প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩০
নওরিন কবির তিশা
জলকল্লোলের উন্মত্ততা চিরে এক লহমায় তিহুর দিকে এগিয়ে গেল নীল। চিন্তিত আঁখিজোড়ার চঞ্চল দৃষ্টি খুঁজে ফিরছে সেই পরিচিত মুখখানি, তীব্র স্রোতকে তুচ্ছ করে এক ঝটকায় সে ধরে ফেলল প্রিয়তমার শীতল, নিথর দেহখানি। ততক্ষণে রাওফিন মাহাকে কিনারায় তুলে এনেছে; মাহা তখনও কাঁপছেন, কেবলই ‘তিহু, তিহু’ করে প্রলাপ বকছে। অন্যদিকে, রুদ্র এসে টেনে তুলেছে রিশাদকে, ক্লান্তিতে প্রায় জ্ঞান হারানোর দশা তার ।
তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি সবাই তখন দম আটকে সেই জলমগ্ন দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে,তাদের বুক ঢিপঢিপ করছে। মুহূর্ত কয়েকের মাঝে নীল তিহুকে কোলে নিয়ে ডাঙায় উঠল, তিহুর শরীর একদম নেতিয়ে পড়েছে, ভেজা চিপচিপে শরীর, শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ প্রায়। সকলের ভারাক্রান্ত হৃদয় বাঁধ ভাঙলো, কিছুটা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো মেয়েগুলো। চিন্তিত উপস্থিত সকলে। সামান্য লোকজন জড়ো হয়েছে।
তবে সকলের উদ্বিগ্নতাকে ছাপিয়ে লুক্কায়িত পৈশাচিক হাসি হাসছে মুন্নি। হৃদয়ের পরতে পরতে শান্তি অনুভূত হচ্ছে তার।এদিকে তিহু,তিহু করতে করতে এক পর্যায়ে চেতনা হারালো মাহা। সে যে সাঁতারে খুব দক্ষ তাও নয়, আবার স্রোতের বিপরীতে ঝাঁপ দেওয়ায় মুখগহ্বর হতে বেশ খানিক পানি প্রবেশ করেছে তার দেহেও। সকলে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তাকে নিয়েও, রাওফিন বেশ কয়েকবার ঝাকাতেও জ্ঞান ফিরলো না তার।
এদিকে নীলের চক্ষুদ্বয় লাল হয়ে আছে, ঠিক যেন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে তা। এক্ষুনি তা ফেটে বেরুবে নোনা জল। সে বেশ কয়েকবার ঝাঁকালো তিহুকে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বহু কষ্টে উচ্চারণ করলো,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—’নুর? এই নুর?নুরাইন? একটি বার তাকাও,নুইইর!
তার এমন উন্মাদনায় অস্থির হলো সবাই। সৌভিক সামিররা দৌড়ে এসে তার পাশে বসলো।সৌভিক নীলের কাঁধে হাত রেখে দৃঢ় কন্ঠে বললো,,
—’এমন করছিস কেন? কিচ্ছু হবে না তোর নুরের। আই প্রমিস কিছু হতে দেব না আমরা। তুই না স্ট্রং? এভাবে কেন ভেঙে পড়ছিস?
নীল উন্মাদ দৃষ্টিতে তাকালো সৌভিকের পানে। চোখ ফেটে গড়িয়ে পড়ল নোনা জল, কম্পিত কন্ঠে বলল,,
—’ও আমার সর্বস্ব সৌভিক, সি ইজ মাই এভরিথিং। আই কান্ট, আই কান্ট লিভ উইথ আউট হার।
জীবনে প্রথম হয়তো তার এমন উন্মাদনা দেখছে সবাই। বিস্মিত-হতবাক-স্তব্ধ প্রত্যেকে।
রাওফিন এক মুহূর্তের জন্য মাহাকে অন্যদের জিম্মায় রেখে ছুটে এলো। সে দ্রুত নীলের কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে উঠল,
—’নীল! কী করছিস? তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চল! এখনও সময় আছে!
কিন্তু নীল যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তার দৃষ্টি কেবল তিহুর মুখে নিবদ্ধ।’হাসপাতাল…’ শব্দটা যেন তার মস্তিষ্কে কোনো অর্থ বহন করছে না। পরবর্তীতে সকলের ধাক্কায় সম্বিৎ ফেরার ন্যায় দ্রুত উঠে বসলো সে, সর্বশক্তিতে উঠে দাঁড়িয়ে তিহুকে কোলে তুলে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দ্রুত তাকে নিয়ে সর্বোচ্চ বেগে এড়িয়ে গেল সম্মুখে।
পিছনে সবাই ফুঁপিয়ে চলেছে,রাওফিনও মাহাকে কোলে তুলে নিল। আইয়াজকে ব্যস্ত স্বরে বলল,,
—’অ্যাম্বুলেন্স কল করো,আইয়াজ। যত দ্রুত সম্ভব।
আইয়াজ অ্যাম্বুলেন্সে কল করেছেন অনেক আগেই। বলতে গেলে তাদের হ্রদে পড়ার পর মুহুর্তেই। হয়তো এতক্ষণে চলেও এসেছে তা। তবে সে কিছু বলার আগেই, রাওফিন মাহাকে নিয়ে নীলের পিছু পিছু পাহাড়ি সিড়িগুলো অতিক্রম করতে করতে, রুদ্রদের উদ্দেশ্যে বলল,,
—’তোরা রিশাদকে নিয়ে আয় জলদি ওর অবস্থাও ভালো না।
রুদ্ররা মাথা হারিয়ে সম্মতি জানালো রাওফিনকে। তারাও রওনা হলো,পিছু পিছু এগিয়ে চলল সকলে।
নবীন গুলোর অস্থির পদচরণায় মুখর হাসপাতাল করিডর। কিছুক্ষণ আগে এখানে উপস্থিত হয়েছে সকলে। উদ্বিগ্নতা জেঁকে আছে প্রত্যেককে।রাফা সহ প্রত্যেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। মুহূর্ত খানিকের মাঝে দাম্ভিকতায় পূর্ণ এক একটা পদচারনায় সেখানে প্রবেশ করল মির্জা মহল আর খান মহলের প্রত্যেকে। হাসপাতালে সকলে হতভম্ব হয়েছে আছে তাদের দিকে। মির্জা সূচনা কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা এগিয়ে আসলো তিহুর কেবিনের দিকে ডক্টর সবে বেরিয়েছিলেন, তার উদ্দেশ্যে উদ্বিগ্ন উদ্ধত কন্ঠে মির্জা সূচনা বলল,,
—’কি অবস্থা ডক্টর? আমার মেয়ের কি অবস্থা?
—’ওটা আপনার মেয়ে? যাই হোক এখন কিছুটা বেটার।জ্ঞান ফিরেছে ওর।
তার জবাবে আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করল না মির্জা সূচনা। এক প্রকার অবজ্ঞা করে তাকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকে তিহুর মলিন মুখশ্রীতে চাইলো। তাকে দেখে তিহু কিছু একটা বলতে যেতেই সে হাত উঁচিয়ে থামালো তাকে। পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে তার মুখোমুখি বসলো, মুখে আদুরে হাত বুলিয়ে বলল,,
—’এখন কি অবস্থা মা? কিভাবে পড়েছিলি?
তিহু কোন জবাব দেওয়ার আগেই একে একে কেবিনে প্রবেশ করল সকলে। প্রত্যেকে উদ্বিগ্নতাকে ছাপিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসলো তার দিকে। প্রত্যেকেই বিবিধ প্রশ্ন করে চলেছে তাকে। এই যেমন, ‘এখন কেমন লাগছে? কিছু খাবে কিনা? অসুস্থতা কম লাগছে কি না?’ ইত্যাদি…!
তবে এতকিছুর মাঝেও তিহুর চঞ্চল চক্ষুজোড়া খুঁজে ফিরছে কাঙ্ক্ষিত মানবটিকে। তবে এখানে নেই সে। তার অনুপস্থিতি সবচেয়ে বড় পীড়া দিলো তিহুকে। ছলছল নয়নে দৃষ্টি ঘোরালো সে ।
—’শু***রের বাচ্চা! তুই জানিস না মানে কি? আর ইউ ফা*কিং কিডিং উইথ মি? ইয়ার্কি করছিস তোরা আমার সাথে? সামলাতে পারিস না যখন দায়িত্ব নিয়েছিস কেন?
নীলের বেপরোয়া উগ্র আচরণে ভীত সন্তস্ত হলো রিসোর্ট ম্যানেজমেন্টে থাকা লোকটা। ভয়ার্ত কণ্ঠে সে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই, নীল কলার আঁকড়ে ধরেছে তার। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ঢোক গিলে বেচারা বলল,,
—’স-স্যার। ওইখানটা মেরামতের কাজ চলছিল। আর এমনিতেও আমরা তো সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছি।
তার কথা যেন নীলের রাগের আগুনে ঘি ঢালল। বজ্রকন্ঠে সে বলল,,—’ফা’ক ইউর সাইনবোর্ড। জানিস যখন স্থানটা ড্যামেজড, তাহলে ওইটা এখনো কার্যকর কেন রেখেছিস? টুরিস্ট স্পটটা বন্ধ করিস নি কেন?
নীলের আচরণে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো সবাই। আইয়াজের দিকে অনুরোধের দৃষ্টিতে তাকালে, অসহায় দৃষ্টিতে সকলের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল সে। কিছুই করার নেই তার। এমনিতেই নীলের যে অবস্থা দেখেছিল তাতে মনে হচ্ছিল এখানে আসলে আর কাউকেই বাঁচিয়ে রাখবে না সে। সে তুলনায় এখনো পরিবেশ শান্ত।
‘কি হলো বলিস না কেন? উত্তর দিস না কেন? জবান বন্ধ হয়ে গেছে? ডোন্ট ওয়ারি এমনিতেই কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো জান চলে যাবে তোর। ’——নীল বা হাতের কর্নিষ্ঠা আর মধ্যমা যারা সর্বোচ্চ বেগে কপাল ঘষতে ব্যস্ত হল, নিজেকে দমানোর চেষ্টাতেও ব্যর্থ সে। আইয়াজকে কাঙ্খিত বস্তুটা বের করতে বলার আগেই সশব্দে ফোন বেজে উঠল তার। কিছুটা বিরক্ত হয়ে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেল রাওফিনের কল। দ্রুত রিসিভ করতেই ভেসে আসলো,,
—’কোথায় তুই নীল? দ্রুত আয়,সিস্টারের জ্ঞান ফিরেছে।
‘সিস্টারের জ্ঞান ফিরেছে’——কথাটা কর্ণগত হতেই, সবকিছু ছেড়ে দ্রুত পদক্ষেপে সেখান থেকে বের হতে হতে আইয়াজের উদ্দেশ্যে সে বলল,,
—’গাড়ি বের কর আইয়াজ। কুইক।
আইয়াজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো যেন। নতুবা এক্ষুনি আরেক মহা পাপের সাক্ষী হতো তাকে। অবশ্য সে প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল।নীল এগিয়ে যেতেই পিছে পিছে দৌড়ে যেতে যেতে সে বলল,,
—’ওকে স্যার।
তড়িঘড়ি হসপিটালের সামনে এসে পৌঁছাল নীল। চটজলদি পায়ে দ্রুত প্রবেশ করল ভেতরে। কারো সঙ্গে কোনো রকম আলাপচারিতায় না জড়িয়ে সোজা পৌঁছালো তিহুর কেবিনে। দরজা টানার শব্দে এক ঝলক সেদিকে চাইলো তিহু, নীলকে দেখে পরমুহূর্তেই নিজের অভিমানী দৃষ্টি ঘোরালো অন্যদিকে ।
নীল ভেতরে ঢুকেই চিরপরিচিত সুমিষ্ট গভীর কণ্ঠে বললো,,—’নুর?
তার এমন ডাকে তিহুর হৃদয়ে শুরু হলো এক অস্থির উচাটন। তার বিপরীতে স্থির থাকলো সে,নীল হয়তো বুঝলো প্রিয়তমার অভিমানের কারণ। মুচকি হেসে পার্শ্ববর্তী চেয়ার টেনে তিহুর বেডের পাশে বসে বলল,,
—’রাগটা কি খুব বেশি?
নিশ্চুপ তিহু। ফের মুচকি হাসলো নীল। তবে কিছু বলার আগেই একে একে বিভিন্ন প্রবেশ করল মির্জা মহলের সকলে। সঙ্গে প্রত্যেক নবীন প্রাণ গুলো। নীলকে এভাবে ভেসে থাকতে দেখে ঠোঁট চেপে মুচকি হাসলো তারা। হঠাৎ নীরবতা কাটিয়ে শোনা গেল মির্জা সূচনার গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর,
—’তোমার থেকে এটা এক্সপেক্ট করিনি নীল। তুমি কি খেয়াল রাখতে সক্ষম ছিলে না?
নীল প্রত্যুত্তরে কিছু বলার আগেই হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে মির্জা সূচনা বললেন,,—’এখন আর কিছু নয়। আম্মা নুরাইনকে মহলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলেছে। আপাতত বাদ বাকি সব ভ্রমণ ক্যান্সেল। পরশু ঢাকা ফিরব আমরা।
তার কথায় মির্জা সায়মা বললেন,,—’চুপ কর আপা, অন্তত বাড়ি পর্যন্ত চল।
তাদের কথোপকথনের মাঝখানে হঠাৎ দরজা ঠেলে দুর্বল পায়ে এগিয়ে আসলো মাহা আর রিশাদ। মাহাকে ধরে আছে জুনাইয়া। পিছনে রাওফিন। ভেতরে ঢুকে দুর্বল কণ্ঠে সে শুধালো,,
—’আর ইউ ওকে না তিহু?
তার কন্ঠে তাদের দিকে ঘুরে তাকালো সকলের। মির্জা সূচনা চটজলদি পায়ে এগিয়ে আসলেন তার দিকে। মির্জা সায়মা মুচকি হেসে বললেন,,—’তুই আসলে অনেক ভাগ্যবতী রে তিহু। নাহলে এমন বন্ধু-বান্ধবী কয়জন পায়?
তিহু সামান্য ওঠার চেষ্টা করতেই মাহা রিশাদ দ্রুত এগিয়ে এসে,থামালো তাকে।
মাহা: স্টপ ইউ,স্টুপিড। উইক তুই।
রিশাদ মাহার এমন কথায় টিটকারি কেটে বলল,,
—’ সুচ বলছে চালন রে। তা মনে হচ্ছে তুই অনেক বেশি সুস্থ।
মাহা: ‘তুই নিজেও কিন্তু উইক।
রিশাদ ভাব নিয়ে বলল,,—’আরে ধুর, উইক না;কি? আমি পুরুষ জাতি সিস।আর পুরুষ জাতি সিংহের ন্যায় হয়। কি বলো রাওফিন ভাই।
রাওফিন কিছু বলতে গিয়েও মাহার দিকে তাকিয়ে থামলো। বোকা হেসে বলল,,—’ওই আর কি!
মির্জা সূচনা আর কথা বাড়াতে দিলেন না। সকলের উদ্দেশ্যে তিনি কিছুটা আদেশের স্বরে বললেন,,
—’আর কোন কথা নয়। তোমরা সকলেই খুব অসুস্থ। চলো এক্ষুনি আমরা বাসায় ফিরব।
শব্দের ঝংকার তুলে মির্জা খোলা হলো মহলের গেটটা। একে একে ভেতরে প্রবেশ করল পাঁচখানা গাড়ি। কিছুক্ষণের মাঝে উপস্থিত হলো সকল গৃহকর্মীরা। একে একে নামল সকলে।তিহু এসেছে মির্জা সূচনাদের গাড়িতে। শত চেষ্টাতেও নীল তাকে নিজের গাড়িতে তুলতে সক্ষম হয়নি। এজন্য ভেতরে ভেতরে আগ্নেয়গিরির উদগিরণ হচ্ছে নীলের। তবে সমস্ত ক্রোধকে পাশে রেখে, গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তিহুর পাশে এসে দাঁড়ালো সে।
—’নুরাইনকে আমি আমার সঙ্গে নিচ্ছি, মাহা আর রিশাদকে তোমরা ধরে নিয়ে আসো। সাবধানে।
মির্জা সূচনার কথায় সম্মতির সূচক মাথা নাড়লো সকলে।তিহুকে নিয়ে সামনের দিকে এগোতেই মাথা ঘুরিয়ে উঠল তিহুর। শক্ত করে আকড়ে ধরল মির্জা সূচনার বাহু। মির্জা সূচনা চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকালে, অপ্রস্তুত হেসে তিহু বলল,,
—’কিছু হয়নি আম্মু। তুমি চলো।
এগোতে যেতেই ফের ঘটল একই কান্ড। মির্জা সূচনা চিন্তিত কন্ঠে কিছু বলার আগেই পেছন থেকে ভেসে আসলো নীলের গম্ভীর কন্ঠেস্বর,
—’তুমি পাশে যাও আম্মু।
ছেলের কথায় তার দিকে তাকালেন মির্জা সূচনা। সঙ্গে তিহুও।মির্জা সূচনা কিছু না বলে আলগোছে পাশে সরে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিহুকে বিষ্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে এগিয়ে এসেই তাকে কোলে কোলে নিলো নীল। সকলের সম্মুখে এমন কান্ডের লজ্জায় লাজুক লতার ন্যায় গুটিয়ে যাওয়ার মত অবস্থা তিহুর। লাজুক তবে দৃঢ় কণ্ঠে সে বললো,,
—’কি করছেন? নামান বলছি।
নীল সম্মুখে অগ্রসর হতে হতে বলল,,—’দেখতে পারছো না?বউকে কোলে তুলছি।
নীলের এমন কথায় কান গরম হয়ে গেল তিহুর। হাজারটা কথা গলার মধ্যিখানে এসে আটকে গেল। বেরোলো না কিছুতেই।
এদিকে তার এমন কাণ্ডে ঠোঁট চেপে মুচকি হাসছে সকলে। মির্জা সূচনা প্রবীনদের নিয়ে এগিয়ে গেলেন অন্দরমহলের দিকে। ধীরে ধীরে এগোলো সকলে। রিশাদের পিছু পিছু নীরা, আর মাহার পিছু পিছু রাওফিন।
—’এত ছোট্ট একটা জিনিসে অসুস্থ হলে হবে সতীন? তুমি যদি এমন দুর্বল হও তাহলে আমার বরকে তো অন্য মেয়েরা ছিনিয়ে নেবে!
নুরজাহান বেগমের এমন কথায় রুম হাসির কলরবে মুখর হলো। বিছানার উপর বালিশে আধ শোয়া হয়ে বসে আছে তিহু। নুরজাহান বেগমের এমন কথার সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো সোফায় বসে থাকা ল্যাপটপে কার্যত নীলের পানে। মনে মনে আওড়ালো,,
—’ছিনিয়ে নেওয়া কি? শুধু তাকাক না, কাটা চামচ দিয়ে চোখ তুলে পানি দিয়ে গিলে খাবো।
‘ও বউ মনি, কোন ভাবনার অতলে ডুবলে?’——রাফার কন্ঠে তিহু তার দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত কণ্ঠে বললো,,—’না কোথাও না। আচ্ছা মাহা কই? আর রিশাদ?
—’মাহা আপু তো ঔষধ খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছে শুনলাম।আর রিশাদ ভাইয়া মেইবি রুমে।
‘ওহ,!’——ছোট্ট স্বরে কথাটা বলেই, এক ঝলক পাশে তাকালো সে। নীরাকে অনুপস্থিত দেখে বলল,,—’আচ্ছা নীর কোথায়? এসে থেকে তো একে একবারও দেখলাম না।
রাফা আশেপাশে তাকিয়ে বলল,,—’ওকে তো এসে থেকে আমিও দেখছি না বউমনি। দেখো হয়তো রুমে বসে পড়ছে বোধহয়।
‘ওহ!’
তাদের কথার মাঝে হঠাৎ নুরজাহান বেগম সকলের উদ্দেশ্যে তাড়া দিয়ে বললেন,,—’চলো রাত হয়েছে বেশ। এখন তোমাদের বউমনির একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।
সকলে সম্মতির সূচক মাথা নাড়িয়ে তিহুকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে গেল তার সঙ্গে। তিহুও মুচকি হেসে বিদায় জানালো তাদের।
—’আপনার ওষুধ টা।
নীরার কন্ঠে তার দিকে ঘুরে চাইল রিশাদ। কিছুটা বিস্মিত কন্ঠে বলল,,—’তুমি?
—’জ্বী। এখন ঔষধটা খেয়ে নিন তো।
রিশাদ তার হাত থেকে পানির গ্লাস সহ ওষুধ টা নিয়ে, খেয়েই বললো,,—‘ঔষধ তুমি আনলে যে?
নীরা সাময়িক অপ্রস্তুত কন্ঠে বলল,,—’না এমনি আর কি। দেখলাম আপনি ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে আসলেন, পরবর্তীতে কেউ তো আসেনি এজন্য।
“ওহ থাঙ্কস।”—বলেই বিছানা গোছাতে লেগে পড়লো রিশাদ। তাকে কাজ করতে দেখে বাধা দিয়ে নীরা বলল,,
—’আমার কাছে দিন। আমি করে দিচ্ছি।
—’ডোন্ট নিড। আই ক্যান হ্যান্ডেল। হাউ এভার তোমাকে থ্যাংকস এতটা ভাবার জন্য।
’বলছি তো আমাকে দিন।’—বলে বাধা দিতে গিয়ে কখন যে নীরা রিশাদের হাত ধরেছে বুঝতেই পারেনি। এদিকে তার এমন কাণ্ডে রিশাদ বিস্মিত দৃষ্টিতে নিজের হাতে তাকিয়ে বলল,,
—’ওকে তুমিই দাও।
নীরা রিশাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের দিকে তাকাতেই বুঝলো নিজ কান্ড। পরক্ষণেই দ্রুত গতিতে হাত সরিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল,,—’আচ্ছা।
‘হুম!’——বলে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়ালো রিশাদ। নীরা অপ্রস্তুত হস্তে ধীরে ধীরে গোছাতে লাগলো বিছানাটা।
—’আর ইউ ফিলিং ওয়েল নাউ, লাভলাইন?
রাওফিনের কন্ঠে ঘুরে চাইল মাহা। যাচ্ছিল তিহুর কক্ষের উদ্দেশ্যে। তবে এমন অসময়ে রাওফিনকে দেখে ভ্রু গোটালো সে।
—’তুমি এখানে কি করছো?
—’কি করছি সেটা পরে জানলেও চলবে মাই লাভ। আগে বলো, এখন কি সুস্থ বোধ করছ? কিছু লাগবে তোমার? পানি,ফ্রুটস,খাবার এনিথিং?
—’কিচ্ছু না। আপাতত তুমি আমার সামনে থেকে সরে যাও। তাহলেই হবে।
তার কথাটা তীরের সুতীক্ষ্ণ বিষাক্ত ফলায় ন্যায় বিদ্ধ করল রাওফিনের বক্ষদেশ। তবুও মুখে মিথ্যে হাসির রেখা টেনে, নির্লজ্জের ন্যায় এগিয়ে এসে সে বলল,,
—’আমি তো চলেই যাব, তবে তোমাকে নিয়ে।
—’ড্রামা বন্ধ করো রাওফিন। বিশ্বাস করো অস্বস্তিকর লাগছে এখন এগুলো আমার।
—’আই নো লাভলাইন, তবে তোমার এই অস্বস্তি একদিন তোমার তীব্র স্বস্তির কারণ হবে ইনশাআল্লাহ….!
—’কক্ষনো নয়। বিষ কখনো কাউকে স্বস্তি দিতে পারে?
তার এমন ইঙ্গিত পূর্ণ কথায় মলিন হাসলো রাওফিন,,-—’হয়তো কখনো বা পারে, নতুবা কষ্ট পেলে সকলে সেটাকেই কেন গ্রহণ করে?
—’কারণ সেটা কষ্ট নিরাময়ের বড় ঔষধ হিসেবে কাজ করে। তবে দ্বিগুণ কষ্ট নিহিত থাকে সেটাতে।
—’তাহলে পৃথিবীতে কি শান্তি নেই?যে অশান্তি লুকাতে মানুষ সবচেয়ে কষ্টের জিনিসটা গ্রহণ করে?
তার কথায় তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো মাহা,—’ইউ নো রাওফিন? পৃথিবীতে আমরা শান্তি খুঁজি, অথচ হযরত আদম (আ:) কেই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল শাস্তি স্বরূপ।
তার এমন কথায় চুপসে গেল রাওফিন, পর মুহূর্তে বললো,,—’তবে শাস্তির মাঝেও তিনি শান্তি খুঁজে নিয়েছিল প্রিয়তমা হাওয়াকে বক্ষে নিয়ে। তুমিও না হয় আমাকে সেই সুবৃহৎ শাস্তির মাঝেও ক্ষুদ্রতম শাস্তি হিসাবে শান্তির ন্যায় গ্রহণ করো।
—’অসম্ভব!
অকপটে কথাটা বলে সেখান থেকে প্রস্থান করলো মাহা। এগিয়ে চললো নিজের রুমের দিকে, আর হলো না তিহুর রুমে যাওয়া। অবশ্য রাতও হয়েছে বেশ। তাই ইচ্ছাকৃতই যাবে না সে। কাল সকালে নাহয় দেখা করা যাবে।
রাত হয়েছে বেশ। ঘড়ির কাঁটায় এগারোটা ছুঁই ছুঁই।জোনাকির উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত রাতরাঙা অন্তরীক্ষ। সামান্য ঝিরিঝিরি বৃষ্টি উত্তপ্ত ধরনীকে শান্ত করতে ব্যস্ত।নিদ্রাহীন দৃষ্টিতে খোলা জানলা দিয়ে সেদিকে চেয়ে আছে তিহু।
‘এই যে মিসেস খান সাহেবা? প্লিজ ফোকাস অন মি।’——-নীলের কন্ঠে তার দিকে সংকুচিত দৃষ্টিতে চাইলো তিহু। তার অভিমানী দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলানো পূর্বক মৃদু হাসলো নীল।
—’রাগটা কি খুব বেশি ম্যাডাম?
তিহু নির্বাক তখনো;দৃষ্টি ঘোরালো শুধু।তার এমন নির্লিপ্ততায় নীল ফের বলল,,
—’এত রাগ ভালো নয় ম্যাডাম।
তিহু বলল না কিছু,শুধু সামান্য সরে গিয়ে নিজেকে জোড়ালো কাঁথার ভাঁজে।তার এমন কান্ডে চিন্তিত দৃষ্টিতে এগিয়ে আসলো নীল। তিহুর কপালে হাত রেখে বলল,,
—’দেখি, জ্বর এসেছে নাকি?
যা ভেবেছিল ঠিক তাই।বেশ উত্তপ্ত তিহুর শরীর।তবে জ্বর যেনো মেয়ে টাকে দ্বিগুণ রুপসী করে তুলছে, কপালে পতিত একগুচ্ছ চুল আলতো হাতে সরিয়ে দিতে দিতে নীল গভীর দৃষ্টিতে তাকালো তিহুর পানে।তার এমন দৃষ্টিতে মিইয়ে আসলো তিহু। পরক্ষণে সমস্ত উদ্যোম একত্র করে বলল,,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ২৯
—’এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে কি মিস্টার?সরুন।
তার কথার প্রত্যুত্তরে গভীর পৌরুষ কন্ঠে নীল বলল,,,—’তোমার ডাগর চক্ষুর চঞ্চল দৃষ্টিতে যতবার চেয়েছি ততবার হারিয়েছি অন্তরালে,হৃদয় জড়িয়েছে প্রেম নামক মায়াজালে।
জ্বরের তোপে কথাগুলো তিহুর কর্ণগত হলো কি না জানা নেই,তবে নীল দ্রুত তার পাশে শুয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে তার কাছাকাছি গিয়ে নিজের উষ্ণতায় আবদ্ধ করল তাকে। এদিকে নীলের এমন ঘনিষ্ঠতায় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তিহুর।জ্বরের ঘোরেও সে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করল নীলকে। কিন্তু নীল যেন আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ,এক ইঞ্চিও পরলো না সে। প্রেয়সীকে বক্ষদেশে নিয়ে পাড়ি জমালো সুখময় ঘুমের রাজ্যে।
