Home প্রেমের পাঁচফোড়ন প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ১৭+১৮

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ১৭+১৮

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ১৭+১৮
Afnan Lara

আহানা রেডি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে হাঁটা ধরলো,হঠাৎ পিছন থেকে তারেক রহমান ডাক দিলেন
জি আঙ্কেল বলুন
মা আজ আমাদের বাসায় দাওয়াত তোমার,রাতে এসে ডিনার করে যেও
আহানা অবাক হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে একটা কাশ দিয়ে বললো কি?আমি?
হ্যাঁ মা আসিও,ভাবলাম একা একা কি বা খাও,আজ আমাদের সাথে এসে একটু খেয়ে যেও,তোমার আন্টিও এতদিন ধরে কত বলছিল তোমাকে ডাকতে,আসিও কেমন?আমি তো যাচ্ছি বাজার করতে,টাটকা ইলিশ মাছ আর মুরগী আনতে
কথাগুলো বলে দাঁত কেলিয়ে চলে গেলেন তিনি
আহানা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,এই লোকটার হলোটা কি,কাল মুখের উপর দরজা দিয়ে চলে গেছিলো আর আজ আমাকে দাওয়াত দিচ্ছে?আজব তো!
আহানা ভার্সিটি ঢুকতেই দেখলো তাদের ক্লাসে শশী ম্যাম

ম্যাম আসবো?
হুম আসো
শুনো সবাই! আমি একটা নোটিশ পড়ে শোনাতে এসেছি,নতুনদের নবীনবরণ অনুষ্ঠান হবে,এত প্রবলেম ছিল এতদিন,আমরা নবীনবরণ অনুষ্ঠানের দিকে খেয়ালই দিই নাই,এ বছর তাই দেরি হয়ে গেলো,নতুন যারা আছে তাদেরকে সিনিয়ররা মিলে বরণ করবে,সব ডেকোরেশনের দায়িত্ব তাদের,সবাই সময়মত আসতে হবে,অনুষ্ঠান হবে ৫তারিখে
বুঝেছো সবাই?
জি ম্যামমমম
আহানাদের ক্লাসের সব মেয়ে ঠিক করলো সেদিন হালকা বেগুনি রঙের শাড়ী পরে আসবে
শান্ত ড্রেসকোড লিখে কাগজ তমালের হাতে দিতে গিয়ে থেমে গেলো,তারপর বললো না থাক আমি যাচ্ছি,আমি সব ক্লাসে ড্রেসকোড বুঝিয়ে দিয়ে আসবো

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আহানাদের ক্লাসে এসে শান্ত নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা তুলে বরাবর আহানার দিকে তাকালো,আহানা রুপার সাথে কথা বলতেসে আর হাসতেসে,আহানা আর রুপা বাদে সবাই শান্তর দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছে,ইসস এই ছেলেটা এত সুদর্শন কেন!তার উপর একদিন এক রঙের জ্যাকেট পরে আসে,লাল/সবুজ/খয়েরী/কালো/হলুদ/বেগুনি/নীল,সব জ্যাকেটের কালেকশন মনে হয় ওর কাছেই আছে
যা মানায় না!!মেয়েরা রীতিমত লজ্জায় লাল টমেটো হয়ে আছে
Attention everyone!!
আহানা চমকে সামনে তাকালো,শান্ত আহানার দিকে তাকিয়ে ব্রু কুঁচকে কথা বলা শুরু করলো
বিভিন্ন ইয়ারের ড্রেসকোড বিভিন্ন রঙের,ফার্স্ট ইয়ারের সব মেয়েরা ঘাড়ো নীল রঙের শাড়ী পরে আসবে,আর ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবি পরে আসবে,ওকে?
সবাই বললো ওকে
আহানার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত জ্যাকেট ধরে চেইন টানতে টানতে চলে গেলো

এই ছেলেটা আমার দিকে এমন করে তাকাই থাকে কেন!
ঐ তোর নীল শাড়ী আছে তো?
হাসাইলি,যার ২টা জামা তার আবার নীল শাড়ী থাকবে
আমার তো নীল শাড়ী একটাই,নাহলে তোকে একটা দিতাম
আমি বরং আমার নীল জামাটা পরে আসবো,তাহলেই হবে
হুম সেটা ঠিক আছে
আহানা রুপার সাথে ঘাসের উপর বসে পানির বোতল হাতে নিলো খাওয়ার জন্য হঠাৎ তমাল এসে রুপাকে আর ওকে ২প্যাকেট কি যেন দিয়ে চলে গেলো
কিরে আহানা এইডা কি?
রুপা নওশাদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে জানতে চাইলো এটা কি?

নওশাদ শান্তর দিকে ইশারা করে দেখালো
এগুলা কি দিসে রুপা?

ভিতরে দেখি পেস্ট্রি ২পিস করে,শান্ত ভাই মনে হয় খাওয়াচ্ছে সবাইকে
কিন্তু কেন?
আমি কি জানি,খুশির ঠেলায় আর কি
আচ্ছা এটা কি কাল সকাল পর্যন্ত ভালো থাকবে?ফ্রিজে না রাখলেও?
কেন বলতো?
এমনি, বল না
হ্যাঁ থাকবে তো মনে হয়
আহানা মনে মনে খুশি হলো,সে এক পিস কাল সকালের জন্য রেখে দিবে,সেটা খেলে আর ভাত খেতে হবে না
আহানা এক পিস নিয়ে মুখে দিয়ে তো চোখ কপালে তুলে ফেললো,এটা কি রে?এত্ত মজা
ওমা তুই জানিস না এটা কি?পেস্ট্রি আর কি
কি দিয়ে বানায়?দাম কত?
এক পিস ৫৫/৬০টাকা,কেক ও বলা যায়

আহানা কেক ও চিনলো না,জীবনে কেক খায়নি সে চিনবে কি করে,তার মানে শান্ত এত টাকা খরচ করে সবাইকে খাওয়াচ্ছে?
শান্ত মনে মনে খুব খুশি হলো আহানার খাওয়া দেখে,সে এতদিনে এটা বুঝেছে যে আহানা ব্রেক টাইমে পানি ছাড়া আর কিছু খায় না, তাই সে স্পেশালি আহানার জন্য পেস্ট্রি অর্ডার করেছে,শুধু আহানাকে দিলে নওশাদ,সূর্য আর রিয়াজ গিলে খাবে ওকে তাই রুপা ও আরও কয়েকজনের জন্যও কিনেছে
আহানা বাকি পিসটা প্যাকেট সহ তার ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো
রুপা তার ২পিসই খেয়ে ফেলেছে ততক্ষণে
ছুটি হয়ে গেছে,আহানা আজ আর কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচ দিয়ে যায়নি,অন্য রোড দিয়ে যাচ্ছে,বারবার পিছন ফিরে তাকাচ্ছে সে

হঠাৎই সামনে শান্ত বাইক নিয়ে এসে থামলো
আহানা ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো
আজ ঐ গাছটার নিচের রোড দিয়ে আসোনি কেন?
এমনি,আমার ইচ্ছা😒
নীল শাড়ী আছে তো তোমার?
আপনি জেনে কি করবেন?
শুনো,যদি অন্য রঙ পরেছো তো ভার্সিটি থেকে বের করিয়ে দিব তোমাকে
আপনাকে ভয় পাই নাকি আমি?

আহানা পাশ কেটে চলে যেতে নিতেই শান্ত আহানার হাত টেনে আবারও আগের জায়গায় নিয়ে আনলো
হাত ছাড়ুন!👿
আগে বলো শাড়ী আছে তো?
না নেই!জামা আছে,নীল,সেটা পরে আসবো আমি
শান্ত আহানার হাত ছেড়ে দিলো,যাও এবার
আহানা মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো
শান্ত একটা শপিংমলে আসলো
শাড়ীর দোকানে ঢুকতেই নওশাদ আর রুপাকে দেখে আরেকদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে পড়লো
আরে এরা এখানো কি করে,উফ!এখন নওশাদ আমাকে দেখলে ১০০টা প্রশ্ন করবে,শিট!!

শান্ত পকেট থেকে মাস্ক নিয়ে পরে নিয়ে দোকানের এক কোণায় চলে গেলো
স্যার আপনার কিছু লাগবে?
হুম,নীল শাড়ী দেখান,ঘাড়ো নীল
এটা বলে তার খয়েরী চুলগুলো টেনে চোখের সামনে নিয়ে আনলো যাতে নওশাদ চিনতে না পারে
দোকানদার অনেকগুলো শাড়ী দেখাচ্ছে শান্তকে
শান্ত একটা শাড়ী দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো,সেটা ধরতে যেতেই রুপা ছোঁ মেরে নিয়ে বললো এটা আমি নিব নওশাদ,আমাকে কিনে দাও
শান্ত এক টান দিয়ে শাড়ীটা নিয়ে হেঁটে চলে গেলো
নওশাদ নিশ্বাস ফেলে মনে মনে বললো বাঁচলাম,আজ পকেটে টাকা নাই,রুপা আমাকে ফকির করে ছাড়বে
কি গো?তুমি লোকটাকে আটকালে না কেন?আমার পছন্দ করা শাড়ীটা নিয়ে চলে গেলো,যাও নিয়ে আসো

আরে বাদ দাওও,আরেকটা দেখো,ওটা তো মনে হয় উনি কিনে ফেলেছেন
রুপা মুখ ফুলিয়ে অন্য শাড়ী দেখতে লাগলো
শান্ত শাড়ীটা কিনে চলে যেতে নিতেই আবার কি মনে করে একটা চুড়ির দোকানে গেলো,নীল চুড়ি কিনলো,সাথে নীল গলার আর কানের সেট ও নিলো,হালকা হেসে এক প্যাকেট করলো সব গুলো মিলিয়ে
বাইক নিয়ে বসে আছে সেই কখন থেকে,আহানাকে বাসায় আসতে দেখলে গিয়ে প্যাকেটটা রেখে আসবে সে
আহানা সাড়ে ৬টার দিকে বাসায় ফিরলো,বাসায় ঢুকে জানালা খুলে দিয়ে উঠানে গেলো সকালের ধোয়া জামাটা আনতে
শান্ত চুপিচুপি জানালার সামনে গিয়ে প্যাকেটটা মুড়িয়ে জানালার গ্রিল দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে এক দৌড়ে পালালো

আহানা জামাটা এনে গুছিয়ে আলমারিতে রেখে রান্নাঘরে যাওয়া ধরতেই তার চোখ গেলো জানালার পাশে থাকা একটা চকচকে হলুদ প্যাকেটের দিকে
এদিক ওদিক তাকালো সে,মীম আপু নেই,কনিকা আপু ও নেই,তাহলে এটা কে দিলো,তাও আমার বিছানার উপর,যখন বাসায় ঢুকলাম তখন তো এটা ছিল না
আহানা আর দেরি না করে প্যাকেটটা খুললো,ওমা একটা নীল শাড়ী,চুড়ি আর গলার, কানের দুলের সেট,আহানা অবাক হয়ে ওগুলো হাতে নিয়ে বসে আছে,একটা চিঠিও আছে দেখছি!!
সেটাতে লিখা-
প্রিয় আহানা
আমি তোর ভোলার মধ্য চৌরাস্তার ৪র্থ গলির ৫ম বাড়ির ৬ষ্ঠ তম তলার খালাম্মা🐸
তোর জন্য একটা উপহার পাঠাইলাম,পরিস কেমন?
ভালা থাইস🙄

আমার খালা?কোথা থেকে আসলো, আমি তো আমার বাবা মায়ের নামই জানি না! খালা আসলো কই থেকে,আর আমার বাসা চিনলো কি করে,চিনলেও দেখা করলো না কেন
যাই হোক,এতসব ভেবে কাজ নেই
আহানা চট করে শাড়ীটা পরে ফেললো,কি সুন্দর পছন্দ আমার পাতানো খালার!!
আহানা সুন্দর করে গুছিয়ে আলমারিতে রেখে দিলো শাড়ীটা
আশ্রমের মায়ের শাড়ীটার সাথের পেটিকোট তো আছে কিন্তু সেটার ব্লাউজ তো লাল
নীল শাড়ীর সাথে তো মিলবে না,আমি এখন ব্লাউজ কই পাবো?
দেখি রুপাকে একটা ফোন করি

হ্যাঁ আহানা বল
তোর কাছে ২টা নীল ব্লাউজ হবে?আমাকে একটা দিতি
হ্যাঁ হবে,আচ্ছা কাল আনবো,তুই না বললি তোর নীল শাড়ী নেই?
ছিল না,আমার কোন খালা যেন পাঠিয়েছে
ওহ,আচ্ছা

আলমারি থেকে আবারও প্যাকেটটা নিয়ে আহানা বসে বসে শাড়ীটাই দেখতেসে কি সুন্দর,শাড়ীর সাথে একটা কাগজ ঝুলতেসে,দামের মনে হয়
আহানা এগিয়ে এসে কাগজটা হাতে নিয়ে দেখতেই চোখ কপালে উঠে গেলো তার
৩হাজার টাকা,আল্লাহ!এত দাম দিয়ে আমাকে শাড়ী না দিয়ে টাকা গুলো আমাকে দিলে আমি অনেক খুশি হতাম
আহানা শাড়ীটা আবার আলমারিতে রেখে দিয়ে তারেক রহমানের বাসায় গেলো
উনার স্ত্রী খুব আদর করলেন,অথচ এতদিন এক গ্লাস পানিও খাওয়ায় নি,আর আজ এত আদর
মুরগী,ইলিশ দিয়ে ১০০টা আইটেম করেছে,মুরগী মনে হয় ২টা এনেছে,মুরগীর কোর্মা,মুরগীর ভুনা,লেগ পিস ২টা আহানার পাতে দিয়েছেন তিনি
আহানা রীতিমত অবাক হচ্ছে আর খেয়ে যাচ্ছে
প্রতিদিন সাদা ভাত আর নুন খেতে খেতে এখন এই খাবার খেতে আহানার কেমন যেন লাগছে
খাওয়া শেষে নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়লো সে
পরেরদিন মিষ্টিদের বাসায় গিয়ে লিফটের ভিতরের বাটনে ৫এ টিপ দিয়ে পাশে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেলো আহানা
পাশে শান্ত দাঁড়িয়ে গেমস খেলতেসে
আহানা বুকে থুথু দিয়ে নিজেকে ঠিক করে রেগে বললো

কি??এমন চোরের মত দাঁড়িয়ে আছেন কেন?আমি তো খেয়ালই করি নাই আপনাকে!আর একটুর জন্য স্ট্রোক করতাম
শান্ত ফোন থেকে চোখ উঠিয়ে বললো তুমি তো আমাকে জীবনেও খেয়াল করো না,নিচের দিকে তাকিয়ে লিফটে ঢুকলে কি করে লিফটের ভেতরের মানুষ দেখবা??
আহানা মুখ বাঁকিয়ে আরেকদিকে ফিরে গেলো
লিফট থেকে নামতে গিয়ে দুজনে মাথায় বাড়ি খেলো দুম করে
ইসসস!
তুমি ঠিক করে হাঁটতেও জানো না?
আপনি জানেন বুঝি?স্টুপিড!
আহানা চলে গেলো
ওমা আমি স্টুপিড? তুমি তাহলে বেয়াদব!!
আহানা মাথা ঘষতে ঘষতে মিষ্টির পাশে গিয়ে বসলো

কি হলো মিস তোমার মাথায়?
ঐ আসলে বাড়ি খাইসিলাম
কারোর সাথে?
হুম
তাহলে জলদি গিয়ে তার মাথার সাথে আরেকটা বাড়ি দিয়ে আসো নাহলে তোমার শিং উঠবে
আরে না এগুলা মিথ্যা কথা

না সত্যি বলতেসি আমি,পরশু আমার সাথে আমার ক্লাসমেট সিয়ামের মাথায় ধাক্কা লেগেছিল,এখন দেখো আমার মাথার এ পাশ দিয়ে ফুলে গেছে😭শিং উঠতেসে
আহানা হেসে দিয়ে বললো আরে এসব কিছু না
তাই নাকি মিষ্টি? তাহলে তো আরেকটা বাড়ি দিতেই হয়!
আহানা চোখ বড় করে শান্তর দিকে চেয়ে আছে
হুম আমিও তো মিসকে সেটাই বলতেসি,মিস বিশ্বাসই করে না
করবে করবে,যখন শিং উঠবে তখন বিশ্বাস করবে
যান এখান থেকে!

তোমার বাসা এটা?আমার মিষ্টির বাসা এটা😒
শান্ত গিয়ে সোফায় বসে পড়লো
আহানা গাল ফুলিয়ে মিষ্টিকে ১ঘন্টা ধরে পড়ালো,পুরোটা সময় শান্ত মিষ্টির পাশে বসে নিউজপেপার পড়েছে
আহানা মিষ্টিদের বাসা থেকে বের হয়ে কয়েক কদম হাঁটতেই শান্ত আহানার হাতের কব্জি ধরে এক টান দিয়ে কাছে নিয়ে আসলো
আহানা ভয় পেয়ে গেলো কিছুটা
ফাঁকা করিডোর,ভোরবেলা যেমনটা থাকে আর কি
শান্তর ঠোঁটের কোণে হাসি উজ্জ্বল হয়ে আছে
আহানার আত্না কাঁপতেসে,হাত মুচড়াচ্ছে সে
শান্ত মাথা এগিয়ে এনে আহানার মাথায় এক বাড়ি দিয়ে হেসে আহানার হাত ছেড়ে দিলো
যাও,তোমার জন্য তো আর আমি শিং নিয়ে হাঁটাচলা করতে পারি না,পরে আমার বিয়েও হবে না, যাও এখন!
শান্ত আরেকদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে পড়লো
আহানা হা করে দাঁড়িয়ে আছে,কি বলবে,কি করবে কিছুই বুঝতেসে না সে,সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তার
শান্ত দাঁড়িয়েই আছে তাকাচ্ছে না আহানার দিকে
আহানা শান্তর দিকে তাকিয়ে পিছন ফিরতেই শান্ত এবার তাকালো
আহানা চলে যাচ্ছে,শান্ত মুচকি হাসতেসে ওর দিকে তাকিয়ে

বুয়া সকালের জন্য বুটের ডালের ভাজি,ডিম,চিকেন মাসালা আর রুটি বানিয়েছে,শান্ত সেগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে আছে,আহানা তো এখন মনে হয় শুধু ভাত খাচ্ছে
বুয়া!
হ্যাঁ বাবা বলেন
আমাকে পান্তা ভাত দিন তো
কিহ!কিন্তু কেন,কি করবেন?
খাবো,কি করবো আর
না বাবা,এসব কি মজা হয়নি?অন্য কিছু বানাই দি??
না আমি পান্তা ভাত খাবো

বুয়া শান্তর জোরাজুরিতে পান্তা ভাত এক বাটি এনে শান্তর সামনে রাখলো,একটু নুন ছিঁটিয়ে দিলো
শান্ত আগ্রহের সাথে এক লোকমা মুখে দিয়ে আর গিলার সাধ্য হয়নি তার,কেশে অনেক কষ্টে গিললো
তারপর চোখ বন্ধ করে বসে রইলো কিছুক্ষন,আহানার খাওয়াটা স্পষ্ট ফিল করতেসে সে
সে তো খুব মজা করে খাচ্ছিলো তাহলে আমার কাছে এটা বিষ মনে হচ্ছে কেন!
বুয়া তুমি কি এই খাবার খাও?
হ বাবা,ভাত রয়ে গেলে তো আমি বাসায় লয় যাই,তারপর আমি আমার মাইয়া,আমার পোলা মিলে খাই
শান্তর চোখে পানি এসে গেলো,মানুষ কত ফাইট করে এই দুনিয়ায় প্রতিটা দিন কাটায়,আর আমরা উপর থেকে এসব দেখতেও পাই না
দেখার চেষ্টা ও করি না,আমাদের খাবারের ১০ভাগের এক ভাগ তাদের দিলেও তারা সুখে থাকতে পারতো

বাবা কি হলো?খাবেন না?আমি যা বানাইসি তা অন্তত খান
নাহ! আমার খিধে নেই,এক কাপ রঙ চা পাঠাও
রঙ চা?
বাবা আপনার শরীর ভালো তো?সর্দি হয়েছে?
কেন?সর্দি হলেই কি রঙ চা খায়?
না বাবা,আমরা তো সর্দি হলে খাই,তাই বললাম,কফি আছে তো সেটা বানাই?
না,আমি রঙ চা খাব
কিরে শান্ত?মদ কি বেশি খেয়েছিস নাকি?কি হয়েছে তোর?এসব কি উল্টা পাল্টা খাচ্ছিস?
না এমনি রিয়াজ! মন চাইলো দেশের গরীব মানুষদের খাবার টেস্ট করা দরকার
ভাই এসব টেস্ট করতে গিয়ে খুব খারাপ লাগে,কষ্ট হয় তাদের জন্য

শান্ত হুম বলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো
সূর্যটা নিচে নামতেসে,পুরো বারান্দা জুড়ে রোদ,শান্ত সিগারেট নিয়ে বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো
সিগারেটটা ধরিয়ে মুখ দিয়ে ধোঁয়া আকাশের দিকে ছাড়তেসে সে
এই অনুভূতিটা একটা শান্তি জোগায়,আচ্ছা আহানার কি শাড়ীটা পছন্দ হয়েছে,আমি শাড়ী কিনতে পারি মা বলতো,তার মানে আহানার নিশ্চয় সেটা পছন্দ হয়েছে
মা সবসময় কোনো রিলেটিভকে শাড়ী গিফট করার হলে আমাকে নিয়ে যেতো,আমি বেছে বেছে অানকমনটা খুঁজে দিতাম

বাবা!তোমার চা
শান্ত সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চায়ের কাপটা নিয়ে আবার তড়িগড়ি করে নিচে তাকালো,সিগারেটটা ফাঁকা রোডের উপর পড়েছে
ঐদিনের কথা মনে এসে গেলো যেদিন সে আহানার সামনে সিগারেট ফেলেছিল
চায়ের কাপ নিয়ে এক চুমুক দিয়ে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো তার
জীবনে রঙ চা খেয়েছে কিনা মনে নেই, হয়ত খেয়েছি মা থাকতে আজ আবার খেলাম,এত বাজে স্বাদ আর আহানা বললো কফির চেয়ে রঙ চা ভালো
ওর পছন্দ আর আমার পছন্দের সাথে আকাশ পাতাল তফাৎ!

নওশাদ বাবা,শান্ত বাবার যেন কি হয়েছে,সকালে এত কিছু বানালাম সেগুলো রেখে পান্তা ভাত খেয়েছে,এখন আবার কফি রেখে রঙ চা খাচ্ছে
ও রঙ চা চাইলো আর তুমিও দিয়ে দিলা?তুমি জানো না ওর এই সময়ে কফি না খেলে সারাদিন শরীর খারাপ থাকে,মাথা ব্যাথার জন্য হাঁটতে পারে না!
আমি কি করমু,আমাকে ধমক দিয়ে কইলো রঙ চা খাবে
কাল আমাকে নওশাদ একটা শাড়ীও কিনে দেয়নি,ওকে নিয়ে গেছিলাম শাড়ী কিনতে

হয়ত হাতে টাকা ছিল না
হুম,নে রাখ ব্লাউজ,কাল তাড়াতাড়ি আসিস কেমন?তাড়াতাড়ি আসলে ফুলের শুভেচ্ছা পাওয়া যাবে
মানে??
ফুল আমাদের গায়ে ছু্ঁড়ে মেরে ওয়েলকাম জানাবে আর কি
আহানা রুপার কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলো
দুম!!!
উফ শান্ত তোরে কে কইসিলো রঙ চা খাইতে??কফি বাদ দিয়ে
এখন মাথা ব্যাথার শোধ আমার উপর দিয়া উঠাইতেছিস,এত জোরে কেউ ঘুষি মারে?যা বাসায় ফিরে রেস্ট নে আর কড়া করে কফি বানিয়ে খা যা
শান্ত অপেক্ষা করছে ছুটি হলে যাবে,আহানাকে একটু জ্বালিয়ে তারপর যাবে

আহানা ভাবলো কাল ঐ রোড দিয়ে যাওয়ায় ধরে ফেলছিল আমাকে,আজ কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচ দিয়ে যাব,তাহলে গোলায় যাবে,বুঝতে পারবে না আমি কোন রোড দিয়ে যাবো
আহানা কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছটার নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে
দাঁড়াও!
আহানা চোখ বন্ধ করে নিজেকে বেকুব বলতে বলতে পিছনে তাকালো
আপনি?
হুম!
কি?
কিছু না,যাও
আহানা মাথা ঝাঁকিয়ে জোরে হেঁটে চলে গেলো,কিছুদূর গিয়ে থেমে গেলো,শান্তর চোখ মুখ এমন লাগতেসিলো কেন?
আহানা আবারও ফিরে এসে দেখলো শান্ত বাইকে হেলান দিয়ে মাথার চুল টানতেসে চোখ বন্ধ করে
আহানা একটু এগিয়ে এসে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললো কি হয়েছে আপনার?

শান্ত চমকে মাথা তুলে তাকালো আহানার দিকে
তুমি যাও নি এখনও?
নাহ মানে আপনাকে এমন লাগতেসে কেন,কি হয়েছে?
শান্ত মাথার চুল টেনে ঠিক করে বললো মাথা ধরেছে,সকালে কফি খাইনি,কফি না খেলে আমার শরীর খারাপ করে
বাসায় চলে যান
হ্যাঁ
শান্ত বাইকে উঠে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো,শরীরে মনে হয় কোনো শক্তি নেই
আহানা দেখলো শান্ত জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে
আহানা তার ব্যাগটা গাছের শেকড়ের উপরের রেখে শান্তকে বললো ২০টাকা দিতে

শান্ত মাথার চুল জোরে টানতে টানতে পকেট থেকে মানিব্যাগ নিয়ে পুরো মানিব্যাগটাই আহানার হাতে ধরিয়ে দিলো
আহানা ২০টাকা নিয়ে মানিব্যাগটা শান্তর হাতে দিয়ে চলে গেলো
শান্ত আহানার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে গাছের শেকড়ের দিকে তাকালো,ব্যাগ রেখে গেছে তার মানে আবার আসবে
আহানা এক কাপ কফি নিয়ে এসে শান্তর হাতে দিলো
শান্ত খুশি হয়ে সাথে সাথে পাগলের মত গরম গরম কফি খেয়ে নিলো

থ্যাংকস!
ওয়েলকাম
আহানা ব্যাগটা নিয়ে চলে যেতে নিতেই শান্ত বললো দাঁড়াতে
কি?
বাইকে উঠো,আমি তোমাকে দিয়ে আসি
আহানা ঢোক গিলে চোখ নামিয়ে বললো নাহ,ধন্যবাদ
ধন্যবাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেলো সে ওখান থেকে
বুকের ভেতরটা কেঁপেই যাচ্ছে তার
শান্ত মুচকি হেসে হাতটা বাড়িয়ে ধরলো সামনে, কতগুলো ফুল পড়ে ভরে গেছে তার হাত
গাছটা মনে হয় আহানার মত আমাকেও চিনে গেছে তাই তো হাত বাড়াতেই এত ফুল এসে ভরে গেলো
পিউদের বাসা থেকে বেরিয়ে এবার যাব আকাশদের বাসায় কিন্তু একি!সেই ছেলেগুলো এখানেও রিকসা এনে হাজির করেছে,ওরা জানে কি করে আমি এখানেও প্রাইভেট পড়াই
আহানা বাধ্য হয়ে রিকসায় উঠলো,রিকসা আকাশদের বাসার সামনে এসে থামলো
আহানা আকাশকে পড়িয়ে বের হতেই আবার দেখলো সেই রিকসা দাঁড়িয়ে আছে সাথে ছেলেগুলাও

আসসালামু আলাইকুম,ভাবী,ভালো আছেন তো??
আহানা চোখ বড় করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললো ভাবী?কার? কিসের?
ছেলেটা কাশ দিয়ে বললো কিছু না
যান বাসায় যান,আল্লাহ হাফেজ
ছেলেগুলো নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো সেখান থেকে
আহানা ভাবতে ভাবতে রিকসায় উঠলো,কিছু তো গড়বড় আছেই!!

বাসায় ফিরে ভাত বসিয়ে বই নিয়ে পড়তেসে আহানা
শান্তর কথা মনে পড়ে গেলো,মানুষ ঔষধ না খেলে অসুস্থ হয়ে যায় আর এই ছেলেটা কফি না খেলে অসুস্থ হয়ে যায়,আজব ব্যাপার!
কয়েকমাস আগে আহানা বাসার সামনের উঠানটাই মরিচের বিচি ফেলেছিল,সেখানে গাছ উঠেছে ৩টা,সেই গাছ ৩টার মধ্যে একটাতে মরিচ ধরেছে অনেকগুলো
আজকে উঠানের সেই মরিচগাছটার থেকে আহানা একটা মরিচ এনে ভাত নিয়ে খেতে বসলো,তার হাতে করা গাছের মরিচ,স্বাদই আলাদা,ঝাল নেই কিন্তু ঝাঁঝ আছে
খাওয়া শেষে সব গুছিয়ে শুয়ে পড়লো সে

পরেরদিন সকাল সকাল আবার বের হলো মিষ্টিকে পড়াতে
শান্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিলো আহানাকে দেখে কফিটা তাড়াতাড়ি শেষ করলো
আহানা মিষ্টিদের বাসায় ঢুকার সময় শান্তর বাসার দিকে তাকিয়ে দেখলো সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতেসে তাও ওর দিকে তাকিয়ে
ডাহা মিছা এটা আমি জানি,ফোনে কথা বলার অভিনয় করতেছে😒
আহানা কিছু না বলে চুপচাপ ভেতরে চলে গেলো
মিষ্টিকে পড়িয়ে বাসা থেকে বের হতেই আবার শান্ত সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলো

আপনার শরীর কেমন আছে?
ভালো
আচ্ছা
আহানা কি বলবে আর ভেবে না পেয়ে আরেকদিকে ফিরে চলে গেলো
শান্ত ও আর কিছু বললো না,আহানার সামনে আসলে মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না তার

নওশাদ,সূর্য,রিয়াজ আর শান্ত হলুদ পাঞ্জাবি পরেছে
ইয়েলো স্কোয়াড🤘
রোডে ৪জনে বের হতেই সবাই হা করে চেয়ে রইলো
নওশাদের বাইকে রিয়াজ উঠেছে আর শান্তর বাইকে সূর্য
৪জনে ভার্সিটিতে এসে কাজে লেগে গেলো

আহানা শাড়ীর কুচি ঠিক করতেসে রুপা এর মাঝে ২৪বার ফোন করেছে তাড়াতাড়ি আসতে নাহলে ফুলের শুভেচ্ছা পাবে না
আহানা তাড়াতাড়ি করে কুচি ঠিক করে চুল ছেড়ে দৌড় দিলো
না কোনো মেকআপ, না কোনো স্টাইল
সাদামাটা একটা মেয়ে,গায়ে নীল শাড়ী জড়িয়ে রোড দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে,আহামরি লাগছে না তাও রোডের সবাই ওর দিকেই চেয়ে আছে,কারন ঢাকায় এই বেশে কোনো মেয়েকে তেমন দেখা যায় না,শাড়ী পড়লে অন্তত লিপস্টিক হলেও ঠোঁটে থাকে তাদের কিন্তু আহানা সেরকম কোনো সাজই দেয়নি,তাই সবাই কিছুটা অবাক হয়েই চেয়ে আছে
চুলগুলো যেন ঝিকমিক করতেসে আহানার,কানের দুল গলার সেটটায় ভারী মানিয়েছে তাকে,একটা শপিং মলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো আহানা,একটু দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নিলো গ্লাসে,একটু লিপস্টিক হলে কতই না ভালো লাগতো
মুখটা কালো করে আবারও হাঁটা ধরলো সে

দে শান্ত ঝুঁড়িটা আমাকে দে
তুই ফুলগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাক,আমি ওকে বললে ঝুড়ির সব ফুল ঢেলে দিবি
কিন্তু কার উপর?
আরে প্রিন্সিপাল স্যারের উপর,আর কার,তোর রুপার?

যাহহহ কি বলিস!
শান্ত নওশাদকে ঝুঁড়িটা দিয়ে ভার্সিটির গেটের দিকে গেলো
আহানা আসতেসে
শান্ত এদিক ওদিক তাকিয়ে সামনে তাকাতেই চোখ আটকে গেলো তার
আহানা হেঁটে আসতেসে দূর থেকে,তাকে দেখা যাচ্ছে
গায়ে তার দেওয়া নীল শাড়ীটা,খোলা চুল,আর কিছু না
কোনো সাজ না,তাও শান্ত হা করে চেয়ে আছে তার দিকে
ওওওওওওয়াওও

এ্যা?কি?ওওও কি?ওকে?কি বলতেছিস শুনি না,ওকে বললি??
আহানা শান্তর দিকে একবার তাকিয়ে ভিতরে চলে গেলো
নওশাদ ভাবলো প্রিন্সিপাল স্যার আসছে
সে ফুলের ঝুঁড়ির সব ফুল আহানার গায়ে ঢেলে দিলো
আহানা থেমে গিয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে উপরের দিকে তাকালো,ফুল পড়েই যাচ্ছে,থামাথামি নাই,এক ঝুঁড়ির ফুলের পাপড়ি তো কম না
শান্ত আহানার দিকে তাকিয়ে রোবট হয়ে গেছে
নওশাদ চোখ ডলে দেখলো এটা আহানা,ইস! শান্ত!!এটা তোর প্রিন্সিপাল?
বেয়াদ্দপ!এক ঝুঁড়ি ফুল নষ্ট করলি!
শান্তর হুস আসলো এবার,এগিয়ে এসে বললো আমি কি ওকে বলসিলাম?তুই ঢেলেছিস কেন?

তুই ওওওওও বলে কি যেন বলছিলি,আমি ভাবলাম ওকে বলেছিস
তোর মাথা
আরেহ সব ফুল তোমরা নষ্ট করলা?নওশাদ!আমার গায়ে দেওয়ার জন্য কোনো ফুল রাখলে না তুমি
না বেবি,কে বললো
নওশাদ উপর থেকে নেমে আহানার সামনের থেকে ফুল কুড়িয়ে রুপার গায়ে মারলো
থ্যাংকু☺
এক মিনিট,আহানা??
এই শাড়ীটা তো আমি কাল মার্কেটে পছন্দ করেছিলাম,তোর খালা এটা পেলো কই
জানি না তো

যাই হোক,এরকম হয়ে এসেছিস কেন?একটু লিপস্টিকও দেস নাই,মরা মরা লাগতেসে এদিকে আয়
রুপা আহানার হাত ধরে নিয়ে গেলো
শান্ত এখনও ওদিকে তাকিয়ে আছে
নওশাদ ঝুঁড়িটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো আরেক ঝুড়ি ফুল আনতে
শান্ত ঝুড়িটা নিয়ে নওশাদকে বকতে বকতে চলে গেলো
রুপা খুব সুন্দর করে আহানার ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে দিয়েছে
ব্যাস এবার তোকে খুব সুন্দর লাগছে
শান্ত দোকানদারকে ফুলের ঝুড়ি দিয়ে বললো ফুলের পাপড়ি ভর্তি করে দিতে,পাশে তাকিয়ে দেখলো একটা ছোট্ট মেয়ে হাতে টিপ নিয়ে বিক্রি করতেসে
শান্ত মুচকি হেসে এক পাতা নীল টিপ কিনে নিলো তার থেকে,টিপ পকেটে ঢুকিয়ে আবারও ভার্সিটিতে ফিরে গেলো ঝুড়ি হাতে নিয়ে

আহানা আর রুপা ক্যামপাসে দাঁড়িয়ে ভার্সিটির ডেকোরেশন দেখতেসে
শান্ত দূরে দাঁড়িয়ে আহানাকে দেখে যাচ্ছে
কিরে ভাই তুই এত কাম চোর হলি কবে থেকে?
স্টেজটা ঠিক করার দায়িত্ব তোর ছিল না?এরকম ড্যাবড্যাব করে ঐদিকে কি দেখস তুই?
নওশাদ পিছন ফিরতে যেতেই শান্ত ওরে ঘুরিয়ে নিয়ে গেলো
চল স্টেজ ঠিক করি
আহানা তুই বাইরে থাক আমি ওয়াসরুম থেকে আসতেসি
ঠিক আছে
আহানা কি যেন ভেবে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে গেলো,কয়েকটা ফুল নিয়ে কানে গুজলো
লেকের কাছে গিয়ে পানিতে উঁকি দিয়ে নিজেকে দেখে হাসলো সে
হঠাৎ পানিতে শান্তর প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলো
ভয় পেয়ে পিছন ফিরে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো আহানা

একটা জিনিস বাকি রয়ে গেছে
কি?
শান্ত আঙ্গুল উঠিয়ে আহানার কপাল ছুঁয়ে দিলো
আহানা কপালে হাত দিয়ে লেকে দেখতে যেতেই শান্ত হাত ধরে আটকালো আহানাকে
তারপর নিজের হাতের ঘড়িটা আহানার সামনে নিয়ে হাত বাঁকিয়ে ধরলো
আহানা স্পষ্ট ভাবে নিজেকে শান্তর ঘড়ির কাঁচে দেখছে,একটা টিপ তার কপালে
এটারই কমতি ছিল
আহানা নিচের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চলে গেলো
শশী ম্যাম অবাক হয়ে বললেন আজ ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট আর মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্টদের দেখে মনে হচ্ছে হিমু আর রুপা,ছেলেরা হলুদ আর মেয়েরা নীল,বাহ কম্বিনেশনটা নাইসসস!!
শান্ত হেসে মাথা চুলকাচ্ছে,আইডিয়াটা তারই ছিল
কিরে আহানা টিপ পেলি কই?
ঐ আসলে
আচ্ছা বাদ দে,চল সিটে বসি,এখন অনুষ্ঠান শুরু হবে
আহানা সিটে বসতেই পাশে শান্ত এসে বসে গেলো
আহানা চোখ বড় করে উঠে গেলো সাথে সাথে রুপা আবার ওর হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিয়ে বললো কি করিস!আর জায়গা পাবি না,চুপচাপ বসে থাক
শান্ত ভাই তোমার সখিনা কই?
পার্লারে সাজতেসে

নওশাদ পানি খাচ্ছিলো,শান্তর কথা শুনে মুখ থেকে পানি সব ফেলে দিলো,ওর কাশি উঠে গেছে,রুপা ওর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললো শান্ত ভাই!
আরে আমি কি করবো?অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পথে আর ও এখনও সাজতেসে
ভাইরে ভাই যে হারে সাজতে গেছে মনে হয় আজ কারো বিয়া😂😃
শান্ত আহানার দিকে একবার এক বাহানায় তাকাচ্ছে
আহানা রুপার সাথে কথা বলতেসে তার খেয়াল নেই তার পাশে একটা মানুষ তার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে সেই কখন থেকে
ওরে রে জরিনা আইসা পড়সে!!
শান্ত চোখ বড় করে পাশে তাকালো,এলিনা নায়িকাদের মত এন্ট্রি নিচ্ছে
সবাই হা করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে,মনে হয় সে ভার্সিটিতে নয় কোনো বিয়ে বাড়িতে এসেছে,হাতা কাটা ব্লাউজ,যে শাড়ী পরেছে মনে হয় এখনই খুলে যাবে,শান্তর পাশ থেকে রিয়াজকে উঠিয়ে সে বসে পড়লো

তোমার পাশে এই মেয়েটা কি করে?তোমার জন্য কি আর জায়গা ছিল না?
বাই দ্যা ওয়ে আমাকে কেমন লাগছে?
কিউট
আরে আহানা আজকে শাড়ী পরেছে দেখছি,তা তুমি কি ম্যাচিং করে কিছু পরতে জানো না?ব্লাউজ এর রঙ এত হালকা আর শাড়ীর রঙ ঘাড়ো,তোমাকে যে একটা ক্ষেত লাগতেসে জানো তুমি?কোথা থেকে এরা উঠে আসে!স্টাইল বলতে কিছু জানে না এরা!
আহানা এলিনার কথায় কষ্ট পেলো তাই চুপচাপ উঠে চলে গেলো ভার্সিটি থেকে
এলিনা!কথা সংযত রেখে বলো

তো.?এখন এই মেয়েটার জন্য তুমি আমাকে শিখাতে আসবে আমার কেমন করে কথা বলা উচিত?ভুলে যেও না এই মেয়েটা তোমাকে একদিন চড় মেরেছিল
আহানা চোখের পানি ধরে রাখার চেষ্টা করতে করতে চলে যাচ্ছে
শান্ত উঠে চলে গেলো সেদিকে
এলিনা?তুমি নিজেকে কি মনে করো?তুমি বিশ্বসুন্দরি?তোমাকে যে ফকিন্নির মত লাগতেছে তা আমরা কেউ বলেছি?
ওহ শাট আপ রুপা!পার্লারের সাজ তোমাদের মত ফকিররা কি করে চিনবে

ওহ রিয়েলি?তুমি এমন ভাব করতেসো যেন তুমি একাই পার্লারে সাজো,আমরা তো জানি না কিছু!
আহানা দাঁড়াও!
আহানা চোখ মুছে পিছন ফিরে তাকালো
কি?
সরি
কেন?

আসলে আমি তোমাকে শাড়ীটা দিয়েছিলাম,আর আমার এটা খেয়াল রাখা উচিত ছিল কাউকে শাড়ী দিলে তার সাথে শাড়ীর অন্য সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও দিতে হয়
মানে?আপনি এই শাড়ীটা দিয়েছেন?
হুম
কিন্তু কেন?আমাকে দয়া দেখাতে কে বলেছিল আপনাকে?কেন দয়া দেখালেন?আমি নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারি,কারোর কোনো দয়ার প্রয়োজন নেই আমার,শাড়ী পরতেই হবে এমন তো কোনো কথা ছিল না
আমার তো নীল জামা ছিল ওটা পরে আসতাম আমি
আপনাকে কে বলেছে এরকম দয়া দেখাতে!!
লাগবে না আমার কারো দয়া!যে দয়াতে আরও বেশি অপমানিত হতে হয় সে দয়া আমার লাগবে না
আহানা চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলো

শান্তর আজ নিজের উপর খুব রাগ উঠতেসে,কেন আমি শাড়ীর সাথে ম্যাচিং করে একটা রেডিমেট ব্লাউজ কিনে দিলাম না
আহানা সোজা বাসায় ফিরে আসলো,গলার সেটটা আর কানের দুল খুলে ছুঁড়ে মারলো ফ্লোরে,শাড়ীটাও খুলে ফেললো সে
আমার আগেই বুঝা উচিত ছিল!যার এই দুনিয়াতে মা বাবা বলে কেউ নেই তার খালা আসবে কই থেকে
সূর্য?তুই শান্তকে দেখেছিস?
নাহ তো
শান্ত বাসায় ফিরে গেছে মনে হয়,এলিনা আহানাকে যা কথা শুনাইলো ওর গায়ে লাগছে
ওর গায়ে লাগছে কেন?নওশাদ?
শান্ত আহানাকে পছন্দ করে মেবি
হুম আমারও তাই মনে হচ্ছে

আহানা মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে পিউদের বাসায় গেলো পড়াতে
রুপা কল করেই যাচ্ছে আহানা রিসিভ করে বললো পরে কথা হবে,আর কিছু বলার সুযোগ দেয়নি ওকে,লাইন কেটে ফোন ব্যাগে রেখে দিলো
বাসায় ফিরে চালের ছোট বালতিটার ঢাকনা খুলে দেখলো ২/৩টা চাল পড়ে আছে,ইস আমি তো একদমই ভুলে গেছিলাম চাল যে শেষ,এখন কি খাব,হাতে তো টাকাও নেই,অবশ্য কাল মিষ্টির মা বেতন দিবেন,কিন্তু সেই ২হাজার টাকা তো তারেক আঙ্কেলকে দিয়ে দিতে হবে,ধুর!!
পানি আর একটা বিসকিট খেয়ে শুয়ে পড়লো সে
পরেরদিন মিষ্টিদের বাসায় আসতেই দেখলো শান্ত আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে
আহানা চোখ নামিয়ে চলে যেতে নিতেই শান্ত গিয়ে পথ আটকালো

আহানা সরি,আমি তোমাকে দয়া দেখানোর জন্য শাড়ীটা দিই নাই,আমি জাস্ট চেয়েছিলাম।।।।।
আহানা শান্তকে আর কিছু বলতে দিলো না
মিষ্টিকে পড়াতে চলে গেলো
শান্ত হাত নিয়ে দেয়ালে ঘুষি মারলো একটা
রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ফেললো,সিগারেট এক প্যাকেট নিয়ে ফ্লোরে বসে সিগারেট খাওয়া শুরু করলো একের পর এক
আহানাকে মিষ্টির মা ২হাজার টাকা দিলেন,সে বাসা থেকে বেরিয়ে হেঁটে বাসায় এসে ভাবলো তারেক আঙ্কেলকে ১৮০০দিব,বাকি ২০০টাকা দিয়ে চাল আর ডাল কিনবো,হুম নাহলে আজ না খেয়ে থাকতে হবে
আগে দেখি ১৮০০টাকা দেখে যদি তারেক আঙ্কেল চিল্লাচিল্লি করে তাহলে বাকি ২০০টাকা ও দিয়ে দিব

আহানা ১৮০০টাকা নিয়ে তারেক রহমানের বাসায় আসলো
কলিংবেল চাপতেই তারেক রহমান এসে দরজা খুলে দেখলেন আহানা টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
আঙ্কেল মাফ করবেন, আমার কাছে ১৮০০টাকা আছে,আমি বাকি ২০০টাকা কদিনের মধ্যেই দিয়ে দিব,এগুলা রাখেন এখন আপাতত
টাকা? কিসের টাকা,তোমার টাকা তো রফিকুর রহিম দিয়া দিসে,তোমার আর দিতে হবে না
মানে?রফিকুর রহিম কে?
না ইয়ে আসলে জানি না,আসি বললো তোমার রিলেটিভ
দেখুন,আমার কোনো রিলেটিভ নেই,আপনি জানেন আমি অনাথ,তাহলে টাকা কে দিসে?সত্যি করে বলবেন
শাহরিয়ার শান্ত নামে একটা ছেলে দিয়েছে
আহানা সাথে সাথে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে,সোজা শান্তর বাসার দিকে গেলো রাগে গজগজ করতে করতে
শান্ত ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নিয়ে জুতার ফিতা লাগাচ্ছে সোফায় বসে
আহানা দরজায় নক করতেই বুয়া গিয়ে দরজা খুললো
আহানা বুয়াকে পাশ কাটিয়ে সোজা ভিতরে চলো গেলো

শান্ত সোফায় ছিল তখন,আহানাকে দেখে দাঁড়িয়ে বললো কি হয়েছে?
আপনাকে কে অধিকার দিয়েছে আমাকে দয়া দেখানোর?আমি বলেছি?আমি বলেছি আমাকে সাহায্য করুন?
একবার শাড়ী একবার বাসা ভাড়া!!
দান করতে হলে ফুটপাতের লোকদের করেন আমি মানা করসি নাকি?
আমাকে দয়া দেখান কেন?লাগবে না আপনার টাকা
আমাকে সবাই ফুটপাতের মনে করে,একজনে বলে বুয়ার কাজ করতে আরেকজনে আল্লাহর ওয়াস্তে টাকা,বস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ১৫+১৬

আমি আজ পর্যন্ত নিজের ভার নিজে বহন করে এসেছি,কারোর থেকে কোনো টাকা দয়া হিসেবেও নি নাই
সো প্লিস আমাকে আর এসব দয়া দেখাবেন না
না খেয়ে মরে যাব তাও কারোর দয়া আমি নিব না
আহানা তার হাতের ২হাজার টাকা শান্তর হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো
বুয়া হা করে তাকিয়ে আছে,শান্তর মত রাগী ছেলে এরকম চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে,মেয়েটা এত কথা শুনিয়ে গেলো তাও কিছু বললো না

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ১৯+২০