশরুমে প্রবেশ করল ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্যে। ফ্রেশ হয়েই বাইরে যাবে সে।
ফ্রেশ হয়ে টাওয়াল দিয়ে চুলগুলো মুছতে মুছতে বের হল তিহু। এখনো কোনো হদিস নেই নীলের। ফের আরেকবার দেয়াল ঘড়িতে চাইলো সে। পাঁচটা বেজে তেতাল্লিশ মিনিট। প্রায় অর্ধ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এখনো লাপাত্তা নীল। এবার চিন্তাটা বেশ জেঁকে বসলো তিহুকে। দ্রুত হেঁটে গিয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে নিজের ফোনটা তুলে নীলকে ফোন দিতে গিয়েই দেখতে পেল, নীলের ফোনটাও পাশে পড়ে আছে।
দুশ্চিন্তারা গাঢ় থেকে প্রগাঢ় হতে শুরু করেছে। দ্রুত রুম থেকে বের হল সে। আশেপাশের রুমগুলো বদ্ধ দরজা দেখে বুঝলো কেউ এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। উঠবেই বা কি করে কাল রাতে সকলে দেরি করে ঘুমাতে যাওয়া আর ঠান্ডা আবহাওয়ার দরুন, ঘুম দীর্ঘ হচ্ছে তাদের।
কিন্তু তিহুর চিন্তা হচ্ছে ভীষণ। যে মানুষটা এতটা শৃঙ্খলিত,নিয়ানুবর্তী সে কেন নিজের ফোন রেখে কোথাও যাবে?তিহু চিন্তিত দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকিয়েই মাথায় হাত চাপলো। দ্রুত ওড়নাটা ঠিকঠাক গাঁয়ে জড়িয়ে, বেরিয়ে পড়ল বাইরের উদ্দেশ্যে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বৃষ্টির রেশ কেটে গেলেও,সকালের স্নিগ্ধ আবহাওয়াতে এখনও মাটির সোঁদা গন্ধ মিশে আছে।পূর্ব-দিগন্তে তরুণী সূর্যের এক চনমনে তেজ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। উষ্ণ রোদটুকু ঠান্ডা প্রকৃতিকে যেন এক নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়েছে।কাল রাতের ঝমঝম বৃষ্টির দরুন পাহাড়ি উপত্যকা থেকে নেমে আসা সরু পথটার চারি ষধারের বনফুল গুলো থেকে এখনও জলকানারা গড়িয়ে পড়ছে।
খোলা প্রান্তরের ন্যায় চারদিক; সারি সারি চা-বাগানের সবুজ পাতাগুলো দীর্ঘ নিশীথের ভারী বর্ষণের ফলে ধুয়ে-মুছে যেন আরও বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। দু’পাশে নেমে যাওয়া টিলাগুলোর খাঁজে খাঁজে ছোট ঝরনা থেকে গড়িয়ে পরছে স্বচ্ছ বারিধারা, তাদের কলকল ধ্বনি চারপাশের নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে উচ্ছলতায়।
নুপুরের রিনিঝিনি শব্দের ঝংকার তুলে সম্মুখে এগিয়ে চলেছে তিহু। দারোয়ানের ভাষ্যমতে এদিকেই এসেছে নীল।বাতাসের এক একটা চঞ্চল স্রোত ক্ষণে ক্ষণে পাগলাটে প্রেমিকের নেয় ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। ভেজা বেবি হেয়ার গুলো কপালের ওপর খেলা করছে সমগ্র চাঞ্চল্য নিয়ে। তবে সেগুলোকে পাত্তা না দিয়ে তিহু একবার চঞ্চল দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল, বুকের মাঝে একটা চাপা উদ্বেগ এখন ঢেউ তুলছে।
খানিক দূর এগোতেই সম্মুখের পাহাড়ি নির্জন উপত্যকা হতে গিটারের মিষ্টি অথচ চঞ্চল সুর তরঙ্গের ন্যায় এসে কর্ণগত হল তার।বিস্মিত আঁখিজোড়া স্থির হলো সুর তরঙ্গের দিকে।আর কালবিলম্ব না সে সর্বোচ্চ গতিতে এগিয়ে গেল সেইদিকে। কিছু দূর যেতেই দৃষ্টিগত হল এক উঁচু টিলা। আর তার ওপর গিটার হাতে অন্যদিকে ঘুরে বসমান মানবটিকে।
এদিকে পিছনে কারো উপস্থিতি অনুভূত হতেই নীল ঘুরে দেখল, সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হলো নিবিড় সবুজের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা হালকা আকাশী রঙের পাকিস্তানি ড্রেস পরিহিত অপরুপাটি। সকালের মিষ্টি রোদ্দুর আরো বেশি স্নিগ্ধ করে তুলছে তাকে।অন্যদিকে নীলকে এভাবে নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে মুহূর্তেই তার মনের সমস্ত উদ্বেগ ক্রোধে পরিণত হলো। ক্রোধিত বেগে এগিয়ে গিয়ে সে বলল,,
—’আর ইউ ম্যাড? কোনো কান্ডজ্ঞান আছে আপনার? এখানে এসেছেন একটিবারও আমাকে বলার প্রয়োজন বোধ করেননি। ফোনটাও আনেন নি আপনি।
রাগে-দুঃখে-কষ্টে চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল তিহুর। এদিকে নীল পিছনে ঘুরে তিহুকে এমন উদ্বিগ্ন দেখে, বেশ অবাক হলো।
—’আরে এমন করছ কেন? আমি তো শুধু.. তোমার ওঠার আগেই চলে যাব ভেবেছিলাম কিন্তু…
তাকে কথা শেষ করতে দিল না তিহু। রেগে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে নীলের কলার আঁকড়ে ধরল সে,,—’আপনি পাগল? জানেন আমি কত চিন্তা করছিলাম? আর আপনি জানবেনই বা কি করে, আপনি তো আর আমার মতো উন্মাদের ন্যায় ভালো….!
কথার ইতি না টেনেই মুখে লাগাম টানল তিহু। বুঝলো কি বলতে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে ছেড়ে নীলকে। এদিকে তার মুখের অপূর্ণ কথাটায় ব্যগ্র দৃষ্টিতে তাকালো নীল। গভীর-ভরাট জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল,,—’ভালো?
তিহু আর দাঁড়ালো না, উল্টো দিক ঘুরে আগের রাস্তায় ফিরে যেতে পা বাড়াতে গেলেই তার অপর হাতটা আঁকড়ে ধরল নীল। তাকে নিজের কাছে টেনে বক্ষদেশ বরাবর এনে বলল,,—’এত পালাই পালাই কেন করো? পছন্দ হয় না আমার স্পর্শ? আমার কন্ঠ? আমার উপস্থিতি?
তিহুর রুদ্ধকর অবস্থা নীলের এমন স্পর্শ আর মাতাল কন্ঠে। নিজেকে বহু কষ্টের সামলিয়ে সে শুকনো ঢোক গিলল,—’ছাড়ুন আমায় ব্যাথা পাচ্ছি।
‘ব্যথা পাচ্ছি।’কথাটা কর্ণগত হওয়া মাত্র নীল ছেড়ে দিল তিহুর হাত। সঙ্গে সঙ্গে তিহু খানিক দূরত্বে গিয়ে দাঁড়ালো। নীল পাশ থেকে গিটারটা তুলতে তুলতে বলল,,—’যে স্পর্শে আজ তোমার ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। সেই স্পর্শ পেতেই দেখবা একদিন তুমি উন্মাদ হবে।
তিহু কথা বাড়ালো না। এগিয়ে চলো রিসোর্টের দিকে। নীল বরাবরের ন্যায় পিছু করলো তার।
“কোথায় গিয়েছিলিস রে তোরা?”~~জুনাইয়ার কন্ঠে তার দিকে ঘুরে তাকালো তিহু-নীল। সবে রিসোর্টে ফিরেছে তারা। এসেই দেখতে পেল সকলে গেটের কাছে অপেক্ষা করছে। নীল কোনো উত্তর না দিয়ে গিটার নিয়ে সোজা ঢুকে পড়লো ভিতরে। তিহু তার দিকে বিরক্তি দৃষ্টিতে তাকালো। সে কিছু বলার আগেই জুনাইয়া ফের বলল,,
—’থাক থাক মিথ্যা বলা লাগবে না পিও। তুমি যে বরের খোঁজে গিয়েছিলে সেটা আমাদের সকলের জানা। শামসুর আঙ্কেলই বলেছে।
জুনাইয়ার কথায় তিহু উত্তর দিতে যাবে তার আগেই পাশ থেকে কুহেলিকা বলল,, —’বাপরে বাপ,কি পিরিত? বুঝলাম বইন তোমার স্বামীরে তুমি একটু বেশি ভালোবাসো। তাই বলে কাউকে কিছু না বলে এই অচেনা জায়গায় বেরিয়ে যাবে?
মাহা তাদের কথার মাঝে ফোড়ন কেটে মুখ বাঁকিয়ে সামান্য হেসে বলল,,—’হ্যাঁ হ্যাঁ আপু, পিরিত দেখে আর বাঁচি না! মনে হয় উনি একাই বিয়ে করেছেন।
ক্রোধিত তিহু এক ঝলক মাহার দিকে তাকালো। এমনিতেই রেগে মেগে আগুন সে আর তার রাগে আগুনেই যেন ঘি ঢালার ন্যায় কাজ করছে সকলের বলা কথাগুলো। ধুপধাপ পায়ে অন্দরমহলে প্রবেশ করল সে। তাকে এমন ক্ষুব্ধ দেখে নাহা মাহার ঘাড়ে হাত রেখে বলল,,
—’ব্যাপার কি বলো তো বড় বউমনি? তোমার বান্ধবীর হঠাৎ হলো টা কি?
“ওর যে কি হয়?”——কথার মধ্যিখানে থামলো মাহা চোখগুলো সরু করে নাহা’র দিকে ফিরে বলল,,—’বাই দ্যা ওয়ে আমাকে কি বললে তুমি?
নাহা পূর্বের ন্যায় তিহুর দিকে দৃষ্টি রেখেই বলল,,—’কেন? বড় বউমনি।
মাহা নিজের ঘাড় থেকে নাহা’র হাতটা ছাড়িয়ে বলল,—’কোন দিক থেকে তোমার বড় বউমনি হই আমি হ্যাঁ?
নাহা’র ধ্যান ছুটল যেন এবার,—’না, মানে রাওফিন ভাইয়া শিখিয়েছে।
—’তুমি কি বাচ্চা যে, তোমার ভাইয়া শেখাবে আর তুমি বলবে?
—’না মানে ওই আর কি, ভাবলাম তোমাদের হয়তো সামথিং সামথিং…
তাকে কোথায় শেষ করতে দিল না মাহা,—’এইইই, এই মেয়ে কি বলো? সামথিং সামথিং মানে?
—’ওই আর কি!
তার জবাবে মাহা কিছু বলতে যাবে তার আগেই পিছন থেকে ভেসে আসে কুহেলিকার ডাক,,—’কিরে নাহু? তোরা কি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি?
—’না চলো।
—’হ্যাঁ,চল। জুনুপু আর মাহু তোমরা ও এসো। রাফা,নীরা ফারিসা তোরাও চল।
—’হ্যাঁ চলো।
একে একে সকলে এগিয়ে চলল রিসোর্ট এর ভিতর।
—’হাত ছাড়ো রাওফিন। নইলে থাপ্পড় কিন্তু একটাও নিচে পড়বে না।
মাহা ক্ষিপ্ত বাঘিনীর ন্যায় তাকালো রাওফিনের পানে। মূলত দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে সে যাচ্ছিল রুমের উদ্দেশ্য। সন্ধ্যায় গ্রীল পার্টির আয়োজন হওয়ায় এখন একটু রেস্ট করবে সকলে। সকলে রুমে চলে গেলেও মাহার চলার পথে বাঁধা হয়েছে রাওফিন। হুট করে কোত্থেকে এসে, পিছন থেকে প্রথমে ওড়না পরবর্তীতে হাত আঁকড়ে ধরেছে তার। রাওফিনের এমন কাণ্ডে মাহার রাগ ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলেছে। তবে রাওফিনের শৈল্পিক দেহের কাছে নিতান্তই ক্ষীণ তার কায়া।
—’আমি তো চাই তোমার হাতে থাপ্পর খেতে জানেমান। আচ্ছা মারো তুমি থাপ্পড়, কিন্তু কি দিয়ে মারবে? ওই ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে? ওটাতো আমার অব্দি পৌছাতেই, তোমার সব তেজ ফুস হয়ে যাবে।
রাওফিনের প্রতিটি কথায় যেন আগ্নেয়গিরির উদগিরণ হচ্ছে মাহার মাঝে। দাঁতে দাঁত পিষে সে বলল,,—’তুই আমার হাত ছাড়বি কি না?
—’উফস লাভলাইন, রোমান্সের মাঝে এত সিরিয়াস হয়ে যাও কেন? আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছি, দেখা গেল আমাদের বাসর রাতেও তুমি…উহুমম..!
তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ফের আরেক ঝটকা মারল মাহা, তবে এবার প্রস্তুত না থাকার দরুন বন্ধন শিথিল হলো রাওফিনের। মাহা দুরে সরে যেতে নিলেই রাওফিন পিছন থেকে ফের বলে উঠলো,,—’এত লাফালাফি করে লাভ হবেনা লাভলাইন। সুদূর কানাডা থেকে আমি ফিরে এসেছি।
—’সো হোয়াট? কেন এসেছ তুমি?
রাওফিন এগিয়ে এলো খানিক। মাহার কাছে এসে সামান্য ঝুঁকে তার কানে ফিসফিসিয়ে গেয়ে উঠলো,,
🎶 এসেছি তোকে নিয়ে ফিরবো বলে….
মনের ই পথে চিনে আয়না চলে….🎶
রাওফিনের গভীর পৌরুষ সেই কণ্ঠে, থমকালো মাহা, স্থির হলো দৃষ্টি ঝাপসা হল সম্মুখে থাকা সবকিছু।
সকাল থেকেই তিহুর গম্ভীরতা ক্রমেক্রমে বেড়ে চলেছে। সারাদিন রুম থেকে একটুও বের হয়নি সে। সকালের নাস্তা সহ দুপুরের খাবারটাও মেড এসে দিয়ে গিয়েছে। তিহু একপ্রকার রুমের দরজা বন্ধ করেই পড়ে আছে। কিছুক্ষণ হল পুব প্রান্তের বিশাল জালনাটার ধারে এসে দাঁড়িয়েছে সে। আকাশটা আজ উজ্জ্বল কোথাও নেই কোনো মেঘের ঘনঘটা। নীলও অনুপস্থিত বেশ অনেকক্ষণ। তবে কোথায় গিয়েছে জানা নেই। জানার প্রয়োজনবোধ অব্দি করেনি তিহু। যে লোক না জানিয়ে তাকে চিন্তায় ফেলতে পারে তার ব্যাপারে আর মাথা ঘামাতে চায় না সে।
হুট করে খুলে গেল রুমের দরজাটা। ভিতরে কে এসেছে তা জানতে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না তিহু। পারফিউমের কড়া সুবাসেই উপস্থিত মানবটির পরিচয় পেয়েছে সে। মানবটি রুমে প্রবেশ করেই বদ্ধ করল দরজাটা। কিছুক্ষণ পর এগিয়ে এলো তিহুর দিকে। কিন্তু না তিহুর কাছে আসলো না সে। মোড় নিলো অন্য দিকে।তিহু গুপ্ত দৃষ্টিতে অগোচরে মানবটির অবস্থান নির্ণয়ে তার দিকে তাকাতেই দেখলো ড্রেসিং টেবিলের দীঘল চওড়া আতশিতে তার অবয়বের দিকেই তাকিয়ে আছে মানবটি।সে চাইতেই চোখাচোখি হলো দুজনের, নীল খানিক বাঁকা হেসে বলল,,
—’রাগ কমেনি ম্যাডাম?
তিহু জবাব দিল না। বরং দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো। নীল ধীরে সুস্থে হাত ঘড়িটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখলো। অতঃপর সদ্য পাশে রাখা গাদাখানিক শপিং ব্যাগ হাতে তুলে নিল। একটা জুয়েলারি বক্স খুলে, হাতে তুলল কাঙ্খিত বস্তুটি। এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো তার অভিমানী ঘরণির পিছে। তিহু নীলের অবস্থান টের বাবা মাত্র যেই না সরতে গেল অমনি নীল আঁকড়ে ধরল তার হাত। ধীরে ধীরে পিঠের উপর পড়ে থাকা দীর্ঘ কেশগুচ্ছ ধীরে ধীরে সরিয়ে,তিহুর সম্মুখ পার্শ্বে রাখল।
অতঃপর হাতে থাকা নেকলেসটি সন্তর্পণে অতি যত্নে ধীরে ধীরে পরিয়ে দিল তিহুর গলায়। নীলের প্রতিটি স্পর্শে জমে আসছে তিহু। শরীরে সৃষ্টি হচ্ছে অযাচিত কম্পনের। গ্রীষ্মের প্রকটতার মাঝে অনুভূত হচ্ছে শীতের তীব্রতা। শিরশিরে এক অনুভূতি মেরুদন্ড পেয়ে নেমে যাচ্ছে সর্বাঙ্গে।নীলের উষ্ণ নিশ্বাসগুলো গভীর অরণ্যের গোপন স্রোতস্বিনীর মতো তার পিঠে আছড়ে পড়ছে, নিঃশব্দে, অগোচরে।
বেপরোয়া ভাবে পতিত সেই নিশ্বাসগুলো মুহূর্তেই তিহুর স্নায়ুতন্ত্রে এক বিদ্যুৎ-শিখার বার্তা বহন করলো, যে বার্তা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো তার রক্তস্রোতকে অজস্র লাভার উত্তাপে পূর্ণ করতে সক্ষম।তিহুর বিস্মিত-নির্বাক-স্থবির। হিমশীতল বরফখন্ডের ন্যায় জমে আছে সে। নীল খানিক মুচকি হাসলো তিহুর এমন অবস্থায়। তবে হঠাৎই তার দৃষ্টি কাটলো তিহুর গলার বাঁ দিকে সামান্য নিচের একখানা কালো তিল।
নেকলেস পরানো শেষে, সে যেইনা ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তিলটাতে সবে স্পর্শ করতে যাবে ঠিক তক্ষুনি দরজায় পরে আলতো আঘাত, বাইরে থেকে কেউ একজন বিনম্র কণ্ঠে শুধালো,,
—’স্যার আপনার পার্সেলটা?
বিরক্তিতে মুখ কুঁচকালো নীল,—’ড্যাম ইট!
পরক্ষণেই তিহুর কাছ থেকে কিছুটা সরে, দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে সেটি খুলে বলল,,—’দাও।
ছেলেটা পার্সেলটা দিয়েই, প্রস্থান করল সেখান থেকে। সে চলে যেতেই নীল দরজা আটকে জিনিসগুলো নিয়ে এগিয়ে গেল সেন্টার টেবিল এর দিকে।
এদিকে নীল সরে যেতে তিহু একঝলক নিজের গলার দিকে চাইলো, রৌদ্র রেখায় নেকলেসটির অগ্নিময় ঝলক প্রমাণ করলো এটি হীরের তিহু এবার বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে। সে হতবাক দৃষ্টিতে নীলের দিকে তাকালো,তবে এবারও তাকে অবাক করে দিয়ে নীল হাতে থাকা ফুচকা গুলো আনবক্সিং করতে করতে বলল,,
—’একটু এসো তো নুর।
ডালি ভর্তি ফুচকা দেখে তিহু চোখ সরু করে তাকাতেই নীল বলল,,—’শুনলাম কেউ একজন নাকি আমার উপর রাগ করে কিছু খায়নি। তাই ভাবলাম…!
তিহু কিছু না বলে চুলগুলো পিছনে এনে, হাত খোঁপায় বেঁধে নিল। অতঃপর রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিতেই নীল বললো,,—’কোথায় যাচ্ছেন ম্যাডাম? রাগ না হয় আমার উপর, তা ফুচকা গুলো কি দোষ করল শুনি?
তিহু এখনো নির্বাক। নীল সেখান থেকে একটা ফুচকা তুলে আলু-ছোলা পুর সঙ্গে টক জল মিশিয়ে তার অভিমানী ঘরনীর সামনে এসে তার মুখের দিকে ফুচকাটা বাড়িয়ে বলল,,—’খেয়ে নিন ম্যাডাম। আদার ওয়েজ সারাদিন আমার ওপর রাগ করে থাকার এনার্জি পাবেন না।
তিহু না নিতে চাইলে, নীল এবার ক্লান্তিতো কন্ঠে বলল,,—’প্লিজ খেয়ে নাও নুর। আমি নিজেও বড্ড ক্লান্ত আজ।
অনুনয় মিশ্রিত সেই কন্ঠে কি যেন হলো তিহুর। ঝটপট মুখে পুরে নিল ফুচকাটা। সেটা নিতেই নীল আরো কয়েকটা ফুচকা রেডি করে তার সম্মুখে এনে বলল,,—’খাইয়ে দিতে পারবে? জাস্ট ফর ওয়ান্স।
তিহুর মধ্যে অজানা এক অনুভূতি কাজ করল, কি জানি ভেবে সেও অতি যত্নে একটা ফুচকা তুলে নীলের মুখের সম্মুখে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে সেটা গ্রহণ করল নীল। শুধু গ্রহণই নয়, মুখে যাওয়া তিহুর দুইটা আঙুলে বসালো আলতো কামড়। সামান্য কেঁপে উঠলো তিহু।
সন্ধ্যা নেমেছে বহুক্ষণ, টিলার গা বেয়ে শীতল বাতাস হ্রদের জলে মৃদু ঢেউ তুলছে। রিসোর্টের আলো এখানে পৌঁছাচ্ছে সামান্য, কিছুটা নির্জন সেই পার আজ জনগুঞ্জনে মুখরিত। কাঠকয়লার মিঠে ধোঁয়ায় গ্রিল-করা মাংসের সুঘ্রাণে সমস্ত প্রান্তর মদির হয়ে উঠেছে। আকাশে তখনো একফালি লালাভ আভা, আর নিবিড় বনানীর প্রান্তে প্রথম তারাটি জ্বলিছে। স্নিগ্ধতায় মোড়ানো সেই মিষ্টি পরিবেশে খান আর মির্জা মহলে সব নবীনগণ আনন্দে মত্ত হয়েছে।
গিটারের টুংটাং শব্দের পাশাপাশি আছে, হাজারো কথার ফুলঝুরি। নীল এসে বসেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। সকলের আবদার একটাই, তাকে আজ গান গাইতেই হবে। নিহিত রুম থেকে তার গিটার টা এনে, নীলের সামনে রেখে বলল,,
—’উহু, আর কোন কথা হবে না ভাইয়া। আজ একটা গান গাইতে হবেই হবে কি বলো রাওফিন ভাই?
—’অফকোর্স, দেখ বেডা আজকে তোর গান গাইতেই হবে।
পাশ থেকে সৌভিক বললো,,—’পিরিত তো বউয়ের সাথে কম করিস না? দুটিতে মিলে ভোর বেলা ঘুরতেও গেছিলি শুনলাম।
পাশ থেকে রাউফিন ফোড়ন কেটে বলল —’সে আর বলতে? তুই কি জানিস? আমাদের গুরুগম্ভীর নেতা সাহেব তার বউকে, ফোর্স ম্যারেজ করেছে?
একটা কথা মুহুর্তেই সকলে তাজ্জব বনে গেল, নিহিত বলল,,—’কি বলো ভাইয়ের না লাভ ম্যারেজ?
রাওফিনকে আর কথা বাড়াতে না দিয়ে, নীল কিছুটা চড়া গলায় বলল,,—’চুপ করবি রাওফিন?
রাওফিন নীলের এমন ধমকে, বাচ্চাদের মতো মুখ করে বলল,,—’বক বক, কত বকবি বকে নে। কিছুদিন পর আমিও দেখাবো নিজের ক্যালমা তখন বুঝিস।
তার কথায় হাসির রোল পড়লো সেখানে। নীল এক ঝলক সদর দরজার দিকে তাকালো। গোধূলি মায়াবী আলোয় খুঁজে চলল কোনো এক ফেইরিকে। যে এখনো এখানে অনুপস্থিত, তবে তার চঞ্চল দৃষ্টি স্থবির হলো মুহূর্তেই। যখন দেখলো কুহেলিকা আর মাহার সঙ্গে এদিকে আসছে তার ব্লু ফেইরি। পরনে ডার্ক ব্লু কালার, সাটিন শাড়ি। যেটা দুপুরে কিনে এনেছিল নীল।
তবে শাড়িটাতে তার ঘরণীকে তার কল্পনার থেকেও বেশি সুন্দরী লাগছে। কোন স্বর্গীয় অপ্সরা ও হার মানবে তার ঘরনীর বর্তমান সৌন্দর্যে। মুগ্ধ-মোহিত দৃষ্টিতে নেশাগ্রস্তের ন্যায় নীল অনিমেষ চেয়ে রইল তিহুর দিকে।তিহুর এমন ঘোর লাগা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা নীলের দিকে এক ঝলক চোখ কুঁচকে তাকালো, পরক্ষণেই তার পাশ কেটে চলে গেলো রাফাদের দিকে।
চিকেন গ্রীল করার দায়িত্ব জুনাইয়ার ওপর বর্তেছে। সবকিছু প্রায় সম্পন্ন। সন্ধ্যাটাও গাঢ় হতে শুরু করেছে। নানা রঙের ফেস্টুন আলোর উষ্ণ রশ্মি আর কয়েকটি পেট্রোলম্যাক্স লণ্ঠনের কোমল আলোকছটার মাঝে মায়াবী সন্ধ্যায় নবীনগুলো সব গোল হয়ে বসে আছে, হ্রদের তীরে।নীলের দৃষ্টি এখনো তিহুতে স্থির। পাশ থেকে রাওফিন তাকে, আলতো আঘাত করে বলল,,
—’চোখ খান একটু সরা, খুলে পড়বে তো।
নীল বিরক্তি দৃষ্টিতে রাওফিনের দিকে তাকাতেই বোকা হাসল সে। হঠাৎ সকলের দিকে ফিরে জোরে বলে উঠলো,,—’অ্যাটেনশান প্লিজ, তোমরা কি জানো তোমাদের গুরুগম্ভীর সাবেক ছাত্রনেতা এখন গান গাইবে।
নীল বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো, সে কিছু বলার আগেই পাশ থেকে কুহেলিকা বলল,—’কি ভাইয়া গান গাইবে! আচ্ছা ভাইয়া প্লিজ একটা গান করুন। সৌভিকের কাছে অনেক শুনেছি আপনার গানের গলা নাকি খুব সুন্দর।
কুহেলিকার কথায় তিহু একবার নীলের পানে চাইল।নীল এবার পড়লো মহা ঝঞ্ঝাটে, শেষমেষ বাধ্য হয়েই, পাশ থেকে গিটার খানা তুলে নিল সে। কিছু একটা ভেবে টুং টাং সুর তুলে তিহুর পানে চেয়ে হঠাৎ গেয়ে উঠলো,,,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ২৭
🎶Tujhe paa ke jawab mila hai asal…
( তোমাকে পেয়েই আসল উত্তর মিলেছে)
Tu hai woh sawaal Khuda ka….
(তুমি খোদার কাছে সেই প্রশ্ন)
Tu mila hai yeh meri dua ka asar…
( তোমাকে পেয়েছি, এটা আমার প্রার্থনার ফল)
Tu mujhse door na jaana…….
(তুমি আমার কাছ থেকে দূরে যেও না)
Teri nazron ka dil pe hua hai asar,….
(তোমার দৃষ্টির প্রভাব পড়েছে হৃদয়ের উপর)
tu mera mehboob hai jaana…
(তুমি আমার প্রিয়তম, জানো!)
(Teri ulfat mein jeeta har pal….
তোমার ভালোবাসায় বাঁচি প্রতিটা মুহূর্ত)
tu ik tohfa hai Khuda ka……
( তুমি হলে খোদার দেওয়া এক উপহার)
