প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২০
Sadiya Jahan Simi
সকাল থেকে মির্জা বাড়িতে আয়োজনের ধুম পড়েছে।জোহরা মির্জার হাতে হাতে মেয়েরা সাহায্য করছে।মিমকে নিয়ে মাহিন পার্লারে গিয়েছে।ওখান থেকে ঘরের দরকারি জিনিসপত্র কিনতে বাজারে যাবে। উদ্যান সকালে নাস্তা করে বের হয়েছে।এখনো আসেনি বাড়িতে। তাড়াতাড়ি আসবে বলেও আসেনি।কোনো দরকারি কল আসাতেই তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গিয়েছিল। জোহরা মির্জা বিভিন্ন পদের রান্না বান্না করছে। বিশেষ মেহমান আসবে বলে কথা।মেয়েরা নাস্তা জাতীয় জিনিস বানাচ্ছে।রাফসা নুডুলস ভালো বানাতে পারে।তাই এটার দায়িত্ব ওর কাঁধেই পড়েছে। এখন চুলায় জেল বানাচ্ছে রাফসা।ফালুদা রান্না করবে।জোহরা মির্জার রান্না প্রায় শেষের দিকে। শুধু পোলাও আর গরুর মাংস বাকি।ওটাও হয়ে যাবে।ঊষা একপাশে দাঁড়িয়ে জুস বানাচ্ছে। গরম ভালোই পড়েছে। ঠান্ডা ঠান্ডা জুস খেলে গলাটা ভিজবে।
“মাইশা মিমকে একটা কল কর তো মা। এখনো আসছে না কেন মেয়েটা? মেহমান চলে আসবে কিছুক্ষণ পরেই।”
মাইশা এক পাশে বসে সালাদ বানাচ্ছিল। মায়ের কথা বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নেয়।এখনো পর্যন্ত জানতেই পারলো না বাড়িতে কোন মেহমান আসছে বা কিসের জন্যই আসছে। মাইশা বিরক্ত হয়ে বলল, “মা তুমি বলবে বাড়িতে কে আসছে? নয়তো আমি এখন কোন কাজই করবো না।”
জোহরা মির্জা কাজে হাত চালাতে চালাতে বলল, “আজকে মিমকে দেখতে আসবে, হয়েছে শান্তি? এখন একটু যাতো কল কর।”
রাফসা ঊষা মাইশা ফ্যালফ্যাল করে তাকালো। কথা হজম হতে কিছু সময় লাগলো। মীমকে দেখতে আসবে অথচ ওরা জানে না।আজকে শুনলো?মাইশা চেঁচিয়ে বলল, “কি বলছো মা? আপুকে দেখতে আসবে আর তুমি আজকে বলছো! আগে বললে কি এমন হতো!”
উনি কাজে মন দিয়েই উত্তর করল, “এলে তো দেখতেই পাবি, তাই বলিনি।”
“তাই বলে তুমি বলবে না? আমরা কি প্রতিবেশীর মতো তোমার মেয়ের নামে কান ভাঙানি দিতাম?আজব তো!”
জোহরা মির্জা আর কিছু বলল না।মসলা কষানোর কাজে ব্যস্ত।মাইশা উঠে চলে গেল। ততক্ষণাৎ কলিং বেল বেজে উঠল।রোহান ড্রয়িং রুমেই বসে ছিল।বসে ফোন দেখছে।এদের আর কাজ নেই যেন।যখুনি দেখো ফোনে ডুবে থাকে।মাইশাই দরজা খুলে দিল। লামিয়া এসেছে লামিয়াকে দেখে মাইশা জড়িয়ে ধরল। “কাল আসিস নি কেন তোর !অপেক্ষায় তো ছিলাম ।”
লামিয়া হাসলো। কালকের কথা মনে পড়তেই চিবুক শক্ত করে উঠলো।মাইশার কাঁধ ভেদ করে দৃষ্টি পড়ে বসে থাকা রোহানের পানে। বান্দার এদিকে কোন খবর নেই। মন প্রাণ দিয়ে ফোনে ডুবে আছে।
“এসেছিলাম কাল সন্ধ্যায়।ভাবলাম তোদের বাড়িতে মানুষজন বেশি। আসা ঠিক হবে না, তাই চলে গিয়েছি।”
লামিয়ার কথায় মাইশা মৃদু চাপড় মেরে বলল, “তুই কি বাইরের মানুষ নাকি? কালকে এলে খুব মজা হত। জানিস,কাল ট্রুথ ডেয়ার খেলেছিলাম। অনেক মজা হয়েছে।”
“বলিস কি? তাহলে তো মিস করে ফেললাম, ইশ্!”
“হ্যাঁ অবশ্যই মিস করে ফেলেছিস।আপুকে দিয়ে কাল আমার কাপড় ধুয়েছি রাত্রিবেলা।”
লামিয়া জোরে নিশ্বাস টেনে ভ্রু কুঁচকে বলে, “তোদের বাড়িতে আয়োজন তো মনে হচ্ছে ভালোই। খুব ভালো গন্ধ বেরিয়েছে খাবারের।”
“আর বলিস না কাহিনী ঘটে গেছে।”
লামিয়া তড়িঘড় করে শুধায়, “কি কাহিনী ঘটেছে?”
“আপুকে দেখতে আসছে আজ পাত্রপক্ষ। আর আমি কিছুক্ষণ আগে জানতে পারলাম। এ নিয়ে বাড়িতে এত আয়োজন।”
লামিয়ার চক্ষুচড়াক গাছ, “বলিস কি, আর আমি আজ শুনলাম!’
“আচ্ছা চল। আর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। ভেতরে যাই।”
রোহানকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তাকালো লামিয়া। রোহানো সে সময় চোখ তুলে তাকিয়েছে কেবল ।লামিয়াকে দেখে কিছুটা অবাক হল। তবে পরমুহূর্তে তা রাগে পরিণত হলো। লামিয়া ভেংচি কেটে চলে গেছে। রোহান ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল। বিড়বিড় করে বলল, “কি বেয়াদব মেয়ে ললনা ছলনা।”
তারপর আড়মোরা হয়ে উঠে দাঁড়ালো। শাওয়ার নেওয়ার প্রয়োজন।
“মা, মা আপুরা খুব কাছেই আছে। এক্ষুনি চলে আসবে।”
জোহরা মির্জা কাজের মাঝেই বলল, “আচ্ছা তোরা গিয়ে শাওয়ার নিয়ে তৈরি হয়ে নে। এদিকটা আমি সামনে নিচ্ছি।”
উষা, মাইশা লামিয়া একসাথে হল। জারা সেই কখনই রুমে চলে গেছে। ওটা আবার সবার থেকে আলাদা। কাজ দেখলে পালায় পালায় করে।
“কি হলো রাফসা? উঠছিস না কেন! শাওয়ার নিবি না?”
“মাইশা আপু তোমরা যাও। আমার একটু পর যাচ্ছি।সবাই একসাথে চলে গেলে ফুফু একা হয়ে যাবে।”
জোহরা মির্জা বাঁধা দিয়ে বলল, “লাগবে না মা তুই গিয়ে রেডি হয়ে নে। আমি দিকটা সামলে নিতে পারব।”
“না ফুফু আমি একটু পরে যাব। আপু তোমরা গিয়ে চটপট করে রেডি হয়ে নাও।”
শেষের কথাটা উষাদের উদ্দেশ্য করে বলল রাফসা।ওরা আর কিছু বলল না।চলে গেল রুমে।
কিছুক্ষণ পর পুনরায় কলিং বেল বেজে উঠল।জোহরা মির্জা যেতে নিলে রাফসা পথ আগলে দাঁড়ালো।
“আমি যাচ্ছি ফুফু।”
রাফসা দরজা খুলে দিতেই রাফসা ভ্যাবাচ্যাকা খেলো দরজার ওপাশে উদ্যান কে দেখে। গতকালের সাদা শার্ট গায়ে জড়িয়ে আছে। সিল্কি এলোমেলো চুল গুলো কপালে পড়ে আছে।কানে এক হাত দিয়ে ফোন ধরে আছে।অপর হাতে একটা শপিং ব্যাগ ধরা। উদ্যান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাফসার পানে।রাফসা চেপে উদ্যাকে যাওয়ার জায়গা করে দিল। উদ্যান ফোন কানে ধরেই ভেতরে ঢুকে।রাফসা দরজা আটকে উদ্যনের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করে উদ্যান ডেকে উঠলো। “দাড়া।”
রাফসা পেছন ফিরে তাকায়। উদ্যান ততক্ষনে ফোন কেটে দিয়েছে।ডান হাতে ধরে রাখা শপিং ব্যাগটা রাফসার পানে বাড়িয়ে দেয়।রাফসা তা নিল না। বোঝার চেষ্টা করছে। উদ্যান কেন ওকে এটা দিচ্ছে।
“ধরছিস না কেন? ”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে বলে, কি এটা? আমায় দিচ্ছেন কেন?”
“KitKat চকলেট।শপে গিয়েছিলাম কিছু কাজে। তখন চোখে পড়ল।সাথে কয়েকজন ফ্রেন্ড ছিল।ওরা সংসারের জিনিস পত্র কিনেছে।তাই আসতে দেরি হলো এতো।”
“তো আমায় বলছেন কেন? আমি কৈফিয়ত চেয়েছি আপনার কাছে?” নিষ্প্রভ কন্ঠে জানতে চাইল রাফসা।
“তুই যে জল্লাদ! কৈফিয়ত চাইবি কেন?” বিড়বিড় করে শুধায় উদ্যান।
উদ্যানের বিড়বিড় করা কথা রাফসা বুঝতে পারেনি। তবে কিছু একটা বলেছে সেটা ঠিক বুঝতে পেরেছে।
“কি বললেন বুঝিনি। আবার বলুন।”
“কিছু না,প্যাকেটটা ধর।”
রাফসা নিল প্যাকেটটা। সেটা হাতে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়।উদ্যান ক্লান্তিতে সোফায় বসে। দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে রাখে। মাথা উঁচু করে আফসোস করে বলল, “ইস কবে যে সংসারের জন্য বাজার করব।”
রাফসাকে রান্না ঘরে ঢুকতে দেখে জোহরা মির্জা জানতে চাইলেন, “কে এসেছেন মা?”
রাফসা আস্তে করে বলল, “ঊষা আপুর ভাইয়া।”
উনি ভ্রু কুঁচকালেন রাফসার কথায়।কথাটা বোঝার চেষ্টা করে বলল, “ঊষার ভাই! তার মানে তো উদ্যান এসেছে।”
রাফসা ফালুদা হালকা নাড়াচাড়া করছে।চুলার আঁচ কমিয়ে সোজা হয়ে দাড়ালো। সংক্ষিপ্ত উত্তর করল, “হুঁ, উনিই এসেছে।”
“এটা কেমন কথা রাফসা? উদ্যান তোর বড় ভাই। ভাইকে ভাইয়া ডাকতে হয় তো। শুনেছি তোদের মধ্যে নাকি কিসের ঝামেলা।ভাই বোনের এরকম টুকটাক ঝামেলা হয়েই থাকে।তাই বলে কি ভাইয়া ডাকবি না আর!”
রাফসা মুখ বাকালো ভাইয়া শব্দটা শুনে। বিড়বিড় করে বলল, ভাইয়া না ছাই। শালা এক নাম্বারের খচ্চর।”
“ছেলেটা বাইরে থেকে এসেছে।যা মা, একটু কষ্ট করে শরবত দিয়ে আয়।ঠান্ডা শরবত খেলে ভালো লাগবে।”
রাফসা স্তম্ভিত হয়ে গেল।আবার যেতে হবে উদ্যানের সামনে? রাফসা যথারীতি চেষ্টা করে উদ্যান কে এড়িয়ে চলার। কিন্তু পারছে কোথায়।সেই ঘুরেফিরে উদ্যানের সামনে পড়তে হয়। ততক্ষণে জোহরা মির্জার গ্লাসে শরবত ঢালা হয়ে গেছে। রাফসার পানে ধরে চটপটে স্বরে বলল, “যা এক্ষুনি দিয়ে আয়।”
বাধ্য হয়ে রাফলা গ্লাসটা হাতে নিল। বকতে বকতে পা বাড়ালো ড্রয়িং রুমে। উদ্যান চোখ বুঝে হেলিয়ে আছে। দুহাত দু প্রান্তে ছড়ানো।বেশ ক্লান্ত দেখা যাচ্ছে।রাফসা গ্লাসটা টি – টেবিলের উপর রাখল শব্দ ছাড়া।
“এই যে,ঊষা আপুর ভাইয়া। শরবত খেয়ে আমাকে উদ্ধার করুন।”
এহেন সম্বোধনে তড়িৎ গতিতে চোখ মেলল উদ্যান। নিজের সামনে রাফসাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। চোখ নামিয়ে দেখলো শরবতের গ্লাস। রাফসার এহেন সম্বোধনে অদ্ভুত চোখের তাকায় উদ্যান। আড়মোড়া হয়ে উঠে বসলো উদ্যান। ভ্রু নাচিয়ে বলল, “নাইস নেইম, ঊষা আপুর ভাইয়া।আই লাইক ইট। কিন্তু পরের কথাটা পছন্দ হয়নি। আপনাকে আমি এখন উদ্ধার করব কিভাবে? সময় সুযোগ বুঝে যোগাযোগ করবেন। তখন উদ্ধার করে দেবো। সুন্দর করে ফিনিশিং দিয়ে।”
“আপনার উদ্ধার আপনি অন্য কাউকে করুন গিয়ে জনদরদী ডাক্তার। আমার প্রয়োজন নাই আপনাকে।”
উদ্যান হাত বাড়িয়ে গ্লাস তুলল।ঢোক ঢোক করে নিমিষেই শেষ করে দেয়। উদ্যানের শরবত খাওয়াতে অ্যাডম অ্যাপলস ক্রমাগত উঠা নামা করে।রাফসা ঢোক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। উদ্যান গ্লাসটা শব্দ করে টেবিলে রাখল। আয়েশ করে বসে বলল, “এভাবে ত্যাড়ামি করিস না। বিয়ের পর হাসবেন্ড এর কাছে উওম মধ্যম খাবি।”
“তাতে আপনার কি? সেটা আমার ব্যাপার।”
উদ্যান দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠলো, “বেয়াদব।তোকে সাবধান করে দিলাম। ভালো লাগছে না।”
রাফসা বিরক্তিতে চোখ বুঝলো।নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল, “ফালতু লোক।”
উদ্যান জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছে।রাফসা চলে যেতে নিয়েও দাঁড়িয়ে গেল। উদ্যান কে প্রশ্ন করেই বসল, “আজ আপনার প্রেমিকাকে দেখতে আসবে জানেন? হাত পা গুটিয়ে বসে আছেন কেন?”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকালো রাফসার কথায়। প্রেমিকা আবার কোথায় পেল! এ মেয়ে আবার চরিত্রে দাগ লাগিয়ে দিচ্ছে। বিরক্ত হয়ে বলল, “আমার আবার প্রেমিকা কোথা থেকে উদয় হলো?”
“কেন মিম আপু।” সংক্ষিপ্ত উত্তর রাফসার।
উদ্যানের কুঁচকানো ভ্রু যুগোল শিথিল হয়ে এলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে, তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকায়।জিভ দিয়ে গালের অভ্যন্তরীণ ত্বক স্পর্শ করলো। ঠোঁট গোল করে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। নিষ্প্রভ কন্ঠে বলে উঠলো, “কানে শোনা কথা,চোখে দেখা দৃশ্য সবসময় সত্যি হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল হয়।”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “মানে বুঝলাম না। আবার বলুন।”
“মুড নেই এখন।” গা ছাড়া ভাব উদ্যানের।
রাফসা বিরক্ত হলো।মন চাইছে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে এই লোকের মুডের দফা রফা করতে।ক্ষণে ক্ষণে মুড চেঞ্জ হয় কার?রাফসার বিরক্ত উদ্যান স্পষ্ট দেখলো। টেবিলের উপর থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে গম্ভীর কন্ঠে শুধায়, “মেহমান এলে নিচে আসবি না।উপরেই থাকবি।ওনারা মিমকে দেখতে আসবে। তোদের না।সো বি কেয়ার ফুল।পা যেন নিচে না পড়ে, আই রিপিট পা যেন নিচে না পড়ে।”
রাফসা চেয়ে দেখলো উদ্যানের প্রস্থান।কি সুন্দর আদেশ করছে।রাফসা উদ্যান কে নকল করে বলে উঠলো, “পা যেন নিচে না পড়ে আই রিপিট পা যেন নিচে না পড়ে। হুঁ,বসে আছি ওনার কথা শুনতে।”
রাফসা উপরে যেতেই নিবে ওমনি থেমে গেল। উদ্যান কে দেখে থতমত খেয়ে যায়। উদ্যান সিঁড়ির দু – তিন ধাপ উপরে উঠে দাঁড়িয়ে আছে।রাফসার পানে শীতল চোখে তাকিয়ে রইল।জোড়সোড় হলো মেয়েটা। কিছু না বলেই পা বাড়ায় সামনে।রাফসাও উদ্যানের পেছনে পা ফেলে। ফ্রেশ হওয়া দরকার।নয়তো শান্তি মিলবে না।
“সব রেডি তো? কোনো ঝামেলা হয়েছে আর?”
ঠোঁটে সিগারেট গুজা।কালো হুডি গায়ে জড়ানো। গরমের মধ্যেও নিজেকে আড়াল করার জন্য বিভিন্ন চেষ্টা আন ক্রেভিয়ান এর। ফাঁকা আস্তানায় দুপুর বেলাও টহল দিচ্ছে।পাশে থাকা ব্যক্তি বলে উঠলো।
“সব রেডি স্যার।তবে ব্যবসায় ইদানিং বেশ লোকসান হচ্ছে।”
সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দিল। লম্বা করে শ্বাস ফেলে ধারালো ছুরির আগায় নিজের বৃদ্ধা আঙ্গুল চেপে ধরল আন। নিমিষেই চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে এলো তরল লাল পদার্থ।মুখে ব্যথাতুর ছাপটুকু নেই তার। শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল রক্ত চুড়িয়ে পড়া আঙ্গুলের পানে।
“লোকসান হওয়ার কারণ কি? কার গাফিলতির ফলে ব্যবসার এই হাল? ”
লোকটা নড়েচড়ে উঠলো। জীবন হাতে নিয়ে আনের সামনে বসতে হয়। গ্যারান্টি নেই কখন কাকে মেরে বসে। বিশাল রকমের সাইকো ‘আন ক্রেভিয়ান’।
“স্যার সেটা বলা যাচ্ছে না।তবে সবাই চেষ্টা করছি। ব্যবসার পেছনে লসের হাত কার আছে তদন্ত চলছে।”
আন শান্ত স্বরে বলল, “আস্তানা থেকে তেরোটা মেয়ে কি করে উধাও হলো?”
বেচারার অবস্থা শোচনীয়।ঘাম বের হয়ে গেল।
“কোনো এক ছেলে ছিল স্যার। খুবই চতুর। আমাদের ছেলেপেলেদের ঘুমের ওষুধ দিয়ে অজ্ঞান করেছে আগে। তারপর মেয়েদের ছাড়িয়েছে।”
আন কুটিল হেসে উঠলো।চোখে আদিম খেলায় মত্ত।
“ভাই খবর নিয়েছি।”
হাঁপাতে হাঁপাতে বললো রনি।আভিয়ান কিছুতেই রাফসার খবর না জেনে শান্তি পাচ্ছিল না।দুই ঘন্টার মধ্যে যে করেই হোক রাফসার খবর জানতে চেয়েছে।আভিয়ানের আদেশ পেয়েই রনি ও আরো কয়েকজন মিলে খোঁজ করতে বেরিয়েছিল।কোনো ভাবে খোঁজ নিয়েই হাজির।আভিয়ান এতক্ষণ যাবৎ পায়চারি করছিল। রনির কথা শুনে তড়িৎ গতিতে শুধায়
“কি খবর পেয়েছিস বল। কোথায় ও?”
“না ভাই ঠিক আছে।ভাবী একদম সুস্থ। খবর নিয়ে জানতে পারলাম উনি ফুফুর বাড়ীতে গিয়েছে।”
“হঠাৎ? ফুফুর বাড়ীতে কেন?” ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে আভিয়ান।
“সে খবর পাইনি ভাই। চেষ্টা করছি জানার।”
“ওকে। ভালো করে সব জেনে নিস।আমি একটু কল্যাণ সমিতির অফিসে যাচ্ছি।শালারা শুধু ঝামেলা পাকাচ্ছে।রাম দা দিয়ে কোবাতে না পারলে শান্তি পাবো না।”
“আমি যাবো আপনার সাথে ভাই?”
আভিয়ান বাধা দিয়ে বলল, “না তুই ওর খবর নে ভালো করে। আমি সামলে নিব ওদিকটায়।”
রনি বাধ্য ছেলের মত মাথা নাড়ালো।আভিয়ান ড্রয়ার খুলে কালো চকচকে রিভালভার টা বের করে কোমড়ে গুঁজে নিল।কালো সানগ্লাস চোখে ঠেকিয়ে পা চালালো নিজ গন্তব্যে।
দুপুর হয়ে গেছে। মেহমানরাও ইতোমধ্যে চলে এসেছে। আপাতত তাদের খাবারের ব্যবস্থা চলছে।মিম কে শাড়ি পরিয়ে রুমে রেখে এসেছে। জোহরা মির্জার সাথে লামিয়ার মা হাতে হাতে বেড়ে দিচ্ছে।মেয়েরা এখনো অবধি নিচে নামেনি।
খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলো সবে।আয়েশ করে খেয়েছে মেহমানরা। প্রশংসা ও করেছে বেশ।তবে পাএের ফুফাতো ভাই নুডুলস পছন্দ করেছে বিশেষ করে। ক্ষণে ক্ষণে বলছে এমন নুডুলস আজ প্রথম খেয়েছে।জোহরা মির্জা ভাইজির প্রশংসা শুনে খুশি হলো।তবে কেউ জানে না এখনো কার রান্না ছিল সেটা।জামিলা খাতুন গালে পান গুঁজে বলল, “তো মেয়ে আনুন।দেখি ছেলের হবু বউ কে।”
জিহাদ একপাশে বসে আছে। ইশ্ কত বছরের প্রেম আজ পূর্ণতা পাবে। উদ্যানের হাতে পায়ে ধরে রাজি করিয়েছে জিহাদ। উদ্যান কে না জানিয়েই ওর বন্ধু ওর ই ফুফাতো বোনের সাথে লাইন মারছিল। উদ্যান জানার পর হম্বিতম্বি করল প্রচুর।পরে মিম জিহাদ দু’জনেই বুঝিয়ে বলেছে। উদ্যান আর নাকোচ করেনি।বোন ভালো থাকলেই হবে।আর জিহাদ খারাপ ছেলে নই। উদ্যানের বেস্ট ফ্রেন্ড।
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৯
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে মিম।মাথায় ঘোমটা টেনে দেওয়া।মিমের দুপাশে মাইশা আর ঊষা।তার পেছনে লামিয়া। উদ্যান তাকালো সেদিকে।রাফসা কে দেখতে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকালো।এ মেয়ে ওর কথা শুনেছে! তবে উদ্যানের চিন্তা ভাবনা ভুল প্রমাণিত করে ততক্ষণাৎ রাফসাকে দেখা যায়। মেরুন কালারের থ্রি পিস পড়েছে রাফসা। বরাবরের মতো স্নিগ্ধ শোভন মুখখানি তার। ভদ্রভাবে ওড়না দিয়ে মাথায় ঘোমটা টানা। শরীর জড়িয়ে রেখেছে ওড়নাটা। উদ্যানের কুঁচকানো ভ্রু যুগোল শিথিল হলো।রাফসার থেকে চোখ সরিয়ে আনতেই চোখ পড়ে জিহাদের ফুফাতো ভাই সৈকতের পানে।কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে রাফসার পানে। উদ্যান তখনো বুঝতে পারেনি ও ছেলের দৃষ্টি কোন দিকে। সৈকতের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকায় উদ্যান। ব্যাস বুঝে গেল এই বান্দার দৃষ্টি কোথায়। উদ্যান একবার সৈকত তো আরেকবার রাফসার পানে তাকাচ্ছে।রাফসার এদিকে কোনো হুঁশ নেই।নিজের ছন্দে ধীর পায়ে নেমে আসছে গুটি গুটি পায়ে।
