Home প্রেমের পাঁচফোড়ন প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ২১+২২

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ২১+২২

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ২১+২২
Afnan Lara

তোরা আড্ডা দে আমি আসতেসি
কই যাস?
একটু কাজ আছে,আসতেসি ৫মিনিট
শান্ত উঠে এসে আহানার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,আহানা রাগে ফুসতেসে
তো??কি খবর,ভালো আছো?
আপনি একটা!!!
কি আমি?
বেয়াদব!
আহানা মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো,শান্ত হাসতেসে কারণ সে এশাকে দিয়ে আহানার ওড়নায় গিট্টু দিয়ে ২হাজার টাকা রেখেছিল
ভার্সিটিতে ছুটি হয়ে গেছে আহানা অন্য রোড দিয়ে টিউশনিতে যাচ্ছে,শান্ত রোডটার পাশেই বাইকে বসে আরামসে সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে,আহানাকে দেখে ফু দিয়ে ধোঁয়া ওর মুখের দিকে দিলো
আহানা দাঁড়িয়ে চোখ বড় করে শান্তর হাত থেকে টেনে সিগারেটটা নিয়ে ফেলে দিলো নিচে

এটা কি করলে?
একই প্রশ্ন আমিও করতে পারি,সিগারেটের ধোঁয়া আমার মুখের সামনে দিলেন কেন?
আমার ইচ্ছা
তাহলে এটাও আমার ইচ্ছা
আহানা শান্তর দিকে ভেঁংচি কাটতে কাটতে যাচ্ছে আর দুম করে নিচে পড়ে গেলো
শান্ত রাক্ষসের মত জোরে হাসতে হাসতে বাইক নিয়ে চলে যাচ্ছে
আহানা নিচে মাটিতে বসে বকতেছে ওকে
বাসায় ফিরে টাকা গুলো নিয়ে বসে আছে সে,আর বাড়াবাড়ি করা যাবে না,পরে কি করতে না কি করে ফেলবে শয়তানটা!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আমি বরং এক কাজ করি,টাকা গুলো দিয়ে বাজার করি,চাল আর ডাল কিনবো আরও কত কি কিনা বাকি
আহানা ২হাজার টাকা থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে আলমারিতে রেখে দিলো
বাকি এক হাজার টাকা নিয়ে কাগজ কলম সহ খাটের উপরে গিয়ে বসলো লিস্ট করার জন্য
একটা নতুন জামা-৫০০টাকা
চাল এক কেজি ১০টাকা করে ২০কেজি- ২০০টাকা
খোলা মসুর ডাল এক কেজি ১২০করে ২কেজি-২৪০টাকা
আর থাকে ৬০টাকা
পেঁয়াজ আর আলু কিনবো সেটা দিয়ে,কম কম করে কিনবো তাহলে ৬০টাকায় হয়ে যাবে,ব্যাস,কাল ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় বাজার করে আনবো
আলমারিতে ধোয়া জামাটা রাখতে গিয়ে আশ্রমের মায়ের শাড়ীটা পড়ে যেতে নিলো,আহানা সেটা ধরে জড়িয়ে ধরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো

আমার মায়ের শাড়ী,আরেহ আজ মাসের কয় তারিখ! ঈদের পরেরদিনই তো আমার সালেহা মায়ের মৃত্যু বার্ষিকি
ইস যদি এবার আশ্রমটাতে যেতে পারতাম তাহলে কত ভালো হতো,মায়ের কবরটা দেখা হতো আর আশ্রমের বাচ্চাদের সাথেও দেখা হয়ে যেতো
এক মিনিট! আমার কাছে তো ১হাজার টাকা আছে,সেটা দিয়ে তো আমি আশ্রমে গিয়ে আবার ফেরত ও আসতে পারি,আরে হ্যাঁ তাই তো,ট্রেনে করে গেলে ভাড়াও কম যাবে,তাহলে আমি ঈদের কদিন আগে যাবো আশ্রমে,টিউশনিও থাকবে না তখন
আহানা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো
পরেরদিন ভোরে উঠে রেডি হয়ে নিয়ে মিষ্টি বাসায় গেলো
শান্তর বাসার দরজা বন্ধ,উফ যাক বাবা বাঁচলাম,শয়তানটা আজ আর তাহলে জ্বালাবে না
আহানা নেচে নেচে মিষ্টিদের বাসার দরজায় নক করলো
শান্ত এসে দরজা খুললো
শান্তকে দেখে আহানা ভূত দেখার মত ভয় পেয়ে এক দৌড় দিলো
পরে আবার কিসব ভেবে ফেরত আসলো
আসেন ম্যাডাম ভিতরে আসেন, এভাবে পালালে কি হয়!!
আপনি এখানে?
ওমা,আমার মিষ্টির বাসায় আমি থাকতে পারি না?

আহানা কিছু না বলে গিয়ে সোফায় বসলো,শান্ত ওর সামনে বরাবর বসলো পায়ের উপর পা তুলে
আহানা বিরক্তি নিয়ে মিষ্টিকে পড়িয়ে যাচ্ছে
শান্ত দাঁত কেলিয়ে আহানার দিকে তাকিয়ে ঢুলতেসে শুধু
আহানার দম বন্ধ হয়ে আসতেসে,কেউ এমন করে তাকিয়ে থাকলে কার ভালো লাগবে?উফ!!
শান্ত ৭টা বাজার ১০মিনিট আগে উঠে চলে গেলো
আহানা বড় একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো,যাক বাবা বাঁচলাম!
মিষ্টিকে আরও ১০মিনিট পড়িয়ে আহানা বাসা থেকে বের হলো,শান্তর বাসার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর লিফটের দিকে তাকালো,শান্ত লিফটের ভেতরে দাঁত কেলিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে ওর দিকে
আহানা চোখ বড় করে সিঁড়ির দিকে চলে যেতে নিতেই শান্ত ওর হাত টেনে ধরে লিফটের ভিতরে নিয়ে আসলো

এই!
চুপ!
আহানা চুপ করে তাকিয়ে আছে
শান্ত পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার নিলো,লিফট থেকে বের হলে ধরাবে
নিচ তলা আসতেই আহানা শান্তর হাত ছাড়িয়ে এক দৌড় দিলো
শান্ত ও দৌড়ে ওর সামনে এসে পড়লো
উফ!কি সমস্যা আপনার?
তুমি আমার থেকে এত পালাও কেন বলোতো?
আপনার কি তাতে?ইস!
আমার কি?
শান্ত এগিয়ে গেলো আহানার দিকে
আবার বলো তো
আহানা ঢোক গিলে পিছনে থাকা একটা কারের সাথে লেগে গেলো

সরি মুখ ফসকে বলে ফেলছি,প্লিস আমাকে ছাদ থেকে ফেলবেন না
শান্ত সিগারেট ধরিয়ে আহানার এক পাশে হাত নিয়ে কারের উপর রেখে মন দিয়ে সিগারেট খাচ্ছে,আহানার দিকে ধোঁয়া ছাড়তেই আহানা চোখ বন্ধ করে কাশি শুরু করে দিলো
আপনি খুব খারাপ, হাত সরান আমি বাসায় যাব
রোজ রোজ বুয়ার হাতের রান্না ভালো লাগে না,আজ সকালের নাস্তা বানিয়ে দাও না প্লিস
কিহ?আপনার মাথা ঠিক আছে?হাত সরান আমি আমার বাসায় যাব
তাহলে আমিও তোমার সাথে যাব
আমি মালিকের কাছে বিচার দিব
তারেক মিয়া আমার সেক্রেটারি,ওরে যদি বলি আমি আহানার সাথে এক বাসায় থাকবো সে কিছু বলবে না
হাত সরান বলতেসি,আমি বাসায় যাবো
যেকোনো একটা চুজ করো
আপনি এমন করেন কেন আমার সাথে?
বারবার এক কথা ভালো লাগে না আহানা,চুপচাপ আমার বাসায় চলো নয়ত আমাকে তোমার বাসায় নিয়ে যাও

আমি এতগুলো ছেলের মাঝে যাবো না আপনার বাসায়
তাহলে চলো তোমার বাসায় যাই
আহানা শান্তর হাত ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হেঁটে চলে গেলো
অনেকদূর এসে দম ফেলে তারপর পিছনে তাকালো,শান্তকে দেখা যাচ্ছে না,মুচকি হেসে স্বস্তি নিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো শান্ত ও আহানার সাথে সাথে ওদিকে চেয়ে আছে
কাউকে খুঁজতেসিলা বুঝি?
আপনি একটা অসভ্য লোক!
আহানা বাসায় এসে দরজা আটকাতে যেতেই শান্ত হাত দিয়ে দরজা ধরে ফেললো
আরে এমন করো কেন,মেহমানকে কেউ এভাবে অপমান করে?

আহানা চোখ রাঙিয়ে টেবিলের উপর ঠাস করে ব্যাগ রেখে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো
শান্ত আহানার বিছানায় বসে গেমস খেলতেসে
আহানা ভাত রাঁধলো পরে ভাবলো বাঁদরটা তো আমার মত খালি বেগুন ভাজা দিয়ে ভাত খেতে পারবে না,কি করি!!
আলু কেটে বেগুন দিয়ে তরকারি রেঁধে নিলো আহানা,মাছ তো নেই
শান্তর সামনে বাটি আর প্লেট এনে রাখলো
শান্ত ফোন রেখে হাত ধুয়ে বসে গেলো খাওয়ার জন্য
আহানা অবাক হচ্ছে,শান্ত এত ছোটখাটো খাবার খুব মজা করে খেয়ে যাচ্ছে

অনেক মজা হয়েছে
কথাটা শুনে আহানার মনে হলো যেন রান্না করাটা সফল হয়েছে তার
খাওয়া শেষে শান্ত গেলো হাত ধুতে
আহানা বিছানার থেকে বাটি আর প্লেট নিচ্ছে রান্নাঘরে রাখার জন্য
শান্ত হাত ধুয়ে এসে আহানার ওড়না টেনে মুখ মুছতে লাগলো
আহানা অবাক হয়ে গেছে শান্তর এমন কাজে
শান্তর ও খেয়াল নেই সে কি করতেছে,মায়ের আঁচল দিয়ে মুখ মুছতো সবসময়
মায়ের মৃত্যুর পর থেকে অভ্যাসটা কয়েকবছর ধরে বন্ধ ছিল আজ হঠাৎ করে এসে যাবে সে ভাবতে পারেনি,,শান্তর হুস আসতেই ইতস্তত বোধ নিয়ে বললো সরি আহানা,আমি আসলে….

ইটস ওকে
আহানা ওড়না ঠিক করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো
শান্ত ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে আহানার দিকে তাকিয়ে বললো থ্যাংকস
মেনশন নট!😒👿
বাই,এমন করে মাঝে মাঝে জ্বালাবো😜
বাহির হোন বলতেসি,ঢং যত্তসব
আহানা দরজা লাগিয়ে দিলো শান্তর মুখের উপর,আজ খাইয়েছি এটাই অনেক আবার বলে মাঝে মাঝে,ব্যাটার শখ কত!
বেয়াদ্দপ মাইয়া!!

কিরে কোথায় ছিলি তুই?
আসলে রিয়াজ একটু জগিং করতে গেসিলাম
বুয়া নাস্তা বানিয়েছে,চল একসাথে খাই
নাহ,আমার খিধে নেই,পরে খাবো,তোরা খা
কথাটা বলে শান্ত নিজের রুমে ফিরে গেলো
রিয়াজ হা করে চেয়ে আছে,অন্য সময়ে সঠিক টাইমে নাস্তা না পেলে চিল্লাই বাসা উল্টায় ফেলে আর আজ বলে খাবে না?আজব তো!
আহানা বাকি খাবার খেয়ে সব গুছিয়ে নিয়ে রেডি হয়ে ভার্সিটিতে আসলো,আজ ঈদের ছুটি দিয়ে দিবে
আহানা খুব খুশি,সে তার ছোটবেলা কাটানো সেই আশ্রমে যাবে
আর শান্ত খুশি সে তার মায়ের কবর আর বাবাকে দেখতে যাবে
কাল ভোরেই রওনা হবে,কয়েকদিন বাদেই ঈদ

কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে এসে আহানা ২৩তম কদম ফেলতেই শান্ত পিছন থেকে ডাক দিলো
আহানা পিছন ফিরে তাকালো ওর দিকে
ঈদে দেশের বাড়ি যাবে না?মা বাবার কাছে
আহানা চুপ করে থেকে বললো হুম যাবো
আমিও যাব,বাই তাহলে,একে বারে ঈদের পরে দেখা হবে
বাই

শান্ত বাইকে উঠে আহানার দিকে এক নজর তাকিয়ে চলে গেলো
আহানা টিউশনি শেষ করে নিউমার্কেটে গিয়ে একটা জামা কিনেছে
৫০০টাকার মধ্যেই ভালো জামা পেয়ে গেলো,তারপর চাল ডাল পেঁয়াজ আলু কিনে বাসায় ফিরলো
শান্ত মার্কেটে এসে মায়ের জন্য গোলাপি চুড়ি কিনলো তারপর ফুলের দোকান থেকে রজনীগন্ধা কিনলো,বাবার জন্য পাঞ্জাবিও কিনেছে সে
আর তার সৎ মা,ভাই বোনের জন্য ও জামা কাপড় নিয়েছে
ব্যাগ গুছিয়ে ফেললো,সব রেডি কাল ট্রেন ধরতে হবে,আহানাকে জ্বালাতে জ্বালাতে একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে,এ কটা দিন না জ্বালিয়ে থাকলে আবার আগের মতন হয়ে যাবে সব,হুম!
পরেরদিন সকাল ৬টায় আহানা কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে হাজির,মানুষের সমাগম বেশি,যাক, খালি থাকলে একা একা লাগতো,ভয় ও করতো
ঈদ তো তাই এত ভিড়!
কথা হলো গিয়ে আমি তো অগ্রিম টিকেট কাটিনি

অনেক রিকুয়েস্ট করে একটা টিকেট জোগাড় করলো আহানা তাও একটা বাচ্চা ছেলের সিট,ছেলের মাকে রিকুয়েস্ট করে ওরে কোলে রাখবে কথা দিয়ে টিকেটটা নিয়েছে সে
কিছু করার নেই,ঈদের ২দিন আগে টিকেট কিনতে আসলে জীবনেও সরাসরি টিকেট পাওয়া যায় না,অগ্রিম কেটে রাখতে হয়,আহানা ভুলেই গেসিলো সেটা,মনে রাখবে কি করে ২হাজার টাকা নিয়ে এ কদিন ধরে শান্তর সাথে যে লঙ্কা কান্ড চলছিলো,বাপরে বাপ!
অবশেষে টিকেট পেয়ে খুশি হয়ে আহানা দাঁড়িয়ে পড়লো ট্রেনের অপেক্ষায়
হাওর এক্সপ্রেস আসতেসে,,ঢাকা টু মোহনগঞ্জ
কমলাপুর আসতে আমার ২০০টাকা শেষ হয়ে গেলো,হেঁটে তো এতদূর আসা যায় না তা নাহলে হেঁটেই আসতাম,ট্রেন আসতেই আহানা তড়িগড়ি করে উঠে পড়লো

শান্ত ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়াচ্ছে হাতে ট্রলি ব্যাগ,দেরি হয়ে গেলো ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে,সে জানেও না এই ট্রেনে তার জ্বালানোর পার্টনার আহানাও আছে
দৌড়ে এক লাফ দিয়ে উঠে গেলো,উফ বাঁচলাম,একটুর জন্য মিস করতাম আমি
এসব ট্রেন ট্রুনে চলতে ভাল্লাগে একদম!না পারতে উঠসি
বাসের টিকেট পাইনি বলে এখানে আসতে হলো আমাকে!!
শান্ত জানালার পাশের সিটে গিয়ে বসলো
তার ঠিক পিছনের কেবিনে আহানাও জানালার সিটে বসেছে

আহানার কোলে বাবুটা,৫বছরের হবে,ওর মা ওকে কোলে নিতে পারবে না কারন উনি গর্ভবতী তাই বাবুর জন্য আলাদা টিকেট কিনেছেন তিনি,আহানা তার টিকেট নিয়েই তাকে কোলে নিয়ে বসে আছে,বাবুটা কোল থেকে নেমে তার বাবার কাছে চলে গেলো,তার বাবার কোলে ২/৩বছরের একটা বাবু,হয়ত তাই তার জন্য আলাদা সিট নেওয়া হয়েছিল
আহানা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে,ট্রেনে সে আরও একবার উঠেছিল,আশ্রম থেকে ফেরার সময়,গাছ পালা চলছে?নাকি ট্রেন চলছে?অদ্ভুত রহস্য
ক্ষেতের পাশ দিয়ে যাচ্ছে ট্রেন,ছোট মেয়ে একটা গরুর বাচ্চাকে নিয়ে ক্ষেত পেরিয়ে চলেছে,তার হাতে আবার একটা ছাগলও বাঁধা

সবুজ ক্ষেত,আর নীল আকাশ,যেন আকাশে আর্জেন্টিনা আর নিচে ব্রাজিলের পতাকা,আহানা এই দুই পক্ষের পতাকার রঙ জানে শুধু,তাদের দলে কে কে আছে,কে কয়বার জিতলো তা জানে না,জানতেও চায় না
বাবুটা তার বাবার কাছ থেকে এসে আহানার কোলে উঠে বসলো
শান্তর পাশে একজন বয়স্ক মহিলা বসেছেন,উনি শুধু দোয়াদরুদ পড়তেসেন,শান্ত এই নিয়ে ৬বার কানে ইয়ারফোন গুজেছে উনি ততবারই টান মেরে শান্তর কান থেকে সেটা ছুটিয়েছেন
উনার একটাই কথা এসব শুনা হারাম আর তাও উনি যখন দোয়াদরুদ পড়তেসেন তখন তো গান শুনলে চ্যালচ্যালাইয়া জাহান্নামে যাবে শান্ত
শান্ত ব্রু কুঁচকে ইয়ারফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেললো

খুব ছোটবেলায় নানি দাদিকে হারিয়েছে সে,তাই তাদের আদর পায়নি কখনও,এই মহিলাকে দেখে যেন নতুন করে হারানো নানি দাদিকে একসাথে পেয়ে গেলো সে
দোয়াদরুদ শেষ করে উনি তার হাতের লেডিস ব্যাগটা খুললেন,শান্তকে বললেন হাত পাততে
শান্ত হাত পেতে জানালার দিকে নজর দিলো
একটা পুকুর নজরে আসলো,জামা কাপড় ছাড়া ছোট ছোট ছেলে কতগুলো ঝাঁপ দিচ্ছে পুকুরটাতে
শান্ত তাদের দিকে চেয়ে হেসে দিয়ে তার হাতের দিকে তাকালো
গোটা এক আলমারির জিনিস পত্র তার হাতে কিন্তু মহিলাটি এখনও বের করেই যাচ্ছেন তার ব্যাগ থেকে আর সব নিয়ে শান্তর হাতে রাখতেছেন
মানুষ এত জিনিস নিয়েও বুঝি হাঁটে?ওহ মাই গড!!
মহিলাটি একটা বক্স খুঁজে পেলেন অবশেষে,এতক্ষণ এটাই খুঁজতেছিলেন,তারপর শান্তকে বললেন তার হাতের সব জিনিস আবার এই ব্যাগে ঢুকাতে

দাদি আমার মনে হয় না এসব এই ব্যাগে ঢুকবে
আরে কি বলো নাতি,আমি এসব কিছু তো এই ব্যাগ থেকেই বের করেছি
ওহ!
শান্ত এক এক করে সব ব্যাগে ঢুকাচ্ছে,টিসু এক বক্স,রুমাল ৫টা,সলা ৬টা,কাগজ পত্র আলা একটা প্যাকেট,আয়না,পানের বাটুয়া,ফোন,চিরুনি,নতুন জুতা,জামা এক সুট
শান্ত অবাক হচ্ছে আর ব্যাগে সব ঢুকাচ্ছে,কারন ছোট মিনি সাইজের এই ব্যাগটায় যে এক আলমারির সমান জিনিস ঢুকবে তা জানা ছিল না তার
দেখেছো?আমি বলসি না সব এটাতে আঁটবে
জি দাদি,বুঝলাম
শান্ত কাজ সেরে আবার জানালার দিকে ফিরে বসলো

এই ছেলে
জি দাদি?
নাও খাও
মহিলাটি একটা বক্স খুলে শান্তর দিকে বাড়িয়ে ধরলেন,ভিতরে পিঠা
নাও খাও,আমার বানানো
শান্ত একটা নিলো,কিন্তু না উনি জোর করে আরও ২টা খাওয়ালো শান্তকে,শান্তর কান্না পাচ্ছে,এমন করে মা চলে যাওয়ার পর থেকে কেউ আদর করে নাই তাকে
চোখের পানি মুছতেই মহিলাটি মাথা মুছে বললেন কি হয়েছে রে?
আমাকে এমন করে মায়ের পরে আর কেউ আদর করে নিই
থাক আমি করলাম তো!মায়ের কাছে যাচ্ছিস বুঝি?

হুম
সেখানে গেলে দেখবি সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে,মায়ের কোলে মাথা রাখলেই
কথাটা শুনে শান্ত কেঁদে দিলো এবার
ছেলেরা হুটহাট করে কাঁদে না তবে প্রিয় মানুষের মৃত্যুতে তারা কান্না থামাতে পারে না কখনও,কেঁদেই ফেলে
কিরে এমন করে কাঁদিস কেন
আমি আর কখনও আমার মায়ের কোলে মাথা রাখতে পারবো না গো দাদি
কেন?
আমার মা আমাকে ছেড়ে আল্লাহর কাছে চলে গেছে অনেক দূরে
মহিলাটি মুখটা ফ্যাকাসে করে শান্তর হাত চেপে বললেন থাক কাঁদিস না,শান্তকে কাঁদতে মানা করে উনি নিজেই হিজাবের ওড়না দিয়ে তার চোখ মুছলেন,তার ছেলে নেই,একটা এক্সিডেন্টে মারা গেছে,এখন তিনি যাচ্ছেন তার ছোট মেয়ের বাসায়,,এই কথা শান্তকে বললেন না কারন শান্ত এমনিতেও কাঁদতেসে আর কষ্ট দেওয়া উচিত না
তা তোর মায়ের কি হয়েছিল রে?
ক্যানসার
ওহ

বাবুটাকে তার মা খাইয়ে দিচ্ছে আহানা সেটা দেখে ওর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো,তাকে কেউ কখনও এমন করে খাইয়ে দেয়নি,যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই নিজের হাতে খেতো সে,হয়ত এর আগে নিচে যা পেতো তাই খেতো,আশ্রমের সব বাচ্চাকে তো আর হাতে ধরিয়ে খাইয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না,একজন আসতেন,থালায় থালায় খাবার সামনে দিয়ে চলে যেতেন,কিভাবে খেতে হয় তা কেউ বলে দেয়নি,একজন আরেকজনকে দেখে খাওয়া শিখতে হতো,আর সালেহা মা আসার পর আহানার মত অনেক বাচ্চাকেই ভালোবাসতেন,তিনি এসেছিলেন যখন আহানার ৬বছর সে সময়ে
বাবুটা আহানার দিকে তাকিয়ে মুখটা ছোট করে বললো কাঁদো কেন?
আহানা চোখ মুছে বললো কই না তো

দুপাশে দুজন কাঁদতেসে,একজন মা হারিয়ে আরেকজন মা বাবা দুজনকে হারিয়ে
বাবুটা তার হাতের বিসকুটের প্যাকেট আহানার হাতে দিয়ে বললো খাও,কেঁদো না
মোহনগঞ্জ এসে ট্রেন থামলো,আহানা বাবুটাকে টাটা দিয়ে ট্রেন থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে,পাক্কা ২বছর পর সে আবার মোহনগঞ্জে এসেছে
জ্বি দাদি ফোন নাম্বার সেভ করেছি,অবশ্যই কল করবেন আমাকে,আমিও করবো
কার গলা এটা,ঐ বাঁদরটার?
আহানা পিছন ফিরে তাকালো,এত এত মানুষের ভীড়ে শান্তকে দেখতে পেলো না সে
মনে হলো শান্তর গলা শুনলাম,ও এখানে কেন আসবে,আমিও না!
আহানা একটা রিকসার খোঁজে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে
শান্ত কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো,গান চলতেসে আর সে এদিক ওদিক তাকিয়ে রিকসা খুঁজতেসে
ওমা একটা রিকসাও নেই,আমাকে কি হেঁটে যেতে হবে নাকি?

আহানা হাঁটা ধরলো রিকসা না পেয়ে
শান্ত ও অবশেষে রিকসা না পেয়ে হেঁটে চললো
কাঁধে একটা ব্যাগ আর হাতে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে
মোহনগঞ্জের ফ্ল্যাটফর্ম থেকে বাম পাশে যে রোড গেছে তা থেকে ক্ষেতে নামতে হয় সেখান দিয়ে একটা ক্ষেত পার হলেই মেইন রোড
আহানা তার হাতের ব্যাগটা মুঠো করে ধরে নামলো ক্ষেতে
শান্ত রিকসার খোঁজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে সেও ক্ষেতে নামলো,আশেপাশে কেউ নেই,শুধু সামনে দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে
আহানা নতুন জামা পরে এসেছিলো আজ তাই শান্ত ওকে ঠিক চিনতে পারলো না তবে চুল দেখে শান্তর কেমন জানি মনে হলো এটা আহানা,আর হাত ঝুলিয়ে হাঁটার স্টাইল দেখেও আহানা মনে হচ্ছে
শেষে কনফিউশন দূরে করতে শান্ত চিৎকার দিয়ে বললো আহানা!!!

আহানা চমকে দাঁড়িয়ে পড়লো,পিছন ফিরে তাকালো শান্তর দিকে
শান্ত ও চমকে গেলো আহানাকে দেখে
আপনি!!
তুমি??এখানে?
আপনি এখানে কি করতেসেন?আমাকে ফলো করতে করতে এতদূর চলে এসেছেন?
আজব তো!তোমাকে ফলো করবো কেন আমি?আমি আমার বাসায় যাচ্ছি ঈদের ছুটি পেয়ে
তো?আমিও তো যাচ্ছি ঈদের ছুটি পেয়ে
শান্ত দাঁত কেলিয়ে আহানার পাশে এসে দাঁড়ালো
ইয়া আল্লাহ!!
এই বাঁদরটাকে তুমি সবসময় আমার সাথেই কেন রাখো!
মেইন রোডে উঠে আহানা শান্তর দিকে ব্রু কুঁচকে তাকালো
শান্ত সানগ্লাসটা পরে জ্যাকেট টেনে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিলো
তারপর একটা ভাব নিয়ে বুক ফুলিয়ে ডান পাশের রোডের দিকে চললো
হুহহহ,বেয়াদবটার ঢং দেখলে গা জ্বলে যায় আমার
আহানা চোখ রাঙিয়ে বাম পাশের রোডটার দিকে চলে গেলো

বাবা?সেই সকাল থেকে বাগানে বসে আছো,বাসায় আসো নাস্তা করে যাও
মিতু জোর করিস না,আজ কতটা দিন পর শান্ত আসতেসে আমি ওর জন্য বাইরেও অপেক্ষা করতে পারবো না?কি বলিস তুই
থাকো তাহলে,মা বকলে আমি বলবো তুমি আসতে চাও না
কথাটা বলে মিতু চলে গেলো বাসার ভেতরে
শান্ত বাসার গেট খুলে ভিতরে পা রাখতেই কেউ একজন এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওকে
গায়ের গন্ধ পেয়ে শান্ত চোখটা বন্ধ করে ফেললো,বাবা♥
কেমন আছিস
ভালো,তুমি কেমন আছো সেটা বলো
তোকে দেখে খুব ভালো আছি আমি
আয় ভেতরে আয়
বাবা শান্তর হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেলেন

মা,মিতু আর সায়ন কোথায়?
সায়ন ঘুমাচ্ছে,মিতু আর ওর মা বাসায়,চল নাস্তা করবো তোর সাথে
এখনও খাও নাই কেন?সকাল ১০টা বাজে
না আমি আমার ছেলের সাথে খাবো,চল
শান্ত মুচকি হেসে বাসার ভিতরে ঢুকতেই মুখো মুখি হলো তার সৎ মা রেণুর সাথে
উনি শান্তকে দেখে মোটেও খুশি হোন নি,তারমুখে বিরক্তি ছিল এতক্ষণ,তাও মুখে মিথ্যা হাসি দিয়ে বললেন এসেছো তাহলে!
শান্ত হাতের ব্যাগটা সোফায় রেখে কাছে এসে সালাম দিলো
উনি সালাম নিয়ে চুপ করে থেকে বললেন রাসেল?রাসেল!!গরুকে ঠিকমত ঘাস দিচ্ছো তো?
উনি ব্যস্ততার দোহায় দিয়ে চলে গেলেন সামনে থেকে
শান্ত মুখটা ছোট করে ভাবলো পাশে বাবা দাঁড়িয়ে আছে বাবার কথা ভেবে হেসে দিয়ে বাবার হাত ধরে ডাইনিং এ গিয়ে বসালো
খালা!খালা,খাবার দিয়া যাও,আমি আর আমার বাবা খাবো,জলদি দাও

কে এরকম ছাগলের মত চিৎকার করে এত সকাল সকাল!
শান্ত থেমে গিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালো,সায়ন নামতেসে বিরক্তি নিয়ে,শান্তকে দেখে ব্রু কুঁচকে হেসে দিয়ে বললো ওহহহ তুমি?আমি ভাবলাম ছাগল ডাকতেসে
সায়ন!!!
সায়ন বাবার ধমকে মুখটা বাঁকিয়ে আবার উপরে চলে গেলো
সায়ন মিসেস রেণুর আগের সংসারের ছেলে,মিতু এই সংসারের,মানে শান্তর বোন
মিতু রুটি নিয়ে এসে ডাইনিং এ রেখে বললো শান্ত ভাইয়া!
শান্ত সিঁড়ির থেকে চোখ নামিয়ে মিতুর দিকে তাকিয়ে হাসলো,মিতু!কেমন আছো?
ভালো,তুমি?
ভালো!
খালা রান্না করতেসে তাই আমি নিয়ে আসলাম

বাবার সাথে বসে খাওয়ার সময় এসব ভুলে গেলো শান্ত,হেসে হেসে খাওয়া শেষ করে নিজের রুমে ফিরে আসলো
সারাটা রুম জুড়ে শুধু মায়ের ছবি
ছবিগুলোতে হাত বুলাতে গিয়ে শান্তর চোখ দিয়ে পানি বেয়ে বেয়ে পড়তে লাগলো
মা চলে যাওয়ার ১০টা বছর কেটে গেছে,মায়ের মৃত্যুর পরপরই একটা কেলেঙ্কারির জেরে বাবা রেণু আন্টিকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়,তারপর তাদের কোল জুড়ে মিতু আসে,মিতুর বয়স এখন ৭বছর
মিতু আমাকে দেখতে পারে তবে একজন বোনের তুলনায় কম,সে তার মায়ের মত
শান্ত মায়ের একটা ছবি নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো
আসবো?
হুম বাবা আসো,বলতে হয় নাকি আবার

কি করিস?
হুমমম জানতাম,আসলেই মায়ের ছবি নিয়ে বসবি
কি আর করবো বাবা,আমার লাইফে তোমরা দুজন ছাড়া আর কে আছে
বিকালের দিকে তোর মায়ের কবর দেখে আসিস
হুম
বাবা শান্তর মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন
শান্ত মায়ের ছবিটা আবারও ওয়ালে টাঙিয়ে রুম থেকে বের হলো,সায়ন উচ্চস্বরে গান শুনতেসে
মাথা ধরে আছে,কফিও খাইনি
শান্ত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো,হঠাৎ খালা দৌড়ে এসে শান্তর হাত জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলেন
উনাকে শান্ত খালা বলে ডাকেন,কারন মা যেদিন এই বাড়িতে প্রথম এসেছিল সেদিন সাথে করে উনাকে এনেছিলেন,উনি মাকে কাজে সাহায্য করতেন,আজ এতটা বছর ধরে উনি এখানে,মালির বউ,আমাদের বাগানের যে মালি আছে টুটুল মিয়ার বউ তিনি,শান্তকে খালা অনেক ভালোবাসেন
ছলছল চোখে শান্তর হাত ধরে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি
শান্ত মুচকি হেসে উনাকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো

খালা কেঁদো না তো,আমাকে এত ইমোশনাল করবা না বলে দিচ্ছি
হ বাবা,তুমি আইছো,আমি অনেক খুশি হয়েছি বাবা
শান্ত হেসে দিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই উনি বললেন বাবা সোফায় গিয়ে বসো আমি তোমার কফি আনতেসি
উনি রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন এক দৌড়ে
শান্ত একটা ম্যাগাজিন নিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো
মিতু সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ওর দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেলো
মিতু মেয়েটা অনেক ভদ্র,বেশি মিশতে চায় না,আর ওর মা ওকে যা বলে তাই করে,হয়ত উনি মানা করেছেন আমার সাথে যেন কথা না বলে
খালা কফি এনে শান্তর সামনে রেখে চলে গেলেন রান্নার কাজে
শান্ত কফির মগটা নিয়ে বাগানের দিকে গেলো,আগে যেসব ফুল ছিল সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই এখন নেই,হয়ত মরে গেছে,নতুন ও আনা হয়েছে
রেণু মায়ের ফুলের খুব শখ তাই হয়ত তার নাম রেণু,ফুলের রেণু
কফি শেষ করে একটা ফুল ছিঁড়তে যেতেই রেণু ছাদে থেকে বললেন শান্ত!ফুলে হাত দিও না,ওটা আমার শখের গাছ
শান্ত হাত ছেড়ে দিয়ে বললো সরি

আহানা ব্যাগ হাতে নিয়ে আশ্রমের গেটের দিকে চেয়ে আছে,কতদিন পর এসেছে সে
গেট খুলে ভিতরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকিয়ে এগিয়ে গেলো
কতটা বদলে গেছে সব,চেনাই যাচ্ছে না
আশ্রমের ভিতরে আসতেই আহানার থেকে ২/৩বছরের ছোট হবে এমন কয়েকটা মেয়ে এসে আহানার হাত টেনে ধরলো
সবার চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠে আছে
আহানাও খুব খুশি হলো তাদের দেখে,এদের সাথে কত খেলেছে সে
সবাইকে একসাথে জড়িয়ে ধরলো আহানা
সবাই খুশিতে আটখানা হয়ে গেছে ওকে পেয়ে
দূর থেকে একজন আহানা বলে এগিয়ে আসলেন
আরিফ উদ্দিন,উনি সালেহা বেগমের গত হওয়ার পরই ম্যানজারের পদ পেয়েছেন
উনি আহানাকে চিনতে পেরে আহানার মাথায় হাত রেখে বললেন কেমন আছো?

ভালো আছি স্যার😊,আপনি কেমন আছেন?
ভালো আছি কোনোরকম, ভালো করেছো এখানে এসে,অনেকদিন তোমাকে দেখি না
আহানা হেসে দিয়ে মেয়েগুলোকে নিয়ে ভিতরে চলে গেলো
দুপুরের খাবার খেয়ে শান্ত হাঁটতে বের হয়েছে
এখানের একটা আশ্রম আছে নাম “শান্তি নিবাস”
শান্তর মায়ের নামের আশ্রমটা,উনার নাম ছিল শান্তি রহমান
উনার অনাথ বাচ্চাদের প্রতি দূর্বলতা কাজ করত অনেক,তাই তার কথাতেই শান্তর বাবা এই আশ্রমটা বানান,আশ্রমটা বানানোর পরই শান্তর মায়ের নামে লিখে দেন
এরপর থেকে শান্তর মা নিজের হাতে এই আশ্রমের প্রতিটা কোণা সাজিয়েছেন
উনি মারা যাওয়ার আগে বলে গেছিলেন উনার কবর যেন আশ্রমের ভেতরে দেওয়া হয়
শান্ত আশ্রমটার ভিতরে ঢুকতেই বুকটা কেঁপে উঠলো তার,কতটাদিন পর মায়ের সাথে দেখা করবে সে
হাতে গোলাপি চুড়ি আর রজনীগন্ধা নিয়ে আশ্রমের আমগাছটার পিছনের দিকে গেলো শান্ত
মায়ের কবরের চারপাশ দিয়ে টাইলস করা বাউন্ডারি
গেটটাতে তালা দেওয়া
আরিফ উদ্দিন শান্তকে দেখে দৌড়ে এসে গেটের তালা খুলে দিলেন,শান্তকে সালাম দিলেন
শান্ত ব্রু কুঁচকে তাকালো উনার দিকে
উনি জিহ্বা কামড় দিয়ে বললেন অভ্যাস কি করবো বাবা তারপর চলে গেলেন চেয়ার আনার জন্য
শান্ত বাউন্ডারির ভিতরে ঢুকে কবরটার কাছে গিয়ে মাটিতে বসে গেলো
গোলাপি চুড়িগুলো কবরের উপরে রাখলো সে,তারপর রজনীগন্ধা ফুল কবরের পাশে রেখে দিলো
কয়েকটা শুকনো মেহগনি গাছের পাতা পড়ে আছে সেগুলো হাত দিয়ে ফেলে দিলো
কবরটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে চিৎকার করে কেঁদে দিলো শান্ত
মা,ফিরে আসো না আমার কাছে,আমি যে তোমাকে ছাড়া গোটা দুনিয়া অন্ধকার দেখি মা,শুনতে পাচ্ছো?মা কথা বলো না কেন!
কেন চলে গেলো আমাকে রেখে,আমাকেও নিয়ে যেতে,কেন আমাকে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় একা রেখে গেলো বলো,কি দোষ করেছিলাম আমি মা!মাগো একবার তোমার শান্তর মাথায় হাত বুলাতে ফিরে আসো না মা!

আহানা পুকুরে নেমেছিল মুখ ধোয়ার জন্য
কান্নার আওয়াজ পেয়ে তাড়াতাড়ি মুখটা ভালো করে মুছে পুকুর ঘাট থেকে উঠে এসে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে গেলো
আরে এটা তো শান্ত,উনি এখানে কি করে?
আহানা আরেকটু কাছে গিয়ে দাঁড়ালো
শান্ত কবর থেকে মাটি নিয়ে হাতে ঘষে লাগাতে লাগাতে কাঁদতেছে
আহানা কবরের দিকে চেয়ে দেখলো কবরের উপর গোলাপি চুড়ি আর রজনীগন্ধা
এই কবরটা তো যতদূর জানি এই আশ্রমের মালিকের কবর,তার নাম শান্তি রহমান,উনার সাথে শান্তর কি সম্পর্ক??
শান্ত কবরে হাত রেখে নিচু হয়ে সেখানে মাথা রাখলো আর কাঁদতে কাঁদতে বললো মা দেখো তোমার ছেলে কাঁদতেসে মা,দেখো না,আমার চোখ মুছতে আসবে না?

মা?তার মানে উনার ছেলে শান্ত?শান্তর মা মারা গেছেন!আমি তো জানতাম ও না,এর আগে তো শান্তকে আশ্রমে দেখলাম না,হয়তবা দেখেছি মনে নেই,আমি তো এই কবরের দিকে বেশি আসতাম না কখনও,আমার ভয় করতো এখানে জঙ্গল বলে তাই হয়ত শান্তকে এর আগে এই আশ্রমে দেখিনি
আহানা শুকনো পাতার উপর দাঁড়িয়েছে তাই খসখস শব্দ হচ্ছে
শব্দ পেয়ে শান্ত পিছন ফিরে তাকালো
আহানাকে দেখে চোখ মুছে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো শান্ত
আহানা চুপ করে থেকে বললো সরি ডিস্টার্ব করার জন্য
দাঁড়াও

কি?
তুমি এখানে কি করতেসো?
আমি তো!এমনি
ওহ
আপনার মা উনি?
হুম
আপনাকে কখনও কষ্ট দিয়ে থাকলে সরি,আমি বুঝি মা হারানোর কষ্ট,মা হারা কাউকে কষ্ট দিয়ে গুনাহ করতে চাই না
নাহ,যাদের মা বাবা আছে তারা বুঝে না মা /বাবা হারানোর কষ্ট,কোনোদিন ও বুঝে না,কিভাবে বুঝবে?যেটা তাদের আছে সেটার অনুপস্থিতিতে কেমন লাগে সেটা তারা বুঝবে না,আমাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়ার দরকার নেই,যাও এখান থেকে,আমাকে একা থাকতে দাও!
আহানা চুপ করে থেকে চলে গেলো
শান্ত মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে,সন্ধ্যা হয়ে গেছে
অন্ধকার ও নেমে এসেছে
শান্ত বাবা?বাসায় যাবা না?সাঁঝবেলা এখানে থাকা ঠিক না বাবা
যাচ্ছি

আরিফ উদ্দিনের কথায় শান্ত চোখ মুছে বেরিয়ে গেলো
তারপর আশ্রমের ম্যানেজারের রুমে এসে কাগজ পত্র দেখতেসে সে
বাবা বলেছে আসার সময় এসব দেখে আসতে
আরিফ উদ্দিনের সাথে কথা বলে নিয়ে আশ্রমটা ঘুরতে ভিতরে গেলো সে
আহানা আনমনে পুকুরঘাটে বসে চোখের পানি ফেলতেছে,এখন না সেই তখন থেকে যখন শান্ত বলেছে যাদের আছে তারা জানে না”” না থাকার কষ্ট!””
সে তো জানেই না আমার কেউই নেই আমি তো আপনার চেয়েও ভালো বুঝি আপনজন কেউ না থাকার কি ব্যাথা,যন্ত্রনা!
অন্ধকার হয়ে গেছে অনেক,এই পুকুরঘাটটা আগের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে,গাছগাছালিতে ভূতুরে বানিয়ে দিয়েছে কেমন!
আহানা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে বিভিন্ন পোকামাকড়ের আওয়াজ
পায়ের কাছে নরম কিছু লাগলো আহানার কাছে,দেখতে যাওয়ার আগেই সেটা কামড় বসিয়ে দিলো তার পায়ে
আহানা এক চিৎকার দিয়ে পা ধরে ২/৩টা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসলো
আশ্রমের লাইটের আলোয় একটু একটু দেখতে পেলো এক হাত লম্বার চেয়েও বেশি বড় একটা সাপ চলে যাচ্ছে,পুকুরের উপরের ঘাটে কিভাবে উঠলো এটা??

শান্ত আহানার চিৎকার শুনতে পেয়ে আশ্রম থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকালো
অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না
আহানা?
এত অন্ধকারে ও কোথায়,চিৎকার দিলো কেন,কেনো বিপদ হয়নি তো!!
আহানা ব্যাথায় মনে হয় মরে যাবে
শান্ত আশ্রমের গেটের সামনে এসে পুরো আশ্রমের যতগুলো বাতি আছে মোট ১৪টা বাতি সে জ্বালিয়ে দিলো
আহানার আর আওয়াজ শুনা যাচ্ছে না
আহানা!!আহানা??কোথায় তুমি?
কি হলো বাবা?আহানাকে খুঁজছো কেন?কি হয়েছে?
ওকে দেখেছেন কোথাও?
ওকে তো মনে হয় পুকুরঘাটে দেখেছিলাম তাও বিকালবেলায়,এখনও থাকার তো কথা না
শান্ত এক দৌড়ে পুকুরঘাটের দিকে গেলো
আহানা পা চেপে ধরে উঠার চেষ্টা করতেসে
শান্ত তড়িগড়ি করে নিচে নেমে আহানার দিকে তাকিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়লো

কি হয়েছে আহানা?পায়ে কি হয়েছে তোমার
আহানার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না,বলার চেষ্টা করতে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো
শান্ত চিৎকার দিয়ে বললো ডাক্তার ডাকতে
আহানাকে কোলে তুলে নিয়ে পুকুর ঘাটের উপরে নিয়ে আসলো
ওকে মাটিতে রেখে বাতির আলোতে আহানার পায়ের দিকে তাকালো,বাতি ছিল লাল রঙের,ঠিকমত দেখতেছে না শান্ত
চিন্তায় তার সারা গা ঘেমে গেছে
জ্যাকেট খুলে ফেললো তারপর সেটা থেকে ফোন বের করে নিয়ে টর্চ জ্বালিয়ে শান্ত আহানার পায়ের উপর ধরলো,সাপের কামড়ের দাগ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে
শান্ত আহানার গায়ের থেকে ওড়না টান দিয়ে ছিঁড়ে হাঁটুর নিচে বেঁধে ফেললো যাতে বিষ বেশিদূর যেতে না পারে
বিষাক্ত কিনা কে জানে,আহানার মুখ দিয়ে ফ্যানা তো বের হচ্ছে না তাও ভয় করছে শান্তর
ডাক্তার আসতেসে সাথে আরিফ আঙ্কেল ও
শান্ত নিজের জ্যাকেটটা আহানাকে পরিয়ে দিলো কারণ ওর ওড়না ছিঁড়ে পা বেঁধেছে সে
ডাক্তার দেখে বললেন না বিষাক্ত সাপ নয় তবে ব্যাথা পেয়েছে সাথে ভয় ও পেয়েছে আর তাই জ্ঞান হারিয়েছে,বিষাক্ত হলে নীল হয়ে যেতো আর নানা লক্ষণ দেখা দিতো,আমি বরং ব্যাথার একটা ইনজেকশান দিয়ে দিচ্ছি জ্ঞান ফিরলে ঔষুধ খাইয়ে দিবেন
শান্ত মাথার ঘাম মুছে আহানাকে কোলে টেনে বসলো সিঁড়ির উপর
ডাক্তার ইনজেকশান বের করলেন
শান্তর মনে হচ্ছে ওকে ইনজেকশান দিবে,ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে তার
আহানার হাতে ইনজেকশান দেওয়ার সময় শান্ত আহানাকে টেনে সরিয়ে নিলো
না ধরবেন না ওকে,দেওয়ার দরকার নেই এটা

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ১৯+২০

শান্ত বাবা?এটা দিলে আহানার ব্যাথা কমবে,তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে
শান্ত আহানার হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেললো
আরিফ উদ্দিন হেসে বললেন কি বাবা ভয় করছে নাকি?ইনজেকশন তো আহানা মাকে দেওয়া হচ্ছে আর তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার শরীরে দিচ্ছে
জানি না,ভয় করছে

প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ২৩+২৪